📄 ওয়াজ শ্রবণকারীদের ক্রন্দন
১১১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তাঁর বাবা উবায়দ আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়র ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাহমাতুল্লাহি আনহুমা’র সাথে কথাবার্তা বলতেন। তাঁর বাবা যখন এই আয়াতটি- يَوْمَئِذٍ يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَعَصَوُا الرَّسُولَ لَوْ تُسَوَّى بِهِمُ الْأَرْضُ وَلَا يَكْتُمُونَ اللَّهَ حَدِيثًا তিলাওয়াত করেন, তখন ইবনে উমর এতো বেশি কাঁদলেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে গেলো চোখের পানিতে। [আয়াতের অর্থ- যে সব লোক কাফির হয়েছিল এবং রাসূলের নাফরমানী করেছিল, সেদিন তারা কামনা করবে যেন জমিনের সাথে মিশে যায়। কিন্তু আল্লাহর নিকট কোন বিষয় গোপন করতে পারবে না। (৪:৪২)]
১১২. হযরত আওয়াম ইবনে হাওশাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উবায়দ ইবনে উমায়য়ার হালকায় আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাহমাতুল্লাহি আনহুকে দেখা যেতো। তিনি খুব কাঁদতেন। চোখের পানিতে মাটিও ভিজে যেতো।
১১৩. হযরত মুআররাফ ইবনে ওয়াসিল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি শফিক ইবনে সালামাকে ইবরাহীম তায়িমির হাতে হাত ধরা অবস্থায় দেখেছি। ইবরাহীম যখন কথা বলেন, শফিক কাঁদতে থাকেন।
১১৪. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কায়েস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আব্দুল আযীয একদা যুহরের নামাযের সালাম ফিরিয়ে বলেন, আরু ইবরাহীম! জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনা করো। তখন আমি আলোচনা করলাম। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে উমর ইবনে আব্দুল আযীযের চেয়ে আর কাউকে এতো বেশি কাঁদতে দেখি নি।
১১৯. হযরত কাতাদা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমার ইবনে আবদুল আজিজের কাছে এক ব্যক্তি আসলো, তাকে ইবনে আতআম ডাকা হতো। তিনি ওয়াজ করছেন আর উমার কাঁদছেন। কেঁদে কেঁদে এক পর্যায়ে বেহুঁশ হয়ে পড়েন।
১২০. হযরত খালিদ ইবনে সাফওয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমার ইবনে আবদুল আজিজ আতআমকে বললেন, ইবনে আতআম! তোমার বাস্তবিতা তোমার নিরপেক্ষই চলে যাবে। তাই সার সংক্ষেপ বক্তব্য দাও। আল্লাহর কাছে জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করো। তখন ইবনে আতআম কাঁদলেন। উমারও কাঁদলেন। ক্রন্দনের আওয়াজে গৃহ কেঁপে উঠলো। ইবনে আতআমকে ইতোপূর্বে আর কোনদিন এতো বেশি কাঁদতে দেখি নি।
১২১. হযরত মুবারক ইবনে ফুজালা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আতআম উমার ইবনে আবদুল আজিজের কাছে গেলেন। তিনি খাটের উপর বসে আছেন। ইবনে আতআম আল্লাহর প্রশংসা গেয়ে লম্বা উপদেশ দিলেন। উমার খাট থেকে নেমে মাটিতে বসে যান। ইবনে আতআম বললেন, উমার! তুমি রাজাদের সন্তান। জন্ম নিয়েছে আরাম আয়েশের মধ্যে। মজাদার খাবার খেয়েছো। বিলাসিতা ছাড়া অন্য কিছু চিন না। উমার কেঁদে কেঁদে বললেন, ইবনে আতআম আরো বেশী কথা বল। ইবনে আতআম উপদেশ দিচ্ছেন। উমার কাঁদতে আছেন। শেষে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
১২২. হযরত মূসা ইবনে জায়েদ হাসানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একজন মানুষ আবদুল্লাহ ইবনে হাসানের সাথে কথা বললো। উপস্থিত লোকজনকে কাঁদালো। সকলে চলে যাওয়ার পর আবদুল্লাহ বললেন, আগেকার লোকজন অনুরূপ কাঁদাতেন।
