📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর মর্ম তাওহিদ

📄 লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর মর্ম তাওহিদ


আপনার বলা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' তথা 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই' কথাটির মর্মার্থই এই তাওহিদ। কারণ তারা ইলাহ মানে এমন উপাস্যকেই বুঝত, যার ইবাদত করা হয়; এসব শাফায়াত ও সান্নিধ্যপ্রাপ্তির ভুল বিশ্বাসের কারণে। চাই সে ফেরেশতা হোক, বা নবী হোক, কিংবা অলি, বা গাছ, অথবা কবর, বা জিন হোক না কেন, এসবের প্রতিটিই তাদের কাছে ইলাহ হিসেবে বিবেচিত হতো। তাঁরা ইলাহ বলতে সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা ও সর্ববিষয়ের নিয়ন্ত্রক বোঝাত না। কারণ তারা জানত, এগুলোর সবই একমাত্র আল্লাহর অধিকারভুক্ত বিষয়। যেমনটি আমি আপনার কাছে ইতোমধ্যে পেশ করেছি।

বরং আমাদের যুগের মুশরিকরা 'সাইয়্যিদ (পির, বাবা)' বলে যা বোঝায়, তারা ইলাহ বলতে সেটাই বোঝাত। নবী (ﷺ) তাদের কাছে এসেছিলেন, তাওহিদি কালিমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র দাওয়াত নিয়ে। এ কালিমার উদ্দিষ্ট বিষয় এর মর্ম, শুধু শব্দ নয়। জাহেল কাফিররা জানত, এ কালিমার দ্বারা নবী (ﷺ)-এর উদ্দেশ্য-ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক গণ্য করা, আল্লাহ ব্যতীত সকল উপাস্যকে অস্বীকার করা এবং সেসব উপাস্য থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা। কারণ তিনি যখন তাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন, “তোমরা বল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।” তারা তখন প্রতিউত্তরে বলেছিল, “সে কি অনেক মাবুদের পরিবর্তে এক মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে? এতো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার!”

আপনি যখন জানতে পারবেন, জাহেলি যুগের কাফিররা এ বিষয়টি জানত, তখন মুসলিম দাবিদার একশ্রেণির কাছে ব্যাপারটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক হিসেবেই প্রতিভাত হবে, যারা কিনা এই কালিমার প্রকৃত অর্থই জানে না, যা কিনা জাহেলি যুগের কাফিররা জানত! বরং এরা মনে করে, কোনো ধরনের অর্থের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস না রেখে স্রেফ কালিমার অক্ষরগুলো উচ্চারণ করলেই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাবি বাস্তবায়িত হয়। এদের মধ্যে যারা চতুর, তারা মনে করে, এই কালিমার মানে- আল্লাহ ছাড়া কোনো সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা ও সর্ববিষয়ের নিয়ন্ত্রক নেই। সেই ব্যক্তির মধ্যে কোনো কল্যাণই থাকতে পারে না, যার চেয়ে জাহেলি যুগের কাফিররাই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর মর্মের ব্যাপারে অধিক অবগত সাব্যস্ত হয়।

টিকাঃ
১১. অনুবাদকের টীকা: বর্তমান মুশরিকরা বলে, অমুকের মাঝে আকিদা রয়েছে। এর মানে, তার ব্যাপারে এমন আকিদা রাখা সঙ্গত হবে যে, সেই ব্যক্তি উপকার করতে পারে। এরা যখন কোনো ব্যক্তির মধ্যে আকিদা রয়েছে বলে দাবি করে, তখন তারা বোঝায়, উক্ত ব্যক্তির ইবাদত পাওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। দ্রষ্টব্য: ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইবরাহিম আলুশ শাইখ বিরচিত শারহু কাশফিশ শুবুহাত; পৃ.৩৮; কিং ফাহাদ লাইব্রেরি কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪২৮ হিজরি (১ম প্রকাশ)।
১২. অনুবাদকের টীকা: লাত তদানীন্তন আরব মুশরিকদের উপাস্য ছিল। তার নাম কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। (সুরা নাজম-৫৩:১৯) ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, 'লাত হাজিদের জন্য ছাতু গুলে দিত।' (সহিহ বুখারি, হা/৪৮৫৯)
১৩. সুরা জিন-৭২:১৮।
১৪. সুরা রাদ-১৩:১৪।
১৫. সুরা সাদ-৩৮:৫।

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 তাওহিদ ও শির্ক চেনার উপকারিতা, যে দুটো বিষয়ে অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ

📄 তাওহিদ ও শির্ক চেনার উপকারিতা, যে দুটো বিষয়ে অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ


আমি আপনাকে যা বললাম, তা যদি আপনি হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন, আর আল্লাহর সাথে শরিকস্থাপনের পরিচয় যদি আপনি জানতে পারেন, যে কর্মের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক স্থাপন করাকে ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্য সব (গুনাহ) যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন।”

আপনি যদি চিনে নিতে পারেন, আল্লাহর দ্বীনের প্রকৃত পরিচয়, যে দ্বীন দিয়ে তিনি প্রথম থেকে নিয়ে সর্বশেষ পর্যন্ত সকল রসুল প্রেরণ করেছিলেন, যে দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম বা আদর্শ আল্লাহ কারও নিকট থেকেই কবুল করবেন না। এ ব্যাপারে (তাওহিদ ও শির্কের ব্যাপারে) অধিকাংশ মানুষ যে অজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে, সে ব্যাপারটিও যদি জানতে পারেন। (উপরিউক্ত চারটি বিষয় জানতে পারলে) আপনি দুটো ফল পাবেন:

এক. মহান আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহপ্রাপ্তির আনন্দ। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তুমি বলে দাও, আল্লাহর এই মহানুভবতা ও দয়া পেয়ে সকলেরই আনন্দিত হওয়া উচিত; তারা যা সঞ্চয় করছে তা অপেক্ষা এটা অনেক উত্তম।”

দুই. আপনি ফলস্বরূপ চরম ভয়ও লাভ করবেন। কারণ আপনি যখন জানবেন, জবান দিয়ে বের করা একটি কথার কারণেও মানুষ কাফির হয়ে যায়। কখনো এমন হয়, সে অজ্ঞতাবশত সেই কথা বলে ফেলে; কিন্তু তার অজ্ঞতা ওজর হিসেবে গৃহীত হয় না। আবার কখনো এমন হয়, ওই কথা তাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে মনে করে সে তা বলে ফেলে, যেমনটি কাফিররা মনে করত। বিশেষত মহান আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের যে ঘটনা বলেছেন, তা যদি তিনি তোমাকে অবহিত করেন যে, তারা সৎ ও জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও মুসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলেছিল, “মুশরিকদের যেমন মাবুদ আছে আমাদের জন্যও তেমন মাবুদ বানিয়ে দাও।” যখন এ বিষয়গুলো আপনার অবগতিতে থাকবে, তখন আপনার ভীতি বেড়ে যাবে, আর এই বিষয় এবং এর সমমনা বিষয়গুলো থেকে আপনাকে নিষ্কৃত করতে পারে এমন জিনিসের প্রতি আপনার আগ্রহও হবে প্রচণ্ড।

টিকাঃ
১৬. সুরা নিসা-৪:৪৮।
১৭. সুরা ইউনুস-১০:৫৮।
১৮. সুরা আরাফ-৭:১৩৮।
১৯. অনুবাদকের টীকা: এখানে শির্কের পরিচয় জেনে রাখা দরকার। শির্ক শব্দের অর্থ, অংশী স্থির করা বা অংশীদার স্থাপন করা। শরিয়তে শির্কের দুটি অর্থ রয়েছে। একটি ব্যাপক অর্থ, আরেকটি নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ অর্থ। ব্যাপক অর্থ অনুযায়ী, আল্লাহর অধিকারের কোনো অংশ অন্যের জন্য ধার্য করাকে শির্ক বলে। আল্লাহর অধিকারের প্রকারত্রয় আমরা ইতঃপূর্বে আলোচনা করেছি। আর নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ অর্থ অনুযায়ী, ইবাদতের কোনো অংশ আল্লাহ বাদ দিয়ে অন্য কারও জন্য ধার্য করাকে শির্ক বলে। শরিয়তের দলিলে শির্ক পরিভাষাটি যেখানে ব্যবহৃত হয়, সেখানে শির্ক বলতে এই খাস বা সীমাবদ্ধ অর্থটিই উদ্দিষ্ট হয়ে থাকে। শির্ক প্রধানত দু ধরনের। একটি বড়ো শির্ক, আরেকটি ছোটো শির্ক।

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 প্রত্যেক হকপন্থি দায়ির বিরুদ্ধে থাকে সংশয় ও দলিল-সংবলিত শত্রুপক্ষ

