📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 নিশিরাতে আল্লাহর সাথে

📄 নিশিরাতে আল্লাহর সাথে


লেখাটা যখন লিখছি, তখন রমাদান মাস চলছে। চারিদিকে রমাদানের বরকতে শান্তি বিরাজমান। বরকতময় এই মাসের জন্য, এই শান্তিময় রাতের জন্যে আমরা অধীর অপেক্ষায় ছিলাম। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হতে চাচ্ছিল না। আলহামদু লিল্লাহ, আমরা আবারও রমাদানের মতো শ্রেষ্ঠ মাসটি পেলাম।

তবে আজকের এই রাত আমরা নবিদের সাথে কাটাব। আলোচনা করব নবিদের চলার পথ নিয়ে, যে পথে তাঁরা সকলে চলেছেন আপন গতিতে। শুধু তাঁরাই নয়, যুগে যুগে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক মুজাদ্দিদের[২৬১] পথ এটি। আজ আমরা শিখব অন্তর নরম করার হাতিয়ার, মৃতপ্রায় ঈমানকে তরতাজা করার উপায় এবং আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক গড়ার কার্যকরী কৌশল। এমন এক আমল আমরা শিখব, যা মুসলিমরা মনে আনন্দ নিয়ে করে। অন্তরের ভালোবাসা নিয়ে রমাদানের প্রথম রাত থেকেই করা শুরু করে। আবার অনেকেই একে অবহেলা করে তাচ্ছিল্যের সাথে। এমনকি রমাদানের শেষ রাত্রিগুলোতেও অবহেলায় একে বিনষ্ট করে। আমি আপনাকে সে বিষয়টা সম্পর্কে সচেতন করছি। মানবজাতিকে দেওয়া আল্লাহর সেই মহান পুরস্কারের কথা আমি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছি দুনিয়ার জান্নাতের কথা। হ্যাঁ, আমি কিয়ামুল লাইলের কথাই শোনাচ্ছি, যাকে আমরা তাহাজ্জুদ বলে থাকি।

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তোমরা অবশ্যই কিয়ামুল লাইল আদায় করবে। কারণ, তা তোমাদের পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস ছিল। তোমাদের রবের নৈকট্য লাভের মাধ্যম এটি। এ ছাড়া পাপ থেকে আত্মরক্ষার পথ এবং দেহের রোগব্যাধি দূরকারী।[২৬২]

রমাদানের প্রতি রাতে তারাবির সালাতে অংশগ্রহণের দ্বারা আমরা এই আমলটি করে থাকি। কিন্তু কিয়ামুল লাইল যে কতটা গুরুত্ব বহন করে, এটা বোঝার জন্য এই একটি বর্ণনাই যথেষ্ট। এটি কোনো সাধারণ আমল নয়। এটি স্রেফ রুকু-সাজদার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তেমনি শুধু রমাদানের জন্যই নির্দিষ্ট নয় এটি; বরং কিয়ামুল লাইল হলো :

১) 'পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস'
পূর্ববর্তী নেককারদের কথা যদি বলতে হয়, তা হলে সবার আগে আসবে আমাদের নবি মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম। তিনি ছিলেন নেককারদের ভিতর সর্বোত্তম, সবচেয়ে পবিত্র সৃষ্টি। সূরা মুজাম্মিল হলো নবিজির ওপর নাযিল হওয়া প্রথম দিকের সূরা। আলিমগণের ভাষ্যমতে সূরাটি নবিজির ওপর অবতীর্ণ হওয়া তৃতীয় কিংবা চতুর্থ সূরা। এই সূরায় আল্লাহ তাঁর নবিকে নির্দেশ দিয়েছেন: 'রাতের বেলা সালাতে দাঁড়াও, তবে কিছু সময় ছাড়া। অর্ধেক রাত কিংবা তার চেয়ে কিছু কম করো। অথবা তার ওপর কিছু বাড়িয়ে নাও। আর ধীরেসুস্থে স্পষ্টভাবে কুরআন তিলাওয়াত করো।'[২৬৩]
যেহেতু সূরা মুজাম্মিল প্রথম দিকের নাযিলকৃত সূরা, তার মানে নবিজিকে দেওয়া আল্লাহর প্রথম নির্দেশসমূহের একটি ছিল কিয়ামুল লাইল। কিয়ামাত-অবধি-আসা মানুষদের হিদায়াতের লক্ষ্যে যে গুরুদায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হবে, কিয়ামুল লাইল ছিল এর পূর্বপ্রস্তুতি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সালাতের বর্ণনা দেবার সময় বলেছেন: '(হে নবি) তোমার রব জানেন যে, তুমি কোনো সময় রাতের প্রায় দুই- তৃতীয়াংশ, কোনো সময় অর্ধাংশ এবং কোনো সময় এক-তৃতীয়াংশ সময় ইবাদাতে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দাও। তোমার সঙ্গী একদল লোকও এ কাজ করে।' [২৬৪]
এই আয়াত নাযিল হয় নুবুওয়তী জীবনের শুরুর দিকে। তখন তিন কী চারটি সূরা নাযিল হয়েছিল মাত্র। অপরদিকে আল্লাহ তাআলা নবিজিকে বললেন, রাতের দুই তৃতীয়াংশের কিছু কম, কিংবা অর্ধরাত সালাতে দাঁড়িয়ে কাটাতেন! অথচ তাকে দেওয়া হয়েছে এই গুটিকয়েক সূরা। তা হলে রাতের এতটা সময় দাঁড়িয়ে তিনি কী করতেন? তিনি কি একই সূরা পুনরাবৃত্তি করে কাটাতেন? না দুআ-যিকর? উত্তর না জানা থাকলেও এটি আমরা সবাই জানি, নুবুওয়াতের সূচনা থেকে জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত নবিজি কিয়ামুল লাইল আদায় করেছেন। সত্যিই কিয়ামুল লাইল ছিল 'তোমাদের পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস।'
আবুয যিনাদ বলেন, 'রাতের শেষ প্রহরে আমি মাসজিদে নববির উদ্দেশে বের হলে প্রতিবার সেখানে কুরআন তিলাওয়াতকারীদের শব্দ পেতাম।' তিনি আরও বলেন, 'ছোটোবেলায় যখন কোনো দরকারে সাক্ষাতের প্রয়োজন হতো, আমরা বলতাম: কারীদের কিয়ামের সময় বের হব।' [২৬৫]
তাউস বলেন, 'আমি রাতের শেষ প্রহরে কাউকে ঘুমোতে দেখিনি।[২৬৬]
ঘটনাটি একবার উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি: একবার এক তলিবুল ইলম ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ-এর বাড়িতে আসে এবং রাত্রিযাপন করে। রাত্রিকালে ইমাম আহমাদ তার কক্ষে এক বালতি পানি রেখে যান, তাহাজ্জুতের সময় সে যেন ওজু করতে পারে এই আশায়। কিন্তু ফজরের সময় ইমাম আহমাদ তাঁর কক্ষে গিয়ে দেখেন, বালতির পানি আগের মতোই আছে। এ দেখে তিনি বলেন, 'সুবহানাল্লাহ! একজন ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ করে, অথচ কিয়ামুল লাইল আদায় করে না!' [২৬৭]
সুবহানাল্লাহ! বিষয়টি সত্যিই আশ্চর্যের। এটা কেবল তলিবুল ইলমের ক্ষেত্রেই নয়, মাসজিদ কমিটির মেম্বার, শিক্ষাখাতে নিযুক্ত ব্যক্তি, দাঈ, কুরআনের শিক্ষার্থী কিংবা আদর্শ সন্তান গঠনে দৃঢ় প্রত্যয়ী মা-বাবা যখন রাতের সালাত আদায় করে না, তখন বড্ড কষ্ট হয়। আমি আরও আশ্চর্য তাদের কথা চিন্তা করে যারা জানে কবরের আযাবের কথা, হাশরের মাঠে পঞ্চাশ হাজার বছর দাঁড়িয়ে থাকার কথাও যারা জানে কিন্তু কিয়ামুল লাইল আদায় করে না।

