📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৬ষ্ঠ সংশয়: নবী (সা.)-কে শাফায়াত দেওয়া হয়েছে, বিধায় সেটা তাঁর কাছ থেকে চাওয়া বৈধ

📄 ৬ষ্ঠ সংশয়: নবী (সা.)-কে শাফায়াত দেওয়া হয়েছে, বিধায় সেটা তাঁর কাছ থেকে চাওয়া বৈধ


সে যদি বলে, 'নবী (ﷺ)-কে শাফায়াত দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ নবীজিকে যা দিয়েছেন, আমি তা থেকেই তাঁর কাছে চাইছি।'

[এই সংশয়ের প্রথম জবাব]
তাহলে জবাব দিতে হবে, আল্লাহ তাঁকে শাফায়াত দিয়েছেন বটে। কিন্তু আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডাকতে তোমাকে নিষেধও করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।” আল্লাহর কাছ থেকে তুমি তাঁর নবী (ﷺ)-এর শাফায়াত চাইবে, সেটা ইবাদত। আর এই ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকে শরিক করতে আল্লাহ তোমাকে নিষেধ করেছেন। তুমি যদি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো, তিনি যেন তোমার ব্যাপারে নবীজির কৃত শাফায়াত মঞ্জুর করেন, তাহলে তুমি মহান আল্লাহর এই কথা মান্য করো। তিনি বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।”

[এই সংশয়ের দ্বিতীয় জবাব]
এতদ্ব্যতীত নবী (ﷺ) ছাড়াও অন্যদের শাফায়াত দেওয়া হয়েছে। বিশুদ্ধ সূত্রে সাব্যস্ত হয়েছে, ফেরেশতাবর্গ শাফায়াত করবেন, অলিগণ শাফায়াত করবেন এবং পিতামাতার আগে শৈশবে মারা যাওয়া সন্তানরাও শাফায়াত করবে।

এখন তুমি কি বলবে, আল্লাহ তাদেরকে শাফায়াত দিয়েছেন। সুতরাং আমি তাঁদের কাছে শাফায়াত চাইব? তুমি যদি এ কথা বল, তাহলে তুমি বুজুর্গদের ইবাদতেই ফিরে গেলে, যে ইবাদতের কথা আল্লাহ তদীয় কিতাবে আলোচনা করেছেন। পক্ষান্তরে তুমি যদি বল, 'না,' তাহলে তোমার এ কথা বাতিল সাব্যস্ত হলো যে, আল্লাহ তাঁকে শাফায়াত দিয়েছেন; সুতরাং আল্লাহ তাঁকে যা দিয়েছেন, আমি তা থেকেই তাঁর কাছে চাইছি!

টিকাঃ
৪৯. সুরা জিন-৭২:১৮।
৫০. সুরা জিন-৭২:১৮।
৫১. সহিহ মুসলিম, হা/১৮৩; সহিহ বুখারি, হা/১২৪৯; সহিহ মুসলিম, হা/২৬৩৫; মুসনাদু আহমাদ, হা/১৭০১২।

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৭ম সংশয়: বুজুর্গ বান্দাদের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্ক নয়

📄 ৭ম সংশয়: বুজুর্গ বান্দাদের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্ক নয়


সে যদি বলে, 'আমি আল্লাহর সাথে কোনোকিছুকেই শরিক করি না; কখনও নয়, কোনোভাবেই নয়। কিন্তু বুজুর্গ লোকদের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্ক নয়।' তাহলে আপনি তাকে বলবেন, তুমি যদি মেনে নাও, ব্যভিচার হারাম করার চেয়েও শির্ককে আল্লাহ বড়ো করে হারাম করেছেন, যদি মেনে নাও, আল্লাহ শির্কের পাপ ক্ষমা করবেন না; তাহলে সেই বিষয়টি আসলে কী, যেটাকে আল্লাহ এত ভয়াবহ করে উল্লেখ করেছেন এবং এই পাপকে ক্ষমা করবেন না বলে জানিয়েছেন? বিষয়টি হয়তো তার জানাই নেই। তখন আপনি তাকে বলবেন, কীভাবে তুমি নিজেকে শির্ক থেকে মুক্ত ঘোষণা করছ, অথচ তুমি তা চেনোই না? কীভাবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ তোমার ওপর বিষয়টি হারাম করেছেন, এর গুনাহ ক্ষমা করবেন না বলে জানিয়েছেন, অথচ তুমি এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না এবং বিষয়টি চেনোও না? তুমি কি মনে করছ, আল্লাহ শির্ককে হারাম করেছেন, কিন্তু আমাদের কাছে শির্কের পরিচয় বলে দেননি?!

