📄 আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন ও এর বিনিময়
بسم الله الرحمن الرحيم
১. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ؓ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا يَلِجُ النَّارَ مَنْ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ وَلَا يَجْتَمِعُ غُبَارٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدُخَانُ جَهَنَّمَ فِي مَنْخِرَيْ عَبْدٍ أَبَدًا
হযরত আবূ হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যেমনি ওলান থেকে নির্গত দুধ পুনরায় ওলানে প্রবেশ করানো যায় না। আল্লাহর পথের ধূলো এবং জাহান্নামের ধোঁয়া কোন বান্দার নাসারন্দ্রে একত্র হতে পারে না।
২. عَنِ ابْنِ مَسْعُوْدٍ ؓ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا مِنْ عَبْدٍ مُؤْمِنٍ يَخْرُجُ مِنْ عَيْنَيْهِ دُمُوْعٌ وَإِنْ كَانَ مِثْلَ رَأْسِ الذُّبَابِ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ * ثُمَّ تُصِيْبُ شَيْئًا مِنْ حَرِّ وَجْهِهِ * إِلَّا حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর ভয়ে কারো চোখ দিয়ে যদি পানি বের হয়, যদিও তা মাছির মাথার পরিমাণ হয়, আল্লাহ তার জন্য আগুন হারাম করে দেবেন।
৩. আবু রায়হান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: لَا تَرَى النَّارَ عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ٭ وَلَا عَيْنٌ سَهِرَتْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায় এবং যে চোখ আল্লাহর পথে পাহারায় জেগে থাকে, কখনো সে দু'চোখ জাহান্নাম দেখবে না।
৪. জায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন: يَا رَسُولَ اللَّهِ ٭ بِمَ أَتَّقِي النَّارَ ٭ قَالَ : بِدُمُوعِ عَيْنَيْكَ ٭ فَإِنَّ عَيْنًا بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ لَا تَمَسُّهَا النَّارُ أَبَدًا আল্লাহর রাসূল! কিসের মাধ্যমে আমি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারি? রাসূল জবাব দিলেন, চোখের পানি দ্বারা! কারণ যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, সে চোখ কখনো আগুনের স্পর্শ পাবে না।
৫. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ٭ لَا تَمَسُّهَا النَّارُ أَبَدًا যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, সে চোখ কখনো আগুনের স্পর্শ পাবে না।
৬. হযরত হাসান বসরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: مَا مِنْ قَطْرَةٍ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ دَمْعَةٍ مِنْ قَطْرَةٍ مِنْ دَمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ❁ وَقَطْرَةٍ دُمُوعٍ قَطَرَتْ مِنْ عَيْنِ رَجُلٍ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ
আল্লাহর রাস্তায় প্রবাহিত রক্ত-কণা এবং গভীর রাতে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারী ব্যক্তির অশ্রু-কণার চেয়ে অন্য কোন 'ফোঁটা' আল্লাহর কাছে এতো প্রিয় নয়।
৭. আবুল-জিলদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি দাউদ আলাইহিস-সালামের মুনাজাত পাঠ করেছি। তিনি প্রার্থনা করেছেন, হে রব! কী তার প্রতিদান যে তোমার ভয়ে কেঁদে কপাল ভাসায়? আল্লাহ তা'আলা জবাব দিয়েছেন, বিনিময় হলো, আমি তার জন্য অগ্নিশিখা হারাম করে দেবো। আজকের দিনে তাকে আমি আতঙ্ক মুক্ত রাখবো।
৮. হযরত জিয়াদ আখরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার ইয্যতের শপথ! যে বান্দা আমার ভয়ে কাঁদবে তাকে আমি শাস্তি থেকে মুক্তি দেবো। আমার ইয্যতের শপথ! যে বান্দা আমার ভয়ে কাঁদবে আমার কুদসিয়্যাতের নূর এই ক্রন্দনকে নুরের হাসিতে পরিবর্তন করে দিবে।
৯. হযরত হাসান বসরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দু'চোখ যখন কাঁদতে থাকে হৃদয় তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। বান্দা যখন আল্লাহর ভয়ে কাঁদে আল্লাহ তার চতুষ্পার্শ্বের সবাইকে করুণা করেন, যদিও তাদের সংখ্যা বিশ হাজার হয়।
১০. হযরত হাসান বসরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাদিসে আছে, আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারীর অশ্রু-কণা মাটিতে গড়িয়ে পড়ার আগেই জাহান্নামের আগুন থেকে তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। যখন সে কোন মজলিসে ক্রন্দন করে এর দ্বারা উপস্থিত সকলের ওপর করুণা বর্ষণ হতে থাকে।
১১. ফারকাদ আস-সাবাখী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাদিসে আছে, সব আমলের ওজন করা হবে। কিন্তু আল্লাহর ভয়ে বান্দার চোখ দিয়ে যে অশ্রু ঝরে, তার কোন ওজন করা হবে না। আগুনের সমুদ্র চোখের পানিই নিভিয়ে দেবে।
১২. হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন হলো 'নেকীর স্তূপ'। ওজন করে এর কোন বিনিময় দেওয়া হবে না। আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারী ও আল্লাহর আনুগত্যে অটল- অবিচল ব্যক্তি বেহিসাব বিনিময় পাবে।
১৩. হযরত শাহর ইবনে হাওশাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একজন মানুষ যখন মজলিসে বসে কাঁদে তাঁর সে ক্রন্দনের দ্বারা মজলিসের সবাইকে করুণা করা হয়।
১৪. নযর ইবনে সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে মারফু' সূত্রে বর্ণিত, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে টুকরে টুকরে কাঁদে, আল্লাহ তা'আলা তার দেহকে আগুনের ওপর হারাম করে দেন। অশ্রু যদি তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার চেহারা (রোজ হাশরে) মলিন হবে না। গোত্রের একজনও যদি আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, আল্লাহ তা'আলা ঐ গোত্রের সকলকে দোযখের আগুন থেকে মুক্ত করে দিবেন। একমাত্র অশ্রু ব্যতীত সকল আমলই ওজন করা হবে অশ্রুই নিভিয়ে দেবে আগুনের সমুদ্রকে।
১৫. খালিদ ইবনে মা'দান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত, চোখের পানি আগুনের সমুদ্র নিভিয়ে দেবে। যে রোদনকারীর কপোল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, তার চোখ কখনো দোযখের আগুন অবলোকন করবে না। বান্দা যখন আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে থাকে, অশ্রু-প্রত্যেকে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। ঊর্ধজগতে তার নাম ও তার বাবার নাম লিখে রাখা হয়। জিকিরুল্লাহর নূরে আলোকিত হয়ে ওঠে তার হৃদয়।
১৭. আব্দুল্লাহ ইবনে আবু সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা হাসান বসরীর মজলিসে ছিলাম। তিনি ওয়ায করছিলেন। হঠাৎ মজলিসের কোণ থেকে একব্যক্তি কেঁদে উঠলেন। হাসান বললেন, কাঁদো! বেশি করে কাঁদো! আমাদের কাছে এই হাদিস পৌঁছেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কাঁদে কিয়ামতের দিন সে দয়া ও করুণা লাভ করবে।
