📄 কান্নার জন্য প্রার্থনা
৪৪. হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: يَا أَيُّهَا النَّاسُ ابْكُوْا ◌ فَإِنْ لَّمْ تَبْكُوْا فَتَبَاكُوْا ◌ فَإِنَّ أَهْلَ النَّارِ يَبْكُوْنَ ◌ حَتَّى تَصِيْرَ فِي وُجُوْهِهِمُ الْجَدَاوِلُ ◌ فَتَنْقَطِعُ الدُّمُوْعُ ◌ فَتَقْرَحُ الْعُيُوْنُ ◌ حَتَّى لَوْ أَنَّ السُّفُنَ أُرْخِيَتْ فِيْهَا لَجَرَتْ
লোকজন! কাঁদো। না পারলে কাঁদার ভান করো। কারণ, জাহান্নামীরা কাঁদতেই থাকবে। কাঁদতে কাঁদতে তাদের চোখ দিয়ে নদী বয়ে যাবে। অশ্রু শেষ হয়ে গেলে চোখ দিয়ে রক্ত ঝরবে। এই আহাজারির অশ্রু-রক্তের মিশ্র নদীতে নৌকাও ভেসে চলতে পারবে।
৪৫. হযরত ইসহাক হাজরানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সালেহ মুররীকে বলতে শুনেছি, কাঁদার অনেক কারণ আছে: পাপের চিন্তা করে কাঁদা, এতে যদি হৃদয়ে সাড়া জাগে তাহলে তো ভালো। নতুবা আতঙ্কজনক অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। এতে যদি দিলের মধ্যে সাড়া মিলে তাহলে ভালো। আর তাতেও যদি ক্রন্দন হয় না তাহলে চিন্তা করবে, আগুনের সিঁড়িতে তুমি গড়াগড়ি করছ। একথা বলে তিনি চিৎকার দিলেন, বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যান। অবস্থা দেখে মজলিসের সমস্ত লোক চিৎকার দিয়ে উঠলো।
৪৬. হযরত আবু হুরাইরাহ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: أَنَّ رَجُلًا ◌ شَكَا إِلَى رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَسْوَةَ قَلْبِهِ ◌ فَقَالَ: إِنْ أَحْبَبْتَ أَنْ يَّلِيْنَ قَلْبُكَ فَامْسَحْ رَأْسَ الْيَتِيْمِ ◌ وَأَطْعِمِ الْمِسْكِيْنَ
এক ব্যক্তি আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তার হৃদয়ের কঠোরতার কথা তুলে ধরল। রাসূল জবাব দিলেন, যদি হৃদয়ে কোমলতা চাও, তবে এতিমের মাথায় হাত বুলাও। নিঃস্বকে আহার করাও।
৪৭. হযরত মু'লি ইবনে জিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক ব্যক্তি হযরত হাসান বসরীকে বললো, আবু সাঈদ! আপনার কাছে আমার হৃদয়ের কঠোরতার অভিযোগ করছি। তিনি বললেন, হৃদয়কে জিকিরের নিকটবর্তী করো।
৪৮. হযরত আবু আবদুর রাহমান মাগাজিলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শাম দেশের একজন মানুষ সেই সমুদ্র তীরে বাস করতেন। তিনি বলতেন, ইবাদতগুজার মানুষ যদি কাঁদতো, তাদের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে রক্ত ও চর্বি গড়িয়ে পড়তো। শরীর শূন্য হয়ে যেতো। তাদের হৃদয় সেদিনের ভয় নিয়ে ঘোরপাক করতো, যেদিন গর্ভবতী মহিলা গর্ভের কথা ভুলে যাবে।
৪৯. হযরত উসমান ইবনে আতা খুরাসানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বাবা থেকে বর্ণনা করেন, হযরত ওয়াইস কারনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কামারের দোকানে আসতেন। অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করতে কামাররা তাদের ব্যাগ দিয়ে যখন বাতাস দিত, তিনি অগ্নি স্ফুলিঙ্গ অবলোকন করতেন আর শব্দ শুনতেন। তারপর চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে যেতেন। লোকেরা এ দৃশ্য দেখে কাছে এসে বলতো, সে এক পাগল! কোন সময় তিনি কুফা শহরের একটি পুরাতন স্তূপে বসে ক্রন্দন করতেন। সূর্যোদয়ের পর সেখান থেকে নেমে আসতেন। শিশুরা তার পেছনে ছুটতো। তিনি দৌঁড়ে মসজিদে চলে যেতেন।
৫০. হযরত বখতরী ইবনে ইয়াজিদ আনসারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জুনক আবিদ কামারের চামড়ার ব্যাগের দৃশ্য অবলোকন করতেন আর কাঁদতেন। হঠাৎ একদিন তিনি চিৎকার দিয়ে মূর্ছামুখে পতিত হন।
৫১. হযরত মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি হযরত হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির সাথে বাজারে যাই। আতরের দোকানের পাশ দিয়ে গেলাম, তখন সুঘ্রাণ পাই। তিনি কাঁদতে লাগলেন। মনে হলো কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়বেন। তখন বলেন, আল্লাহ্র শপথ! সমগ্র সৃষ্টির ঠিকানা হয় জান্নাতে হবে, না হয় জাহান্নামে। তৃতীয় কোন ঠিকানা নেই। তখন আবার কাঁদতে থাকেন। এই ঘটনার কিছু দিন পরই তিনি দুনিয়া ত্যাগ করেন।
৫২. হযরত আবুল হাইসাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর আসওয়াস গোত্রের পাশ দিয়ে গেলাম। তারা গালিচার উপর বসে আছে। পরনে রঙ বেরঙের রেশমী বস্ত্র। সাঈদ তাদেরকে সালাম দিলেন। তারা তাঁকে স্বাগত জানালো, সালাম জানিয়ে বসতে বললো। এদের কাছ থেকে সরে আসার পর খুব কাঁদলেন। জিজ্ঞেস করি, হযরত! কোন্ কারণে এত বেশী কাঁদছেন? জবাব দিলেন, এই লোকগুলোকে দেখার পর জান্নাত ও এর আরাম- আয়েশের কথা স্মরণ হয়ে যায়।