১২৩. হযরত উকায়বা ইবনে ফুজালা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি সাঈদ ইবনে দা'লাজের কাছে গেলাম। তাঁর সামনে এক ব্যক্তিকে প্রহার করা হচ্ছিলো। আমি বললাম, আল্লাহ! আমিরকে সংশোধন করুন। আমি আপনার সাথে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই। এরপর আপনি যথেষ্টাতাই করবেন। বললাম, কিয়ামতের দিন অপকর্মের ফলে লোকজনের হৃদয় কাঁপতে থাকবে। অহঙ্কারীরা তখন সমগ্র সৃষ্টির পদতলে থাকবে। একথা শুনে তিনি খুব বেশি কাঁদলেন। লোকটিকে ছেড়ে দেন। এরপর থেকে যখনই তাঁর কাছে যেতাম আমাকে বেশ শ্রদ্ধা করতেন। একদিন বলেন উকায়রা! তোমার কথা আমাকে কাঁদায়। একথা বলে কাঁদতে লাগলেন।
১২০. হযরত মুদার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক রাতে আমরা ক’জন সমুদ্র সৈকতে সমবেত হই। মুসলিম আবু আবদুল্লাহ ও সাথে ছিলেন। এক পর্যায়ে ইজদ অঞ্চলের এক লোক বললো, প্রেমিকের জন্য ইশকের সম্পর্ক ছাড়া আর কি আছে? প্রেমিক কল্যাণকর কাজের সন্ধানে লেগেই থাকে। একথা শ্রবণ করে মুসলিম খুব কাঁদলেন। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তখন আমার ভয় হয়েছিল, তিনি যেন মরে যাবেন।
১২১. হযরত আবু জাফর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সালেহ ইবনে আবদুল করিম আমাকে বললেন, রাহমানের জন্য ক্রন্দনকারীদের কাঁদনে চোখের পানি ভাসে, জমিনের বিভিন্ন অংশ আত্মপ্রকাশ করতে থাকে, তারা কখন আমাদের উপর সিজদা করবে। এটুকু বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। মনে হলো তাঁর প্রাণ বেরিয়ে যাবে।
১২২. হযরত সালত ইবনে হাকিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক বন্ধুর সাথে আমি রাত্রি যাপন করলাম। আমাদের মধ্যে একজন ক্বারী একথা বলতে লাগলেন, আমার কি হলো, আমি কোনো পাপের জন্য কাঁদছি না? পাপ তো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অন্তরের জন্য ব্যাধি।
১২৩. হযরত রিয়াহ ইবনে উবায়দা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট বসা ছিলাম। একজন গ্রাম্য লোক সেথায় উপস্থিত হয়ে বললো, অনেক দূর থেকে একটি প্রয়োজনে এসেছি। কিয়ামতের দিন আমার সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা আপনাকে প্রশ্ন করবেন। উমার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী বলতে চাচ্ছো আবার বলো। তার মাথা নীচু হয়ে যায়। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। অশ্রুর ফোঁটায় মাটি সিক্ত হয়ে যায়। এরপর মাথা উঠিয়ে উমার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পরিবারের সদস্য কতজন? লোকটি জবাব দিল, আমি ও আমার তিন মেয়ে আছে। তখন তিনি তার জন্য তিনশ দিরহাম ও প্রত্যেক মেয়ের জন্য একশ দিরহাম নির্ধারণ করলেন। নগদ একশ দিরহাম দিয়ে বললেন, আমার নিজের সম্পদ থেকে এই টাকা প্রদান করছি, মুসলমানদের মাল থেকে নয়। এগুলো খরচ করো, মুসলমানদের দান-খয়রাতও আমার হাতে আসলে বাকি টাকা এসে নিয়ে যেয়ো।
১২৪. হযরত উবায়দা ইবনে হাসসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আজারবাইজান থেকে এক ব্যক্তি উমার ইবনে আবদুল আজিজের নিকট আসলো। সে বললো, আমি এই স্থানে দাঁড়িয়ে আরেকটি জায়গার কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। সেখানকার মানুষের মধ্যে যে ঝগড়া বিবাদ হচ্ছে সে ব্যাপারে আপনাকে আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞাসাবাদ করত ভুলবেন না। কথাটি শুনে উমার কাঁদতে লাগলেন। তিনি বললেন, আবার বলো। লোকটি বার বার উক্ত কথা বলছিলো আর তিনি কাঁদতে থাকেন। অবশেষে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী অভিযোগ? জবাব দিলো, আজারবাইজানের শাসক আমার উপর যুলম করেছেন। আমার কাছ থেকে বারো হাজার দিরহাম বলপূর্বক আদায় করে বায়তুল মালে নিয়ে জমা করেছেন। অভিযোগ শ্রবণ করে উমার কর্মচারীকে নির্দেশ দিলেন, শাসকের নিকট পত্র লিখ, সে যেনো লোকটির টাকা ফেরৎ দেয়।
