📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 চেহারায় কান্নার চিহ্ন

📄 চেহারায় কান্নার চিহ্ন


২০৯. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ঈসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দনের ফলে হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুর চেহারায় দুটি কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল।
২১۰. হযরত আবূ রায়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর মুখমণ্ডলে জুতার ফিতার মতো কালো রেখা অঙ্কিত হয়ে গিয়েছিল, চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার ফলে।
২১۱. হযরত জুহায়র সালাগ্বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কাঁদার ফলে ইয়াযিদ রুক্কাশীর চেহারা ঝলসে যায়।
২১২. হযরত আবদুর রাহমান ইবনে আসলাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির চেহারায় চোখের পানির দাগ পড়ে গিয়েছিল।
২১৩. হযরত মূসা ইবনে সালেহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উকবার উভয় গালে অশ্রু ঝরে পড়ার চিহ্ন দেখেছি।
২১৪. হযরত উকায়বা ইবনে ফুজায়লা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ফজল ইবনে ঈসার উভয় গালে চোখের পানিতে চিহ্ন পড়ে যায়। মনে হতো তার গাল কেউ নখ দিয়ে চিরে ফেলেছে। গোটা জীবনই তিনি কেঁদে কাটিয়েছেন।
২১৫. হযরত জাফর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, হায়সব! আল্লাহর শপথ! কান্নাকাটি যদি নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকতো তাহলে গোটা জীবনই কেঁদে কাটাতাম। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি এতো বেশি কাঁদতেন, তার গালে চোখের পানি ঝরার চিহ্ন পড়ে গিয়েছিল।

📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 জীবনটি যারা কেঁদে কাটালেন

📄 জীবনটি যারা কেঁদে কাটালেন


২১৯. হযরত নুসাইয়ার ইবনে জালুক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রবি ইবনে খুসায়ম খুব বেশি কাঁদতেন। চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে যেতো। প্রায়ই বলতেন, আমরা একদল মানুষকে পেলাম, যাদের পাশে চোরের মতো বসে থাকতাম।
২১৯. হযরত মুসলিম ইবনে খালিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন কা'বা শরীফ তাওয়াফ করতেন চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে যেতো।
২১৮. হযরত মুজার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আব্দুল কায়স গোত্রের একজন যুবক ছিলেন। তিনি দিনরাত কেঁদে কাটাতেন। কোন আলস্য আসতো না। অনুরোধ করা হলো, একটু অল্প করে কাঁদুন না! তিনি বলতেন, কেন অল্প কাঁদবো? আমার কাজ তো চেষ্টা-সাধনা করা। আল্লাহর শপথ! আমি এ চেষ্টা কখনো থামাবো না। বর্ণনাকারী বলেন, দিবানিশি ক্রন্দন করেই এই যুবক জীবন কাটাতেন।
২۱۹. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালেহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বনী তামীম গোত্রের এক লোক আমার নিকট বর্ণনা করেন, হাসান ইবনে সালেহ রাতের এক তৃতীয়াংশ সময় নামায পড়ে কাটাতেন। এরপর নামাযের মুসাল্লায় বসে শুধু কাঁদতেন। আলীও তাঁর কামরায় এসে কাঁদতেন। এছাড়া তাঁদের মাও দিনরাত কাঁদতেন। প্রথমে মা ইন্তিকাল করেন, এরপর আলী। তারপর হাসানের মৃত্যু ঘটে। বর্ণনাকারী বলেন, হাসানকে স্বপ্নে দেখলাম। জিজ্ঞেস করি, আপনার মায়ের অবস্থা বলুন। উত্তরে বললেন, জীবদ্দশায় দীর্ঘদিনের ক্রন্দনের ফলে তিনি চিরকালের আনন্দ লাভ করেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, আলীর অবস্থা কী? জবাব দিলেন, আলী ভালোই আছে। জিজ্ঞেস করি, এবার বলুন আপনি কেমন আছেন? বলেন 'আল্লাহর ক্ষমা ছাড়াও ভরসার আর কী আছে?' একথা বলে তিনি চলে যান।
২২০. হযরত মু'আবিয়া আজরাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলাইমীকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার মনে কী চায়? জবাব দিলেন, কাঁদতে চাই। কাঁদতে কাঁদতে যেনো কাঁদার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলি! তিনি রাতদিন কাঁদতেন। সর্বদা চেহারায় চোখের পানি ঝরতে দেখা যেতো।
২২১. হযরত জাফর ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলাইমিকে দু'ব্যক্তি দেখতে গেলেন। তাঁরা তাঁকে কাঁদতে দেখেন। একজন বললেন, তিনি তো গত তিনদিন-তিনরাত যাবৎ কাঁদছেন। এরপর তারা উভয়ে বেরিয়ে আসলেন।
২২২. হযরত মু'আজ ইবনে ফিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াহ্ইয়াহ্ইয়া ইবনে মুসলিম ‘ক্রন্দনকারী' নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি পাগড়ি পরিধান করতেন। অধিক ক্রন্দনের ফলে চোখের পানিতে পাগড়ির উভয় দিকের শিমলা ভিজে যেতো।
২২৩. হযরত আবূ সাহল মুহাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসির সাথে একটি জানাযায় ছিলাম। দেখতে পেলাম চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেছে। বসে আছেন একদম নীরবে। আমি একথাটি 'ক্রন্দনকারী' ইয়াহ্ইয়াহ্ইয়া ইবনে মুসলিমের সঙ্গে আলোচনা করলাম। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, তুমি যদি দুনিয়ার জীবনে কাঁদো, কবর জীবনের কাঁদা থেকে মুক্তি পাবে।
২২৪. হযরত সাঈদ ইবনে ফুজায়েল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী উপর তলায় থাকতেন আর লোকজন থাকতো নীচ তলায়। এক ব্যক্তি আমাকে বললো, ওয়াসী সারারাত কাঁদতেন। ক্রন্দনে কোনো অলসতা ও বিরক্তিভাব হতো না।
২২৬. হযরত হিশাম কারদাসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির একজন আত্মীয় বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসীর সাথে এক ব্যক্তি সাক্ষাৎ করতে গেলেন। এ সময় আল্লাহাহ্ [একজন মহিলা] তাঁর গৃহে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, ওয়াসীর জন্য যখন রাত হয়, তখন গোটা বিশ্বটাও যদি মৃত্যুবরণ করে, তবুও তার মতো এতো ক্রন্দন হবে না।
২২৭. হযরত আবু উবায়দা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল ওয়াহিদ ইবনে জায়েদের মজলিসে উবা নামক এক যুবক ১ বৎসর লাগাতার শুধু কেঁদেছেন। আবদুল ওয়াহিদ বয়ান পর পর থেকেই তিনি কাঁদতেন, নীরব হতেন না। লোকজন আবদুল ওয়াহিদকে বললো, উবার ক্রন্দনের কারণে আপনার কোন কথাই বুঝি না। তিনি বললেন, কি করতে পারি? উবা তো নিজেকে রক্ষার জন্য কাঁদছেন, কিভাবে তাঁকে বাধা দিই? যদি তাঁকে বারণ করি তাহলে জাতির জন্য এক নিকৃষ্টমানের বস্তায় পরিণত হবো।
২২৮. হযরত সালিম নাফিছ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সমুদ্র তীরে এক রাতে উবাকে দেখতে পেলাম। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত তিনি শুধু এ কথাই বলছিলেন, প্রভু! যদি তুমি আমাকে শাস্তি দাও, তবে তো আমি তোমার প্রেমিক! আর যদি করুণা করো, তবুও আমি তোমার প্রেমিক! এভাবে বার বার বলছিলেন।
২২৯. হযরত মুহাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ফুযায়ল ইবনে ইয়াজের পুত্র আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, ফুযায়ল কাঁদতে ভালোবাসতেন। এমনকি যখন ঘুমোতেন, তখনও ঘরের লোকজন ক্রন্দনের আওয়াজ শোনাতো।
২৩০. হযরত বারি ইবনে সাবিত রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরীকে দেখেছি চিৎ হয়ে শুয়ে কাঁদছেন।
২৩۱. হযরত ইউনুস ইবনে উবায়েদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা হাসান বসরীর সাথে যখনই সাক্ষাত করতাম, দেখতাম তিনি কাঁদছেন। কাঁদন দেখে আমাদের করুণা হতো।
২৩২. হযরত মানসুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরীর কাঁদা দেখে আমাদের দিল গলে যেতো।
২৩৩. হযরত উবায়েদুল্লাহ ইবনে আয়জার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যখনই হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে দেখেছি তাঁর উভয় চোখের মধ্যখানে একটি চিহ্ন পেতাম। মনে হতো এটা ক্ষতচিহ্ন। যখন তিনি নিজে বা অন্য কেউ আখিরাতের আলোচনা করতেন, তাঁর দু’চোখ যেনো চার চোখে পরিণত হতো!
