📄 লেখকের পৌত্র ইমাম সুলাইমান আলুশ শাইখ বিরচিত পরিশিষ্ট
ইমাম সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ (রহঃ) 'কিতাবুত তাওহিদের' জগৎশ্রেষ্ঠ ভাষ্যগ্রন্থ 'তাইসিরুল আযিযিল হামিদে' আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে কবরপূজারিদের অনেক সংশয় রয়েছে। তার মধ্যে অনেকগুলো সংশয় লেখক তাঁর 'কাশফুশ শুবুহাত (কুবুরীদের সংশয় নিরসন)' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি সেখানে যেসব সংশয়ের আলোচনা করেননি, সেসবের আলোচনা আমরা এখানে সংযোজন করছি।
টিকাঃ
৯৯. অনুবাদকের টীকা: বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের মাননীয় লেখক শাইখুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব আন-নাজদি (রহঃ) এর সুযোগ্য পৌত্র ইমাম সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ (রহঃ) এই বইয়ের পরিশিষ্ট সংযোজন করেছেন। দাদাজানের লেখা অনবদ্য গ্রন্থ কিতাবুত তাওহিদের ব্যাখ্যা লিখেছেন তিনি। খুবই প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় আমরা তাঁর সংযোজিত পরিশিষ্ট অনুবাদ করে বইয়ের সাথে যুক্ত করে দিলাম।
📄 ১৫শ সংশয়: স্বয়ং নবীজি গাইরুল্লাহকে ডাকার করার শিক্ষা দিয়েছেন জনৈক অন্ধ সাহাবিকে
তাদের একটি অন্যতম সংশয়: তারা ইমাম তিরমিজি কর্তৃক তদীয় 'জামি তিরমিজি' গ্রন্থে বর্ণিত একটি হাদিসকে দলিল হিসেবে পেশ করে। তিরমিজি বলেছেন, ... জনৈক অন্ধ ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর নবী, আমার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, যেন তিনি আমাকে আরোগ্য দান করেন। তিনি বললেন, তুমি চাইলে আমি দোয়া করব, তবে তুমি ইচ্ছে করলে ধৈর্যধারণ করতে পার, সেটা হবে তোমার জন্য উত্তম। সে বলল, তার নিকট দোয়া করুন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে উত্তমরূপে ওজু করার নির্দেশ দিলেন এবং এই দোয়া করতে বললেন, “হে আল্লাহ, আপনার নিকট আমি প্রার্থনা করছি এবং আপনার প্রতিই মনোনিবেশ করছি আপনার নবী, দয়ার নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মাধ্যমে (অসিলায়)। আমি তাঁর অসিলায় আমার প্রয়োজনের জন্য আমার প্রভুর দিকে ধাবিত হলাম, যাতে আমার এ প্রয়োজন পূর্ণ করে দেওয়া হয়। হে আল্লাহ, আমার ব্যাপারে তাঁর কৃত সুপারিশ আপনি কবুল করে নিন।”
মুশরিকরা এই শব্দগুচ্ছের সাথেই লেগে রয়েছে, যদিও উক্ত শব্দগুচ্ছ ওই ইমামদের বর্ণনায় আসেনি। মুশরিকরা বলে, আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে ডাকা যদি শির্কই হতো, তাহলে নবী (ﷺ) অন্ধ সাহাবিকে এই দোয়া শিখিয়ে দিতেন না, যার মধ্যেই রয়েছে গাইরুল্লাহকে ডাকার বিষয়বস্তু। কয়েকটি দিক থেকে তাদের এ কথার জবাব দেওয়া যায়:
প্রথমত, হাদিসটিকে যদিও তিরমিজি সহিহ বলে আখ্যায়িত করেছেন, তথাপি হাদিসটি প্রমাণিত কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ তিরমিজি সহিহ বলার ক্ষেত্রে হাকিমের মতো শিথিলতার পথ অবলম্বন করেন। দ্বিতীয়ত, হাদিসটির সাথে এ বিষয়ক বিতর্কের প্রাসঙ্গিকতা নেই। নবী (ﷺ)- এর কাছে অন্ধ সাহাবির দোয়া চাওয়া এবং তাঁর উপস্থিতিতে তাঁর দোয়ার অসিলায় আল্লাহর অভিমুখী হওয়া কতইনা দূরে রয়েছে- মরা মানুষদের কাছে প্রার্থনা, তাদের উদ্দেশ্যে ও তাদের কবরে সিজদা দেওয়া, দুঃখ-দুর্দশায় তাদের ওপর ভরসা করা, তাদের কাছে আশ্রয় চাওয়া, তাদের উদ্দেশ্যে জবাই ও মানত করা, দূরবর্তী জায়গা থেকে তাদের ‘হে আমার পির, হে আমার বাবা, আমার জন্য এটা করে দিন’ বলে ডাকাডাকি করার মতো বিষয়গুলো থেকে!
