📄 গোপনে রোদন
১৪৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে কাব বয়ান করছিলেন, তখন এক ব্যক্তি কেঁদে উঠলো। বয়ান বন্ধ করে বললেন, কে কাঁদছে? জবাবে বলা হলো, অমুক গোত্রের একজন ক্রীতদাস। বর্ণনাকারী বলেন, মনে হলো তিনি এরূপ কাঁদা অপছন্দ করলেন।
১৪৯. হযরত আবু মাশার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে কাব যখন বয়ান দিতেন, চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তো। যদি অন্য কাউকে ক্রন্দন করতে শোনাতেন, ধমক দিয়ে বলতেন, এটা কী?
১৫০. হযরত হাম্মাদ ইবনে যায়েদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একদা আইয়ুব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কাঁদতে কাঁদতে নিজের নাকে ধরে বললেন, এটা হলো শ্লেষ্মা। ক্রন্দনের কারণে কখনো কখনো বের হয়। আরেকবার ক্রন্দনের সময় গোপনীয়তার চেষ্টা করে বলেন, বার্ধক্যের কারণে মানুষের কাশি ওঠে ও শ্লেষ্মা পড়ে!
১৫۱. হযরত কাহমাস ইবনে হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে খাতাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বসে এক ব্যক্তি দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। মনে হলো তার মধ্যে ব্যাকুলতা এসে গেছে। তখন উমর তাকে আঘাত করলেন।
১৫২. হযরত আবদুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু সারিলের মধ্যে যখন কথাবার্তা কিংবা তিলাওয়াতের সময় ক্রন্দন আসতো, তখন হাসি দিয়ে তা থেমে দিতেন।
১৬৩. হযরত রাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বয়ান করছিলেন, এক লোক কেঁদে উঠলো। হাসান বললেন, কী উদ্দেশ্যে কাঁদছো, এ সম্পর্কেও আল্লাহ পাক তোমাকে শেষ বিচারের দিন প্রশ্ন করবেন।
১৬৪. হযরত ইসাম রামালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বয়ান করছিলেন, মজলিস থেকে একব্যক্তি হঠাৎ কেঁদে উঠলো। হাসান বলেন, যদি আল্লাহর জন্য কেঁদে থাকো তবে নিজেকে তিরস্কার করলে। আর যদি গায়রুল্লাহর জন্য কাঁদো, তুমি ধ্বংস হয়ে গেলে।
১৬৫. হযরত হাম্মাদ ইবনে জায়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আইয়ুব কোন একটি বিষয়ের উপর আলোচনা করছিলেন, এক পর্যায়ে তাঁর হৃদয় গলে গেলো। যেনো কেঁদে ফেলবেন। তখন খেমা নির্গত করলেন, আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, বৃদ্ধ লোকের জন্য খেমা পড়া বেশ কঠিন সমস্যা।
১৬৬. হযরত হুরায়ব ইবনে সুফিয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মনসুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাদের সাথে কথা বলছিলেন। এরপর মজলিস ত্যাগ করার আগে কয়েকবার চোখ মুছলেন।
১৬৭. হযরত আবদুর রহমান ইবনে মুসলিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আইয়ুব কাঁদলেন। ক্রন্দন সম্বরণ করতে না পেরে মজলিস ত্যাগ করে চলে গেলেন।
১৬৮. হযরত বুস্তাম হারিস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আইয়ুবের হৃদয় যখন গলে যেতো, চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো। তখন বন্ধুদের নিকট থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসতেন, নাক ধরে রাখতেন। মনে হতো খেমা এসে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেলে মজলিস ছেড়ে চলে যেতেন।
