📄 তাওহিদ ও শির্ক চেনার উপকারিতা, যে দুটো বিষয়ে অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ
আমি আপনাকে যা বললাম, তা যদি আপনি হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন, আর আল্লাহর সাথে শরিকস্থাপনের পরিচয় যদি আপনি জানতে পারেন, যে কর্মের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক স্থাপন করাকে ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্য সব (গুনাহ) যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন।”
আপনি যদি চিনে নিতে পারেন, আল্লাহর দ্বীনের প্রকৃত পরিচয়, যে দ্বীন দিয়ে তিনি প্রথম থেকে নিয়ে সর্বশেষ পর্যন্ত সকল রসুল প্রেরণ করেছিলেন, যে দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম বা আদর্শ আল্লাহ কারও নিকট থেকেই কবুল করবেন না। এ ব্যাপারে (তাওহিদ ও শির্কের ব্যাপারে) অধিকাংশ মানুষ যে অজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে, সে ব্যাপারটিও যদি জানতে পারেন। (উপরিউক্ত চারটি বিষয় জানতে পারলে) আপনি দুটো ফল পাবেন:
এক. মহান আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহপ্রাপ্তির আনন্দ। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তুমি বলে দাও, আল্লাহর এই মহানুভবতা ও দয়া পেয়ে সকলেরই আনন্দিত হওয়া উচিত; তারা যা সঞ্চয় করছে তা অপেক্ষা এটা অনেক উত্তম।”
দুই. আপনি ফলস্বরূপ চরম ভয়ও লাভ করবেন। কারণ আপনি যখন জানবেন, জবান দিয়ে বের করা একটি কথার কারণেও মানুষ কাফির হয়ে যায়। কখনো এমন হয়, সে অজ্ঞতাবশত সেই কথা বলে ফেলে; কিন্তু তার অজ্ঞতা ওজর হিসেবে গৃহীত হয় না। আবার কখনো এমন হয়, ওই কথা তাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে মনে করে সে তা বলে ফেলে, যেমনটি কাফিররা মনে করত। বিশেষত মহান আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের যে ঘটনা বলেছেন, তা যদি তিনি তোমাকে অবহিত করেন যে, তারা সৎ ও জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও মুসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলেছিল, “মুশরিকদের যেমন মাবুদ আছে আমাদের জন্যও তেমন মাবুদ বানিয়ে দাও।” যখন এ বিষয়গুলো আপনার অবগতিতে থাকবে, তখন আপনার ভীতি বেড়ে যাবে, আর এই বিষয় এবং এর সমমনা বিষয়গুলো থেকে আপনাকে নিষ্কৃত করতে পারে এমন জিনিসের প্রতি আপনার আগ্রহও হবে প্রচণ্ড।
টিকাঃ
১৬. সুরা নিসা-৪:৪৮।
১৭. সুরা ইউনুস-১০:৫৮।
১৮. সুরা আরাফ-৭:১৩৮।
১৯. অনুবাদকের টীকা: এখানে শির্কের পরিচয় জেনে রাখা দরকার। শির্ক শব্দের অর্থ, অংশী স্থির করা বা অংশীদার স্থাপন করা। শরিয়তে শির্কের দুটি অর্থ রয়েছে। একটি ব্যাপক অর্থ, আরেকটি নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ অর্থ। ব্যাপক অর্থ অনুযায়ী, আল্লাহর অধিকারের কোনো অংশ অন্যের জন্য ধার্য করাকে শির্ক বলে। আল্লাহর অধিকারের প্রকারত্রয় আমরা ইতঃপূর্বে আলোচনা করেছি। আর নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ অর্থ অনুযায়ী, ইবাদতের কোনো অংশ আল্লাহ বাদ দিয়ে অন্য কারও জন্য ধার্য করাকে শির্ক বলে। শরিয়তের দলিলে শির্ক পরিভাষাটি যেখানে ব্যবহৃত হয়, সেখানে শির্ক বলতে এই খাস বা সীমাবদ্ধ অর্থটিই উদ্দিষ্ট হয়ে থাকে। শির্ক প্রধানত দু ধরনের। একটি বড়ো শির্ক, আরেকটি ছোটো শির্ক।
📄 প্রত্যেক হকপন্থি দায়ির বিরুদ্ধে থাকে সংশয় ও দলিল-সংবলিত শত্রুপক্ষ