টিকাঃ
৫২. অনুবাদকের টীকা: প্রসিদ্ধ হানাফি ফিকহ 'আল-মুখতার ফি ফুরুয়িল হানাফিয়্যাহ' গ্রন্থের ভাষ্যকার, অষ্টম হিজরি শতাব্দীর বিদ্বান ইবনু আবিল কাসিম আর-রুমি ‘শারহুল মুখতার' গ্রন্থে বলেছেন, "অজ্ঞ লোকদের মাথায় শয়তান বদ্ধমূল করে দিল, অলির মাধ্যমে আল্লাহর কসম করলে, অলির কাছে প্রার্থনা করলে অলিকে অধিক সম্মান দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন-পূরণের ব্যাপারটিও অধিক কার্যকরী হয়। এর মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে শিরকে নিপাতিত করল।"

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৮ম সংশয়: শির্ক মানে মূর্তিপূজা, আমরা তো মূর্তিপূজা করি না

📄 ৮ম সংশয়: শির্ক মানে মূর্তিপূজা, আমরা তো মূর্তিপূজা করি না


সে যদি বলে, 'শির্ক মানে মূর্তিপূজা। আর আমরা মূর্তিপূজা করি না!'

[এই সংশয়ের প্রথম জবাব]
সেক্ষেত্রে আপনি তাকে বলবেন, মূর্তিপূজার মানে কী? তুমি কি মনে করছ, তৎকালীন মুশরিকরা বিশ্বাস রাখত, কাঠ ও পাথর সৃষ্টি করে, রিজিক দেয়, আর তাদের পূজক তথা উপাসকদের বিষয়াদি পরিচালনা করে?! এ দাবিকে স্বয়ং কুরআন মিথ্যা প্রতিপন্ন করে!

পক্ষান্তরে সে যদি বলে, মূর্তিপিয়া মানে কাঠ, অথবা পাথর, কিংবা কবর বা অন্যকিছুর ওপর নির্মিত সৌধের ইবাদত করা। তারা এসবকে ডাকত এবং এসবের উদ্দেশ্যে জবেহ করত। তারা বলত, সে আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করবে, আর তার বরকতে আল্লাহ আমাদের (বিপদাপদ) প্রতিহত করবেন, কিংবা তাঁর বরকতে আমাদেরকে প্রদান করবেন।

তাহলে আপনি বলবেন, তুমি সত্য বলেছ। কবর বা অন্যকিছুর ওপর নির্মিত সৌধ ও পাথরের নিকটে তোমরা যা করো, এটাই সেই কাজ। এ ব্যক্তি স্বীকৃতি দিল, তাদের এ কাজই মূর্তিপূজা। আর এটাই তো কাঙ্ক্ষিত।

[এই সংশয়ের দ্বিতীয় জবাব]
তাকে আরও বলতে হবে, তুমি যে বলছ, শির্ক মানে মূর্তিপূজা। এর মানে কি তুমি বোঝাতে চাইছ, কেবল মূর্তিপূজার মাঝেই শির্ক সীমাবদ্ধ? সৎ ব্যক্তিবর্গের ওপর ভরসা করা এবং শিশুকে ডাকাডাকি করা এর আওতাভুক্ত নয়? আল্লাহ তাঁর কিতাবে যেই আলোচনা করেছেন, তা এই দাবিকে খণ্ডন করে দেয়; আর কুরআনে এসেছে, ফেরেশতাবর্গ, অথবা ঈসা, কিংবা বুজুর্গ লোকদের যারা ইবাদত করেছে তারা কাফির। এজন্য সে স্বীকার করতে বাধ্য হবে, আল্লাহর ইবাদতে যে ব্যক্তি কোনো একজন বুজুর্গ বান্দাকে শরিক করেছে, সেটাই কুরআনে বর্ণিত শির্ক। আর এটাই কাঙ্ক্ষিত।

এ মাসআলার তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়: সে যদি বলে, 'আমি আল্লাহর সাথে শরিক করি না।' আপনি তাকে জিজ্ঞেস করবেন, 'আল্লাহর সাথে শরিক করা বলতে কী বোঝায়? তুমি আমার কাছে ব্যাখ্যা করো।' সে যদি বলে, 'শির্ক হচ্ছে মূর্তিপূজা।' আপনি বলবেন, 'মূর্তিপূজার কাকে বলে? আমার কাছে ব্যাখ্যা করো।' সে যদি বলে, 'আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত (উপাসনা) করি না।' তাহলে আপনি বলবেন, 'এক আল্লাহর ইবাদত বলতে কী বোঝায়? আমার কাছে ব্যাখ্যা করো।' সে যদি কুরআনের বিবরণ মোতাবেক ব্যাখ্যা করে, তবে ভালো। সেটাই কাঙ্ক্ষিত। আর সে যদি এসব না জানে, তাহলে সে কীভাবে এমন জিনিস দাবি করছে, যা তার জানাই নেই? অপরপক্ষে সে যদি এগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করে, তাহলে আপনি তার কাছে আল্লাহর সাথে কৃত শির্ক এবং মূর্তিপূজার পরিচয় বিষয়ক সুস্পষ্ট আয়াতগুলো বর্ণনা করে জানিয়ে দেবেন, বর্তমান যুগে তারা হুবহু সেই কাজটিই করে চলেছে।

