📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 মৃত্যুর দোরগোড়ায়

📄 মৃত্যুর দোরগোড়ায়


গত রাতে তারাবি সালাত চলাকালে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক মুসল্লি পড়ে যায়। তখন মাত্র পাঁচ কী ছয় রাকআত শেষ হয়েছে। তাৎক্ষণিক ঘোষণা করা হয়, জামাতে যদি কোনো ডাক্তার উপস্থিত থাকে সে যেন চলে আসে এবং তাকে চেকআপ করে। সে জ্ঞান হারায়নি এবং তাকে সুস্থই মনে হচ্ছিল। ডাক্তার তাকে নিয়ে গেলে আবার জামাত দাঁড়িয়ে যায়। পরবর্তীকালে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

কতই-না উত্তম মৃত্যু! সম্ভবত আল্লাহর কাছে তার দাঁড়ানো এতই প্রিয় ছিল যে, তিনি বান্দাকে ইবাদাতের সময়ে নিয়ে গেলেন! রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তাকে দিয়ে তিনি আমল করান।' সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কী রকম ইয়া রাসূলুল্লাহ?' তিনি বলেন, 'মৃত্যুর পূর্বে তাকে নেক আমলের তাওফীক দেন।' [৩০৭]

সত্যি বলতে রমাদানের শুরুতে চরম আগ্রহ থাকা, তারপর সেই আগ্রহে ভাটা পড়া—এটাই প্রমাণ করে, শেষ ভালো যার সব ভালো তার। ওপারের ডাক কোন মুহূর্তে আসবে—এই চিন্তা বহু দ্বীনদার বান্দার চোখের ঘুম কেড়ে নেয়। অজস্র অশ্রু ঝরায় তাদের এই ভাবনা:

'অন্তিম মুহূর্তে আমি কোন অবস্থায় থাকব?'
'মৃত্যুর ফেরেস্তাকে দেখার ভয় আমাকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেবে না তো?'
'আমার পাপের বোঝা যদি সেদিন শাহাদাত পাঠে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?'
'আমি কি মুসলিম অবস্থায় মরতে পারব?'

প্রথম তিন প্রজন্মের বিখ্যাত আলিম সুফইয়ান সাওরি। তিনি তখন মৃত্যুশয্যায়, অঝোরে কাঁদছেন। জিজ্ঞেস করা হলো, এই ক্রন্দন কি তার পাপের জন্য? তিনি মাটি থেকে একটি লাঠি ওপরের দিকে তুললেন এবং বললেন, 'বিশাল জমিন হতে এই লাঠি সরিয়ে নেওয়া জমিনের জন্য যতটা মামুলি বিষয়, আমার কাছে আমার পাপ এর চেয়েও তুচ্ছ (অর্থাৎ পরিমাণে অনেক কম)। বরং আমার ভয় হচ্ছে, মৃত্যুর সময় যদি আমার ঈমান তুলে নেওয়া হয়!' [৩০৮]

ইমাম শাফিয়ি-এর সাথেও অনুরূপ ঘটেছিল। তিনি যখন মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, তাঁর এক ছাত্র আল-মুযানি ঘরে প্রবেশ করে জানতে চায়, 'ইমাম, আপনি কেমন আছেন?' তিনি বলেন, 'বুঝতে পারছি যাত্রার অবসান ঘটতে যাচ্ছে, ভাইদের বিদায় দেবার সময় ঘনিয়ে এসেছে, এবং সময় চলে এসেছে রবের সাথে সাক্ষাতের। অথচ আমি জানি না, আমার রূহ কি জান্নাতে প্রবেশের দ্বারা আমার সম্মান বৃদ্ধি করবে, না জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে আফসোসের মধ্যে ফেলে দেবে!' [৩০৯]

