📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ঈমানের মৌলিক শর্ত পাঁচটি

📄 ঈমানের মৌলিক শর্ত পাঁচটি


১. মৌখিক স্বীকারোক্তি — الإقرار باللسان
অনেক মুহাক্কিক আলিম ইমানের সংজ্ঞা বর্ণনা করতে গিয়ে তাসদিকের (আন্তরিক সত্যায়ন) পাশাপাশি মৌখিক স্বীকারোক্তিকেও সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁদের সংজ্ঞা অনুসারে কেউ যদি আন্তরিক সত্যায়নের পাশাপাশি মৌখিক স্বীকারোক্তিও প্রদান করে, তবেই সে মুমিন বলে বিবেচিত হবে; অন্যথায় সে কাফিরই থেকে যাবে। আল্লামা ইবনুল হুমাম রাহ. মুসায়ারা গ্রন্থে এ বিষয়টি সবিস্তারে আলোচনা করেছেন এবং এই অভিমতকে ইমাম আবু হানিফার মাজহাব বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আশআরি ও মাতুরিদি মৌখিক স্বীকারোক্তির বিষয়টি ইমানের সংজ্ঞা ও হাকিকতের অন্তর্ভুক্ত করেননি; বরং তাসদিককেই ইমানের মূল বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদি রাহ.-ও তাঁর তাফসিরগ্রন্থে এই অভিমত দিয়েছেন।
তবে উভয় দল এ ব্যাপারে একমত যে, কারও থেকে মৌখিক স্বীকারোক্তি তলব করা হলে তার জন্য স্বীকারোক্তি দেওয়া অপরিহার্য। যদি তলব করা সত্ত্বেও বিনা ওজরে কেউ মৌখিক স্বীকারোক্তি প্রদান থেকে বিরত থাকে, তার ওপর মুসলমানের বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে না; বরং তার এই অবস্থাকে ‘কুফরে ইনাদ’ নামে নামকরণ করা হবে।
তাই মুসলিম হিসেবে কারও বিবেচিত হতে অপরিহার্য শর্ত হলো, প্রয়োজনের সময় তাকে মৌখিক স্বীকারোক্তি দিতে হবে। ইমাম আবুল মুয়িন নাসাফي রাহ. লেখেন,
وهو أن يصدق الرسول ﷺ فيما جاء به من عند الله تعالى، فمن أتى بهذا التصديق فهو مؤمن فيما بينه وبين الله تعالى، والإقرار يحتاج إليه ليقف عليه الخلق فيجروا عليه أحكام الإسلام. هذا هو المروي عن أبي حنيفة رحمه الله، وإليه ذهب الشيخ أبو منصور الماتريدي رحمه الله، وهو أصح الروايتين عن أبي الحسن الأشعري رحمه الله.
‘সুতরাং ইমান হচ্ছে রাসুল ﷺ আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তা সত্যায়ন করা। যে ব্যক্তি সত্যায়ন করবে, সে আল্লাহর কাছে মুমিন বলে বিবেচিত হবে। আর মৌখিক স্বীকারোক্তির প্রয়োজন এ কারণে যে, মানুষ যাতে তার ইমানের ব্যাপারে অবগত হয়ে তার ওপর ইসলামের বিধিবিধান প্রয়োগ করতে পারে। এটিই ইমাম আবু হানিফা রাহ. থেকে বর্ণিত মত। শায়খ আবু মানসুর মাতুরিদি রাহ.-ও এই মত পোষণ করেছেন। শায়খ আবুল হাসান আশআরি রাহ. থেকে বর্ণিত দুটি মতের মধ্যে এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত।
ইমাম ইবনুল হুমাম রাহ. লেখেন,
اتفق القائلون بعدم اعتبار الإقرار على أن يعتقد أنه متى طولب به أتى به، فإن طولب به فلم يقر فهو كفر عناد، وهذا ما قالوا إن ترك العناد شرط وفسروه به.
