📄 অধিক ক্রন্দনকারীদের হৃদয়াকর্ষক কাহিনী
২৬۱. হযরত যাযাদ ইবনে ওযাহাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহর চোখের পানিতে পাথরের উপর দুটি চিহ্ন পড়তে দেখেছি।
২৬২. হযরত যাযাদ ইবনে ওযাহাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহকে কাঁদতে দেখেছি। তিনি হাত দিয়ে চোখের পানি মুছছিলেন।
২৬৩. হযরত মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যদি কাঁদা আমার নিয়ন্ত্রণাধীন হতো তাহলে গোটা জীবনটাই কেঁদে কাটাতাম। যদি মানুষ আমাকে পাগল না বলতো, তাহলে মাথায় মাটি তুলে রাস্তাঘাট ও গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়াতাম। এ অবস্থায়ই মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন হতো। একথা বলে তিনি অঝোর ধারায় অশ্রু বর্ষণ করে কাঁদতে লাগলেন।
২৬৪. হযরত আফলা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আলীর সাথে হজ্ব আদায় করতে গেলাম। মসজিদে প্রবেশ করে আবেগভরে বাইতুল্লাহর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। জোরে জোরে কাঁদতে লাগলেন। বললাম, হযরত! আশপাশের লোকজন আপনার দিকে তাকাচ্ছে। একটু আস্তে আস্তে কাঁদলে ভালো হতো! তিনি বলেন, আমি কাঁদবো না? আল্লাহ পাক যদি আমার প্রতি একটু করুণার দৃষ্টিতে তাকান তাহলে আমি সফল হবো। এরপর বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করে মাকামে ইব্রাহীমের পেছনে দাঁড়িয়ে নামায শুরু করলেন। সিজদা থেকে ওঠার পর দেখা গেলো, সিজদার জায়গাটুকু চোখের জলে সিক্ত হয়ে গেছে।
২৬৫. হযরত ইয়া'লা ইবনে আসাদাক্ব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান একব্যক্তিকে দেখলেন দীর্ঘ সময় ধরে সিজদায় আছেন। তিনি যখন মাথা উঠালেন, দেখা গেল সিজদার জায়গা অশ্রুতে ভিজে গেছে। আব্দুল মালিক এক ব্যক্তিকে বলে রাখলেন, তাঁর পাশে দাঁড়াও। নামায শেষ হয়ে গেলে তাঁর জ্ঞানের পরীক্ষা নেবে। নামায শেষে তিনি লোকটির নিকট এসে বললেন, আমি তো আপনার মধ্যে জান্নাতের ছবি দেখতে পাচ্ছি। একথা শ্রবণ করামাত্র লোকটি বিকট শব্দে চিৎকার দিলেন। আব্দুল মালিক তা সহ্য করতে পারলেন না- অজ্ঞান হয়ে পড়েন। দীর্ঘক্ষণ পর তাঁর হুঁশ আসলো। তিনি লক্ষ্য করলেন ঐ লোকটি তাঁর চেহারার ঘর্ম মুছেন আর বলছেন, প্রভু! তোমার এ অবাধ্য বান্দাতো ধ্বংস হয়ে গেল। একথা শুনে আব্দুল মালিক আবার কাঁদতে লাগলেন। ঐ আবিদ লোকটি এবার এদিক-সেদিক না তাকিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন।
২৬৬. হযরত হাফস ইবনে গিয়াস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা ইবনে জারিরের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি ক্বিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থার উপর আলোচনা করছিলেন। নিজে কাঁদলেন, উপস্থিত লোকজনও খুব বেশি কাঁদলেন। ওররাদ নামক একব্যক্তি চিৎকার শুরু করলেন। শরীরে কম্পন আসলো। এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। ইবনে জারির কেঁদে কেঁদে বললেন, ওররাদ! আমাদের মধ্যে কেবল তোমার কাছেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা আসলো। জাহান্নাম থেকে মুক্তির বিশ্বাস একমাত্র তোমার হৃদয়েই বিরাজ করছে। লোকজন! আল্লাহ্র শপথ! ওররাদই আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। তাঁর মধ্যে যে ভয় ও আশার অবস্থা আছে, আমাদের সবার মধ্যে তা থাকা চাই। আল্লাহ্র আনুগত্যে আমরা সবাই সমান। কিন্তু আমরা আটকা পড়ে গেছি, আর তিনি এগিয়ে আছেন। আমরা সবাই ওয়াজ শোনলাম, আলোচনা বুঝলাম কিন্তু কারো মধ্যে তাঁর মতো ক্রিয়া সৃষ্টি হলো না। এটাই তাঁর হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতার নিদর্শন। আর আমাদের হৃদয় পাপের আঁধারে আচ্ছন্ন। একথা বলে ইবনে জারির খুব বেশি কাঁদলেন। ক্বুরআন শরীফের এই আয়াতংশ তিলাওয়াত করলেন: إِنْ نَحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ [আমরাও তোমাদের মত মানুষ, কিন্তু আল্লাহ বান্দাদের মধ্য থেকে যার উপরে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন (১৪:১১)]। হাফস বলেন, আমি ওররাদকে দেখতাম মাথা ঢেকে মসজিদে আসতেন। এক কোণে বসে নামাজ পড়তেন, দু’আ করতেন আর প্রাণ খুলে আল্লাহর দরবারে কাঁদতেন। তারপর বেরিয়ে যেতেন। আবার যুহরের সময় আসতেন। অনুরূপ নামাজ-দু'আয় সময় কাটাতেন। ইশা পর্যন্ত একইভাবে ইবাদতে মশগুল থাকতেন। কারো সাথে কথা বলতেন না। কারো নিকটে বসতেনও না। আমি তাঁর আখলাক ও বৈশিষ্ট্যে প্রভাবিত হলাম। এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি কে? জবাব দিলেন, তুমি যার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো তিনি তো ওররাদ আজালী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। যিনি আল্লাহর সাথে এই প্রতিজ্ঞা করেছেন, যে পর্যন্ত না তিনি প্রভুর চেহারা দেখবেন সে পর্যন্ত তিনি হাসবেন না।
২৬৭. হযরত সাকিন ইবনে মাকিন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ওররাদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। তাঁর ছোট বোনকে জিজ্ঞেস করি, ওররাদ কিভাবে রাত্রি যাপন করতেন। বললেন, ক্রন্দন আর আহাজারি করে। জিজ্ঞেস করলাম, রাতের কোন অংশে? জবাব দিলেন, রাতের প্রথম ও শেষ তৃতীয়াংশে। জানতে চাইলাম, তিনি পাঠ করতেন এমন কোন দু'আ কি আপনার মুখস্থ আছে? উত্তর দিলেন, সুবহে সাদিকের প্রাক্কালে তিনি সিজদা করতেন। কেঁদে কেঁদে বলতেন, মাওলা! তোমার বান্দা আনুগত্যের মাধ্যমে সান্নিধ্য কামনা করছে। করুণাময়! স্বীয় তাওহিদ দিয়ে তাকে সাহায্য করো। মাওলা! এই অধম বান্দা তোমার ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকতে চায়। করুণাময়! করুণা দ্বারা তাকে সাহায্য করো। মাওলা! বান্দা তোমার কল্যাণের ভীষণ প্রত্যাশী। যেদিন সফলকাম লোকেরা কল্যাণ লাভ করে আনন্দবোধ করবে, সেদিন তোমার এ বান্দার প্রত্যাশাটুকু ভেঙে দিও না- নিরাশ করো না। এভাবে দু'আ করতে করতে সকাল সন্ধ্যা শুধু কাঁদতেন। কঠোর সাধনা হেতু বেশ দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁর চেহারার রং বদলে যায়।
২৬৮. হযরত সাক্বিব ইবনে মাকিন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ওরাদা আজালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন মৃত্যুবরণ করলেন, লোকজন তাঁকে দাফন করতে কবরের পাশে নিয়ে গেল। কবর থেকে যে কী অপূর্ব ঘ্রাণ! সুশোভিত হলো চতুর্দিক। যারা কবরে দাফন করার জন্য নেমেছিল তারা ঘ্রাণযুক্ত মাটি নিয়ে আসলো। কবরস্থ করার পর দীর্ঘ সত্তর দিন পর্যন্ত এই ঘ্রাণটি স্থায়ী ছিলো। সকাল-সন্ধ্যা লোকজন তাঁর সমাধিতে আসতেই থাকে- দিন দিন জিয়ারতকারীদের সংখ্যা বাড়তে আছে। তখন শাসক আশঙ্কা করলেন, লোকজন ফিতনায় পতিত হবে। তিনি এক লোককে ঘ্রাণযুক্ত মাটি আনার জন্য পাঠালেন। শাসক এই অপূর্ব সুগন্ধি উপভোগ করলেন। এরপর তিনি লোকজনকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। এ ঘটনার পর কবর থেকে সুঘ্রাণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
২৬৯. হযরত মিকওয়্যাল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার কাছে বুরাইহম আসলেন। বললেন, তোমার কোন প্রতিবেশী বা কোন ভাই আছে কি যে আমার সঙ্গে সন্তুষ্টচিত্তে হজ্ব গমন করবে? জবাব দিই, হ্যাঁ, আছেন। তখন আমি এক মুত্তাকী লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। আলোচনা করে হজ্ব গমনের জন্য তারা উভয়েই রাজি হলেন। এরপর বুরাইহম বাড়িতে চলে যান। পরদিন ঐ লোকটি আমার কাছে আসলো, বললো, আমি যেতে পারবো না, অন্য কোন সাথী খুঁজে দেখুন। আমি বললাম, সর্বনাশ! কী বলছো? আল্লাহর শপথ! কুফা নগরীতে তাঁর মতো সচ্চরিত্রবান আর কাউকে দেখি নি। তাঁর সঙ্গে আমি সমুদ্র ভ্রমণ গিয়েছি। তিনি শুধু কল্যাণকর কাজই করতেন ও দীর্ঘসময় নিরলসভাবে কাঁদতেন। তাঁর ক্রন্দন আমাদের ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করে দিতো। একথা শোনে লোকটি বললো, সর্বনাশ! ক্রন্দন তো বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হয়। হৃদয় যখন নরম হয় তখনই তো চোখে পানি আসে। আমি বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু তাঁর বেলায় ব্যতিক্রম আছে। তিনি খুব বেশি কাঁদেন। এবার লোকটি বললেন, আমি তাঁর সাথে হজ্ব যাবো। তাঁর দ্বারা উপকৃত হবো। আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করবো।