১৮৯. হযরত হাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী যখন অসুস্থ ছিলেন, সাবিতও তাঁকে দেখতে আসলেন। ‘ক্রন্দনকারী’ ইয়াহইয়া তাঁকে সালাম জানালেন। সাবিত বললেন, আপনি কে? অন্য এক ব্যক্তি তার পরিচয় দিলেন, তিনি আবু মুসলিম ইয়াহইয়া। সাবিত আবার জিজ্ঞেস করেন, আবু মুসলিম কে? পরিচয় দেওয়া হলো তিনি ‘ক্রন্দনকারী’ ইয়াহইয়া। এতদশ্রবণে সাবিত বলেন, সেদিনটি তোমাদের জন্য খুবই অনিষ্টকর, যেদিন তোমরা তাকে ‘ক্রন্দনকারী’ উপাধি দিয়েছ।
১৯০. হযরত আ'মাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হুযাইফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নামাযে কাঁদলেন। নামায শেষে দেখলেন, পেছনে এক ব্যক্তি বসে আছেন। তিনি তাঁকে বললেন, খবরদার! আমার এ অবস্থা কাউকে বলবে না।
১৯১. হযরত হাসান ইবনে রাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মধ্যে যখন কাঁদার ভাব আসতো, প্রকাশ হওয়ার আতঙ্কে মজলিস থেকে চলে যেতেন। আর কোন কোন সময় অন্য আলোচনায় মনোনিবেশ করতেন।
১৯২. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এমন অনেক লোককে পেয়েছি যারা একই বালিশে স্ত্রীকে নিয়ে মাথা রাখতেন। চোখের পানি গাল বয়ে পড়তো অথচ স্ত্রী তা টেরই পেতেন না। এমনও মানুষ পেয়েছি, যারা দাঁড়াতেন একই সারিতে, একজনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো অথচ অপরজন তা বুঝতেই পারতেন না।
১৯৩. হযরত মা'মার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পাশে বসে এক ব্যক্তি কেঁদে উঠলো। হাসান বললেন, সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে কেউ যখন কাঁদতেন পার্শ্বেরজন তা বুঝতে পারতেন না।
১৫৪. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এমন মানুষও ছিলেন, স্ত্রীর পাশে থেকে বিশ বছর পর্যন্ত কেঁদেছেন, কিন্তু স্ত্রী তা কোনদিন জানতেও পারেননি।
১৫৫. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ঈসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মসজিদে হাসান ইবনে আবি সিনান উপস্থিত হতেন। মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন কথা বলতেন, হাসসানের চোখের পানি মাটিতে পড়ে ধূলোবালি সিক্ত হতো, কিন্তু কোন আওয়াজ শোনা যেতো না।
📄 পাপের ভয়ে আহাজারি
১৬৬. হযরত উকবা ইবনে আমীর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: يَا رَسُولَ اللَّهِ ، مَا النَّجَاةُ ؟ قَالَ : إِمْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ ، وَلْيَسْعَكَ بَيْتُكَ ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! মুক্তির পথ কি? জবাব দিলেন, জবান নিয়ন্ত্রণ করো, ঘরে অবস্থান করো, কৃতপাপের জন্য কাঁদতে থাকো।
১৬৭. হযরত আবদ ইবনে আবদুর রাহমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার বাবা আমাকে উপদেশ দিয়েছেন, প্রতিপালককে ভয় করো, জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে রাখো আর পাপের কথা স্মরণ করে কাঁদো।