‘যারা মৌখিক স্বীকারোক্তিকে (ইমানের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত বলে) বিবেচনা করেননি, তারা সবাই এই আকিদার ব্যাপারে একমত যে, যখন তার কাছে ইমানের মৌখিক স্বীকারোক্তি তলব করা হবে, তখন সে স্বীকারোক্তি প্রদান করবে। যদি তার কাছে মৌখিক স্বীকারোক্তি তলব করা সত্ত্বেও সে যদি তা প্রদান না করে, তাহলে তা কুফরে ইনাদ। ফকিহগণ যে বলেছেন, ইমানের একটি শর্ত হলো “ইনাদ” পরিহার করা, তার ব্যাখ্যা তারা এটাই করেছেন। (অর্থাৎ, মৌখিক স্বীকারোক্তি প্রদান করা।)
২. সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা- الرضا والمحبة
একজন মুমিনের জন্য ইসলামের সব বিধান ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত সব বিষয়ের প্রতি সন্তুষ্টি পোষণ করা এবং ইসলামকে ভালোবাসা অপরিহার্য। শরিয়তের দৃষ্টিতে একব্যক্তির ইমান বিবেচ্য হতে শর্ত হলো, শরিয়ত এবং ইসলামের প্রমাণিত প্রতিটি বিষয়কে সন্তুষ্টির নজরে দেখতে হবে, এর সঙ্গে হৃদ্যতা ও ভালোবাসার সম্পর্ক রাখতে হবে। কেউ যদি রাসুল কর্তৃক আনীত পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে সত্যায়ন করে, মৌখিকভাবে ইমানের স্বীকারোক্তিও প্রদান করে; কিন্তু ইসলামি শরিয়তের প্রতি অন্তরে বিরূপ মনোভাব লালন করে কিংবা ইসলামের প্রমাণিত কোনো বিষয়কে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে, তাহলে সে ব্যক্তি মুমিন বলে বিবেচিত হবে না; বরং তার সঙ্গে কাফিরের মতোই আচরণ করা হবে। যেমন, আল্লাহ কুরআন মাজিদে বলেন,
مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِلَّهِ وَمَلَئِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَمِيْكُلَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لِلْكَفِرِينَ
যদি কেউ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাদের, তাঁর রাসুলগণের এবং জিবরিল ও মিকাইলের শত্রু হয়, তবে (সে শুনে রাখুক,) আল্লাহ ও কাফিরদের শত্রু। [সুরা বাকারা (২) : ৯৮]
এই আয়াতে আল্লাহ ফেরেশতাদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণকারীদের কাফির বলে অভিহিত করেছেন। ইমাম নাসাফি রাহ. এই আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, (বর্ণনা-পরম্পরায়) আয়াতের শেষ বাক্যটি তো এরূপ হওয়া স্বাভাবিক ছিল-'আল্লাহ তাদের শত্রু'। কিন্তু আয়াতটি বিবৃত হলো এভাবে, 'আল্লাহ কাফিরদের শত্রু'। এর দ্বারা মূলত ইঙ্গিত করা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাদের শত্রু হওয়ার প্রকৃত কারণ হলো তাদের কুফর। এর দ্বারা আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ফেরেশতাদের প্রতি ভালোবাসা লালন করা অপরিহার্য। কেউ যদি তাদের প্রতি ভালোবাসার স্থলে শত্রুতা লালন করে, তাহলে সে কাফির বলে বিবেচিত হবে। এই বিধান শুধু ফেরেশতাদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীনের আবশ্যকীয় ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত সব বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। দীনের কোনো একটি বিধানের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করা পূর্ণ শরিয়তের প্রতি শত্রুতা পোষণেরই নামান্তর।
৩. সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ- التعظيم والاحترام