২) কিয়ামুল লাইল: 'তোমাদের রবের নৈকট্য লাভের মাধ্যম।'
আপনি কি জানতে চান, কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায়? আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে সহজ রাস্তা কোনটা? উত্তরটি পেতে রাতের সালাতে দাঁড়িয়ে যান। নিশ্চিত পেয়ে যাবেন। সম্ভবত এজন্যই ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপনকারীদের আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তারা যেন এই আমল দ্বারা তাঁর প্রশংসা করে। কারণ, এটা আল্লাহর নিকট খুবই মূল্যবান। আর তাদের পুরস্কার? সত্যি বলতে, বিষয়টি আমাদের কল্পনার বাইরে। আল্লাহ বলেন, 'তারা শয্যা ত্যাগ করে, তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশা নিয়ে, এবং তাদেরকে যে রিযক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।[২৬৮]
বিনিময়ে তারা কী পাবে? এর পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'অতঃপর কোনো ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ-জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত তার বিনিময়-স্বরূপ।[২৬৯]
পুরস্কার কী হবে কেন স্পষ্ট করে বলা হলো না? ইমাম ইবনুল কাইয়িম একটি সুন্দর নসিহত দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'গভীরভাবে ভেবে দেখুন, তারা যেমন তাদের রাতের সালাত গোপন রাখত, তেমনি তাদের পুরস্কারও গোপন রাখা হয়েছে, কেউ জানে না।'[২৭০]
তার মানে এই নয় যে, কিয়ামুল লাইলের সবগুলো পুরস্কারই আল্লাহ গোপন রেখেছেন। রাসূল বলেন, 'জান্নাতে একটি প্রাসাদ রয়েছে যার ভিতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভিতর দেখা যাবে।' তখন জনৈক বেদুইন বলল, হে আল্লাহর রাসূল, এটি কার হবে? তিনি বললেন, এটি হবে তার, যে ভালোকথা বলে, অন্যদের আহার করায়, সিয়াম অব্যাহত রাখে এবং রাতে যখন সব মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন উঠে সালাত আদায় করে।'[২৭১]
রাসূল আরও বলেন, 'তিন শ্রেণীর ব্যক্তিকে আল্লাহ ভালোবাসেন, তাদের দেখে হাসেন এবং খুশি হন।... (তিন শ্রেণীর এক শ্রেণী হলো) সেই ব্যক্তি, যার সুন্দরী স্ত্রী এবং নরম বিছানা আছে, কিন্তু সে রাতে সালাতে দাঁড়ায়। আর তাই আল্লাহ বলেন, “সে তার প্রবৃত্তি চাহিদাকে ত্যাগ করেছে এবং আমাকে স্মরণ করেছে। আর সে যদি চাইত, ঘুমিয়ে থাকতে পারত।”[২৭২]
প্রশ্ন আসতে পারে, 'আল্লাহ আমাকে দেখে হাসেন! এর অর্থ কী?' রাসূল বলেন, 'আর তোমার রব যখন কোনো বান্দাকে দুনিয়াতে দেখে হাসেন, (কিয়ামাতের দিন) তার কোনো হিসাব-নিকাশ নেই।' (অর্থাৎ বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে) [২৭৩]

