📄 অশ্রুতে যাদের চোখ নষ্ট হয়েছে
১৮৫. হযরত কাতাদাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জিয়াদ ইবনে মাতাঁর কাঁদতে কাঁদতে চোখ নষ্ট করে দিলেন। এভাবে তাঁর পুত্র আলা ইবনে জিয়াদও ক্রন্দন করে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যখন কিছু করতেন বা কথা বলতেন, শিশুর মতো কেঁদে কেঁদে অন্যের সাহায্য নিতেন।
১৮৬. হযরত উমর ইবনে যার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উসামাদ জাব্বিককে বললাম, কাঁদতে কাঁদতে চোখ নষ্ট করে ফেললেন। জবাবে বলেন, আর কী করবা, বলুন? বললাম, একটু স্মরণ করলে ভালো হতো না? তিনি বলেন, কেনো, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কি আগুন থেকে মুক্তির কোন নিশ্চয়তা এসেছে? একথা বলে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
১৮৭. হযরত আবু নাঈম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আলা ইবনে আবদুল করিম এতো বেশি কাঁদতেন, শেষ পর্যন্ত উভয় চোখ নষ্ট হয়ে গেল।
১৮৮. হযরত শিহাব ইবনে আব্বাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বুয়াইম আবূ বকরকে দেখেছি, অধিক ক্রন্দনের কারণে তাঁর চোখের পাতা পড়ে গিয়েছিলো। চোখদ্বয় সর্বদা সিক্ত থাকতো। তাঁর ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, বুয়াইম সব সময় চোখ মুছেন কেন? বললেন, তিনি আত্মসংশোধনের জন্য খুব বেশি কাঁদেন। এ কারণেই চোখ নষ্ট হয়ে যায়।
১৮৯. হযরত আবূ বকর ইবনে আইয়াশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক ক্রন্দনের কারণে মনসুরের চোখ নষ্ট হয়ে যায়। রাত কাটাতেন নামায পড়ে, দিনের বেলা রোযা রাখতেন। তাঁর জননী পুত্রের কাঁদা দেখে বলতেন, আমি মরে গেলেও হয়তো তুমি এতো বেশি কাঁদবে না!
১৯০. হযরত কাবিসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মালিক ইবনে মুগাউয়ালের চোখ সব সময় ভেজা থাকতো। অধিক ক্রন্দনকারী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। আমি দেখেছি, যখন কথা বলতেন, দাড়ি বেয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়তো।
১৯۱. হযরত কিলাব ইবনে জারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বায়তুল মাকদিসে একজন যুবককে দেখলাম। দীর্ঘদিন যাবৎ কাঁদার কারণে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছেন। জিজ্ঞেস করলাম, হে যুবক! এভাবে কাঁদলে শরীর সুস্থ থাকবে কি করে? কেঁদে কেঁদে বললেন, প্রভু যা চান তা করবেন। যদি ইচ্ছা করেন চোখ নষ্ট হয়ে যাক, তবে তা-ই হবে। আমার শরীর তো আমার নিকট খুব সম্মানী। পরকালের সুখ-শান্তির প্রত্যাশায় আমি কাঁদছি। পরজীবনের সুখশান্তি লাভ না হলে, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তা হবে চিরকালের দুর্দশা। আমি তো আল্লাহ থেকে গাফিল ছিলাম, তাই ভীষণ চিন্তায় আছি। এটুকু বলে যুবক অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
১৯২. হযরত মুআয় ইবনে জিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াম গোত্রের একজন যুবক ছিলেন, যার চোখ দুটো অতিরিক্ত ক্রন্দনের ফলে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অনেকে তাঁকে এজন্য তিরস্কার করলেন। তিনি বলতেন, ক্রন্দন তো সত্যবাদী লোকদের ওরাসত। এই ক্রন্দনই তাঁদেরকে পরকালের কল্যাণের দিকে নিয়েছে। প্রভু কি একথা বলেন নি, বান্দাহ! আমার নিকট চলে এসো। পরকালীন সকল কল্যাণ তো আমার কাছে? আল্লাহর শপথ! বাকী জীবন কেঁদে কাটাবো। আখিরাতের জীবন যখন এসে যাবে, আমি আমার কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহর নিকট থেকে পেয়ে যাবো।
১৯৩. হযরত শাহ ইবনে ফাইয়াজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হিশাম দাওয়াওয়ারী কাঁদতে কাঁদতে উভয় চোখ নষ্ট করে দিয়েছিলেন। তাঁর চক্ষু খোলা থাকতো, কিন্তু দৃষ্টিশক্তি ছিলো না।
১৯৪. হযরত বিশর ইবনে মানসুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দন করতে করতে বুদাইল উকাইলীর চোখে ক্ষতচিহ্ন পড়ে গেল। কেউ তিরস্কার করলে বলতেন, কিয়ামত দিবসের দীর্ঘ এবং তীব্র পিপাসার ভয়ে এভাবে কাঁদছি।