১৮. জাফর ইবনে সুলাইমান বলেন, মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়ায করছিলেন। হঠাৎ হুশআব কেঁদে উঠেন। মালিক তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলেন, আবু বশর! কাঁদো। হাদিসে আছে, ভীত যখন কাঁদতে থাকে, মনিব শেষ পর্যন্ত তাকে দয়া করেন। এবং আগুন থেকে মুক্তি দেন।
১৯. হযরত ফারকাদ সাবাখী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি একটি গ্রন্থে পড়েছি, আল্লাহর ভয়ে যারা কাঁদে তাদেরকে তুমি বলো, তোমাদের জন্য সুসংবাদ! আল্লাহর করুণা যখন বর্ষণ হতে থাকে, তখন এই বর্ষণের সূচনা হয় তোমাদের উপর দিয়েই।
২০. হযরত আবু মায়মুন বাররাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক ব্যক্তি হযরত হাসান বসরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহিহি কে বললো, আমাকে কিছু উপদেশ দিন? তিনি বললেন, আল্লাহর স্মরণে ফিকির করে করে জিহ্বা এবং আল্লাহর ভয়ে কেঁদে কেঁদে চোখের পাতা সিক্ত রাখো।
২১. হযরত কা’ব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, গুনাহর ভয়ে যে কাঁদে, তাকে ক্ষমা করা হয়। এবং যে অতিশয় আগ্রহে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য কাঁদে, আল্লাহ তাকে নিজ দর্শনের সুযোগ করে দেন; যখনই সে ইচ্ছা করে, আল্লাহর দীদার লাভের সৌভাগ্য অর্জন করে।
২১. হযরত যাদান আবু উমর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমাদের কাছে এই হাদিস পৌঁছেছে, আগুনের ভয়ে ক্রন্দনকারীকে আল্লাহ আগুন থেকে মুক্তি দেন। আর জান্নাত লাভের আগ্রহের অতিশয্যে ক্রন্দনকারীকে আল্লাহ জান্নাত দান করেন।
২২. ইয়াজিদ ইবনে আবান রুক্কাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি কোন পাপ-কর্ম সম্পাদন করার পর লজ্জিত হয়ে ক্রন্দন করে, পাপ-পুণ্য লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিরিশতাগণ সে পাপটি তুলে যান। আল্লাহর ভয়ে যার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে নিরাপত্তা প্রদান করবেন।
২৩. হযরত আতিয়াহ আওফি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাদিসে আছে, কৃত পাপ স্মরণ করে যখন কেউ কাঁদে, তখন তার পাপ মুছে ফেলে তার বদলে একটি নেকি লিখে দেওয়া হয়।
২৪. হযরত মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পাপের স্মরণে ক্রন্দন পাপকে মিটিয়ে দেয়, যেভাবে বাতাস শুকনো পাতা উড়িয়ে নিয়ে যায়।
২৫. হযরত আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়েদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ভাইয়েরা! আল্লাহকে পাওয়ার জন্য কি কাঁদবে না? জেনে রেখো, যে ব্যক্তি মাওলাকে পাওয়ার জন্য কাঁদে, মাওলার দিদার থেকে সে বঞ্চিত হবে না। ভাইয়েরা! তোমরা কি দোযখের ভয়ে কাঁদবে না? জেনে রেখো, দোযখের ভয়ে ক্রন্দনকারীকে আল্লাহ মুক্তি দেবেন। বন্ধু! কিয়ামতের দিনের পিপাসার ভয়ে কি কাঁদবে না? জেনে রেখো, যে ব্যক্তি এই ভয়ে কাঁদে সকল সৃষ্টি জীবের মধ্যে তাকেই পিপাসামুক্ত রাখা হবে। এরপরও কি তোমরা কাঁদবে না? উপস্থিত সবাই বলল, অবশ্যই! তিনি আবার বললেন, হ্যাঁ, দুনিয়ার জীবনে চোখের শীতল অশ্রু ঝরিয়ে কাঁদতে থাকো। তাহলে জান্নাতে নবী, সিদ্দিক, শহীদ এবং নেক বান্দাদের সাথে তোমাদেরও পিপাসা নিবারণ করা হবে। তারাই হলেন উত্তম বন্ধু! এটুকু বলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে গেলেন।
২৬. হযরত রুশাদ ইবনে সা'আদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার এক সঙ্গী থেকে বর্ণনা করেন, আমি একটি কিতাবে পেয়েছি, আল্লাহ তা'আলা বলেন, তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে বলো, তারা যেনো আমার ভয়ে ক্রন্দনকারী লোকদের সাথে ওঠাবসা করে। আমি যখন এই ক্রন্দনকারীদের করুণা করবো, তখন তারাও রহমত লাভে ধন্য হবে।
২৭. হযরত হারুন ইবনে রিআব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাদিসে আছে, ক্রন্দনের বোঝা প্রচণ্ড ভারী, একটি পাল্লায় যদি এর ওজন করা হয়, তবে তা দুনিয়ার সমস্ত পাহাড়ের সমপরিমাণ ওজনবিশিষ্ট হয়ে যাবে কিংবা ঝুঁকে পড়বে। অশ্রু যখন কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে, আগুনের সমুদ্র নিতে যায়। আল্লাহর কোনো নিষ্ঠাবান বান্দা যখন মজলিসে কাঁদে, তার ক্রন্দনের বরকতে উপস্থিত সবাইকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।
২৮. হযরত উমর ইবনে যার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি যখনই কোনো ক্রন্দনকারীকে দেখেছি, আমার মনে হয়েছে, তার উপর কেবল রহমতই বর্ষণ হচ্ছে।
২৯. হযরত আবু মা'মার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি আবু হাশিমের মজলিসে আউন ইবনে আবদুল্লাহ্কে দেখেছি। তিনি কাঁদছেন এবং অশ্রু মুছছেন আর বলছেন, আমার কাছে এই হাদিসখানা পৌঁছেছে, যে অশ্রুর উপর দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে যাবে, তাতে আগুনের ছোঁয়া লাগবে না।
৩০. হযরত ইয়াযিদ রূপাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমাদের কাছে এই হাদিস পৌঁছেছে, আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারী যখন কোন স্থানে বসে ক্রন্দন করে, স্থানটি তখন কেঁপে ওঠে। যতক্ষণ সে কাঁদতে থাকে, রাহমাতে ইলাহী ঐ স্থান বেষ্টন করে রাখে।
৩১. হযরত আবুল জুদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমাকে উমর ইবনে আবদুল আযীয বললেন, হে আবুল জুদী! আল্লাহর স্মরণে তোমার কপাল বেয়ে যে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, তাকে তুমি গণীমত মনে করো।
৩২. হযরত মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি জনৈক ব্যক্তিকে কাঁদতে দেখে বলতেন, আমাদের নিকট এই হাদিসটি পৌঁছেছে, ক্রন্দনকারীকে দয়া করা হয়। তাই যে ব্যক্তি ক্রন্দনের ক্ষমতা রাখে, সে যেনো ক্রন্দন করতে থাকে।
৩৩. হযরত আবু হাজিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমাদের কাছে এই হাদিসটি পৌঁছেছে, আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন হলো তার করুণা পাবার মাধ্যম।
৩৪. হযরত মিফযাল ইবনে মুহালহাল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমাদের কাছে একটি হাদিস এ মর্মে পৌঁছেছে, বান্দা যখন আল্লাহর ভয়ে কাঁদে তখন তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নূরে নূরান্বিত হয়ে যায়। এবং রোনাযারির মাধ্যমে সে সুসংবাদপ্রাপ্ত হয়। এক অঙ্গ অন্য অঙ্গকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, এটা কিসের নূর? জবাব আসে, এ হলো ক্রন্দনের নূর, যা তোমাদেরকে বেষ্টন করে ফেলেছে।
৩৫. হযরত ইবনে যার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার নিকট এ হাদিসখানা পৌঁছেছে, আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারীর অশ্রুর প্রতিটি ফোঁটার বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা তার অন্তরে নূরের পাহাড় তৈরি করে দেন। তার মধ্যে নেক আমল করার শক্তি বাড়িয়ে দেন এবং আগুনের সমুদ্র নিভিয়ে দেন।
৩৬. হযরত সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দন হলো তাওবাহর একটি চাবি। তুমি কি দেখো না, ক্রন্দনকারীর দিল নরম হয়ে যায় এরপর সে অনুতপ্ত হয়ে পড়ে?