৫৩. হযরত ওয়াইবা ইবনে সাফওয়ানের এক ভাই বর্ণনা করেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির একজন খাদিম বলেন, এক রাতে উমর কেঁদে কেঁদে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। এতে আমারও ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি তাঁর কাছে রাত্রিযাপন করতাম। অধিকাংশ সময়ই তাঁর ক্রন্দনে জেগে উঠতাম। কিন্তু এ রাত তিনি বেশী কাঁদলেন। সকালে আমাকে ডেকে বলেন, 'বৎস! মানুষ তোমার কথা শুনবে এবং তোমাকে মেনে চলবে- তাতে তো কোন কল্যাণ নেই। বরং তুমি মহান প্রতিপালকের বিধান বুঝবে ও তা পালন করবে- তাতেই আসল কল্যাণ। বৎস! আজ রাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন মানুষকে আমার নিকট আসতে দেবে না। আমার ভয় হচ্ছে, না আমি তাদের কথা বুঝবো আর না তারা বুঝবে আমার কথা।' এরপর বলি, আমীরুল মু'মিনীন! আজ রাত আপনাকে এতো বেশী কাঁদতে দেখেছি অন্য কোন রাতে এমন দেখি নি। এবার পুনরায় কাঁদেন আর বলেন, 'বৎস! আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর সামনে কিভাবে দাঁড়াবো এ নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছি।' তখন বেহুঁশ হয়ে যান। ভোর হওয়ার পর জ্ঞান ফিরে আসে। এ ঘটনার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আর কখনো তাঁকে মুচকি হাসি দিতেও দেখি নি।
৫৪. হযরত মুসলিম ইবনে আবদুল মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহির খাদিম আবদুস সালাম বলেন, একদা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কাঁদলেন, তখন তাঁর স্ত্রী ফাতিমাহ সহ ঘরের সকলে কাঁদলেন। কিন্তু কেউ জানতেন না, এ কাঁদার কারণ কি। এ প্রশ্নটি যখন চিন্তায় আসল, ফাতিমা জিজ্ঞেস করলেন, আমীরুল মু'মিনীন! কি জন্য কাঁদছিলেন? জবাব দেন, 'আল্লাহর সামনে সকল মানুষ জমায়েত হবে, একদল যাবে জান্নাতে আর আরেকদল জাহান্নামে। আমি এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছিলাম।' এটুকু বলে তিনি চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে যান।
৫৫. হযরত মিসমা ইবনে আসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি আবদুল আজিজ ইবনে সুলাইমান, কিলাব ইবনে যারী এবং সালমান আ'রাজের সাথে এক সমুদ্র সৈকতে রাত্রিযাপন করেছিলাম। তখন কিলাব এতো বেশী কাঁদলেন, মনে হলো মারা যাবেন। তাঁর ক্রন্দন দেখে আবদুল আজিজও কাঁদলেন। সালমানও তাঁদের আহাজারি দেখে কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহর শপথ! তাদের এই অবস্থা দেখে আমিও কাঁদতে লাগলাম। কিন্তু আমি জানতাম না কিসের জন্য এই ক্রন্দন। পরদিন আবদুল আজিজকে জিজ্ঞেস করি, আবু মুহাম্মদ! গতরাত এতো বেশী কাঁদলেন কেন? জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! সমুদ্র সৈকতে উর্মির ওঠানামার দৃশ্য দেখে জাহান্নামের আগুনের লেলিহানের কথা স্মরণ হয়ে যায়। এজন্যই আমি কাঁদতে থাকি। এরপর একই প্রশ্ন করি কিলাবকে। আল্লাহর শপথ! তিনিও অনুরূপ উত্তর দিলেন। এরপর জিজ্ঞেস করি সালমান আ'রাযকে। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে সম্ভবত আমিই একমাত্র অধম! আমি তো কাঁদছিলাম শুধুমাত্র তাঁদের আহাজারি দেখে। তাঁরা যে কাঁদছেন, তাদের প্রতি একটু সহানুভূতি প্রকাশ করতে চেয়েছি।
৫৬. হযরত বকর ইবনে আবদুল্লাহ মুযানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একদা আবু মূসা বসরায় ওয়াজ করছিলেন। তিনি আলোচনা করেন জাহান্নামের উপর। এরপর হঠাৎ এমন বেশী কাঁদলেন, চোখের পানি ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে মিম্বর পর্যন্ত গড়িয়ে পড়লো। উপস্থিত লোকজন এ দৃশ্য দেখে করুণ সুরে কাঁদতে লাগলেন।
৫৭. হযরত মুগিরা ইবনে সা'দ ইবনে আখরাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে হাঁটছিলাম। আমরা যখন কামারদের পাশ কেটে যাচ্ছিলাম তখন তিনি থেমে যান, দেখতে লাগলেন তারা কিভাবে আগুন থেকে লোহা বের করছে। এরপর কাঁদতে শুরু করলেন।
৫৮. হযরত নজর ইবনে ইসমাঈল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রবি ইবনে আবু রুন্দ এক ব্যক্তির সাথে হাঁটছিলেন। তখন ঐ লোকটি আল্লাহর প্রশংসা করে এক জায়গায় বসে পড়লেন এবং কাঁদতে লাগলেন। সেখানে আরেক ব্যক্তি এসে তাকে প্রশ্ন করলো, আল্লাহ আপনার উপর করুণা বর্ষণ করুন! কাঁদছেন কেনো? জবাব দিলেন, জান্নাতী ও জাহান্নামীদের নিয়ে চিন্তা করছি। দেখলাম, প্রশান্ত লোকেরাই জান্নাতী আর অপদস্থরাই হলো জাহান্নামী। এ বিষয়টাই আমাকে কাঁদিয়েছে।
৫৯. হযরত ইবনে আবি জুবাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত তালহা এবং হযরত জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কামারের ব্যাগের পাশ কেটে যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে যেতেন, এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ওঠতেন। এভাবে ফলমূল ও আতর বিক্রেতাদের পাশ কেটে যাওয়ার সময়ও তাঁরা দাঁড়িয়ে যেতেন এবং কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে জান্নাত লাভের প্রার্থনা করতেন।
৬০. হযরত আ’মাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রবি ইবনে খুসাইম কামারদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অগ্নিতো বাতাস দেওয়ার ব্যাগের দিকে লক্ষ্য করে বেহুঁশ হয়ে যেতেন।
৬১. হযরত আবদুল আজিজ ইবনে আলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসসান ইবনে আবি সিনান চিনির ব্যবসা করে বেশ লাভবান হলেন। এ জন্য ক’জন বন্ধু তাঁকে স্বাগত জানাতে গেলেন। তাঁরা দেখেন, হাসসান ঘরের কোণে বসে কাঁদছেন। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, আবদুল্লাঃ! এ তো আল্লাহর নিয়ামত, তাতে কাঁদার কী আছে? জবাব দেন, আল্লাহর শপথ! ভয় করছি, এই চিনি পেয়ে যদি আমি উদাসীন হয়ে যাই। এজন্যই আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করছি।