অন্ধ সাহাবির হাদিস এক জিনিস, আর গাইরুল্লাহকে ডাকা ও ফরিয়াদ করা আরেক জিনিস। অন্ধ সাহাবির হাদিসে কেবল এ বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি নবী (ﷺ)-এর কাছে চেয়েছেন, নবীজি যেন তাঁর জন্য দোয়া ও সুপারিশ করে দেন। বিষয়টি ছিল মূলত নবীজির দোয়া ও সুপারিশ দিয়ে অসিলা গ্রহণ করা। এজন্য তিনি প্রার্থনার শেষাংশে বলেছেন, “হে আল্লাহ, আমার ব্যাপারে তাঁর সুপারিশ আপনি কবুল করে নিন।” এ থেকে জানা যায়, নবীজি তাঁর জন্য সুপারিশ করেছিলেন।
চাইতে নবীর অসিলায় চেয়েছেন স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে। তবে নবীজির সত্তার অসিলায় প্রার্থনার বিষয়টি দুর্বল অভিমতের বক্তব্য। সৃষ্টি কুলের সত্তার অসিলায় প্রার্থনা করা কিংবা তাদের সত্তার মাধ্যমে আল্লাহর শানে কসম করা নিকৃষ্ট বিদাত। এটা নবী (ﷺ)-এর নিকট থেকে প্রমাণিত হয়নি। আবু হানিফা বলেছেন, “কেবল আল্লাহর অসিলা ব্যতিরেকে অন্য কারও অসিলায় আল্লাহকে ডাকা কারও জন্য সমীচীন নয়।” আবু ইউসুফ (ইমাম আবু হানিফার প্রধান ছাত্র এবং হানাফিদের শ্রেষ্ঠ বিদ্বান) বলেছেন, “অমুকের হকের অসিলায়, আপনার নবী-রসুলের হকের অসিলায়, কাবাঘরের হকের অসিলায়, হজের পবিত্র স্থানের অসিলায় প্রার্থনা করা আমি খারাপ মনে করি।”
টিকাঃ
১০০. অনুবাদকের টীকা: তাইসিরুল আযিযিল হামিদের মুহাক্কিক শাইখ উসামা আল-উতাইবি হাফিযাহুল্লাহ উদ্ধৃত করেছেন, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ তাঁর 'কায়িদা জালিলা' গ্রন্থে বলেছেন, “তিরমিজিতে কথাটি এভাবেই উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু সকল উলামা বলেছেন, তিনি হলেন আবু জাফর আল-খাতমি; আর এটাই সঠিক।”
১০১. সাখাউয়ি কৃত ফাতহুল মুগিস, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা ৪২।
১০২. আদ-দুরুল মুখতার, খণ্ড: ৬; পৃ.৩৯৬।
১০৩. মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ১; পৃ.২০৩৩; শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যাহ, পৃ.২৬২।
১০৪. শারহু মুখতাসারিল কারখি, 'মাকরুহ' অধ্যায়।
১০৫. তাবারানি কৃত মুজামুল আওসাত, হা/৬৫০২; মুজামুস সাগির, হা/৯৯২; আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলামের কারণে হাদিসটি বানোয়াট।
১০৬. সুরা আরাফ-৭:২৩।
১০৭. বর্ণনাকারী আব্দুর রহমানের ব্যাপারে দেখুন: মিযযি প্রণীত তাহযিবুল কামাল, খণ্ড: ১৭; পৃ.১১৪-১১৯।
📄 ১৬শ সংশয়: গবাদিপশু হারিয়ে গেলে ‘ওকে আটকাও’ বলে মানুষদের ডাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে হাদিসে; সুতরাং গাইরুল্লাহকে ডাকা বৈধ
তারা আরেকটি হাদিস দিয়ে দলিল পেশ করে। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু ইয়ালা এবং ইবনুস সুন্নি তদীয় 'আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলা' গ্রন্থে। ইবনুস সুন্নি বলেন, আমাদের কাছে আবু ইয়ালা হাদিস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমাদের কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন হাসান বিন আমর বিন শাকিক, তিনি বলেন, আমাদের কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন মারুফ বিন হাসসান, তিনি বলেছেন, আবু মুয়াজ আস-সামারকান্দি