📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৪র্থ সংশয়: কবরপূজারিরা বুজুর্গ বান্দাদের ডাকা এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে জবেহ করা সত্ত্বেও ‘তাদের ইবাদত করেছে বলতে অস্বীকার করে

📄 ৪র্থ সংশয়: কবরপূজারিরা বুজুর্গ বান্দাদের ডাকা এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে জবেহ করা সত্ত্বেও ‘তাদের ইবাদত করেছে বলতে অস্বীকার করে


সে যদি বলে, আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করি না। সৎ বান্দাদের কাছে এসব আশ্রয়প্রার্থনা এবং তাদেরকে আহ্বান করা মূলত ইবাদত নয়।

[এই সংশয়ের প্রথম জবাব]
এক্ষেত্রে আপনি তাকে বলবেন, তুমি কি স্বীকার করো, সমুদয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করা তোমার কর্তব্য, যা আল্লাহ তোমার ওপর ফরজ করেছেন? সে যদি বলে, 'হ্যাঁ,' তাহলে আপনি তাকে বলুন, 'আল্লাহ যে তোমার ওপর এ দায়িত্ব ফরজ করেছেন, অর্থাৎ সমুদয় ইবাদতকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করা, যা তোমার ওপর আল্লাহর অধিকার; সেই দায়িত্ব আসলে কী, তার বিবরণ দাও আমার কাছে।'

সে আসলে ইবাদতের পরিচয় ও প্রকারভেদ বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়। সুতরাং আপনি ইবাদতের পরিচয় দিন এ কথা বলে, মহান আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা বিনীতভাবে ও সংগোপনে তোমাদের রবকে ডাক। বস্তুত তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।” আপনি তাকে মহান আল্লাহর এ কথাটি জানিয়ে জিজ্ঞেস করুন, এটা কি আল্লাহর ইবাদত? সে অবশ্যই বলবে, 'হ্যাঁ, দোয়াই তো ইবাদতের মূল। তখন আপনি তার উদ্দেশে বলবেন, তুমি যদি এটাকে ইবাদত হিসেবে মেনে নাও, আর ভয় ও আশা নিয়ে দিনরাত আল্লাহকে ডাকতে থাক, এরপর তুমি একই প্রয়োজন নিয়ে নবী বা অন্য আর কাউকে ডাক; তাহলে তুমি কি আল্লাহর ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করলে? সে অবশ্যই বলবে, 'হ্যাঁ (এটা শির্ক)।'

এরপর আপনি তাকে বলবেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, “অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত পড়ো এবং জবাই করো।” এখন আপনি যদি আল্লাহর উদ্দেশ্যে সালাত পড়েন এবং জবাই করেন, তাহলে এটা কি ইবাদত হলো? সে অবশ্যই বলবে, 'হ্যাঁ।' তখন আপনি তাকে বলবেন, 'তুমি যদি মাখলুকের উদ্দেশ্যে তথা নবী, জিন বা অন্য আর কারও উদ্দেশ্যে জবাই করো, তাহলে তুমি কি এই ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরিক করলে?' সে অবশ্যই মেনে নিতে বাধ্য হবে এবং বলবে, 'হ্যাঁ।'

[এই সংশয়ের দ্বিতীয় জবাব]
আপনি তাকে আরও জিজ্ঞেস করবেন, 'যে মুশরিকদের ব্যাপারে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, তারা কি ফেরেশতাবর্গ, বুজুর্গ বান্দাদের, লাত ও অন্যান্য উপাস্যের ইবাদত করত?' সে অবশ্যই বলবে, 'হ্যাঁ।' তখন আপনি তাকে বলবেন, 'এসব উপাস্যের উদ্দেশ্যে তাদের কৃত ইবাদতগুলো কি প্রার্থনা (আহ্বান), জবাই, আশ্রয়প্রার্থনা প্রভৃতি ক্ষেত্রেই সংঘটিত হত না? নচেৎ তারা তো স্বীকারই করত, তারা আল্লাহর বান্দা ও তাঁর কর্তৃত্বাধীন, আর সকলকিছুর একমাত্র পরিচালক আল্লাহ। কিন্তু তারা কেবল মর্যাদা ও শাফায়াতের জন্য তাদেরকে ডাকত এবং তাদের কাছে আশ্রয় চাইত। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট একটি বিষয়।

