📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 নামাযের মধ্যে ক্রন্দন

📄 নামাযের মধ্যে ক্রন্দন


১২৬. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আবু হারিস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজকে দেখেছি, সিজদা থেকে মাথা উঠালেন। উভয় সিজদার মধ্যে বিশ আয়াত পরিমাণ সময় বসে রইলেন। আবার সিজদা করলেন। যখন মাথা উঠালেন, দেখলাম চোখের পানিতে কপাল বয়ে যাচ্ছে। মক্কা শরীফে অবস্থানকালে নফল নামাযে আমি এ দৃশ্যটি অবলোকন করি।
১২৭. হযরত আদহাম ইবনে জাকারিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, খুরাসানের একজন শায়খ আমার নিকট বর্ণনা করেন, বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে আবু জা'ফর যখন যাত্রা করলেন, তখন এক দরবেশের ঘরে মেহমান হলেন। উমর ইবনে আবদুল আজিজও ইতোপূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাস যাত্রাপথে ঐ দরবেশের ঘরে অতিথি হয়েছিলেন। আবু জা'ফর দরবেশকে জিজ্ঞেস করলেন, জনাব! উমর ইবনে আবদুল আজিজের কোন কাজটি আপনার নিকট সর্বাপেক্ষা আশ্চর্যজনক মনে হয়েছে? দরবেশ জবাব দিলেন, হ্যাঁ, আমীরুল মু'মিনীন! তিনি একবার আমার ছাদে অবস্থান করছিলেন আর আমি চিৎ হয়ে শুয়েছিলাম। হঠাৎ অনুভব করি নালা বেয়ে আমার বুকে পানি পড়ছে। বিষয়টি আমাকে ভাবাল। বাইরে কোন বৃষ্টিপাতও হচ্ছে না আর আমার ঘরেও পানি নেই। তাই উপর তলায় যাই। উঠে দেখি উমর ইবনে আবদুল আজিজ সিজদায় আছেন, আর তাঁর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে।
১২৮. হযরত আলী ইবনে শাবীব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার কাছে কয়েক জন বন্ধু বর্ণনা করেছেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন সিজদা থেকে মাথা উঠালেন, দেখা গেল চোখের পানিতে সিজদার জায়গা সিক্ত হয়ে গেছে।
১২৯. হযরত মুহাম্মদ ইবনে জা'ফর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, খালিদ জাইয়াদকে দেখেছি। যখন সিজদা থেকে মাথা ওঠালেন, সিজদা স্থলের ধুলো অশ্রুতে ভিজে গেছে।
১৩০. হযরত মাকহুল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এক নেতাকে তাওয়াফ করতে দেখেছি। আমার ইচ্ছা হলো তিনি কী করছেন তা দেখব। লক্ষ্য করলাম তিনি রুকনে আসওয়াদের সামনে দাঁড়িয়ে চল্লিশ আয়াত পর্যন্ত সময় অবস্থান করলেন। এরপর পাথরের পাশে গিয়েও অনুরূপ সময় দাঁড়ালেন। সেখান থেকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একই পরিমাণ সময় অতিবাহিত করলেন। তারপর চলে গেলেন রুকনানে হাজরায় (সম্ভবত হাতীমে)। সেখানে এসে দু রাকআত নামাজ পড়লেন। উপস্থিত নামাযিদের মধ্যে তার নামাজ ছিলো সব চেয়ে আকর্ষণীয়। যখন সিজদায় গেলেন দু‘আ করতে শুনলাম, আল্লাহ! পাপ ক্ষমা কর। অতীতে ও বর্তমানে যত পাপ করেছি, ক্ষমা কর। এরপর খুব কাঁদলেন। চোখের পানিতে পাথর ভিজে গেল।
১৩۱. হযরত মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি রাইয়াহ কাইসীর পাশে নামাজ পড়ছিলাম। তখন দেখি, তার চোখের পানি টপ টপ করে মাটিতে পড়ছে।
১৩২. হযরত মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইসমাইল ইবনে দাউদের পাশে নামাজ পড়ি। তখন অনবরত পাই তার চোখের পানি টপ টপ করে চাটাইয়ের উপর পড়ছে।
১৩৩. হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে আইজার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে যখনই দেখেছি, তাঁর উভয় চোখের মধ্যেখানে একটি দাগ লক্ষ্য করেছি। মনে হতো এটা কোন ক্ষতচিহ্ন। কিন্তু আসল কথা, তাঁর সামনে যখন আখিরাতের আলোচনা হতো, চোখদ্বয় অশ্রুতে ভারী হয়ে যেতো।
১৩৪. হযরত আব্দুল জাব্বার ইবনে নহর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত, তার কাছে মুহাম্মাদ ইবনে সিরীনের একজন পরিবারের সদস্য বলেন, জামে মসজিদে দেখি মুসলিম ইবনে ইয়াসার সিজদা থেকে মাথা উঠাচ্ছেন। সিজদার জায়গা চোখের পানিতে একদম ভিজা। মনে হলো এখানে পানি ঢালা হয়েছে।
১৩৫. হযরত কাদির দাইলামী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ফুজাঈলের ইবনে আয়াজ আমার হাত ধরে বলেন, ফুজাঈলের জন্য কাঁদো। আমি তোমার এক বন্ধুকে দেখেছি, কুফার মসজিদে যখন তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠালেন সিজদার জায়গাটি অশ্রুতে সিক্ত হয়ে গিয়েছে।
১৩৬. হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইমার ইবনে মুসলিম আমাকে মসজিদের মধ্যে একটা আরেকটার বিপরীতে স্থাপিত দুটি ভেজা জায়গা দেখালেন। আমি বললাম, এসব কী? উত্তর দিলেন, আল্লাহর শপথ! এটা জায়গাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহির চোখের পানি। তিনি মাগরিব থেকে ইশা পর্যন্ত রুকূ অবস্থায় ছিলেন।
১৩৭. হযরত আমর ইবনে কায়েস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শফীক ইবনে সালামা মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ পড়তেন এবং খুব বেশী কাঁদতেন।
১৩৭. [এ নামাযের কোন বর্ণনা মূল কিতাবে পাওয়া যায় নি। -অনুবাদক]

📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 পবিত্রতা অর্জনের সময় ক্রন্দন

📄 পবিত্রতা অর্জনের সময় ক্রন্দন


১৪৮. হযরত আবদুর রাহমান ইবনে হাফস কুরাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আলী ইবনে হুসাইন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন অযু করতেন, চেহারা হলুদ বর্ণ ধারণ করতো। পরিবার পরিজন জিজ্ঞেস করলেন, অযুর মধ্যে এমন অবস্থা হয় কেনো? জবাব দেন, জানো! কার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি?
১৪৯. হযরত আবু সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মানসুর ইবনে জাদানকে দেখেছি, যখন অযু করতেন, চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে ওঠতো, জোরে জোরে কাঁদতেন। জিজ্ঞেস করি, আল্লাহ আপনার উপর করুণা বর্ষণ করুন! আপনার এ কী অবস্থা? জবাবে দেন, আমার চেয়ে করুণ অবস্থা আর কারো হতে পারে কি? যে সত্তার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি, তিনি তো কখনো তন্দ্রাচ্ছন্ন বা নিদ্রামগ্ন হন না।
১৫০. হযরত নাঈম ইবনে মুয়ায়ারা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলাইমী যখন অযু করতেন, তাঁর শরীর কেঁপে উঠতো। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তো। খুব কাঁদতেন। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে জবাব দিতেন, এক মহান কাজ আদায়ের সংকল্প করছি। আমি তো আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি।

📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 গোপনে রোদন

📄 গোপনে রোদন


১৪৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে কাব বয়ান করছিলেন, তখন এক ব্যক্তি কেঁদে উঠলো। বয়ান বন্ধ করে বললেন, কে কাঁদছে? জবাবে বলা হলো, অমুক গোত্রের একজন ক্রীতদাস। বর্ণনাকারী বলেন, মনে হলো তিনি এরূপ কাঁদা অপছন্দ করলেন।
১৪৯. হযরত আবু মাশার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে কাব যখন বয়ান দিতেন, চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তো। যদি অন্য কাউকে ক্রন্দন করতে শোনাতেন, ধমক দিয়ে বলতেন, এটা কী?
১৫০. হযরত হাম্মাদ ইবনে যায়েদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একদা আইয়ুব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কাঁদতে কাঁদতে নিজের নাকে ধরে বললেন, এটা হলো শ্লেষ্মা। ক্রন্দনের কারণে কখনো কখনো বের হয়। আরেকবার ক্রন্দনের সময় গোপনীয়তার চেষ্টা করে বলেন, বার্ধক্যের কারণে মানুষের কাশি ওঠে ও শ্লেষ্মা পড়ে!
১৫۱. হযরত কাহমাস ইবনে হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে খাতাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বসে এক ব্যক্তি দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। মনে হলো তার মধ্যে ব্যাকুলতা এসে গেছে। তখন উমর তাকে আঘাত করলেন।
১৫২. হযরত আবদুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু সারিলের মধ্যে যখন কথাবার্তা কিংবা তিলাওয়াতের সময় ক্রন্দন আসতো, তখন হাসি দিয়ে তা থেমে দিতেন।
১৬৩. হযরত রাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বয়ান করছিলেন, এক লোক কেঁদে উঠলো। হাসান বললেন, কী উদ্দেশ্যে কাঁদছো, এ সম্পর্কেও আল্লাহ পাক তোমাকে শেষ বিচারের দিন প্রশ্ন করবেন।
১৬৪. হযরত ইসাম রামালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বয়ান করছিলেন, মজলিস থেকে একব্যক্তি হঠাৎ কেঁদে উঠলো। হাসান বলেন, যদি আল্লাহর জন্য কেঁদে থাকো তবে নিজেকে তিরস্কার করলে। আর যদি গায়রুল্লাহর জন্য কাঁদো, তুমি ধ্বংস হয়ে গেলে।
১৬৫. হযরত হাম্মাদ ইবনে জায়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আইয়ুব কোন একটি বিষয়ের উপর আলোচনা করছিলেন, এক পর্যায়ে তাঁর হৃদয় গলে গেলো। যেনো কেঁদে ফেলবেন। তখন খেমা নির্গত করলেন, আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, বৃদ্ধ লোকের জন্য খেমা পড়া বেশ কঠিন সমস্যা।
১৬৬. হযরত হুরায়ব ইবনে সুফিয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মনসুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাদের সাথে কথা বলছিলেন। এরপর মজলিস ত্যাগ করার আগে কয়েকবার চোখ মুছলেন।
১৬৭. হযরত আবদুর রহমান ইবনে মুসলিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আইয়ুব কাঁদলেন। ক্রন্দন সম্বরণ করতে না পেরে মজলিস ত্যাগ করে চলে গেলেন।
১৬৮. হযরত বুস্তাম হারিস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আইয়ুবের হৃদয় যখন গলে যেতো, চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো। তখন বন্ধুদের নিকট থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসতেন, নাক ধরে রাখতেন। মনে হতো খেমা এসে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেলে মজলিস ছেড়ে চলে যেতেন।
১৮৯. হযরত হাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী যখন অসুস্থ ছিলেন, সাবিতও তাঁকে দেখতে আসলেন। ‘ক্রন্দনকারী’ ইয়াহইয়া তাঁকে সালাম জানালেন। সাবিত বললেন, আপনি কে? অন্য এক ব্যক্তি তার পরিচয় দিলেন, তিনি আবু মুসলিম ইয়াহইয়া। সাবিত আবার জিজ্ঞেস করেন, আবু মুসলিম কে? পরিচয় দেওয়া হলো তিনি ‘ক্রন্দনকারী’ ইয়াহইয়া। এতদশ্রবণে সাবিত বলেন, সেদিনটি তোমাদের জন্য খুবই অনিষ্টকর, যেদিন তোমরা তাকে ‘ক্রন্দনকারী’ উপাধি দিয়েছ।
১৯০. হযরত আ'মাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হুযাইফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নামাযে কাঁদলেন। নামায শেষে দেখলেন, পেছনে এক ব্যক্তি বসে আছেন। তিনি তাঁকে বললেন, খবরদার! আমার এ অবস্থা কাউকে বলবে না।
১৯১. হযরত হাসান ইবনে রাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মধ্যে যখন কাঁদার ভাব আসতো, প্রকাশ হওয়ার আতঙ্কে মজলিস থেকে চলে যেতেন। আর কোন কোন সময় অন্য আলোচনায় মনোনিবেশ করতেন।
১৯২. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এমন অনেক লোককে পেয়েছি যারা একই বালিশে স্ত্রীকে নিয়ে মাথা রাখতেন। চোখের পানি গাল বয়ে পড়তো অথচ স্ত্রী তা টেরই পেতেন না। এমনও মানুষ পেয়েছি, যারা দাঁড়াতেন একই সারিতে, একজনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো অথচ অপরজন তা বুঝতেই পারতেন না।
১৯৩. হযরত মা'মার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পাশে বসে এক ব্যক্তি কেঁদে উঠলো। হাসান বললেন, সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে কেউ যখন কাঁদতেন পার্শ্বেরজন তা বুঝতে পারতেন না।
১৫৪. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এমন মানুষও ছিলেন, স্ত্রীর পাশে থেকে বিশ বছর পর্যন্ত কেঁদেছেন, কিন্তু স্ত্রী তা কোনদিন জানতেও পারেননি।
১৫৫. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ঈসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মসজিদে হাসান ইবনে আবি সিনান উপস্থিত হতেন। মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন কথা বলতেন, হাসসানের চোখের পানি মাটিতে পড়ে ধূলোবালি সিক্ত হতো, কিন্তু কোন আওয়াজ শোনা যেতো না।