৩৭. হযরত হামযা আ’মা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার আম্মা হাসান বসরীর নিকট যেয়ে বললেন, ‘আবু সাঈদ! এ হলো আমার পুত্র। আমি চাই সে যেনো আপনার সান্নিধ্যে থাকে। আপনার দ্বারা আল্লাহ যেন তাকে কল্যাণ দান করেন।’ এরপর থেকে আমি তাঁর কাছে সর্বদা আসা-যাওয়া করতে থাকি। একদিন বললেন, ‘বৎস! সব সময় আখিরাতের কল্যাণ লাভের চিন্তা করো। অবশ্যই তুমি কল্যাণ লাভে ধন্য হবে। নিঃসঙ্গ অবস্থায় কাঁদবে। প্রতিপালক তোমার দিকে দৃষ্টি দেবেন। অশ্রুর উপর করুণা বর্ষণ করবেন। তাতে তুমি সফল হবে।' যখনই আমি তাঁর বাড়ি যেতাম, কাঁদতে দেখতাম, মানুষের সাথে গেলেও দেখতাম তিনি কাঁদছেন। কোন সময় দেখতাম নামায পড়েছেন আর আমার কানে তাঁর ক্রন্দনের আওয়াজ আসছে। একদিন বললাম, আবু সাঈদ! আপনি খুব বেশী কাঁদেন! একথা শ্রবণ করে আরো কাঁদলেন। অতঃপর বলেন বৎস! মুমিন যদি না কাঁদে, তাহলে সে আর কী করবে? ক্রন্দন তো রহমতের পথে আহ্বান করে। যদি জীবনে কাঁদার ক্ষমতা রাখো, কাঁদতেই থাকো। হয়তো এ অবস্থা দেখে আল্লাহ তা'আলা তোমার উপর করুণা বর্ষণ করতে পারেন আর তখন তো আগুন থেকে রেহাই পেয়ে যাবে।
৩৮. হযরত ইসমাঈল ইবনে যাকওয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া এবং তার বাবা মসজিদে গেলেন। সেখানে একজন বক্তা ওয়াজ করছিলেন। তখন ইয়াস ও তার বাবা ছাড়া উপস্থিত সকলেই কাঁদলেন। লোকজন চলে যাওয়ার পর মুয়াবিয়া ছেলেকে বললেন, এই মজলিসে আমরাই সর্বাপেক্ষা অধম। ইয়াস বললেন, এটাতো হৃদয়ের নম্রতা ও কোমলতার পরিচয়। এর দ্বারা চোখের পানি যেভাবে গড়িয়ে পড়ে, অনুরূপ ফিতনারও আশঙ্কা থাকে। বাবা বললেন, বৎস! জানি না তুমি কি বলতে চাচ্ছো, কিন্তু এসব লোক তো কোমলতা ও রহমত লাভের আশায় এগিয়ে গেছে।
৩৯. হযরত আবু কা’ব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা মুয়াবিয়া ইবনে ক্বুররার মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। তিনি একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন মসজিদের কোণ থেকে এক ব্যক্তি কেঁদে উঠেন। মুয়াবিয়া তার দিকে চেয়ে বলেন, তুমি যে কাঁদছো আল্লাহ তোমাকে এর বিনিময়ে বিরাট রাজ্য দান করেছেন। একথা বলার পর গোটা বৈঠকে ক্রন্দনের রুল পড়ে যায়।
৪০. হযরত ফারকাদ সাবাখী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একটি গ্রন্থের মধ্যে পড়েছি, বান্দা যখন আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, তার পাপ মিটে যায়। সে যেন নবজাত নিষ্পাপ শিশু। বান্দা যদি পাহাড়সম গুনাহ করেও কাঁদতে থাকে, আল্লাহর রহমত তাকে বেষ্টন করে দেয়। জান্নাত লাভের জন্য যে ব্যক্তি ক্রন্দন করে, জান্নাত নিজেই আল্লাহর দরবারে তার জন্য সুপারিশ করবে। সে বলবে, প্রতিপালক! তুমি তাকে আমার মধ্যে পাঠিয়ে দাও। আগুন তার মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে। সে বলবে, প্রতিপালক! সে আপনার নিকট আমার কাছ থেকে মুক্তি কামনা করছে, আমার ভয়ে কাঁদালে, তাকে মুক্ত রাখো।
৪১. হযরত ফারকাদ সাবাখী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কাঁদতে কাঁদতে দুর্বল হয়ে গেলেন। কাঁদার কারণ জানতে চাইলে জবাব দেন, জেনেছি, আল্লাহর ভয়ে যে খুব কাঁদে, কিয়ামতের দিন আগুন তাকে স্পর্শ করবে না। একথা বলে তিনি আরো কাঁদতে লাগলেন। তাঁর সকল সঙ্গীও কেঁদে উঠেন।
৪২. হযরত আবু ইমরান জুনি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, প্রত্যেক আমলের ওজন করা হবে, কেবল চোখের পানি ছাড়া। আগুনের সমুদ্র নিভিয়ে দিবে এই চোখের পানিই।
৪৩. হযরত সালিম ইবনে আবদূল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'আ করতেন, আল্লাহ! খুব বেশী ক্রন্দনশীল দুটি চোখ আমাকে দান করুন। কেঁদে কেঁদে যেনো কপোল বেয়ে অশ্রু পড়তে থাকে। চোখের পানি রক্তে পরিণত হওয়ার আগে আর দণ্ডগুলো অসার হওয়ার পূর্বে আমি যেন আপনার ভয় থেকে মুক্তি পেয়ে যাই।
📄 কান্নার জন্য প্রার্থনা
৪৪. হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: يَا أَيُّهَا النَّاسُ ابْكُوْا ◌ فَإِنْ لَّمْ تَبْكُوْا فَتَبَاكُوْا ◌ فَإِنَّ أَهْلَ النَّارِ يَبْكُوْنَ ◌ حَتَّى تَصِيْرَ فِي وُجُوْهِهِمُ الْجَدَاوِلُ ◌ فَتَنْقَطِعُ الدُّمُوْعُ ◌ فَتَقْرَحُ الْعُيُوْنُ ◌ حَتَّى لَوْ أَنَّ السُّفُنَ أُرْخِيَتْ فِيْهَا لَجَرَتْ
লোকজন! কাঁদো। না পারলে কাঁদার ভান করো। কারণ, জাহান্নামীরা কাঁদতেই থাকবে। কাঁদতে কাঁদতে তাদের চোখ দিয়ে নদী বয়ে যাবে। অশ্রু শেষ হয়ে গেলে চোখ দিয়ে রক্ত ঝরবে। এই আহাজারির অশ্রু-রক্তের মিশ্র নদীতে নৌকাও ভেসে চলতে পারবে।
৪৫. হযরত ইসহাক হাজরানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সালেহ মুররীকে বলতে শুনেছি, কাঁদার অনেক কারণ আছে: পাপের চিন্তা করে কাঁদা, এতে যদি হৃদয়ে সাড়া জাগে তাহলে তো ভালো। নতুবা আতঙ্কজনক অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। এতে যদি দিলের মধ্যে সাড়া মিলে তাহলে ভালো। আর তাতেও যদি ক্রন্দন হয় না তাহলে চিন্তা করবে, আগুনের সিঁড়িতে তুমি গড়াগড়ি করছ। একথা বলে তিনি চিৎকার দিলেন, বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যান। অবস্থা দেখে মজলিসের সমস্ত লোক চিৎকার দিয়ে উঠলো।
৪৬. হযরত আবু হুরাইরাহ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: أَنَّ رَجُلًا ◌ شَكَا إِلَى رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَسْوَةَ قَلْبِهِ ◌ فَقَالَ: إِنْ أَحْبَبْتَ أَنْ يَّلِيْنَ قَلْبُكَ فَامْسَحْ رَأْسَ الْيَتِيْمِ ◌ وَأَطْعِمِ الْمِسْكِيْنَ
এক ব্যক্তি আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তার হৃদয়ের কঠোরতার কথা তুলে ধরল। রাসূল জবাব দিলেন, যদি হৃদয়ে কোমলতা চাও, তবে এতিমের মাথায় হাত বুলাও। নিঃস্বকে আহার করাও।
৪৭. হযরত মু'লি ইবনে জিয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক ব্যক্তি হযরত হাসান বসরীকে বললো, আবু সাঈদ! আপনার কাছে আমার হৃদয়ের কঠোরতার অভিযোগ করছি। তিনি বললেন, হৃদয়কে জিকিরের নিকটবর্তী করো।