৬২. হযরত আবদুর রহমান ইবনে হাফস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে মুনকাদিরের কাছে একজন শাসক দূতের মাধ্যমে কিছু উপহার পাঠান। উপহার দেখে উমর কাঁদতে লাগলেন। তখন তার নিকট আবু বকর এসে হাজির হলেন। তিনিও উমরের ক্রন্দন দেখে কাঁদতে শুরু করলেন। এবার উপস্থিত হন মুহাম্মাদ। উমরের রোদন দেখে তিনিও কান্না আটকে রাখতে পারলেন না। ক্রন্দনের রোল পড়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে আগত দূতও আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না- তিনিও কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর দূত আমিরের দরবারে ফিরে যেয়ে ঘটনার বর্ণনা দিলেন। আমির এই ক্রন্দনের কারণ জানার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন এবং রিবইয়াকে উমরের নিকট পাঠালেন। রিবইয়া এসে মুহাম্মাদকে ক্রন্দন সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। মুহাম্মাদ বললেন, উমরকে জিজ্ঞেস করো। তিনি এ ব্যাপারে বেশী অবগত। তখন রিবইয়া উমরের কাছে যেয়ে প্রশ্ন করলেন, ভাই! উপহার পেয়ে এতো কাঁদলেন কেন? জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! আমার ভয় হয়েছে, হৃদয় যদি দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তাহলে তো আখিরাতে আমার জন্য কিছুই থাকবে না। এজন্যই কাঁদছিলাম। এরপর তিনি সমস্ত মাল মদীনা মুনাওয়ারার গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। রিবইয়া ফিরে এসে আমিরের নিকট পূর্ণ বর্ণনা তুলে ধরেন। এবার আমিরও কাঁদা দিলেন। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! কল্যাণ তো এ পথেই নিহিত।
৬৩. হযরত সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বেশ নীরবে বসে আছেন। তাঁর বন্ধু-বান্ধবরা পাশে বসেই কথা বলছেন। তারা জিজ্ঞেস করলেন, আমীরুল মুমিনীন! কথা বলছেন না কেনো? জবাব দিলেন, ভাবছি কিভাবে জান্নাতীরা পরস্পরে সাক্ষাৎ করছেন আর খুশগল্প করছেন। আর অপরদিকে জাহান্নামীরা কিভাবে ভীষণ যন্ত্রণায় চিৎকার দিচ্ছে। একথা বলেই তিনি কাঁদতে লাগলেন।
📄 যে কারণে আহাজারি
৬৪. হযরত কা’ব রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বান্দা যখন কাঁদে, আল্লাহ তা’আলা একজন ফিরিশতা প্রেরণ করেন। তিনি তার ডানা দিয়ে কপোলে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে দেন। যখন আবার তা ভিজে যায়, পুনরায় মুছে দেন।
৬৫. হযরত মাকহুল রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যেসব লোকের পাপ কম তাদের হৃদয় খুবই নরম থাকে।
৬৬. হযরত হাইয়্যাজ ইবনে মুহাম্মাদ রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কুরাইশ বংশের একজন শায়খ ছিলেন, তাঁর চোখ দিয়ে খুব দ্রুত পানি বেরিয়ে আসতো। ছিলেন তাহাজ্জুদ গুজার। তাঁর পাপের মাত্রা ছিল খুব অল্প। মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতেন। এক আলিমের সাথে তাঁর সম্পর্কে বলি, ঐ শায়খ তো দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমী। আমার মনে হয় না ৫০ বৎসর যাবৎ তিনি কোন পাপে লিপ্ত হয়েছেন। এরপরও জীবনভর ক্রন্দন করছেন। তখন ঐ আলিম মন্তব্য করলেন, তাঁর মতো হতে হলে দীর্ঘদিন চোখের পানিতে বুক ভাসাতে হবে। আমি বললাম, তা কিভাবে সম্ভব? জবাব দিলেন, শরীর বজ্রহীন হলে পাতলা থাকে। ঠিক তদ্রূপ হৃদয়ে পাপ যখন স্বল্প হয়, চোখের পানি দ্রুত বেরিয়ে আসে। আমি বললাম, হ্যাঁ, বিষয়টি এরূপই।
৬৭. হযরত আবু আবদুল্লাহ বুরাসী রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হৃদয় যতক্ষণ পর্যন্ত দগ্ধ হয় না, ততক্ষণ চোখ দিয়ে পানি বের হয় না। হৃদয় যখন দগ্ধ হবে এবং অগ্নিশিখা থেকে ধোঁয়া মাথায় ছড়িয়ে পড়বে তখনই চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকবে।
৬৮. হযরত মালিক ইবনে জায়গাআম রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বাবার কাছ থেকে বর্ণনা করেন, হৃদয় যে পরিমাণ দগ্ধ হবে, চোখ থেকে সে পরিমাণ পানিও বের হবে। সমস্ত অন্তরপুরী জ্বলে গেলেও একজন চিন্তাশীলের জন্য ক্রন্দন ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
৬৯. হযরত মিসমা ইবনে আসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি বাহরাইনের এক আবিদকে জিজ্ঞেস করলাম, চিন্তাশীলের হৃদয় তার ডাকে সাড়া দেয়, তার চোখ দিয়ে প্রত্যেক কাজে অশ্রু ঝরে, এর কারণ কী? তিনি বললেন, চিন্তাশীল ব্যক্তির মধ্যে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ পেলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর তা হৃদয় ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করে থেমে যায়। তখন হৃদয়ে সৃষ্টি হয় আলোড়ন, এতে অন্তরে জ্বালাতন আরম্ভ হয়। এ জ্বালাতনে চুলের গোড়ায় পানি উঠলে ওঠে, নয়নযুগল দিয়ে নির্গত হয় অশ্রু। চোখের পাতা এই অশ্রুকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়।
৭০. হযরত আবূ মু'আওয়িয়া আসওয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহর জন্য যে ব্যক্তি অধিক হারে নিষ্ঠা ও সততার চর্চা করে, তার চোখ দিয়ে পানি আসে। সে যখন ক্রন্দন করতে চায়, চোখ তাতে সাড়া দেয়।
৭১. হযরত রাহাওয়া আবূ সাহল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনাকে বললাম, আপনি কি ফুজাঈলকে দেখেছেন, তাঁর চোখের পানি তো কখনও শুকায় না? সুফিয়ান বললেন, হৃদয় যখন রক্তাক্ত হয়, চোখ থেকে অশ্রু নির্গত হয়। একথা বলে তিনি একটি অভিনব শ্বাস ছাড়লেন।
