📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম কাঁদলেন যেভাবে

📄 ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম কাঁদলেন যেভাবে


৩৫৭. আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়্যা এত বেশি কাঁদতেন যে সামনের দাঁত বেরিয়ে আসত। তার মা বলতেন বাবা! তুমি যদি অনুমতি দাও তবে দাঁতগুলো আমি পশম দিয়ে ঢেকে দেব। কারো দৃষ্টিতে তা পড়বে না। তিনি জবাব দিলেন, মা আপনি করতে পারেন। তখন মা তা তার গালে পশম পেঁচিয়ে দিলেন। চোখের পানিতে যখন তা ভিজে যেত মা কাছে এসে পশম নিংড়িয়ে দিতেন। তখন পানি গাল বয়ে গড়িয়ে যেত।
৩৫৮. ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়্যার উভয় গালে দুটি দাগ ছিল। বাবা যাকারিয়্যা তাকে বলতেন, আমি এমন সন্তান আল্লাহর কাছে চাইলাম যার দ্বারা আমার চোখ শীতল হয়ে যায়। ইয়াহইয়া জবাব দিলেন, বাবা! জিব্রাঈল আমাকে সংবাদ দিলেন, জান্নাত ও দোযখের মধ্যে একটি ময়দান আছে, একমাত্র ক্রন্দনকারী ছাড়া তা কেউ অতিক্রম করে যেতে পারবে না।
৩৫৯. মা'মার বলেন, শিশুরা যাকারিয়্যাকে বলল, এসো খেলতে যাই। তিনি জবাব দিলেন, আমরা কি খেলা ধুলার জন্য সৃষ্টি হয়েছি? তখন আল্লাহ্ যোযনা দিলেন صَبِيًّا الْحَكَمَ وَآتَيْنَا وَআ আমি তাকে শৈশবেই বিচার বুদ্ধি দান করেছিলাম। [মরিয়ম:১২]
৪০০. ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়্যা একরাত তৃপ্তি করে যবের রুটি খেলেন। তখন রাতের অধিফা আদায় না করে ঘুমিয়ে যান। আল্লাহ্ তার কাছে ওহী পাঠালেন, ইয়াহইয়া! আমার ঘর থেকে কি তোমার ঘর উত্তম? আমার প্রতিবেশ থেকে কি তোমার প্রতিবেশ উত্তম? আমার ইযযতের শপথ! ইয়াহইয়া! যদি জান্নাতুল ফেরদাউসের দিকে একটিবার তাকাতে, তোমার প্রাণ উদগ্রীব হয়ে যেত। যদি একটিবার দোযখের দিকে তাকাতে, তোমার চোখ থেকে পানি শেষ হয়ে পূঁজ বের হত। নরম কাপড় ফেলে লুহার কাপড় পরিধান করতো।
৪০۱. ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ঘাস খেতেন। আল্লাহর ভয়ে এত বেশি কাঁদতেন যদি চোখে কোন গ্রাস রাখা হয় তবে তা বয়ে যাবে। চোখের পানিতে মুখে নালার বয়ে গিয়েছিল।
৪০২. জাফর বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়ার কাছে শয়তান আসল। ইয়াহইয়া বললেন ইবলিস! তোর গলায় এসব কি লটকে আছে জবাব দেয়, এগুলো হলো প্রবৃত্তি। প্রতিদিন আমি তাতে পতিত হই। ইয়াহইয়া বললেন, আমিও কি তাতে পতিত হই? জবাব দেয়, যখন আপনি পেট ভরে খান তখন নামায ও যিকর আদায়ে ভারি অনুভব হয়। ইয়াহইয়া বলেন, আল্লাহর শপথ! আর কভুও পেট ভরে খাব না। তা শুনে ইবলিসও প্রতিজ্ঞা করে, আমিও কভু কোন মুসলমানের মঙ্গল কামনা করব না।
৪০৩. ইয়াহইয়া মানুষের রান্না করা খাবার খেতেন না। আশঙ্কা করতেন তাতে যদি কোন যুলমের অংশিদারিত্ব থাকে। শাক সবজি খেতেন। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলে আল্লাহ মওতের ফিরিশতাকে তাঁর কাছে এ বলে পাঠালেন অমুক দেহের ঐ আত্মাকে ক্ববয কর। ঐ শরীরটি কোন পাপ করে নি, এমন কি পাপের ইচ্ছাও করে নি।

📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 ফিরিশতাদের রোদন

📄 ফিরিশতাদের রোদন


৪০৪. হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জিব্রাঈল আলাইহিস- সালামকে জিজ্ঞেস করলাম, মিকাইলকে কখনো হাসতে দেখি নি কেনো? জবাব দিলেন, জাহান্নাম সৃষ্টির পর থেকে মিকাইল আর হাসেন নি।
৪০৫. হযরত ইব্রাহীম ইবনে মুখাল্লাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিব্রাঈল আলাইহিস-সালামকে বললেন, আপনি যখনই আমার কাছে আসেন, চোখে আতঙ্কের চিহ্ন দেখতে পাই? উত্তর দিলেন, জাহান্নাম সৃষ্টির পর থেকে আমি হাসি নি।
৪০৬. হযরত বকর আবিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইবনে আবি হায়ালার একজন সাথীকে জিজ্ঞেস করলাম, ফিরিশতারা কি হাসেন? জবাব দিলেন জাহান্নাম সৃষ্টির পর থেকে তারা আর হাসেন নি।
৪০৭. হযরত যিয়াদ ইবনে আবি হাবিবা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আরশ বহনকারী একজন ফিরিশতার উভয় চোখ দিয়ে অধিক ক্রন্দনের কারণে পানির নালার বয়েছিল। তিনি মাথা তুলে বললেন, প্রভু! পবিত্রতা ও গুণগান তোমারই। তোমার প্রাপ্য অনুযায়ী তোমাকে তো ভয় করা হয় নি। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, যারা আমার নামে মিথ্যা শপথ করে তারা তো এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে না।
৪০৮. হযরত আবু ফুজালা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহ তা'আলার এমন কিছু ফিরিশতা আছেন, যারা জাহান্নাম সৃষ্টির পর আর কোনদিন হাসেন নি। ভয় হয়, যদি আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট হয়ে তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন।
৪০৯. হযরত জাফর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন [মিরাজের রাতে] চতুর্থ আসমানে নেওয়া হলো, তিনি একটি ধ্বনি শুনতে পেলেন। জিব্রাঈল আলাইহিস- সালামকে প্রশ্ন করলেন, এটা কিসের আওয়াজ? উত্তর দিলেন, আপনার উম্মাতদের জন্য ক্রন্দন করা হচ্ছে- এটা সেই আওয়াজ।
৪১০. হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মিরাজের রাত আমি জিব্রাঈল আলাইহিস-সালামকে দেখেছি, একখণ্ড পুরাতন কাপড়ের মতো যা আকাশ থেকে পতিত হয়। তার এ অবস্থা পরিলক্ষিত হওয়ার কারণ ছিলো আল্লাহর প্রতি ভীষণ ভয়।
৪১১. হযরত ইয়াযিদ রুক্বাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহ তা'আলার এমন কিছু ফিরিশতা তার পবিত্র আরশের চতুর্দিকে আছেন যাদের চোখ দিয়ে নালার মতো পানি আসছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ডেকে বলেন, আমার ফিরিশতারা! তোমরা আমার নিকটে থেকে এতো ক্রন্দন করছো কেন? কিসের ভয় করছো? তারা জবাব দেন, প্রভু! আপনার ইয্যত ও আযমতের শপথ! আমরা যা জানতে পেরেছি, তা যদি পৃথিবীবাসী জানতো তাহলে, পানাহার করতো না ও বিছানায় আরাম করতো না। গরু-গাধার মতো চিৎকার করে ময়দানে বেরিয়ে পড়তো!

📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 আরো কয়েকজনের অত্যাশ্চর্য ক্রন্দন