📄 নামাযের মধ্যে ক্রন্দন
১২৬. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আবু হারিস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজকে দেখেছি, সিজদা থেকে মাথা উঠালেন। উভয় সিজদার মধ্যে বিশ আয়াত পরিমাণ সময় বসে রইলেন। আবার সিজদা করলেন। যখন মাথা উঠালেন, দেখলাম চোখের পানিতে কপাল বয়ে যাচ্ছে। মক্কা শরীফে অবস্থানকালে নফল নামাযে আমি এ দৃশ্যটি অবলোকন করি।
১২৭. হযরত আদহাম ইবনে জাকারিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, খুরাসানের একজন শায়খ আমার নিকট বর্ণনা করেন, বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে আবু জা'ফর যখন যাত্রা করলেন, তখন এক দরবেশের ঘরে মেহমান হলেন। উমর ইবনে আবদুল আজিজও ইতোপূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাস যাত্রাপথে ঐ দরবেশের ঘরে অতিথি হয়েছিলেন। আবু জা'ফর দরবেশকে জিজ্ঞেস করলেন, জনাব! উমর ইবনে আবদুল আজিজের কোন কাজটি আপনার নিকট সর্বাপেক্ষা আশ্চর্যজনক মনে হয়েছে? দরবেশ জবাব দিলেন, হ্যাঁ, আমীরুল মু'মিনীন! তিনি একবার আমার ছাদে অবস্থান করছিলেন আর আমি চিৎ হয়ে শুয়েছিলাম। হঠাৎ অনুভব করি নালা বেয়ে আমার বুকে পানি পড়ছে। বিষয়টি আমাকে ভাবাল। বাইরে কোন বৃষ্টিপাতও হচ্ছে না আর আমার ঘরেও পানি নেই। তাই উপর তলায় যাই। উঠে দেখি উমর ইবনে আবদুল আজিজ সিজদায় আছেন, আর তাঁর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে।
১২৮. হযরত আলী ইবনে শাবীব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার কাছে কয়েক জন বন্ধু বর্ণনা করেছেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন সিজদা থেকে মাথা উঠালেন, দেখা গেল চোখের পানিতে সিজদার জায়গা সিক্ত হয়ে গেছে।
১২৯. হযরত মুহাম্মদ ইবনে জা'ফর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, খালিদ জাইয়াদকে দেখেছি। যখন সিজদা থেকে মাথা ওঠালেন, সিজদা স্থলের ধুলো অশ্রুতে ভিজে গেছে।
১৩০. হযরত মাকহুল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এক নেতাকে তাওয়াফ করতে দেখেছি। আমার ইচ্ছা হলো তিনি কী করছেন তা দেখব। লক্ষ্য করলাম তিনি রুকনে আসওয়াদের সামনে দাঁড়িয়ে চল্লিশ আয়াত পর্যন্ত সময় অবস্থান করলেন। এরপর পাথরের পাশে গিয়েও অনুরূপ সময় দাঁড়ালেন। সেখান থেকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একই পরিমাণ সময় অতিবাহিত করলেন। তারপর চলে গেলেন রুকনানে হাজরায় (সম্ভবত হাতীমে)। সেখানে এসে দু রাকআত নামাজ পড়লেন। উপস্থিত নামাযিদের মধ্যে তার নামাজ ছিলো সব চেয়ে আকর্ষণীয়। যখন সিজদায় গেলেন দু‘আ করতে শুনলাম, আল্লাহ! পাপ ক্ষমা কর। অতীতে ও বর্তমানে যত পাপ করেছি, ক্ষমা কর। এরপর খুব কাঁদলেন। চোখের পানিতে পাথর ভিজে গেল।
১৩۱. হযরত মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি রাইয়াহ কাইসীর পাশে নামাজ পড়ছিলাম। তখন দেখি, তার চোখের পানি টপ টপ করে মাটিতে পড়ছে।
১৩২. হযরত মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইসমাইল ইবনে দাউদের পাশে নামাজ পড়ি। তখন অনবরত পাই তার চোখের পানি টপ টপ করে চাটাইয়ের উপর পড়ছে।
১৩৩. হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে আইজার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে যখনই দেখেছি, তাঁর উভয় চোখের মধ্যেখানে একটি দাগ লক্ষ্য করেছি। মনে হতো এটা কোন ক্ষতচিহ্ন। কিন্তু আসল কথা, তাঁর সামনে যখন আখিরাতের আলোচনা হতো, চোখদ্বয় অশ্রুতে ভারী হয়ে যেতো।