২৩৪. হযরত রাবি আবু মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াযিদ রুকাশী কাঁদতেন, বেহুঁশ হতেন। জ্ঞান ফিরে আসতো, আবার কাঁদতেন পুনরায় বেহুঁশ হতেন। অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে তাঁর পরিবারের নিকট নিয়ে যাওয়া হতো। তিনি বলতেন, ক্রন্দনের দিন আসার আগে কাঁদো! আহাজারির দিন আসার আগে আহাজারি করো! তাওবার দরজা বন্ধ হওয়ার আগে তাওবাহ করো! নূহ আলাইহিস-সালামকে 'নূহ' বলা হতো এজন্য, তিনি ‘নাওয়াহ’ তথা অধিক ক্রন্দনকারী ছিলেন। তাই যুবক-বৃদ্ধরা! তোমরা নিজেদের জন্য কাঁদো। তিনি এসব কথা বলতেন, আর দাড়ি ও গাল বেয়ে চোখের পানি ঝরে পড়তো।
২৩৫. হযরত ফুযায়েল ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ঘটনাটি আমার বোন বর্ণনা করেছেন। বনী তামীম গোত্রের আবদুল ওয়াহ্হাবের এক বন্ধু ছিলেন। যখনই বন্ধুদ্বয়ের সাক্ষাত হতো, উভয়ে একত্রে কাঁদতেন। এমনকি কোন সময় সকাল থেকে যোহর পর্যন্ত ক্রন্দন চলত। আমি মুহাম্মাদকে বললাম, বন্ধুর সাথে সাক্ষাত হলেই উভয়ে কাঁদা শুরু করে দাও, কেউ কারো কথা শোন না? তাই জবাব দেন, চুপ থাকো! দুনিয়া তো আনন্দের জায়গা নয়। স্থায়ী আরাম-আয়েশের ক্ষেত্র নয়। পরকালের পাথেয় যে সংগ্রহ করলো, সে-ই তো সৌভাগ্যবান। আল্লাহর শপথ! ক্রন্দন আমার হৃদয়ের প্রশান্তি। যদি ক্রন্দন না হয়, তাহলে দুনিয়ার জীবনের পেরেশানীর কারণে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে পড়ে। বোন বলেন, আল্লাহর শপথ! তাঁর এ কথাটি আমাকে কাঁদিয়েছে।
২৩৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইবনে আবি রাওয়াদ যখন কথা বলতেন, গাল বেয়ে অশ্রু ঝরত। এভাবে উছায়াহ যখন কথা বলতেন, চোখ দিয়ে পানি বর্ষণ হতো।
২৩৭. হযরত সাঈদ ইবনে আমির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক ‘ক্রন্দনকারী’ ইয়াহইয়া গোল করে পাগড়ি বাঁধতেন। চোখের পানিতে পাগড়ির শিমলা ভিজে যেতো।
২৩৮. হযরত ইয়াহইয়া ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন কথা বলতেন, শ্বাস-প্রশ্বাস পানি মিশ্রিত হয়ে যেতো। যখনই তাঁর কাছে বসেছি কেবল কেঁদেছি।
২৩৯. হযরত আবদুল ওয়াহিদ ইবনে জায়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তুমি যদি হাসান বসরীকে দেখো, তাহলে তাঁর কথা শুনার পূর্বে তুমি কেঁদে ফেলবে। হাসানকে দেখবে আর কাঁদবে না, এরূপ কোনো মানুষ আছে? এটুকু বলে আবদুল ওয়াহিদ খুব বেশী কাঁদলেন।
২৪۰. হযরত মালিক ইবনে মুগাওয়াল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জনৈক ব্যক্তি দিনরাত কাঁদতেন। তাঁর মা বলতেন, যদি তুমি কাউকে হত্যা করতে, তাহলে তার পরিবার-পরিজন তোমার এই ক্রন্দন দেখে হয়তো মাফ করে দিত। একথা শুনে তিনি আরো কাঁদলেন এবং বললেন, মা-জননী! আমি তো নিজেকে হত্যা করে ফেলেছি! ছেলের মুখ থেকে এরূপ কথা শোনে মা-ও কাঁদতে লাগলেন।
২৪۰. হযরত সুফিয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাঈদ ইবনে সাঈদ সব সময় কাঁদতেন। চোখের পানি শুকাতো না। তাওয়াফ করেছেন, কাঁদছেন। কুরআন তিলাওয়াত করেছেন, কাঁদছেন। রাস্তায় আছেন, তখনও কাঁদছেন। এক ব্যক্তি তাঁকে তিরস্কার করলো, তখনো কাঁদলেন। এরপর বললেন, হ্যাঁ অধিক কাঁদার কারণে আপনি আমাকে তিরস্কার করছেন। কিন্তু ক্রন্দন তো আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। লোকটি বলেন, তাঁর এ কথা শুনে তাঁকে ছেড়ে চলে গেলাম।
২৪১. হযরত হিশাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার বাবা উবায়দ সায়রাফী বলেন, এক বছর হাসান বসরীর সান্নিধ্যে কাটিয়েছি। দেখতাম, চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি যেন সব সময় ভিজে থাকত।
২৪২. হযরত সুহায়ল ইবনে আবদুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাদের সাথে সালাতুল আসর আদায় করলেন। সালাম ফেরানোর পর হাতের আঙুলে কামড় দিলেন। এরপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে।
২৪৩. হযরত মুসলিম নাহহাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনে সাওয়্কার সাথে সাক্ষাৎ করতাম। তিনি কেবল একটি কথাই বলতেন, পূর্ববর্তী কোন মানুষের কাছে যে দিন যে রাত চলে গেছে তা আর কখনো ফিরে আসে নি। একথা বলতেন আর কাঁদতেন।

📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 ক্রন্দনের কারণে যারা তিরস্কৃত হতেন

📄 ক্রন্দনের কারণে যারা তিরস্কৃত হতেন


২৪৪. হযরত আবদুর রাহমান ইবনে ইয়াযিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি ইয়াযিদ ইবনে মূসাদকে বললাম, কী ব্যাপার! আপনার চোখ শুকায় না কেন? জবাব দিলেন, তোমার জানার উদ্দেশ্য কী? বললাম, হয়তো এর দ্বারা আল্লাহ তা’আলা আমাকে উপকৃত করবেন। তিনি বললেন, ভাই! আল্লাহ আমাকে ভয় প্রদর্শন করেছেন। যদি তাঁর অবাধ্যতা করি তিনি আগুনের মধ্যে বন্দী করবেন। আল্লাহর শপথ! যদি তিনি আমাকে গোসলখানায়ও বন্দী রাখার ভয় দেখাতেন, তথাপি আমার চোখ অশ্রুসিক্ত থাকতো।
২৪৫. হযরত সালামা ইবনে সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, লোকজন ইয়াযিদ রুক্বাশীকে প্রশ্ন করলেন, অধিক ক্রন্দনে আপনি বিরক্তবোধ করেন না? তিনি কাঁদলেন এবং বললেন, দুষ্কপোষ্য শিশু কি কখনো পরিতৃপ্ত হয়? আল্লাহর শপথ! দুনিয়ার জীবনে চোখের পানি আসতে আসতে যদি রক্ত আসে এবং এরপর পূঁজ বের হয় তবুও তা আমার নিকট প্রিয়। আরো বললেন, জানতে পেরেছি, জাহান্নামীদের চোখের পানি পড়া যখন বন্ধ হবে তখন রক্ত ঝরবে। যদি সেই রক্তের বন্যায় নৌকা ছাড়া হয় তথাপি তা ভেসে চলবে। সুতরাং যে ব্যক্তি দুনিয়াতে বেঁচে আছে সে কাঁদবে না তো কি করবে? আরো বলেন, ইয়াযিদ! ক্রন্দনের যুগ আসার আগে নিজের জন্য কাঁদতে থাকো। হযরত নূহ আলাইহিস-সালামকে ‘নূহ’ এজন্যই বলা হতো, তিনি নিজের জন্য কাঁদতেন। ইয়াযিদ! তোমার মৃত্যুর পর কে তোমার জন্য নামায পড়বে, কে রোযা রাখবে, কে তোমার জন্য প্রভুর দরবারে ফরিয়াদ করবে? তিনি এসব কথা বার বার বলেছেন আর কাঁদছেন। তারপর বলেন, ভাইসব! তোমরা কাঁদতে থাকো, না পারলে নিজেকে কাঁদা ও! যদি ক্রন্দন করতে অপারগ হও তাহলে যে কাঁদে তাঁর প্রতি দয়াপরবেশ হও!