📘 কোমল হৃদয়ের ক্রন্দন > 📄 পাপের ভয়ে আহাজারি

📄 পাপের ভয়ে আহাজারি


১৬৬. হযরত উকবা ইবনে আমীর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: يَا رَسُولَ اللَّهِ ، مَا النَّجَاةُ ؟ قَالَ : إِمْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ ، وَلْيَسْعَكَ بَيْتُكَ ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! মুক্তির পথ কি? জবাব দিলেন, জবান নিয়ন্ত্রণ করো, ঘরে অবস্থান করো, কৃতপাপের জন্য কাঁদতে থাকো।
১৬৭. হযরত আবদ ইবনে আবদুর রাহমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার বাবা আমাকে উপদেশ দিয়েছেন, প্রতিপালককে ভয় করো, জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে রাখো আর পাপের কথা স্মরণ করে কাঁদো।
১৬৮. হযরত মিসমা ইবনে আসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এবং আবদুল আজিজ ইবনে সালমান নাশিরা ইবনে সাঈদ হানাফীর নিকট গেলাম। তিনি এমন ছিলেন, কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখদুটি নষ্ট হয়ে যায়। আমরা তাঁর সাক্ষাতের অনুমতি চাইলাম। অনুমতি দিলেন। আবদুল আজিজ তাঁকে সালাম জানালেন। নাশিরা বললেন, কে, আবু মুহাম্মাদ নাকি? জবাব দিলেন, জি হ্যাঁ। নাশিরা জিজ্ঞেস করেন কেনো এসেছ? জবাব দিলেন, আপনি পাপের জন্য কেঁদে থাকেন, আমরা এসেছি এই আশায়, যেনো পাপের জন্য কাঁদতে পারি। একথা শোনে তিনি চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। আবদুল আজিজ তাঁর মাথার পাশে বসে কাঁদতে শুরু করলেন, নাশিনার পরিবার-পরিজনকেও ডেকে আনলেন। সবাই তাঁকে ঘিরে কাঁদলেন। বর্ণনাকারী আসিম বলেন, ক্রন্দনের রোল যখন বেশি হয়ে হলো, আমি গোপনে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম।
১৬৯. হযরত সালামা ইবনে সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যিয়াদ অট্টহাসি দিয়ে ওঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি। একথা বলেই খুব বেশী করে কাঁদলেন। উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, আল্লাহ পাক আমীরকে সংশোধন করে দিন! আপনি হাসলেন তারপর সাথে সাথেই কাঁদলেন, কারণ কি? জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! একটি গোনাহর কথা আমার স্মরণ হয়ে গেছে। যখন আমি এই গোনাহর সাথে জড়িয়ে পড়ি খুব আনন্দভোগ করি। কিন্তু যখন এই পাপের শাস্তির চিন্তা আসলো, আর না কেঁদে পারিনি। এটুকু বলে আবার কাঁদতে লাগলেন।
১৭০. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে হারিস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যখন রিয়াজ ইবনে কাইসিকে মসজিদে দেখলাম, লক্ষ্য করলাম তিনি কাঁদছেন। যখন ঘরে পেতাম তখনও দেখি তিনি কাঁদছেন। একদিন বললাম, সারাটি জীবনই তো কেঁদে কেঁদে কাটিয়ে দিলেন। একথা শোনে আবার কেঁদে ওঠলেন এবং বললেন, পাপীর জন্য ক্রন্দন ছাড়া আর করার কী আছে বলুন?”