জেনে রাখবেন, মহান আল্লাহর প্রজ্ঞার অন্তর্গত একটি বিষয়- তিনি এ তাওহিদ-সহ যে নবীই পাঠিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে তৈরি রেখেছেন শত্রুদল। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “এমনিভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্য মানুষ ও জিনদের মধ্য থেকে বহু শয়তানকে শত্রুরূপে সৃষ্টি করেছি; এরা ধোঁকা দেওয়ার জন্য একে অন্যকে কতকগুলো মনোমুগ্ধকর কথার কুমন্ত্রণা দেয়।”
অনেক সময় তাওহিদের শত্রুদের অনেক ইলম এবং বইপুস্তক ও দলিলপ্রমাণও থাকতে পারে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, “তাদের নিকট যখন সুস্পষ্ট প্রমাণ-সহ তাদের রসুলরা আসত, তখন তারা নিজেদের জ্ঞান নিয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠত। আর তারা যা নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ করত সেটাই (আজাব) তাদেরকে বেষ্টন করল।”
এ ব্যাপারটি যেহেতু আপনি অবগত হলেন, আর জানলেন, আল্লাহর পথে অবশ্যই শত্রুদল উপবিষ্ট রয়েছে, যারা বাগ্মী, জ্ঞানী এবং যুক্তি-প্রমাণের অধিকারী; সেহেতু আপনার আবশ্যকীয় কর্তব্য হবে- আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্গত এমন বিষয় শিক্ষার্জন করা, যা আপনার হাতিয়ারে পরিণত হবে, যেই হাতিয়ার দিয়ে আপনি ওই শয়তানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন। যেই শয়তানকুলের ইমাম ও অগ্রণী ইবলিস আপনার মহিমান্বিত রবের উদ্দেশ্যে বলেছিল, “আমি আপনার সরল পথে অবশ্যই ওৎ পেতে বসে থাকব। এরপর আমি তাদের সম্মুখ দিয়ে, পিছন দিয়ে, ডান দিক দিয়ে এবং বাম দিক দিয়ে তাদের কাছে আসব, আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না।”
কিন্তু আপনি যদি আল্লাহর অভিমুখী হন এবং আল্লাহর সুস্পষ্ট দলিলপ্রমাণ শোনেন, তাহলে আপনি মোটেও ভীত ও চিন্তিত হবেন না। আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল।”
প্রকৃতপ্রস্তাবে একজন তাওহিদপন্থি সাধারণ মানুষ ওই মুশরিকদের এক হাজার বিদ্বানের ওপর বিজয়ী হবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, "আর নিশ্চয় আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী।” সুতরাং মহান আল্লাহর দল দলিল ও বক্তব্য দিয়েও বিজয়ী থাকবে, যেমন তারা তরবারি ও বর্শা দিয়ে বিজয়ী। ভয় কেবল ওই তাওহিদপন্থিকে নিয়েই, যে বিনা হাতিয়ারে পথ চলছে।
টিকাঃ
২০. সুরা আনআম-৬:১১২।
২১. সুরা গাফির (আল মু'মিন)-৪০:৮৩।
২২. সুরা আরাফ-৭:১৬-১৭।
২৩. সুরা নিসা-৪:৭৬।
২৪. সুরা সাফফাত-৩৭:১৭৩।
📄 আল-কুরআন কেয়ামত পর্যন্ত আগত প্রত্যেক বাতিলপন্থির বিরুদ্ধে দলিল
মহান আল্লাহ তাঁর কিতাব দিয়ে আমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, যে কিতাবকে তিনি করেছেন—সকল কিছুর ব্যাখ্যা, হেদায়েত, রহমত এবং মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ। অতএব বাতিলপন্থি যে প্রমাণ বা যুক্তিই আনুক না কেন, কুরআনে এমন দলিল রয়েছে, যা উক্ত যুক্তি-প্রমাণকে খণ্ডন করবে এবং তার অসারতা প্রকাশ করে দেবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তারা তোমার নিকট যে সমস্যাই উপস্থিত করেছে, তার সঠিক সমাধান ও উত্তম ব্যাখ্যা আমি তোমাকে দিয়েছি।” কতিপয় তাফসিরকারক বলেছেন, “এ আয়াতটি কেয়ামত পর্যন্ত বাতিলপন্থিদের উপস্থাপিত প্রতিটি যুক্তি-প্রমাণের ক্ষেত্রে ব্যাপক।”
টিকাঃ
২৫. সুরা নাহল-১৬:৮৯।
২৬. সুরা ফুরকান-২৫:৩৩।
📄 বাতিলপন্থি মুশরিকদের জবাব দেওয়ার দুটো ধারা এবং তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