২৪৬. হযরত ইসমাঈল ইবনে জাওয়াআন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াযিদ রুক্বাশী ঘরে প্রবেশ করলে কাঁদতেন, জানাযায় শারীক হলে কাঁদতেন, বন্ধু-বান্ধবরা যখন কাছে বসতেন তখনও নিজে কাঁদতেন এবং তাঁদেরকেও কাঁদাতেন। তাঁর ছেলে একদিন বললেন, বাবাজান! আর কত কাঁদবেন? আল্লাহর শপথ! জাহান্নাম যদি কেবলমাত্র আপনার জন্য সৃষ্টি করা হতো তবুও হয়তো এতো কাঁদতেন না। তিনি জবাব দেন, এ কী বলছ? দোষ তো আমি, আমার বন্ধু-বান্ধব ও আমাদের জিয়াও ভাইদের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। তুমি কি পাঠ করো নি, سَنَفْرُغُ لَكُمْ أَيُّهَا الثَّقَلَانِ [হে জিন ও মানব! আমি শীঘ্রই তোমাদের জন্য কর্মমুক্ত হয়ে যাব] তুমি কি পড়ো নি, يُرْسَلُ عَلَيْكُمَا شُوَاظٌ مِّن نَّارٍ وَنُحَاسٌ فَلَا تَنتَصِرَانِ [তোমাদের প্রতি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও ধূমকুন্ড ছাড়া হবে, তখন তোমরা সেসব প্রতিরোধ করতে পারবে না] এভাবে তিলাওয়াত করে করে যখন এই আয়াতে আসতেন: يَطُوفُونَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ حَمِيمٍ آنٍ [তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মাঝখানে প্রদক্ষিণ করবে] তখন ঘুরপাক খেয়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে পড়তেন। তাঁর স্ত্রী সন্তানকে বললেন, পুত্র! তোমার বাবার সাথে এ কী আচরণ করছো? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি তো বিষয়টিকে কেবল সহজ করার চেষ্টা চালাচ্ছি। তিনি যে নিজেকে মেরে ফেলবেন, তাতো আমি কল্পনাও করি নি।
২৪৭. হযরত আবদুন নূর ইবনে ইয়াযিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার বাবা ইয়াযিদ রুক্বাশী কেঁদে কেঁদে বন্ধুদেরকে বলতেন, অন্ধকার দিন আসার পূর্বে কাঁদো! আগামীকাল কাঁদার আগে আজই কাঁদো! যেদিন কাঁদলে কোন উপকার হবে না, সেদিন উপস্থিত হওয়ার আগেই কাঁদো! দুনিয়ার জীবনে বেশী করে কাঁদো! এসব কথা বলে তিনি চিৎকার দিয়ে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়তেন।
২৫৮. শাম দেশের উমাইয়া নামক ব্যক্তি বানী সাহাম ফটকের পাশে এসে নামায পড়তেন। খুব জোরে জোরে কাঁদতেন। চোখ বেয়ে পানি ঝরে পড়তো। একদিন গভর্নর তাঁর নিকট সংবাদ প্রেরণ করলেন, আপনি জোরে জোরে কেঁদে মুসলিমদের নামাযের ক্ষতি করেছেন। ভালো হতো যদি একটু আস্তে করে কাঁদতেন। উমাইয়া একথা শুনে কাঁদলেন এবং বললেন, চিন্তা ও পেরেশানীর দিনের কথা স্মরণ হলে আমি কাঁদি। কাঁদার মধ্যে আরাম বোধ করি। আরো বলতেন, অনুগত বান্দার চেয়ে আর কে সৌভাগ্যশীল হতে পারে? জেনে রাখো, একমাত্র আনুগত্যের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত। আল্লাহর আনুগত্যশীল বান্দা তো দুনিয়া এবং আখিরাতে বাদশাহ। এভাবে তাওয়াফ পালনের সময়ও তিনি কাঁদতেন। কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়তেন।
২৫৯. হযরত ফায়াজ ইবনে ফজল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মিসওয়ার কাঁদলেন, সাথে তাঁর মাও কাঁদলেন। পুত্র মাকে জিজ্ঞেস করেন, মাগো! কিসের জন্য কাঁদছো? মা জবাব দেন, আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি কাঁদছো- তাই আমিও কাঁদছি! পুত্র বললেন, ওহে আম্মাজান! যেদিন আমাদের উপর আক্রমণ হবে সেদিন ক্রন্দনেই আমাদেরকে ছায়া দান করবে। মা বললেন, ওহে বৎস! এ আক্রমণ কিসের? পুত্র জবাব দেন, এটা হলো কিয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতি। এরপর উভয়ে বেশ কাঁদলেন। মিসওয়ার আরো বলতেন, যদি আমার মা না থাকতেন, একান্ত গুরুতর ছাড়া মসজিদ ত্যাগ করতাম না। ঘরে বাইরে যেখানেই তিনি থাকতেন, কেবল কাঁদতেন। নামাযে কাঁদতেন। বসে বসেও কাঁদতেন।
২৬০. হযরত আবু হামযা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি রিয়া কায়িসির সাথে ভ্রমণে ছিলাম। একটি ছোট ছেলে কেঁদে কেঁদে কাছে আসলো। রিয়া তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা! কাঁদছো কেনো? শিশুটি কোনো জবাব দিতে পারলো না। এতে তিনিও কাঁদলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, আবু হামযা! দোযখীদের জন্য আর কিসের মধ্যে শান্তি থাকতে পারে? এটুকু বলে তিনি কাঁদতে থাকেন।
২৪১. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ফাররুখ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রিয়াহ কাইসী আমার সাক্ষাতে আসলেন। রাতের বেলা আমাদের শিশু কেঁদে উঠলো। শিশুর সাথে তিনি কাঁদতে লাগলেন। সকাল পর্যন্ত অব্যাহত রইলো। ঘটনাটি একদিন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম। তিনি জবাব দিলেন, শিশুটির ক্রন্দন দেখে জাহান্নামে অগ্নি দগ্ধ লোকদের কথা মনে পড়ে গেল। তাদের তো কোনো সাহায্যকারী নেই। একথা বলে তিনি আবার কাঁদতে লাগলেন।
২৪২. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযীদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি সাইদ ইবনে সায়িব থেকে অতি দ্রুত ক্রন্দনকারী কোন লোক দেখি নি। তাঁকে একটু আবেগ-তাড়িত করলেই চোখ বেয়ে পানি ঝরে পড়তো।
২৪৩. হযরত ফাইয়াজ ইবনে মুহাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জিয়াদ আসওয়াদ একদিন কাঁদতে লাগলেন। মাইমুন ইবনে মেহরান জিজ্ঞেস করলেন, জিয়াদ! আর কতো কাঁদবে? জবাব দিলেন, আবু আইয়ুব! কাঁদা ছাড়া আমার যে আর কিছু করার নেই।
২৪৪. হযরত সিরাহ আরু উবায়দা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলায়মার স্ত্রী বললেন, আতা খুব বেশী কাঁদেন। তাঁকে কিছু বলুন। আমি তাঁকে তিরস্কার করলে তিনি জবাব দিলেন, হে সিরাহ কেন তিরস্কার করছো? এটা তো আমার জন্য মঙ্গলময়। জাহান্নামের অগ্নিতে যারা পুড়বে তাদের কথা স্মরণ করছি। আমি নিজেও তাদের সাথী মনে করি। যে লোককে শিকলে বেঁধে জাহান্নামে টেনে নিয়ে নিক্ষেপ করা হবে, সে কী কাঁদবে না, চিৎকার করবে না?