ইমান বিবেচ্য হতে এটি একটি মৌলিক শর্ত। কেউ যদি পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে সত্যায়ন করে এবং মৌখিক স্বীকারোক্তিও প্রদান করে, তবে ইসলামের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ লালন না করে; বরং ইসলামকে অবমাননা করে, তাহলে তার ইমান আল্লাহর কাছে গৃহীত হয় না এবং সে মুমিন বলে বিবেচিত হয় না। আল্লাহ বলেন,
﴿ذلِكَ وَمَنْ يُعَظِّمُ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ﴾
এটা আল্লাহর বিধান। যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে এটা তার অন্তরের তাকওয়ারই বহিঃপ্রকাশ। [সুরা হজ (২২): ৩২]
৪. আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য -التسليم والانقياد
আত্মসমর্পণের অর্থ হচ্ছে সব শর্ত ও হাকিকত ঠিক রেখে ইমান আনার পর গোটা শরিয়তের প্রতিটি বিধানের সামনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দেওয়া এবং তার ওপর আমলের জজবা ও মানসিকতা রাখা।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, শরিয়তের প্রতিটি হুকুম ও ফায়সালার সামনে নিজেকে সমর্পণ ব্যতিরেকে ইমানের দাবি গ্রহণযোগ্য নয় :
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا﴾
না, তোমার প্রতিপালকের কসম, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ-না নিজেদের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদের ক্ষেত্রে তোমাকে বিচারক মানে, তারপর তুমি যে রায় দাও, সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনোরূপ কুণ্ঠাবোধ না করে এবং অবনতমস্তকে তা গ্রহণ করে নেয়। [সুরা নিসা (৪) : ৬৫]
এই আয়াতে আল্লাহ কসম খেয়ে, একাধিক দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তার অব্যয় ব্যবহার করে বান্দাদের জানিয়ে দিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা শরিয়তের হুকুম ও ফায়সালার সামনে আত্মসমর্পণ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মুমিন হতে পারবে না। ইমাম আবু বকর জাসসাস রাহ. এই আয়াতের তাফসিরে লেখেন,
وَفِي هَذِهِ الْآيَةِ دَلَالَةٌ عَلَى أَنَّ مَنْ رَدَّ شَيْئًا مِنْ أَوَامِرِ اللَّهِ تَعَالَى أَوْ أَوَامِرِ رَسُولِهِ ﷺ فَهُوَ خَارِجُ مِنْ الْإِسْلَامِ سَوَاءٌ رَدَّهُ مِنْ جِهَةِ الشَّكَ فِيهِ أَوْ مِنْ جِهَةِ تَرْكِ الْقَبُولِ وَالِامْتِنَاعِ مِنْ التَّسْلِيمِ وَذَلِكَ يُوجِبُ صِحَّةَ مَا ذَهَبَ إِلَيْهِ الصَّحَابَةُ فِي حُكْمِهِمْ بِارْتِدَادِ مَنْ امْتَنَعَ مِنْ أَدَاءِ الزَّكَاةِ وَقَتْلِهِمْ وَسَبْيِ ذَرَارِيهِمْ لِأَنَّ اللَّهَ تَعَالَى حَكَمَ بِأَنَّ مَنْ لَمْ يُسَلَّمْ لِلنَّبِيِّ ﷺ قَضَاءَهُ وَحُكْمَهُ فَلَيْسَ مِنْ أَهْلِ الْإِيمَانِ
'এই আয়াতে এ পথনির্দেশ রয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর কোনো বিধান অথবা রাসুলের কোনো হুকুম প্রত্যাখ্যান করবে, সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে। সে সন্দেহবশত তা প্রত্যাখ্যান করুক অথবা গ্রহণ না করতে পারার কারণে প্রত্যাখ্যান করুক কিংবা আত্মসমর্পণ থেকে বিরত থাকার কারণে প্রত্যাখ্যান করুক-এ সবই সমান। (আবু বকর রা.-এর যুগে) সাহাবিগণ জাকাত আদায়ে অস্বীকারকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মুরতাদ হওয়ার সিদ্ধান্ত আরোপ করেছিলেন। তাদের হত্যা এবং তাদের নারী ও শিশুদের বন্দি করার পক্ষে মত ব্যক্ত করেছিলেন-এই আয়াত অপরিহার্যভাবে তাদের সেই অবস্থানকে বিশুদ্ধ বলে প্রমাণ করে। কারণ, আল্লাহ নিজেই এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন, যারা রাসুলের সিদ্ধান্ত ও ফায়সালার সামনে আত্মসমর্পণ করে না, তারা ইমানদারদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