৪৮. হযরত আবু আবদুর রাহমান মাগাজিলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শাম দেশের একজন মানুষ সেই সমুদ্র তীরে বাস করতেন। তিনি বলতেন, ইবাদতগুজার মানুষ যদি কাঁদতো, তাদের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে রক্ত ও চর্বি গড়িয়ে পড়তো। শরীর শূন্য হয়ে যেতো। তাদের হৃদয় সেদিনের ভয় নিয়ে ঘোরপাক করতো, যেদিন গর্ভবতী মহিলা গর্ভের কথা ভুলে যাবে।
৪৯. হযরত উসমান ইবনে আতা খুরাসানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বাবা থেকে বর্ণনা করেন, হযরত ওয়াইস কারনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কামারের দোকানে আসতেন। অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করতে কামাররা তাদের ব্যাগ দিয়ে যখন বাতাস দিত, তিনি অগ্নি স্ফুলিঙ্গ অবলোকন করতেন আর শব্দ শুনতেন। তারপর চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে যেতেন। লোকেরা এ দৃশ্য দেখে কাছে এসে বলতো, সে এক পাগল! কোন সময় তিনি কুফা শহরের একটি পুরাতন স্তূপে বসে ক্রন্দন করতেন। সূর্যোদয়ের পর সেখান থেকে নেমে আসতেন। শিশুরা তার পেছনে ছুটতো। তিনি দৌঁড়ে মসজিদে চলে যেতেন।
৫০. হযরত বখতরী ইবনে ইয়াজিদ আনসারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জুনক আবিদ কামারের চামড়ার ব্যাগের দৃশ্য অবলোকন করতেন আর কাঁদতেন। হঠাৎ একদিন তিনি চিৎকার দিয়ে মূর্ছামুখে পতিত হন।
৫১. হযরত মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি হযরত হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির সাথে বাজারে যাই। আতরের দোকানের পাশ দিয়ে গেলাম, তখন সুঘ্রাণ পাই। তিনি কাঁদতে লাগলেন। মনে হলো কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়বেন। তখন বলেন, আল্লাহ্র শপথ! সমগ্র সৃষ্টির ঠিকানা হয় জান্নাতে হবে, না হয় জাহান্নামে। তৃতীয় কোন ঠিকানা নেই। তখন আবার কাঁদতে থাকেন। এই ঘটনার কিছু দিন পরই তিনি দুনিয়া ত্যাগ করেন।
৫২. হযরত আবুল হাইসাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর আসওয়াস গোত্রের পাশ দিয়ে গেলাম। তারা গালিচার উপর বসে আছে। পরনে রঙ বেরঙের রেশমী বস্ত্র। সাঈদ তাদেরকে সালাম দিলেন। তারা তাঁকে স্বাগত জানালো, সালাম জানিয়ে বসতে বললো। এদের কাছ থেকে সরে আসার পর খুব কাঁদলেন। জিজ্ঞেস করি, হযরত! কোন্ কারণে এত বেশী কাঁদছেন? জবাব দিলেন, এই লোকগুলোকে দেখার পর জান্নাত ও এর আরাম- আয়েশের কথা স্মরণ হয়ে যায়।
৫৩. হযরত ওয়াইবা ইবনে সাফওয়ানের এক ভাই বর্ণনা করেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির একজন খাদিম বলেন, এক রাতে উমর কেঁদে কেঁদে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। এতে আমারও ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি তাঁর কাছে রাত্রিযাপন করতাম। অধিকাংশ সময়ই তাঁর ক্রন্দনে জেগে উঠতাম। কিন্তু এ রাত তিনি বেশী কাঁদলেন। সকালে আমাকে ডেকে বলেন, 'বৎস! মানুষ তোমার কথা শুনবে এবং তোমাকে মেনে চলবে- তাতে তো কোন কল্যাণ নেই। বরং তুমি মহান প্রতিপালকের বিধান বুঝবে ও তা পালন করবে- তাতেই আসল কল্যাণ। বৎস! আজ রাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন মানুষকে আমার নিকট আসতে দেবে না। আমার ভয় হচ্ছে, না আমি তাদের কথা বুঝবো আর না তারা বুঝবে আমার কথা।' এরপর বলি, আমীরুল মু'মিনীন! আজ রাত আপনাকে এতো বেশী কাঁদতে দেখেছি অন্য কোন রাতে এমন দেখি নি। এবার পুনরায় কাঁদেন আর বলেন, 'বৎস! আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর সামনে কিভাবে দাঁড়াবো এ নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছি।' তখন বেহুঁশ হয়ে যান। ভোর হওয়ার পর জ্ঞান ফিরে আসে। এ ঘটনার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আর কখনো তাঁকে মুচকি হাসি দিতেও দেখি নি।
৫৪. হযরত মুসলিম ইবনে আবদুল মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহির খাদিম আবদুস সালাম বলেন, একদা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কাঁদলেন, তখন তাঁর স্ত্রী ফাতিমাহ সহ ঘরের সকলে কাঁদলেন। কিন্তু কেউ জানতেন না, এ কাঁদার কারণ কি। এ প্রশ্নটি যখন চিন্তায় আসল, ফাতিমা জিজ্ঞেস করলেন, আমীরুল মু'মিনীন! কি জন্য কাঁদছিলেন? জবাব দেন, 'আল্লাহর সামনে সকল মানুষ জমায়েত হবে, একদল যাবে জান্নাতে আর আরেকদল জাহান্নামে। আমি এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছিলাম।' এটুকু বলে তিনি চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে যান।
৫৫. হযরত মিসমা ইবনে আসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি আবদুল আজিজ ইবনে সুলাইমান, কিলাব ইবনে যারী এবং সালমান আ'রাজের সাথে এক সমুদ্র সৈকতে রাত্রিযাপন করেছিলাম। তখন কিলাব এতো বেশী কাঁদলেন, মনে হলো মারা যাবেন। তাঁর ক্রন্দন দেখে আবদুল আজিজও কাঁদলেন। সালমানও তাঁদের আহাজারি দেখে কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহর শপথ! তাদের এই অবস্থা দেখে আমিও কাঁদতে লাগলাম। কিন্তু আমি জানতাম না কিসের জন্য এই ক্রন্দন। পরদিন আবদুল আজিজকে জিজ্ঞেস করি, আবু মুহাম্মদ! গতরাত এতো বেশী কাঁদলেন কেন? জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! সমুদ্র সৈকতে উর্মির ওঠানামার দৃশ্য দেখে জাহান্নামের আগুনের লেলিহানের কথা স্মরণ হয়ে যায়। এজন্যই আমি কাঁদতে থাকি। এরপর একই প্রশ্ন করি কিলাবকে। আল্লাহর শপথ! তিনিও অনুরূপ উত্তর দিলেন। এরপর জিজ্ঞেস করি সালমান আ'রাযকে। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে সম্ভবত আমিই একমাত্র অধম! আমি তো কাঁদছিলাম শুধুমাত্র তাঁদের আহাজারি দেখে। তাঁরা যে কাঁদছেন, তাদের প্রতি একটু সহানুভূতি প্রকাশ করতে চেয়েছি।
৫৬. হযরত বকর ইবনে আবদুল্লাহ মুযানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একদা আবু মূসা বসরায় ওয়াজ করছিলেন। তিনি আলোচনা করেন জাহান্নামের উপর। এরপর হঠাৎ এমন বেশী কাঁদলেন, চোখের পানি ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে মিম্বর পর্যন্ত গড়িয়ে পড়লো। উপস্থিত লোকজন এ দৃশ্য দেখে করুণ সুরে কাঁদতে লাগলেন।
