📄 আল্লাহর প্রতি ঈমান
আল্লাহর প্রতি ইমান আনয়নের সারকথা হলো, অন্তরে এই বিশ্বাস ও স্বীকৃতি রাখা যে, আল্লাহ গোটা সৃষ্টিজগৎকে অস্তিত্ব দান করেছেন। তিনি তাঁর সত্তা, গুণাবলি ও কাজসমূহে একক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার, সহযোগী, সমকক্ষ বা প্রতিপক্ষ নেই। পূর্ণতার সব গুণ তাঁর মধ্যে রয়েছে। সর্বপ্রকার দোষত্রুটি থেকে তিনি মুক্ত ও পবিত্র।
আল্লাহর প্রতি ইমানের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে। যথা: তাওহিদুর রুবুবিয়াহ, তাওহিদুল উলুহিয়াহ, তাওহিদুল হাকিমিয়াহ এবং তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত।
তাওহিদুর রুবুবিয়াহ-এর অর্থ হলো, রব হিসেবে আল্লাহর একত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা বা আল্লাহর কার্যাবলি, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতায় তাঁকে একক বলে বিশ্বাস করা। রব এমন একটি সর্বমর্মী ও ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, অন্য ভাষায় তার প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। সাধারণভাবে বাংলায় এর অর্থ যদিও প্রতিপালক করা হয়; কিন্তু এর ব্যাপকতার মধ্যে প্রভু, স্রষ্টা, স্বত্বাধিকারী, ব্যবস্থাপক, পরিচালক, পরিকল্পনাকারী, লালনপালনকারী, নিরাপত্তা দানকারী ইত্যাদি অর্থও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং তাওহিদুর রুবুবিয়াহর অর্থ হবে সৃষ্টি, মালিকানা, রিজিকদান, জীবন-মৃত্যু দান, গোটা সৃষ্টিজগৎ ও সব বিষয় নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা, সার্বভৌমত্ব, আইনকানুন ও বিধিবিধান প্রণয়ন, উপকার-অপকারের ক্ষমতা, বিপদ-সংকট থেকে পরিত্রাণ দেওয়া ইত্যাদি অধিকার ও কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর-এর সবগুলোর ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া এবং এসব ক্ষেত্রে তাঁর কোনো অংশীদার নেই-এ কথা সত্যায়ন করা।
তাওহিদুল উলুহিয়াহ হচ্ছে ইবাদতের উপযুক্ত হিসেবে একমাত্র আল্লাহকে গ্রহণ করা। শরিয়তসম্মত উপায়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সব আমল একমাত্র তাঁরই উদ্দেশে নিবেদন করা। আর এটাই সকল নবি-রাসুলের দাওয়াতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল।
ইসলামগ্রহণে ইচ্ছুক ব্যক্তির প্রথম কাজ হলো আল্লাহর তাওহিদুল উলুহিয়াহ এবং মুহাম্মাদ ﷺ -এর রিসালাতের ঘোষণা দেওয়া। এটা প্রমাণ করে যে, রাসুলগণের দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা। এই তাওহিদ হচ্ছে সে মূল বিষয়, যার ওপর সব আমলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভরশীল। এ তাওহিদ প্রতিষ্ঠা না হলে কোনো আমলই শুদ্ধ হয় না। তাওহিদের এ দিকটি সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে মানুষের মধ্যে তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন আকিদা-বিশ্বাস ও ধ্যানধারণা থেকেই যায়, যা শিরক বলে বিবেচিত।
রাসুলের যুগে মুশরিকরা রুবুবিয়াহর কিছু বিষয় মেনে নিলেও তাওহিদুল উলুহিয়াহকে মেনে নিতে পারেনি। এ জন্য আল্লাহ তাদের মুশরিক বলে অভিহিত করেছেন। তাওহিদের কালিমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' দ্বারা মূলত এ তাওহিদকেই সাব্যস্ত করা হয়েছে।