২৪৫. হযরত সিরাহ আনাজী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলায়মার সাথে সাক্ষাৎ হলেই দেখতাম, উভয় চোখ অশ্রুসজল। তাঁর তুলনা চলে সন্তানহারা মায়ের সাথে। মনে হতো তিনি এ পৃথিবীর অধিবাসী নন।
২৬৬. হযরত সালেহ মুররী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলায়ামীকে বললাম, আপনি কী আকাঙ্ক্ষা করছেন? তিনি এত কাঁদলেন এরপর বলেন, আবু বশর! আল্লাহর শপথ! আমি তো অদ্বারে পরিণত হতে চাই! দুনিয়া-আখিরাতে আমার কোন অস্তিত্ব যেনো না থাকে। সালেহ বলেন, আমি তাঁর এ কথাটুকু শুনে কাঁদতে থাকি। আল্লাহর শপথ! আমি জানি তিনি তো হিসাব দিনের জটিলতা থেকে মুক্তি কামনা করছেন।
২৬৭. হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একজন সাধক আরেক সাধকের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। ক্রন্দনের কারণে তাঁর চোখ দুটো নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। সাক্ষাৎকারী সাধক জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? জবাব দিলেন, কেনো কাঁদবো না? আল্লাহর শপথ! আমি চাই পুরা জীবনটাই কাঁদতে কাঁদতে কাটিয়ে দিই।
২৬৮. হযরত নাঈম তামিমী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মাইসারা কাইসী কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে পড়তেন। বলা হলো, হযরত! নিজের উপর একটু দয়া করুন। জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! কোনো করুণা করবো না নিজের উপর। কিয়ামত যে আমার সামনেই। আমি তখন জানতে পারবো, প্রভুর কাছ থেকে শুভ ও না অশুভ ফল পাবো। দীর্ঘ ক্রন্দনের দরুন মাইসারা কাইসী শেষ পর্যন্ত অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
২৬৯. হযরত আবিদ আবু ইয়াইয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবাদান অঞ্চলে একজন আবিদকে দেখেছি। তিনি রাতদিন শুধু কাঁদতেন। বললাম, ভাই! আর কতো কাঁদবেন? একথা শুনে তিনি আরো কাঁদতে লাগলেন। বললেন, বলুন, কাঁদবো নয়তো কী করবো? এটুকু বলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
২৭০. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাজা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াযিদ রুক্কাশী চল্লিশ বছর কাঁদলেন। তাঁর চোখের পানি শুকাতো না। যখন বলা হতো, কেন এতো কাঁদছেন? বলতেন, আমি তো ক্রন্দনকারীদের মধ্যে অগ্রগামী হতে পারি নি।

📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 অধিক ক্রন্দনকারীদের হৃদয়াকর্ষক কাহিনী

📄 অধিক ক্রন্দনকারীদের হৃদয়াকর্ষক কাহিনী


২৬۱. হযরত যাযাদ ইবনে ওযাহাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহর চোখের পানিতে পাথরের উপর দুটি চিহ্ন পড়তে দেখেছি।
২৬২. হযরত যাযাদ ইবনে ওযাহাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহকে কাঁদতে দেখেছি। তিনি হাত দিয়ে চোখের পানি মুছছিলেন।
২৬৩. হযরত মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যদি কাঁদা আমার নিয়ন্ত্রণাধীন হতো তাহলে গোটা জীবনটাই কেঁদে কাটাতাম। যদি মানুষ আমাকে পাগল না বলতো, তাহলে মাথায় মাটি তুলে রাস্তাঘাট ও গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়াতাম। এ অবস্থায়ই মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন হতো। একথা বলে তিনি অঝোর ধারায় অশ্রু বর্ষণ করে কাঁদতে লাগলেন।
২৬৪. হযরত আফলা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আলীর সাথে হজ্ব আদায় করতে গেলাম। মসজিদে প্রবেশ করে আবেগভরে বাইতুল্লাহর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। জোরে জোরে কাঁদতে লাগলেন। বললাম, হযরত! আশপাশের লোকজন আপনার দিকে তাকাচ্ছে। একটু আস্তে আস্তে কাঁদলে ভালো হতো! তিনি বলেন, আমি কাঁদবো না? আল্লাহ পাক যদি আমার প্রতি একটু করুণার দৃষ্টিতে তাকান তাহলে আমি সফল হবো। এরপর বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করে মাকামে ইব্রাহীমের পেছনে দাঁড়িয়ে নামায শুরু করলেন। সিজদা থেকে ওঠার পর দেখা গেলো, সিজদার জায়গাটুকু চোখের জলে সিক্ত হয়ে গেছে।
২৬৫. হযরত ইয়া'লা ইবনে আসাদাক্ব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান একব্যক্তিকে দেখলেন দীর্ঘ সময় ধরে সিজদায় আছেন। তিনি যখন মাথা উঠালেন, দেখা গেল সিজদার জায়গা অশ্রুতে ভিজে গেছে। আব্দুল মালিক এক ব্যক্তিকে বলে রাখলেন, তাঁর পাশে দাঁড়াও। নামায শেষ হয়ে গেলে তাঁর জ্ঞানের পরীক্ষা নেবে। নামায শেষে তিনি লোকটির নিকট এসে বললেন, আমি তো আপনার মধ্যে জান্নাতের ছবি দেখতে পাচ্ছি। একথা শ্রবণ করামাত্র লোকটি বিকট শব্দে চিৎকার দিলেন। আব্দুল মালিক তা সহ্য করতে পারলেন না- অজ্ঞান হয়ে পড়েন। দীর্ঘক্ষণ পর তাঁর হুঁশ আসলো। তিনি লক্ষ্য করলেন ঐ লোকটি তাঁর চেহারার ঘর্ম মুছেন আর বলছেন, প্রভু! তোমার এ অবাধ্য বান্দাতো ধ্বংস হয়ে গেল। একথা শুনে আব্দুল মালিক আবার কাঁদতে লাগলেন। ঐ আবিদ লোকটি এবার এদিক-সেদিক না তাকিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন।
২৬৬. হযরত হাফস ইবনে গিয়াস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা ইবনে জারিরের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি ক্বিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থার উপর আলোচনা করছিলেন। নিজে কাঁদলেন, উপস্থিত লোকজনও খুব বেশি কাঁদলেন। ওররাদ নামক একব্যক্তি চিৎকার শুরু করলেন। শরীরে কম্পন আসলো। এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। ইবনে জারির কেঁদে কেঁদে বললেন, ওররাদ! আমাদের মধ্যে কেবল তোমার কাছেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা আসলো। জাহান্নাম থেকে মুক্তির বিশ্বাস একমাত্র তোমার হৃদয়েই বিরাজ করছে। লোকজন! আল্লাহ্র শপথ! ওররাদই আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। তাঁর মধ্যে যে ভয় ও আশার অবস্থা আছে, আমাদের সবার মধ্যে তা থাকা চাই। আল্লাহ্র আনুগত্যে আমরা সবাই সমান। কিন্তু আমরা আটকা পড়ে গেছি, আর তিনি এগিয়ে আছেন। আমরা সবাই ওয়াজ শোনলাম, আলোচনা বুঝলাম কিন্তু কারো মধ্যে তাঁর মতো ক্রিয়া সৃষ্টি হলো না। এটাই তাঁর হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতার নিদর্শন। আর আমাদের হৃদয় পাপের আঁধারে আচ্ছন্ন। একথা বলে ইবনে জারির খুব বেশি কাঁদলেন। ক্বুরআন শরীফের এই আয়াতংশ তিলাওয়াত করলেন: إِنْ نَحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ [আমরাও তোমাদের মত মানুষ, কিন্তু আল্লাহ বান্দাদের মধ্য থেকে যার উপরে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন (১৪:১১)]। হাফস বলেন, আমি ওররাদকে দেখতাম মাথা ঢেকে মসজিদে আসতেন। এক কোণে বসে নামাজ পড়তেন, দু’আ করতেন আর প্রাণ খুলে আল্লাহর দরবারে কাঁদতেন। তারপর বেরিয়ে যেতেন। আবার যুহরের সময় আসতেন। অনুরূপ নামাজ-দু'আয় সময় কাটাতেন। ইশা পর্যন্ত একইভাবে ইবাদতে মশগুল থাকতেন। কারো সাথে কথা বলতেন না। কারো নিকটে বসতেনও না। আমি তাঁর আখলাক ও বৈশিষ্ট্যে প্রভাবিত হলাম। এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি কে? জবাব দিলেন, তুমি যার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো তিনি তো ওররাদ আজালী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। যিনি আল্লাহর সাথে এই প্রতিজ্ঞা করেছেন, যে পর্যন্ত না তিনি প্রভুর চেহারা দেখবেন সে পর্যন্ত তিনি হাসবেন না।
২৬৭. হযরত সাকিন ইবনে মাকিন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ওররাদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। তাঁর ছোট বোনকে জিজ্ঞেস করি, ওররাদ কিভাবে রাত্রি যাপন করতেন। বললেন, ক্রন্দন আর আহাজারি করে। জিজ্ঞেস করলাম, রাতের কোন অংশে? জবাব দিলেন, রাতের প্রথম ও শেষ তৃতীয়াংশে। জানতে চাইলাম, তিনি পাঠ করতেন এমন কোন দু'আ কি আপনার মুখস্থ আছে? উত্তর দিলেন, সুবহে সাদিকের প্রাক্কালে তিনি সিজদা করতেন। কেঁদে কেঁদে বলতেন, মাওলা! তোমার বান্দা আনুগত্যের মাধ্যমে সান্নিধ্য কামনা করছে। করুণাময়! স্বীয় তাওহিদ দিয়ে তাকে সাহায্য করো। মাওলা! এই অধম বান্দা তোমার ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকতে চায়। করুণাময়! করুণা দ্বারা তাকে সাহায্য করো। মাওলা! বান্দা তোমার কল্যাণের ভীষণ প্রত্যাশী। যেদিন সফলকাম লোকেরা কল্যাণ লাভ করে আনন্দবোধ করবে, সেদিন তোমার এ বান্দার প্রত্যাশাটুকু ভেঙে দিও না- নিরাশ করো না। এভাবে দু'আ করতে করতে সকাল সন্ধ্যা শুধু কাঁদতেন। কঠোর সাধনা হেতু বেশ দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁর চেহারার রং বদলে যায়।
২৬৮. হযরত সাক্বিব ইবনে মাকিন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ওরাদা আজালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন মৃত্যুবরণ করলেন, লোকজন তাঁকে দাফন করতে কবরের পাশে নিয়ে গেল। কবর থেকে যে কী অপূর্ব ঘ্রাণ! সুশোভিত হলো চতুর্দিক। যারা কবরে দাফন করার জন্য নেমেছিল তারা ঘ্রাণযুক্ত মাটি নিয়ে আসলো। কবরস্থ করার পর দীর্ঘ সত্তর দিন পর্যন্ত এই ঘ্রাণটি স্থায়ী ছিলো। সকাল-সন্ধ্যা লোকজন তাঁর সমাধিতে আসতেই থাকে- দিন দিন জিয়ারতকারীদের সংখ্যা বাড়তে আছে। তখন শাসক আশঙ্কা করলেন, লোকজন ফিতনায় পতিত হবে। তিনি এক লোককে ঘ্রাণযুক্ত মাটি আনার জন্য পাঠালেন। শাসক এই অপূর্ব সুগন্ধি উপভোগ করলেন। এরপর তিনি লোকজনকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। এ ঘটনার পর কবর থেকে সুঘ্রাণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
২৬৯. হযরত মিকওয়্যাল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার কাছে বুরাইহম আসলেন। বললেন, তোমার কোন প্রতিবেশী বা কোন ভাই আছে কি যে আমার সঙ্গে সন্তুষ্টচিত্তে হজ্ব গমন করবে? জবাব দিই, হ্যাঁ, আছেন। তখন আমি এক মুত্তাকী লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। আলোচনা করে হজ্ব গমনের জন্য তারা উভয়েই রাজি হলেন। এরপর বুরাইহম বাড়িতে চলে যান। পরদিন ঐ লোকটি আমার কাছে আসলো, বললো, আমি যেতে পারবো না, অন্য কোন সাথী খুঁজে দেখুন। আমি বললাম, সর্বনাশ! কী বলছো? আল্লাহর শপথ! কুফা নগরীতে তাঁর মতো সচ্চরিত্রবান আর কাউকে দেখি নি। তাঁর সঙ্গে আমি সমুদ্র ভ্রমণ গিয়েছি। তিনি শুধু কল্যাণকর কাজই করতেন ও দীর্ঘসময় নিরলসভাবে কাঁদতেন। তাঁর ক্রন্দন আমাদের ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করে দিতো। একথা শোনে লোকটি বললো, সর্বনাশ! ক্রন্দন তো বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হয়। হৃদয় যখন নরম হয় তখনই তো চোখে পানি আসে। আমি বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু তাঁর বেলায় ব্যতিক্রম আছে। তিনি খুব বেশি কাঁদেন। এবার লোকটি বললেন, আমি তাঁর সাথে হজ্ব যাবো। তাঁর দ্বারা উপকৃত হবো। আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করবো।
পরদিন তাঁরা উঠে বেরিয়ে পড়লেন। উটে আরোহণ করলেন। বুহাইম যখন আরোহণ করলেন, তখন হাত দাঁড়ির নীচে রাখলেন। তাঁর গাল বেয়ে চোখের পানি পড়ছিলো, দাঁড়ি ভিজে গেছে, বুক ভাসছে। আল্লাহর শপথ! অঙ্গজলে জমিনও সিক্ত হয়েছে। তাঁর সফর সাথী আমার বন্ধু বললেন, মিকওয়াল! তিনি তো ক্রন্দন শুরু করে দিয়েছেন। আমার ভ্রমণসঙ্গী হবেন কিভাবে? বললাম, যাও! চলতে থাকো। পরিবার পরিজনের বিরহে তিনি কাঁদছেন। বুহাইম আমার কথা শোনলেন, বললেন, আল্লাহর শপথ! ভাই বিষয়টি এরূপ নয়। এ মুহূর্তে ইহ-পরকালের ভ্রমণের কথা স্মরণ হয়ে গেছে। এরপর আরো জোরে কাঁদতে লাগলেন। সাথী বললেন, মিকওয়াল! এটাই হলো তোমার সঙ্গে আমার প্রথম শত্রুতা! বুহাইমের সাথে আমার কী সম্পর্ক হতে পারে? তাঁর জন্য উচিৎ হলো, জাউওয়ান ইবনে উলবা, দাউদ তায়ী, সালাম আবিল আহওয়াস (রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম) এর সাথে সফর করা। তাঁরা পরস্পরে মিলে কাঁদবেন ও এক সাথে মৃত্যুবরণ করবেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাঁদের সাথে চলতে থাকি আর বলি, সর্বনাশ! বন্ধু! তিনি তোমার এক উত্তম সাথী। তিনি হজ্ব দীর্ঘদিন থাকেন। একজন সৎ লোক। উদার মনের ব্যবসায়ী। সাথী জবাব দিলেন, হ্যাঁ- তাঁর সাথে আমার এই ব্যাপারটি প্রথম। এতে হয়তো কল্যাণ নিহিত আছে। আমরা উভয়ের এসব কথাবার্তা বুহাইমের কানে যায় নি। যদি যেতো তাহলে হয়তো তাঁকে সাথে নিতেন না। অতঃপর তাঁরা দু'জন সফরে একসাথে চলে গেলেন। পবিত্র হজ্ব আদায় করলেন। এরপর বাড়িতে ফিরে আসলেন। তাঁদের মধ্যে তৈরী হলো গভীর ভ্রাতৃত্ব বন্ধন।