৭২. হযরত ইসমাঈল ইবনে আইয়াশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দনের ৭ টি কারণ আছে: ১. আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন। এই ভয়ে চোখের এক ফোঁটা পানি আগুনের সমুদ্রে নিভিয়ে দেয়। এজন্যই আল্লাহর ভয়ে কোন কোন মানুষের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। ২. আনন্দের ক্রন্দন। ৩. দুঃখের ক্রন্দন। ৪. প্রেমাশক্তির ক্রন্দন। ৫. (আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর) ভয়ের ক্রন্দন। ৬. ব্যথার ক্রন্দন। (সপ্তমটির উল্লেখ নাই)
📄 তিলাওয়াতের মধ্যে ক্রন্দন
৭৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
قَالَ لِيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اقْرَأْ عَلَيَّ قَالَ: قُلْتُ: أَلَيْسَ تَعَلَّمْتُ مِنْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: إِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي ۞ فَقَرَأْتُ عَلَيْهِ سُورَةَ النِّسَاءِ حَتَّى إِذَا بَلَغْتُ: ﴿فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا﴾ فَاضَتْ عَيْنَاهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, কাছে বসে তিলাওয়াত করো। আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি তো আপনার কাছ থেকেই তিলাওয়াত শিখেছি? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি অন্যের কণ্ঠে শুনতে ভালোবাসি। আমি তখন সুরা নিসা তিলাওয়াত করতে লাগলাম। যখন আমি اِذَا ... فَكَيْفَ ‘ আয়াতে পৌঁছলাম তখন দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র নয়নযুগল থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
[আয়াতের অর্থ: আর তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি প্রতিটি উম্মত থেকে তাদের অবস্থা বর্ণনাকারী ডেকে আনব এবং আপনাকেও ডাকব তাদের অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে।]
৭৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন: لَمَّا نَزَلَتْ إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا بَكَى أَبُو بَكْرٍ الصِّدِّيقُ رَحِمَهُ اللهُ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَا يُبْكِيكَ يَا أَبَا بَكْرٍ قَالَ : أَبْكَتْنِي يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذِهِ السُّورَةُ সুরায়ে যিলযাল নাজিল হওয়ার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু কাঁদতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, আবু বকর! কাঁদছো কেন? জবাব দিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই সুরাটি আমাকে কাঁদাচ্ছে।
৭৫. হযরত আবু আবদুর রহমান হাবলী রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, উকবা ইবনে আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু খুব মধুর সুরে তিলাওয়াত করতেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একদিন তাঁকে বললেন, সুরা বারাআত তিলাওয়াত করে শোনাও। তিনি তিলাওয়াত করলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খুব কাঁদলেন। এরপর বলেন, এই সুরা যে অবতীর্ণ হয়েছে তা আমার ধারণাও ছিলো না।
৭৬. হযরত নাফে রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন এই আয়াত, أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ - তিলাওয়াত করতেন, এতো বেশি কাঁদতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেতো। সাথে সাথে বলতেন, হ্যাঁ, হে আমার প্রতিপালক! [আয়াতের অর্থ: আল্লাহর স্মরণে মুমিনদের হৃদয় গলে যাওয়ার কি এখনও সময় হয় নি? (৫৭:১৬)]
৭৭. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাবাহ রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাফওয়ান ইবনে মিহরাজ যখন এই আয়াত, وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقِلِبُونَ - তিলাওয়াত করতেন, কাঁদতে থাকতেন। মনে হতো তিনি ভেসে পড়বেন। [আয়াতের অর্থ: যুলুমকারীরা শীঘ্রই জানতে পারবে তাদের গন্তব্যস্থল কিরূপ। (২৬:২২৭)]
৭৮. হযরত ইবনে আজালান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কুরআন তিলাওয়াতের সময় ক্রন্দনের প্রতিটি ফোঁটার দ্বারা আল্লাহর করুণা লাভ হয়।
৭৯. হযরত ফজল রুক্বাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সুললিত কন্ঠের তিলাওয়াতে প্রফুল্ল হয়ে ওঠে আবিদদের হৃদয়। যে হৃদয়ে সুন্দর তিলাওয়াতের আওয়াজে সাড়া জাগে না, তা তো মৃত। সুন্দর কন্ঠধ্বনি দ্বারা যে চোখে পানি আসে না, তা তো উদাসীন চোখ।
৮০. হযরত আবু সালামা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত উমর ইবনে খাতাব রাদিয়াল্লাহু আনহু আবূ মূসাকে যখন বলতেন, আমাদেরকে প্রভূর কথা স্মরণ করিয়ে দিন, তিনি তখন তিলাওয়াত করতেন।
৮১. হযরত আবূ মা’শার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে কায়েস যখন বন্ধুদেরকে কাঁদানোর ইচ্ছা করতেন, তখন কথা বলার পূর্বে কুরআন শরীফ তilaওয়াত করতেন। তাঁর কন্ঠ ছিলো সুমধুর। তিলাওয়াতের সময় নিজে কাঁদতেন, অন্যকেও কাঁদাতেন। তিলাওয়াত শেষে তিনি কথা বলতেন। যখন কথা বলতেন, চোখদু’টো অশ্রুতে ভিজে যেতো।
