📄 সংজ্ঞা বিশ্লেষণ
১. রাসুলকে সত্যায়ন করা- التصديق للرسول
শরিয়তের দৃষ্টিতে সত্যায়ন বিবেচ্য হতে তাতে তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকা আবশ্যক:
১. অন্তরে সুনিশ্চিত জ্ঞান।
২. রাসুল -কে সত্যবাদী জানা।
৩. রাসুল কর্তৃক আনীত যাবতীয় বিধান আন্তরিকভাবে মেনে নেওয়া এবং তার আনুগত্য করা।
ইমান আনয়নের জন্য শব্দগত বা মানতিকশাস্ত্রে সংজ্ঞায়িত সত্যায়ন যথেষ্ট নয়; বরং শরয়ি সত্যায়ন সাব্যস্ত হতে উল্লিখিত তিনটি বিষয়ই এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকা আবশ্যক। আল্লামা সাআদ তাফতাজানি রাহ. লেখেন, التصديق. أى اذعان حكم المخبر وقبوله وجعله صادقا
'সত্যায়ন হচ্ছে সংবাদদাতা (আল্লাহ ও তাঁর রাসুল)-এর বিধানের সামনে আনুগত্য প্রদর্শন করা, তা গ্রহণ করে নেওয়া এবং তা সত্যে পরিণত করা।'
وليس حقيقة التصديق أن يقع في القلب نسبة الصدق الى الخبر أو المخبر عن غير اذعان وقبول، بل هو اذعان وقبول لذلك، بحيث يقع عليه اسم التسليم. على ما صرح به الامام الغزالي. وبالجملة: هو المعنى الذي يعبر عنه بالفارسية بگرويدن.
'সত্যায়নের তত্ত্বকথা এ নয় যে, আনুগত্য বরণ ও গ্রহণ ব্যতিরেকে শুধু অন্তরে সংবাদ (কুরআন-সুন্নাহ) বা সংবাদদাতা (আল্লাহ ও তাঁর রাসুল)-এর দিকে সত্যতার নিসবত (সম্বন্ধ) তৈরি হবে; বরং সত্যায়ন হলো সত্যায়িত বিষয়ের উদ্দেশে আনুগত্য বরণ করা এবং তা এমনভাবে গ্রহণ করে নেওয়া, যার ব্যাপারে 'আত্মসমর্পণ' শব্দ প্রয়োগ করা যায়; যেমনটা ইমাম গাজালি রাহ. স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। মোদ্দাকথা, সত্যায়নের অর্থ হলো ফার্সিভাষার گرویدن শব্দের অনুরূপ।' উল্লেখ্য, ফার্সিতে گرویدن শব্দের অর্থ হলো 'ফরমাবরদার' তথা আনুগত্যপরায়ণ। 'মুতি' তথা অনুগত। 'পায়রো' ও 'মুতাকিদ' তথা অনুসারী ও ভক্ত। এরপর তিনি বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে লেখেন,
ولو حصل هذا المعنى لبعض الكفار، كان اطلاق اسم الكافر عليه من جهة أن عليه شيئا من أمارات التكذيب والانكار، كما اذا فرضنا ان أحدا صدق بجميع ما جاء به النبي عليه السلام وسلمه وأقر به وعمل. ومع ذلك شد الزنار بالاختيار، أو سجد للصنم بالاختيار، نجعله كافرا، لما أن النبي عليه السلام جعل ذلك علامة التكذيب والانكار.