১৭১. হযরত মূসা ইবনে ঈসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত হুযাইফা মারাআশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এক যুবককে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, যুবক! কাঁদছো কেন? সে জবাব দিলো, অতীতের গুনাহ স্মরণ হয়েছে তাই কাঁদছি। এতদপ্রসঙ্গে হুযায়ফাও কাঁদলেন। এরপর বললেন, হ্যাঁ ভাই! গুনাহর সমপরিমাণ ক্রন্দন করা চাই। একথা বলে যুবকের হাত ধরে এক কোলে গেলেন। উভয়ে একসাথে কাঁদতে লাগলেন।
১৭২. হযরত উবায়দূল্লাহ ইবনে মূসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা হাসান ইবনে সালেহের নিকট ছিলাম। তাঁর মধ্যে ক্রন্দনের ভাব আসলো। আরেক লোক জোরেসুরে কাঁদতে লাগলো। মজলিস থেকে অপর এক ব্যক্তি বললো, ভাই! নিজের জন্য এরূপ কাঁদো। যে ব্যক্তি নিজের উপর করুণা করে না, তার কোন কল্যাণ নেই। বর্ণনাকারী বলেন, হাসানকে এই বাক্যাটি বার বার বলতে শোনেছি। মনে হলো এটা তাঁর কাছে খুব ভালো লেগেছে।
১৭৩. হযরত কায়স ইবনে সুলাইম আখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জাহহাক ইবনে মুজাহীম বিকেল বেলা কাঁদতেন। জিজ্ঞেস করা হলো কাঁদেন কেন? জবাব দিলেন, জানি না, আমার কোন্ আমল আজ উপরের দিকে চলে গেছে?
১৭৪. হযরত জুহায়র সা’লুলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক ব্যক্তি ক্রন্দনকারী হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করলেন। সবসময় তিনি কাঁদতেন। তাঁর এক ভাই তিরস্কারের সুরে বললেন, আল্লাহ তোমাকে করুণা করুন! দীর্ঘদিন ধরে তুমি কাঁদছো কেন? তিনি কেঁদে কেঁদে জবাব দেন, পাপের আধিক্য দেখে কাঁদছি। পাপীদের কাজই তো হলো কাঁদা। পেরেশানী দূর করার জন্য চোখের পানি কেন, রক্ত ঝরাতে হলেও কুঁড়াবো না। একথা বলে তিনি আরো বেশী কাঁদলেন এবং অজ্ঞান হয়ে যান। প্রশ্নকারী তাঁর কাছ থেকে সরে গেলেন।
১৭৫. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা মাগফিরাত নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সাথে ছিলেন হাওশাব ইবনে মুসলিম। তার প্রসিদ্ধি ছিল, তিনি জিকরের সময় খুব কাঁদতেন। তখন মাগফিরাতের আলোচনা শোনে কাঁদতে লাগলেন এবং মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
১৭৬. হযরত আবূ ইমরান জাওনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যখন ঝড়-ঝঞ্ঝা শুরু হবে, বুঝা যাবে তখন ক’জন মুক্তি পাচ্ছে?
১৭৭. হযরত তালহা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক ব্যক্তি অনেক পাপ করেছিলেন। প্রতিটি পাপের জন্য তিনি আলাদাভাবে কাঁদতেন। তাঁর খাদিম বললেন, এটা যদি আপনার অভ্যাসে পরিণত হয় তাহলে অন্ধ হয়ে যাবেন।