১৬৮. হযরত মিসমা ইবনে আসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এবং আবদুল আজিজ ইবনে সালমান নাশিরা ইবনে সাঈদ হানাফীর নিকট গেলাম। তিনি এমন ছিলেন, কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখদুটি নষ্ট হয়ে যায়। আমরা তাঁর সাক্ষাতের অনুমতি চাইলাম। অনুমতি দিলেন। আবদুল আজিজ তাঁকে সালাম জানালেন। নাশিরা বললেন, কে, আবু মুহাম্মাদ নাকি? জবাব দিলেন, জি হ্যাঁ। নাশিরা জিজ্ঞেস করেন কেনো এসেছ? জবাব দিলেন, আপনি পাপের জন্য কেঁদে থাকেন, আমরা এসেছি এই আশায়, যেনো পাপের জন্য কাঁদতে পারি। একথা শোনে তিনি চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। আবদুল আজিজ তাঁর মাথার পাশে বসে কাঁদতে শুরু করলেন, নাশিনার পরিবার-পরিজনকেও ডেকে আনলেন। সবাই তাঁকে ঘিরে কাঁদলেন। বর্ণনাকারী আসিম বলেন, ক্রন্দনের রোল যখন বেশি হয়ে হলো, আমি গোপনে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম।
১৬৯. হযরত সালামা ইবনে সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যিয়াদ অট্টহাসি দিয়ে ওঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি। একথা বলেই খুব বেশী করে কাঁদলেন। উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, আল্লাহ পাক আমীরকে সংশোধন করে দিন! আপনি হাসলেন তারপর সাথে সাথেই কাঁদলেন, কারণ কি? জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! একটি গোনাহর কথা আমার স্মরণ হয়ে গেছে। যখন আমি এই গোনাহর সাথে জড়িয়ে পড়ি খুব আনন্দভোগ করি। কিন্তু যখন এই পাপের শাস্তির চিন্তা আসলো, আর না কেঁদে পারিনি। এটুকু বলে আবার কাঁদতে লাগলেন।
১৭০. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে হারিস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যখন রিয়াজ ইবনে কাইসিকে মসজিদে দেখলাম, লক্ষ্য করলাম তিনি কাঁদছেন। যখন ঘরে পেতাম তখনও দেখি তিনি কাঁদছেন। একদিন বললাম, সারাটি জীবনই তো কেঁদে কেঁদে কাটিয়ে দিলেন। একথা শোনে আবার কেঁদে ওঠলেন এবং বললেন, পাপীর জন্য ক্রন্দন ছাড়া আর করার কী আছে বলুন?”
১৭১. হযরত মূসা ইবনে ঈসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত হুযাইফা মারাআশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এক যুবককে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, যুবক! কাঁদছো কেন? সে জবাব দিলো, অতীতের গুনাহ স্মরণ হয়েছে তাই কাঁদছি। এতদপ্রসঙ্গে হুযায়ফাও কাঁদলেন। এরপর বললেন, হ্যাঁ ভাই! গুনাহর সমপরিমাণ ক্রন্দন করা চাই। একথা বলে যুবকের হাত ধরে এক কোলে গেলেন। উভয়ে একসাথে কাঁদতে লাগলেন।
১৭২. হযরত উবায়দূল্লাহ ইবনে মূসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা হাসান ইবনে সালেহের নিকট ছিলাম। তাঁর মধ্যে ক্রন্দনের ভাব আসলো। আরেক লোক জোরেসুরে কাঁদতে লাগলো। মজলিস থেকে অপর এক ব্যক্তি বললো, ভাই! নিজের জন্য এরূপ কাঁদো। যে ব্যক্তি নিজের উপর করুণা করে না, তার কোন কল্যাণ নেই। বর্ণনাকারী বলেন, হাসানকে এই বাক্যাটি বার বার বলতে শোনেছি। মনে হলো এটা তাঁর কাছে খুব ভালো লেগেছে।
১৭৩. হযরত কায়স ইবনে সুলাইম আখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জাহহাক ইবনে মুজাহীম বিকেল বেলা কাঁদতেন। জিজ্ঞেস করা হলো কাঁদেন কেন? জবাব দিলেন, জানি না, আমার কোন্ আমল আজ উপরের দিকে চলে গেছে?