'এই বৈশিষ্ট্য যদি কোনো কাফিরের অর্জিত হয়, তাহলে তার ওপর 'কাফির' শব্দ প্রয়োগ করা হবে এই বিবেচনায় যে, তার মধ্যে নাকচ ও অস্বীকারের প্রতীক রয়েছে। যেমন ধরুন, কেউ নবি -এর আনীত সবকিছু সত্যায়ন করল, স্বীকারোক্তিও দিলো এবং তা অনুযায়ী আমলও করল; কিন্তু পাশাপাশি সে ইচ্ছাকৃতভাবে (বিধর্মীদের প্রতীক বিশেষ ধরনের) বেল্ট বাঁধল অথবা স্বেচ্ছায় মূর্তিকে সিজদা করল, তাহলে আমরা তাকে কাফির বলে গণ্য করব। কারণ, নবি এগুলোকে নাকচ ও অস্বীকারের প্রতীক বলে নির্ধারণ করেছেন।'
২. আবশ্যিকভাবে বিদিত - معلوم بالضرورة
এর দ্বারা সেসব বিষয় বোঝানো হয়েছে, যেগুলো এতটা ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, সাধারণ ও অসাধারণ সবাই তা দীনি আকিদা বা বিধানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি জানে।" এ ধরনের সব বিষয়ের সত্যায়ন করা এবং এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ইমান আনয়নের জন্য অপরিহার্য। শরিয়তের পরিভাষায় এসব বিষয়কে 'জরুরিয়াতে দীন' বলা হয়। কেউ যদি এ ধরনের কোনো বিষয় প্রত্যাখ্যান করে বা সত্যায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সে মুমিন বলে বিবেচিত হবে না। কারণ, জরুরিয়াতে দীনের সত্যায়ন ছাড়া কারও ইমান বিবেচ্য ও গ্রহণীয় হয় না। আল্লামা সাআদ তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
تصديق النبي فيما علم مجيئه به بالضرورة أي فيما اشتهر كونه من الدين بحيث يعلمه العامة من غير افتقار إلى نظر واستدلال كوحدة الصانع ووجوب الصلاة وحرمة الخمر ونحو ذلك.
'যা কিছুসহ রাসুলের আগমন আবশ্যিকভাবে বিদিত হয়েছে, সেসব ব্যাপারে তাঁকে সত্যায়ন করা। অর্থাৎ, সেসব ব্যাপারে, যেগুলো দীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি এতটাই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, সাধারণ জনতাও তা জানে। এর জন্য আলাদাভাবে গবেষণা ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন হয় না। যেমন : স্রষ্টার একত্ব, সালাতের অপরিহার্যতা ও মাদকের নিষিদ্ধতা ইত্যাদি। ' ১৬ আল্লামা আবদুল হাকিম শিয়ালকোটি রাহ. লেখেন,
قوله: (فيما علم مجيئه به ضرورة أي فيما اشتهر كونه من الدين بحيث يعلمه العامة بلا دليل.
'যেসব বিষয়সহ রাসুলের আগমন আবশ্যিকভাবে বিদিত হয়েছে, অর্থাৎ, যা কিছু দীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি এতটা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, জনসাধারণও দলিল-প্রমাণ ছাড়াই তা জানে। '১৭ ইমামুল আসর আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. (মৃত্যু: ১৩৫২)-ও একই সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন এবং এর ওপর বিস্তৃত আলোচনা করেছেন তার কালজয়ী ইকফারুল মুলহিদিন গ্রন্থে।
টিকাঃ
১৩ শারহুল আকায়িদিন নাসাফিয়া: ১/৭৮।
১৪ শারহুল আকায়িদিন নাসাফিয়া: ১/৭৮।
১৫ আন-নিবরাস: ২৪৯।
১৬ শারহুল মাকাসিদ, দারুল মাআরিফিন নুমানিয়া পাকিস্তান প্রকাশিত: ২/২৪৭।
১৭ শারহুল মাওয়াকিফ: ৮/৩৫২।