৩) কিয়ামুল লাইল : 'পাপের কাফফারা, পাপ থেকে আত্মরক্ষার পথ।'
কী হতে কী হয়ে গেল বুঝে উঠতে পারেননি। এখন কৃত-পাপ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে আপনাকে। রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। কোনো কাজে শান্তি পাচ্ছেন না। কবরের আযাব, আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর ভয় আপনার মনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। ইউটিউব ঘাটছেন, ফেসবুকের বিভিন্ন পেইজ ঘুড়ছেন, তবুও মনকে শান্ত করতে পারছেন না। দংশন করেই চলেছে। যদি এমন কিছু হয়ে থাকে তা হলে উঠে পড়ুন। কিয়ামুল লাইলকে আঁকড়ে ধরুন, এটাই আপনার চিকিৎসা। কিয়ামুল লাইল পাপের আযাব থেকে নিষ্কৃতি দেয়, আল্লাহর নূর দ্বারা অন্তর পরিপূর্ণ করে দেয়। শুধু তাই নয়, তাওবার পর সেই পাপগুলো পুনরায় সংগঠিত হওয়া ঠেকাতে কিয়ামুল লাইল ঢালের মতো কাজ করে। কিয়ামুল লাইলের সবচেয়ে বিস্ময়কর বাস্তবতা এটাই-এই সালাত শুধু অতীতের পাপই মিটে দেয় না, সাথে আগামীর সম্ভাব্য পাপ অনুপ্রবেশের ছিদ্রগুলোও বন্ধ করে দেয়। ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এজন্যই হয়তো নবিজি কিয়ামুল লাইলকে বলেছেন, 'মুমিনের সম্মান'। পাপ লাঞ্ছনা বয়ে আনে। পাপে জড়িয়ে যাবার পর অন্তরে অপরাধবোধ কাজ করে, নিজের প্রতি ঘৃণা জাগ্রত হয়। আর এ থেকে নিষ্কৃতির পথ কিয়ামুল লাইল। পাপের শৃঙ্খল ভেঙে কিয়ামুল লাইল এনে দেয় স্বাধীনতা, মৃত অন্তরকে করে জাগ্রত, বিইজনিল্লাহ।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আমার কাছে জিবরীল এসে বলল, “মুহাম্মাদ, যতদিন ইচ্ছা বাঁচো, (তবে জেনে রেখো) মৃত্যু তোমার কাছেও আসবে। যাকে ইচ্ছা ভালোবাসো, একদিন তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটবে। যা ইচ্ছা আমল করো, এর প্রতিদান তুমি পাবে। জেনে রাখো, কিয়ামুল লাইল মুমিনের সম্মান। আর ইজ্জত হলো মানুষের থেকে অমুখাপেক্ষী হওয়া।” [২৭৪]
দেখবেন, সাধারণত যারা সালাত ছেড়ে দেয়, তারাই পাপের জগতে হাবুডুবু খাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তারপর এদের পর এমন অপদার্থ লোকেরা এদের স্থলাভিষিক্ত হলো, যারা সালাত নষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব করল। শীঘ্রই তারা এই গোমরাহীর (মন্দ) পরিণামের মুখোমুখি হবে।'[২৭৫] আপনার অতীত কিংবা বর্তমানকে এই মূলনীতির আলোকে যাচাই করুন। আপনি স্পষ্ট দেখতে পাবেন-জীবনের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তগুলোতে সালাতের ব্যাপারে অমনোযোগী ছিলেন। কিয়ামুল লাইল বা রাতের সালাত হচ্ছে মুমিনের সম্মান। এমন এক সম্মান, যা আল্লাহ তাআলা লোকসমাজে প্রকাশ করে দেন। যদিও-বা সেই মুমিন তা গোপন রাখার চেষ্টা করে।
আতা' খুরাসানি বলেন, 'কিয়ামুল লাইল হলো শরীরের জন্য জীবন, কলবের জন্য নূর, দৃষ্টির জন্য আলো, আর অঙ্গ-প্রতঙ্গের জন্য শক্তি। ব্যক্তি যখন রাতের সালাত আদায় করে, পরের দিন এমন আনন্দ নিয়ে জাগ্রত হয়, যা সে অন্তর থেকে অনুভব করতে পারে।' [২৭৬]
তাবিয়ি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, 'যে ব্যক্তি কিয়ামুল লাইল আদায় করে, আল্লাহ তার চেহারায় নূর উদ্ভাসিত করে দেন। তাকে মুসলিমরা ভালোবাসে, যদিও-বা তাকে প্রথম দেখে। বলে, "সত্যিই লোকটাকে আমার খুব ভালো লাগে।” [২৭৭]
ইমাম ওয়াকি' ইবনু জাররাহ রহিমাহুল্লাহ-কে যারাই দেখেছে, একবাক্যে বলেছে— 'এ তো মানুষ নয়, যেন ফেরেশতা!' আর ওয়াকি' ইবনু জাররাহ তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। তেমনিভাবে যারা তাবিয়ি মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন রহিমাহুল্লাহ-কে দেখেছে, তার উজ্জ্বলতায় মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে, 'সুবহানাল্লাহ!' কারণ, তিনিও তাহাজ্জুদ আদায় করতেন।
এর চেয়েও অবাক-করার মতো কথা ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, 'কিছু নারীরা অত্যধিক পরিমাণে রাতের সালাত আদায় করত। তাদেরকে এর কারণ জানতে চাওয়া হলে তারা বলে, "কিয়ামুল লাইল চেহারার মাধুর্য বৃদ্ধি করে। তাই আমি পছন্দ করি, এই সালাত দ্বারা আমার চেহারার রূপ লাবণ্য বেড়ে যাক।” [২৭৮]

আমি নিশ্চিত, ওপরের বর্ণনাটি পড়ে অনেকে হয়তো আজ রাত থেকেই তাহাজ্জুদ শুরু করে দেবেন। হ্যাঁ, এগুলো প্রতিদান। তবে এর চূড়ান্ত প্রতিদান কিয়ামাতের দিনেই প্রকাশ পাবে। এর আগে আসুন, আজকের রাতের প্রস্তুতি নিয়ে কিছু কথা বলি:
কিয়ামুল লাইলে কী পরিমাণ আয়াত আমার পড়া উচিত? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি রাতের সালাতে দশটি আয়াত পড়বে, তার (নাম) গাফেলদের তালিকায় উঠবে না। যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে এক শ আয়াত পড়বে, তার (নাম) অনুগতদের তালিকায় উঠবে। আর যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে এক হাজার আয়াত পড়বে, তার নাম উঠবে মুকান্তিরীন ('কিন্তার' সংগ্রহকারীদের) তালিকায়।[২৭৯]
কিন্তার শব্দের অর্থ: “প্রচুর স্বর্ণ। অধিকাংশ ভাষাবিদদের মতে চার হাজার দিনারের সমান। [...] অন্যদের মতে অসীম ধন-সম্পদকে কিন্তার বলা হয়।[২৮০]
তথাপি কিন্তার দ্বারা আসলে নবিজি কী বুঝিয়েছেন, এর ব্যাখ্যা আরেক হাদীসে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, 'এক কিন্তার দুনিয়া এবং এতে যা কিছু আছে—এসব থেকে উত্তম।[২৮১]
এদিকে সহীহ বুখারির বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার ইমাম ইবনু হাজার একটি চমৎকার তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'সূরা মুলক (৬৭ নং সূরা) থেকে কুরআনের শেষ সূরা পর্যন্ত ১০০০ আয়াত রয়েছে।[২৮২]