পরদিন তাঁরা উঠে বেরিয়ে পড়লেন। উটে আরোহণ করলেন। বুহাইম যখন আরোহণ করলেন, তখন হাত দাঁড়ির নীচে রাখলেন। তাঁর গাল বেয়ে চোখের পানি পড়ছিলো, দাঁড়ি ভিজে গেছে, বুক ভাসছে। আল্লাহর শপথ! অঙ্গজলে জমিনও সিক্ত হয়েছে। তাঁর সফর সাথী আমার বন্ধু বললেন, মিকওয়াল! তিনি তো ক্রন্দন শুরু করে দিয়েছেন। আমার ভ্রমণসঙ্গী হবেন কিভাবে? বললাম, যাও! চলতে থাকো। পরিবার পরিজনের বিরহে তিনি কাঁদছেন। বুহাইম আমার কথা শোনলেন, বললেন, আল্লাহর শপথ! ভাই বিষয়টি এরূপ নয়। এ মুহূর্তে ইহ-পরকালের ভ্রমণের কথা স্মরণ হয়ে গেছে। এরপর আরো জোরে কাঁদতে লাগলেন। সাথী বললেন, মিকওয়াল! এটাই হলো তোমার সঙ্গে আমার প্রথম শত্রুতা! বুহাইমের সাথে আমার কী সম্পর্ক হতে পারে? তাঁর জন্য উচিৎ হলো, জাউওয়ান ইবনে উলবা, দাউদ তায়ী, সালাম আবিল আহওয়াস (রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম) এর সাথে সফর করা। তাঁরা পরস্পরে মিলে কাঁদবেন ও এক সাথে মৃত্যুবরণ করবেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাঁদের সাথে চলতে থাকি আর বলি, সর্বনাশ! বন্ধু! তিনি তোমার এক উত্তম সাথী। তিনি হজ্ব দীর্ঘদিন থাকেন। একজন সৎ লোক। উদার মনের ব্যবসায়ী। সাথী জবাব দিলেন, হ্যাঁ- তাঁর সাথে আমার এই ব্যাপারটি প্রথম। এতে হয়তো কল্যাণ নিহিত আছে। আমরা উভয়ের এসব কথাবার্তা বুহাইমের কানে যায় নি। যদি যেতো তাহলে হয়তো তাঁকে সাথে নিতেন না। অতঃপর তাঁরা দু'জন সফরে একসাথে চলে গেলেন। পবিত্র হজ্ব আদায় করলেন। এরপর বাড়িতে ফিরে আসলেন। তাঁদের মধ্যে তৈরী হলো গভীর ভ্রাতৃত্ব বন্ধন।
আমি প্রতিবেশী বন্ধুটির সাথে সাক্ষাৎ করলাম। সালাম জানালাম। বললেন, ভাই! আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দিন। সমাজে এখনো হয়তো আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতো মানুষ জীবিত আছেন! তুলনামূলক আমি ধনী, তিনি গরীব। অথচ তিনি আমার জন্য ব্যয় করেছেন। আমি যুবক, তিনি বৃদ্ধ- অথচ তিনি আমার সেবায় লেগে যেতেন। তিনি রোযাদার- আমি রোযা রাখি নি। তথাপি তিনি খাবার পাক করতেন আমার জন্য। আমি (বর্ণনাকারী) তখন জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কেন তাঁর সঙ্গে ভ্রমণ করতে নিরুৎসাহ ছিলে? তিনি বললেন, অধিক ক্রন্দনের কারণে আমি ভয় পেয়েছিলাম। তাছাড়া সফরে অন্যান্য লোকদের অসুবিধা হবে– তাও আশঙ্কা করেছি।
পরে আসলাম বুহাইমের কাছে। সালাম জানালাম। জিজ্ঞেস করলাম, সাথীকে কেমন লাগলো? জবাব দিলেন, বেশ উত্তম বন্ধু। বেশী করে তিনি আল্লাহর জিকির করেছেন, দীর্ঘ সময় তিলাওয়াত করেন, দ্রুত চোখ বেয়ে অশ্রু বেরিয়ে আসে। তাঁকে তুমি আমার সাথে দিয়েছ, আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
২৭১. হযরত মুআজ ইবনে জিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবাদান শহরে কিছু আবিদ থাকতেন। তাঁদের মধ্যে বুহাইম নামক একজন ছিলেন। তিনি খেজুর গাছের নীচে বসে নামায পড়তেন। দীর্ঘ সময় বসে থাকতেন। খুব বেশী চিন্তামগ্ন দেখাতো। ফুঁসিয়ে ফুঁসিয়ে কাঁদতেন। তাঁর ক্রন্দনের আওয়াজ শুনা যেতো। শরীরে মশা-মাছি বসার কারণে কষ্ট পেলে বলতেন, বুহাইম! তোমার মধ্যে মশা-মাছির অনুভব বিদ্যমান- মৃত্যুর খবর কি আছে?
২৭১. হযরত মুআফ্ফিয়া ইবনে আমর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বুহাইম দীর্ঘকায় বাদামী রংয়ের ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে সব সময় চিন্তামগ্ন দেখা যেতো।
২৭১. হযরত আবদুর রহমান ইবনে জিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা ইবনে ইয়াসার, সুলায়মান ইবনে ইয়াসার এবং তাঁদের বন্ধুরা হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে মদীনা শরীফ থেকে বেরিয়ে পড়লেন। আবওয়ায়ে এসে যাত্রাবিরতি করেন। সুলায়মান ও তাঁর বন্ধুরা কোন এক প্রয়োজনে বেরিয়ে যান। এদিকে আতা ইবনে ইয়াসার সে স্থানে একা একা নামায পড়তে লাগলেন। এসময় এক সুন্দরী আরবী মহিলা তাঁর নিকটে আসলেন। আতা ভাবলেন, হয়তো তিনি কোন প্রয়োজনে এসেছেন, তাই নামায সংক্ষেপ করলেন। মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কোন প্রয়োজন আছে? মহিলা জবাব দেন, হ্যাঁ। আমি আপনার সাথে মিলিত হতে চাই! তিনি বললেন, দূর হও এখান থেকে! তুমি আমাকে ও নিজেকে জাহান্নামের আগুনে জ্বালাতে চাও। বুঝতে পারলেন মহিলাটি তাঁকে উত্তেজিত করতে চেষ্টা করছে। তাই কাঁদতে শুরু করলেন। বললেন, আমার কাছ থেকে দূর হও! দূর হও! ক্রন্দন বেড়ে গেল। এবার মহিলাটি নিজেও কাঁদতে লাগলো। সুতরাং উভয়ের ক্রন্দন শুরু। এমন সময় সুলায়মান এসে উপস্থিত। উভয়কে কাঁদতে দেখে তিনিও নীরব থাকেন নি। এক কোণে বসে কাঁদতে লাগলেন। জানতেন না, কিসের জন্য আতা ও মহিলা কাঁদছিলেন।
এভাবে সাথীদের একেকজন সেখানে আসেন আর কাঁদতে থাকেন। কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করেন না, কিসের কারণে এ ক্রন্দন। ক্রন্দনের রোল পড়ে যাওয়ার পর মহিলাটি সে স্থান ত্যাগ করলো। লোকজন একে একে উঠে পড়লেন। আতা বয়সে সুলায়মান থেকে বড়। মহিলা সম্পর্কে তিনি আতাকে কোন প্রশ্নই করলেন না। কোন এক প্রয়োজনে উভয় তাই মিশর ভ্রমণে গেলেন। দীর্ঘদিন মিশরে থাকলেন। একদিন ঘুমের মধ্যে আতা কেঁদে উঠলেন। সুলায়মান জিজ্ঞেস করলেন, ভাই! কাঁদছেন কেন? আতা আরো কাঁদতে লাগলেন। পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ভাইজান! কেন কাঁদছেন? আতা জবাব দিলেন, আজ রাত একটি স্বপ্ন দেখেছি। যতদিন বেঁচে থাকবে কাউকে এই স্বপ্নের কথা বলবে না। আমি দেখলাম, হযরত ইউসুফ আলাইহিস-সালামকে। তাঁর সৌন্দর্যের প্রতি আমি তাকিয়ে থাকি। কেঁদে উঠি। অধিক মানুষের সমাগমে তিনি আমার দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, কাঁদছো কেনো? জবাব দিলাম, আপনার উপর আমার মা-বাবা কুরবান হোন। আপনার ও আজিজের স্ত্রীর কথা আমার স্মরণ হয়ে গেছে। এই মহিলার কারণে আপনি কষ্টভোগ করেছেন, কারাবরণ করেছেন। বৃদ্ধ পিতা ইয়াকুব আলাইহিস-সালামের বিরহ সহ্য করেছেন। এজন্য আশ্চর্য বোধ করছি আর কাঁদছি। একথা শোনে ইউসুফ আলাইহিস-সালাম বললেন, আবওয়ায় একজন পুরুষ ও মহিলার মধ্যে যে ঘটনা ঘটেছিল, তা থেকে কি তোমার বিস্ময়বোধ হয় না? তখন বুঝতে সক্ষম হলাম, তিনি কি বলতে চাচ্ছেন। আমি কাঁদতে শুরু করলাম এবং এ অবস্থায়ই ঘুম ভেঙে গেল। সুলায়মান এবার জিজ্ঞেস করলেন, ঐ মহিলার ঘটনাটি কী ছিল? আতা তখন ঘটনাটি আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই ঘটনার কথা আর কাউকে বলেন নি। আতার ইন্তিকালের পর সুলায়মান এই ঘটনাটি তার ঘরের একজন মহিলার নিকট বর্ণনা করেছিলেন। সুলায়মানের মৃত্যুর পর মদিনায় ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে।
২.৭৩. হযরত ইবরাহীম বিন সুবহ বারবারাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা মুগীরা আবু মুহাম্মাদের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি যখন কথা বলতেন, নিজে কাঁদতেন মানুষকেও কাঁদাতেন। তিনি বলেন, ভাইসব কাঁদো! চোখ ও হৃদয়কে কাঁড়াও! আজকে যে ব্যক্তি নিশ্চিত কাল সে আনন্দিত থাকবে। যে আজকে কাঁদবে আগামীকাল সে হাসবে। আজকে যে আতঙ্কিত থাকবে আগামীকাল সে নিরাপদ থাকবে। আজ যে ক্ষুধার্থ আগামীকাল সে পরিতৃপ্ত থাকবে। আজকের পিপাসা-কাতর ব্যক্তি আগামীকাল পরিতৃপ্ত থাকবে আল্লাহর কাছে। সুতরাং তোমরা কল্যাণ অবলম্বন করো। হিংসা করো না, নতুবা ধ্বংস হয়ে যাবে। একথা বলে তিনি কাঁদতে থাকেন আর শ্রোতারাও কাঁদতে শুরু করেন।
২.৭১. হযরত বকর ইবনে মূসাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা আবু মুহাম্মাদ মুগীরার সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি মসজিদে কিবলামুখী হয়ে বসে আছেন। দাড়ি বেয়ে চোখের পানি ঝরছে। সালাম জানিয়ে বললাম, আল্লাহ আপনার উপর করুণা বর্ষণ করুন! কি জন্য এতো বেশী কাঁদছেন। জবাব দিলেন, দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশিত নিকটবর্তী রাতের জন্য। জানি না সে রাতে আমার অবস্থা কী হবে। এটুকু বলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
২.৭২. হযরত ইবনে সিমাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি ইবনে জারকে রাতের প্রথম থেকে শেষাহ্ন পর্যন্ত শুধু কাঁদতেহি দেখি। কাবা শরীফের গিলাফে ধরে বলছেন, হে প্রভু! আমার আরোহীকে তোমার অভিমুখী। করেছে। মরুভূমির দূরত্ব তোমার জন্য অতিক্রম করে এসেছি। তোমার করুণা ও বিনিময় লাভের প্রত্যাশায় তোমার দরবারে এসে পড়ে আছি। একথা বলে তিনি সকাল পর্যন্ত কাঁদতে থাকেন।
২৭৬. হযরত আমার ইবনে উসমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা বাহরাম আজালীকে বলতে শুনেছি, হে মাবুদ! তোমার সম্মানের শপথ! তোমার জন্য যারা কেঁদেছে তাঁদেরকে তুমি করুণা থেকে ব্যর্থ করো না। তোমার বন্ধুরা তো তোমার প্রতি সুধারণা পোষণ করে। তোমার জন্য তাঁদের প্রত্যাশা খুবই বিশাল। একথা বলে তিনি কাঁদতে থাকেন। চোখের পানিতে ভিজে যায় দাড়ি।
২৭৭. হযরত জায়েদ হামারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা আবদুর রাহমান মাগাফিলীর পাশে ছিলাম। তিনি কথা বলছিলেন। এক ব্যক্তি কেঁদে উঠলেন। তিনি বললেন, তাঁকে ছেড়ে দাও। ক্রন্দন আর তাওবাহ ছাড়া পাপীদের আর কী করার আছে?