৫৭. হযরত মুগিরা ইবনে সা'দ ইবনে আখরাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে হাঁটছিলাম। আমরা যখন কামারদের পাশ কেটে যাচ্ছিলাম তখন তিনি থেমে যান, দেখতে লাগলেন তারা কিভাবে আগুন থেকে লোহা বের করছে। এরপর কাঁদতে শুরু করলেন।
৫৮. হযরত নজর ইবনে ইসমাঈল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রবি ইবনে আবু রুন্দ এক ব্যক্তির সাথে হাঁটছিলেন। তখন ঐ লোকটি আল্লাহর প্রশংসা করে এক জায়গায় বসে পড়লেন এবং কাঁদতে লাগলেন। সেখানে আরেক ব্যক্তি এসে তাকে প্রশ্ন করলো, আল্লাহ আপনার উপর করুণা বর্ষণ করুন! কাঁদছেন কেনো? জবাব দিলেন, জান্নাতী ও জাহান্নামীদের নিয়ে চিন্তা করছি। দেখলাম, প্রশান্ত লোকেরাই জান্নাতী আর অপদস্থরাই হলো জাহান্নামী। এ বিষয়টাই আমাকে কাঁদিয়েছে।
৫৯. হযরত ইবনে আবি জুবাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত তালহা এবং হযরত জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কামারের ব্যাগের পাশ কেটে যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে যেতেন, এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ওঠতেন। এভাবে ফলমূল ও আতর বিক্রেতাদের পাশ কেটে যাওয়ার সময়ও তাঁরা দাঁড়িয়ে যেতেন এবং কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে জান্নাত লাভের প্রার্থনা করতেন।
৬০. হযরত আ’মাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রবি ইবনে খুসাইম কামারদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অগ্নিতো বাতাস দেওয়ার ব্যাগের দিকে লক্ষ্য করে বেহুঁশ হয়ে যেতেন।
৬১. হযরত আবদুল আজিজ ইবনে আলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাসসান ইবনে আবি সিনান চিনির ব্যবসা করে বেশ লাভবান হলেন। এ জন্য ক’জন বন্ধু তাঁকে স্বাগত জানাতে গেলেন। তাঁরা দেখেন, হাসসান ঘরের কোণে বসে কাঁদছেন। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, আবদুল্লাঃ! এ তো আল্লাহর নিয়ামত, তাতে কাঁদার কী আছে? জবাব দেন, আল্লাহর শপথ! ভয় করছি, এই চিনি পেয়ে যদি আমি উদাসীন হয়ে যাই। এজন্যই আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করছি।
৬২. হযরত আবদুর রহমান ইবনে হাফস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে মুনকাদিরের কাছে একজন শাসক দূতের মাধ্যমে কিছু উপহার পাঠান। উপহার দেখে উমর কাঁদতে লাগলেন। তখন তার নিকট আবু বকর এসে হাজির হলেন। তিনিও উমরের ক্রন্দন দেখে কাঁদতে শুরু করলেন। এবার উপস্থিত হন মুহাম্মাদ। উমরের রোদন দেখে তিনিও কান্না আটকে রাখতে পারলেন না। ক্রন্দনের রোল পড়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে আগত দূতও আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না- তিনিও কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর দূত আমিরের দরবারে ফিরে যেয়ে ঘটনার বর্ণনা দিলেন। আমির এই ক্রন্দনের কারণ জানার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন এবং রিবইয়াকে উমরের নিকট পাঠালেন। রিবইয়া এসে মুহাম্মাদকে ক্রন্দন সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। মুহাম্মাদ বললেন, উমরকে জিজ্ঞেস করো। তিনি এ ব্যাপারে বেশী অবগত। তখন রিবইয়া উমরের কাছে যেয়ে প্রশ্ন করলেন, ভাই! উপহার পেয়ে এতো কাঁদলেন কেন? জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! আমার ভয় হয়েছে, হৃদয় যদি দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তাহলে তো আখিরাতে আমার জন্য কিছুই থাকবে না। এজন্যই কাঁদছিলাম। এরপর তিনি সমস্ত মাল মদীনা মুনাওয়ারার গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। রিবইয়া ফিরে এসে আমিরের নিকট পূর্ণ বর্ণনা তুলে ধরেন। এবার আমিরও কাঁদা দিলেন। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! কল্যাণ তো এ পথেই নিহিত।
৬৩. হযরত সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বেশ নীরবে বসে আছেন। তাঁর বন্ধু-বান্ধবরা পাশে বসেই কথা বলছেন। তারা জিজ্ঞেস করলেন, আমীরুল মুমিনীন! কথা বলছেন না কেনো? জবাব দিলেন, ভাবছি কিভাবে জান্নাতীরা পরস্পরে সাক্ষাৎ করছেন আর খুশগল্প করছেন। আর অপরদিকে জাহান্নামীরা কিভাবে ভীষণ যন্ত্রণায় চিৎকার দিচ্ছে। একথা বলেই তিনি কাঁদতে লাগলেন।
📄 যে কারণে আহাজারি
৬৪. হযরত কা’ব রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বান্দা যখন কাঁদে, আল্লাহ তা’আলা একজন ফিরিশতা প্রেরণ করেন। তিনি তার ডানা দিয়ে কপোলে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে দেন। যখন আবার তা ভিজে যায়, পুনরায় মুছে দেন।
৬৫. হযরত মাকহুল রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যেসব লোকের পাপ কম তাদের হৃদয় খুবই নরম থাকে।
৬৬. হযরত হাইয়্যাজ ইবনে মুহাম্মাদ রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কুরাইশ বংশের একজন শায়খ ছিলেন, তাঁর চোখ দিয়ে খুব দ্রুত পানি বেরিয়ে আসতো। ছিলেন তাহাজ্জুদ গুজার। তাঁর পাপের মাত্রা ছিল খুব অল্প। মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতেন। এক আলিমের সাথে তাঁর সম্পর্কে বলি, ঐ শায়খ তো দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমী। আমার মনে হয় না ৫০ বৎসর যাবৎ তিনি কোন পাপে লিপ্ত হয়েছেন। এরপরও জীবনভর ক্রন্দন করছেন। তখন ঐ আলিম মন্তব্য করলেন, তাঁর মতো হতে হলে দীর্ঘদিন চোখের পানিতে বুক ভাসাতে হবে। আমি বললাম, তা কিভাবে সম্ভব? জবাব দিলেন, শরীর বজ্রহীন হলে পাতলা থাকে। ঠিক তদ্রূপ হৃদয়ে পাপ যখন স্বল্প হয়, চোখের পানি দ্রুত বেরিয়ে আসে। আমি বললাম, হ্যাঁ, বিষয়টি এরূপই।
৬৭. হযরত আবু আবদুল্লাহ বুরাসী রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হৃদয় যতক্ষণ পর্যন্ত দগ্ধ হয় না, ততক্ষণ চোখ দিয়ে পানি বের হয় না। হৃদয় যখন দগ্ধ হবে এবং অগ্নিশিখা থেকে ধোঁয়া মাথায় ছড়িয়ে পড়বে তখনই চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকবে।