- কিন্তু আমার যদি এই পরিমাণ আয়াত মুখস্থ না থাকে? আল্লাহ বলেন, '..অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকু পড়ো...।[২৮৩]
কোনো-এক ভোরে ইবনু উমর আবূ গালিব রহিমাহুল্লাহ-কে বলেন, 'আবূ গালিব, তুমি কি রাতের সালাতে দাঁড়াবে না? অন্তত এক তৃতীয়াংশ কুরআন পড়ো।' আবূ গালিব উত্তরে বলেন, 'এখন তো প্রায় ভোর হয়ে গেছে, কীভাবে সম্ভব?' ইবনু উমর বলেন, 'সূরা ইখলাস-ই কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান।[২৮৪]

- এলার্ম দিয়ে রেখেও যদি উঠতে না পারি? দুশ্চিন্তার কিছু নেই, আল্লাহ আপনাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন না। রাসূল বলেন, 'যে ব্যক্তি রাতের সালাত আদায় করার নিয়ত করে বিছানায় যাবে, অতঃপর সকাল পর্যন্ত ঘুম তাকে কাবু করে ফেললেও নিয়ত অনুযায়ী সে পূর্ণ পুরস্কার পাবে। তখন তার ঘুম হবে মহামহিম রবের পক্ষ থেকে তার জন্য সদাকা-স্বরূপ।' [২৮৫]

- এরপরেও যদি কিয়ামুল লাইলের মিষ্টতা চেখে দেখতে ব্যর্থ হই? নিশিরাতে প্রিয় রবের সাথে গোপন আলাপনের যে সুখ, তা কবিদের কলমেও অবর্ণনীয়। এই আলাপের জন্য প্রতিটি প্রহর গুনতে থাকে রাতের আবিদরা। আল্লাহর সাথে গোপন আলাপ এবং তাঁর সামনে দুআয় হারিয়ে যাবার উৎকণ্ঠা তাদেরকে অস্থির করে রাখে সারাবেলা।
ইমাম আবূ সুলাইমান দারানি বলেন, 'রাতের আবিদরা যে মিষ্টতা রাতে অনুভব করে, তা খেলতামাশায় রত ব্যক্তিদের চেয়েও মিষ্টি। আর রাত বলে যদি কিছু না থাকত, তা হলে আমার বেঁচে থাকাই বৃথা হয়ে যেত। [২৮৬]
আসলে কিয়ামুল লাইলের গুরুত্ব, ব্যাখ্যা, মধুরতা-কোনোটাই ভাষায় প্রকাশ করার মতো না, যতক্ষণ না ব্যক্তি নিজে চেখে দেখছে। ইমাম ইবনু রজব বলেছেন, 'যারা মুনাজাতের স্বাদ পাওয়া ব্যক্তিদের কাতারে নিজেদের শামিল করেনি, তাদের গোপন মুনাজাতের মিষ্টতা দেখেনি, তারা কখনোই বুঝবে না, কোন জিনিসের কারণে মুনাজাতকারীরা কাঁদে। যে ব্যক্তি ইউসুফের সৌন্দর্য দেখেনি, ইয়াকূবের অন্তরের যন্ত্রণা সে কী করে বুঝবে।।[২৮৭]

'কিন্তু আমি তাহাজ্জুদের স্বাদ পাই না কেন?' আপনার মনে হয়তো এই প্রশ্নটি কাজ করছে। আসলে এই রূহানি স্বাদ উপভোগ করতে সময় প্রয়োজন, প্রয়োজন লেগে থাকা। নফস প্রথম প্রথম অনুযোগ করবে, ঘ্যানঘ্যান করবে, বিশ্রামকে প্রাধান্য দেবে, ঘুমানোর বায়না ধরবে, বলবে সময় নেই। অতঃপর যখন নফস অনুধাবন করতে পারবে, আপনি আল্লাহকে পেতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, পরকালের আবাস নির্মাণে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে আছেন, তখন সে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। না করে যে উপায় নেই তার।
তাবিয়ি ইমাম ছাবিত বুনানি বলেন, 'বিশ বছর যাবৎ আমি কিয়ামুল লাইলে সময় ব্যয় করেছি। বিশতম বছরে এসে এর স্বাদ অনুভব করতে পেরেছি।' [২৮৮]

সুসংবাদ তাদের জন্য, যারা নিজেদের কবরগুলো আলোকিত করে এতে নামার পূর্বেই, তাদের রবকে সন্তুষ্ট করে রবের সাথে সাক্ষাতের পূর্বেই, এবং যারা সালাত আদায় করে তাদের ওপর জানাযার সালাত অনুষ্ঠিত হবার আগেই।

টিকাঃ
[২৬১] সমাজ সংস্কারক
[২৬২] তিরমিযি, ৩৫৪৯; হাসান
[২৬৩] সূরা মুজাম্মিল, ৭৩: ২-৪
[২৬৪] সূরা মুজাম্মিল, ৭৩: ২০
[২৬৫] মারুযি, মুখতাসার কিয়ামিল লাইল, ১/৯৮
[২৬৬] আবু নাঈম, হিলতিয়াতুল আওলিয়া, ৪/৫
[২৬৭] মানাকিবু ইমাম আহমাদ, ২৭৩
[২৬৮] সূরা সাজদাহ, ৩২: ১৬
[২৬৯] সূরা সাজদাহ, ৩২: ১৭
[২৭০] ইবনুল কাইয়িম, হাদিল আরওয়াহ, ২৭৮
[২৭১] তিরমিযি, ২৭১৮
[২৭২] মুসতাদরাক হাকীম, ৬৮; সহীহ
[২৭৩] সহীহ আত-তারগীব, ১৩৭১
[২৭৪] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪৬৩/৫
[২৭৫] সূরা মারইয়াম, ১৯ : ৫৯
[২৭৬] ইবনু আবিদ দুনইয়া, আত-তাহাজ্জুদ ওয়া কিয়ামুল লাইল, ১৭
[২৭৭] আবদুল হক, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, ১০৫৪
[২৭৮] রওদাতুল মুহিব্বীন, ২২১
[২৭৯] আবূ দাউদ, ১৩৯৮; সহীহ
[২৮০] ইবনুল আসীর, আন-নিহায়া ফি গারীবিল-হাদীস, ৪/১১৩
[২৮১] সহীহ আত-তারগীব, ৬৩৮
[২৮২] তারগীব, ১/২৪৮
[২৮৩] সূরা মুজাম্মিল, ৭৩: ২০
[২৮৪] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ১/৩০৪
[২৮৫] নাসাঈ, ১৭৮৭
[২৮৬] আদ-দীনূরি, আল-মুজালাসা ওয়া জাওাহিরুল-ইলম, ১/৪৭৩
[২৮৭] লাতাইফুল মাআরিফ, ৪৫
[২৮৮] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ২/৩২০