* ইকফারুল মুলহিদিন: ৪১-৪২
📄 একটি সংশয় নিরসন
উপরিউক্ত আলোচনা দেখে পাঠকের মনে হতে পারে, শুধু 'জরুরিয়াতে দীন' অস্বীকার করলেই বোধ হয় ব্যক্তি কাফির হয়। যেসব বিষয় জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা অস্বীকার করলে ইমানের কোনো ক্ষতি হয় না। এ ক্ষেত্রে আমরা বলব, ইসলামের যাবতীয় বিধান বিস্তৃতভাবে বা মোটামুটিভাবে সত্যায়ন করা প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর অপরিহার্য। আকিদা-বিশেষজ্ঞগণ ইমানের সংজ্ঞায় জরুরিয়াতে দীনের কথা উল্লেখের কারণ হলো, এটা তাদের বিশেষ পরিভাষা। আকিদাশাস্ত্রে সাধারণত অকাট্য ও সুনিশ্চিত বিষয়াদি সম্পর্কে আলোচনা হয়। এ জন্য তাঁরা সংজ্ঞার মধ্যেও জরুরিয়াতে দীনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। অন্যথায় বাস্তবতা হলো, প্রকৃত মুসলিম হতে শুধু 'জরুরিয়াতে দীন' মানাই যথেষ্ট নয়; বরং ইসলামের প্রতিটি প্রমাণিত বিধান সত্যায়ন করা অপরিহার্য, তা যতই সাধারণ হোক না কেন।
তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাকফির (কাউকে কাফির বলে ফাতওয়া দেওয়া)-এর সম্পর্ক স্রেফ অকাট্য বিধিবিধানের সঙ্গে। কেউ যদি ইসলামের এমন কোনো বিধান প্রত্যাখ্যান করে, যা অকাট্যভাবে সাব্যস্ত নয়, তাহলে তাকে কাফির বলা যাবে না। আল্লামা আবুল মুয়িন নাসাফি রাহ. লেখেন,
ثم إن هذا المعنى اللغوي وهو التصديق بالقلب هو حقيقة الإيمان الواجب على العبد حقا لله تعالى، وهو أن يصدق الرسول ﷺ فيما جاء به من عند الله تعالى، فمن أتى بهذا التصديق فهو مؤمن فيما بينه وبين الله تعالى، والإقرار يحتاج إليه ليقف عليه الخلق فيجروا عليه أحكام الإسلام.
'ইমানের শাব্দিক অর্থই—অর্থাৎ, অন্তর দ্বারা সত্যায়ন করা—হলো ইমানের তত্ত্বকথা, যা বান্দার ওপর আল্লাহর হক হিসেবে অবধারিত। সুতরাং ইমান হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল ﷺ যা কিছু এনেছেন, তা সত্যায়ন করা। যে ব্যক্তি এরূপ সত্যায়ন করবে, সে আল্লাহর কাছে মুমিন বলে বিবেচিত হবে। আর মৌখিক স্বীকারোক্তির প্রয়োজন এ কারণে যে, মানুষ যাতে তার ইমানের ব্যাপারে অবগত হয়ে তার ওপর ইসলামের বিধিবিধান প্রয়োগ করতে পারবে।
উপরিউক্ত সংজ্ঞায় দেখা যাচ্ছে, আল্লামা আবুল মুয়িন নাসাফি রাহ. আকিদা- বিশেষজ্ঞ অন্য ইমামগণের তুলনায় কিছুটা ব্যতিক্রমভাবে এর উপস্থাপন করেছেন। অন্যরা সংজ্ঞা বর্ণনা করতে গিয়ে জরুরিয়াতে দীনের কথা উল্লেখ করে সংজ্ঞা সীমিত করে ফেলেন। অপরদিকে আল্লামা আবুল মুয়িন নাসাফি রাহ. সংজ্ঞার ব্যাপকতা ঠিক রেখেছেন। তিনি শুধু জরুরিয়াতে দীন সত্যায়নের কথা বলেননি; বরং রাসুল কর্তৃক আনীত সব বিধান (তা জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত হোক বা না হোক) সত্যায়নের কথা বলেছেন।
ইমামুল আসর আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন,
من قصره من المتكلمين على الضروريات فلأن موضوع فنهم هو القطعي، لا أن المؤمن به هو القطعي فقط، نعم التكفير إنما يكون بجحوده فقط.