৬৮. হযরত মালিক ইবনে জায়গাআম রাহিমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বাবার কাছ থেকে বর্ণনা করেন, হৃদয় যে পরিমাণ দগ্ধ হবে, চোখ থেকে সে পরিমাণ পানিও বের হবে। সমস্ত অন্তরপুরী জ্বলে গেলেও একজন চিন্তাশীলের জন্য ক্রন্দন ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
৬৯. হযরত মিসমা ইবনে আসিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি বাহরাইনের এক আবিদকে জিজ্ঞেস করলাম, চিন্তাশীলের হৃদয় তার ডাকে সাড়া দেয়, তার চোখ দিয়ে প্রত্যেক কাজে অশ্রু ঝরে, এর কারণ কী? তিনি বললেন, চিন্তাশীল ব্যক্তির মধ্যে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ পেলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর তা হৃদয় ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করে থেমে যায়। তখন হৃদয়ে সৃষ্টি হয় আলোড়ন, এতে অন্তরে জ্বালাতন আরম্ভ হয়। এ জ্বালাতনে চুলের গোড়ায় পানি উঠলে ওঠে, নয়নযুগল দিয়ে নির্গত হয় অশ্রু। চোখের পাতা এই অশ্রুকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়।
৭০. হযরত আবূ মু'আওয়িয়া আসওয়াদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহর জন্য যে ব্যক্তি অধিক হারে নিষ্ঠা ও সততার চর্চা করে, তার চোখ দিয়ে পানি আসে। সে যখন ক্রন্দন করতে চায়, চোখ তাতে সাড়া দেয়।
৭১. হযরত রাহাওয়া আবূ সাহল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনাকে বললাম, আপনি কি ফুজাঈলকে দেখেছেন, তাঁর চোখের পানি তো কখনও শুকায় না? সুফিয়ান বললেন, হৃদয় যখন রক্তাক্ত হয়, চোখ থেকে অশ্রু নির্গত হয়। একথা বলে তিনি একটি অভিনব শ্বাস ছাড়লেন।
৭২. হযরত ইসমাঈল ইবনে আইয়াশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ক্রন্দনের ৭ টি কারণ আছে: ১. আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন। এই ভয়ে চোখের এক ফোঁটা পানি আগুনের সমুদ্রে নিভিয়ে দেয়। এজন্যই আল্লাহর ভয়ে কোন কোন মানুষের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। ২. আনন্দের ক্রন্দন। ৩. দুঃখের ক্রন্দন। ৪. প্রেমাশক্তির ক্রন্দন। ৫. (আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর) ভয়ের ক্রন্দন। ৬. ব্যথার ক্রন্দন। (সপ্তমটির উল্লেখ নাই)
📄 তিলাওয়াতের মধ্যে ক্রন্দন
৭৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
قَالَ لِيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اقْرَأْ عَلَيَّ قَالَ: قُلْتُ: أَلَيْسَ تَعَلَّمْتُ مِنْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: إِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي ۞ فَقَرَأْتُ عَلَيْهِ سُورَةَ النِّسَاءِ حَتَّى إِذَا بَلَغْتُ: ﴿فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا﴾ فَاضَتْ عَيْنَاهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, কাছে বসে তিলাওয়াত করো। আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি তো আপনার কাছ থেকেই তিলাওয়াত শিখেছি? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি অন্যের কণ্ঠে শুনতে ভালোবাসি। আমি তখন সুরা নিসা তিলাওয়াত করতে লাগলাম। যখন আমি اِذَا ... فَكَيْفَ ‘ আয়াতে পৌঁছলাম তখন দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র নয়নযুগল থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
[আয়াতের অর্থ: আর তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি প্রতিটি উম্মত থেকে তাদের অবস্থা বর্ণনাকারী ডেকে আনব এবং আপনাকেও ডাকব তাদের অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে।]
৭৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন: لَمَّا نَزَلَتْ إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا بَكَى أَبُو بَكْرٍ الصِّدِّيقُ رَحِمَهُ اللهُ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَا يُبْكِيكَ يَا أَبَا بَكْرٍ قَالَ : أَبْكَتْنِي يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذِهِ السُّورَةُ সুরায়ে যিলযাল নাজিল হওয়ার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু কাঁদতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, আবু বকর! কাঁদছো কেন? জবাব দিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই সুরাটি আমাকে কাঁদাচ্ছে।
৭৫. হযরত আবু আবদুর রহমান হাবলী রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, উকবা ইবনে আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু খুব মধুর সুরে তিলাওয়াত করতেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একদিন তাঁকে বললেন, সুরা বারাআত তিলাওয়াত করে শোনাও। তিনি তিলাওয়াত করলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খুব কাঁদলেন। এরপর বলেন, এই সুরা যে অবতীর্ণ হয়েছে তা আমার ধারণাও ছিলো না।
৭৬. হযরত নাফে রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন এই আয়াত, أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ - তিলাওয়াত করতেন, এতো বেশি কাঁদতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেতো। সাথে সাথে বলতেন, হ্যাঁ, হে আমার প্রতিপালক! [আয়াতের অর্থ: আল্লাহর স্মরণে মুমিনদের হৃদয় গলে যাওয়ার কি এখনও সময় হয় নি? (৫৭:১৬)]
৭৭. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাবাহ রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাফওয়ান ইবনে মিহরাজ যখন এই আয়াত, وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقِلِبُونَ - তিলাওয়াত করতেন, কাঁদতে থাকতেন। মনে হতো তিনি ভেসে পড়বেন। [আয়াতের অর্থ: যুলুমকারীরা শীঘ্রই জানতে পারবে তাদের গন্তব্যস্থল কিরূপ। (২৬:২২৭)]
৭৮. হযরত ইবনে আজালান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কুরআন তিলাওয়াতের সময় ক্রন্দনের প্রতিটি ফোঁটার দ্বারা আল্লাহর করুণা লাভ হয়।