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 মুমিনের জীবনে অবসর

📄 মুমিনের জীবনে অবসর


সূরাটি কুরআনের ছোটো সূরাগুলোর একটি। এতই ছোটো যে তাড়াহুড়োর মুহূর্তে কিংবা যখন দ্রুত সালাত শেষ করার তাগিদ থাকে, তখন অনেকে এই সূরা বেছে নেয়। তবে ছোটো হলেও এতে এমন অমূল্য গুপ্তধন আছে, যা শুধু আমাদের দুনিয়ার জীবনকেই নয়, বরং আখিরাতের জীবনও পাল্টে দিতে সক্ষম। সূরা আশ-শারহ-এর কথা বলছি। কুরআনের ৯৪ তম সূরা এটি। হাতের নাগালে কুরআনের কপি থাকলে এর আয়াতগুলোতে একটু নজর বুলিয়ে দেখুন। বিশেষ করে এই আয়াতটি :

فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ

'অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনি ইবাদাতে রত হও।' [২৮৯]

এই আয়াত নাযিল হওয়ার পেছনে একটি গল্প আছে। গল্পটি না জানা ব্যতীত এর আসল মর্ম উদ্ধার করা যাবে না। খেয়াল করে দেখুন, বাক্যটি শুরু হয়েছে 'ফা' অব্যয় দিয়ে। ব্যাকরণের ভাষায় বলে فاء التفريع অর্থাৎ 'শাখা বিন্যাসকরণ ফা'। মানে, এই 'ফা' আসে পূর্বের কোনোকিছুকে বিন্যস্ত করতে। অতএব সবার আগে আমাদের প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।

সূরা আশ-শারহ যখন নাযিল হয়, খুব কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি তখন মক্কায়। নির্যাতন নিপীড়ন, প্রিয়জনদের হারানো বেদনা-সব মিলিয়ে তাঁর অন্তরে কালোমেঘ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। দুঃখে তিনি কাতর। তখন আট-আয়াত-বিশিষ্ট অসাধারণ এই সূরার মাধ্যমে আল্লাহ নবিজিকে স্মরণ করিয়ে দিলেন তাঁর অসীম দয়ার কথা। বাতলে দিলেন অন্তরের ব্যথা নিরাময়ে করণীয় দিক-নির্দেশনা। ছড়িয়ে দিলেন ভারাক্রান্ত মনে আনন্দের দীপ্তি এবং প্রশান্তির পরশ।

১) আমি কি তোমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিইনি?
২) এবং তোমার বোঝা নামিয়ে দিইনি?
৩) যে বোঝা ভেঙে দিচ্ছিল তোমার পিঠকে?

এই সূরায় রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে প্রদত্ত তিনটি নিয়ামাত আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন : ১) তার বক্ষ প্রশস্ত করে দেওয়া; ২) তার বোঝা নামিয়ে দেওয়া; এবং ৩) তার সম্মান বৃদ্ধি করে দেওয়া।

সামনে এগোবার পূর্বে একটি মূলনীতি আমাদের স্মরণ রাখতে হবে : আলিমগণ বলেন, মহামহিম আল্লাহ তাঁর নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে যা দিয়েছেন, তার অনুসারীগণও এর অংশ পাবে। আর তা হবে, কে কত ভালোভাবে তাঁকে অনুসরণ করেছে তার ভিত্তিতে। [২৯০]

কাজেই বক্ষ প্রশস্ত হওয়া, পাপের বোঝা নামিয়ে দেওয়া, এবং সম্মান বৃদ্ধি পাওয়া—নিয়ামাতগুলো প্রত্যেক মুসলিমই অর্জনে সক্ষম। তবে এটা নির্ভর করছে নবিজির সুন্নাহকে আমরা কতটা আপন করে নিতে পারলাম, তার ওপর।

অতএব তারাই সর্বাধিক সুখী, পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত এবং সম্মানিত, যারা সুন্নাতের পাবন্দিতে অগ্রগামী; যারা এগিয়ে থাকে ইলম, আমল, দাওয়াহ-সব ময়দানে। তো এই সূরা তিন অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে নবির প্রতি মহান আল্লাহর তিনটি করুণা প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় অংশে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে: দুঃখের সাথেই সুখ রয়েছে। সবশেষে তৃতীয় অংশে নবিজিকে একটি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। যে দয়াময় আল্লাহ আপনার প্রতি এই করুণা করলেন, তাঁর শোকর আদায় করুন। আল্লাহ বলেন, 'কাজেই যখন তুমি অবসর পাবে, তখনই (আল্লাহর ইবাদাতে) সচেষ্ট হবে। আর তোমার রবের প্রতি গভীর মনযোগী হবে।'

এখানে কোন কাজ থেকে অবসর পাবার কথা বলা হচ্ছে? ইবনু মাসউদ বলেন, এর মানে হলো : যখন তুমি ফরজ ইবাদাত সমাপ্ত করবে, তখন নিজেকে রাতের সালাতে নিমগ্ন করবে। [২৯১] কেউ বলেছে: 'সালাত শেষে দুআয় মনোনিবেশ করো।' যেমন: তাশাহহুদ এবং দরুদ শেষে সালাম ফেরানোর আগে দুআ, যাকে আমরা দুআ মাসুরা বলি। ইবনু আব্বাস, দাহহাক, মুকাতিল-সহ আরও অনেকেই এই মত ব্যক্ত করেছেন। [২৯২]

হাসান এবং কাতাদা বলেছেন, 'এর অর্থ হলো, শত্রুদের সাথে যুদ্ধ শেষ হলে ইবাদাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ো।' [২৯৩]

আবার কেউ বলেছে, 'তোমার দুনিয়াবি কাজ শেষে আল্লাহর কাজে নিমগ্ন হও।' মুজাহিদ এই মত দিয়েছেন, [২৯৪] এ ছাড়া ইবনু কাসীর [২৯৫] এবং ইবনু তাইমিয়্যা-ও মতটি পছন্দ করেছেন। [২৯৬]