৮২. হযরত ইবনে আবি যিব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট এক ব্যক্তি এই আয়াতটি, وَإِذَا أُلْقُوا مِنْهَا مَكَانًا ضَيِّقًا مُقَرَّنِينَ دَعَوْا هُنَالِكَ ثُبُورًا - পাঠ করলেন, তখন খলিফা কাঁদতে লাগলেন। এরপর মজলিস ছেড়ে ঘরে চলে যান। লোকজনও চলে গেলো।
[আয়াতের অর্থ: যখন এক শিকলে কয়েকজন বেঁধে জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, তারা সেখানে মৃত্যুকে ডাকবে। (২৫:১৩)]
৮৩. হযরত সাঈদ ইবনে আবি আরুবা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমার ইবনে আবদুল আজিজ ছেলেকে বললেন, আমাকে তিলাওয়াত করে শোনাও। ছেলে জিজ্ঞেস করলেন, কি তিলাওয়াত করবো? বললেন, সূরা কাফ। ছেলে যখন তিলাওয়াত করে এই আয়াতে وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ -আসলেন তখন উমর কাঁদতে লাগলেন। এরপর আবার বললেন, বৎস! তিলাওয়াত করো। ছেলে জিজ্ঞেস করলেন, কি তিলাওয়াত করবো? বললেন, সুরায়ে কাফ। ছেলে তিলাওয়াত করে যখন মৃত্যুর আলোচনার আয়াতে আবার আসলেন, উমর খুব বেশী কাঁদলেন। এভাবে তিনি কয়েক বার তিলাওয়াত করালেন আর কাঁদলেন।
[আয়াতের অর্থ: মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে, এ থেকে তুমি টালবাহানা করতে। (কাফ:১৯)]
৮৪. হযরত মু'তামির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উবাই ফযরের নামাযে আমাদের ইমামতি করছিলেন। তিনি সুরায়ে কাফ তিলাওয়াত করে যখন এই আয়াতে, وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ -আসলেন তখন খুব বেশী কাঁদলেন। পরবর্তী আয়াত তিলাওয়াত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললেন। অতঃপর রুকুতে চলে যান।
[আয়াতের অর্থ: মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে, এ থেকে তুমি টালবাহানা করতে। (৫০:১৯)]
৮৫. হযরত সালূত ইবনে হাকিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মক্কা শরীফে একজন ক্বারী সাহেব আমাদের কাছে বসে তিলাওয়াত করলেন। তিনি যখন সূরা ক্বাফের এই আয়াতে, وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ তখন ফুজায়েলের দরজার সামনে উপস্থিত ছিলাম। তাঁর কণ্ঠে সজোরে ক্রন্দন শোনাচ্ছিল।
৮৬. হযরত সুফিয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তালক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তিলাওয়াতের সময় নিজে কাঁদাতেন লোকদেরকেও কাঁদাতেন। কোমল হৃদয়ে মধুর কণ্ঠে ক্ষণিত তিলাওয়াত শুনে কেউ না কেঁদে পারতেন না। তাঁর মা তাঁকে বললেন, প্রিয় সন্তান! তোমার কণ্ঠ কতোই না সুন্দর! তবে ক্বিয়ামতের দিন এটাও (রিয়া হেতু) শাস্তির কারণ হতে পারে। একথা শ্রবণ করে তালক বেশ কাঁদলেন। কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে গেলেন।
৮৭. হযরত সাঈদ ইবনে ফুজায়েল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে বসে এক ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করলেন। যখন তিনি এই আয়াতে فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ - পাঠ করলেন তখন উমর অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যান। [আয়াতের অর্থ: অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। (৫২:২৭)]
৮৮. হযরত ইবরাহীম তায়মী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হারিস ইবনে সুয়ায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এই দু'টি আয়াত, فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ তিলাওয়াত করে কাঁদতে লাগলেন। এরপর বলেন, পরকালের শাস্তি খুবই কঠিন। [আয়াতের অর্থ: অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে। কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে। (৯৯:৭-৮)]
৮৯. হযরত হারিস ইবনে সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে বসা ছিলাম। তখন একজন কারী সাহেব সূরায়ে যিলযাল তিলাওয়াত করেন। মালিক কাঁদতে শুরু করলেন, সাথে সাথে মজলিসের সবাই চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। কারী সাহেব যখন إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا আয়াতটি পাঠ করলেন, মালিক কেঁদে কেঁদে একেবারে অজ্ঞান হয়ে যান এবং এই অবস্থায়ই তাঁকে মজলিস থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
[আয়াতের অর্থ: যখন পৃথিবী তার কম্পনে প্রকম্পিত হবে। (৯৯:১)]
৯০. হযরত আবু মাওদূদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয এই আয়াতটি: وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَمَا تَتْلُو مِنْهُ مِنْ قُرْآنٍ وَلَا تَعْمَلُونَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا
তিলাওয়াত করতে করতে কাঁদতে থাকেন। ঘরের লোকজন ক্রন্দনের আওয়াজ শুনতে পেলেন। স্ত্রী ফাতিমা কাছে এসে কাঁদলেন। এরপর ঘরের সকলেই কাঁদতে লাগলেন। এসময় আবদুল মালিক ঘরে প্রবেশ করলেন। দেখেন সবাই কাঁদছেন। বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এতো বেশী কাঁদছেন, কারণ কী? জবাব দিলেন, প্রিয় পুত্র! বেশ ভালো কথা। তোমার বাবা যদি এ দুনিয়াকে চিনত না এবং দুনিয়াও তোমার বাবাকে না চিনতো তবে তো ভালো হতো! আল্লাহর শপথ! আমার ভয় হচ্ছে, আমি যেমন ধ্বংস হয়ে যাবো! আমার ভয় হয়, আমি কি জাহান্নামী হয়ে যাবো!