এ প্রসঙ্গে নিচের আয়াতটিও লক্ষণীয়-
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَنُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَلًا بَعِيدًا
হে নবি, আপনি কি তাদের দেখেননি যারা দাবি করে, আপনার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে, তারা এর প্রতি ইমান রাখে; অথচ তাদের অবস্থা এমন যে, তারা ফায়সালার জন্য তাগুতের কাছে নিজেদের মোকদ্দমা নিয়ে যেতে চায়? অথচ তাদের প্রতি আদেশ করা হয়েছিল, যেন সুস্পষ্টভাবে তাগুতকে অস্বীকার করে। বস্তুত শয়তান ধোঁকা দিয়ে তাদের চরমভাবে গোমরাহ করতে চায়। [সুরা নিসা (৪) : ৬০]
যারা ইসলামي বিচারব্যবস্থার সামনে আত্মসমর্পণ না করে নিজেদের মোকদ্দমা নিয়ে তাগুতের দ্বারস্থ হতে চায়, এই আয়াতে তাদের ইমানকে বাস্তবতাবিবর্জিত দাবি বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা রাহ. বলেন,
والإسلام هو التسليم والانقياد لأوامر الله تعالى. فمن طريق اللغة فرق بين الإسلام والإيمان؛ ولكن لا يكون إيمان بلا إسلام ولا يوجد إسلام بلا إيمان.
'ইসলাম মানেই হলো আল্লাহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং তাঁর আনুগত্য করা। শাব্দিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম ও ইমানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে ইসলাম ছাড়া ইমান অস্তিত্ব লাভ করে না এবং ইমান ছাড়া ইসলামও অস্তিত্ব লাভ করে না।
৫. ইসলাম ছাড়া অন্য সব দীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা - التبري عن الأديان سوى الإسلام
কারও ইমান বিবেচ্য হতে শুধু ইসলামের ব্যাপারে আন্তরিক সত্যায়ন, মৌখিক স্বীকারোক্তি, সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা, আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্ম ও কুফরি-শিরকি মতবাদ-মতাদর্শের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করাও মৌলিক ও অপরিহার্য শর্ত। সুতরাং কেউ নিজেকে যতই মুসলিম বলে দাবি করুক না কেন, সে যদি হিন্দুধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম বা ইয়াহুদিধর্ম কিংবা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বা জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করে, তাহলে তার ইমানের দাবি বিশুদ্ধ, গৃহীত ও বিবেচিত হবে না।
কারণ, কুরআন মাজিদে আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একমাত্র দীন হলো ইসলাম। [সুরা আলে ইমরান (৩): ১৯]
এই শর্তের ভিত্তিতেই ফকিহগণ স্পষ্টভাবে লিখেছেন, কোনো বিধর্মী বা কুফরি মতবাদের ধ্বজাধারী যদি মুসলিম হতে চায়, তাহলে শুধু কালিমা পাঠ করে তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্যপ্রদানই তার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং তাকে সেই ধর্ম বা কুফরি মতবাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিতে হবে। তবেই তার কালিমা গৃহীত হবে। আল্লামা ইবনু কাওয়ান শাফিয়ي রাহ. (মৃত্যু : ৮৮৯ হিজরি) লেখেন,
بل الإيمان هو التصديق الخاص، ولكن لقبوله شرط : هو التلفظ بالشهادتين عند القدرة وعدم الإتيان بما هو مكفر.