সবগুলো মতই মোটের ওপর কাছাকাছি অর্থ প্রকাশ করছে। একটি আরেকটির সাথে সাঙ্ঘর্ষিক নয়। ইবনু জারীর তাবারি বলেছেন, সবগুলো অর্থই এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। এ থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো, মুমিন-মাত্রই সর্বদা ব্যস্ত। একটুও বেহুদা নষ্ট করার সুযোগ নেই তার। প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকে সে, হয় দুনিয়ার প্রয়োজন পূরণে, নয়তো আখিরাতের পুঁজি সংগ্রহে। এই মূলনীতি মেনে চললে 'অবসর সময়'-কেন্দ্রিক নানান সমস্যার জোট খুলে যাবে নিমিষেই।

বর্ণিত আছে, ইবনু আব্বাস একদিন দুই ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোক দুটো কুস্তি লড়ছিল। তাদের দেখে তিনি বলেন, 'অবসর সময়ে আমাদের এসব করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।' [২৯৭]

অপরদিকে উমর ইবনুল খাত্তাব বলেন, 'তোমাদের মধ্যে আমি এমন ব্যক্তিকে অপছন্দ করি, অবসর সময়ে যে দুনিয়ার জন্য কিছু করে না, দ্বীনের জন্যও কিছু করে না।' [২৯৮]

ঠিক এই কারণেই প্রথম দিকের অর্থাৎ সোনালি যুগের মুসলিমদের মধ্যে অবসর সময় নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না। তারা কখনোই ছুটির আবেদন করেনি, নেক আমল এবং আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া থেকে অবসর গ্রহণ করেনি। আসলে যৌবনকালে কিংবা ব্যাচেলর থাকাবস্থায় মানুষ আমল ইবাদাত, দাওয়াহ, ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা, বিভিন্ন পরিকল্পনা করা ইত্যাদি কাজের প্রতি অনেক সক্রিয় ভূমিকা রাখবে—এগুলো স্বাভাবিক। এতে আলাদা কোনো কৃতিত্ব নেই। কিন্তু যখন কর্মজীবনে পা রাখে, বিয়ে করে কিংবা বার্ধক্যে উপনিত হয়, তাদের কর্মোদ্যমেও ভাটা পড়তে শুরু করে। এ-সকল ব্যস্ততার অজুহাতে কি নেক আমল থেকে নিস্তার মিলতে পারে?

'অতএব যখন তুমি অবসর পাবে, তখনই (আল্লাহর ইবাদাতে) সচেষ্ট হবে।'

জব-সেক্টর নিয়ে চিন্তা করুন, কর্মজীবনে মানুষ কতটা কর্মমুখর থাকে? একজন ডেন্টিস্টের কথাই ধরা যাক, তিনি রোগীর-পর-রোগী দেখেই চলেন। দিনে আট ঘণ্টা, কখনও-বা নয় ঘণ্টা ডিউটি। এভাবে সে বছরের-পর-বছর কাটিয়ে দেয়। তাকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন, 'এই জীবনে আপনি কতজন রোগী দেখার নিয়ত করেছেন? কয়টা দাঁত দেখবেন?' সে আপনাকে কোনো উত্তর দিতে পারবে না, কেননা তার চিন্তাজগতে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। কেউই এভাবে নির্ধারণ করে রাখে না।

কিংবা একজন রাজমিস্ত্রির কথা ধরুন, বছরকে-বছর সেও নানান প্রজেক্টে কাজ করে চলে। তাকে জিজ্ঞেস করুন, 'এই জীবনে আপনি আর কয়টা ইট বসাবেন?' সে আপনাকে উত্তর দিতে পারবে না, কেননা সে এক প্রজেক্ট শেষ হলে আরেক প্রজেক্ট—এভাবে কাজ করেই যাবে, নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। তার কাজ করা দিয়ে কথা।

একজন পাইলটের কর্মজীবন নিয়ে চিন্তা করুন, তার জীবনটা হয় ভ্রমণের। আমাদের মধ্য থেকে গড়ে খুব কম মানুষই সপ্তাহে এত দীর্ঘ পথ যাত্রা করে যা তাকে প্রতিদিন করতে হয়। তার গোটা জীবনই এমন অবসাদপূর্ণ ভ্রমণে নিবেদিত। কেননা এর সাথে রুজি সম্পৃক্ত। তাই কষ্ট হলেও করতে হয়। এখন তাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, 'আর কত মাইল আপনি ভ্রমণ করবেন?' সেও কিন্তু আপনাকে উত্তর দিতে পারবে না। তার মস্তিষ্কে এমন নির্দিষ্ট কোনো মাইল নেই।

সবশেষে আমি আপনাকে প্রশ্ন করব: ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ায়, ৬০ কি ৭০ বছর আমরা বাঁচব; এই ক্ষুদ্র সময়জুড়ে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, ভালো থাকার তাগিদে এই যদি আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের নমুনা হয়, তা হলে সেই জীবনের জন্য কতটুকু পরিশ্রম করা প্রয়োজন, যে জীবনে মৃত্যু বলে কিছু নেই? যে ছুটির অজুহাত দিয়ে নেক আমল থেকে দূরে থাকে, কিংবা দাওয়াহ প্রদান থেকে অবসরের প্রহর গুনছে, সে আসলে জান্নাতের রাস্তা চিনতে ভুল করেছে; অথবা আমাদের সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে।

দীর্ঘদিনের দুআ, আত্মত্যাগ, অশ্রু বিসর্জন, নির্ঘুম রাত এবং ভয়-শঙ্কা শেষে আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দাওয়াহ যখন সমগ্র আরব উপদ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল, তখন মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ করতে শুরু করল। মক্কা-বিজয়ের সেই আনন্দমুখর দিনে আল্লাহ তাআলা একটি সূরা নাযিল করেছেন। বলুন তো, সেদিন আল্লাহ কী উপদেশ দিয়ে সূরা নাযিল করেছেন? হয়তো ভাবছেন, সূরাটিতে অবসরের বার্তা দেওয়া হয়েছে। না, অবসর-সংক্রান্ত ছিল না। আসুন সূরাটি পড়ি :

إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ ۞ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا ۞ فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا

'যখন আল্লাহর সাহায্য এসে যায় এবং বিজয় লাভ হয়। আর (হে নবি,) তুমি যদি দেখো যে লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ করছে, তখন তুমি তোমার রবের হামদ-সহকারে তাঁর তাসবীহ পড়ো এবং তাঁর কাছে মাগফিরাত চাও। অবশ্য তিনি বড়োই তাওবা কবুলকারী।' [২৯৯]

অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলাফল উপভোগের দিন আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবিকে এই আয়াতগুলো উপহার দিলেন। সেদিন নবিজির স্থানে যদি আমরা হতাম, তা হলে অতীতের কথা ভেবে হয়তো দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না। কত পরিশ্রমই-না করেছেন আমাদের নবি!