১৯৫. হযরত হিশাম ইবনে হাসসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াজিদ রুক্বাশী এক নাগাড়ে চল্লিশ বৎসর ক্রন্দন করার ফলে চোখের পাতা লটকে যায়। চোখ হয়ে যায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। অশ্রু ঝরতে ঝরতে গালের মধ্যে দাগ পড়ে যায়।
১৯৬. হযরত সাঈদ ইবনে আমির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক ক্রন্দনের কারণে বুদাইল উকাইলীর চোখদ্বয় নষ্ট হয়ে।
১৯৭. হযরত সাঈদ ইবনে আমির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বেশী কাঁদতে কাঁদতে হিশাম ইবনে আব্দুল্লাহর উভয় চোখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। তিনি কোন লোকের দিকে চেয়ে থাকলেও কথা না শোনা পর্যন্ত চিনতে পারতেন না।
১৯৮. হযরত সালাম আবুল আজওয়াস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক কান্নার ফলে মানসুরের চোখদ্বয় সংকুচিত হয়ে পড়ে।
১৯৯. হযরত জুহায়র সালুলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দনের কারণে ইয়াজিদ রুক্বাশীর চোখের পাতা বিচ্ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল। অশ্রু ঝরতে ঝরতে তাঁর চেহারা পর্যন্ত ঝলসে পড়েছিল।
২০০. হযরত আবদুর রহমান ইবনে মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উসায়র জার্বী কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে যান। এজন্য তাঁকে তিরস্কার করা হতো। তিরস্কার শুনে কাঁদতে কাঁদতে আর বলতেন, আমি এখন শান্ত হবো না। আগামীকাল তো মৃত্যুর আগমন হবে, সুতরাং থামবো কি করে? আল্লাহর শপথ! কাঁদবো, কাঁদবো, আরো বেশী কাঁদবো। ক্রন্দন করে যদি কল্যাণ লাভ করি তাহলে এটি হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার উপর বিশেষ দয়া। বর্ণনাকারী বলেন, বেশী ক্রন্দনের কারণে, তাঁর প্রতিবেশীরা সময় সময় কষ্টবোধ করতো।
২০১. হযরত সালামাতুল আবিদা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উবায়দাদা বিনতে আবু কিলাব চল্লিশ বৎসর কাঁদলেন। ফলে চোখ দু’টো নষ্ট হয়ে যায়।
২০২. হযরত মিসমা ইবনে আসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বেশী কাঁদার কারণে নাসিরা ইবনে সাঈদ হান্নাহীর চোখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
২০৩. হযরত গাফিরা ইবনে কারাহাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ফারকাদ সাবাহী দীর্ঘদিন যাবৎ কাঁদার কারণে চোখ নষ্ট করে ফেলেন। চোখের পাতা লটকে গিয়েছিল।
২০৪. হযরত আনাস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সাবিতকে বলেন, আপনার চোখ তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখ মোবারকের মতো। একথা শ্রবণ করে সাবিতও এতো বেশী কাঁদলেন যে, কিছুক্ষণের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে যান।
২০৫. হযরত কাসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাঈদ ইবনে জুবায়ের খুব বেশী কাঁদতেন। কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে যান।
২০৬. হযরত মু'তামির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বেশী কাঁদার ফলে ইয়াযিদ রুক্কাশীর চোখের পাতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
২০৭. হযরত জাফর ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক কাঁদার কারণে সাবিতের চোখ দু’টো বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হলো। চিকিৎসক বললেন, ক্রন্দন না করলেই তবে চিকিৎসা করতে পারি। তিনি উত্তরে বললেন, যে চোখ দিয়ে পানি আসে না, সে চোখ থাকার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই।
২০৮. হযরত জাফর ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাবিত বুনানী রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। ডাক্তার তাঁকে বললেন, আমাকে একটি বিষয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করুন। সুস্থ হয়ে যাবেন। জিজ্ঞেস করলেন, নিশ্চয়তা কিসের? ডাক্তার বললেন, কাঁদতে পারবেন না। জবাব দেন, দেখুন! যে চোখ দিয়ে পানি আসে না- তার মধ্যে তো কোন কল্যাণ নেই।