এমনকি রাসূল-এর সাহাবি মুয়াজ ইবনু জাবাল-এর জীবনেও অনেকটা এরকম ঘটনা ঘটেছিল। তিনি তখন মৃত্যুর বিছানায়, উপস্থিত লোকেরা তাঁকে বলতে শুনল, 'বাহিরে দেখে আসো তো, এখনও সকাল হয়েছে কি না?' তারা বলল, রাত এখনও বাকি আছে। তিনি কিছুক্ষণ পর আবার একই প্রশ্ন করলেন। তারা তাঁকে আশ্বাস দিল সূর্য এখনও ওঠেনি। তৃতীয়বারের মতো যখন প্রশ্নটা করতে যাবেন এবার তিনি চিৎকার করে বললেন, 'আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই এমন রাত থেকে, যার সকাল হবে জাহান্নামে।' [৩১০]

জাহান্নামের ভয়ে সদা তটস্থ থাকতেন মুয়াজ। তাই আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে পানাহ চাইছিলেন। এই রাতেই যদি তার মৃত্যু হয়, তবে সকালবেলায় যেন তার রূহ জাহান্নামে না চলে যায়। তাই তিনি এই দুআ করছিলেন। দেখে মনে হচ্ছে যেন এই কথাগুলো এমন কেউ বলছেন, যাদের জীবনটা ছিল পাপে টইটম্বুর, বিভিন্ন প্রকার নেশায় এবং খেলতামাশায় কেটেছে। বাস্তবে এমন কিছুই না। এই মানুষগুলোর পুরো জীবনটাই ছিল ইবাদাত, শিক্ষাপ্রদান এবং তাওবার সমষ্টি। তবুও তারা উপলব্ধি করতে পারতেন, মৃত্যু এমন এক পরীক্ষার সময়, যখন জীবনের সকল আমল ভেস্তে যেতে পারে।

এমন ব্যক্তির ব্যাপারে কী বলবেন, যে ব্যক্তি দিনভর সিয়াম রাখল, তারপর সূর্য ডোবার আগ মুহূর্তে খুব অল্প পরিমাণ খেয়ে নিল? নিশ্চয়ই বলবেন, তার সিয়াম নষ্ট হয়ে গেছে! আচ্ছা, এমন ব্যক্তির ব্যাপারে কী মনে হয়, যিনি ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা সালাতে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু সালাম ফেরার আগে হঠাৎ মনে হলো তিনি ওযু অবস্থায় নেই? তার সালাত নষ্ট হয়ে গেছে। তদ্‌রূপ কেউ হয়তো বাহ্যিক ধার্মিকতায় এবং ইবাদাত পাবন্দির এক লম্বা জীবন কাটিয়েছে। কিন্তু দেখা গেল সব বিগড়ে গেছে অন্তিম মুহূর্তে এসে। তার সব আমল ধূলিকণায় পরিণত হয়েছে। কিংবা সে শেষ মুহূর্তে এসে আমল ছেড়ে দিল।

আসলে এ ব্যাপারে আমরা কেউই নিশ্চয়তা দিতে পারি না, আমাদের মৃত্যু কেমন হবে। হ্যাঁ, কিছু ইঙ্গিত তো অবশ্যই রয়েছে। ইমাম ইবনু কাসীর রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সুস্থতা এবং নিরাপদ থাকাকালে ইসলাম পালনে সচেষ্ট হও, যেন তুমি এর ওপরেই মৃত্যুবরণ করতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহ আল-কারীম, অত্যন্ত উদার। তিনি তাঁর অসীম উদারতা প্রদর্শনের ধারা চলমান রেখেছেন এবং তিনিই নির্ধারণ করেছেন, যে ব্যক্তি যেভাবে জীবন অতিবাহিত করবে, তার মৃত্যুও হবে সেভাবে। আর যে ব্যক্তি যে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে উত্থিতও ওই অবস্থায়।' [৩১১]