'ইমান হলো বিশেষ ধরনের সত্যায়নের নাম, তবে ইমান গ্রহণের জন্য শর্ত রয়েছে। তা হলো, সক্ষমতা থাকাবস্থায় তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য মুখে উচ্চারণ করা এবং এমন কিছু না করা, যা কুফর অপরিহার্য করে।
আল্লামা হাসকাফি রাহ. লেখেন,
وإسلامه أن يتبرأ عن الأديان سوى الإسلام أو عما انتقل إليه) بعد نطقه بالشهادتين، وتمامه في الفتح؛ ولو أتى بهما على وجه العادة لم ينفعه ما لم يتبرأ، بزازية.
'মুরতাদ ব্যক্তির ইসলামগ্রহণের পন্থা হলো, সে তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়ার পরে ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্মের সঙ্গে কিংবা ইসলাম ছেড়ে যে ধর্মে সে স্থানান্তরিত হয়েছিল, তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সে যদি শুধু তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেয়, তাহলে এটা তার কাজে আসবে না-যতক্ষণ-না সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে।

টিকাঃ
৩৪ তাওয়িলাতু আহলিস সুন্নাহ: ৩/৫২০।
* কুফরের প্রকারসমূহের বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে।
৩৬ আত-তামহিদ লি কাওয়াদিত তাওহিদ: ৩৭৮।
** আল-মুসায়ারা, আল-খাতিমা ফি বাহসিল ইমান : ২৭৯।
৩৮ আহকামুল কুরআন, দারু ইহইয়াতিত তুরাসিল আরাবি বৈরুত প্রকাশিত: ৩/১৮১।
* আল-ফিকহুল আকবার-আল-আকিদা ওয়া ইলমুল কালাম: ৬২২।
৮০ শারহুল আকায়িদিল আজুদিয়া: ১০৮।
৮১ আদ-দুররুল মুখতার মাআ রাদ্দিল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ: ৪/২২৬।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ঈমানের জন্য এসব শর্ত কেন প্রয়োজন

📄 ঈমানের জন্য এসব শর্ত কেন প্রয়োজন


ইমান এবং কুফর পরস্পর বিপরীত জিনিস। যেভাবে কারও মধ্যে একসঙ্গে দুটি একত্রিত হওয়া অসম্ভব, সেভাবে কেউ উভয়টা থেকে মুক্ত হওয়াও অসম্ভব। পৃথিবীর সকল মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত: হয়তো মুমিন, নয়তো কাফির। এটি কুরআনেরই ঘোষণা। [সুরা তাগাবুন (৬৪) : ২] সুতরাং ইমান বিবেচ্য হতে সেসব বিষয় থেকে মুক্ত থাকা শর্ত করা হয়েছে; যা কুফরের প্রতীক, চিহ্ন বা নিদর্শন বহন করে। আকিদা-বিশেষজ্ঞ প্রায় সকল ইমামের বক্তব্যেই একত্রে বা বিক্ষিপ্তভাবে এ শর্তগুলোর আলোচনা এসেছে।
ইমাম ইবনুল হুমام রাহ. (মৃত্যু: ৮৬১ হিজরি) লেখেন,
اعتبر في ترتيب لازم الفعل وجود أمور عدمها مترتب ضده كتعظيم الله تعالى وأنبيائه وكتبه وبيته وترك السجود للصنم ونحوه والانقياد وهو الاستسلام إلى قبول أو أمره ونواهيه الذي هو معنى الإسلام وقد اتفق أهل الحق وهم فريقا الأشاعرة والحنفية على أنه لا إيمان بلا إسلام وعكسه، فيمكن اعتبار هذه الأمور أجزاء لمفهوم الإيمان فيكون انتفاء ذلك اللازم عند انتفائها لانتفاء الإيمان وإن وجد التصديق.
