📄 মু'তাজিলাদের ঈমান
আকিদা-বিশেষজ্ঞ কোনো কোনো আলিমের রচনাবলিতে দেখা যায়, তাঁরা ইমানের সংজ্ঞা বর্ণনা করতে গিয়ে অতিরিক্ত একটি বিষয়ও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁরা লিখেছেন, 'কারও ইমান গৃহীত ও বিবেচিত হতে রাসুলের আনীত দীনকে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যায়ন করতে হবে। তাকলিদের ভিত্তিতে কেউ যদি দীনকে সত্যায়ন করে, তাহলে তার ইমানের কোনো মূল্য নেই।' তাঁরা তাঁদের রচনাবলিতে 'মুকাল্লিদের ইমান' শিরোনামে এ বিষয়ক আলোচনা উপস্থাপন করেছেন।
কিন্তু এই সংজ্ঞা মেনে নিলে বলতে হয়, যে-সকল মানুষ গভীরভাবে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত, তাদের ইমান, আকিদা ও সত্যায়ন চিরকাল নিষ্ফলই থেকে যাবে; কখনোই তা গৃহীত হবে না। অথচ এ কথা তো বলাও বাহুল্য, সমাজের অধিকাংশ মানুষই এই পর্যায়ভুক্ত। এখন এই মূলনীতি স্বীকার করে নিলে অধিকাংশ মানুষকে ইসলাম থেকে চিরতরে বঞ্চিত থাকতে হবে। যেই ইসলাম ছিল অত্যন্ত সহজ, সংজ্ঞার মারপ্যাঁচে পড়ে তা হয়ে যাবে নিতান্ত জটিল।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের মতে এই অবস্থান সঠিক নয়। আল্লামা আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ শাকরুন রাহ. (মৃত্যু: ৯২৯ হিজরি)-কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বেশ দীর্ঘ আকারে এর জবাব লেখেন—১৪২৪ হিজরিতে যা মিসরের তানতা শহর থেকে স্বতন্ত্র গ্রন্থরূপে প্রকাশিত হয়। আল-জাইশু ওয়াল কামিন লি কিতালি মান কাফফারা আম্মাতাল মুসলিমিন নামে তা প্রকাশ করা হয়। সেই গ্রন্থের সারকথা আমরা এখানে উল্লেখ করছি:
মুসলিম সর্বসাধারণের ব্যাপারে এই ধারণা পোষণ করা সংগত নয় যে, তারা সবাই তাকলিদের ওপর ভিত্তি করে ইমান এনেছে, দীনের মৌলিক সব বিষয়েও তারা কারও অন্ধ অনুকরণ করে ইসলামে অনুপ্রবেশ করেছে। কারণ, মফস্বলের কোনো অশিক্ষিত ও অতি সাধারণ মানুষকেও যদি জিজ্ঞেস করা হয়—কে সৃষ্টি করেছেন পৃথিবী? কে স্থাপন করেছেন পাহাড়-পর্বত? খুঁটি ছাড়া কে উত্তোলন করেছেন নীল আকাশ? কে তাকে সজ্জিত করেছেন চাঁদ, সূর্য ও নক্ষত্র দ্বারা? তাহলে তারা নিঃসংকোচে জবাব দেবে—আল্লাহ। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তাদের অনেকে জীবনে কখনো আকিদার একটা বইও পড়েনি। কোনো আকিদা-বিশেষজ্ঞ ইমাম থেকে শাস্ত্রীয় সবক নেয়নি, তাওহিদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গবেষণামূলক বিষয়াদির জ্ঞান অর্জনেরও সুযোগ তাদের হয়ে ওঠেনি। তারা কারও থেকে আকিদা-শাস্ত্রের পাঠগ্রহণ ছাড়াই নিজেদের ফিতরত (স্বভাবধর্ম) এবং সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষার আলোকে নির্দ্বিধায় বলে ফেলছে—এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টা মহান আল্লাহই এ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই এগুলো নিপুণভাবে পরিচালনা করছেন। সব ক্ষমতার মালিক তিনি। জীবন, জীবিকা, মৃত্যু, রোগ, আরোগ্য সবই তাঁর হাতে। তিনি পরম দয়ালু, অতি দয়াবান। বিচারদিবসের মালিক তিনি। তাঁর শাস্তিও বড়ই কঠোর। এখন এই ব্যক্তিকে মুকাল্লিদ বিশেষণে বিশেষায়িত করা কতটুকু ন্যায়সংগত আচরণ বলে বিবেচিত হবে? উপরন্তু এদের যদি মুকাল্লিদ বলা হয়, তবু মুকাল্লিদের ইমান বিবেচ্য ও গ্রহণীয় কি না, তা নিয়ে তিন ধরনের অভিমত পাওয়া যায়:
১. যদি অন্তর থেকে সব আবশ্যক আকিদা-বিশ্বাস সত্য বলে মেনে নেয়, তাহলে তার ইমান গৃহীত ও বিবেচিত হবে। চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন না করার কারণে তার কোনো গুনাহ হবে না।
২. তার ইমান গৃহীত হবে। তবে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ ত্যাগের কারণে সে গুনাহগার হবে। কারণ, শরিয়া-প্রণেতার পক্ষ থেকে বান্দা এসবের জন্যও আদিষ্ট ছিল; কিন্তু মুকাল্লিদ এই আমলটি পরিত্যাগ করেছে।
৩. মুকাল্লিদের ইমান, আকিদা ও সত্যায়নের কোনো বিবেচনা নেই। এ ধরনের সত্যায়নের দ্বারা কেউ কখনো মুমিন হয় না; বরং পুরোদস্তুর কাফিরই থাকে।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম প্রথম মতই গ্রহণ করেছেন। ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদি রাহ., ইমাম আবুল হাসান আশআরি রাহ., ইমাম কুশায়রি রাহ., ইমাম গাজালি রাহ., ইমাম ইজুদ্দিন ইবনু আবদিস সালাম রাহ. প্রমুখ এই মতকেই অগ্রগণ্য করেছেন। ইমাম ইবনু রুশদ রাহ. প্রমুখও এই অভিমতকে অন্য সব অভিমতের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইমাম ইবনুল হুমাম রাহ. মুসায়ারা গ্রন্থে এই মতকে অধিকাংশ ফকিহ ও আলিমের মাজহাব বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লামা কাসিম ইবনু কুতলুবুগা রাহ. মুসামারা গ্রন্থের টীকায় এই মতকে Imam Abu Hanifa, Imam Sufyan Sawri, Imam Malik, Imam Awzayi, Imam Shafi'i, Imam Ahmad Ibn Hambal and Imam Abdullah Ibn Sayyid Qattan রাহ.-এর অভিমত বলে আখ্যায়িত করেছেন।)
রাসুলের কর্মপন্থা এবং সাহাবিগণের পথ ও পদ্ধতি দেখলে এই অবস্থানকেই মজবুত মনে হয়। কারণ, রাসুল কোনো কাফিরকে ইসলাম গ্রহণ করানোর সময়ে শুধু তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদানের আদেশকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। তিনি কালিমা পড়ানোর সময় স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ কিংবা নবি ও রাসুল পাঠানোর দলিল ও তাৎপর্য সর্বদা বয়ান করতেন না। কোনো নওমুসলিমের ওপর এসব তাত্ত্বিক বিষয় সমাধার দায়িত্বও চাপিয়ে দিতেন না। ইমান গৃহীত হতে যদি এসব বিষয় মৌলিকভাবে প্রয়োজনীয় হতো, তাহলে রাসুল অন্তত কখনো তা পরিহার করতেন না; উপরন্তু সবাইকে গুরুত্বসহ এর নির্দেশ ও নির্দেশনা দিতেন।