৭৯. হযরত ফজল রুক্বাশী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সুললিত কন্ঠের তিলাওয়াতে প্রফুল্ল হয়ে ওঠে আবিদদের হৃদয়। যে হৃদয়ে সুন্দর তিলাওয়াতের আওয়াজে সাড়া জাগে না, তা তো মৃত। সুন্দর কন্ঠধ্বনি দ্বারা যে চোখে পানি আসে না, তা তো উদাসীন চোখ।
৮০. হযরত আবু সালামা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত উমর ইবনে খাতাব রাদিয়াল্লাহু আনহু আবূ মূসাকে যখন বলতেন, আমাদেরকে প্রভূর কথা স্মরণ করিয়ে দিন, তিনি তখন তিলাওয়াত করতেন।
৮১. হযরত আবূ মা’শার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে কায়েস যখন বন্ধুদেরকে কাঁদানোর ইচ্ছা করতেন, তখন কথা বলার পূর্বে কুরআন শরীফ তilaওয়াত করতেন। তাঁর কন্ঠ ছিলো সুমধুর। তিলাওয়াতের সময় নিজে কাঁদতেন, অন্যকেও কাঁদাতেন। তিলাওয়াত শেষে তিনি কথা বলতেন। যখন কথা বলতেন, চোখদু’টো অশ্রুতে ভিজে যেতো।
৮২. হযরত ইবনে আবি যিব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট এক ব্যক্তি এই আয়াতটি, وَإِذَا أُلْقُوا مِنْهَا مَكَانًا ضَيِّقًا مُقَرَّنِينَ دَعَوْا هُنَالِكَ ثُبُورًا - পাঠ করলেন, তখন খলিফা কাঁদতে লাগলেন। এরপর মজলিস ছেড়ে ঘরে চলে যান। লোকজনও চলে গেলো।
[আয়াতের অর্থ: যখন এক শিকলে কয়েকজন বেঁধে জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, তারা সেখানে মৃত্যুকে ডাকবে। (২৫:১৩)]
৮৩. হযরত সাঈদ ইবনে আবি আরুবা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমার ইবনে আবদুল আজিজ ছেলেকে বললেন, আমাকে তিলাওয়াত করে শোনাও। ছেলে জিজ্ঞেস করলেন, কি তিলাওয়াত করবো? বললেন, সূরা কাফ। ছেলে যখন তিলাওয়াত করে এই আয়াতে وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ -আসলেন তখন উমর কাঁদতে লাগলেন। এরপর আবার বললেন, বৎস! তিলাওয়াত করো। ছেলে জিজ্ঞেস করলেন, কি তিলাওয়াত করবো? বললেন, সুরায়ে কাফ। ছেলে তিলাওয়াত করে যখন মৃত্যুর আলোচনার আয়াতে আবার আসলেন, উমর খুব বেশী কাঁদলেন। এভাবে তিনি কয়েক বার তিলাওয়াত করালেন আর কাঁদলেন।
[আয়াতের অর্থ: মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে, এ থেকে তুমি টালবাহানা করতে। (কাফ:১৯)]
৮৪. হযরত মু'তামির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উবাই ফযরের নামাযে আমাদের ইমামতি করছিলেন। তিনি সুরায়ে কাফ তিলাওয়াত করে যখন এই আয়াতে, وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ -আসলেন তখন খুব বেশী কাঁদলেন। পরবর্তী আয়াত তিলাওয়াত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললেন। অতঃপর রুকুতে চলে যান।
[আয়াতের অর্থ: মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে, এ থেকে তুমি টালবাহানা করতে। (৫০:১৯)]
৮৫. হযরত সালূত ইবনে হাকিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মক্কা শরীফে একজন ক্বারী সাহেব আমাদের কাছে বসে তিলাওয়াত করলেন। তিনি যখন সূরা ক্বাফের এই আয়াতে, وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ তখন ফুজায়েলের দরজার সামনে উপস্থিত ছিলাম। তাঁর কণ্ঠে সজোরে ক্রন্দন শোনাচ্ছিল।
৮৬. হযরত সুফিয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তালক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তিলাওয়াতের সময় নিজে কাঁদাতেন লোকদেরকেও কাঁদাতেন। কোমল হৃদয়ে মধুর কণ্ঠে ক্ষণিত তিলাওয়াত শুনে কেউ না কেঁদে পারতেন না। তাঁর মা তাঁকে বললেন, প্রিয় সন্তান! তোমার কণ্ঠ কতোই না সুন্দর! তবে ক্বিয়ামতের দিন এটাও (রিয়া হেতু) শাস্তির কারণ হতে পারে। একথা শ্রবণ করে তালক বেশ কাঁদলেন। কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে গেলেন।
৮৭. হযরত সাঈদ ইবনে ফুজায়েল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে বসে এক ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করলেন। যখন তিনি এই আয়াতে فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ - পাঠ করলেন তখন উমর অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যান। [আয়াতের অর্থ: অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। (৫২:২৭)]
৮৮. হযরত ইবরাহীম তায়মী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হারিস ইবনে সুয়ায়দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এই দু'টি আয়াত, فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ তিলাওয়াত করে কাঁদতে লাগলেন। এরপর বলেন, পরকালের শাস্তি খুবই কঠিন। [আয়াতের অর্থ: অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে। কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে। (৯৯:৭-৮)]
৮৯. হযরত হারিস ইবনে সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে বসা ছিলাম। তখন একজন কারী সাহেব সূরায়ে যিলযাল তিলাওয়াত করেন। মালিক কাঁদতে শুরু করলেন, সাথে সাথে মজলিসের সবাই চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। কারী সাহেব যখন إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا আয়াতটি পাঠ করলেন, মালিক কেঁদে কেঁদে একেবারে অজ্ঞান হয়ে যান এবং এই অবস্থায়ই তাঁকে মজলিস থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
[আয়াতের অর্থ: যখন পৃথিবী তার কম্পনে প্রকম্পিত হবে। (৯৯:১)]
৯০. হযরত আবু মাওদূদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয এই আয়াতটি: وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَمَا تَتْلُو مِنْهُ مِنْ قُرْآنٍ وَلَا تَعْمَلُونَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا
তিলাওয়াত করতে করতে কাঁদতে থাকেন। ঘরের লোকজন ক্রন্দনের আওয়াজ শুনতে পেলেন। স্ত্রী ফাতিমা কাছে এসে কাঁদলেন। এরপর ঘরের সকলেই কাঁদতে লাগলেন। এসময় আবদুল মালিক ঘরে প্রবেশ করলেন। দেখেন সবাই কাঁদছেন। বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এতো বেশী কাঁদছেন, কারণ কী? জবাব দিলেন, প্রিয় পুত্র! বেশ ভালো কথা। তোমার বাবা যদি এ দুনিয়াকে চিনত না এবং দুনিয়াও তোমার বাবাকে না চিনতো তবে তো ভালো হতো! আল্লাহর শপথ! আমার ভয় হচ্ছে, আমি যেমন ধ্বংস হয়ে যাবো! আমার ভয় হয়, আমি কি জাহান্নামী হয়ে যাবো!