📄 চেহারায় কান্নার চিহ্ন
২০৯. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ঈসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দনের ফলে হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুর চেহারায় দুটি কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল।
২১۰. হযরত আবূ রায়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর মুখমণ্ডলে জুতার ফিতার মতো কালো রেখা অঙ্কিত হয়ে গিয়েছিল, চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার ফলে।
২১۱. হযরত জুহায়র সালাগ্বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কাঁদার ফলে ইয়াযিদ রুক্কাশীর চেহারা ঝলসে যায়।
২১২. হযরত আবদুর রাহমান ইবনে আসলাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির চেহারায় চোখের পানির দাগ পড়ে গিয়েছিল।
২১৩. হযরত মূসা ইবনে সালেহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উকবার উভয় গালে অশ্রু ঝরে পড়ার চিহ্ন দেখেছি।
২১৪. হযরত উকায়বা ইবনে ফুজায়লা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ফজল ইবনে ঈসার উভয় গালে চোখের পানিতে চিহ্ন পড়ে যায়। মনে হতো তার গাল কেউ নখ দিয়ে চিরে ফেলেছে। গোটা জীবনই তিনি কেঁদে কাটিয়েছেন।
২১৫. হযরত জাফর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, হায়সব! আল্লাহর শপথ! কান্নাকাটি যদি নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকতো তাহলে গোটা জীবনই কেঁদে কাটাতাম। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি এতো বেশি কাঁদতেন, তার গালে চোখের পানি ঝরার চিহ্ন পড়ে গিয়েছিল।
📄 জীবনটি যারা কেঁদে কাটালেন
২১৯. হযরত নুসাইয়ার ইবনে জালুক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রবি ইবনে খুসায়ম খুব বেশি কাঁদতেন। চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে যেতো। প্রায়ই বলতেন, আমরা একদল মানুষকে পেলাম, যাদের পাশে চোরের মতো বসে থাকতাম।
২১৯. হযরত মুসলিম ইবনে খালিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন কা'বা শরীফ তাওয়াফ করতেন চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে যেতো।
২১৮. হযরত মুজার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আব্দুল কায়স গোত্রের একজন যুবক ছিলেন। তিনি দিনরাত কেঁদে কাটাতেন। কোন আলস্য আসতো না। অনুরোধ করা হলো, একটু অল্প করে কাঁদুন না! তিনি বলতেন, কেন অল্প কাঁদবো? আমার কাজ তো চেষ্টা-সাধনা করা। আল্লাহর শপথ! আমি এ চেষ্টা কখনো থামাবো না। বর্ণনাকারী বলেন, দিবানিশি ক্রন্দন করেই এই যুবক জীবন কাটাতেন।
২۱۹. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালেহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বনী তামীম গোত্রের এক লোক আমার নিকট বর্ণনা করেন, হাসান ইবনে সালেহ রাতের এক তৃতীয়াংশ সময় নামায পড়ে কাটাতেন। এরপর নামাযের মুসাল্লায় বসে শুধু কাঁদতেন। আলীও তাঁর কামরায় এসে কাঁদতেন। এছাড়া তাঁদের মাও দিনরাত কাঁদতেন। প্রথমে মা ইন্তিকাল করেন, এরপর আলী। তারপর হাসানের মৃত্যু ঘটে। বর্ণনাকারী বলেন, হাসানকে স্বপ্নে দেখলাম। জিজ্ঞেস করি, আপনার মায়ের অবস্থা বলুন। উত্তরে বললেন, জীবদ্দশায় দীর্ঘদিনের ক্রন্দনের ফলে তিনি চিরকালের আনন্দ লাভ করেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, আলীর অবস্থা কী? জবাব দিলেন, আলী ভালোই আছে। জিজ্ঞেস করি, এবার বলুন আপনি কেমন আছেন? বলেন 'আল্লাহর ক্ষমা ছাড়াও ভরসার আর কী আছে?' একথা বলে তিনি চলে যান।
২২০. হযরত মু'আবিয়া আজরাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলাইমীকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার মনে কী চায়? জবাব দিলেন, কাঁদতে চাই। কাঁদতে কাঁদতে যেনো কাঁদার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলি! তিনি রাতদিন কাঁদতেন। সর্বদা চেহারায় চোখের পানি ঝরতে দেখা যেতো।