আমি প্রতিবেশী বন্ধুটির সাথে সাক্ষাৎ করলাম। সালাম জানালাম। বললেন, ভাই! আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দিন। সমাজে এখনো হয়তো আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতো মানুষ জীবিত আছেন! তুলনামূলক আমি ধনী, তিনি গরীব। অথচ তিনি আমার জন্য ব্যয় করেছেন। আমি যুবক, তিনি বৃদ্ধ- অথচ তিনি আমার সেবায় লেগে যেতেন। তিনি রোযাদার- আমি রোযা রাখি নি। তথাপি তিনি খাবার পাক করতেন আমার জন্য। আমি (বর্ণনাকারী) তখন জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কেন তাঁর সঙ্গে ভ্রমণ করতে নিরুৎসাহ ছিলে? তিনি বললেন, অধিক ক্রন্দনের কারণে আমি ভয় পেয়েছিলাম। তাছাড়া সফরে অন্যান্য লোকদের অসুবিধা হবে– তাও আশঙ্কা করেছি।
পরে আসলাম বুহাইমের কাছে। সালাম জানালাম। জিজ্ঞেস করলাম, সাথীকে কেমন লাগলো? জবাব দিলেন, বেশ উত্তম বন্ধু। বেশী করে তিনি আল্লাহর জিকির করেছেন, দীর্ঘ সময় তিলাওয়াত করেন, দ্রুত চোখ বেয়ে অশ্রু বেরিয়ে আসে। তাঁকে তুমি আমার সাথে দিয়েছ, আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
২৭১. হযরত মুআজ ইবনে জিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবাদান শহরে কিছু আবিদ থাকতেন। তাঁদের মধ্যে বুহাইম নামক একজন ছিলেন। তিনি খেজুর গাছের নীচে বসে নামায পড়তেন। দীর্ঘ সময় বসে থাকতেন। খুব বেশী চিন্তামগ্ন দেখাতো। ফুঁসিয়ে ফুঁসিয়ে কাঁদতেন। তাঁর ক্রন্দনের আওয়াজ শুনা যেতো। শরীরে মশা-মাছি বসার কারণে কষ্ট পেলে বলতেন, বুহাইম! তোমার মধ্যে মশা-মাছির অনুভব বিদ্যমান- মৃত্যুর খবর কি আছে?
২৭১. হযরত মুআফ্ফিয়া ইবনে আমর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বুহাইম দীর্ঘকায় বাদামী রংয়ের ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে সব সময় চিন্তামগ্ন দেখা যেতো।
২৭১. হযরত আবদুর রহমান ইবনে জিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা ইবনে ইয়াসার, সুলায়মান ইবনে ইয়াসার এবং তাঁদের বন্ধুরা হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে মদীনা শরীফ থেকে বেরিয়ে পড়লেন। আবওয়ায়ে এসে যাত্রাবিরতি করেন। সুলায়মান ও তাঁর বন্ধুরা কোন এক প্রয়োজনে বেরিয়ে যান। এদিকে আতা ইবনে ইয়াসার সে স্থানে একা একা নামায পড়তে লাগলেন। এসময় এক সুন্দরী আরবী মহিলা তাঁর নিকটে আসলেন। আতা ভাবলেন, হয়তো তিনি কোন প্রয়োজনে এসেছেন, তাই নামায সংক্ষেপ করলেন। মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কোন প্রয়োজন আছে? মহিলা জবাব দেন, হ্যাঁ। আমি আপনার সাথে মিলিত হতে চাই! তিনি বললেন, দূর হও এখান থেকে! তুমি আমাকে ও নিজেকে জাহান্নামের আগুনে জ্বালাতে চাও। বুঝতে পারলেন মহিলাটি তাঁকে উত্তেজিত করতে চেষ্টা করছে। তাই কাঁদতে শুরু করলেন। বললেন, আমার কাছ থেকে দূর হও! দূর হও! ক্রন্দন বেড়ে গেল। এবার মহিলাটি নিজেও কাঁদতে লাগলো। সুতরাং উভয়ের ক্রন্দন শুরু। এমন সময় সুলায়মান এসে উপস্থিত। উভয়কে কাঁদতে দেখে তিনিও নীরব থাকেন নি। এক কোণে বসে কাঁদতে লাগলেন। জানতেন না, কিসের জন্য আতা ও মহিলা কাঁদছিলেন।
এভাবে সাথীদের একেকজন সেখানে আসেন আর কাঁদতে থাকেন। কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করেন না, কিসের কারণে এ ক্রন্দন। ক্রন্দনের রোল পড়ে যাওয়ার পর মহিলাটি সে স্থান ত্যাগ করলো। লোকজন একে একে উঠে পড়লেন। আতা বয়সে সুলায়মান থেকে বড়। মহিলা সম্পর্কে তিনি আতাকে কোন প্রশ্নই করলেন না। কোন এক প্রয়োজনে উভয় তাই মিশর ভ্রমণে গেলেন। দীর্ঘদিন মিশরে থাকলেন। একদিন ঘুমের মধ্যে আতা কেঁদে উঠলেন। সুলায়মান জিজ্ঞেস করলেন, ভাই! কাঁদছেন কেন? আতা আরো কাঁদতে লাগলেন। পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ভাইজান! কেন কাঁদছেন? আতা জবাব দিলেন, আজ রাত একটি স্বপ্ন দেখেছি। যতদিন বেঁচে থাকবে কাউকে এই স্বপ্নের কথা বলবে না। আমি দেখলাম, হযরত ইউসুফ আলাইহিস-সালামকে। তাঁর সৌন্দর্যের প্রতি আমি তাকিয়ে থাকি। কেঁদে উঠি। অধিক মানুষের সমাগমে তিনি আমার দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, কাঁদছো কেনো? জবাব দিলাম, আপনার উপর আমার মা-বাবা কুরবান হোন। আপনার ও আজিজের স্ত্রীর কথা আমার স্মরণ হয়ে গেছে। এই মহিলার কারণে আপনি কষ্টভোগ করেছেন, কারাবরণ করেছেন। বৃদ্ধ পিতা ইয়াকুব আলাইহিস-সালামের বিরহ সহ্য করেছেন। এজন্য আশ্চর্য বোধ করছি আর কাঁদছি। একথা শোনে ইউসুফ আলাইহিস-সালাম বললেন, আবওয়ায় একজন পুরুষ ও মহিলার মধ্যে যে ঘটনা ঘটেছিল, তা থেকে কি তোমার বিস্ময়বোধ হয় না? তখন বুঝতে সক্ষম হলাম, তিনি কি বলতে চাচ্ছেন। আমি কাঁদতে শুরু করলাম এবং এ অবস্থায়ই ঘুম ভেঙে গেল। সুলায়মান এবার জিজ্ঞেস করলেন, ঐ মহিলার ঘটনাটি কী ছিল? আতা তখন ঘটনাটি আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই ঘটনার কথা আর কাউকে বলেন নি। আতার ইন্তিকালের পর সুলায়মান এই ঘটনাটি তার ঘরের একজন মহিলার নিকট বর্ণনা করেছিলেন। সুলায়মানের মৃত্যুর পর মদিনায় ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে।
২.৭৩. হযরত ইবরাহীম বিন সুবহ বারবারাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা মুগীরা আবু মুহাম্মাদের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি যখন কথা বলতেন, নিজে কাঁদতেন মানুষকেও কাঁদাতেন। তিনি বলেন, ভাইসব কাঁদো! চোখ ও হৃদয়কে কাঁড়াও! আজকে যে ব্যক্তি নিশ্চিত কাল সে আনন্দিত থাকবে। যে আজকে কাঁদবে আগামীকাল সে হাসবে। আজকে যে আতঙ্কিত থাকবে আগামীকাল সে নিরাপদ থাকবে। আজ যে ক্ষুধার্থ আগামীকাল সে পরিতৃপ্ত থাকবে। আজকের পিপাসা-কাতর ব্যক্তি আগামীকাল পরিতৃপ্ত থাকবে আল্লাহর কাছে। সুতরাং তোমরা কল্যাণ অবলম্বন করো। হিংসা করো না, নতুবা ধ্বংস হয়ে যাবে। একথা বলে তিনি কাঁদতে থাকেন আর শ্রোতারাও কাঁদতে শুরু করেন।