তা ছাড়া আকিদাশাস্ত্রের এসব তাত্ত্বিক আলোচনা তো অনেক পরে সংকলিত ও লিপিবদ্ধ হয়েছে। এখনো সব মুসলিমের জন্য এ ধরনের ব্যাপক-বিস্তর জটিল আলোচনা হৃদয়ঙ্গম করা কষ্টসাধ্য। কুরআনে আল্লাহ নিজে জানিয়েছেন তিনি কারও ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না। [সুরা বাকারা (২) : ২৮৬] দীনের মধ্যেও তিনি অসাধ্য ও দুরূহ বিষয় রাখেননি। [সুরা হজ (২২): ৭৮; সুরা বাকারা (২) : ১৮৫] সুতরাং ইমান আনয়নের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ মানুষের জন্য অসাধ্য কোনো বিষয় মৌলিক বা প্রাসঙ্গিক শর্ত হিসেবে আরোপিত হতে পারে না।
মোদ্দাকথা, প্রথম অভিমতটিই প্রণিধানযোগ্য। দ্বিতীয় অভিমতটিও কোনো কোনো বিদগ্ধ আলিম থেকে বর্ণিত হয়েছে। তবে তাঁদের মতানুসারেও সেটি সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য প্রযোজ্য নয়; বরং যারা প্রকৃত অর্থে এর জন্য যোগ্য ও উপযুক্ত, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ধরা যেতে পারে। সুতরাং সর্বসাধারণ এই বিধানের অন্তর্ভুক্ত হবে না। আর তৃতীয় অভিমতটি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কোনো ইমাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়; বরং অনেকে এটাকে মুতাজিলাদের মাজহাব বলে আখ্যায়িত করেছে। সুতরাং এটা কিছুতেই বিবেচনাযোগ্য নয়।
টিকাঃ
২১ তাকলিদ অর্থ অনুসরণ। মুকাল্লিদ অর্থ অনুসারী।
২২ কোনো কোনো আলিম এই অভিমতকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের মত বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য সব মতের ওপর এই মতকে প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যেমন, তাহজিবু শারহিস সানুসিয়া গ্রন্থে (পৃ. ১৩০) এটাকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং অপর দুটি মতকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে আল্লামা সানুসি রাহ. নিজেই বলেন, এই বিধান সাধারণ মানুষের জন্য নয়; বরং এটা শুধু সে-সকল মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের মধ্যে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের যোগ্যতা রয়েছে; এতৎসত্ত্বেও তারা আকিদার ব্যাপারে তার ব্যবহার পরিত্যাগ করেছে। উপরন্তু এখানে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন দ্বারা উচ্চমার্গীয় শাস্ত্রীয় তাত্ত্বিক কোনো বিষয় উদ্দেশ্য নয়; বরং জনসাধারণের উপযোগী পর্যায়ের যথাযথ ব্যবহার শুধু উদ্দেশ্য। যেমন, ইমাম আসমায়ির জবাবে জনৈক বেদুইন বলেছিল, মল যেহেতু প্রাণীর অস্তিত্বের নিদর্শন বহন করে, পথচলার দাগ যেহেতু মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ ধারণ করে, তাহলে এই সুবিশাল আকাশ ও বিস্তৃত পৃথিবী কেন এক স্রষ্টার পরিচয় প্রদান করবে না?
২৩ আল-মুসায়ারা মাআল মুসামারা: ২৮৫-২৮৮।
** বিস্তারিত জানতে দেখুন- আল-জাইশু ওয়াল কামিন লি কিতালি মান কাফফারা আম্মাতাল মুসলিমিন, আল্লামা মুহাম্মাদ শাকরুন আবু আবদিল্লাহ ওয়াহরানি রাহ. (মৃত্যু: ৯২৯ হিজরি), দারুস সাহাবা লিত-তুরাস প্রকাশিত।