[আয়াতের অর্থ: বস্তুত: যে কোন অবস্থাতেই তুমি থাক এবং কুরআনের যে কোন অংশ থেকেই পাঠ কর কিংবা যে কোন কাজই তোমরা কর, অথচ আমি তোমাদের নিকট উপস্থিত থাকি, যখন তোমরা তাতে আত্মনিয়োগ কর। (১০:৬১)]
৯১. হযরত হিশাম ইবনে হাসসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এবং মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে গেলাম। দেখি সেখানে এক ব্যক্তি বসে তিলাওয়াত করছেন। তিনি যখন إِنْ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ مَا لَهُ مِنْ دَافِعٍ - আয়াতদ্বয় তিলাওয়াত করলেন, তখন হাসান ও তাঁর সাথীরা কাঁদতে লাগলেন। মালিক ইবনে দীনার অস্থির হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। [আয়াতের অর্থ: আপনার পালনকর্তার শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। কেউ তা প্রতিরোধ করতে পারবে না। (৫২:৭-৮)]
৯২. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একজন মানুষ উবাই এর কাছে এই আয়াতগুলো, وَالطُّورِ وَكِتَابٍ مَسْطُورٍ فِي رَقٍّ مَنْشُورٍ وَالْبَيْتِ الْمَعْمُورِ وَالسَّقْفِ الْمَرْفُوعِ وَالْبَحْرِ الْمَسْجُورِ এবং إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ مَا لَهُ مِنْ دَافِعٍ তিলাওয়াত করলেন। তখন উপস্থিত লোকজন কাঁদতে লাগলেন। তাঁদের ক্রন্দনের আওয়াজে আমি কারী সাহেবের বাকী তিলাওয়াত আর শুনতে পারি নি। [আয়াতের অর্থ: কসম তুর পর্বতের! কসম প্রশস্ত পত্রে লিখিত কিতাবের! কসম বায়তুল-মামুর তথা আবাদ গৃহের! কসম সমুন্নত ছাদের এবং উত্তাল সমুদ্রের! আপনার পালনকর্তার শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। কেউ তা প্রতিরোধ করতে পারবে না। (৫২:১-৮)]
৯৩. হযরত মুকাতিল ইবনে হাইয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পেছনে নামায আদায় করেছিলাম। তিনি এই আয়াতটি وَقِفُوهُمْ إِنَّهُمْ مَسْئُولُونَ কাঁদতে কাঁদতে বার বার পাঠ করতে থাকেন। ক্রন্দনের কারণে তিনি আর সামনে এগিয়ে তিলাওয়াত করতে পারছিলেন না। [আয়াতের অর্থ: এবং তাদেরকে থামাও, তারা জিজ্ঞাসিত হবে। (৩৭:২৪)]
৯৪. হযরত আ'মাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু সালেহ নামক একজন মুয়াজ্জিন ছিলেন। ইমাম সাহেব দেরী করলে তিনি ইমামতি করতেন। কোমল হৃদয়ের এই মানুষটি প্রবল ক্রন্দনের কারণে নামাজের মধ্যে যেন অবসন্ন হতে পারতেন না।
৯৫. হযরত আবদুল্লাহ আনাসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শুক্রবার দিন উমর ইবনে আবদুল আযীয ময়লা কাপড় পরে বেরিয়ে আসলেন। তাঁর পেছনে ছিলো একজন হাবশী ভৃত্য। তিনি যখন লোক সমাগমে পৌঁছলেন গোলামটি চলে গেল। উমর মিম্বরে আরোহণ করেন। এরপর এই আয়াত দুটি إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ وَإِذَا النُّجُومُ انْكَدَرَتْ -তিলাওয়াত করে বলেন, সূর্য ও নক্ষত্রের কী অবস্থা হবে? এরপর আবার তিলাওয়াত করে এই আয়াতগুলোতে আসলেন وَإِذَا الْجَنَّةُ أُزْلِفَتْ وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعِّرَتْ কাঁদতে লাগলেন। মসজিদের সবাই কাঁদতে শুরু করলেন, এমনকি গোটা মসজিদে ক্রন্দনের রোল পড়ে গেল। মনে হলো, মসজিদের দেওয়ালও কাঁদতে আছে। [আয়াতের অর্থ: যখন জাহান্নামের আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হবে। এবং যখন জান্নাত নিকটবর্তী করা হবে। (৮১:১-২)]
৯৬. হযরত হাকিম ইবনে নূহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি জায়গাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে ছিলাম। বিশর ইবনে মানসুর তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলেন। জায়গাম আমাকে বললেন, আমাদের ঐ সাথী খুব সুন্দর তিলাওয়াত করেন। বিশর ইবনে মানসুর সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত শুনতে খুবই ভালোবাসতেন। আমি তখন ঐ কারী সাহেবকে নিয়ে আসি। তিনি পারস্যের অধিবাসী, খুব সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী। যখন তিনি তিলাওয়াত আরম্ভ করলেন, লোকজন কাঁদতে লাগলো। কারী নিজেও ফারসী ভাষায় বলতে বলতে কাঁদলেন। আল্লাহর শপথ! উপস্থিত সকলেই সন্তানহারা মায়ের মতো চিৎকার করে কাঁদছিলেন। চিৎকারে বাহির লোকজন জমায়েত হলো। বিশর ইবনে মানসুর বার বার বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলেন। আবু মালিক উটাওয়াসা করতে লাগলেন। মনে হচ্ছিলো, তিনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এ রাত্রটি আমার কাছে ছিল অত্যন্ত সুখকর, প্রশংসাদায়ক। বিশর আমাকে বললেন, হাকিম! ঐ পারস্য অধিবাসী কারী কী করলেন! তিনি তো চোখের সামনে কষ্ট দিয়ে মানুষকে মেরে ফেললেন!