টিকাঃ
৪১. সুরা আরাফ-৭:৫৫।
৪২. অনুবাদকের টীকা: শাইখ আব্দুল মুহসিন আল-কাসিমের নুসখায় এ স্থলে 'দোয়াই তো ইবাদতের মূল' কথাটি এভাবেই রয়েছে। পক্ষান্তরে কাশফুশ শুবুহাতের আরও অনেক নুসখায় এ স্থলে বলা হয়েছে, 'হ্যাঁ, দোয়া তো ইবাদতেরই অন্তর্গত।'
৪৩. সুরা কাওসার-১০৮:২।
৪৪. অনুবাদকের টীকা: খ্যাতনামা হানাফি বিদ্বান, ইমাম মাহমুদ শুকরি আল-আলুসি হানাফি কবরপূজারি ইবনু জারজিস আল-ইরাকির ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে বলেছেন, “কতিপয় মুশরিক আছে, যারা এই ইরাকি ও তার সমমনাদের চেয়েও বুদ্ধিমান। যারা কিনা রুকু-সিজদা ছাড়া আর কোনো কিছুকেই ইবাদত মনে করে না।”

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৫ম সংশয়: যে শির্কের বিরুদ্ধে বলে, সে প্রকারান্তরে রসুল (সা.)-এর শাফায়াত অস্বীকার করে

📄 ৫ম সংশয়: যে শির্কের বিরুদ্ধে বলে, সে প্রকারান্তরে রসুল (সা.)-এর শাফায়াত অস্বীকার করে


সে যদি বলে বসে, 'তুমি কি আল্লাহর রসুল (ﷺ)-এর শাফায়াত অস্বীকার করছ এবং তা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করছ?' তাহলে আপনি বলবেন, আমি শাফায়াত অস্বীকার করি না এবং তা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণাও করি না। বরং নবী (ﷺ) শাফায়াত করবেন এবং তাঁর শাফায়াত মঞ্জুর করা হবে। আমি নিজে তাঁর শাফায়াত প্রত্যাশাও করি। কিন্তু যাবতীয় শাফায়াত মহান আল্লাহর মালিকানাধীন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তুমি বল, সকল শাফায়াত আল্লাহর মালিকানাভুক্ত।”

তথাপি শাফায়াতের কার্যক্রম আল্লাহ অনুমতি দেওয়ার আগে সম্পন্ন হবে না। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “কে আছে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট শাফায়াত করবে?” আর শাফায়াতকারীরা কারও ব্যাপারে ততক্ষণ সুপারিশ করবে না, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তার জন্য শাফায়াত করার অনুমতি না দিচ্ছেন (অর্থাৎ শাফায়াতপ্রাপ্ত বান্দা হতে হলে তাকে আল্লাহর সন্তোষভাজন হতে হবে)। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, “তিনি যাদের প্রতি খুবই সন্তুষ্ট, তারা (ফেরেশতারা) শুধু তাদের জন্যই শাফায়াত করে।"

তাওহিদ ছাড়া অন্যকিছুর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন না। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে চাইবে, কক্ষনো তার সেই ধর্ম কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” সকল শাফায়াত যখন আল্লাহর মালিকানাভুক্ত, আল্লাহর অনুমতি পাওয়ার আগে শাফায়াত করা হবে না, এমনকি নবী (ﷺ) ও অন্যান্য শাফায়াতকারীরা কারও ব্যাপারে ততক্ষণ সুপারিশ করবে না, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তার জন্য শাফায়াত করার অনুমতি না দিচ্ছেন, আর তিনি তাওহিদপন্থি ছাড়া অন্য কারও জন্য শাফায়াতের অনুমতিও দেবেন না, তখন স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে যায়, সত্যিকারার্থেই সকল শাফায়াত আল্লাহর মালিকানাধীন। এজন্য আমি তাঁর কাছেই এ শাফায়াত চাইব। আমি বলব, হে আল্লাহ, আপনি দয়া করে আমাকে নবীজির শাফায়াত থেকে বঞ্চিত করবেন না। ইয়া আল্লাহ, আপনি আমার জন্য করা তাঁর শাফায়াতকে মঞ্জুর করুন। অনুরূপ আরও প্রার্থনা আল্লাহর কাছেই চাইব।

টিকাঃ
৪৫. সুরা যুমার-৩৯:৪৪।
৪৬. সুরা বাকারা-২:২৫৫।
৪৭. সুরা আম্বিয়া-২১:২৮।
৪৮. সুরা আলে ইমরান-৩:৮৫।

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৬ষ্ঠ সংশয়: নবী (সা.)-কে শাফায়াত দেওয়া হয়েছে, বিধায় সেটা তাঁর কাছ থেকে চাওয়া বৈধ

📄 ৬ষ্ঠ সংশয়: নবী (সা.)-কে শাফায়াত দেওয়া হয়েছে, বিধায় সেটা তাঁর কাছ থেকে চাওয়া বৈধ


সে যদি বলে, 'নবী (ﷺ)-কে শাফায়াত দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ নবীজিকে যা দিয়েছেন, আমি তা থেকেই তাঁর কাছে চাইছি।'