[আয়াতের অর্থ: বস্তুত: যে কোন অবস্থাতেই তুমি থাক এবং কুরআনের যে কোন অংশ থেকেই পাঠ কর কিংবা যে কোন কাজই তোমরা কর, অথচ আমি তোমাদের নিকট উপস্থিত থাকি, যখন তোমরা তাতে আত্মনিয়োগ কর। (১০:৬১)]
৯১. হযরত হিশাম ইবনে হাসসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এবং মালিক ইবনে দীনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে গেলাম। দেখি সেখানে এক ব্যক্তি বসে তিলাওয়াত করছেন। তিনি যখন إِنْ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ مَا لَهُ مِنْ دَافِعٍ - আয়াতদ্বয় তিলাওয়াত করলেন, তখন হাসান ও তাঁর সাথীরা কাঁদতে লাগলেন। মালিক ইবনে দীনার অস্থির হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। [আয়াতের অর্থ: আপনার পালনকর্তার শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। কেউ তা প্রতিরোধ করতে পারবে না। (৫২:৭-৮)]
৯২. হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একজন মানুষ উবাই এর কাছে এই আয়াতগুলো, وَالطُّورِ وَكِتَابٍ مَسْطُورٍ فِي رَقٍّ مَنْشُورٍ وَالْبَيْتِ الْمَعْمُورِ وَالسَّقْفِ الْمَرْفُوعِ وَالْبَحْرِ الْمَسْجُورِ এবং إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ مَا لَهُ مِنْ دَافِعٍ তিলাওয়াত করলেন। তখন উপস্থিত লোকজন কাঁদতে লাগলেন। তাঁদের ক্রন্দনের আওয়াজে আমি কারী সাহেবের বাকী তিলাওয়াত আর শুনতে পারি নি। [আয়াতের অর্থ: কসম তুর পর্বতের! কসম প্রশস্ত পত্রে লিখিত কিতাবের! কসম বায়তুল-মামুর তথা আবাদ গৃহের! কসম সমুন্নত ছাদের এবং উত্তাল সমুদ্রের! আপনার পালনকর্তার শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। কেউ তা প্রতিরোধ করতে পারবে না। (৫২:১-৮)]
৯৩. হযরত মুকাতিল ইবনে হাইয়ান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পেছনে নামায আদায় করেছিলাম। তিনি এই আয়াতটি وَقِفُوهُمْ إِنَّهُمْ مَسْئُولُونَ কাঁদতে কাঁদতে বার বার পাঠ করতে থাকেন। ক্রন্দনের কারণে তিনি আর সামনে এগিয়ে তিলাওয়াত করতে পারছিলেন না। [আয়াতের অর্থ: এবং তাদেরকে থামাও, তারা জিজ্ঞাসিত হবে। (৩৭:২৪)]
৯৪. হযরত আ'মাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু সালেহ নামক একজন মুয়াজ্জিন ছিলেন। ইমাম সাহেব দেরী করলে তিনি ইমামতি করতেন। কোমল হৃদয়ের এই মানুষটি প্রবল ক্রন্দনের কারণে নামাজের মধ্যে যেন অবসন্ন হতে পারতেন না।
৯৫. হযরত আবদুল্লাহ আনাসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শুক্রবার দিন উমর ইবনে আবদুল আযীয ময়লা কাপড় পরে বেরিয়ে আসলেন। তাঁর পেছনে ছিলো একজন হাবশী ভৃত্য। তিনি যখন লোক সমাগমে পৌঁছলেন গোলামটি চলে গেল। উমর মিম্বরে আরোহণ করেন। এরপর এই আয়াত দুটি إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ وَإِذَا النُّجُومُ انْكَدَرَتْ -তিলাওয়াত করে বলেন, সূর্য ও নক্ষত্রের কী অবস্থা হবে? এরপর আবার তিলাওয়াত করে এই আয়াতগুলোতে আসলেন وَإِذَا الْجَنَّةُ أُزْلِفَتْ وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعِّرَتْ কাঁদতে লাগলেন। মসজিদের সবাই কাঁদতে শুরু করলেন, এমনকি গোটা মসজিদে ক্রন্দনের রোল পড়ে গেল। মনে হলো, মসজিদের দেওয়ালও কাঁদতে আছে। [আয়াতের অর্থ: যখন জাহান্নামের আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হবে। এবং যখন জান্নাত নিকটবর্তী করা হবে। (৮১:১-২)]
৯৬. হযরত হাকিম ইবনে নূহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি জায়গাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে ছিলাম। বিশর ইবনে মানসুর তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলেন। জায়গাম আমাকে বললেন, আমাদের ঐ সাথী খুব সুন্দর তিলাওয়াত করেন। বিশর ইবনে মানসুর সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত শুনতে খুবই ভালোবাসতেন। আমি তখন ঐ কারী সাহেবকে নিয়ে আসি। তিনি পারস্যের অধিবাসী, খুব সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী। যখন তিনি তিলাওয়াত আরম্ভ করলেন, লোকজন কাঁদতে লাগলো। কারী নিজেও ফারসী ভাষায় বলতে বলতে কাঁদলেন। আল্লাহর শপথ! উপস্থিত সকলেই সন্তানহারা মায়ের মতো চিৎকার করে কাঁদছিলেন। চিৎকারে বাহির লোকজন জমায়েত হলো। বিশর ইবনে মানসুর বার বার বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলেন। আবু মালিক উটাওয়াসা করতে লাগলেন। মনে হচ্ছিলো, তিনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এ রাত্রটি আমার কাছে ছিল অত্যন্ত সুখকর, প্রশংসাদায়ক। বিশর আমাকে বললেন, হাকিম! ঐ পারস্য অধিবাসী কারী কী করলেন! তিনি তো চোখের সামনে কষ্ট দিয়ে মানুষকে মেরে ফেললেন!
৯৭. হযরত মাসরূক রাহিমাহুল্লাহু আলাইহি বলেন, আমি হযরত আয়শা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কাছে যেয়ে এই আয়াত, فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ -তিলাওয়াত করলাম। তিনি কেঁদে কেঁদে দু'আ করলেন, প্রভু! আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রেহাই দিন। [আয়াতের অর্থ: অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। (৫২:২৭)]
৯৮. হযরত আবদুল আজিজ রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা একস্থানে জমায়েত হলাম। প্রথম রাতে আমাদের সাথে ছিলেন রবি ইবনে সাবী এবং আরো কয়েকজন ফকীর। লোকজন বলতে লাগলো আবদুল ওয়াহিদ ইবনে জায়দ এসেছেন। মানুষ তা শ্রবণে সমবেত হতে থাকে। তিনি যখন আমাদের কাছে আসলেন একজন কারী সাহেব এই আয়াতদ্বয়, يَوْمَ تَمُورُ السَّمَاءُ مَوْرًا وَتَسِيرُ الْجِبَالُ سَيْرًا তিলাওয়াত করছিলেন। আবদুল ওয়াহিদ তা শ্রবণ করে খুব জোরে চিৎকার দিলেন। উপস্থিত লোকজনও কাঁদতে লাগলো। আবদুল ওয়াহিদ বেহুঁশ হয়ে যান। রবি এবং তাঁর সাথীরা তাঁকে ঘিরে কাঁদতে থাকেন। তিনি মাটিতে বেহুশ হয়ে পড়লেন। এ অবস্থায় বেশ গভীর রাতে তার জ্ঞান ফিরে আসলো। [আয়াতের অর্থ: সেদিন প্রবলভাবে আকাশ প্রকম্পিত হবে এবং পর্তমালা হবে চলমান। (৫২:৯-১০)]
৯৯. হযরত শা'বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু এক লোকের কণ্ঠে এই আয়াতখানা إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ শুনে কাঁদতে লাগলেন। ক্রমান্বয়ে ক্রন্দন বাড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে অস্থির হয়ে মাটিতে পড়ে যান। লোকজন তাঁকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলো। জবাব দিলেন, আমাকে ছেড়ে দাও! আমি প্রভুর পক্ষ থেকে সত্যের শপথ শুনতে পাচ্ছি। [আয়াতের অর্থ: আপনার পালনকর্তার শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। (৫২:৭)]
১০০. হযরত আবু খুরাইম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞেস করা হলো, এখানে কিছু লোক আছেন তারা তিলাওয়াত শোনে জোরেসুরে কাঁদেন (এটা কি ঠিক)? তিনি বললেন, জিকির ও তিলাওয়াতের সময় লোকজন সব সময়ই কেঁদে আসেন।