১৮৯. হযরত আবু আব্দুর রহমান মাগাজিবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শাম দেশের সমুদ্র সৈকতে বিচরণকালে এক ব্যক্তি বললেন, আবদিরারা যদি পাপের জন্য কাঁদেন, তাহলে তাদের শরীর দিয়ে রক্ত ও পানি বেরিয়ে আসবে। শরীর শুকিয়ে রক্ত-পানিশূন্য হবে। আতঙ্কে তাদের রূহ চক্রর দিতে থাকবে। তারা সেদিনকে ভয় করবেন, যেদিন গর্ভবতী মহিলা জানতে পারবে না, সে কী প্রসব করেছে? একথা বলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়লেন।
১৯০. হযরত সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু সুলায়মান জীবনভর কাঁদলেন। বার বার এ কথাটি বলতেন, পাপের বিচার হওয়ার পূর্বে কাঁদতে থাকো। নিজের হিসাব নিয়ে ভাবো। অতীতে যেসব অশুভ কাজ করেছ, যদি ভাবতে তাহলে আল্লাহর দরবারে তাওবাহ্ করতে, ইখলাস অবলম্বন করতে। প্রভু খুবই করুণাময়! আমরা তো তার ভৃত্য।
১৯১. হযরত বুহাইম আয়ালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সমুদ্রভ্রমণে আমাদের সাথে একজন যুবক ছিলেন। তিনি দিনরাত কাঁদতেন। একজন তাকে তিরস্কার করে বললো, নিজের প্রতি একটু করুণা করুন! যুবক বললেন, যদি সারা জীবনই কাঁদি তবুও ক্রন্দন অল্প হবে! তার এ কথা শুনে উপস্থিত সকলেই কাঁদতে লাগলেন।
১৯২. হযরত উসমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বুহাইম একজন চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন। তিনি সমুদ্র-ভ্রমণের সময় পূর্বে বর্ণিত সেই যুবকের অবস্থা স্মরণ করে কাঁদতেন। তিনি বলতেন, ঐ যুবক নিজের উপর বেশ করুণা করেছে। একথা বলে তিনি আরো বেশী কাঁদতেন।
১৯৩. হযরত মুহাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কারী আবু জাফরকে রাতের গভীরে কাঁদতে শুনেছি। কেঁদে কেঁদে বলতেন, সারা জীবন তোমার পাপের জন্য কাঁদতে থাকো, কাঁদার চেষ্টা করো। ক্রন্দন চিন্তা- ফিকিরকে দূর করে দেয়। দিনের বেলায় সংঘটিত পাপের কথা কখনো ভুলবে না। পাপ তো মানুষকে একদম ঘিরে ফেলে। তিনি এসব কথা বার বার বলছিলেন আর কাঁদছিলেন।
১৮৩. হযরত বহর আবু ইয়াহইয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সমুদ্র সৈকতে এক আবিদকে কাঁদতে দেখলাম। তাকে ঘিরে তার বন্ধু-বান্ধবরাও কাঁদছিলেন। আবিদ বললেন, কাঁদো! কাঁদতে থাকো! ক্রন্দন ছাড়া মুক্তির পথ নেই। কেঁদে কেঁদে আরো বলেন, কেউ কাঁদে দুনিয়ার জন্য, আর আমরা কাঁদছি পাপ মোচনের জন্য। একথা শোনে বন্ধুরা আরো বেশী কাঁদলেন।
১৮৪. হযরত সালেহ মুররী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পাপের জন্য নিজেই কাঁদো, মৃত্যুর পর তোমার পাপের জন্য কি আরেকজন কাঁদবে? একথা বলার পর কাঁদতে থাকেন, আর বলেন, ভাইসব! পাপের জন্য কাঁদো, পাপাসক্ত হৃদয়ে কল্যাণ পৌঁছে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00