আমাদের কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন কাতাদার সূত্রে ইবনু বুরাইদাহ থেকে, তিনি বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে। ইবনু মাসউদ বলেন, রসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তোমাদের কারও পশু কোনো ভূখণ্ডে ছুটে পালালে, সে যেন হাঁক দেয়, আল্লাহর বান্দারা, ওকে আটকাও।” ইবনুস সুন্নির কিতাবে এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। আর জামিউস সাগির গ্রন্থে এসেছে, “কারণ জমিনে আল্লাহর উপস্থিত বান্দা আছে, যে তাকে আটক করে তোমাদের কাছে সোপর্দ করবে।”
তাদের এ সংশয়ের জবাব: এই হাদিসের বিষয়বস্তু মারুফ বিন হাসসানের ওপর ভিত্তিশীল। যে নিজেই আবু মুয়াজ আস-সামারকান্দি। সুতরাং মূল পাণ্ডুলিপিতে যে বলা হয়েছে, 'মারুফ বিন হাসসান বলেন, আবু মুয়াজ আস-সামারকান্দি আমাদের কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন,' কথাটি ভুল। আমার ধারণা, অনুলিপিকার এ ভুলটি করেছেন। ইবনু আদি বলেন, “সে মুনকারুল হাদিস (পরিত্যাক্ত হাদিস- বর্ণনাকারী)।” যাহাবি তদীয় মিযানুল ইতিদাল গ্রন্থে বলেন, “ইবনু আদি বলেছেন, সে মুনকারুল হাদিস (পরিত্যাক্ত হাদিস-বর্ণনাকারী)। সে উমার বিন যার থেকে দীর্ঘ একটি পাণ্ডুলিপির হাদিস বর্ণনা করেছে; যেই পাণ্ডুলিপি বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষিত নয়।” সুয়ুতি বলেছেন, “হাদিসটি দুর্বল।”
আমি বলি, বরং হাদিসটি বাতিল। কারণ কাতাদার সূত্রে সাইদ কর্তৃক বর্ণিত হাদিস কীভাবে এমন হতে পারে যে, সাইদের সুদৃঢ় হাফিয ছাত্রবর্গ সে হাদিস বিষয়ে অজ্ঞাত থাকেন?! যেমন ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, ইসমাইল বিন উলাইয়্যা, আবু উসামা, খালিদ বিন হারিস, আবু খালিদ আল-আহমার, সুফইয়ান, শুবা, আব্দুল ওয়ারিস, ইবনুল মুবারাক, আনসারি, গুনদার, ইবনু আবি আদি প্রমুখের মতো ছাত্ররা সে বিষয়ে অজ্ঞাত থাকেন, আর 'মুনকারুল হাদিস' আখ্যায়িত এই অজ্ঞাত শাইখ কিনা বর্ণনা করেন সেই হাদিস! হাদিসটি বানোয়াট হওয়ার ব্যাপারে এটি একটি অন্যতম শক্তিশালী দলিল। পক্ষান্তরে হাদিসটি প্রমাণিত ধরে নিলেও তাতে (কবরপূজারিদের পক্ষে) কোনো দলিলের অস্তিত্ব নেই। কারণ এ হাদিসে উপস্থিত ব্যক্তির কাছে তার সাধ্যে কুলোয় এমন বিষয়ই চাওয়া হয়েছে। যেমন হাদিসটিতে বলাই হয়েছে, “কারণ জমিনে আল্লাহর উপস্থিত বান্দা আছে, যে তাকে আটক করে তোমাদের কাছে সোপর্দ করবে।”
টিকাঃ
১০৮. আবু ইয়ালা কৃত মুসনাদ, হা/৫২৬৯; ইবনুস সুন্নি কৃত আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলা, হা/৫০৮; তাবারানি কৃত মুজামুল কাবির, হা/১০৫১৮; তাবারানির এক বর্ণনায় এরূপ শব্দগুচ্ছ এসেছে, 'আল্লাহর বান্দারা, আমাকে সাহায্য করো। আল্লাহর বান্দারা, আমাকে সাহায্য করো।' এটা একটা বাতিল হাদিস। এ হাদিসের প্রত্যেকটি সনদে দুর্বলতা রয়েছে। বিস্তারিত তাহকিক দেখুন: আলবানি কৃত সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দয়িফা, খণ্ড: ২; পৃ.১০৮-১১২।
১০৯. আল-কামিল, খণ্ড: ৬; পৃ.৩২৫।
১১০. ফায়দুল কাদির, ভণ্ড: ১; পৃ.৩০৭।
📄 ১৭শ সংশয়: হাদিসে ‘হে মুহাম্মদ, আপনার অসিলায় রবের কাছে চাইছি’ বলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; সুতরাং গাইরুল্লাহকে ডাকা বৈধ