প্রথম ধারা: হালের মুশরিকরা আমাদের বিরুদ্ধে যেসব যুক্তি-প্রমাণ দেয় সেসবের জবাবস্বরূপ- আল্লাহ তাঁর কিতাবের মধ্যে যা উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে কয়েকটি বিষয় আমি আপনার কাছে উল্লেখ করছি। আমরা বলি, বাতিলপন্থিদের জবাব দেওয়ার দুটো ধারা আছে- একটি সংক্ষিপ্ত, আরেকটি বিস্তারিত।
সংক্ষিপ্ত জবাবটি আসলে মহান একটি বিষয় এবং জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য বড়ো ধরনের ইলমি অবগতি। জবাবটি হলো— মহান আল্লাহ বলেছেন, “তিনিই তোমার ওপর কিতাব নাজিল করেছেন, তার মধ্যে আছে দ্ব্যর্থহীন আয়াতসমূহ। সেগুলো কিতাবের মূল, আর অন্যগুলো দ্ব্যর্থবোধক। ফলে যাদের অন্তরে রয়েছে বক্রতা, তারা ফিতনার উদ্দেশ্যে এবং ভুল ব্যাখ্যার অনুসন্ধানে দ্ব্যর্থবোধক আয়াতগুলোর পেছনে লেগে থাকে। অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না।”
রসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, “যারা দ্ব্যর্থবোধক আয়াতের পেছনে ছোটে, তাদের যখন তোমরা দেখবে, তখন মনে রাখবে, তাদের কথাই আল্লাহ কুরআনে বলেছেন। সুতরাং তাদের থেকে সতর্ক থাকবে।”
উক্ত বিষয়টির দৃষ্টান্ত: কোনো মুশরিক যদি তোমাকে বলে, আল্লাহ বলেছেন, “জেনে রেখ, আল্লাহর অলিদের (সাহায্যপ্রাপ্ত নেক বান্দাদের) না কোনো ভয় আছে, আর না তারা চিন্তিত হবে।” কিংবা মুশরিক বলে, অবশ্যই শাফায়াত সত্য। কিংবা বলে, নিশ্চয় আল্লাহর কাছে নবীগণের মর্যাদা রয়েছে। অথবা সে নবী (ﷺ)-এর কোনো বক্তব্য উদ্ধৃত করে স্বীয় বাতিল মতাদর্শের পক্ষে দলিল পেশ করতে চায়। কিন্তু তার বলা কথাগুলোর অর্থ আপনার বুঝে আসে না। সেক্ষেত্রে আপনি এ কথা বলে জবাব দেবেন, মহান আল্লাহ জানিয়েছেন, যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, তারা সুস্পষ্ট দলিল ছেড়ে দিয়ে দ্ব্যর্থবোধক দলিলের পেছনে লেগে থাকে। আমি তোমার কাছে যা বলেছি, অর্থাৎ মুশরিকরা তাওহিদুর রুবুবিয়্যাহর স্বীকৃতি দিত এ কথা আল্লাহ বলেছেন এবং ফেরেশতাবর্গ, নবীগণ ও অলিদের ইবাদত করার দরুন— 'তারা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে' এ কথা বলা সত্ত্বেও—তাদেরকে কাফির বলেছেন। আমার ব্যক্তীকৃত এ কথাগুলো সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। কেউ এর অর্থ পরিবর্তন করতে পারবে না।
পক্ষান্তরে, ওহে মুশরিক, তুমি আমার কাছে কুরআনের যে অংশ বা নবী (ﷺ) এর যে হাদিস পেশ করেছ, সেগুলোর প্রকৃত অর্থ আমার জানা নেই। কিন্তু এ বিষয়টি আমি সুনিশ্চিত জানি যে, আল্লাহর কথা কখনোই পরস্পরবিরোধী হয় না এবং নবী (ﷺ)-এর কথাও আল্লাহর কথার বিপরীত হতে পারে না। এটি সঠিক ও উত্তম জবাব। কিন্তু মহান আল্লাহ যাকে তৌফিক দিয়েছেন, সে ব্যতীত আর কেউ তা বুঝতে পারে না। সুতরাং আপনি এই জবাবকে ছোটো করে দেখবেন না। এ জবাবের ব্যাপারটি আসলে তেমনই, যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন, “এই গুণ কেবল তারাই লাভ করে, যারা ধৈর্যশীল। এই গুণ কেবল তারাই লাভ করে, যারা মহাভাগ্যবান।”
টিকাঃ
২৭. সুরা আলে ইমরান-৩:৭।
২৮. সহিহ বুখারি, হা/৪৫৪৭; সহিহ মুসলিম, হা/২৬৬৫।
২৯. অনুবাদকের টীকা: সুরা ইউনুসের আয়াতটি দিয়ে কবরপূজারিরা যুক্তি দেয়। যারা আউলিয়াদের ইবাদত করে, তাদের কাছে ফরিয়াদ করে, তারা এ আয়াতটি দিয়ে বোঝাতে চায়, অলিরা আল্লাহর নৈকট্যশীল ও মর্যাদাবান বান্দা।
৩০. সুরা ইউনুস-১০:৬২।
৩১. অনুবাদকের টীকা: এসব বলে কবরপূজারি বোঝাতে চায়, এগুলো যেহেতু সত্য, সেহেতু কবরে শায়িত মরা মানুষের কাছে শাফায়াত চাওয়া যাবে এবং মৃত নবিদের কাছেও প্রার্থনা করা যাবে।
৩২. সুরা ফুসসিলাত-৪১:৩৫।