📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৫ম সংশয়: যে শির্কের বিরুদ্ধে বলে, সে প্রকারান্তরে রসুল (সা.)-এর শাফায়াত অস্বীকার করে

📄 ৫ম সংশয়: যে শির্কের বিরুদ্ধে বলে, সে প্রকারান্তরে রসুল (সা.)-এর শাফায়াত অস্বীকার করে


সে যদি বলে বসে, 'তুমি কি আল্লাহর রসুল (ﷺ)-এর শাফায়াত অস্বীকার করছ এবং তা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করছ?' তাহলে আপনি বলবেন, আমি শাফায়াত অস্বীকার করি না এবং তা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণাও করি না। বরং নবী (ﷺ) শাফায়াত করবেন এবং তাঁর শাফায়াত মঞ্জুর করা হবে। আমি নিজে তাঁর শাফায়াত প্রত্যাশাও করি। কিন্তু যাবতীয় শাফায়াত মহান আল্লাহর মালিকানাধীন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তুমি বল, সকল শাফায়াত আল্লাহর মালিকানাভুক্ত।”

তথাপি শাফায়াতের কার্যক্রম আল্লাহ অনুমতি দেওয়ার আগে সম্পন্ন হবে না। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “কে আছে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট শাফায়াত করবে?” আর শাফায়াতকারীরা কারও ব্যাপারে ততক্ষণ সুপারিশ করবে না, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তার জন্য শাফায়াত করার অনুমতি না দিচ্ছেন (অর্থাৎ শাফায়াতপ্রাপ্ত বান্দা হতে হলে তাকে আল্লাহর সন্তোষভাজন হতে হবে)। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, “তিনি যাদের প্রতি খুবই সন্তুষ্ট, তারা (ফেরেশতারা) শুধু তাদের জন্যই শাফায়াত করে।"

তাওহিদ ছাড়া অন্যকিছুর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন না। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে চাইবে, কক্ষনো তার সেই ধর্ম কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” সকল শাফায়াত যখন আল্লাহর মালিকানাভুক্ত, আল্লাহর অনুমতি পাওয়ার আগে শাফায়াত করা হবে না, এমনকি নবী (ﷺ) ও অন্যান্য শাফায়াতকারীরা কারও ব্যাপারে ততক্ষণ সুপারিশ করবে না, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তার জন্য শাফায়াত করার অনুমতি না দিচ্ছেন, আর তিনি তাওহিদপন্থি ছাড়া অন্য কারও জন্য শাফায়াতের অনুমতিও দেবেন না, তখন স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে যায়, সত্যিকারার্থেই সকল শাফায়াত আল্লাহর মালিকানাধীন। এজন্য আমি তাঁর কাছেই এ শাফায়াত চাইব। আমি বলব, হে আল্লাহ, আপনি দয়া করে আমাকে নবীজির শাফায়াত থেকে বঞ্চিত করবেন না। ইয়া আল্লাহ, আপনি আমার জন্য করা তাঁর শাফায়াতকে মঞ্জুর করুন। অনুরূপ আরও প্রার্থনা আল্লাহর কাছেই চাইব।

টিকাঃ
৪৫. সুরা যুমার-৩৯:৪৪।
৪৬. সুরা বাকারা-২:২৫৫।
৪৭. সুরা আম্বিয়া-২১:২৮।
৪৮. সুরা আলে ইমরান-৩:৮৫।

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৬ষ্ঠ সংশয়: নবী (সা.)-কে শাফায়াত দেওয়া হয়েছে, বিধায় সেটা তাঁর কাছ থেকে চাওয়া বৈধ

📄 ৬ষ্ঠ সংশয়: নবী (সা.)-কে শাফায়াত দেওয়া হয়েছে, বিধায় সেটা তাঁর কাছ থেকে চাওয়া বৈধ


সে যদি বলে, 'নবী (ﷺ)-কে শাফায়াত দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ নবীজিকে যা দিয়েছেন, আমি তা থেকেই তাঁর কাছে চাইছি।'

[এই সংশয়ের প্রথম জবাব]
তাহলে জবাব দিতে হবে, আল্লাহ তাঁকে শাফায়াত দিয়েছেন বটে। কিন্তু আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডাকতে তোমাকে নিষেধও করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।” আল্লাহর কাছ থেকে তুমি তাঁর নবী (ﷺ)-এর শাফায়াত চাইবে, সেটা ইবাদত। আর এই ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকে শরিক করতে আল্লাহ তোমাকে নিষেধ করেছেন। তুমি যদি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো, তিনি যেন তোমার ব্যাপারে নবীজির কৃত শাফায়াত মঞ্জুর করেন, তাহলে তুমি মহান আল্লাহর এই কথা মান্য করো। তিনি বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।”