তারা আরও একটি হাদিস দিয়ে দলিল পেশ করে। হাদিসটি তাবারানি বর্ণনা করেছেন তদীয় 'মুজামুল কাবির' গ্রন্থে। উসমান বিন হুনাইফ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, জনৈক ব্যক্তি কোনো এক প্রয়োজনে উসমান বিন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বারবার আসা-যাওয়া করে। কিন্তু তিনি তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না এবং তার প্রয়োজনের প্রতি লক্ষও করেন না। ব্যক্তিটি উসমান বিন হুনাইফের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর কাছে অনুযোগ করলে উসমান বিন হুনাইফ বলেন, 'তুমি অজুখানায় গিয়ে অজু করে নেবে। এরপর মসজিদে এসে দুরাকাত সালাত পড়বে। এরপর বলবে, হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে চাইছি, আর দয়ার নবী আমাদের নবী মুহাম্মাদের অসিলায় আপনার অভিমুখী হচ্ছি। হে মুহাম্মাদ, আমি আপনার অসিলা আপনার রবের অভিমুখী হচ্ছি, যেন তিনি আমার প্রয়োজন পূরণ করে দেন...।”
কয়েকদিক থেকে এ সংশয়ের জবাব দেওয়া যায়। যথা-
প্রথমত, হাদিসের বর্ণনাকারী তাহির বিন ঈসা ন্যায়পরায়ণ হিসেবে পরিচিত নন। বরং তিনি অজ্ঞাত। যাহাবি তাঁর ব্যাপারে জারহ (দোষ) বা তাদিল (গুণ) কিছুই উল্লেখ করেননি। সুতরাং তিনি একজন অজ্ঞাতপরিচয় বর্ণনাকারী (مجهول الحال)। তাঁর হাদিস দিয়ে দলিল পেশ করা সিদ্ধ হবে না। বিশেষ করে সেসব ক্ষেত্রে, যখন তাঁর বর্ণিত হাদিস সরাসরি কিতাব ও সুন্নাহর দলিলপ্রমাণের খেলাপ হয়। দ্বিতীয়ত, তাবারানি বলেছেন, হাদিসটি আবু সাইদ আল-মাক্কি থেকে বর্ণিত হয়েছে। ইনি প্রথমজনের চেয়ে অধিকতর অজ্ঞাত। কারণ ইবনু ওয়াহবের মাক্কি শাইখরা সুপরিচিত। এদের মধ্যে 'আবু সাইদ' উপনামের কেউ নেই। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, বর্ণনাকারী আবু সাইদ আল-মাক্কি অজ্ঞাত।
তৃতীয়ত, হাদিসটি প্রমাণিত ধরে নিলেও, অনুপস্থিত ও মৃত ব্যক্তিকে ডাকার কোনো দলিল নেই এতে। হাদিসে যা রয়েছে তার সারকথা হচ্ছে, হাদিসে উল্লিখিত ব্যক্তি স্বীয় প্রার্থনায় নবীজির অসিলায় দোয়া করেছেন। মরা মানুষকে ডাকার সাথে এর সম্পর্ক কোথায়? কারণ মাখলুকের অসিলায় দোয়া করা মানে তার মাধ্যমে প্রার্থনা করা, সরাসরি তার কাছেই প্রার্থনা করা নয়। আর আলোচনা হচ্ছে কেবল মাখলুকের কাছে এমনসব ক্ষেত্রে সরাসরি প্রার্থনা, আহ্বান ও সাহায্য চাওয়া নিয়ে, যেসব বিষয় সম্পন্ন করার ক্ষমতা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারও নেই। সরাসরি ব্যক্তির কাছে প্রার্থনা আর ব্যক্তির অসিলায় প্রার্থনা— এ দুটো বিষয়ের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তিই পার্থক্য করবেন। সুতরাং মাখলুকের অসিলায় চাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যই দোয়াকে একনিষ্ঠ করেন। কিন্তু তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন মাখলুকের সত্তা কিংবা মাখলুকের দোয়ার অসিলায়।