৯৭. হযরত মাসরূক রাহিমাহুল্লাহু আলাইহি বলেন, আমি হযরত আয়শা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কাছে যেয়ে এই আয়াত, فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ -তিলাওয়াত করলাম। তিনি কেঁদে কেঁদে দু'আ করলেন, প্রভু! আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রেহাই দিন। [আয়াতের অর্থ: অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। (৫২:২৭)]
৯৮. হযরত আবদুল আজিজ রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা একস্থানে জমায়েত হলাম। প্রথম রাতে আমাদের সাথে ছিলেন রবি ইবনে সাবী এবং আরো কয়েকজন ফকীর। লোকজন বলতে লাগলো আবদুল ওয়াহিদ ইবনে জায়দ এসেছেন। মানুষ তা শ্রবণে সমবেত হতে থাকে। তিনি যখন আমাদের কাছে আসলেন একজন কারী সাহেব এই আয়াতদ্বয়, يَوْمَ تَمُورُ السَّمَاءُ مَوْرًا وَتَسِيرُ الْجِبَالُ سَيْرًا তিলাওয়াত করছিলেন। আবদুল ওয়াহিদ তা শ্রবণ করে খুব জোরে চিৎকার দিলেন। উপস্থিত লোকজনও কাঁদতে লাগলো। আবদুল ওয়াহিদ বেহুঁশ হয়ে যান। রবি এবং তাঁর সাথীরা তাঁকে ঘিরে কাঁদতে থাকেন। তিনি মাটিতে বেহুশ হয়ে পড়লেন। এ অবস্থায় বেশ গভীর রাতে তার জ্ঞান ফিরে আসলো। [আয়াতের অর্থ: সেদিন প্রবলভাবে আকাশ প্রকম্পিত হবে এবং পর্তমালা হবে চলমান। (৫২:৯-১০)]
৯৯. হযরত শা'বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু এক লোকের কণ্ঠে এই আয়াতখানা إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ শুনে কাঁদতে লাগলেন। ক্রমান্বয়ে ক্রন্দন বাড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে অস্থির হয়ে মাটিতে পড়ে যান। লোকজন তাঁকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলো। জবাব দিলেন, আমাকে ছেড়ে দাও! আমি প্রভুর পক্ষ থেকে সত্যের শপথ শুনতে পাচ্ছি। [আয়াতের অর্থ: আপনার পালনকর্তার শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। (৫২:৭)]
১০০. হযরত আবু খুরাইম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞেস করা হলো, এখানে কিছু লোক আছেন তারা তিলাওয়াত শোনে জোরেসুরে কাঁদেন (এটা কি ঠিক)? তিনি বললেন, জিকির ও তিলাওয়াতের সময় লোকজন সব সময়ই কেঁদে আসেন।
📄 ওয়াইজদের ক্রন্দন
১০১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিআল্লাহু আনহুমা বলেন: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ وَهُوَ يَقُولُ : لَا تَنْسَوُا الْعَظِيمَتَيْنِ قُلْنَا : وَمَا الْعَظِيمَتَانِ ◌ قَالَ : الْجَنَّةُ وَالنَّارُ ◌ ثُمَّ ذَكَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا ذَكَرَ ◌ ثُمَّ بَكَى حَتَّى جَرَى أَوَائِلُ دُمُوعِهِ جَانِبَيْ لِحْيَتِهِ ◌ ثُمَّ قَالَ : وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ ◌ لَوْ تَعْلَمُونَ مِنْ عِلْمِ الْآخِرَةِ مَا أَعْلَمُ ◌ لَمَشَيْتُمْ إِلَى الصَّعِيدِ ◌ فَلْتَخْشَيَنَّ عَلَى رُؤُوسِكُمُ التُّرَابَ ◌
আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি বললেন, বড় দু’টি বিষয়কে তোমরা ভুলে যেও না। জিজ্ঞেস করি, বড় দু’টো বিষয় কী? জবাব দিলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম। এরপর তিনি উপদেশ প্রদান করতে থাকেন আর কাঁদেন। চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে যায়। আরো বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি আখিরাতের যৎটুকু জ্ঞান রাখি তা যদি তোমরা রাখতে, তাহলে পাহাড়ে চলে যেতে এবং মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি করতে।
১০২. হযরত বকর ইবনে আবদুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু মূসা বসরায় এক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি জাহান্নাম নিয়ে আলোচনা করেন। তখন কাঁদতে লাগলেন। চোখের পানি মিশ্র দিয়ে গড়িয়ে যেতে লাগলো। দৃশ্যটি দেখে উপস্থিত লোকজনও কাঁদলেন।
১০৩. হযরত আবু কুরাইল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিআল্লাহু আনহুমা বলেন, যদি কোন জাহান্নামী দুনিয়াতে ফিরে আসতো, তাহলে তার বীভৎস চেহারা ও দুর্গন্ধে দুনিয়ার সকল মানুষ মৃত্যুবরণ করতো। একথা বলে তিনি খুব কাঁদেন।
১০৪. হযরত আব্বাদ ইবনে মানসুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আদি ইবনে আরাতা আমাদের নিকট বক্তব্য দিয়েছিলেন। ওয়াজ করার সময় নিজে কাঁদলেন, উপস্থিত সকলকেও কাঁদালেন। বললেন, তোমরা ঐ লোকটির মতো হয়ে যাও, যে তার ছেলেকে উপদেশ দিয়েছিল, 'বৎস! মৃত্যু পর্যন্ত এমনভাবে নামায পড়ো যেনো এটাই তোমার জীবনের শেষ নামায। বৎস! এসো আমরা এমন দু'জন লোকের মতো আমল করি, যাদেরকে জাহান্নামের পাশে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে।' আব্বাদ একজন সাহাবীর সূত্রে বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'একদল ফিরিশতার হৃদয় আল্লাহর ভয়ে কাঁপছে। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। আকাশ ও জমিন সৃষ্টির পর থেকে একদল ফিরিশতা সিজদাবান আছেন, কিয়ামত পর্যন্ত তাঁরা মাথা উত্তোলন করেন না। আরেক দল ফিরিশতা কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে আছেন, কিয়ামত পর্যন্ত তারা সারি ভাঙবেন না। কিয়ামতের দিন যখন তাঁদের সামনে আল্লাহ তা'আলা প্রকাশ হবেন, তারা তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করবেন এবং বলবেন, আপনার পবিত্রতার বর্ণনা দিচ্ছি। আমরা তো আপনার শান অনুযায়ী ইবাদাত করতে পারি নি।