২২১. হযরত জাফর ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলাইমিকে দু'ব্যক্তি দেখতে গেলেন। তাঁরা তাঁকে কাঁদতে দেখেন। একজন বললেন, তিনি তো গত তিনদিন-তিনরাত যাবৎ কাঁদছেন। এরপর তারা উভয়ে বেরিয়ে আসলেন।
২২২. হযরত মু'আজ ইবনে ফিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াহ্ইয়াহ্ইয়া ইবনে মুসলিম ‘ক্রন্দনকারী' নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি পাগড়ি পরিধান করতেন। অধিক ক্রন্দনের ফলে চোখের পানিতে পাগড়ির উভয় দিকের শিমলা ভিজে যেতো।
২২৩. হযরত আবূ সাহল মুহাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসির সাথে একটি জানাযায় ছিলাম। দেখতে পেলাম চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেছে। বসে আছেন একদম নীরবে। আমি একথাটি 'ক্রন্দনকারী' ইয়াহ্ইয়াহ্ইয়া ইবনে মুসলিমের সঙ্গে আলোচনা করলাম। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, তুমি যদি দুনিয়ার জীবনে কাঁদো, কবর জীবনের কাঁদা থেকে মুক্তি পাবে।
২২৪. হযরত সাঈদ ইবনে ফুজায়েল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী উপর তলায় থাকতেন আর লোকজন থাকতো নীচ তলায়। এক ব্যক্তি আমাকে বললো, ওয়াসী সারারাত কাঁদতেন। ক্রন্দনে কোনো অলসতা ও বিরক্তিভাব হতো না।
২২৬. হযরত হিশাম কারদাসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির একজন আত্মীয় বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসীর সাথে এক ব্যক্তি সাক্ষাৎ করতে গেলেন। এ সময় আল্লাহাহ্ [একজন মহিলা] তাঁর গৃহে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, ওয়াসীর জন্য যখন রাত হয়, তখন গোটা বিশ্বটাও যদি মৃত্যুবরণ করে, তবুও তার মতো এতো ক্রন্দন হবে না।
২২৭. হযরত আবু উবায়দা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল ওয়াহিদ ইবনে জায়েদের মজলিসে উবা নামক এক যুবক ১ বৎসর লাগাতার শুধু কেঁদেছেন। আবদুল ওয়াহিদ বয়ান পর পর থেকেই তিনি কাঁদতেন, নীরব হতেন না। লোকজন আবদুল ওয়াহিদকে বললো, উবার ক্রন্দনের কারণে আপনার কোন কথাই বুঝি না। তিনি বললেন, কি করতে পারি? উবা তো নিজেকে রক্ষার জন্য কাঁদছেন, কিভাবে তাঁকে বাধা দিই? যদি তাঁকে বারণ করি তাহলে জাতির জন্য এক নিকৃষ্টমানের বস্তায় পরিণত হবো।
২২৮. হযরত সালিম নাফিছ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সমুদ্র তীরে এক রাতে উবাকে দেখতে পেলাম। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত তিনি শুধু এ কথাই বলছিলেন, প্রভু! যদি তুমি আমাকে শাস্তি দাও, তবে তো আমি তোমার প্রেমিক! আর যদি করুণা করো, তবুও আমি তোমার প্রেমিক! এভাবে বার বার বলছিলেন।
২২৯. হযরত মুহাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ফুযায়ল ইবনে ইয়াজের পুত্র আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, ফুযায়ল কাঁদতে ভালোবাসতেন। এমনকি যখন ঘুমোতেন, তখনও ঘরের লোকজন ক্রন্দনের আওয়াজ শোনাতো।
২৩০. হযরত বারি ইবনে সাবিত রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরীকে দেখেছি চিৎ হয়ে শুয়ে কাঁদছেন।
২৩۱. হযরত ইউনুস ইবনে উবায়েদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা হাসান বসরীর সাথে যখনই সাক্ষাত করতাম, দেখতাম তিনি কাঁদছেন। কাঁদন দেখে আমাদের করুণা হতো।
২৩২. হযরত মানসুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরীর কাঁদা দেখে আমাদের দিল গলে যেতো।
২৩৩. হযরত উবায়েদুল্লাহ ইবনে আয়জার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যখনই হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে দেখেছি তাঁর উভয় চোখের মধ্যখানে একটি চিহ্ন পেতাম। মনে হতো এটা ক্ষতচিহ্ন। যখন তিনি নিজে বা অন্য কেউ আখিরাতের আলোচনা করতেন, তাঁর দু’চোখ যেনো চার চোখে পরিণত হতো!