২৭৮. হযরত মুজর আর সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দনরত লোকের কাঁদন দ্বারা আমি যে স্বাদ পাই, তা আর কোন কিছুতেই পাই না।
২৭৯. হযরত উকায়বা ইবনে ফুজালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু উবায়দা খাওয়াস বৃদ্ধ বয়সে দাড়িতে হাত রেখে বলতেন, প্রভু! বৃদ্ধ হয়ে গেছি। আমাকে মুক্তি দাও। এরপর তিনি শুধু কাঁদেন।
২৮০. হযরত মুলি ওররাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকটে ছিলাম। তিনি কথা বলছিলেন। তখন আবু উবায়দা খাওয়াস তাঁর কাছে আসলেন। তিনি থলে থেকে একটি রশি বের করলেন। রশির একাংশ নিজের ঘাড়ে আর অপর অংশ মালিকের ঘাড়ে রাখলেন। এরপর বললেন, মালিক! মনে করো আমি আল্লাহর সামনে হাজির। একথা শোনার পর উপস্থিত সমস্ত লোক কাঁদতে শুরু করলেন।
২৮১. হযরত ইসহাক ইবনে ইবরাহীম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মূসা খাইয়াতো ক্রন্দন করে করে একদম নির্বাক হয়ে যেতেন। মাটিতে পড়ে নিজেকে বলতেন, দীর্ঘ ক্রন্দনের আগে কাঁদো। দুর্ভাগ্যবরণের পূর্বে কাঁদো। আল্লাহর শপথ! কাঁদতে থাকো।
২৮২. হযরত ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ মূসা খাইয়াতের পাশে বসতেন। মূসা কেবল নিজের জন্য কাঁদতেন। বলতেন, আমাকে কাফনের কাপড় পরিয়ে দাও! কবরে নিয়ে আমাকে দাফন করো! ইবরাহীম বলেন, আমাকে তিনি যখন দেখে ফেলতেন নীরব হয়ে যেতেন।
২৮৩. হযরত মালিক ইবনে যায়গাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাকিম ইবনে নূহ আমাকে বলেন, তোমার বাবা রাতের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু কাঁদতেন। সমুদ্র ভ্রমণে আমরা তাঁর সাথে ছিলাম। না একটি সিজদা দিলেন বা কোন রুকু করলেন। সকালে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আবূ মালিক! রাত তো দীর্ঘ ছিলো। কিন্তু আপনি তো নামায পড়লে না দু'আও করলে না। তিনি কাঁদতে লাগলেন। এরপর বলেন, মানুষ যদি জানতো আগামীকাল কী হবে, তাহলে তারা আরাম আয়েশের স্বাদ ছেড়ে দিতো। আল্লাহর শপথ! যখন রাত হয় তখন রাতের আলো, পরিবেশ, নিস্তব্ধতা ও ভয়াবহতার কথা আমার স্মরণ হয়ে যায়। সেদিনের কথা আমি স্মরণ করি, যেদিন বাবা তার সন্তানকে কোন উপকার করতে পারবে না। সন্তানও বাবাকে কোন সাহায্য করতে পারবে না। একথা বলে তিনি চিৎকার করে অস্থির হয়ে যান। সাথীরা আমাকে বললো, তুমি কেন তাঁকে উত্তেজিত করো? এরপর থেকে আমি তাঁর সাথে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম না। তিনি যখন কিছু জিজ্ঞেস করতেন আমি শুধু উত্তর দিতাম।
২৮৪. হযরত সালামা ইবনে সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আলা ইবনে যিয়াদ স্বপ্নে দেখলেন, তিনি জান্নাতের অধিবাসী। তখন লাগাতার তিনদিন কাঁদতে থাকেন, ঘুম ত্যাগ করেন, খাবারের স্বাদ থেকে বিরত থাকেন। হাসান তাঁর কাছে এসে বললেন, ভাই! জান্নাতের সংবাদ পেয়ে নিজেকে মেরে ফেলবেন? একথা শোনে আরো বেশী কাঁদেন। তিনি রোযাদার ছিলেন। হাসান সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর সাথে অবস্থান করে ইফতারের সময় খাবার গ্রহণ করেন।
২৮৫. হযরত আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আলা ইবনে যিয়াদের কাছে এক ব্যক্তি আসলেন। তিনি বললেন, আমি স্বপ্নে দেখি, এক ব্যক্তি আমাকে বলছেন তুমি আলা ইবনে যিয়াদের কাছে যাও। তাঁকে বলো, আর কতো কাঁদবে? তোমার গুনাহ তো ক্ষমা করা হয়েছে। একথা শোনে তিনি আরো কাঁদলেন। এরপর বললেন, তাহলে তো আমি আর কখনো কাঁদা থামাবো না।
২৮৬. হযরত হারিস ইবনে উবায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়দ মালিক ইবনে দীনারের মজলিসে বসতেন। আমি মালিকের উপদেশ কিছুই বুঝতে পারতাম না শুধুমাত্র আবদুল ওয়াহিদের ক্রন্দনের কারণে।
২৮৭. হযরত আবদুল আজিজ ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মিসমা আমার বাবার কাছে আসতেন। তাঁরা দু’জন একত্র হয়ে কেবল কাঁদতেন।
২৮৮. হযরত আবদুল আজিজ ইবনে সালমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এবং আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়দ মালিক ইবনে দীনারের কাছে গেলাম। দেখি তিনি মজলিস থেকে উঠে চলে গেছেন। দরোজা বন্ধ। আমরা সাক্ষাতের অপেক্ষায় বসে পড়লাম। উদ্দেশ্য ছিলো, কোন কথা তিনি বলছেন কি না তা জানতো। যদি বলেন, তাহলে আমরা তাঁর সাক্ষাতের অনুমতি চাইবো। কিন্তু এমনভাবে কি যেনো বলছিলেন, আমাদের বোধগম্য হচ্ছিলো না। এরপর জোরে জোরে কাঁদেন ও শ্বাস ছাড়েন। অজ্ঞান হয়ে যান। আবদুল ওয়াহিদ আমাকে বললেন, আমরা চলে যাই। উনি তো নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত!
২৮৯. হযরত আবু উমার খাত্তাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রীতদাস উবরা খুব বেশী কাঁদতেন। চোখের পানিতে হাতের মুঠি ভরে যেতো। ঐ পানি দিয়ে মুখমণ্ডল ও গর্দান ধুতেন। তিনি বলতেন, হে মা'বূদ! হে সরদার! হিসাব দিবসে আমাকে অপদস্থ করো না। যখন আযান শুনতেন, কাঁদতেন।
২৯০. হযরত ফজল ইবনে দাকিন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান ইবনে সালেহ যখন কোন জানাযা দেখতেন চোখের পানিতে তারোচ্ছা হয়ে যেতো। তিনি যখন অসুস্থ, আমরা দেখতে গেলাম। তিনি কাঁদছিলেন। চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে গেছে।
২৯۱. হযরত হারুন ইবনে আবি শায়বা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার চাচা হাসান ইবনে সালেহের সাথে খুব বেশী ওঠাবসা করতেন। ফযরের পর তাকে বলতে শুনেছেন, আহা! বিপদের পর বিপদ। বিপদ যদি একটা হতো তাহলে হয়তো পার পাওয়া যেতো। কিন্তু বিপদের তো কোন শেষ নেই। এটুকু বলে দীর্ঘ সময় নির্বাক থাকতেন।
২৯২. হযরত খালিদ ইবনে সাকার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার বাবা ছিলেন সুফিয়ান সওরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বিশেষ পরিচিত ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমি সুফিয়ান সওরী'র সাথে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলাম। একজন মহিলা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমি ঘরে ঢুকে শোনলাম তিনি এই আয়াতটি,
أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ ۚ بَلَىٰ وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ
তিলাওয়াত করছেন। এরপর বললেন, হ্যাঁ আমার প্রভু! হ্যাঁ। ঘরের ছাদের দিকে তাকালেন। চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। আমি দীর্ঘ সময় বসে রইলাম। এরপর হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন, পাশে বসলেন। এরপর বললেন, তুমি যে কখন আসলে আমি বুঝতে পারি নি।
[আয়াতের অর্থ: তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও গোপন পরামর্শ শুনি না? হ্যাঁ শুনি, আমার ফেরেস্তাগণ তাদের নিকট থেকে লিপিবদ্ধ করে। (৪৩:৮০)]
২৮৩. হযরত ইয়াহহাক ইবনে মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হিশাম ইবনে হাস্সানকে দেখেছি যখনই জান্নাত বা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা আলোচনা করতেন তার চোখ দিয়ে পানি ভেসে পড়তো। অনুরূপ ইবনে আওনকে দেখেছি, তার চোখদ্বয় অশ্রুতে টলমল করছে।
২৮৪. হযরত হাম্মাদ ইবনে জায়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাবিত বুনানীকে দেখেছি যখন কাঁদতেন তখন তাঁর পাঁজরও কাঁপতো।
২৮৫. হযরত মাতার ওয়ারাফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হারাম ইবনে হাইয়ান হাম্মামের কাছে রাত্রিয়াপন করলেন। হাম্মাম সকাল পর্যন্ত কাঁদলেন। ভোরে হারাম জিজ্ঞেস করলেন, ভাই! সারারাত কাঁদলেন কেনো? জবাব দিলেন, সে রাতের কথা ভাবছিলাম, যে রাত্রে গ্রহ-নক্ষত্র টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। হাম্মাম একদা হারামের নিকট রাত্রি যাপন করেন। হারাম সারারাত কাঁদলেন। সকালে হাম্মাম প্রশ্ন করলেন, ভাই! গত রাত কেন কাঁদলেন? জবাব দিলেন, সেদিনের কথা আমার মনে পড়ে গিয়েছিল যেদিন মানুষ কবর থেকে উঠে জমায়েত হবে। সকাল-বিকাল যখনই তাঁরা একত্রিত হতেন কামারের দোকানে চলে যেতেন। কামারের বাতাস দেওয়ার ব্যাগ দেখতেন এবং বসে বসে কাঁদতেন। আল্লাহর দরবারে জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় চাইতেন। এরপর চলে যেতেন আতরের দোকানে। সেখানে গিয়ে আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইতেন। দু’আ করে সময় কাটাতেন। এরপর যাবতীয় গন্তব্যস্থলে ফিরে যেতেন।