২.৭১. হযরত বকর ইবনে মূসাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা আবু মুহাম্মাদ মুগীরার সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি মসজিদে কিবলামুখী হয়ে বসে আছেন। দাড়ি বেয়ে চোখের পানি ঝরছে। সালাম জানিয়ে বললাম, আল্লাহ আপনার উপর করুণা বর্ষণ করুন! কি জন্য এতো বেশী কাঁদছেন। জবাব দিলেন, দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশিত নিকটবর্তী রাতের জন্য। জানি না সে রাতে আমার অবস্থা কী হবে। এটুকু বলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
২.৭২. হযরত ইবনে সিমাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি ইবনে জারকে রাতের প্রথম থেকে শেষাহ্ন পর্যন্ত শুধু কাঁদতেহি দেখি। কাবা শরীফের গিলাফে ধরে বলছেন, হে প্রভু! আমার আরোহীকে তোমার অভিমুখী। করেছে। মরুভূমির দূরত্ব তোমার জন্য অতিক্রম করে এসেছি। তোমার করুণা ও বিনিময় লাভের প্রত্যাশায় তোমার দরবারে এসে পড়ে আছি। একথা বলে তিনি সকাল পর্যন্ত কাঁদতে থাকেন।
২৭৬. হযরত আমার ইবনে উসমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা বাহরাম আজালীকে বলতে শুনেছি, হে মাবুদ! তোমার সম্মানের শপথ! তোমার জন্য যারা কেঁদেছে তাঁদেরকে তুমি করুণা থেকে ব্যর্থ করো না। তোমার বন্ধুরা তো তোমার প্রতি সুধারণা পোষণ করে। তোমার জন্য তাঁদের প্রত্যাশা খুবই বিশাল। একথা বলে তিনি কাঁদতে থাকেন। চোখের পানিতে ভিজে যায় দাড়ি।
২৭৭. হযরত জায়েদ হামারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা আবদুর রাহমান মাগাফিলীর পাশে ছিলাম। তিনি কথা বলছিলেন। এক ব্যক্তি কেঁদে উঠলেন। তিনি বললেন, তাঁকে ছেড়ে দাও। ক্রন্দন আর তাওবাহ ছাড়া পাপীদের আর কী করার আছে?
২৭৮. হযরত মুজর আর সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দনরত লোকের কাঁদন দ্বারা আমি যে স্বাদ পাই, তা আর কোন কিছুতেই পাই না।
২৭৯. হযরত উকায়বা ইবনে ফুজালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু উবায়দা খাওয়াস বৃদ্ধ বয়সে দাড়িতে হাত রেখে বলতেন, প্রভু! বৃদ্ধ হয়ে গেছি। আমাকে মুক্তি দাও। এরপর তিনি শুধু কাঁদেন।
২৮০. হযরত মুলি ওররাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকটে ছিলাম। তিনি কথা বলছিলেন। তখন আবু উবায়দা খাওয়াস তাঁর কাছে আসলেন। তিনি থলে থেকে একটি রশি বের করলেন। রশির একাংশ নিজের ঘাড়ে আর অপর অংশ মালিকের ঘাড়ে রাখলেন। এরপর বললেন, মালিক! মনে করো আমি আল্লাহর সামনে হাজির। একথা শোনার পর উপস্থিত সমস্ত লোক কাঁদতে শুরু করলেন।
২৮১. হযরত ইসহাক ইবনে ইবরাহীম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মূসা খাইয়াতো ক্রন্দন করে করে একদম নির্বাক হয়ে যেতেন। মাটিতে পড়ে নিজেকে বলতেন, দীর্ঘ ক্রন্দনের আগে কাঁদো। দুর্ভাগ্যবরণের পূর্বে কাঁদো। আল্লাহর শপথ! কাঁদতে থাকো।
২৮২. হযরত ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ মূসা খাইয়াতের পাশে বসতেন। মূসা কেবল নিজের জন্য কাঁদতেন। বলতেন, আমাকে কাফনের কাপড় পরিয়ে দাও! কবরে নিয়ে আমাকে দাফন করো! ইবরাহীম বলেন, আমাকে তিনি যখন দেখে ফেলতেন নীরব হয়ে যেতেন।
২৮৩. হযরত মালিক ইবনে যায়গাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাকিম ইবনে নূহ আমাকে বলেন, তোমার বাবা রাতের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু কাঁদতেন। সমুদ্র ভ্রমণে আমরা তাঁর সাথে ছিলাম। না একটি সিজদা দিলেন বা কোন রুকু করলেন। সকালে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আবূ মালিক! রাত তো দীর্ঘ ছিলো। কিন্তু আপনি তো নামায পড়লে না দু'আও করলে না। তিনি কাঁদতে লাগলেন। এরপর বলেন, মানুষ যদি জানতো আগামীকাল কী হবে, তাহলে তারা আরাম আয়েশের স্বাদ ছেড়ে দিতো। আল্লাহর শপথ! যখন রাত হয় তখন রাতের আলো, পরিবেশ, নিস্তব্ধতা ও ভয়াবহতার কথা আমার স্মরণ হয়ে যায়। সেদিনের কথা আমি স্মরণ করি, যেদিন বাবা তার সন্তানকে কোন উপকার করতে পারবে না। সন্তানও বাবাকে কোন সাহায্য করতে পারবে না। একথা বলে তিনি চিৎকার করে অস্থির হয়ে যান। সাথীরা আমাকে বললো, তুমি কেন তাঁকে উত্তেজিত করো? এরপর থেকে আমি তাঁর সাথে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম না। তিনি যখন কিছু জিজ্ঞেস করতেন আমি শুধু উত্তর দিতাম।
২৮৪. হযরত সালামা ইবনে সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আলা ইবনে যিয়াদ স্বপ্নে দেখলেন, তিনি জান্নাতের অধিবাসী। তখন লাগাতার তিনদিন কাঁদতে থাকেন, ঘুম ত্যাগ করেন, খাবারের স্বাদ থেকে বিরত থাকেন। হাসান তাঁর কাছে এসে বললেন, ভাই! জান্নাতের সংবাদ পেয়ে নিজেকে মেরে ফেলবেন? একথা শোনে আরো বেশী কাঁদেন। তিনি রোযাদার ছিলেন। হাসান সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর সাথে অবস্থান করে ইফতারের সময় খাবার গ্রহণ করেন।
২৮৫. হযরত আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আলা ইবনে যিয়াদের কাছে এক ব্যক্তি আসলেন। তিনি বললেন, আমি স্বপ্নে দেখি, এক ব্যক্তি আমাকে বলছেন তুমি আলা ইবনে যিয়াদের কাছে যাও। তাঁকে বলো, আর কতো কাঁদবে? তোমার গুনাহ তো ক্ষমা করা হয়েছে। একথা শোনে তিনি আরো কাঁদলেন। এরপর বললেন, তাহলে তো আমি আর কখনো কাঁদা থামাবো না।
২৮৬. হযরত হারিস ইবনে উবায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়দ মালিক ইবনে দীনারের মজলিসে বসতেন। আমি মালিকের উপদেশ কিছুই বুঝতে পারতাম না শুধুমাত্র আবদুল ওয়াহিদের ক্রন্দনের কারণে।
২৮৭. হযরত আবদুল আজিজ ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মিসমা আমার বাবার কাছে আসতেন। তাঁরা দু’জন একত্র হয়ে কেবল কাঁদতেন।
২৮৮. হযরত আবদুল আজিজ ইবনে সালমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এবং আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়দ মালিক ইবনে দীনারের কাছে গেলাম। দেখি তিনি মজলিস থেকে উঠে চলে গেছেন। দরোজা বন্ধ। আমরা সাক্ষাতের অপেক্ষায় বসে পড়লাম। উদ্দেশ্য ছিলো, কোন কথা তিনি বলছেন কি না তা জানতো। যদি বলেন, তাহলে আমরা তাঁর সাক্ষাতের অনুমতি চাইবো। কিন্তু এমনভাবে কি যেনো বলছিলেন, আমাদের বোধগম্য হচ্ছিলো না। এরপর জোরে জোরে কাঁদেন ও শ্বাস ছাড়েন। অজ্ঞান হয়ে যান। আবদুল ওয়াহিদ আমাকে বললেন, আমরা চলে যাই। উনি তো নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত!