২৩৪. হযরত রাবি আবু মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াযিদ রুকাশী কাঁদতেন, বেহুঁশ হতেন। জ্ঞান ফিরে আসতো, আবার কাঁদতেন পুনরায় বেহুঁশ হতেন। অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে তাঁর পরিবারের নিকট নিয়ে যাওয়া হতো। তিনি বলতেন, ক্রন্দনের দিন আসার আগে কাঁদো! আহাজারির দিন আসার আগে আহাজারি করো! তাওবার দরজা বন্ধ হওয়ার আগে তাওবাহ করো! নূহ আলাইহিস-সালামকে 'নূহ' বলা হতো এজন্য, তিনি ‘নাওয়াহ’ তথা অধিক ক্রন্দনকারী ছিলেন। তাই যুবক-বৃদ্ধরা! তোমরা নিজেদের জন্য কাঁদো। তিনি এসব কথা বলতেন, আর দাড়ি ও গাল বেয়ে চোখের পানি ঝরে পড়তো।
২৩৫. হযরত ফুযায়েল ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ঘটনাটি আমার বোন বর্ণনা করেছেন। বনী তামীম গোত্রের আবদুল ওয়াহ্হাবের এক বন্ধু ছিলেন। যখনই বন্ধুদ্বয়ের সাক্ষাত হতো, উভয়ে একত্রে কাঁদতেন। এমনকি কোন সময় সকাল থেকে যোহর পর্যন্ত ক্রন্দন চলত। আমি মুহাম্মাদকে বললাম, বন্ধুর সাথে সাক্ষাত হলেই উভয়ে কাঁদা শুরু করে দাও, কেউ কারো কথা শোন না? তাই জবাব দেন, চুপ থাকো! দুনিয়া তো আনন্দের জায়গা নয়। স্থায়ী আরাম-আয়েশের ক্ষেত্র নয়। পরকালের পাথেয় যে সংগ্রহ করলো, সে-ই তো সৌভাগ্যবান। আল্লাহর শপথ! ক্রন্দন আমার হৃদয়ের প্রশান্তি। যদি ক্রন্দন না হয়, তাহলে দুনিয়ার জীবনের পেরেশানীর কারণে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে পড়ে। বোন বলেন, আল্লাহর শপথ! তাঁর এ কথাটি আমাকে কাঁদিয়েছে।
২৩৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইবনে আবি রাওয়াদ যখন কথা বলতেন, গাল বেয়ে অশ্রু ঝরত। এভাবে উছায়াহ যখন কথা বলতেন, চোখ দিয়ে পানি বর্ষণ হতো।
২৩৭. হযরত সাঈদ ইবনে আমির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক ‘ক্রন্দনকারী’ ইয়াহইয়া গোল করে পাগড়ি বাঁধতেন। চোখের পানিতে পাগড়ির শিমলা ভিজে যেতো।
২৩৮. হযরত ইয়াহইয়া ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন কথা বলতেন, শ্বাস-প্রশ্বাস পানি মিশ্রিত হয়ে যেতো। যখনই তাঁর কাছে বসেছি কেবল কেঁদেছি।
২৩৯. হযরত আবদুল ওয়াহিদ ইবনে জায়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তুমি যদি হাসান বসরীকে দেখো, তাহলে তাঁর কথা শুনার পূর্বে তুমি কেঁদে ফেলবে। হাসানকে দেখবে আর কাঁদবে না, এরূপ কোনো মানুষ আছে? এটুকু বলে আবদুল ওয়াহিদ খুব বেশী কাঁদলেন।
২৪۰. হযরত মালিক ইবনে মুগাওয়াল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জনৈক ব্যক্তি দিনরাত কাঁদতেন। তাঁর মা বলতেন, যদি তুমি কাউকে হত্যা করতে, তাহলে তার পরিবার-পরিজন তোমার এই ক্রন্দন দেখে হয়তো মাফ করে দিত। একথা শুনে তিনি আরো কাঁদলেন এবং বললেন, মা-জননী! আমি তো নিজেকে হত্যা করে ফেলেছি! ছেলের মুখ থেকে এরূপ কথা শোনে মা-ও কাঁদতে লাগলেন।