'আকিদা-বিশেষজ্ঞ ইমামগণের মধ্যে যাঁরা ইমানের সংজ্ঞা জরুরিয়াতে দীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন, তাঁদের এমন করার কারণ হলো, তাঁদের শাস্ত্রের আলোচ্যবিষয় শুধু অকাট্য বিষয়গুলো। এমন নয় যে, ইমান শুধু অকাট্য বিষয়গুলোর ওপরই আনতে হয়। হ্যাঁ, তাকফির শুধু অকাট্য বিষয় অস্বীকারের কারণেই করা যায়।
টিকাঃ
১৯ আত-তামহিদ লি কাওয়ায়িদিত তাওহিদ: ৩৭৭-৩৭৮।
২০ হাশিয়াতু ইকফারিল মুলহিদিন-মাজমুআতু রাসায়িলিল কাশমিরি: ৩/৪।
📄 মু'তাজিলাদের ঈমান
আকিদা-বিশেষজ্ঞ কোনো কোনো আলিমের রচনাবলিতে দেখা যায়, তাঁরা ইমানের সংজ্ঞা বর্ণনা করতে গিয়ে অতিরিক্ত একটি বিষয়ও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁরা লিখেছেন, 'কারও ইমান গৃহীত ও বিবেচিত হতে রাসুলের আনীত দীনকে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যায়ন করতে হবে। তাকলিদের ভিত্তিতে কেউ যদি দীনকে সত্যায়ন করে, তাহলে তার ইমানের কোনো মূল্য নেই।' তাঁরা তাঁদের রচনাবলিতে 'মুকাল্লিদের ইমান' শিরোনামে এ বিষয়ক আলোচনা উপস্থাপন করেছেন।
কিন্তু এই সংজ্ঞা মেনে নিলে বলতে হয়, যে-সকল মানুষ গভীরভাবে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত, তাদের ইমান, আকিদা ও সত্যায়ন চিরকাল নিষ্ফলই থেকে যাবে; কখনোই তা গৃহীত হবে না। অথচ এ কথা তো বলাও বাহুল্য, সমাজের অধিকাংশ মানুষই এই পর্যায়ভুক্ত। এখন এই মূলনীতি স্বীকার করে নিলে অধিকাংশ মানুষকে ইসলাম থেকে চিরতরে বঞ্চিত থাকতে হবে। যেই ইসলাম ছিল অত্যন্ত সহজ, সংজ্ঞার মারপ্যাঁচে পড়ে তা হয়ে যাবে নিতান্ত জটিল।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের মতে এই অবস্থান সঠিক নয়। আল্লামা আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ শাকরুন রাহ. (মৃত্যু: ৯২৯ হিজরি)-কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বেশ দীর্ঘ আকারে এর জবাব লেখেন—১৪২৪ হিজরিতে যা মিসরের তানতা শহর থেকে স্বতন্ত্র গ্রন্থরূপে প্রকাশিত হয়। আল-জাইশু ওয়াল কামিন লি কিতালি মান কাফফারা আম্মাতাল মুসলিমিন নামে তা প্রকাশ করা হয়। সেই গ্রন্থের সারকথা আমরা এখানে উল্লেখ করছি:
মুসলিম সর্বসাধারণের ব্যাপারে এই ধারণা পোষণ করা সংগত নয় যে, তারা সবাই তাকলিদের ওপর ভিত্তি করে ইমান এনেছে, দীনের মৌলিক সব বিষয়েও তারা কারও অন্ধ অনুকরণ করে ইসলামে অনুপ্রবেশ করেছে। কারণ, মফস্বলের কোনো অশিক্ষিত ও অতি সাধারণ মানুষকেও যদি জিজ্ঞেস করা হয়—কে সৃষ্টি করেছেন পৃথিবী? কে স্থাপন করেছেন পাহাড়-পর্বত? খুঁটি ছাড়া কে উত্তোলন করেছেন নীল আকাশ? কে তাকে সজ্জিত করেছেন চাঁদ, সূর্য ও নক্ষত্র দ্বারা? তাহলে তারা নিঃসংকোচে জবাব দেবে—আল্লাহ। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তাদের অনেকে জীবনে কখনো আকিদার একটা বইও পড়েনি। কোনো আকিদা-বিশেষজ্ঞ ইমাম থেকে শাস্ত্রীয় সবক নেয়নি, তাওহিদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গবেষণামূলক বিষয়াদির জ্ঞান অর্জনেরও সুযোগ তাদের হয়ে ওঠেনি। তারা কারও থেকে আকিদা-শাস্ত্রের পাঠগ্রহণ ছাড়াই নিজেদের ফিতরত (স্বভাবধর্ম) এবং সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষার আলোকে নির্দ্বিধায় বলে ফেলছে—এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টা মহান আল্লাহই এ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই এগুলো নিপুণভাবে পরিচালনা করছেন। সব ক্ষমতার মালিক তিনি। জীবন, জীবিকা, মৃত্যু, রোগ, আরোগ্য সবই তাঁর হাতে। তিনি পরম দয়ালু, অতি দয়াবান। বিচারদিবসের মালিক তিনি। তাঁর শাস্তিও বড়ই কঠোর। এখন এই ব্যক্তিকে মুকাল্লিদ বিশেষণে বিশেষায়িত করা কতটুকু ন্যায়সংগত আচরণ বলে বিবেচিত হবে? উপরন্তু এদের যদি মুকাল্লিদ বলা হয়, তবু মুকাল্লিদের ইমান বিবেচ্য ও গ্রহণীয় কি না, তা নিয়ে তিন ধরনের অভিমত পাওয়া যায়:
১. যদি অন্তর থেকে সব আবশ্যক আকিদা-বিশ্বাস সত্য বলে মেনে নেয়, তাহলে তার ইমান গৃহীত ও বিবেচিত হবে। চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন না করার কারণে তার কোনো গুনাহ হবে না।
২. তার ইমান গৃহীত হবে। তবে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ ত্যাগের কারণে সে গুনাহগার হবে। কারণ, শরিয়া-প্রণেতার পক্ষ থেকে বান্দা এসবের জন্যও আদিষ্ট ছিল; কিন্তু মুকাল্লিদ এই আমলটি পরিত্যাগ করেছে।
৩. মুকাল্লিদের ইমান, আকিদা ও সত্যায়নের কোনো বিবেচনা নেই। এ ধরনের সত্যায়নের দ্বারা কেউ কখনো মুমিন হয় না; বরং পুরোদস্তুর কাফিরই থাকে।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম প্রথম মতই গ্রহণ করেছেন। ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদি রাহ., ইমাম আবুল হাসান আশআরি রাহ., ইমাম কুশায়রি রাহ., ইমাম গাজালি রাহ., ইমাম ইজুদ্দিন ইবনু আবদিস সালাম রাহ. প্রমুখ এই মতকেই অগ্রগণ্য করেছেন। ইমাম ইবনু রুশদ রাহ. প্রমুখও এই অভিমতকে অন্য সব অভিমতের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইমাম ইবনুল হুমাম রাহ. মুসায়ারা গ্রন্থে এই মতকে অধিকাংশ ফকিহ ও আলিমের মাজহাব বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লামা কাসিম ইবনু কুতলুবুগা রাহ. মুসামারা গ্রন্থের টীকায় এই মতকে Imam Abu Hanifa, Imam Sufyan Sawri, Imam Malik, Imam Awzayi, Imam Shafi'i, Imam Ahmad Ibn Hambal and Imam Abdullah Ibn Sayyid Qattan রাহ.-এর অভিমত বলে আখ্যায়িত করেছেন।)
রাসুলের কর্মপন্থা এবং সাহাবিগণের পথ ও পদ্ধতি দেখলে এই অবস্থানকেই মজবুত মনে হয়। কারণ, রাসুল কোনো কাফিরকে ইসলাম গ্রহণ করানোর সময়ে শুধু তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদানের আদেশকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। তিনি কালিমা পড়ানোর সময় স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ কিংবা নবি ও রাসুল পাঠানোর দলিল ও তাৎপর্য সর্বদা বয়ান করতেন না। কোনো নওমুসলিমের ওপর এসব তাত্ত্বিক বিষয় সমাধার দায়িত্বও চাপিয়ে দিতেন না। ইমান গৃহীত হতে যদি এসব বিষয় মৌলিকভাবে প্রয়োজনীয় হতো, তাহলে রাসুল অন্তত কখনো তা পরিহার করতেন না; উপরন্তু সবাইকে গুরুত্বসহ এর নির্দেশ ও নির্দেশনা দিতেন।