১৭৪. হযরত জুহায়র সা’লুলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক ব্যক্তি ক্রন্দনকারী হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করলেন। সবসময় তিনি কাঁদতেন। তাঁর এক ভাই তিরস্কারের সুরে বললেন, আল্লাহ তোমাকে করুণা করুন! দীর্ঘদিন ধরে তুমি কাঁদছো কেন? তিনি কেঁদে কেঁদে জবাব দেন, পাপের আধিক্য দেখে কাঁদছি। পাপীদের কাজই তো হলো কাঁদা। পেরেশানী দূর করার জন্য চোখের পানি কেন, রক্ত ঝরাতে হলেও কুঁড়াবো না। একথা বলে তিনি আরো বেশী কাঁদলেন এবং অজ্ঞান হয়ে যান। প্রশ্নকারী তাঁর কাছ থেকে সরে গেলেন।
১৭৫. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা মাগফিরাত নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সাথে ছিলেন হাওশাব ইবনে মুসলিম। তার প্রসিদ্ধি ছিল, তিনি জিকরের সময় খুব কাঁদতেন। তখন মাগফিরাতের আলোচনা শোনে কাঁদতে লাগলেন এবং মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
১৭৬. হযরত আবূ ইমরান জাওনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যখন ঝড়-ঝঞ্ঝা শুরু হবে, বুঝা যাবে তখন ক’জন মুক্তি পাচ্ছে?
১৭৭. হযরত তালহা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক ব্যক্তি অনেক পাপ করেছিলেন। প্রতিটি পাপের জন্য তিনি আলাদাভাবে কাঁদতেন। তাঁর খাদিম বললেন, এটা যদি আপনার অভ্যাসে পরিণত হয় তাহলে অন্ধ হয়ে যাবেন।
১৮৯. হযরত আবু আব্দুর রহমান মাগাজিবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শাম দেশের সমুদ্র সৈকতে বিচরণকালে এক ব্যক্তি বললেন, আবদিরারা যদি পাপের জন্য কাঁদেন, তাহলে তাদের শরীর দিয়ে রক্ত ও পানি বেরিয়ে আসবে। শরীর শুকিয়ে রক্ত-পানিশূন্য হবে। আতঙ্কে তাদের রূহ চক্রর দিতে থাকবে। তারা সেদিনকে ভয় করবেন, যেদিন গর্ভবতী মহিলা জানতে পারবে না, সে কী প্রসব করেছে? একথা বলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়লেন।
১৯০. হযরত সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু সুলায়মান জীবনভর কাঁদলেন। বার বার এ কথাটি বলতেন, পাপের বিচার হওয়ার পূর্বে কাঁদতে থাকো। নিজের হিসাব নিয়ে ভাবো। অতীতে যেসব অশুভ কাজ করেছ, যদি ভাবতে তাহলে আল্লাহর দরবারে তাওবাহ্ করতে, ইখলাস অবলম্বন করতে। প্রভু খুবই করুণাময়! আমরা তো তার ভৃত্য।
১৯১. হযরত বুহাইম আয়ালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সমুদ্রভ্রমণে আমাদের সাথে একজন যুবক ছিলেন। তিনি দিনরাত কাঁদতেন। একজন তাকে তিরস্কার করে বললো, নিজের প্রতি একটু করুণা করুন! যুবক বললেন, যদি সারা জীবনই কাঁদি তবুও ক্রন্দন অল্প হবে! তার এ কথা শুনে উপস্থিত সকলেই কাঁদতে লাগলেন।
১৯২. হযরত উসমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বুহাইম একজন চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন। তিনি সমুদ্র-ভ্রমণের সময় পূর্বে বর্ণিত সেই যুবকের অবস্থা স্মরণ করে কাঁদতেন। তিনি বলতেন, ঐ যুবক নিজের উপর বেশ করুণা করেছে। একথা বলে তিনি আরো বেশী কাঁদতেন।