২৪۰. হযরত সুফিয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাঈদ ইবনে সাঈদ সব সময় কাঁদতেন। চোখের পানি শুকাতো না। তাওয়াফ করেছেন, কাঁদছেন। কুরআন তিলাওয়াত করেছেন, কাঁদছেন। রাস্তায় আছেন, তখনও কাঁদছেন। এক ব্যক্তি তাঁকে তিরস্কার করলো, তখনো কাঁদলেন। এরপর বললেন, হ্যাঁ অধিক কাঁদার কারণে আপনি আমাকে তিরস্কার করছেন। কিন্তু ক্রন্দন তো আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। লোকটি বলেন, তাঁর এ কথা শুনে তাঁকে ছেড়ে চলে গেলাম।
২৪১. হযরত হিশাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার বাবা উবায়দ সায়রাফী বলেন, এক বছর হাসান বসরীর সান্নিধ্যে কাটিয়েছি। দেখতাম, চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি যেন সব সময় ভিজে থাকত।
২৪২. হযরত সুহায়ল ইবনে আবদুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাদের সাথে সালাতুল আসর আদায় করলেন। সালাম ফেরানোর পর হাতের আঙুলে কামড় দিলেন। এরপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে।
২৪৩. হযরত মুসলিম নাহহাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনে সাওয়্কার সাথে সাক্ষাৎ করতাম। তিনি কেবল একটি কথাই বলতেন, পূর্ববর্তী কোন মানুষের কাছে যে দিন যে রাত চলে গেছে তা আর কখনো ফিরে আসে নি। একথা বলতেন আর কাঁদতেন।
📄 ক্রন্দনের কারণে যারা তিরস্কৃত হতেন
২৪৪. হযরত আবদুর রাহমান ইবনে ইয়াযিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি ইয়াযিদ ইবনে মূসাদকে বললাম, কী ব্যাপার! আপনার চোখ শুকায় না কেন? জবাব দিলেন, তোমার জানার উদ্দেশ্য কী? বললাম, হয়তো এর দ্বারা আল্লাহ তা’আলা আমাকে উপকৃত করবেন। তিনি বললেন, ভাই! আল্লাহ আমাকে ভয় প্রদর্শন করেছেন। যদি তাঁর অবাধ্যতা করি তিনি আগুনের মধ্যে বন্দী করবেন। আল্লাহর শপথ! যদি তিনি আমাকে গোসলখানায়ও বন্দী রাখার ভয় দেখাতেন, তথাপি আমার চোখ অশ্রুসিক্ত থাকতো।
২৪৫. হযরত সালামা ইবনে সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, লোকজন ইয়াযিদ রুক্বাশীকে প্রশ্ন করলেন, অধিক ক্রন্দনে আপনি বিরক্তবোধ করেন না? তিনি কাঁদলেন এবং বললেন, দুষ্কপোষ্য শিশু কি কখনো পরিতৃপ্ত হয়? আল্লাহর শপথ! দুনিয়ার জীবনে চোখের পানি আসতে আসতে যদি রক্ত আসে এবং এরপর পূঁজ বের হয় তবুও তা আমার নিকট প্রিয়। আরো বললেন, জানতে পেরেছি, জাহান্নামীদের চোখের পানি পড়া যখন বন্ধ হবে তখন রক্ত ঝরবে। যদি সেই রক্তের বন্যায় নৌকা ছাড়া হয় তথাপি তা ভেসে চলবে। সুতরাং যে ব্যক্তি দুনিয়াতে বেঁচে আছে সে কাঁদবে না তো কি করবে? আরো বলেন, ইয়াযিদ! ক্রন্দনের যুগ আসার আগে নিজের জন্য কাঁদতে থাকো। হযরত নূহ আলাইহিস-সালামকে ‘নূহ’ এজন্যই বলা হতো, তিনি নিজের জন্য কাঁদতেন। ইয়াযিদ! তোমার মৃত্যুর পর কে তোমার জন্য নামায পড়বে, কে রোযা রাখবে, কে তোমার জন্য প্রভুর দরবারে ফরিয়াদ করবে? তিনি এসব কথা বার বার বলেছেন আর কাঁদছেন। তারপর বলেন, ভাইসব! তোমরা কাঁদতে থাকো, না পারলে নিজেকে কাঁদা ও! যদি ক্রন্দন করতে অপারগ হও তাহলে যে কাঁদে তাঁর প্রতি দয়াপরবেশ হও!