'ইসলামে একজন ব্যক্তির ওপর ইমানের অপরিহার্য বিধিবিধান আরোপ করতে কিছু বিষয়ের বিবেচনা করা হয়েছে, যা বিদ্যমান না থাকলে ইমানের বিপরীত বিষয়-অর্থাৎ, কুফরের বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে। যেমন: আল্লাহ তাআলা, তাঁর নবিগণ, তাঁর কিতাবসমূহ ও তাঁর ঘরকে সম্মান করা, মূর্তি ও এ জাতীয় জিনিসের সিজদা বর্জন করা এবং আনুগত্য করা-অর্থাৎ, আল্লাহর আদেশ- নিষেধসমূহ গ্রহণের উদ্দেশ্যে নিজেকে সঁপে দেওয়া ইত্যাদি।'
হকপন্থিদের উভয় দল-আশআরি ও হানাফি (মাতুরিদি) ইমামগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, ইমান ও ইসলাম একটি ছাড়া অপরটি বাস্তবায়িত হয় না। অতএব, এই ব্যাখ্যার আলোকে উল্লিখিত বিষয়সমূহকেও ইমানের হাকিকতের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যথাযথ। সুতরাং যদি এমন হয় যে, কারও তাসদিক (সত্যায়ন) তো ঠিকই আছে; কিন্তু এসব বিষয় অবিদ্যমান থাকার কারণে ইমানের অপরিহার্য বিধিবিধান আরোপ হচ্ছে না, তাহলে তা মূলত ইমান অবিদ্যমান হয়ে যাওয়ার কারণেই আরোপ করা যাচ্ছে না। (কারণ, ইমানের অপরিহার্য মৌলিক শর্ত বিদ্যমান না থাকার কারণে কেমন যেন ইমানই অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে।)
ইমাম ইবনু হাজার হাইতামি রাহ.-ও তাঁর রচনায় ইমানের জন্য অবধারিত অনুরূপ কিছু বিষয়ের বর্ণনা দিয়েছেন। এ ছাড়াও প্রসিদ্ধ হাম্বলি মুতাকাল্লিম ইমাম শামসুদ্দিন সাফারিনি রাহ. লেখেন,
قال جمهور الأشاعرة والماتريدية: الإيمان هو التصديق بالنبي ﷺ وبكل ما علم مجيئه به من الدين بالضرورة أي الإذعان، والقبول مع الرضا، والتسليم، وطمأنينة النفس لذلك؛ تفصيلا فيما علم تفصيلا، وإجمالا فيما علم إجمالا.
'সংখ্যাগরিষ্ঠ আশআরি ও মাতুরিদি ইমাম বলেন, ইমান হলো নবি -কে এবং যেসব বিষয়সহ তাঁর আগমন আবশ্যিকভাবে বিদিত হয়েছে, তা সব তাসদিক (সত্যায়ন) করা। অর্থাৎ, আনুগত্য-বরণ, সন্তুষ্টির সঙ্গে গ্রহণ ও আত্মসমর্পণ করা এবং সে ব্যাপারে অন্তর প্রশান্ত হওয়া। যেসব বিষয় বিস্তরভাবে জানা গেছে, সেগুলো বিস্তরভাবে সত্যায়ন করা এবং যেসব বিষয় মোটামুটিভাবে জানা গেছে, সেগুলো মোটামুটিভাবে সত্যায়ন করা।

টিকাঃ
** আল-মুসায়ারা: ২৮১।
** দ্রষ্টব্য-আল-ফাতহুল মুবিন, শারহু হাদিসি জিবরিল: ১৫৪।
* লাওয়ামিউল আনহারিল বাহিয়া, ফাসলুন ফিল কালামি আলাল ইমান ওয়াখতিলাফিন নাসي ফিহি, তানবিহাত: ১/৪২০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00