২৮৬. হযরত আসিম রুক্বাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আওয়ায়ান এবং হাম্মাম আমির ইবনে আবদুল্লাহর কাছে গেলেন। তার দরোজা বন্ধ। ঘরের ভেতর থেকে ক্রন্দনের আওয়াজ আসছে। শোনে তারাও কাঁদতে লাগলেন। এরপর অনুমতি পেয়ে ঘরে গেলেন। তাদের চেহারায় ক্রন্দনের চিহ্ন দেখে আমির প্রশ্ন করেন, আপনারা কেনো কাঁদলেন? জবাব দেন, আপনার কান্না শোনে। তিনি বললেন, ক্রন্দনের কারণ বলছি। আমি সে রাতের কথা স্মরণ করছি, যে রাতের পর থেকেই শুরু হবে কিয়ামত-দিবস।
২৯৭. হযরত মালিক ইবনে মিগওয়াল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি ইবনে কায়েস রাস্তায় বসে কাঁদছেন। একব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদছেন কেনো? জবাব দিলেন, কাঁদছি সে রাতের কথা স্মরণ করে যার সকাল দিয়ে হবে কিয়ামত দিবসের শুরু। সকালে তিনি রাস্তায় বেরিয়ে যেতেন। ডানে-বামে থাকতো অনেক লোক। বলতেন, প্রতিপালক! লোকজন স্ব-স্ব প্রয়োজন সমাধানে সকাল বেলা বেরিয়েছে। আমিও তোর বেলা বেরিয়ে মাগফিরাত কামনা করছি আপনার দরবারে।
২৯৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কাসির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজকে প্রশ্ন করা হলো, আপনার মধ্যে আল্লাহর প্রতি তাওয়াজ্জুহ কিভাবে সৃষ্টি হলো? জবাব দিলেন, এক ক্রীতদাসকে প্রহার করছিলাম। সে বললো, উমর! সে রাতের কথা স্মরণ করুন, যে রাতের পরই শুরু কিয়ামতের দিনের।
২৯৯. হযরত আওযায়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ আদি ইবনে আতার কাছে চিঠি লিখলেন; হামদ ও সালাতের পর, তোমাকে সে রাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যা অতিবাহিত হওয়ার পরই কিয়ামতের সূচনা। আফসোস! সে রাত ও সে সকাল কাফিরদের জন্য বড়োই কঠিন।
৩০০. হযরত জুনায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রজব মাসে কোন একদিন হাসান রাহিমাহুল্লাহ মসজিদে ছিলেন। হাতে একটি পানির পাত্র। এ থেকে মাটিতে কুলি করছিলেন। বার বার দীর্ঘ শ্বাস ছাড়েন ও ক্রন্দন করেন। ঘাড় কাঁপতে থাকে। এরপর বলেন, আহ! যদি হৃদয় জীবন্ত থাকতো, অন্তর পরিশুদ্ধ থাকতো, তাহলে সে রাতের ভয়ে নিজেকে কাঁদাতাম যার সকাল দিয়ে হবে কিয়ামত দিবসের শুরু। মানুষ সেদিনের কথা শোনছে না যেদিন পাপ উন্মোচন হয়ে যাবে। কোন চোখ না কেঁদে পারবে না।
📄 আদম আলাইহিস সালাম কাঁদলেন যেভাবে
৩০১. হযরত উবাই ইবনে কা'ব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আদম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর গাছের মত লম্বা ছিলেন। তার দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। কেশ ছিল লম্বা। তিনি যখন ভুল করে ফেলেন তখন বিবস্ত্র হয়ে যান। জান্নাতে পলায়নপর হয়ে দৌড় দেন। একটি গাছের পাশে এসে দাঁড়ান। আল্লাহ বললেন আদম! কি আমার কাছ থেকে পালাচ্ছ? জবাব দেন, না হে প্রতিপালক। আমার ভুলের জন্য বেশ লজ্জাবোধ করছি। আল্লাহ তখন তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। যখন মৃত্যু ঘনিয়ে আসল আল্লাহ জান্নাতের কাফন ও সুগন্ধি দিয়ে ফিরিশতা পাঠালেন। হাওয়া যখন ফিরিশতাদের দেখলেন তিনিও তাদের পেছনে আসতে চাইলেন। তখন আদম বললেন আল্লাহর দূতের সাথে আমাকে একা থাকতে দাও। তোমার কারণেই আমি এত কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি। অতঃপর ফিরিশতারা তাঁকে বরই গাছের পাতা মিশিয়ে পানি দিয়ে গোসল করান, বেজোড় সংখ্যানুসারে। এভাবে বেজোড় কাপড় পরান। কবর খনন করে সেখানে তাঁকে দাফন করেন। ফিরিশতারা বলেন, এটাই হলো আদম সন্তানদের কাফন দাফনের পদ্ধতি।
৩০২. হযরত উসমান ইবনে সা'দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বললাম আদম আলাইহিস-সালামের নামাজে ফিরিশতাগণ ক'টি তাকবির দিয়েছিলেন? বললেন, চার তাকবির।
৩০৩. হযরত উবাই রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আদমের জন্য কবর খনন করা হয়েছিল।
৩০৪. হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আদম আলাইহিস-সালাম যখন নিষিদ্ধ গাছের ফল খেলেন, আল্লাহ বললেন, তুমি কেন আমার অবাধ্যতা করলে? জবাব দেন, হাওয়াই আমাকে এ কাজের প্ররোচনা দেন। আল্লাহ বলেন, হ্যাঁ, আমি এজন্য তাদের গর্ভপাত ও গর্ভধারণের সময় কষ্ট বাধ্য করে দিয়েছি। প্রতি মাসে দু'বার তাদের রক্তপাত হবে। হাওয়া যখন এ কথাটি জানলেন, জোরে জোরে কাঁদলেন। আল্লাহ বললেন তোমার মেয়েরাও এভাবে কাঁদবে।
৩০৬. হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জান্নাতে আদম ও হাওয়ার পোশাক ছিল নখের মত সাদা ও স্বচ্ছ। কিন্তু তাঁরা যখন ভুল করেন, এ কাপড় ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পর থেকে এর স্মরণ স্বরূপ তাঁরা হাত পায়ের নখ কাটতেন।
৩০৭. হযরত নয়র ইবনে ইসমাঈল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলা বলেন, আদম! তুমি কি আমার অবাধ্যতা করেছ, আর ইবলিশের আনুগত্য করেছ? জবাব দিলেন, প্রভু! সে আপনার নামে শপথ করে বলেছিল, সে নাকি আমার হিতৈষী। আমার বিশ্বাস ছিল আপনার নামে শপথ করে কেউ মিথ্যা কথা বলে না।
৩০৮. হযরত হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জান্নাত থেকে আদম আলাইহিস-সালাম বের হওয়ার পর তিনশত বৎসর কাঁদলেন। চোখের পানিতে নালা বয়ে গিয়েছিল।
৩০৯. হযরত ইবনে ছাবিত রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, গোটা বিশ্বাসীর চোখের পানি একত্র করলেও আদমের চোখের পানির সমান হবে না।
৩১০. হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জান্নাত থেকে আদম বের হওয়ার সময় একটি পাথর বয়ে এনেছিলেন। এটা দিয়ে চোখের পানি মুছতেন। জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর গোটা জীবন তিনি ক্রন্দন করেছিলেন।
৩১১. হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর তিনশত বৎসর পর্যন্ত আদম আলাইহিস- সালাম কাঁদতে থাকেন। চোখের পানি বন্ধ হত না।
৩১১. হযরত ওহাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর তিনশত বৎসর কাঁদলেন। ভুল করার পর আকাশের দিকে মাথা তুলে তাকান নি।
৩১২. হযরত আবদুর রহমান ইবনে জায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস-সালাম ভুলের কারণে শত বৎসর কাঁদলেন। লজ্জার কারণে আকাশের দিকে মাথা উত্তোলন করেন নি।
৩১৩. হযরত ইয়াযীদ রুক্বাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস-সালাম জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর তিনশত বৎসর কাঁদলেন। চোখের পানি শুকায় নি। তাঁর এক সন্তান বললেন, আপনি অধিক ক্রন্দন করে জমিনবাসীকে কষ্ট দিচ্ছেন। তিনি বলেন, কাঁদছি এজন্য, আরশের চতুর্দিবকের ফিরিশতাদের ধ্বনি আমি শুনতে পাই।
৩১৪. হযরত ইয়াযীদ রুক্বাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জান্নাতের জন্য আদম আলাইহিস-সালাম দীর্ঘদিন কাঁদলেন। তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে জবাব দিতেন, আমি প্রচুর দুর্গন্ধময় পরিবেশ ভাবি আর কাঁদি। সেখানকার মাটি খুবই পবিত্র। ফিরিশতাদের আলাপ-আলোচনায় কেবল সেখানে শুনা যায়।
৩১৫. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে মুনকাদির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর আদম পৃথিবীতে চল্লিশ বৎসর ছিলেন, তাঁর চোখ কখনও শুকায় নি। হাওয়া আলাইহাস-সালাম বললেন, ফিরিশতাদের কথাবার্তা আমাদের নিকট প্রায় অজানা হয়ে গেছে। প্রভুর কাছে ফরিয়াদ করুন, আমরা যেনো তাঁদের কথা-বার্তা শুনতে পারি। আদম জবাব দিলেন, আমার ভুলের কারণে লজ্জাবোধ হয় প্রভুর সামনে কিভাবে আকাশের দিকে মাথা তুলি।
৩১৬. হযরত হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস-সালাম জান্নাত থেকে বের হলেন। তিনশত বৎসর কাঁদলেন। আকাশের দিকে মাথা তুলেন নি। স্ত্রীকে দেখেন নি। তাঁকে স্পর্শও করেন নি।
৩১৭. হযরত সুফিয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হিন্দের পাহাড়ে আদম আলাইহিস-সালাম তিনশত বছর ধরে কাঁদলেন। মুখে অশ্রু দুটি দাগ পড়ে যায়। যতোদিন না ফিরিশতা এসে তাঁকে বললেন, আল্লাহ আপনার উপর বরকত দান করুন, ততোদিন পর্যন্ত হাসেন নি।