📄 প্রত্যেক হকপন্থি দায়ির বিরুদ্ধে থাকে সংশয় ও দলিল-সংবলিত শত্রুপক্ষ


জেনে রাখবেন, মহান আল্লাহর প্রজ্ঞার অন্তর্গত একটি বিষয়- তিনি এ তাওহিদ-সহ যে নবীই পাঠিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে তৈরি রেখেছেন শত্রুদল। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “এমনিভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্য মানুষ ও জিনদের মধ্য থেকে বহু শয়তানকে শত্রুরূপে সৃষ্টি করেছি; এরা ধোঁকা দেওয়ার জন্য একে অন্যকে কতকগুলো মনোমুগ্ধকর কথার কুমন্ত্রণা দেয়।”

অনেক সময় তাওহিদের শত্রুদের অনেক ইলম এবং বইপুস্তক ও দলিলপ্রমাণও থাকতে পারে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, “তাদের নিকট যখন সুস্পষ্ট প্রমাণ-সহ তাদের রসুলরা আসত, তখন তারা নিজেদের জ্ঞান নিয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠত। আর তারা যা নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ করত সেটাই (আজাব) তাদেরকে বেষ্টন করল।”

এ ব্যাপারটি যেহেতু আপনি অবগত হলেন, আর জানলেন, আল্লাহর পথে অবশ্যই শত্রুদল উপবিষ্ট রয়েছে, যারা বাগ্মী, জ্ঞানী এবং যুক্তি-প্রমাণের অধিকারী; সেহেতু আপনার আবশ্যকীয় কর্তব্য হবে- আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্গত এমন বিষয় শিক্ষার্জন করা, যা আপনার হাতিয়ারে পরিণত হবে, যেই হাতিয়ার দিয়ে আপনি ওই শয়তানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন। যেই শয়তানকুলের ইমাম ও অগ্রণী ইবলিস আপনার মহিমান্বিত রবের উদ্দেশ্যে বলেছিল, “আমি আপনার সরল পথে অবশ্যই ওৎ পেতে বসে থাকব। এরপর আমি তাদের সম্মুখ দিয়ে, পিছন দিয়ে, ডান দিক দিয়ে এবং বাম দিক দিয়ে তাদের কাছে আসব, আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না।”

কিন্তু আপনি যদি আল্লাহর অভিমুখী হন এবং আল্লাহর সুস্পষ্ট দলিলপ্রমাণ শোনেন, তাহলে আপনি মোটেও ভীত ও চিন্তিত হবেন না। আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল।”

প্রকৃতপ্রস্তাবে একজন তাওহিদপন্থি সাধারণ মানুষ ওই মুশরিকদের এক হাজার বিদ্বানের ওপর বিজয়ী হবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, "আর নিশ্চয় আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী।” সুতরাং মহান আল্লাহর দল দলিল ও বক্তব্য দিয়েও বিজয়ী থাকবে, যেমন তারা তরবারি ও বর্শা দিয়ে বিজয়ী। ভয় কেবল ওই তাওহিদপন্থিকে নিয়েই, যে বিনা হাতিয়ারে পথ চলছে।

টিকাঃ
২০. সুরা আনআম-৬:১১২।
২১. সুরা গাফির (আল মু'মিন)-৪০:৮৩।
২২. সুরা আরাফ-৭:১৬-১৭।
২৩. সুরা নিসা-৪:৭৬।
২৪. সুরা সাফফাত-৩৭:১৭৩।

📘 কুবুরীদের সংশয় নিরসন 📄 আল-কুরআন কেয়ামত পর্যন্ত আগত প্রত্যেক বাতিলপন্থির বিরুদ্ধে দলিল

📄 আল-কুরআন কেয়ামত পর্যন্ত আগত প্রত্যেক বাতিলপন্থির বিরুদ্ধে দলিল


মহান আল্লাহ তাঁর কিতাব দিয়ে আমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, যে কিতাবকে তিনি করেছেন—সকল কিছুর ব্যাখ্যা, হেদায়েত, রহমত এবং মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ। অতএব বাতিলপন্থি যে প্রমাণ বা যুক্তিই আনুক না কেন, কুরআনে এমন দলিল রয়েছে, যা উক্ত যুক্তি-প্রমাণকে খণ্ডন করবে এবং তার অসারতা প্রকাশ করে দেবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তারা তোমার নিকট যে সমস্যাই উপস্থিত করেছে, তার সঠিক সমাধান ও উত্তম ব্যাখ্যা আমি তোমাকে দিয়েছি।” কতিপয় তাফসিরকারক বলেছেন, “এ আয়াতটি কেয়ামত পর্যন্ত বাতিলপন্থিদের উপস্থাপিত প্রতিটি যুক্তি-প্রমাণের ক্ষেত্রে ব্যাপক।”

টিকাঃ
২৫. সুরা নাহল-১৬:৮৯।
২৬. সুরা ফুরকান-২৫:৩৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px