তথাপি মহান আল্লাহ বলেছেন, তোমার মিশন সমাপ্ত হয়েছে, এবার আল্লাহর স্মরণ করো। 'অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই ইবাদাতে রত হও।' [৩০০]

যুগে যুগে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য নবি-রাসূল পাঠিয়েছেন কিতাব এবং মুজিযা দিয়ে। সৃষ্টি করেছেন জান্নাত, যার চারিদিকে শুধু বাগান আর বাগান। আরও আছে জাহান্নাম, যা চিরস্থায়ী আজাবের বাসস্থান। একজন মুসলিম অবশ্যই বিশ্বাস করে যে, এসব আল্লাহ তাআলা ক্রীড়াকৌতুক-রূপে করেননি। কেবল দুনিয়ার জন্য করেননি। আর যে মুসলিম এই বিশ্বাসে দৃঢ় সচেতন, তার পুরো জীবনটাই হয় আমলের সমারোহ। এক আমল থেকে আরেক আমলে ব্যস্ত থাকে সে। এমনকি সে যদি সাময়িক সময়ের জন্য বিনোদনে ধাবিত হয়, তবুও সেটা হয় জান্নাতের পথ চলার আগ্রহ-উদ্দীপনা রিচার্জ করার জন্যেই। আল্লাহ বলেন,

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

'বলো, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মরণ বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।' [৩০১]

আসলে নেক আমল করার সুবর্ণ সুযোগ বছরের প্রতি মাসে, প্রতিদিনই থাকে। এই সুযোগ শুধু রমাদানে নয়, বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলে নয়। বরং জীবনের প্রতিটি মিনিট আমলের সুবর্ণ সুযোগ। আর আল্লাহ আমাদের কাছে এটাই চান, যেন আমরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করি। এর জীবন্ত উদাহরণ আয়াতটিতে রয়েছে, 'অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনি ইবাদাতে রত হও।' [৩০২]

দেখুন, কীভাবে দ্বীন ইসলামকে আমাদের রব সাজিয়ে দিয়েছেন :

আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য চারটি মাস নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যেগুলোকে বলা হয় 'হারাম তথা পবিত্র মাস'। অন্য যে-কোনো সময়ের চেয়ে এই সম্মানিত মাসগুলোতে আমলের প্রতি অধিক উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মাসগুলো ধারাবাহিকভাবে: রজব মাস দিয়ে প্রথম হারাম মাস শুরু হয়। এরপর আসে অন্যান্য মাস। আসে শাবান মাস, এই মাসের অধিকাংশ দিন নবিজি সিয়াম পালন করতেন। এর পরে আসে বছরের শ্রেষ্ঠতম মাস 'শাহরু রমাদান'। এতেই রয়েছে বছরের শ্রেষ্ঠতম দশ রজনি, এবং বছরের শ্রেষ্ঠতম রাত 'লাইলাতুল-কদর।' রমাদন-পরবর্তী মাস শাওয়াল। এই মাসে ছয়টি সিয়াম পালন করতে বলা হয়েছে। আর যে ব্যক্তি রমাদানের পর এই মাসে ছয়টি সিয়াম রাখে, তাকে সারা বছর সিয়াম রাখার প্রতিদান দেওয়া হয়। এভাবে শাওয়াল শেষে আসে যুল-কদা। যুল-কদা হলো দ্বিতীয় হারাম মাস। তা ছাড়া এটা হাজ্জের মাসগুলোর একটি। যুল-ক্বদার পর যুল-হিজ্জা। এটি তৃতীয় হারাম মাস। এটাও হাজ্জের মাস। বছরের সেরা দশ দিন রয়েছে এই মাসের শুরুতে। এরপর বছরের শ্রেষ্ঠ দিন 'আরাফাহ'। এ দিনের সিয়াম পালন বর্তমান এবং পরবর্তী বছরের পাপসমূহ মুছে দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই মাসে হাজ্জ সম্পন্ন হয়। আর যার হাজ্জ কবুল হয়, তার পাপসমূহ এমনভাবে মুছে দেওয়া হয়, যেন সে সদ্য-ভূমিষ্ট-নবজাতক! এরপর আসে মুহাররম মাস। এটি চতুর্থ হারাম মাস। রমাদানের পর এই মাসে সিয়াম রাখার প্রতিদান সব থেকে বেশি। আশুরা মুহাররম মাসেই, যেদিন সিয়াম রাখলে এক বছরের পাপ মুছে দেওয়া হয়।

ভালোভাবে লক্ষ করুন, কীভাবে ইসলামি বর্ষপঞ্জি সাজানো হয়েছে। বছর শুরু হচ্ছে মুহাররম দিয়ে, যা অতি সম্মানিত ও ইবাদাতের মাস। আবার বছর শেষ হচ্ছে যুল-হিজ্জা দিয়ে, যা আরেকটি সম্মানিত ও ইবাদাতের মাস। খেয়াল করুন, অধিক সাওয়াব অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ কীভাবে বছরজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এমন বর্ষপঞ্জিই বলে দেয় আমাদের রব একজন, যিনি চান বান্দারা যেন এই আয়াতের ওপর আমল করে— 'অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনি ইবাদাতে রত হও।' আমাদের রব চান, আমরা যেন তাঁকে নিয়েই কাটাই প্রতিক্ষণ, আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নিই প্রতিটা মুহূর্ত।

এবার চলুন, প্রিয় নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরকতময় জীবনের দিকে মনোনিবেশ করি। এখন আমরা দেখব এই আয়াতের চশমায়, নবিজির জীবনটা কেমন ছিল। চলুন ঘুরে আসি ১৪০০ বছর আগে নববি যুগে।

মদীনায় হিজরতের প্রথম দশটি বছর যেভাবে কেটেছে নবিজির :