২৪৬. হযরত ইসমাঈল ইবনে জাওয়াআন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াযিদ রুক্বাশী ঘরে প্রবেশ করলে কাঁদতেন, জানাযায় শারীক হলে কাঁদতেন, বন্ধু-বান্ধবরা যখন কাছে বসতেন তখনও নিজে কাঁদতেন এবং তাঁদেরকেও কাঁদাতেন। তাঁর ছেলে একদিন বললেন, বাবাজান! আর কত কাঁদবেন? আল্লাহর শপথ! জাহান্নাম যদি কেবলমাত্র আপনার জন্য সৃষ্টি করা হতো তবুও হয়তো এতো কাঁদতেন না। তিনি জবাব দেন, এ কী বলছ? দোষ তো আমি, আমার বন্ধু-বান্ধব ও আমাদের জিয়াও ভাইদের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। তুমি কি পাঠ করো নি, سَنَفْرُغُ لَكُمْ أَيُّهَا الثَّقَلَانِ [হে জিন ও মানব! আমি শীঘ্রই তোমাদের জন্য কর্মমুক্ত হয়ে যাব] তুমি কি পড়ো নি, يُرْسَلُ عَلَيْكُمَا شُوَاظٌ مِّن نَّارٍ وَنُحَاسٌ فَلَا تَنتَصِرَانِ [তোমাদের প্রতি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও ধূমকুন্ড ছাড়া হবে, তখন তোমরা সেসব প্রতিরোধ করতে পারবে না] এভাবে তিলাওয়াত করে করে যখন এই আয়াতে আসতেন: يَطُوفُونَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ حَمِيمٍ آنٍ [তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মাঝখানে প্রদক্ষিণ করবে] তখন ঘুরপাক খেয়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে পড়তেন। তাঁর স্ত্রী সন্তানকে বললেন, পুত্র! তোমার বাবার সাথে এ কী আচরণ করছো? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি তো বিষয়টিকে কেবল সহজ করার চেষ্টা চালাচ্ছি। তিনি যে নিজেকে মেরে ফেলবেন, তাতো আমি কল্পনাও করি নি।
২৪৭. হযরত আবদুন নূর ইবনে ইয়াযিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার বাবা ইয়াযিদ রুক্বাশী কেঁদে কেঁদে বন্ধুদেরকে বলতেন, অন্ধকার দিন আসার পূর্বে কাঁদো! আগামীকাল কাঁদার আগে আজই কাঁদো! যেদিন কাঁদলে কোন উপকার হবে না, সেদিন উপস্থিত হওয়ার আগেই কাঁদো! দুনিয়ার জীবনে বেশী করে কাঁদো! এসব কথা বলে তিনি চিৎকার দিয়ে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়তেন।
২৫৮. শাম দেশের উমাইয়া নামক ব্যক্তি বানী সাহাম ফটকের পাশে এসে নামায পড়তেন। খুব জোরে জোরে কাঁদতেন। চোখ বেয়ে পানি ঝরে পড়তো। একদিন গভর্নর তাঁর নিকট সংবাদ প্রেরণ করলেন, আপনি জোরে জোরে কেঁদে মুসলিমদের নামাযের ক্ষতি করেছেন। ভালো হতো যদি একটু আস্তে করে কাঁদতেন। উমাইয়া একথা শুনে কাঁদলেন এবং বললেন, চিন্তা ও পেরেশানীর দিনের কথা স্মরণ হলে আমি কাঁদি। কাঁদার মধ্যে আরাম বোধ করি। আরো বলতেন, অনুগত বান্দার চেয়ে আর কে সৌভাগ্যশীল হতে পারে? জেনে রাখো, একমাত্র আনুগত্যের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত। আল্লাহর আনুগত্যশীল বান্দা তো দুনিয়া এবং আখিরাতে বাদশাহ। এভাবে তাওয়াফ পালনের সময়ও তিনি কাঁদতেন। কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়তেন।
২৫৯. হযরত ফায়াজ ইবনে ফজল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মিসওয়ার কাঁদলেন, সাথে তাঁর মাও কাঁদলেন। পুত্র মাকে জিজ্ঞেস করেন, মাগো! কিসের জন্য কাঁদছো? মা জবাব দেন, আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি কাঁদছো- তাই আমিও কাঁদছি! পুত্র বললেন, ওহে আম্মাজান! যেদিন আমাদের উপর আক্রমণ হবে সেদিন ক্রন্দনেই আমাদেরকে ছায়া দান করবে। মা বললেন, ওহে বৎস! এ আক্রমণ কিসের? পুত্র জবাব দেন, এটা হলো কিয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতি। এরপর উভয়ে বেশ কাঁদলেন। মিসওয়ার আরো বলতেন, যদি আমার মা না থাকতেন, একান্ত গুরুতর ছাড়া মসজিদ ত্যাগ করতাম না। ঘরে বাইরে যেখানেই তিনি থাকতেন, কেবল কাঁদতেন। নামাযে কাঁদতেন। বসে বসেও কাঁদতেন।
২৬০. হযরত আবু হামযা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি রিয়া কায়িসির সাথে ভ্রমণে ছিলাম। একটি ছোট ছেলে কেঁদে কেঁদে কাছে আসলো। রিয়া তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা! কাঁদছো কেনো? শিশুটি কোনো জবাব দিতে পারলো না। এতে তিনিও কাঁদলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, আবু হামযা! দোযখীদের জন্য আর কিসের মধ্যে শান্তি থাকতে পারে? এটুকু বলে তিনি কাঁদতে থাকেন।