১৯৩. হযরত মুহাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কারী আবু জাফরকে রাতের গভীরে কাঁদতে শুনেছি। কেঁদে কেঁদে বলতেন, সারা জীবন তোমার পাপের জন্য কাঁদতে থাকো, কাঁদার চেষ্টা করো। ক্রন্দন চিন্তা- ফিকিরকে দূর করে দেয়। দিনের বেলায় সংঘটিত পাপের কথা কখনো ভুলবে না। পাপ তো মানুষকে একদম ঘিরে ফেলে। তিনি এসব কথা বার বার বলছিলেন আর কাঁদছিলেন।
১৮৩. হযরত বহর আবু ইয়াহইয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সমুদ্র সৈকতে এক আবিদকে কাঁদতে দেখলাম। তাকে ঘিরে তার বন্ধু-বান্ধবরাও কাঁদছিলেন। আবিদ বললেন, কাঁদো! কাঁদতে থাকো! ক্রন্দন ছাড়া মুক্তির পথ নেই। কেঁদে কেঁদে আরো বলেন, কেউ কাঁদে দুনিয়ার জন্য, আর আমরা কাঁদছি পাপ মোচনের জন্য। একথা শোনে বন্ধুরা আরো বেশী কাঁদলেন।
১৮৪. হযরত সালেহ মুররী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পাপের জন্য নিজেই কাঁদো, মৃত্যুর পর তোমার পাপের জন্য কি আরেকজন কাঁদবে? একথা বলার পর কাঁদতে থাকেন, আর বলেন, ভাইসব! পাপের জন্য কাঁদো, পাপাসক্ত হৃদয়ে কল্যাণ পৌঁছে না।
📄 অশ্রুতে যাদের চোখ নষ্ট হয়েছে
১৮৫. হযরত কাতাদাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জিয়াদ ইবনে মাতাঁর কাঁদতে কাঁদতে চোখ নষ্ট করে দিলেন। এভাবে তাঁর পুত্র আলা ইবনে জিয়াদও ক্রন্দন করে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যখন কিছু করতেন বা কথা বলতেন, শিশুর মতো কেঁদে কেঁদে অন্যের সাহায্য নিতেন।
১৮৬. হযরত উমর ইবনে যার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উসামাদ জাব্বিককে বললাম, কাঁদতে কাঁদতে চোখ নষ্ট করে ফেললেন। জবাবে বলেন, আর কী করবা, বলুন? বললাম, একটু স্মরণ করলে ভালো হতো না? তিনি বলেন, কেনো, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কি আগুন থেকে মুক্তির কোন নিশ্চয়তা এসেছে? একথা বলে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
১৮৭. হযরত আবু নাঈম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আলা ইবনে আবদুল করিম এতো বেশি কাঁদতেন, শেষ পর্যন্ত উভয় চোখ নষ্ট হয়ে গেল।
১৮৮. হযরত শিহাব ইবনে আব্বাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বুয়াইম আবূ বকরকে দেখেছি, অধিক ক্রন্দনের কারণে তাঁর চোখের পাতা পড়ে গিয়েছিলো। চোখদ্বয় সর্বদা সিক্ত থাকতো। তাঁর ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, বুয়াইম সব সময় চোখ মুছেন কেন? বললেন, তিনি আত্মসংশোধনের জন্য খুব বেশি কাঁদেন। এ কারণেই চোখ নষ্ট হয়ে যায়।
১৮৯. হযরত আবূ বকর ইবনে আইয়াশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক ক্রন্দনের কারণে মনসুরের চোখ নষ্ট হয়ে যায়। রাত কাটাতেন নামায পড়ে, দিনের বেলা রোযা রাখতেন। তাঁর জননী পুত্রের কাঁদা দেখে বলতেন, আমি মরে গেলেও হয়তো তুমি এতো বেশি কাঁদবে না!