৩১৮. হযরত হাসসান ইবনে আতিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস-সালাম জান্নাত থেকে বের হওয়ার কারণে দীর্ঘ ষাট বৎসর কাঁদলেন।
৩১৯. হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর একশত বৎসর মাথা নীচু করে রাখলেন। আকাশের দিকে তাকাতেন না। চোখের পানি কখনো শুকাত না। তিনি প্রার্থনা করেন, মা'বূদ! হাওয়া আমাকে ধোঁকা দিয়েছে! ইবলিস আমার পদস্খলন ঘটিয়েছে! পরীক্ষা আমাকে আঁকড়ে ধরেছে! আপনি যদি করুণা না করেন, তো ধ্বংস হয়ে যাবো। ঘোষণা আসলো, আদম! তোমাকে ক্ষমা করা হলো। এ ঘোষণা শুনে লজ্জা হেতু আরো একশত বৎসর কাঁদলেন।
৩২০. হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জান্নাত থেকে আদম আলাইহিস-সালামকে যখন যমীনে পাঠানো হলো, তাঁর চোখের পানি শুকায় নি। গভীরভাবে চিন্তিত। মাথা নীচু। সপ্তম দিবসে আল্লাহ বললেন, আদম! কী কাজ করেছো? জবাব দিলেন, মা'বূদ! বিপদ বড় হয়ে গেছে। পাপ বহন করে ফেলেছি। প্রচুর রাজ্য থেকে আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। মর্যাদার ঘর থেকে পতিত হয়েছি অপদস্থতার গৃহে। সৌভাগ্যের গৃহ থেকে এখন দুর্ভাগ্যের ঘরে এসেছি। আরাম ও বিলাসিতার ঘর ছেড়ে দুঃখ-কষ্টের গৃহে প্রবেশ করেছি। শান্তি ও স্থিতিশীলতার বাড়ি ছেড়ে এসেছি অস্তিত্বশীলতার গৃহে। অবিনশ্বর জগৎ থেকে এসেছি নশ্বর জগতে। তাহলে কেনো ভুলের জন্য আমি কাঁদবো না? আল্লাহ বললেন, আদম! আমি কি তোমাকে আমার জন্য সৃষ্টি করি নি? আমার ঘরকে তোমার আবাসস্থল বানিয়ে দিই নি? গোটা সৃষ্টির মধ্যে তোমাকে নির্বাচিত করি নি? আমার সম্মান দ্বারা তোমাকে ভূষিত করি নি? ঢেলে কি দেই নি আমার প্রেম? আমার ক্রোধের ভয় দেখাই নি? আমি কি তোমাকে নিজের হাত দ্বারা সৃষ্টি করি নি? আমার রূহ কি তোমার মধ্যে ফুঁৎকার করি নি? আমার ফিরিশতারা কি তোমাকে সিজদা করে নি? তুমি কি আমার মর্যাদার কেন্দ্রস্থলে ছিলে না? তুমি তো নির্দেশ অমান্য করেছো। ভুলে গিয়েছো প্রতিজ্ঞা। আমার ক্রোধের পিছু চলেছ। আমার উপদেশ নষ্ট করেছ। কিরূপে তুমি আমার করুণা অস্বীকার করবে? আমার সম্মানের শপথ! গোটা বিশ্ব যদি মানুষে ভরে যায়, সবাই আমার উপাসনায় মত্ত হয়, দিনরাত আমার পবিত্রতার গুণগান গায়, তাদের মধ্যে কোন বিরতিকোষও আসে না, এরপর যদি তারাও আমার অবাধ্যতা করে, আমি তাদের সবাইকে পাপীষ্টদের স্তরে নিক্ষিপ্ত করবো।
একথা শোনে আদম আলাইহিস-সালাম হিন্দেঁর পাহাড়ে তিনশত বৎসর কাঁদেন। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ তাঁর চোখের পানিতে ভরে যায়। অকৃত বৃক্ষলতা গজে ওঠে। এরপর তিনি বাইতুল আতিকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কাবায়র পথে এগিয়ে আসছিলেন। দূরত্ব বিরাট। শেষ পর্যন্ত কাছে আসলেন। ৭ চক্কর দিলেন। কাঁদলেন। চোখের পানিতে হাটু ডুবে যায়। নামায পড়লেন। কেঁদে কেঁদে সিজদানত হলেন। ঘোষণা আসলো, আদম! তোমার দুর্বলতায় করুণার দৃষ্টি দিচ্ছি। তোমার তাওবাহ কবুল করলাম। মুছে দিলাম তোমার পাপ। আদম আলাইহিস-সাلام বললেন, প্রভু! তুমি ছাড়া কোন উপাস্য নাই। তোমার পবিত্রতার গুণগান গাই। আমি পাপ করেছি। নিজের উপর যুলুম করেছি। এখন আমার তাওবাহ কবুল করুন। আপনিও তাওবাহ কবুলকারী। করুণাময়। আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি শ্রেষ্ঠ ক্ষমাকারী। আমাকে করুণা করুন। আপনি শ্রেষ্ঠ দয়াপরবশ। এরপর তিনি দীর্ঘদিন বাইতুল্লাহর কাছে অবস্থান করেন। ফিরিশতা এসে বললেন, আদম! আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন। একথা শুনে মৃদু হাসলেন।
৩২১. হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস-সালামকে আল্লাহ তা’আলা বললেন, ‘আদম! তোমার চেহারায় এটা কিসের চিহ্ন? কিসে বেষ্টন করেছে তোমাকে?’ জবাব দিলেন, অবিনশ্বর জন্ম থেকে নশ্বর এই ধরায় আসা, সৌভাগ্যের জায়গা ছেড়ে দুর্ভাগ্যের বাসস্থানে আসা।’ তিনি হিদেঁর পাহাড়ে একশ বছর সিজদায় পড়ে কাঁদতে থাকেন। লম্বা উপত্যকা চোখের পানিতে ভরে যায়। দারচিনি- করনফুলের গাছ গজ ওঠে। এরপর জিবরাঈল আলাইহিস-সালাম তাঁর নিকট অবতরণ করে বললেন, আদম! মাথা উত্তোলন করুন। তা’আলা আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি মাথা উঠালেন। চলে গেলেন বাইতুল্লাহয়। ৭ চক্কর দিলেন। এরপর কাঁদতে লাগলেন। চোখের পানিতে হাঁটু পর্যন্ত পানি জমা হয়ে গেল। মাকামে এসে দু’ রাকা’আত নামায আদায় করলেন। চোখের পানি গোটা জমিনের উপর ভাসতে থাকে।
৩২২. হযরত আতা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস- সালাম একশত বছর কাঁদতে থাকেন। দু’টি উপত্যকা বেয়ে তাঁর চোখের জল বেয়ে যায়। একটির নাম হলো আরাফাদ, আরেকটি হলো বালজারাান উপত্যকা। উভয়টিতে ছিল বাঘের বসবাস। এরপর ছিলো ইয়াভুত ও মগিমুওয়াব। ছিলো আলানযুজ বৃক্ষ। আদম একশত বছর চিন্তামগ্ন হয়ে বসে থাকেন। তাঁর হাত ছিলো গালের নীচে।
৩২৩. হযরত আতা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জান্নাত থেকে আদম আলাইহিস-সালাম বের হওয়ার পর ভুলের কারণে একশত বছর কাঁদেন। তাঁর ক্রন্দনে ফিরিশতাদের পর্যন্ত কষ্ট হয়েছে।
৩২৪. হযরত আবূ তালিব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহ ডাক দিলেন, আদম! আমি তোমার কিরূপ প্রতিবেশী ছিলাম? জবাব দিলেন, মাওলা! আপনি তো উত্তম প্রতিবেশী। আল্লাহ বলেন, তুমি আমার প্রতিবেশী থেকে বেরিয়ে যাও! এরপর তিনি ছিনিয়ে নিলেন আদমের মাথার মুকুট ও অলঙ্কার।
৩২৫. হযরত মুজাহিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস-সালাম জান্নাতের গাছ থেকে নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর, জান্নাতী লেবাস তাঁর শরীর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কেবল অবশিষ্ট ছিলো মাথার মুকুট। জান্নাতের গাছের পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢাকতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। হাওয়ার দিকে চেয়ে বললেন, এক্ষুণি আল্লাহর প্রতিবেশ থেকে বেরিয়ে আসো। এটাই অবাধ্যতার প্রথম পরিণতি। হাওয়া বললেন, আদম! কল্পনাও করি নি, আল্লাহর নাম নিয়েও কেউ মিথ্যা শপথ করতে পারে। ইবলিস তাঁরা উভয়কে গাছের ফল খাওয়ার জন্য কসম খেয়ে আহ্বান করেছিলো। আদম লজ্জার কারণে জান্নাত থেকে পলায়ন করতে থাকেন। একটি গাছের ডালে এসে থামলেন। আদম মনে করছিলেন, এক্ষুণি তাঁকে শাস্তি দেওয়া হবে। চিৎকার করে বললেন, ক্ষমা করুন! ক্ষমা করুন! আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, আদম! তুমি কি আমার কাছ থেকে পলায়ন করছো? আদম আলাইহিস-সালাম জবাব দিলেন, না প্রভু! আমি লজ্জার কারণে দৌড়াচ্ছি।
আল্লাহ তা’আলা দু’জন ফিরিশতাকে নির্দেশ দিলেন, আদম ও হাওয়াকে আমার প্রতিবেশ থেকে বের করে দাও। তারা আমার অবাধ্যতা করেছে। জিবরাঈল মাথার মুকুট খুলে নিলেন। মিকাঈল খুলে নিলেন কপাল থেকে অলঙ্কার। আদম আলাইহিস-সালাম পবিত্র সত্তার রাজ্য থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ক্ষুধা ও পিপাসার জগতে নেমে আসলেন। একশত বৎসর পাপের জন্য কাঁদলেন। মাথা হাঁটুর সাথে মিলিয়ে বসে যান। চোখের পানিতে চতুর্দিকে গজে ওঠে বৃক্ষ-তরু-লতা। একটি শুকুন পিপাসায় কাতর হয়ে উঠছিলো। সে আদমের চোখের ভাসমান পানি পান করে পিপাসা নিবারণ করলো। আল্লাহ তাঁকে কথা বলার শক্তি দিলেন। সে বললো, আদম! আপনার দু’হাজার বৎসর পূর্বে এই পৃথিবীতে এসেছি। ভ্রমণ করেছি পূর্ব থেকে পশ্চিমে। নদ নদী খাল- বিল ও সাগর থেকে পানি পান করেছি। কিন্তু এই পানির মতো এতো সুপেয়- সুস্বাদু পানি পান করি নি। আদম আলাইহিস-সালাম বললেন, শুকুন! সর্বনাশ! বুঝে-শোনে কথা বলছো? প্রভুর অবাধ্য দাসের চোখের পানিতে কিভাবে স্বাদ পাবে? পাপাচারীর চোখের পানির মত আর কোন পানি কি এত তিক্ত হতে পারে? শকুন! আমাকে লজ্জা দিচ্ছ। আমি প্রভুর অবাধ্যতা করেছি। বিলাসিতার জগৎ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি। এসেছি দারিদ্র্য ও নিঃস্বতার ধরায়। শকুন বললো, আদম! লজ্জা দিচ্ছ না। চোখের পানিতে যে স্বাদ পেয়েছি আমি তা-ই ব্যক্ত করলাম। যে বান্দা তার প্রভুর অবাধ্যতা করে পাপ স্মরণ করে, হৃদয় ও শরীর ফেঁপে ওঠে, প্রভুর ভয়ে কাঁদতে থাকে, তার চোখের পানি থেকে আর কোন পানি এতো সুপেয় ও সুমিষ্ট হতে পারে?