পক্ষান্তরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সক্ষম নয়, এমন ক্ষেত্রে বান্দার কাছে চাইলে, দোয়ার মতো ইবাদতে আল্লাহর সাথে শরিক করা হয়ে যায়। বস্তুত অন্ধ সাহাবির হাদিসে এবং উসমান বিন হুনাইফের হাদিসে এক আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ দোয়ার কথাই কেবল উল্লিখিত হয়েছে; যেমনটি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে হাদিসে। 'হে মুহাম্মাদ, আপনার অসিলায় আমি দোয়া করছি'— এই কথায় মৃতের সাধ্যাতীত বিষয়ে তাকে ডাকা হয়নি। বরং এতে শুধু মৃতব্যক্তির কথা অন্তরে জাগরিত অবস্থায় তাকে সম্বোধন করার মতো বিষয়ই রয়েছে। যেমন সালাতরত বান্দা বলে থাকেন, 'আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ; হে নবী, আপনার জন্য ধার্য হোক নিরাপত্তা এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত।'
চতুর্থত, তারা মনে করে, এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, মৃত ও অনুপস্থিত এমন সকল সৎব্যক্তির কাছে দোয়া করা বৈধ। তারা নিজেদের বাতিল সমঝ অনুযায়ী হাদিস থেকে যা বুঝেছে, সেই বুঝ থেকে তারা ধরে নিয়েছে, প্রত্যেক মৃত ও অনুপস্থিত বুজুর্গকে ডাকার সপক্ষে এ হাদিস একটি দলিল। যদিও রসুল (ﷺ)-এর তিরোধানের পর কিংবা জীবদ্দশাতেই তাঁর সাধ্যাতীত বিষয়ে তাঁকে ডাকার দলিল এ হাদিসে নেই। তথাপি যদি ধরে নেওয়া হয়, এতে সেই দলিল আছে, তবুও সার্বজনিকভাবে সকল অনুপস্থিত ও মৃত ব্যক্তিকে ডাকার দলিল এ হাদিসে নেই। কেননা এই কিয়াসে (অনুমিতি/তুলনা) পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে।
তাদের সুপরিচিত বইপুস্তকে যেসব সংশয় বিদ্যমান রয়েছে, সেসবের প্রধান প্রধান সংশয় এগুলোই। এই তিনটি হাদিসের বাইরে যা রয়েছে, সেগুলোর তাদের নিজেদের রচিত বানোয়াট হাদিস। যেমন তাদের রচিত বক্তব্য, “তোমরা কোনো বিষয়ে অক্ষম হলে আঁকড়ে ধরবে কবরবাসীদের।” অনুরূপভাবে তারা আরও বলেছে, “তোমাদের কেউ পাথরের প্রতি সুধারণা করলেও তা তোমাদের উপকার করবে।” ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, “এটা মূর্তিপূজক মুশরিকদের বানোয়াট কথা।”
টিকাঃ
১১১. তাবারানি কৃত মুজামুল কাবির, হা/৮৩১১; মুজামুস সাগির, খণ্ড: ১; পৃ.১৮৩; ইবনু আবি হাতিম কৃত আল-ইলাল, খণ্ড: ২; পৃ.১৯০; ইবনু কানি কৃত মুজামুস সাহাবা, খণ্ড: ২; পৃ.২৫৮; আবু হাতিম হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন, আর আবু যুরআ আর-রাযি হাদিসটিকে দুর্বল আখ্যায়িত করেছেন।
১১২. অনুবাদকের টীকা: যাহাবি কৃত তারিখুল ইসলাম, খণ্ড: ২২; পৃ.১৬৯।
১১৩. অনুবাদকের টীকা: তাইসিরুল আযিযিল হামিদের মুহাক্কিক শাইখ উসামা আল-উতাইবি বলেছেন, "শাইখ সুলাইমান যেভাবে উল্লেখ করেছেন, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। বরং তাবারানির বর্ণনায় আবু সাইদ আল-মাক্কি উপনামের বর্ণনাকারীর মূলনাম স্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে। নামটি হলো শাবিব বিন সাইদ আল-মাক্কি।"
১১৪. অনুবাদকের টীকা: শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া বলেছেন, “তারা একটি হাদিস বর্ণনা করে, যা জ্ঞানবান ব্যক্তিদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে মিথ্যা কথা। হাদিসটি হলো: 'তোমরা কোনো বিষয়ে অক্ষম হলে আঁকড়ে ধরবে কবরবাসীদের।' বরং শির্কের দ্বার উন্মোচন করেছে এমন কারও রচিত কথা এটা।"
১১৫. ইবনুল কাইয়্যিম কৃত আল-মানারুল মুনিফ ফিস সাহিহি ওয়াদ দায়িফ, পৃ.১৩৯।