১৩৪. হযরত আব্দুল জাব্বার ইবনে নহর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত, তার কাছে মুহাম্মাদ ইবনে সিরীনের একজন পরিবারের সদস্য বলেন, জামে মসজিদে দেখি মুসলিম ইবনে ইয়াসার সিজদা থেকে মাথা উঠাচ্ছেন। সিজদার জায়গা চোখের পানিতে একদম ভিজা। মনে হলো এখানে পানি ঢালা হয়েছে।
১৩৫. হযরত কাদির দাইলামী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ফুজাঈলের ইবনে আয়াজ আমার হাত ধরে বলেন, ফুজাঈলের জন্য কাঁদো। আমি তোমার এক বন্ধুকে দেখেছি, কুফার মসজিদে যখন তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠালেন সিজদার জায়গাটি অশ্রুতে সিক্ত হয়ে গিয়েছে।
১৩৬. হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইমার ইবনে মুসলিম আমাকে মসজিদের মধ্যে একটা আরেকটার বিপরীতে স্থাপিত দুটি ভেজা জায়গা দেখালেন। আমি বললাম, এসব কী? উত্তর দিলেন, আল্লাহর শপথ! এটা জায়গাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহির চোখের পানি। তিনি মাগরিব থেকে ইশা পর্যন্ত রুকূ অবস্থায় ছিলেন।
১৩৭. হযরত আমর ইবনে কায়েস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শফীক ইবনে সালামা মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ পড়তেন এবং খুব বেশী কাঁদতেন।
১৩৭. [এ নামাযের কোন বর্ণনা মূল কিতাবে পাওয়া যায় নি। -অনুবাদক]
📄 পবিত্রতা অর্জনের সময় ক্রন্দন
১৪৮. হযরত আবদুর রাহমান ইবনে হাফস কুরাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আলী ইবনে হুসাইন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন অযু করতেন, চেহারা হলুদ বর্ণ ধারণ করতো। পরিবার পরিজন জিজ্ঞেস করলেন, অযুর মধ্যে এমন অবস্থা হয় কেনো? জবাব দেন, জানো! কার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি?
১৪৯. হযরত আবু সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মানসুর ইবনে জাদানকে দেখেছি, যখন অযু করতেন, চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে ওঠতো, জোরে জোরে কাঁদতেন। জিজ্ঞেস করি, আল্লাহ আপনার উপর করুণা বর্ষণ করুন! আপনার এ কী অবস্থা? জবাবে দেন, আমার চেয়ে করুণ অবস্থা আর কারো হতে পারে কি? যে সত্তার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি, তিনি তো কখনো তন্দ্রাচ্ছন্ন বা নিদ্রামগ্ন হন না।
১৫০. হযরত নাঈম ইবনে মুয়ায়ারা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আতা সুলাইমী যখন অযু করতেন, তাঁর শরীর কেঁপে উঠতো। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তো। খুব কাঁদতেন। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে জবাব দিতেন, এক মহান কাজ আদায়ের সংকল্প করছি। আমি তো আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি।
📄 গোপনে রোদন
১৪৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে কাব বয়ান করছিলেন, তখন এক ব্যক্তি কেঁদে উঠলো। বয়ান বন্ধ করে বললেন, কে কাঁদছে? জবাবে বলা হলো, অমুক গোত্রের একজন ক্রীতদাস। বর্ণনাকারী বলেন, মনে হলো তিনি এরূপ কাঁদা অপছন্দ করলেন।
১৪৯. হযরত আবু মাশার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে কাব যখন বয়ান দিতেন, চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তো। যদি অন্য কাউকে ক্রন্দন করতে শোনাতেন, ধমক দিয়ে বলতেন, এটা কী?
১৫০. হযরত হাম্মাদ ইবনে যায়েদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একদা আইয়ুব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কাঁদতে কাঁদতে নিজের নাকে ধরে বললেন, এটা হলো শ্লেষ্মা। ক্রন্দনের কারণে কখনো কখনো বের হয়। আরেকবার ক্রন্দনের সময় গোপনীয়তার চেষ্টা করে বলেন, বার্ধক্যের কারণে মানুষের কাশি ওঠে ও শ্লেষ্মা পড়ে!