৩২৭. হযরত আলী ইবনে আবু তালহা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর আদম আলাইহিস-সালাম সর্বপ্রথম যে খাবার খেয়েছিলেন তা ছিল কদ। তিনি যখন মলত্যাগের ইচ্ছে করলেন, তার অবস্থা হলো প্রসবকারী মহিলার মতো। পূর্বে পশ্চিমে কেবল ঘুরতে লাগলেন। মলত্যাগ কিভাবে করবেন, বুঝতে পারছিলেন না। জিব্রাঈল আলাইহিস-সালাম অবতরণ করলেন। আদম আলাইহিস-সালামকে নিয়মমতো বসালেন। তিনি মলত্যাগ করলেন। বেরিয়ে আসলো দুর্গন্ধ। ফলে দীর্ঘ ৭০ বছর তিনি কাঁদলেন।
৩২৮. হযরত ফাতাহ মুসেলি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস-সালাম তাঁর ছেলেকে বললেন, বৎস! আমরা ছিলাম আকাশের অধিবাসী। আমাদের খাবার ছিলো আকাশবাসীদের খাবারের মতো। শত্রু ইবলিস আমাদের দ্বারা পাপ ঘটিয়ে জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত করে। এখন চিন্তা-পেরেশানী ছাড়া কোন শান্তি নেই, যতোদিন না ফিরে গিয়েছি আমাদের মূল বাসস্থানে।
৩২৯. হযরত ফাতেহ মুসেলি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস-সালাম ছেলেকে বললেন, আল্লাহ্র শপথ! যে ঘরে ছিলাম তা থেকে বের হওয়ার পর দীর্ঘদিন আমি চিন্তাযুক্ত ছিলাম। তুমি যদি আমার অবস্থা দেখতে তাহলে তোমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হতো।
📄 নূহ আলাইহিস সালাম কাঁদলেন যেভাবে
৩২৯. হযরত ওয়াহব ইবনে ওয়ারাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত নূহ আলাইহিস-সালামকে তাঁর ছেলের ব্যাপারে তিরস্কার করলেন, তখন এই ইরশাদ করলেন, مِّنْ أَعِظُكَ أَن تَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ [আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, আপনি অজ্ঞদের দলভুক্ত হবেন না।] এই তিরস্কারের পর হযরত নূহ আলাইহিস-সালাম ৩০০ বছর কাঁদলেন। তাঁর চোখের নিচে পানির নালার দাগ পড়ে গিয়েছিল।
৩৩০. হযরত ইয়াযিদ রুক্বাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নূহ আলাইহিস-সালামকে এজন্য 'নূহ' নাম রাখা হয়েছিল, কারণ তিনি ছিলেন 'নাওয়াছ' বা অধিক ক্রন্দনকারী।
📄 দাউদ আলাইহিস সালাম কাঁদলেন যেভাবে
৩০১. হযরত সুদ্দী রাহমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, শয়তান দাউদ আলাইহিস-সালামের কাছে আসলো। তিনি তখন মেহরাবে ছিলেন। সে কবুতরের আকৃতি ধারণ করলো। তার ডানা ছিলো মোতির তৈরী। মেহরাবের দরজায় পৌঁছিলেই দাউদ আলাইহিস-সালাম তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। পাখীরূপী শয়তান সাথে সাথে উড়ে গেল। উড়ে যাওয়ার পর বাগানে গোসলরতো একজন মহিলার প্রতি তাঁর খেয়াল পড়লো। মহিলাটি সাথে সাথে তার চুল দিয়ে শরীর ঢেকে দিল। তিনি তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। বললো, তার স্বামী একজন বৃদ্ধ। তখন দাউদ আলাইহিস-সালাম সেনাপতিকে নির্দেশ দিলেন অমুক সেনাদের সৈনিককে যুদ্ধে পাঠাও। সে যুদ্ধে গিয়ে জয়লাভ করলো। তখন দাউদ আলাইহিস-সালাম সেনাপতিকে আবার নির্দেশ দিলেন, সৈনিককে তারওতে পাঠাও! সৈনিক এবার যুদ্ধে গিয়ে মৃত্যুবরণ করলো। লাইস ইবনে সালিম রাহমাহুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, দাউদ আলাইহিস-সালামের নিকট দু'জন ফিরিশতা মানুষ আকৃতিতে অবতরণ করলেন। তিনি তাঁদের দেখে ঘাবড়ে গেলেন। তাঁরা আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত তাঁর নিকট বর্ণনা করলেন। দাউদ আলাইহিস-সালাম বললেন, বিষয়টি আসলেই এরকম। তখন তাঁরা বললেন, হ্যাঁ। জবাবে দাউদ বললেন, তাহলে আমরা আঘাতও করবো নাকে এবং চেহারায়। তাঁরা বললেন, আপনি প্রহারের উপযুক্ত। একথা বলে উভয় অদৃশ্য হয়ে যান। দাউদ আলাইহিস-সালাম বিষয়টি বুঝতে পেরে চল্লিশদিন একনাগাড়ে সিজদানত অবস্থায় রইলেন। চোখের পানিতে ঘাস-লতা গজে উঠলো। আল্লাহ তাঁকে বললেন, তুমি কি ক্ষুধার্ত - আমি তোমাকে খাওয়াবো। তুমি কি নিপীড়িত- তোমাকে সাহায্য করবো। একথা শোনে তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন। এই করুণ চিৎকারে লতাপাতা জ্বলে গেল। আল্লাহ তা'আলা আবার বললেন, তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। মাথা ওঠাও।
[বিদ্র: ইমাম ইবনে আবিদুনিয়া ক্রন্দনের আলোচনা প্রসঙ্গে দাউদ আলাইহিস-সালাম সম্পর্কে যে ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়েছেন তাতে ইসরাঈলী বর্ণনার মিশ্রণ আছে। অনেক ক্ষেত্রে এ রকম বর্ণনা ইস্সমতে আম্বিয়া বিরোধী হয়ে যায়। ইস্সমত মানে আজীবন নিষ্পাপ থাকা। এটি নবীগণের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। এ ব্যাপারে তাফসিরে ইবনে কাসির অধ্যয়ন করা যেতে পারে।]
৩০২. হযরত কাতাদাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস-সালাম চল্লিশদিন সিজদায় কাটালেন। আল্লাহ বললেন, মাথা ওঠাও! তোমাকে ক্ষমা করলাম। তিনি বললেন, এটা কিভাবে হতে পারে? আপনি তো ন্যায়বিচারক! আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, পাপের ফায়সালাও করি, ক্ষমাও করি। বান্দাকে তাওবার তাওফিক দিই। সে সন্তুষ্ট হয়। দাউদ আলাইহিস-সালাম বললেন, এখন আমি তৃপ্তি বোধ করছি। আমার বিশ্বাস হয়েছে, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, ঐ মহিলা ছিলেন সুলাইমানের মাতা।
৩০৩. হযরত সুফিয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজের আয়াত পাঠ করে বলেন, দাউদ আলাইহিস-সালাম মেহরাবে নামাজ পড়ছিলেন। ত্রিশ হাজার সৈনিক তাঁর পাহারায় আছে। এরপরও দু' ব্যক্তি তাঁর নিকট যেয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি ঘাবড়ে গেলেন। তারা বলল ভয় করবেন না। আমরা বিদ্যমান দুটি পক্ষ, একে অপরের প্রতি বাড়াবাড়ি করছি। তাই আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করুন। অবিচার করবেন না। আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন। সে আমার ভাই। সে নিরানব্বই দুম্বার মালিক। আমি একটি মাদী দুম্বার মালিক। এরপরও সে বলে এটিও আমাকে দিয়ে দাও। সে কথাবার্তায় আমার উপর বল প্রয়োগ করে। দাউদ বললেন, সে তোমার দুম্বাটিকে নিজের দুম্বাগুলোর সাথে সংযুক্ত করার দাবী করে তোমার প্রতি অবিচার করেছে। শরীকদের অনেকেই একে অপরের প্রতি জুলুম করে থাকে। তবে ঐসব লোক করে না, যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ও সৎকর্ম সম্পাদনকারী। অবশ্য এমন লোকের সংখ্যা অল্প। ‘দাউদের খিয়াল হল, আমি তাকে পরীক্ষা করছি। অতঃপর তিনি পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন এবং তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন। [কুরআন সূরা ৩৮:২২-২৪ দ্রষ্টব্য।]
তিনি সাথে সাথে সিজদায় পড়ে গেলেন। চল্লিশ রাত একনাগাড়ে ক্রন্দন করলেন। চোখের অশ্রুতে ঘাস-লতা গজে উঠলো। লতা-পাতায় মাথা আবৃত হয়ে যায়। তিনি বললেন, প্রভু! আমার দাগ পড়ে গেছে। জানি না পাপের পরিণতি কী? আল্লাহ বললেন, দাউদ! তুমি কি ক্ষুধার্ত? তোমাকে আহার করাবো। তুমি কি পিপাসু? তোমাকে পান করাবো। তুমি কি বস্ত্রহীন? তোমাকে কাপড় পরাবো। একথা শুনে দাউদ আলাইহিস-সালাম খুব আহাজারি করলেন। ফলে তাঁর পার্শ্বস্থ ঘাস ও লতাপাতা শুকিয়ে যায়।
৩০৪. হযরত ইবনে সাবিও রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদম আলাইহিস-সালামের পর যদি হযরত দাউদ আলাইহিস-সালামের ক্রন্দনকে ওজন করা হয়, গোটা বিশ্ববাসীর ক্রন্দনের সমান হয়ে যাবে।
৩০৫. হযরত আতা খোরাসানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস-সালাম নিজের হাতে একটি চিহ্ন তৈরী করেছিলেন। এটা করেছিলেন তাঁর ভুলের একটি নিদর্শন স্বরূপ। যখন এই চিহ্নের দিকে তাকাতেন, উভয় হাত কাঁপতে থাকতো।
৩০৬. হযরত মুজাহিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ প্রভুর দরবারে প্রার্থনা করলেন, ভুলের জন্য তিনি যেনো হাতের মধ্যে চিহ্ন অঙ্কন করে দেন। পানাহার বা অন্য কোন কাজের জন্য তিনি যখন হাত ব্যবহার করতেন, এই চিহ্ন তাঁর চোখে পড়তো আর তিনি খুব বেশী কাঁদতেন।
৩০৭. হযরত আওজায়ি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দাউদ আলাইহিস-সালামের উভয় চোখ ছিলো পানির ব্যাগের মতো যা থেকে শুধু পানি পড়তো। জমিনে যেরকম গর্ত আছে, তদ্রূপ চোখের পানিতে তাঁর চেহারায় গর্ত হয়ে যায়।
৩৩৯. হযরত ইউনুস ইবনে বাক্কার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস-সালাম চল্লিশদিন পর্যন্ত সিজদায় পড়ে থাকেন। চোখের পানিতে তাঁর চতুর্দিকের যমিনে ঘাস উঠে যায়। তিনি বললেন, প্রভু! কপালে চিহ্ন পড়ে গেছে, চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। জানি না পাপের পরিণাম কি? তখন আল্লাহ তা‘আলা বললেন, দাউদ! তুমি কি ক্ষুধার্ত, তোমাকে খাবার দিব? তুমি কি পিপাসার্ত? তোমাকে পান করাবো। তুমি কি নির্যাতিত, তোমাকে সাহায্য করব? একথা শোনে তিনি খুব আহাজারি করলেন। আর তখনই তাঁকে ক্ষমা করা হয়।
৩৪০. হযরত ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস-সালাম ততক্ষণ পর্যন্ত সিজদা থেকে মাথা উঠান নি, যতক্ষণ না ফিরিশতা এসে তাঁকে বললেন, আপনার কাজের প্রথমারম্ভ হচ্ছে ছোট গুনাহ এবং শেষাংশ হলো বড় গুনাহ। এরপর তিনি মাথা ওঠালেন। তখন থেকে পানাহার বর্জন করে দিলেন। চোখের পানি যেন তাঁর খাবারে পরিণত হল।
৩৪১. সুলায়মান তাইমি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম চল্লিশ রাত সিজদায় পড়ে থাকলেন। চোখের পানিতে সবুজ ঘাস গজিয়ে উঠে। আহাজারি করে বলেন, ‘প্রভু! তুমি যদি আমাকে অবাধ্যতা থেকে বাঁচাতে।’ তাঁর মনে হলো দোয়া কবুল হবে না। কাঁদন রোদন আরো বাড়িয়ে দিলেন। এক পর্যায়ে আল্লাহ তাঁকে করুণা করলেন। ঘোষণা আসল দাউদ! মাথা উঠাও। তোমাকে ক্ষমা করলাম।
৩৪২. সুলায়মান তাইমি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম কাঁপতে থাকেন। পানাহার ত্যাগ করেন। স্ত্রীর সান্নিধ্য ছেড়ে দেন। এভাবেই মৃত্যু বরণ করেন।
৩৪২. উবায়দ ইবনে উমায়ার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম চল্লিশ বছর যাবত রাতের বেলা সিজদায় পড়ে থাকেন। আর কাঁদেন।
৩৪৩. সুলায়মান ইবনে কুমারার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম নিজের হাতে লিখে রাখছিলেন ‘দাউদ এক পাপী’। এ লেখায় চোখ পড়লে কেঁপে উঠতেন। চোখ অশ্রুসজল হয়ে যেত। সন্তানহারা মায়ের মত কাঁদতেন।
৩৪৪. মুজাহিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম রাতের মধ্যে তাঁর পাপের কথাটি লিখে রাখছিলেন, যেন তা ভুলতে পারেন না। তাই যখনই ওদিকে লক্ষ্য করতেন কেঁপে উঠতেন।
৩৪৫. আবু কুদামা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম বলতেন চোখের সামনে পাপটি লিখলাম যেন পুনর্বার না করি।
৩৪৬. ইবনে আবু আউদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম সিজদায় পড়ে কাঁদতে থাকেন। চোখের পানিতে সবুজ ঘাস গজিয়ে উঠে। তিনি প্রার্থনা করেন প্রভু! জবাব আসলো, তুমি কি ক্ষুধার্ত আমি আহার দিব? পিপাসু আমি তৃষ্ণা দূর করব? বস্ত্রহীন আমি কাপড় পরাব?