১০৫. মক্কার শায়খ হযরত আবু জারিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি উমর ইবনে আবদুল আজিজকে মিম্বরে বসে কাঁদতে দেখেছি। অধিক ক্রন্দনে তিনি কথা বলতে পারছিলেন না।
১০৬. হযরত আবু জাফর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, খানাচিরা নামক স্থানে আমি উমর ইবনে আবদুল আজিজকে মিম্বরে উঠতে দেখি। তখন তাঁর দাড়ি বেয়ে চোখের পানি পড়ছিলো। যখন মিম্বর থেকে নেমে পড়লেন, তখনও কাঁদছিলেন।
১০৭. হযরত হাজ্জাজ ইবনে সাফওয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মদীনা মুনাওয়ারার এক ব্যক্তি মুহাম্মাদ ইবনে কা’বকে সঙ্গে নিয়ে উমর ইবনে আবদুল আজিজের সাথে সাক্ষাৎ করেন। উমর মুহাম্মাদকে বললেন, আবু হামযা! তোমার ভাই বুসর ইবনে সাঈদের এই নিম্নসঙ্কতার মধ্যে কী ক্ষতি ছিল! এটুকু বলে তিনি এতো কাঁদলেন, মনে হচ্ছিলো মাটিতে পড়ে যাবেন। এরপর আবার বলেন, আল্লাহর শপথ! বুসর যেভাবে নিম্নসঙ্কতা ও ইবাদতের মধ্যে অটল ছিলেন, অনুরূপভাবে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অবিচল ছিলেন।
১০৮. হযরত আবু বকর হাযালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি হাজ্জাজকে মিশরে বসে খুতবা দিতে দেখেছি। তিনি বলেন, লোকজন! আগামীকাল তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়ায়ে। সবাইকে তখন প্রশ্ন করা হবে, তাই প্রত্যেকেরই উচিৎ আল্লাহকে ভয় করা। সেদিনের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করা উচিৎ। ঐ জায়গায় ভ্রান্ত লোকেরা ধ্বংস হবে। জ্ঞানবুদ্ধি বিলুপ্ত হবে। ফায়সালা থাকবে একমাত্র আল্লাহর কাছে। প্রত্যেকেরই বিনিময় পাবে নিজ নিজ কর্মানুসারে। নিশ্চয় আল্লাহ অতি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। আমল করো, সেদিন আসার আগেই ছুটে চলো, যেদিন আকাঙ্ক্ষা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এটুকু বলে তিনি মিশরে থেকেই কাঁদতে লাগলেন। চোখের পানি তার দাঁড়িয়ে বয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
১০৯. হযরত আবু সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাজ্জাজ আমাদেরকে বক্তব্য দেন, আদমসন্তান! আজ তুমি আহার করছো, আগামীকাল তোমাকে খাওয়া হবে! এরপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে তিলাওয়াত করলেন- كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ তখন চোখের পানিতে তাঁর পাগড়ির শিমলা ভিজে গেলো। [আয়াতের অর্থ- প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। (৩:১৮৫)]
১১০. হযরত আবু বকর ইবনে আবু সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাজ্জাজকে একদিন মিম্বরে খুত্বা দিতে শুনলাম। তিনি বলছিলেন, আদমসন্তান! তুমি ঘরে বসে আছো, এরপর তোমার কাছে একজনের আগমন হলো যিনি হচ্ছেন মৃত্যুর ফিরিশতা। তিনি তার হাত তোমার শরীরে রাখলেন, এতে নিস্তেজ হয়ে পড়লো তোমার দেহখানা। এরপর তিনি চলে গেলেন তোমার আত্মা নিয়ে। পরিবার পরিজন তোমাকে গোসল দিয়ে কাফন পরালো। কবরে নিয়ে দাফন করলো। তখন তোমাকে নিয়ে দু'জন বন্ধু তর্ক- বিতর্ক করতে লাগলো। এর একজন হচ্ছেন তোমার পরিবার থেকে আর অপরজন তোমার অর্থ-সম্পদ থেকে। তাই আল্লাহকে ভয় করো। আজকে তুমি খাচ্ছো। কাল তো তোমাকে খাওয়া হবে। এরপর তিনি চিৎকার দিলেন। মনে হলো এখনই মরে যাবেন। তার চোখে অশ্রু এসে গেলো। কপোল বেয়ে তা গড়িয়ে গড়িয়ে শিমলা সিক্ত করে দিল। এরপর মিম্বর থেকে নেমে গেলেন। পুনরায় মিম্বরে উঠলেন। এবার বৃষ্টির জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন। অনুতাপভাবে আগেও তিনি বৃষ্টির জন্য দু'আ করেছেন। কিন্তু আজকে মিম্বর থেকে নামার পূর্বেই বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে যায়। অতঃপর কিবলামুখী হয়ে নামায পড়লেন। চাঁদার মুসাল্লায় পড়ে যায়। দু'আ যেহেতু কবুল হয়েছে তাই আরো বেশি কাঁদলেন। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বান্দা যখন প্রভুর দরবারে হাত পেশ করে, প্রভু যদি তার ডাকে সাড়া দেন তবে দীর্ঘ সময় অতিক্রম হয়। যাতে করে প্রয়োজন সমাধানের পর সে বেশী কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারে। আল্লাহর শপথ করে বলতে পারি, এ কারণেই তোমরা তিনদিন রোযা রাখতে পেরেছো। এ কথা বলে বের হয়ে যান।