২৮৯. হযরত আবু উমার খাত্তাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রীতদাস উবরা খুব বেশী কাঁদতেন। চোখের পানিতে হাতের মুঠি ভরে যেতো। ঐ পানি দিয়ে মুখমণ্ডল ও গর্দান ধুতেন। তিনি বলতেন, হে মা'বূদ! হে সরদার! হিসাব দিবসে আমাকে অপদস্থ করো না। যখন আযান শুনতেন, কাঁদতেন।
২৯০. হযরত ফজল ইবনে দাকিন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান ইবনে সালেহ যখন কোন জানাযা দেখতেন চোখের পানিতে তারোচ্ছা হয়ে যেতো। তিনি যখন অসুস্থ, আমরা দেখতে গেলাম। তিনি কাঁদছিলেন। চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে গেছে।
২৯۱. হযরত হারুন ইবনে আবি শায়বা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার চাচা হাসান ইবনে সালেহের সাথে খুব বেশী ওঠাবসা করতেন। ফযরের পর তাকে বলতে শুনেছেন, আহা! বিপদের পর বিপদ। বিপদ যদি একটা হতো তাহলে হয়তো পার পাওয়া যেতো। কিন্তু বিপদের তো কোন শেষ নেই। এটুকু বলে দীর্ঘ সময় নির্বাক থাকতেন।
২৯২. হযরত খালিদ ইবনে সাকার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার বাবা ছিলেন সুফিয়ান সওরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বিশেষ পরিচিত ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমি সুফিয়ান সওরী'র সাথে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলাম। একজন মহিলা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমি ঘরে ঢুকে শোনলাম তিনি এই আয়াতটি,
أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ ۚ بَلَىٰ وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ
তিলাওয়াত করছেন। এরপর বললেন, হ্যাঁ আমার প্রভু! হ্যাঁ। ঘরের ছাদের দিকে তাকালেন। চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। আমি দীর্ঘ সময় বসে রইলাম। এরপর হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন, পাশে বসলেন। এরপর বললেন, তুমি যে কখন আসলে আমি বুঝতে পারি নি।
[আয়াতের অর্থ: তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও গোপন পরামর্শ শুনি না? হ্যাঁ শুনি, আমার ফেরেস্তাগণ তাদের নিকট থেকে লিপিবদ্ধ করে। (৪৩:৮০)]
২৮৩. হযরত ইয়াহহাক ইবনে মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হিশাম ইবনে হাস্সানকে দেখেছি যখনই জান্নাত বা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা আলোচনা করতেন তার চোখ দিয়ে পানি ভেসে পড়তো। অনুরূপ ইবনে আওনকে দেখেছি, তার চোখদ্বয় অশ্রুতে টলমল করছে।
২৮৪. হযরত হাম্মাদ ইবনে জায়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাবিত বুনানীকে দেখেছি যখন কাঁদতেন তখন তাঁর পাঁজরও কাঁপতো।
২৮৫. হযরত মাতার ওয়ারাফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হারাম ইবনে হাইয়ান হাম্মামের কাছে রাত্রিয়াপন করলেন। হাম্মাম সকাল পর্যন্ত কাঁদলেন। ভোরে হারাম জিজ্ঞেস করলেন, ভাই! সারারাত কাঁদলেন কেনো? জবাব দিলেন, সে রাতের কথা ভাবছিলাম, যে রাত্রে গ্রহ-নক্ষত্র টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। হাম্মাম একদা হারামের নিকট রাত্রি যাপন করেন। হারাম সারারাত কাঁদলেন। সকালে হাম্মাম প্রশ্ন করলেন, ভাই! গত রাত কেন কাঁদলেন? জবাব দিলেন, সেদিনের কথা আমার মনে পড়ে গিয়েছিল যেদিন মানুষ কবর থেকে উঠে জমায়েত হবে। সকাল-বিকাল যখনই তাঁরা একত্রিত হতেন কামারের দোকানে চলে যেতেন। কামারের বাতাস দেওয়ার ব্যাগ দেখতেন এবং বসে বসে কাঁদতেন। আল্লাহর দরবারে জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় চাইতেন। এরপর চলে যেতেন আতরের দোকানে। সেখানে গিয়ে আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইতেন। দু’আ করে সময় কাটাতেন। এরপর যাবতীয় গন্তব্যস্থলে ফিরে যেতেন।
২৮৬. হযরত আসিম রুক্বাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আওয়ায়ান এবং হাম্মাম আমির ইবনে আবদুল্লাহর কাছে গেলেন। তার দরোজা বন্ধ। ঘরের ভেতর থেকে ক্রন্দনের আওয়াজ আসছে। শোনে তারাও কাঁদতে লাগলেন। এরপর অনুমতি পেয়ে ঘরে গেলেন। তাদের চেহারায় ক্রন্দনের চিহ্ন দেখে আমির প্রশ্ন করেন, আপনারা কেনো কাঁদলেন? জবাব দেন, আপনার কান্না শোনে। তিনি বললেন, ক্রন্দনের কারণ বলছি। আমি সে রাতের কথা স্মরণ করছি, যে রাতের পর থেকেই শুরু হবে কিয়ামত-দিবস।
২৯৭. হযরত মালিক ইবনে মিগওয়াল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি ইবনে কায়েস রাস্তায় বসে কাঁদছেন। একব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদছেন কেনো? জবাব দিলেন, কাঁদছি সে রাতের কথা স্মরণ করে যার সকাল দিয়ে হবে কিয়ামত দিবসের শুরু। সকালে তিনি রাস্তায় বেরিয়ে যেতেন। ডানে-বামে থাকতো অনেক লোক। বলতেন, প্রতিপালক! লোকজন স্ব-স্ব প্রয়োজন সমাধানে সকাল বেলা বেরিয়েছে। আমিও তোর বেলা বেরিয়ে মাগফিরাত কামনা করছি আপনার দরবারে।
২৯৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কাসির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজকে প্রশ্ন করা হলো, আপনার মধ্যে আল্লাহর প্রতি তাওয়াজ্জুহ কিভাবে সৃষ্টি হলো? জবাব দিলেন, এক ক্রীতদাসকে প্রহার করছিলাম। সে বললো, উমর! সে রাতের কথা স্মরণ করুন, যে রাতের পরই শুরু কিয়ামতের দিনের।
২৯৯. হযরত আওযায়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ আদি ইবনে আতার কাছে চিঠি লিখলেন; হামদ ও সালাতের পর, তোমাকে সে রাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যা অতিবাহিত হওয়ার পরই কিয়ামতের সূচনা। আফসোস! সে রাত ও সে সকাল কাফিরদের জন্য বড়োই কঠিন।
৩০০. হযরত জুনায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রজব মাসে কোন একদিন হাসান রাহিমাহুল্লাহ মসজিদে ছিলেন। হাতে একটি পানির পাত্র। এ থেকে মাটিতে কুলি করছিলেন। বার বার দীর্ঘ শ্বাস ছাড়েন ও ক্রন্দন করেন। ঘাড় কাঁপতে থাকে। এরপর বলেন, আহ! যদি হৃদয় জীবন্ত থাকতো, অন্তর পরিশুদ্ধ থাকতো, তাহলে সে রাতের ভয়ে নিজেকে কাঁদাতাম যার সকাল দিয়ে হবে কিয়ামত দিবসের শুরু। মানুষ সেদিনের কথা শোনছে না যেদিন পাপ উন্মোচন হয়ে যাবে। কোন চোখ না কেঁদে পারবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00