[এই সংশয়ের দ্বিতীয় জবাব]
এতদ্ব্যতীত নবী (ﷺ) ছাড়াও অন্যদের শাফায়াত দেওয়া হয়েছে। বিশুদ্ধ সূত্রে সাব্যস্ত হয়েছে, ফেরেশতাবর্গ শাফায়াত করবেন, অলিগণ শাফায়াত করবেন এবং পিতামাতার আগে শৈশবে মারা যাওয়া সন্তানরাও শাফায়াত করবে।

এখন তুমি কি বলবে, আল্লাহ তাদেরকে শাফায়াত দিয়েছেন। সুতরাং আমি তাঁদের কাছে শাফায়াত চাইব? তুমি যদি এ কথা বল, তাহলে তুমি বুজুর্গদের ইবাদতেই ফিরে গেলে, যে ইবাদতের কথা আল্লাহ তদীয় কিতাবে আলোচনা করেছেন। পক্ষান্তরে তুমি যদি বল, 'না,' তাহলে তোমার এ কথা বাতিল সাব্যস্ত হলো যে, আল্লাহ তাঁকে শাফায়াত দিয়েছেন; সুতরাং আল্লাহ তাঁকে যা দিয়েছেন, আমি তা থেকেই তাঁর কাছে চাইছি!

টিকাঃ
৪৯. সুরা জিন-৭২:১৮।
৫০. সুরা জিন-৭২:১৮।
৫১. সহিহ মুসলিম, হা/১৮৩; সহিহ বুখারি, হা/১২৪৯; সহিহ মুসলিম, হা/২৬৩৫; মুসনাদু আহমাদ, হা/১৭০১২।

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৭ম সংশয়: বুজুর্গ বান্দাদের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্ক নয়

📄 ৭ম সংশয়: বুজুর্গ বান্দাদের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্ক নয়


সে যদি বলে, 'আমি আল্লাহর সাথে কোনোকিছুকেই শরিক করি না; কখনও নয়, কোনোভাবেই নয়। কিন্তু বুজুর্গ লোকদের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্ক নয়।' তাহলে আপনি তাকে বলবেন, তুমি যদি মেনে নাও, ব্যভিচার হারাম করার চেয়েও শির্ককে আল্লাহ বড়ো করে হারাম করেছেন, যদি মেনে নাও, আল্লাহ শির্কের পাপ ক্ষমা করবেন না; তাহলে সেই বিষয়টি আসলে কী, যেটাকে আল্লাহ এত ভয়াবহ করে উল্লেখ করেছেন এবং এই পাপকে ক্ষমা করবেন না বলে জানিয়েছেন? বিষয়টি হয়তো তার জানাই নেই। তখন আপনি তাকে বলবেন, কীভাবে তুমি নিজেকে শির্ক থেকে মুক্ত ঘোষণা করছ, অথচ তুমি তা চেনোই না? কীভাবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ তোমার ওপর বিষয়টি হারাম করেছেন, এর গুনাহ ক্ষমা করবেন না বলে জানিয়েছেন, অথচ তুমি এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না এবং বিষয়টি চেনোও না? তুমি কি মনে করছ, আল্লাহ শির্ককে হারাম করেছেন, কিন্তু আমাদের কাছে শির্কের পরিচয় বলে দেননি?!

টিকাঃ
৫২. অনুবাদকের টীকা: প্রসিদ্ধ হানাফি ফিকহ 'আল-মুখতার ফি ফুরুয়িল হানাফিয়্যাহ' গ্রন্থের ভাষ্যকার, অষ্টম হিজরি শতাব্দীর বিদ্বান ইবনু আবিল কাসিম আর-রুমি ‘শারহুল মুখতার' গ্রন্থে বলেছেন, "অজ্ঞ লোকদের মাথায় শয়তান বদ্ধমূল করে দিল, অলির মাধ্যমে আল্লাহর কসম করলে, অলির কাছে প্রার্থনা করলে অলিকে অধিক সম্মান দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন-পূরণের ব্যাপারটিও অধিক কার্যকরী হয়। এর মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে শিরকে নিপাতিত করল।"

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৮ম সংশয়: শির্ক মানে মূর্তিপূজা, আমরা তো মূর্তিপূজা করি না

📄 ৮ম সংশয়: শির্ক মানে মূর্তিপূজা, আমরা তো মূর্তিপূজা করি না


সে যদি বলে, 'শির্ক মানে মূর্তিপূজা। আর আমরা মূর্তিপূজা করি না!'