১৯০. হযরত কাবিসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মালিক ইবনে মুগাউয়ালের চোখ সব সময় ভেজা থাকতো। অধিক ক্রন্দনকারী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। আমি দেখেছি, যখন কথা বলতেন, দাড়ি বেয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়তো।
১৯۱. হযরত কিলাব ইবনে জারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বায়তুল মাকদিসে একজন যুবককে দেখলাম। দীর্ঘদিন যাবৎ কাঁদার কারণে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছেন। জিজ্ঞেস করলাম, হে যুবক! এভাবে কাঁদলে শরীর সুস্থ থাকবে কি করে? কেঁদে কেঁদে বললেন, প্রভু যা চান তা করবেন। যদি ইচ্ছা করেন চোখ নষ্ট হয়ে যাক, তবে তা-ই হবে। আমার শরীর তো আমার নিকট খুব সম্মানী। পরকালের সুখ-শান্তির প্রত্যাশায় আমি কাঁদছি। পরজীবনের সুখশান্তি লাভ না হলে, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তা হবে চিরকালের দুর্দশা। আমি তো আল্লাহ থেকে গাফিল ছিলাম, তাই ভীষণ চিন্তায় আছি। এটুকু বলে যুবক অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
১৯২. হযরত মুআয় ইবনে জিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াম গোত্রের একজন যুবক ছিলেন, যার চোখ দুটো অতিরিক্ত ক্রন্দনের ফলে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অনেকে তাঁকে এজন্য তিরস্কার করলেন। তিনি বলতেন, ক্রন্দন তো সত্যবাদী লোকদের ওরাসত। এই ক্রন্দনই তাঁদেরকে পরকালের কল্যাণের দিকে নিয়েছে। প্রভু কি একথা বলেন নি, বান্দাহ! আমার নিকট চলে এসো। পরকালীন সকল কল্যাণ তো আমার কাছে? আল্লাহর শপথ! বাকী জীবন কেঁদে কাটাবো। আখিরাতের জীবন যখন এসে যাবে, আমি আমার কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহর নিকট থেকে পেয়ে যাবো।
১৯৩. হযরত শাহ ইবনে ফাইয়াজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হিশাম দাওয়াওয়ারী কাঁদতে কাঁদতে উভয় চোখ নষ্ট করে দিয়েছিলেন। তাঁর চক্ষু খোলা থাকতো, কিন্তু দৃষ্টিশক্তি ছিলো না।
১৯৪. হযরত বিশর ইবনে মানসুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দন করতে করতে বুদাইল উকাইলীর চোখে ক্ষতচিহ্ন পড়ে গেল। কেউ তিরস্কার করলে বলতেন, কিয়ামত দিবসের দীর্ঘ এবং তীব্র পিপাসার ভয়ে এভাবে কাঁদছি।
১৯৫. হযরত হিশাম ইবনে হাসসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াজিদ রুক্বাশী এক নাগাড়ে চল্লিশ বৎসর ক্রন্দন করার ফলে চোখের পাতা লটকে যায়। চোখ হয়ে যায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। অশ্রু ঝরতে ঝরতে গালের মধ্যে দাগ পড়ে যায়।
১৯৬. হযরত সাঈদ ইবনে আমির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক ক্রন্দনের কারণে বুদাইল উকাইলীর চোখদ্বয় নষ্ট হয়ে।
১৯৭. হযরত সাঈদ ইবনে আমির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বেশী কাঁদতে কাঁদতে হিশাম ইবনে আব্দুল্লাহর উভয় চোখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। তিনি কোন লোকের দিকে চেয়ে থাকলেও কথা না শোনা পর্যন্ত চিনতে পারতেন না।
১৯৮. হযরত সালাম আবুল আজওয়াস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক কান্নার ফলে মানসুরের চোখদ্বয় সংকুচিত হয়ে পড়ে।
১৯৯. হযরত জুহায়র সালুলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দনের কারণে ইয়াজিদ রুক্বাশীর চোখের পাতা বিচ্ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল। অশ্রু ঝরতে ঝরতে তাঁর চেহারা পর্যন্ত ঝলসে পড়েছিল।
২০০. হযরত আবদুর রহমান ইবনে মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উসায়র জার্বী কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে যান। এজন্য তাঁকে তিরস্কার করা হতো। তিরস্কার শুনে কাঁদতে কাঁদতে আর বলতেন, আমি এখন শান্ত হবো না। আগামীকাল তো মৃত্যুর আগমন হবে, সুতরাং থামবো কি করে? আল্লাহর শপথ! কাঁদবো, কাঁদবো, আরো বেশী কাঁদবো। ক্রন্দন করে যদি কল্যাণ লাভ করি তাহলে এটি হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার উপর বিশেষ দয়া। বর্ণনাকারী বলেন, বেশী ক্রন্দনের কারণে, তাঁর প্রতিবেশীরা সময় সময় কষ্টবোধ করতো।