২৪১. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ফাররুখ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রিয়াহ কাইসী আমার সাক্ষাতে আসলেন। রাতের বেলা আমাদের শিশু কেঁদে উঠলো। শিশুর সাথে তিনি কাঁদতে লাগলেন। সকাল পর্যন্ত অব্যাহত রইলো। ঘটনাটি একদিন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম। তিনি জবাব দিলেন, শিশুটির ক্রন্দন দেখে জাহান্নামে অগ্নি দগ্ধ লোকদের কথা মনে পড়ে গেল। তাদের তো কোনো সাহায্যকারী নেই। একথা বলে তিনি আবার কাঁদতে লাগলেন।
২৪২. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযীদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি সাইদ ইবনে সায়িব থেকে অতি দ্রুত ক্রন্দনকারী কোন লোক দেখি নি। তাঁকে একটু আবেগ-তাড়িত করলেই চোখ বেয়ে পানি ঝরে পড়তো।
২৪৩. হযরত ফাইয়াজ ইবনে মুহাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জিয়াদ আসওয়াদ একদিন কাঁদতে লাগলেন। মাইমুন ইবনে মেহরান জিজ্ঞেস করলেন, জিয়াদ! আর কতো কাঁদবে? জবাব দিলেন, আবু আইয়ুব! কাঁদা ছাড়া আমার যে আর কিছু করার নেই।
২৪৪. হযরত সিরাহ আরু উবায়দা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলায়মার স্ত্রী বললেন, আতা খুব বেশী কাঁদেন। তাঁকে কিছু বলুন। আমি তাঁকে তিরস্কার করলে তিনি জবাব দিলেন, হে সিরাহ কেন তিরস্কার করছো? এটা তো আমার জন্য মঙ্গলময়। জাহান্নামের অগ্নিতে যারা পুড়বে তাদের কথা স্মরণ করছি। আমি নিজেও তাদের সাথী মনে করি। যে লোককে শিকলে বেঁধে জাহান্নামে টেনে নিয়ে নিক্ষেপ করা হবে, সে কী কাঁদবে না, চিৎকার করবে না?
২৪৫. হযরত সিরাহ আনাজী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলায়মার সাথে সাক্ষাৎ হলেই দেখতাম, উভয় চোখ অশ্রুসজল। তাঁর তুলনা চলে সন্তানহারা মায়ের সাথে। মনে হতো তিনি এ পৃথিবীর অধিবাসী নন।
২৬৬. হযরত সালেহ মুররী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলায়ামীকে বললাম, আপনি কী আকাঙ্ক্ষা করছেন? তিনি এত কাঁদলেন এরপর বলেন, আবু বশর! আল্লাহর শপথ! আমি তো অদ্বারে পরিণত হতে চাই! দুনিয়া-আখিরাতে আমার কোন অস্তিত্ব যেনো না থাকে। সালেহ বলেন, আমি তাঁর এ কথাটুকু শুনে কাঁদতে থাকি। আল্লাহর শপথ! আমি জানি তিনি তো হিসাব দিনের জটিলতা থেকে মুক্তি কামনা করছেন।
২৬৭. হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একজন সাধক আরেক সাধকের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। ক্রন্দনের কারণে তাঁর চোখ দুটো নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। সাক্ষাৎকারী সাধক জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? জবাব দিলেন, কেনো কাঁদবো না? আল্লাহর শপথ! আমি চাই পুরা জীবনটাই কাঁদতে কাঁদতে কাটিয়ে দিই।
২৬৮. হযরত নাঈম তামিমী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মাইসারা কাইসী কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে পড়তেন। বলা হলো, হযরত! নিজের উপর একটু দয়া করুন। জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! কোনো করুণা করবো না নিজের উপর। কিয়ামত যে আমার সামনেই। আমি তখন জানতে পারবো, প্রভুর কাছ থেকে শুভ ও না অশুভ ফল পাবো। দীর্ঘ ক্রন্দনের দরুন মাইসারা কাইসী শেষ পর্যন্ত অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
২৬৯. হযরত আবিদ আবু ইয়াইয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবাদান অঞ্চলে একজন আবিদকে দেখেছি। তিনি রাতদিন শুধু কাঁদতেন। বললাম, ভাই! আর কতো কাঁদবেন? একথা শুনে তিনি আরো কাঁদতে লাগলেন। বললেন, বলুন, কাঁদবো নয়তো কী করবো? এটুকু বলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
২৭০. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাজা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াযিদ রুক্কাশী চল্লিশ বছর কাঁদলেন। তাঁর চোখের পানি শুকাতো না। যখন বলা হতো, কেন এতো কাঁদছেন? বলতেন, আমি তো ক্রন্দনকারীদের মধ্যে অগ্রগামী হতে পারি নি।