৩৪৭. ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম যখন কাঁদতেন চোখের পানিতে তাঁর সামনে ভিজে যেত। ঘাস গজিয়ে উঠত। কেঁদে কেঁদে দুর্বল হয়ে পড়তেন।
৩৪৮. ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম নামাযে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কাঁদতেন। চোখের পানিতে মাটি সিক্ত হত। এরপর রুকু করতেন। ক্রন্দন চলছে আর মাটি সিক্ত হচ্ছে। এরপর সিজদা করতেন।
৩৫০. ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম বালুপূর্ণ একটি মুসাল্লায় নামায পড়তেন। চোখের পানিতে তা ভিজে যেত। সেজদায় মাথা রেখে বলতেন, কপাল রক্তাক্ত। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। কিন্তু আমার পাপ মোচন হয় নি। তখন ঘোষণা আসল - দাউদ! তুমি কি পিপাসু? পান করাবো। তুমি কি ক্ষুধার্ত? আহার করাবো। তুমি কি বস্ত্রহীন? কাপড় পরাবো। একথা শোনে দাউদ আলাইহিস-সালাম খুব বেশী আহাজারি করলেন। আর তখনই তাঁকে ক্ষমা করা হয়।
৩৫১. সাবিত রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম সাতটি বিছানা বালু দিয়ে ভরে রাখলেন। এরপর খুব কাঁদলেন। চোখের পানি যেন নিঃশেষ হয়ে গেল।
৩৫২. উমর ইবনে যার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহ দাউদ আলাইহিস সালামের তাওবা কবুল করলেন। তখন তিনি একদিন নির্ধারণ করলেন প্রয়োজন সমাধান করার জন্য, একদিন ক্রুদের জন্য, একদিন কিনার জন্য। আরামের বিছানাটি বালু দিয়ে ভরে দিলেন। হাতের মধ্যে পাপের কথা লিখে রাখলেন। তাতে চোখ পড়লে বেশ কাঁদতেন।
৩৫৩. আবু সাইদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম পরনের কাপড় খুলে ছুঁড়ি পরলেন। শরীরের মধ্যখানে একটি বেল্ট বাঁধলেন। ভৃত্য শামউনকে বললেন যেভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে তাড়িয়ে নেওয়া হয় আমাকেও তাড়িয়ে নাও। সে তাকে তাড়িয়ে নেয় মেহরাবের দিকে। সেখানে গিয়ে তিনি সিজদায় পড়ে যান।
৩৫৪. আবুল আফিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম প্রার্থনা করতেন, গুণগান গাই সেই সত্তার যিনি আলোর সৃষ্টিকর্তা। প্রভু! পাপের কথা স্মরণ হলে গোটা দুনিয়া আমার কাছে সংকীর্ণ হয়ে উঠে। তবে যখন তোমার করুণার প্রতি দৃষ্টি দিই, মনে হলো প্রাণ ফিরে পেলাম। গুণগান গাই সেই সত্তার যিনি আলোর সৃষ্টিকর্তা। প্রভু! তোমার কাছে তোমার চিকিৎসক বান্দাদেরকে চাই, যারা আমার পাপের চিকিৎসা করে দিবে।
৩৫৫. সাফওয়ান ইবনে মিহরায রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম প্রার্থনা করতেন, আল্লাহর শাস্তি ভোগ করার আগেই আমি এ থেকে পরিত্রাণ কামনা করি। সাফওয়ান যখনই এই ঘটনা স্মরণ করতেন কেঁদে উঠতেন।
৩৫৬. সাবিত বুনানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন কৃত পাপ স্মরণ করতেন আল্লাহর ভয় বেড়ে যেত। অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেঁপে উঠত। তা যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। আবার যখন পাপাচরীদের উপর আল্লাহর করুণার কথা স্মরণ করতেন, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্বস্থানে ফিরে যেত।
৩৫৭. আবু আতাফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম পান করার জন্য পাত্র হাতে নিতেন। তখন চোখের পানিতে পাত্র ভরে যেত।
৩৫৮. মুজাহিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম পান করার জন্য পাত্র হাতে নিতেন। তখন এর তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক পানের আগেই পাপের কথা স্মরণ করতেন। কাঁদার প্রাবল্যে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। অশ্রুজলে পাত্র ভরে যেত।
৩৫৯. ইসমাঈল ইবনে উবাইদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালামকে যখন অধিক ক্রন্দনের কারণে তিরস্কার করা হত বলতেন, আযাজ্জাবির দিন আসার আগে, হাড় মাংস এবং চুল দাড়ি অগ্নিদগ্ধ হওয়ার আগে আর যে সব ফিরিশতা কঠোর ও আল্লাহর অবাধ্যতা করেন না তাদের পাকড়াওএর আগে আমাকে কাঁদতে দাও।
৩৬২. ওয়ালিদ ইবনে মুসলিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম পাপের কথা স্মরণ করলে, বেশ সংকীর্ণতাবোধ করতেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের পার্শ্ববর্তী ঘর থেকে বের হয়ে কেবল ঘুরতেন। বনি ইসরাইলের আবিদদের কাছে চলে যেতেন। তাদেরকে বলতেন, প্রতিটি পাপী যেন পাপের জন্য কাঁদতে থাকে। এসময় তারা তাকে অনুসরণ করতেন এবং সবাই একত্রে আহাজারি শুরু করতেন।
৩৬৩. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম শেষ রাতে সিজদায় পড়ে কেবল কাঁদতেন। তখন জলে স্থলের প্রতিটি প্রাণী নীরব হয়ে যেত। তারা ক্রন্দন ধ্বনি শুনত। এরপর নিজেরাও কাঁদত।
৩৬৪. ইয়াহইয়া ইবনে কাসির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন ভুল করে ফেললেন তাঁর পাশের সব প্রাণী পালিয়ে যায়। তিনি প্রার্থনা করলেন, প্রভু! প্রাণীগুলো ফিরিয়ে দাও। আমি তাদের ঘনিষ্ঠতা চাই। আল্লাহ্ এগুলো ফিরিয়ে দিলেন। তারা তাঁকে ঘিরে থাকল। তাঁর দিকে কান পাতল। তখন তিনি জোরে জোরে যাবুর পড়তে লাগলেন। আহাজারি শুরু করলেন। পশুরা বলল দাউদ! আপনার মধুর কণ্ঠে পাপ মোচন হয়ে গেছে।
৩৬৫. ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পাহাড়ের উপর নির্দেশ আসল, দাউদ যখন যাবুর পড়েন তোমরা তাঁর সাথে কণ্ঠ মিলাও। পাখিরা তোমাদেরকে সাহায্য করবে। তাই যখন দাউদ ক্রন্দন করতেন পাহাড় পর্বত তাতে সাড়া দিত। উপর দিয়ে উড়ন্ত পাখিরা দাঁড়িয়ে যেত।
৩৬৬. ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন পড়তেন তাঁর চার পাশে পাখিরা উপচে পড়ত, বহমান পানি থেমে যেত তার সুমধুর ধ্বনি শুনে। চোখের পানিতে ঘাস গজিয়ে উঠত।
৩৬৯. আওয়াযী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন উচ্চ ধ্বনি দিয়ে পড়তেন, পশু পাখি তার মিহরাবের পাশে থেমে যেত।
৩৭০. যহাদ ইবনে মুনাফিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন যাবুর পড়তেন, তখন কেবল কাঠ ভাঙার মত শব্দ শুনা যেত।
১৭১. যায়দ ইবনে আসলাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন যাবুর পড়তেন পাখিরা তাঁর পাশে জমে যেত। মাটি সিক্ত হয়ে যেত চোখের পানিতে। পান পাত্র যখন হাতে নিতেন পানি ও অশ্রুজল একত্র হয়ে যেত।
৩৭২. হযরত মুয়ার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন পড়তেন পশু পাখি তাঁর মিহরাবে ভিড় করতো। সুন্দর ধ্বনি শুনে তারা যেন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত।
৩৭৩. হযরত কাসম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত দাউদ আলাইহিসসালাম যখন তিলাওয়াত করতেন, পাখিরা তাদের নীড় ছেড়ে চলে আসতো। জঙ্গলের প্রাণীরা স্বস্থান ছেড়ে তাঁর নিকট এসে ঘিরে বসতো। তাঁর মধুর কণ্ঠে তিলাওয়াতের প্রভাবে তারা যেন ছটফট করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত।
৩৭৪. শাহর ইবনে হাওশাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালামকে ‘নাওয়ায’ [অতি ক্রন্দনকারী] বলা হতো।
৩৭০. মুহাম্মদ ইবনে খাওয়াত বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন দীর্ঘ দিন কাঁদলেন তাকে বলা হলো ঐ স্ত্রীর [আগের] স্বামীর কবরে যাও। তুমি যে কাজ করেছ এ জন্য তার কাছে ক্ষমা চাও। আল্লাহ তখন কবরবাসী লোকটিকে কথা বলার শক্তি দিলেন। দাউদ আওয়াজ দিলেন আনওরিয়া! আমি দাউদ। আমার কাছে তোমার একটি প্রাপ্য আছে। লোকটি জবাব দিলেন আমি তো আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম। এরপর তিনি চলে আসলেন। তার মন প্রশান্ত হলো। কিছুদিন পর আবার বলা হলো সেখানে যাও, তোমার কর্মের বর্ণনা দাও। তিনি গেলেন এবং অনুরূপ কথা বললেন। কবর থেকে ধ্বনি আসল দাউদ! নবীগণ তো অনুরূপ করেনই।
৩৭৪. ইমরান জুনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম বললেন, প্রভু! তোমার শত্রু শয়তান আমাকে লজ্জা দিচ্ছে। সে বলছে তুমি যখন ভুল করেছিলে তখন তোমার প্রভু কোথায় ছিলেন?