[এই সংশয়ের প্রথম জবাব]
তাহলে জবাব দিতে হবে, আল্লাহ তাঁকে শাফায়াত দিয়েছেন বটে। কিন্তু আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডাকতে তোমাকে নিষেধও করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।” আল্লাহর কাছ থেকে তুমি তাঁর নবী (ﷺ)-এর শাফায়াত চাইবে, সেটা ইবাদত। আর এই ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকে শরিক করতে আল্লাহ তোমাকে নিষেধ করেছেন। তুমি যদি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো, তিনি যেন তোমার ব্যাপারে নবীজির কৃত শাফায়াত মঞ্জুর করেন, তাহলে তুমি মহান আল্লাহর এই কথা মান্য করো। তিনি বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।”

[এই সংশয়ের দ্বিতীয় জবাব]
এতদ্ব্যতীত নবী (ﷺ) ছাড়াও অন্যদের শাফায়াত দেওয়া হয়েছে। বিশুদ্ধ সূত্রে সাব্যস্ত হয়েছে, ফেরেশতাবর্গ শাফায়াত করবেন, অলিগণ শাফায়াত করবেন এবং পিতামাতার আগে শৈশবে মারা যাওয়া সন্তানরাও শাফায়াত করবে।

এখন তুমি কি বলবে, আল্লাহ তাদেরকে শাফায়াত দিয়েছেন। সুতরাং আমি তাঁদের কাছে শাফায়াত চাইব? তুমি যদি এ কথা বল, তাহলে তুমি বুজুর্গদের ইবাদতেই ফিরে গেলে, যে ইবাদতের কথা আল্লাহ তদীয় কিতাবে আলোচনা করেছেন। পক্ষান্তরে তুমি যদি বল, 'না,' তাহলে তোমার এ কথা বাতিল সাব্যস্ত হলো যে, আল্লাহ তাঁকে শাফায়াত দিয়েছেন; সুতরাং আল্লাহ তাঁকে যা দিয়েছেন, আমি তা থেকেই তাঁর কাছে চাইছি!

টিকাঃ
৪৯. সুরা জিন-৭২:১৮।
৫০. সুরা জিন-৭২:১৮।
৫১. সহিহ মুসলিম, হা/১৮৩; সহিহ বুখারি, হা/১২৪৯; সহিহ মুসলিম, হা/২৬৩৫; মুসনাদু আহমাদ, হা/১৭০১২।

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 ৭ম সংশয়: বুজুর্গ বান্দাদের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্ক নয়

📄 ৭ম সংশয়: বুজুর্গ বান্দাদের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্ক নয়


সে যদি বলে, 'আমি আল্লাহর সাথে কোনোকিছুকেই শরিক করি না; কখনও নয়, কোনোভাবেই নয়। কিন্তু বুজুর্গ লোকদের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্ক নয়।' তাহলে আপনি তাকে বলবেন, তুমি যদি মেনে নাও, ব্যভিচার হারাম করার চেয়েও শির্ককে আল্লাহ বড়ো করে হারাম করেছেন, যদি মেনে নাও, আল্লাহ শির্কের পাপ ক্ষমা করবেন না; তাহলে সেই বিষয়টি আসলে কী, যেটাকে আল্লাহ এত ভয়াবহ করে উল্লেখ করেছেন এবং এই পাপকে ক্ষমা করবেন না বলে জানিয়েছেন? বিষয়টি হয়তো তার জানাই নেই। তখন আপনি তাকে বলবেন, কীভাবে তুমি নিজেকে শির্ক থেকে মুক্ত ঘোষণা করছ, অথচ তুমি তা চেনোই না? কীভাবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ তোমার ওপর বিষয়টি হারাম করেছেন, এর গুনাহ ক্ষমা করবেন না বলে জানিয়েছেন, অথচ তুমি এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না এবং বিষয়টি চেনোও না? তুমি কি মনে করছ, আল্লাহ শির্ককে হারাম করেছেন, কিন্তু আমাদের কাছে শির্কের পরিচয় বলে দেননি?!

টিকাঃ
৫২. অনুবাদকের টীকা: প্রসিদ্ধ হানাফি ফিকহ 'আল-মুখতার ফি ফুরুয়িল হানাফিয়্যাহ' গ্রন্থের ভাষ্যকার, অষ্টম হিজরি শতাব্দীর বিদ্বান ইবনু আবিল কাসিম আর-রুমি ‘শারহুল মুখতার' গ্রন্থে বলেছেন, "অজ্ঞ লোকদের মাথায় শয়তান বদ্ধমূল করে দিল, অলির মাধ্যমে আল্লাহর কসম করলে, অলির কাছে প্রার্থনা করলে অলিকে অধিক সম্মান দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন-পূরণের ব্যাপারটিও অধিক কার্যকরী হয়। এর মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে শিরকে নিপাতিত করল।"

ফন্ট সাইজ
15px
17px