[এই সংশয়ের প্রথম জবাব]
সেক্ষেত্রে আপনি তাকে বলবেন, মূর্তিপূজার মানে কী? তুমি কি মনে করছ, তৎকালীন মুশরিকরা বিশ্বাস রাখত, কাঠ ও পাথর সৃষ্টি করে, রিজিক দেয়, আর তাদের পূজক তথা উপাসকদের বিষয়াদি পরিচালনা করে?! এ দাবিকে স্বয়ং কুরআন মিথ্যা প্রতিপন্ন করে!

পক্ষান্তরে সে যদি বলে, মূর্তিপিয়া মানে কাঠ, অথবা পাথর, কিংবা কবর বা অন্যকিছুর ওপর নির্মিত সৌধের ইবাদত করা। তারা এসবকে ডাকত এবং এসবের উদ্দেশ্যে জবেহ করত। তারা বলত, সে আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করবে, আর তার বরকতে আল্লাহ আমাদের (বিপদাপদ) প্রতিহত করবেন, কিংবা তাঁর বরকতে আমাদেরকে প্রদান করবেন।

তাহলে আপনি বলবেন, তুমি সত্য বলেছ। কবর বা অন্যকিছুর ওপর নির্মিত সৌধ ও পাথরের নিকটে তোমরা যা করো, এটাই সেই কাজ। এ ব্যক্তি স্বীকৃতি দিল, তাদের এ কাজই মূর্তিপূজা। আর এটাই তো কাঙ্ক্ষিত।

[এই সংশয়ের দ্বিতীয় জবাব]
তাকে আরও বলতে হবে, তুমি যে বলছ, শির্ক মানে মূর্তিপূজা। এর মানে কি তুমি বোঝাতে চাইছ, কেবল মূর্তিপূজার মাঝেই শির্ক সীমাবদ্ধ? সৎ ব্যক্তিবর্গের ওপর ভরসা করা এবং শিশুকে ডাকাডাকি করা এর আওতাভুক্ত নয়? আল্লাহ তাঁর কিতাবে যেই আলোচনা করেছেন, তা এই দাবিকে খণ্ডন করে দেয়; আর কুরআনে এসেছে, ফেরেশতাবর্গ, অথবা ঈসা, কিংবা বুজুর্গ লোকদের যারা ইবাদত করেছে তারা কাফির। এজন্য সে স্বীকার করতে বাধ্য হবে, আল্লাহর ইবাদতে যে ব্যক্তি কোনো একজন বুজুর্গ বান্দাকে শরিক করেছে, সেটাই কুরআনে বর্ণিত শির্ক। আর এটাই কাঙ্ক্ষিত।

এ মাসআলার তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়: সে যদি বলে, 'আমি আল্লাহর সাথে শরিক করি না।' আপনি তাকে জিজ্ঞেস করবেন, 'আল্লাহর সাথে শরিক করা বলতে কী বোঝায়? তুমি আমার কাছে ব্যাখ্যা করো।' সে যদি বলে, 'শির্ক হচ্ছে মূর্তিপূজা।' আপনি বলবেন, 'মূর্তিপূজার কাকে বলে? আমার কাছে ব্যাখ্যা করো।' সে যদি বলে, 'আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত (উপাসনা) করি না।' তাহলে আপনি বলবেন, 'এক আল্লাহর ইবাদত বলতে কী বোঝায়? আমার কাছে ব্যাখ্যা করো।' সে যদি কুরআনের বিবরণ মোতাবেক ব্যাখ্যা করে, তবে ভালো। সেটাই কাঙ্ক্ষিত। আর সে যদি এসব না জানে, তাহলে সে কীভাবে এমন জিনিস দাবি করছে, যা তার জানাই নেই? অপরপক্ষে সে যদি এগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করে, তাহলে আপনি তার কাছে আল্লাহর সাথে কৃত শির্ক এবং মূর্তিপূজার পরিচয় বিষয়ক সুস্পষ্ট আয়াতগুলো বর্ণনা করে জানিয়ে দেবেন, বর্তমান যুগে তারা হুবহু সেই কাজটিই করে চলেছে।

টিকাঃ
৫৩. অনুবাদকের টীকা: আলোচ্য অষ্টম সংশয়ের প্রথম জবাবে ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রহ.) যা বলেছেন, সেটা হানাফি বিদ্বান ইমাম মাহমুদ শুকরি আল-আলুসি হুবহু তাঁর 'গায়াতুল আমানি' গ্রন্থে কবরপূজারিদের খণ্ডন হিসেবে আলোকপাত করেছেন।
৫৪. সুরা সাদ-৩৮:৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px