📄 আরো কয়েকজনের অত্যাশ্চর্য ক্রন্দন


৪১২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু নামাযে কাঁদতেন। তিন সারি পেছন থেকেও ক্রন্দনের আওয়াজ শোনা যেতো।"
৪১৩. হযরত আলকামা ইবনে ওয়াক্কাস রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুএর পেছনে নামায পড়েছি। তিনি সূরা ইউসুফ পাঠকালে ইউসুফ আলাইহিস-সালামের আলোচনা আসলেই কেঁদে উঠতেন। অনেক সারির পেছন থেকেও কাঁদার শব্দ শোনা যেতো।"
৪১৪. হযরত আবু মামার রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তিলাওয়াত করে সিজদায় গেলেন। মাথা উঠিয়ে বললেন, সিজদা তো হলো- কিন্তু ক্রন্দন আসলো না!"
৪১৫. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুএর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তার সামনে কিছু মাল রাখা ছিলো। তখন বেশ আওয়াজ দিয়ে কাঁদলেন। শরীরের হাড়িউ ও পাঁজরো কম্পন শুরু হলো। এরপর বলেন, আমি তা থেকে মুক্তি চাই!"
৪১৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, উমর ইবনে খাত্তাব আমাকে ডাকলেন। তার কাছে যাই। সামনে ছিলো একগাদা কাপড়। তাতে জড়িয়ে রাখা সোনা-গয়না। আমাকে বললেন, এগুলো নিয়ে যাও। লোকদের মাঝে বন্টন কর। আল্লাহই বেশী অবগত, তিনি তার নবী ও হযরত আবু বকর সিদ্দিক থেকে এগুলো দূরে রেখেছিলেন। জানি না, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার নিকট আসা এসব জিনিস কল্যাণকর না অকল্যাণকর! এরপর বেশ জোরে কাঁদলেন।
৪১৭. হযরত কাতাদাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু শাম দেশে আসলেন। তার জন্য এমন খাবার পাকানো হয় যা ইতোপূর্বে দেখা যায় নি। তিনি বললেন, এগুলো গরীব-নিঃস্ব মুসলিমদের মধ্যে বিলিয়ে দাও!
৪১৮. হযরত আওন ইবনে আবি জুহায়ফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একদল মানুষ উমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুর কাছে এসে অভাব-অনটনের অভিযোগ করলেন। তিনি কেঁদে উঠলেন। দু' হাত উঠিয়ে বললেন, আল্লাহ! আমার হাতে তাদেরকে ধ্বংস করুন না। এরপর তাদের জন্য খাবার প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন।
৪১৯. হযরত জিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আব্দুল আজিজের সাথে এক রাতে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি বললেন, জিয়াদ গল্প বলো! বললাম, আমি তো গল্পকার নই! আবার বললেন, তাহলে কথা বলো! জবাব দিই, জিয়াদের আবার কথা বলার কী আছে? সে যদি জাহান্নামে যায়, কোন জান্নাতী তার উপকার করবে না। আর যদি জান্নাতে যায়, কোন জাহান্নামী ক্ষতি করতেও পারবে না। উমর বললেন, আল্লাহর শপথ! সত্য বলেছো! কথাগুলো বলার সময় তিনি চুলার পাশে ছিলেন। তার চোখের পানিতে চুলার অঙ্গার নিভে যায়।
৪২০. হযরত জিছর ইবনে হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের পাশে বসে কোন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম। তিনি তখন কাঁদতে থাকেন। এমনকি দেখতে পেলাম তাঁর অন্ত্রের মধ্যে রক্তও আছে। আওয়ায়াী ঘটনাটি শুনে মন্তব্য করলেন, তাহলে তো উমর ইবনে আব্দুল আজিজ দাউদ আলাইহিস-সালামের মতো হয়ে গিয়েছিলেন!
৪২১. হযরত মায়মুন ইবনে মেহরান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ সূরা তাকাসুর তিলাওয়াত করলেন। খুব বেশী কাঁদলেন। এরপর বললেন, যে ব্যক্তি কবরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে সে হয় জান্নাতে যাবে, না হয় জাহান্নামে যাবে।
৪২২. হযরত মুকাতিল ইবনে হাইয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজের পেছনে নামায পড়েছি। তিনি যখন এই আয়াতটিতে আসলেন وَقِفُوهُمْ إِنَّهُمْ مَسْئُولُونَ তখন তা বার বার পাঠ করতে লাগলেন। আর যেনো সামনে এগুতে পারছিলেন না। [আয়াতের অর্থ: এবং তাদেরকে থামা, তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে (৩৭:২৪)]।
৪২৩. হযরত আবু ইমরান জাওনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার মা আমাকে বলতেন, তুমি কি এ জায়গায় কালো চিহ্নটি দেখতে পাচ্ছ? এটা তোমার বাবার চোখের পানির চিহ্ন। তাকে বলতাম, আর কতো কাঁদবেন? তিনি জবাব দিতেন, প্রশ্ন করো না। জানি না আমার ফাতেমা কিসের উপর হবে?
৪২৪. হযরত আমবাসা খাওয়াস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসিয়্যা প্রতি রাত 'هَلْ أَتَاكَ حَدِيْثُ الْغَاشِيَةِ' সূরাটি তিলাওয়াত করতেন আর কাঁদতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00