১৫۱. হযরত কাহমাস ইবনে হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে খাতাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বসে এক ব্যক্তি দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। মনে হলো তার মধ্যে ব্যাকুলতা এসে গেছে। তখন উমর তাকে আঘাত করলেন।
১৫২. হযরত আবদুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু সারিলের মধ্যে যখন কথাবার্তা কিংবা তিলাওয়াতের সময় ক্রন্দন আসতো, তখন হাসি দিয়ে তা থেমে দিতেন।
১৬৩. হযরত রাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বয়ান করছিলেন, এক লোক কেঁদে উঠলো। হাসান বললেন, কী উদ্দেশ্যে কাঁদছো, এ সম্পর্কেও আল্লাহ পাক তোমাকে শেষ বিচারের দিন প্রশ্ন করবেন।
১৬৪. হযরত ইসাম রামালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বয়ান করছিলেন, মজলিস থেকে একব্যক্তি হঠাৎ কেঁদে উঠলো। হাসান বলেন, যদি আল্লাহর জন্য কেঁদে থাকো তবে নিজেকে তিরস্কার করলে। আর যদি গায়রুল্লাহর জন্য কাঁদো, তুমি ধ্বংস হয়ে গেলে।
১৬৫. হযরত হাম্মাদ ইবনে জায়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আইয়ুব কোন একটি বিষয়ের উপর আলোচনা করছিলেন, এক পর্যায়ে তাঁর হৃদয় গলে গেলো। যেনো কেঁদে ফেলবেন। তখন খেমা নির্গত করলেন, আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, বৃদ্ধ লোকের জন্য খেমা পড়া বেশ কঠিন সমস্যা।
১৬৬. হযরত হুরায়ব ইবনে সুফিয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মনসুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাদের সাথে কথা বলছিলেন। এরপর মজলিস ত্যাগ করার আগে কয়েকবার চোখ মুছলেন।
১৬৭. হযরত আবদুর রহমান ইবনে মুসলিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আইয়ুব কাঁদলেন। ক্রন্দন সম্বরণ করতে না পেরে মজলিস ত্যাগ করে চলে গেলেন।
১৬৮. হযরত বুস্তাম হারিস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আইয়ুবের হৃদয় যখন গলে যেতো, চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো। তখন বন্ধুদের নিকট থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসতেন, নাক ধরে রাখতেন। মনে হতো খেমা এসে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেলে মজলিস ছেড়ে চলে যেতেন।
১৮৯. হযরত হাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী যখন অসুস্থ ছিলেন, সাবিতও তাঁকে দেখতে আসলেন। ‘ক্রন্দনকারী’ ইয়াহইয়া তাঁকে সালাম জানালেন। সাবিত বললেন, আপনি কে? অন্য এক ব্যক্তি তার পরিচয় দিলেন, তিনি আবু মুসলিম ইয়াহইয়া। সাবিত আবার জিজ্ঞেস করেন, আবু মুসলিম কে? পরিচয় দেওয়া হলো তিনি ‘ক্রন্দনকারী’ ইয়াহইয়া। এতদশ্রবণে সাবিত বলেন, সেদিনটি তোমাদের জন্য খুবই অনিষ্টকর, যেদিন তোমরা তাকে ‘ক্রন্দনকারী’ উপাধি দিয়েছ।
১৯০. হযরত আ'মাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হুযাইফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নামাযে কাঁদলেন। নামায শেষে দেখলেন, পেছনে এক ব্যক্তি বসে আছেন। তিনি তাঁকে বললেন, খবরদার! আমার এ অবস্থা কাউকে বলবে না।
১৯১. হযরত হাসান ইবনে রাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মধ্যে যখন কাঁদার ভাব আসতো, প্রকাশ হওয়ার আতঙ্কে মজলিস থেকে চলে যেতেন। আর কোন কোন সময় অন্য আলোচনায় মনোনিবেশ করতেন।
১৯২. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এমন অনেক লোককে পেয়েছি যারা একই বালিশে স্ত্রীকে নিয়ে মাথা রাখতেন। চোখের পানি গাল বয়ে পড়তো অথচ স্ত্রী তা টেরই পেতেন না। এমনও মানুষ পেয়েছি, যারা দাঁড়াতেন একই সারিতে, একজনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো অথচ অপরজন তা বুঝতেই পারতেন না।
১৯৩. হযরত মা'মার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পাশে বসে এক ব্যক্তি কেঁদে উঠলো। হাসান বললেন, সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে কেউ যখন কাঁদতেন পার্শ্বেরজন তা বুঝতে পারতেন না।
১৫৪. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এমন মানুষও ছিলেন, স্ত্রীর পাশে থেকে বিশ বছর পর্যন্ত কেঁদেছেন, কিন্তু স্ত্রী তা কোনদিন জানতেও পারেননি।
১৫৫. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ঈসা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মসজিদে হাসান ইবনে আবি সিনান উপস্থিত হতেন। মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন কথা বলতেন, হাসসানের চোখের পানি মাটিতে পড়ে ধূলোবালি সিক্ত হতো, কিন্তু কোন আওয়াজ শোনা যেতো না।