টিকাঃ
৫৩. অনুবাদকের টীকা: আলোচ্য অষ্টম সংশয়ের প্রথম জবাবে ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রহ.) যা বলেছেন, সেটা হানাফি বিদ্বান ইমাম মাহমুদ শুকরি আল-আলুসি হুবহু তাঁর 'গায়াতুল আমানি' গ্রন্থে কবরপূজারিদের খণ্ডন হিসেবে আলোকপাত করেছেন।
৫৪. সুরা সাদ-৩৮:৫।

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৯ম সংশয়: তদানীন্তন কাফিররা ফেরেশতাবর্গ ও নবিদের ডাকার দরুন কাফির হয়নি, বরং ফেরেশতাবর্গকে আল্লাহর কন্যা বলার কারণে কাফির হয়েছে।

📄 ৯ম সংশয়: তদানীন্তন কাফিররা ফেরেশতাবর্গ ও নবিদের ডাকার দরুন কাফির হয়নি, বরং ফেরেশতাবর্গকে আল্লাহর কন্যা বলার কারণে কাফির হয়েছে।


সে যদি বলে বসে, “তদানীন্তন মুশরিকরা ফেরেশতাবর্গ ও নবিদের ডাকার কারণে কাফির হয়নি। বরং তারা যখন বলেছিল, 'ফেরেশতারা আল্লাহর কন্যা,' কেবল তখনই তারা কাফির হয়েছিল। আর আমরা তো আব্দুল কাদির জিলানি বা অন্য আর কাউকে আল্লাহর পুত্র বলি না।”

তাহলে এর জবাব হবে, আল্লাহর সন্তান আছে—এমন কথা বলা স্বতন্ত্র কুফর। মহান আল্লাহ বলেছেন, “বল, তিনি আল্লাহ এক। আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।” এক মানে যাঁর কোনো নজির বা দৃষ্টান্ত নেই। আর সকল প্রয়োজনে সবাই যাঁর মুখাপেক্ষী হয়, তাঁকে সামাদ (অমুখাপেক্ষী) বলে। কেউ যদি এটা অস্বীকার করে, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। যদিও সে সুরার শেষাংশ অস্বীকার না করে থাকে।

এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তিনি কাউকে জন্ম দেন না এবং তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি।” যে ব্যক্তি এটা অস্বীকার করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। যদিও সে সুরার প্রথমাংশ অস্বীকার না করে থাকে। মহান আল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অপর কোনো সত্য মাবুদ নেই। যদি থাকত তাহলে প্রত্যেক মাবুদ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যা বলে তা হতে আল্লাহ মহাপবিত্র।” তিনি দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। দুটোর প্রত্যেকটিকে স্বতন্ত্র ও আলাদা কুফর নির্ধারণ করেছেন।

মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, “এরা জিনদেরকে আল্লাহর শরিক বানিয়ে নিয়েছে; অথচ আল্লাহই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর না জেনে না বুঝে তারা তাঁর জন্য পুত্র-কন্যা সন্তান থাকার কথা রচনা করে; তারা যা বলে তা হতে আল্লাহ মহাপবিত্র ও বহু ঊর্ধ্বে রয়েছেন।” এখানে আল্লাহ দুটো কুফরের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। আমাদের বক্তব্যের পক্ষে এটিও একটি দলিল- লাত একজন সৎব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাকে ডাকার কারণে যারা কাফির হয়েছিল, তারা তাকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করেনি। আর জিনের ইবাদত করার দরুন যারা কাফির হয়েছিল, তারাও তাদেরকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করেনি। তদ্রুপ চার মাযহাবের উলামাগণই 'মুরতাদের বিধান' শীর্ষক অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন, কোনো মুসলিম যদি মনে করে, আল্লাহর সন্তান আছে, সে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী কাফির)। আবার কেউ আল্লাহর সাথে শির্ক করলে সে মুরতাদ। তাঁরা দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন।

টিকাঃ
৫৫. অনুবাদকের টীকা: এই পরিচ্ছেদ এবং আসন্ন '১০ম সংশয়' শীর্ষক পরিচ্ছেদ দুটো শাইখ মুহাম্মাদ হামিদ আল-ফাকি ও শাইখ আব্দুল মুহসিন আল-কাসিমের তাহকিককৃত নুসখায় নেই।
৫৬. সুরা ইখলাস-১১২:১-২।
৫৭. সুরা ইখলাস-১১২:৩।
৫৮. সুরা মুমিনুন-২৩:৯১।
৫৯. অনুবাদকের টীকা: আল্লাহ তায়ালা সুরা মুমিনুনের এ আয়াতে দুটো বিষয় আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। এক. তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি। দুই. তাঁর সাথে অপর কোনো সত্য মাবুদের অস্তিত্ব নেই।
৬০. সুরা আনআম-৬:১০০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px