রমাদানের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করছি আমরা। এই বিদায়-বেলাই বলে দেবে সত্যিকারার্থে কে আল্লাহর দৃষ্টিতে দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিল। প্রতিজ্ঞা করুন, অটল থাকবেন শেষ পর্যন্ত। অটল থাকবেন রমাদানের শেষেও, থাকবেন জীবনকে বিদায় জানাবার দিনেও।

টিকাঃ
[৩০৭] তিরমিযি, ২২১৩
[৩০৮] সিয়ার, ১৩/২৯৭
[৩০৯] বায়হাকি, যুহদুল কাবীর, ৫৭৫
[৩১০] আহমাদ, আয-যুহদ, ১০১১
[৩১১] ইবনু কাসীর, ২/৭৫

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 প্রকৃত স্বস্তি তাঁরই সান্নিধ্যে

📄 প্রকৃত স্বস্তি তাঁরই সান্নিধ্যে


প্রকৃত স্বস্তি আর প্রশান্তি শুধু এক সত্তার সান্নিধ্যে মধ্যেই। এই অন্তর কখনোই ক্লান্ত হয় না তাঁর অবিরাম স্মরণে ও বিরতিহীন প্রশংসায়। বরং আত্মা-মনন সব একাগ্র হয়ে যায় তাঁকে পাবার আকাঙ্ক্ষায়। তাঁকে ডেকে চলার মধ্যে হৃদয়ে যে উষ্ণতা মেলে, এর কোনো তুলনা নেই। তাঁর রহমতের ভিখারির চোখ বেয়ে যে অশ্রু ঝরে পড়ে, এর নেই কোনো উপমা। তাঁর দরজায় অনবরত কড়া নাড়ার মাধ্যমে যে প্রশান্তি লাভ হয়, রাজা বাদশাহরা তা কল্পনাও করতে পারবে না।

তিনিই মাবুদ, সীমাহীন দয়াবান। তিনি অপরাজেয়, অসীম রাজত্বের অধিকারী, অসীম দানশীল। তিনিই মাবুদ, আর তাই দাসেরা তাঁকে মেনে চলে পরমানন্দে। তিনিই মাবুদ, তাঁর সাহায্য ছাড়া কোনোকিছুই করা যায় না। তিনি ব্যতীত সমগ্র সৃষ্টিকুলের কোনো পরিচয় নেই। প্রাণের স্পন্দন থেমে যাবে যদি তিনি একমুহূর্তের জন্যও আড়াল হয়ে যান। বস্তুত তাঁকে ছাড়া একমূহূর্তও বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

আমরা মানুষদের ভালোবাসি তাদের কাজের জন্য, যে গুণগুলো তারা অর্জন করেছে সেসবের জন্য। তথাপি কেবল সত্তাগত কারণে চূড়ান্ত ভালোবাসার অধিকার রাখে বাস্তবে এমন কেউ নেই; এমনকি নবি রসূলগণও নন। এই নিয়মের ব্যতিক্রম কেবল একজনই। আর তিনি হলেন আমাদের রব, আল্লাহ তাআলা।

ওপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার, কেন রসূল বলেছিলেন, কবিদের ভিতর সর্বাধিক সত্য কথা কবি লাবীদের কথা। যিনি বলেছেন, 'জেনে রেখো, আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই মিথ্যে'। [৩১২]

এমন গুণসম্পন্ন রবকে যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে, সে তো অন্যদের মতো নয়। তাই তোমার দিন-রাতের ঘণ্টাগুলো অন্যদের মতো হতে পারে না। তোমার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য মুহূর্তগুলো অন্যদের মতো হতে পারে না। অতএব লুটিয়ে পড়ো তাঁর সাজদায়। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ক্রন্দনে ভাসিয়ে দাও জমিন। সত্যনিষ্ঠ একজন মুসলিমের ছাঁচে নিজেকে গড়ে তোলো এবং প্রকৃত সুখের সন্ধানে লেগে যাও নতুন উদ্যমে।

টিকাঃ
[৩১২] বুখারি: ৬১৪৭; মুসলিম: ২২৫৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px