শহিদ সাইয়িদ কুতুব রাহ. বলেন, আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি হলো হাকিমিয়াহ। কেউ যখন কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের জন্য আইন প্রণয়ন করে, তখনই সে আল্লাহর বদলে নিজেকে এমন আরেক প্রভুর ভূমিকায় বসিয়ে নেয়, যার আইনের আনুগত্য ও অনুসরণ করা হয়। আর যারা তাদের আনুগত্য করে, তারা আল্লাহর পরিবর্তে আইনপ্রণেতাদের গোলামে পরিণত হয়। তারা আল্লাহর মনোনীত দীনের অনুসরণ না করে আইনপ্রণেতাদের রচিত দীনের অনুসরণ করে। জেনে রাখুন আমার ভাইয়েরা, এটা আকিদার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। এটা হলো ইবাদত ও দাসত্বের প্রশ্ন। এটা হলো ইমান ও কুফরের প্রশ্ন। জাহিলিয়াত ও ইসলামের প্রশ্ন। জাহিলিয়াত কোনো নির্দিষ্ট সময় বা যুগ নয়; জাহিলিয়াত হলো একটা অবস্থা।
তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাতের অর্থ হলো, আল্লাহ নিজেকে যেসব নামে নামকরণ করেছেন এবং তাঁর কিতাবে নিজেকে যেসব গুণে গুণান্বিত করেছেন; অথবা রাসুল ﷺ তাঁর যেসব নাম ও গুণের কথা উল্লেখ করেছেন, সেসব নাম ও গুণ সত্যায়ন করা এবং সেসব ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে মেনে নেওয়া। আল্লাহ নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, তাতে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন, তার ধরন বর্ণনা এবং কোনো প্রকার উদাহরণ পেশ করা ব্যতীত আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্তের মাধ্যমেই এ তাওহিদ বাস্তবায়ন হতে পারে। আল্লাহকে সৃষ্টির যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ও সাদৃশ্য এবং সব ধরনের দোষত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা থেকে পবিত্র ঘোষণা করা।
টিকাঃ
২৩ সুরা নাহল: ৩৬; সুরা আম্বিয়া: ২৫; সুরা আরাফ: ৫৯, ৬৫, ৭৩, ৮৫; সুরা আনকাবুত: ১৬; সুরা জুমার: ১১; সহিহ বুখারি: ২৫, ৩৯২, ১৩৯৯, ২৯৪৬; সহিহ মুসলিম: ১৩৩-১৩৮।
২৮ তাফসির ফি জিলালিল কুরআন, শহিদ সাইয়িদ কুতুব রাহ.।
📄 ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান
এই বিশ্বাস লালন করা যে, ফেরেশতা নুরের সৃষ্টি বিশেষ ধরনের মাখলুক। তারা আল্লাহ কর্তৃক বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত। তাদের কিছু কাজ হলো: আল্লাহর নির্দেশে মানুষকে হিফাজত করা, মানুষের আমলের হিসাব রাখা, ওহি নিয়ে অবতরণ করা, প্রাণ সংহার করা, বৃষ্টি বর্ষণ করা, চাঁদ ও সূর্যের উদয়-অস্ত নিয়ন্ত্রণ করা, জিকিরের মজলিসে উপস্থিত হওয়া ও আমল নিয়ে ঊর্ধ্বাকাশে ওঠা ইত্যাদি। কুরআন ও হাদিসে তাঁদের যেসব কাজের বর্ণনা এসেছে, আমরা সেগুলোতে বিশ্বাস করি। আল্লাহ বিভিন্ন কাজে তাঁদের লাগিয়ে রেখেছেন তাঁদের প্রতি কোনো মুখাপেক্ষিতা ছাড়াই। এর পেছনে আল্লাহর হিকমাহ এবং অন্তর্নিহিত রহস্য রয়েছে, যার ব্যাপারে তিনিই সর্বাধিক অবগত। কুরআনুল কারিমের অসংখ্য আয়াতে এবং রাসুলের অগণিত হাদিসে ফেরেশতাদের আলোচনা এসেছে। তাঁরা যেহেতু দৃশ্যমান ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, সুতরাং তাঁদের ব্যাপারে নুসুসে বিশুদ্ধ সূত্রে আমাদের যতটুকু জানানো হয়েছে, এর বাইরে তাঁদের ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না। সুতরাং ফেরেশতাদের প্রতি তাফসিলি ইমান নয়; বরং ইজমালি ইমানই যথেষ্ট।
📄 কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান
আল্লাহ তাআলা নবি ও রাসুলগণের প্রতি যত কিতাব ও সহিফা অবতীর্ণ করেছেন, সবগুলোর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। তাওরাত, জাবুর, ইনজিল, কুরআন এবং সহিফাসমূহ হক-সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, এই আকিদা অন্তরে বদ্ধমূল রাখতে হবে। তবে আমরা এ-ও বিশ্বাস করি, কুরআনের পূর্বে আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে, সেগুলো মানুষের হাতে বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়েছে। শুধু এই কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে নিয়েছেন। [সুরা হিজর (১৫) : ৯] কুরআন মাজিদ পূর্ববর্তী সব কিতাব রহিতকারী এবং সেগুলোর বক্তব্যের সত্যায়নকারী। [সুরা মায়িদা (৫): ৪৮] একইভাবে আমরা সকল নবি ও রাসুলের প্রতিও ইমান রাখি। আমরা কারও নবুওয়াত ও রিসালাতকেই অস্বীকার করি না। [সুরা বাকারা (২) : ২৮৫] তবে শরিয়ত পালনের ক্ষেত্রে আমরা কেবল মুহাম্মাদ ﷺ -এর শরিয়ত অনুসরণ করি। কারণ, সবার দীন ও মিল্লাত এক থাকলেও প্রত্যেকের শরিয়ত ছিল স্বতন্ত্র। [সুরা মায়িদা (৫) : ৪৮] তবে কুরআনের ওপর থাকবে তাফসিলি ইমান এবং পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের ওপর থাকবে ইজমালি ইমান। কুরআন পূর্ববর্তী সব আসমানি কিতাবের সত্যায়নকারী। তাই কুরআনের ওপর তাফসিলি ইমান আনয়নের দ্বারা পূর্বের সব কিতাবেরও সত্যায়ন হয়ে যাবে। আর বিশ্বাস রাখতে হবে, কুরআন আল্লাহ নাজিল করেছেন। এটি তাঁর কালাম। কুরআন মাখলুক (সৃষ্ট) নয়; বরং এটি স্রষ্টার সিফাত (গুণ)। কুরআন মহান রব থেকে প্রকাশিত এবং তা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তন করবে।
টিকাঃ
* নুসুস: কুরআন ও হাদিসের পাঠ।
** বিস্তৃত, ব্যাপক।
“ সংক্ষিপ্ত, অস্পষ্ট, মোটামুটি।
* বিস্তারিত জানতে পড়ুন লেখকের অনূদিত গ্রন্থ- মিল্লাতে ইবরাহিমের জাগরণ।
📄 নবিগণের প্রতি ঈমান
'নবি' অর্থ সংবাদদাতা। 'রাসুল' অর্থ দূত ও বার্তাবাহক। পরিভাষায় নবি ও রাসুল বলা হয় সে-সকল মহান ব্যক্তিকে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কাছে বিধিবিধান পৌঁছানোর জন্য যাদের নির্বাচিত করেছেন। আদম আ. থেকে শুরু করে মুহাম্মাদ ﷺ পর্যন্ত আল্লাহ অসংখ্য-অগণিত নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা কত ছিল, তা আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের এই আকিদা পোষণ করা জরুরি যে, তাঁদের সংখ্যা যা-ই হোক, তাঁরা সবাই হকের ওপর ছিলেন। মানবজাতির মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের উত্তম গুণ ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন। আমাদের জন্য ইমান আনয়নের ক্ষেত্রে نبيগণের মধ্যে পার্থক্য করা জায়িজ নেই যে, কোনো নবির ওপর ইমান আনব; আর কোনো নবিকে অস্বীকার করব।
اٰمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهِ ، وَقَالُوا سَمِعْنَا وَ أَطَعْنَا * غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ
রাসুল সেই বিষয়ের প্রতি ইমান এনেছেন, যা তাঁর ওপর তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং (ইমান এনেছে) মুমিনরাও। তারা সবাই আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসুলগণের প্রতি ইমান এনেছেন। (তারা বলে,) আমরা আল্লাহর রাসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করি না (যে, কারও প্রতি ইমান আনব এবং কারও প্রতি আনব না) এবং তারা বলে, আমরা (আল্লাহ ও রাসুলের বিধানসমূহ মনোযোগসহ) শুনেছি এবং তা খুশিমনে মেনে নিয়েছি। হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপনার মাগফিরাতের ভিখারি আর আপনারই কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে। [সুরা বাকারা (২): ২৮৫]
সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের জন্য সকল নবির ওপর ইমান আনা অপরিহার্য। কেউ যদি এমন কারও প্রতি ইমান না রাখে, যাঁর নবুওয়াত বা রিসালাত অকাট্যভাবে প্রমাণিত, কিংবা তাঁর শানে গোস্তাখি করে, তাহলে সে মুরতাদ (ইসলামচ্যুত) হয়ে যাবে।