তা ছাড়া আকিদাশাস্ত্রের এসব তাত্ত্বিক আলোচনা তো অনেক পরে সংকলিত ও লিপিবদ্ধ হয়েছে। এখনো সব মুসলিমের জন্য এ ধরনের ব্যাপক-বিস্তর জটিল আলোচনা হৃদয়ঙ্গম করা কষ্টসাধ্য। কুরআনে আল্লাহ নিজে জানিয়েছেন তিনি কারও ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না। [সুরা বাকারা (২) : ২৮৬] দীনের মধ্যেও তিনি অসাধ্য ও দুরূহ বিষয় রাখেননি। [সুরা হজ (২২): ৭৮; সুরা বাকারা (২) : ১৮৫] সুতরাং ইমান আনয়নের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ মানুষের জন্য অসাধ্য কোনো বিষয় মৌলিক বা প্রাসঙ্গিক শর্ত হিসেবে আরোপিত হতে পারে না।
মোদ্দাকথা, প্রথম অভিমতটিই প্রণিধানযোগ্য। দ্বিতীয় অভিমতটিও কোনো কোনো বিদগ্ধ আলিম থেকে বর্ণিত হয়েছে। তবে তাঁদের মতানুসারেও সেটি সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য প্রযোজ্য নয়; বরং যারা প্রকৃত অর্থে এর জন্য যোগ্য ও উপযুক্ত, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ধরা যেতে পারে। সুতরাং সর্বসাধারণ এই বিধানের অন্তর্ভুক্ত হবে না। আর তৃতীয় অভিমতটি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কোনো ইমাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়; বরং অনেকে এটাকে মুতাজিলাদের মাজহাব বলে আখ্যায়িত করেছে। সুতরাং এটা কিছুতেই বিবেচনাযোগ্য নয়।
টিকাঃ
২১ তাকলিদ অর্থ অনুসরণ। মুকাল্লিদ অর্থ অনুসারী।
২২ কোনো কোনো আলিম এই অভিমতকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের মত বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য সব মতের ওপর এই মতকে প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যেমন, তাহজিবু শারহিস সানুসিয়া গ্রন্থে (পৃ. ১৩০) এটাকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং অপর দুটি মতকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে আল্লামা সানুসি রাহ. নিজেই বলেন, এই বিধান সাধারণ মানুষের জন্য নয়; বরং এটা শুধু সে-সকল মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের মধ্যে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের যোগ্যতা রয়েছে; এতৎসত্ত্বেও তারা আকিদার ব্যাপারে তার ব্যবহার পরিত্যাগ করেছে। উপরন্তু এখানে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন দ্বারা উচ্চমার্গীয় শাস্ত্রীয় তাত্ত্বিক কোনো বিষয় উদ্দেশ্য নয়; বরং জনসাধারণের উপযোগী পর্যায়ের যথাযথ ব্যবহার শুধু উদ্দেশ্য। যেমন, ইমাম আসমায়ির জবাবে জনৈক বেদুইন বলেছিল, মল যেহেতু প্রাণীর অস্তিত্বের নিদর্শন বহন করে, পথচলার দাগ যেহেতু মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ ধারণ করে, তাহলে এই সুবিশাল আকাশ ও বিস্তৃত পৃথিবী কেন এক স্রষ্টার পরিচয় প্রদান করবে না?
২৩ আল-মুসায়ারা মাআল মুসামারা: ২৮৫-২৮৮।
** বিস্তারিত জানতে দেখুন- আল-জাইশু ওয়াল কামিন লি কিতালি মান কাফফারা আম্মাতাল মুসলিমিন, আল্লামা মুহাম্মাদ শাকরুন আবু আবদিল্লাহ ওয়াহরানি রাহ. (মৃত্যু: ৯২৯ হিজরি), দারুস সাহাবা লিত-তুরাস প্রকাশিত।