৩৭৬. মালিক ইবনে দিনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, فَغَفَرْنَا لَهُ ذَلِكَ وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَآبِ আয়াতটির ব্যাখ্যায় বলেন, কিয়ামতের দিন একটি উঁচু মিম্বর তৈরী করে জান্নাতে রাখা হবে। এরপর ঘোষণা হবে, দাউদ! দুনিয়াতে যেভাবে মধুর কণ্ঠে আমার গুণগান বর্ণনা করতে এভাবে গুণগান গেয়ে যাও। জান্নাতের প্রত্যেক অধিবাসী তখন দাউদ আলাইহিস সালামের কণ্ঠ শুনবেন। এটাই হলো আল্লাহর এই কথার মর্ম। [আয়াতের অর্থ: আমি তার সে অপরাধ ক্ষমা করলাম। নিশ্চয় তার জন্য আমার কাছে রয়েছে উচ্চ মর্যাদা ও সুন্দর আবাসস্থল। (৩৮:২৫)]
৩৭৭. ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, পাপ ঘটে যাওয়ার পর দাউদ আলাইহিস সালাম নারীদের কাছ থেকে দূরত্ব অবলম্বন করেন। সব সময় কেবল উপাসনা করতে থাকেন।
৩৮৯. সুলাইমান তাইমি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পাপ ঘটে যাওয়ার পর দাউদ আলাইহিস সালাম আর স্ত্রীর সাথে সহবাস করেন নি।
৩৯০. আবু আমার আওয়াই রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন কাঁদতেন পশু পাখি তাঁর কাছে ভিড় করতো। ক্রন্দন ধ্বনি শুনে তারা যেন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো।
৩৯১. দাউদ আলাইহিস সালাম প্রার্থনা করতেন, প্রভু! পাপাচারদের ক্ষমা কর। তাদের সাথে দাউদকেও ক্ষমা করো। গুণগান গাই তারই যিনি সৃষ্টি করেছেন আলো। প্রভু! ভুল করে ফেলেছি। ভয় করি, যদি ক্ষমা না করো, কিয়ামতের দিন আমি শান্তি পেয়ে যাব। গুণগান গাই তারই যিনি সৃষ্টি করেছেন আলো। প্রভু! চিকিৎসকদের কাছে ঘুরে বেরিয়েছি, তাদের কাছে পাপের চিকিৎসার আবেদন করেছি। তারা সবাই আমাকে তোমার পথ দেখিয়েছেন।
৩৯২. মুজাহিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পাপ ঘটে যাওয়ার পর দাউদ আলাইহিস সালাম চল্লিশ দিন সিজদায় পড়ে থাকেন। চোখের পানিতে ঘাস গজিয়ে উঠে। মাথা আছড়িত হয়ে যায়। তখন প্রার্থনা করেন, প্রভু! কপাল রক্তাক্ত। চোখের পানি শেষ। আল্লাহ তাকে বললেন, তুমি কি ক্ষুধার্ত - তোমাকে খাওয়াবো, নিপীড়িত- তোমাকে সাহায্য করবো। একথা শুনে চিৎকার দিয়ে উঠলেন। এই করুণ চিৎকারে লতাপাতা জ্বলে গেল। এ সময়ই তাঁর তাওবা কবুল হয়।
তিনি হাতের মধ্যে পাপটি লিখে রাখতেন। পান পাত্র হাতে নিয়ে কেবল একটু পানি পান করতে পারতেন, ক্রন্দনের প্রাবল্যে। পাত্র ভরে যেত অশ্রুজলে। বলা হয়ে থাকে, দাউদের চোখের পানি সমগ্র সৃষ্টির চোখের পানির সমান হবে। আর আদমের চোখের পানি দাউদ ও সমগ্র সৃষ্টির চোখের পানির সমান হবে।
৩৬২. ইবনে সাবিত বলেন, পাপ ঘটে যাওয়ার পর দাউদ খুব কাঁদেন। তার চোখের পানি সমস্ত সৃষ্টির চোখের পানির সমান হবে। আর জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর আদমও খুব কেঁদেছিলেন। তার চোখের পানি দাউদ ও সমস্ত সৃষ্টির চোখের পানির সমান হবে।
৩৬৩. ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, পাপ ঘটে যাওয়ার পর দাউদ প্রার্থনা করেন, প্রভু! ক্ষমা করো। তখন আল্লাহ বললেন তোমাকে ক্ষমা করলাম। আর বোবা চেপে দিলাম বনি ইসরাঈলের উপর। তিনি বললেন, প্রভু! এটা কেমন কথা? তুমি তো সুবিচারক। কারো উপর অন্যায় করো না। পাপ করেছি আমি। আর এর শাস্তি ভোগ করবে অন্যজন। আল্লাহ বললেন তুমি যখন পাপ করেছিলে তারা দ্রুত এটা ঘৃণা করে নি।
৩৬৪. কাব বলেন, দাউদ নিঃস্ব দরিদ্র লোকদের কাছে বসে থাকতেন। খুব কাঁদতেন। প্রার্থনা করতেন, প্রভু! নিঃস্ব ও পাপীদের ক্ষমা করো। আর তাদের সাথে দাউদকে ক্ষমা করে দাও। উল্লেখ্য এর আগে তিনি পাপীদের জন্য বদ দোয়া করতেন।
৩৬৫. কাব বলেন, দাউদ বলতেন প্রভু! পাপ ভুলতে পারি না, এজন্য যে আমি এটা স্মরণ করে চিহ্নিত হই। কাঁদি। তোমার কাছে ক্ষমা মাগি।
৩৬৬. উবায়দ ইবনে উমায়র বলেন, দাউদ জোরে কাঁদতেন। উদ্দেশ্য, ক্রন্দন শুনে যেন আরো ক্রন্দন করতে পারেন।
৩৬৭. ওহাব বলেন, পাপ হয়ে যাওয়ার পর দাউদ জঙ্গলে বেড়িয়ে যান। পশুদল তাঁর পাশে জমে যায়। তিনি কাঁদেন। পশুরাও কাঁদে। দীর্ঘ সময় পর সিজদায় পড়ে যান। অশ্রুতে ঘাস-লতা গজে উঠলো। আল্লাহ বললেন, দাউদ! তুমি কি ক্ষুধার্ত? তোমাকে আহার করাবো। পিপাসু? পান করাবো। বস্ত্রহীন? কাপড় পরাবো। একথা শোনে দাউদ আলাইহিস-সালাম বলেন, পাপ আমাকে চেপে ধরেছে। এরপর সিজদায় কাঁদতে থাকেন। তখনই থাকে করুণা করা হয়।
৩৮৮. ওহাব বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন কাঁদতেন পঙ্গদল তাঁর কাছে ভিড় করতো। পাখিরা থেমে যেতো। তিনি বলতেন, ‘প্রভু! পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে গেছে। কপাল রক্তাক্ত। চোখের পানি একদম শেষ। কিন্তু পাপ মোচন হয় নি’। এভাবে কাঁদতে থাকেন। তখনই থাকে করুণা করা হয়।
৩৮৯. বাকর ইবনে আবদুল্লাহ মুয়ানি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম পাপের কারণে ৪০ দিন সিজদায় পড়ে কাঁদতে থাকেন। চোখের পানিতে ঘাস-লতা গড়ে উঠে। আল্লাহ বলতেন, তুমি কি পিপাসু, পান করাবো? ক্ষুধার্ত - তোমাকে খাওয়াবো। বস্ত্রহীন, কাপড় পরাবো? একথা শুনে তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন। তখনই তাঁকে ক্ষমা করা হয়।
৩৯০. আব্দুল আযিয ইবনে ওমর বলেন, পাপ ঘটে যাওয়ার পর দাউদের সুন্দর কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে উঠে। তিনি বলতেন সত্যবাদীদের স্বচ্ছ কষ্টের সামনে আমার ধ্বনি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
৩৯১. পাপ ঘটে যাওয়ার পর বনি ইসরাইলের কাছে গিয়ে কাঁদতে থাকেন। তারাও তার সাথে কাঁদেন। এরপর চলে যেতেন জঙ্গলে। পঙ্গদল তাঁর কাছে আসত। তিনি কাঁদেন, তারাও কাঁদে। পাখিরা কাছে থেমে যেতো। তার কাঁদা দেখে তারাও কাঁদে। এরপর আরো সংকীর্ণতা বোধ করতেন। পাহাড়ে ঘুরতেন। চিৎকার দিয়ে বলেন, প্রভু! পাপের কারণে! তোমাকে ভয় করছি। এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত করতে থাকেন। এরপর চলে যেতেন পরিবারের কাছে। ইবাদতের কামড়ায় প্রবেশ করতেন। কেবল নামায পড়তেন। সেজদায় পড়ে কাঁদেন। ছোট ছেলে এসে বলতেন বাবা! রাত গভীর। রোয়াদারগণ ইফতার করে ফেলেছেন। তিনি জবাব দেন, বাবারে তোমার পিতা তো এ সব লোকদের মত নয়। তোমার বাবা তো বড় একটি অন্যায় করে ফেলেছেন। এখন তিনি, তুমি ও তোমার রাত থেকে তিনি একদম উদাসিন। তখন ছেলে ক্রন্দন করে মায়ের কাছে চলে যেতেন। স্ত্রী এসে বলতেন, আল্লাহর নবী! রাত হয়ে গেছে। রোযাদারদের ইফতারের সময় আসন্ন। আপনার খাবার কি নিয়ে আসব? দরজার পাশ থেকে জবাব দিলেন, পাপ করার পর খাবার খেয়ে দাউদ আর কী করবে? এভাবেই চলতে থাকে তার অবস্থা। তখনই তাঁকে ক্ষমা করা হয়।
৩১. ইয়াহিদি রুকায়ি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম যখন কাঁদতেন আশে পাশের পাখিরাও করুণা হত। দীর্ঘ ক্রন্দনে তারাও তাঁর সাথে আহাজারি করত। তিনি কাঁদতেন আর ঘুরতেন। ‘প্রভু! আমি তো পাপ করে ফেলেছি’ এ কথা বলেন আর কাঁদেন।
৩২. মালিক ইবনে দিনার বলেন, দাউদ যখন রাতে পাপের কথা স্মরণ করতেন, ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন। তখন বলতেন, ‘আকাশের অধিপতি! তোমার দিকে মাথা উঠালাম। মূঢ়েরা তো তাদের মালিকের দিকে চেয়ে থাকে।’ এভাবে সকাল পর্যন্ত কাঁদতে থাকেন।
৩৩. হাসান বলেন, ক্ষমা লাভ করার পর দাউদের রোদন আরো বেড়ে যায়। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো- আল্লাহর নবী! আপনি কি মাফি পান নি? জবাব দেন আল্লাহর কাছে লজ্জা লাগছে, আমি কি করতে পারি?
৩৪. মালিক ইবনে দিনার বলেন, দাউদ বলতেন লোকজন! নারী হলো তিক্ত গাছ। এ গাছ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখ নীচের দিকে রাখবে। পাপী দাউদ যে রকম পাপ করেছে তা থেকে বেচে থাকতে তোমরা আখেরাতের কথা স্মরণ রাখবে। পবিত্রতা বর্ণনা করি আলো সৃষ্টিকারীর। প্রভু! পানি দিয়ে উভয় চোখে, সেজদার মাধ্যমে আমার কপালে আর রুকুর মাধ্যমে হাঁটুতে শক্তি দাও। উদ্দেশ্য, যেনো তোমার সন্তুষ্টি লাভ করি। পবিত্রতা বর্ণনা করি আলো সৃষ্টিকারীর।
৩৫. হাযহায ইবনে জিমার বলেন, দাউদের আঁশ ভর্তি সাতটি বিছানা ছিল। প্রতিদিন তাতে বসতেন। তাঁর চারপাশে ত্রিশ ক্রন্দনকারী সমবেত থাকতেন। চোখের পানি মাটি দিয়ে গড়িয়ে যেত।