২০১. হযরত সালামাতুল আবিদা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উবায়দাদা বিনতে আবু কিলাব চল্লিশ বৎসর কাঁদলেন। ফলে চোখ দু’টো নষ্ট হয়ে যায়।
২০২. হযরত মিসমা ইবনে আসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বেশী কাঁদার কারণে নাসিরা ইবনে সাঈদ হান্নাহীর চোখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
২০৩. হযরত গাফিরা ইবনে কারাহাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ফারকাদ সাবাহী দীর্ঘদিন যাবৎ কাঁদার কারণে চোখ নষ্ট করে ফেলেন। চোখের পাতা লটকে গিয়েছিল।
২০৪. হযরত আনাস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সাবিতকে বলেন, আপনার চোখ তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখ মোবারকের মতো। একথা শ্রবণ করে সাবিতও এতো বেশী কাঁদলেন যে, কিছুক্ষণের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে যান।
২০৫. হযরত কাসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাঈদ ইবনে জুবায়ের খুব বেশী কাঁদতেন। কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে যান।
২০৬. হযরত মু'তামির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বেশী কাঁদার ফলে ইয়াযিদ রুক্কাশীর চোখের পাতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
২০৭. হযরত জাফর ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অধিক কাঁদার কারণে সাবিতের চোখ দু’টো বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হলো। চিকিৎসক বললেন, ক্রন্দন না করলেই তবে চিকিৎসা করতে পারি। তিনি উত্তরে বললেন, যে চোখ দিয়ে পানি আসে না, সে চোখ থাকার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই।
২০৮. হযরত জাফর ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাবিত বুনানী রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। ডাক্তার তাঁকে বললেন, আমাকে একটি বিষয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করুন। সুস্থ হয়ে যাবেন। জিজ্ঞেস করলেন, নিশ্চয়তা কিসের? ডাক্তার বললেন, কাঁদতে পারবেন না। জবাব দেন, দেখুন! যে চোখ দিয়ে পানি আসে না- তার মধ্যে তো কোন কল্যাণ নেই।
📄 চেহারায় কান্নার চিহ্ন
২০৯. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ঈসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দনের ফলে হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুর চেহারায় দুটি কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল।
২১۰. হযরত আবূ রায়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর মুখমণ্ডলে জুতার ফিতার মতো কালো রেখা অঙ্কিত হয়ে গিয়েছিল, চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার ফলে।
২১۱. হযরত জুহায়র সালাগ্বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কাঁদার ফলে ইয়াযিদ রুক্কাশীর চেহারা ঝলসে যায়।
২১২. হযরত আবদুর রাহমান ইবনে আসলাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির চেহারায় চোখের পানির দাগ পড়ে গিয়েছিল।
২১৩. হযরত মূসা ইবনে সালেহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উকবার উভয় গালে অশ্রু ঝরে পড়ার চিহ্ন দেখেছি।
২১৪. হযরত উকায়বা ইবনে ফুজায়লা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ফজল ইবনে ঈসার উভয় গালে চোখের পানিতে চিহ্ন পড়ে যায়। মনে হতো তার গাল কেউ নখ দিয়ে চিরে ফেলেছে। গোটা জীবনই তিনি কেঁদে কাটিয়েছেন।
২১৫. হযরত জাফর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, হায়সব! আল্লাহর শপথ! কান্নাকাটি যদি নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকতো তাহলে গোটা জীবনই কেঁদে কাটাতাম। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি এতো বেশি কাঁদতেন, তার গালে চোখের পানি ঝরার চিহ্ন পড়ে গিয়েছিল।