প্রথম হিজরি : রাবিউল আওয়াল মাসের ৮ তারিখে কুবায় পৌঁছান এবং তাৎক্ষণিক মাসজিদ আল-কুবা নির্মাণ করেন। এরপর সেই মাসেই তিনি মদীনার শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং ১২ তারিখে পৌঁছান। সেখানে নির্মাণ করেন মাসজিদ আন-নববি, মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বাঁধনে বেঁধে দেন এবং ইয়াহুদিদের সাথে চুক্তি করেন।

দ্বিতীয় হিজরি : এই হিজরিতে সিয়াম, যাকাত, ঈদের সালাত, যাকাতুল ফিতরের বিধান জারি করা হয়। স্পষ্ট করে দেওয়া হয় জিহাদের বিধান এবং পরিবর্তন করা হয় কিবলা। এরপর সেই বছর সঙ্ঘটিত হয় ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ, রমাদানের ১৭ তারিখে। তারপর বানু কাইনুকার বিশ্বাসঘাতকতার দরুন তাদের উচ্ছেদ করা হয়।

তৃতীয় হিজরি : এই বছরের শাওয়াল মাসে উহুদ-যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হয়। এ ছাড়া মদ হারাম হওয়া নিয়ে হামরা আল-আসাদ যুদ্ধও সঙ্ঘটিত হয়।

চতুর্থ হিজরি : আল-রাজী এবং বীরে মাউনার মর্মান্তিক ঘটনাগুলো এই হিজরিতেই ঘটে। এরপর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে গুপ্ত হত্যার চেষ্টার অপরাধে আন-নাদীর গোত্রকে উচ্ছেদ করা হয়। হিজাবের আয়াত এই বছরেই নাযিল হয়েছিল।

পঞ্চম হিজরি : এই হিজরিতে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কাফির এবং মুশরিকদের যৌথ প্রচেষ্টায় হাজার খানেক সৈন্য সে যুদ্ধে মদীনা ঘেরাও করে। এরপর ইয়াহুদিদের চূড়ান্ত উচ্ছেদের পালা আসে বানু কুরাইযার চুক্তিভঙ্গের কারণে। সবশেষে হাজ্জ ফরজ করা হয় এই বছর।

ষষ্ঠ হিজরি : মুসলিমরা উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় সফর করে, কিন্তু পথিমধ্যে বাধাপ্রাপ্ত হয়। তখন হুদাইবিয়ার সন্ধি-চুক্তি সম্পাদিত হয় রিদওয়ান নামক স্থানে। এরপর ধীরে ধীরে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্ব নেতাদেরকে ইসলামের আহ্বান জানিয়ে চিঠিপত্র পাঠাতে থাকেন।

সপ্তম হিজরি : এ বছর খায়বার যুদ্ধে ইয়াহুদিদের দুর্গ জয় করে মুসলিমরা এবং উমরাহ পালন করে।

অষ্টম হিজরি : মু'তার যুদ্ধ হয় এই বছর। মক্কা বিজয়ও হয় অষ্টম হিজরিতে। এ ছাড়া হুনাইন যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তারপর নবিজি সাহাবিদের নিয়ে তায়িফ অবরোধ করেন।

নবম হিজরি : তাবুক যুদ্ধ এই বছরেই হয়। যুদ্ধ শেষে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সন্ধি-চুক্তির উদ্দেশ্যে দিগদিগন্ত থেকে ৭০ এর অধিক প্রতিনিধি মদীনায় আসে।

দশম হিজরি : বিদায় হাজ্জ আয়োজিত হয় দশম হিজরিতে। এরপর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসামা ইবনু যাইদ (রাঃ)-কে সেনাপ্রধান নিয়োগ দিয়ে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন।

একাদশ হিজরি : একাদশ হিজরি সনের মাথায় সমগ্র আরব উপদ্বীপ ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিরলস পরিশ্রমের ফলাফলের এক ঝলক ছিল এটি। কিন্তু শরীরের-ওপর-দিয়ে-যাওয়া প্রচণ্ড ধকল ও জখমের ফলে এ বছর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে পারছিলেন না। সবশেষে এ বছর মুসলিম উম্মাহর ওপর সবচেয়ে বড়ো বিপদ নেমে আসে। রবিউল আওয়ালের ১২ তারিখ, সোমবার বাদ ফজর, দুহা সালাতের সময় আমাদের রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রবের ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোক গমন করেন। জাতি হারায় তার সর্বশ্রেষ্ঠ নেতাকে...

আসলে নবিজির গোটা জীবনই ছিল এই আয়াতের তাফসীর: 'অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই ইবাদাতে সচেষ্ট হও।' [৩০৩]

আমাদের কাছে আল্লাহ এটাই চান। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রেখে-যাওয়া-সুন্নাহ যেদিন আমরা আমাদের পরিবারে, আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব, সেদিন থেকেই উম্মাহর আমূল পরিবর্তন শুরু হবে। দীঘল দিনের আলো নিভে আসে আঁধার-কালো-রাত, এভাবেই ফুরিয়ে যায় আমাদের জীবন-নামক ডায়রির পাতাগুলো। এমন দিন খুব দূরে নয়, যেদিন আর কোনো পাতাই মিলবে না এই ডায়রিতে...

কাজেই দিনশেষে যখন আপনি হেলিয়ে দিচ্ছেন নিজেকে আরাম বিছানায়, প্রশ্ন করুন: ওপারের জীবনের জন্য কী করলাম? আজকের দিনটি কি আমি আল্লাহর বান্দার মতো কাটিয়েছিলাম? সময়ের সদ্‌ব্যবহার করেছি কতটুকু? হাশরের ময়দানে আজকের এই দিনটি কি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে না বিপক্ষে?

পরিশেষে আমাদের সবার আত্মজিজ্ঞাসা করা উচিত: এরকম একটি ব্যস্তজীবনের কথাই যদি কুরআন বলে থাকে—দুআ, সালাত, সক্রিয়তা, আত্মোন্নায়ন, পরিকল্পনা অনুযায়ী চলা, আখিরাত গড়া—তা হলে এসবের সমাপ্তি কবে? অবসর কবে মিলবে?

একবার ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ-কে ঠিক এই প্রশ্নটিই করা হয়েছিল: 'মুমিনের জীবনে অবসর কবে মিলবে?' উত্তরে তিনি বললেন, 'জান্নাতে পা রাখার সাথে সাথেই।' [৩০৪]

হ্যাঁ, সেদিনই সকল কষ্টের বোঝা লাঘব হবে। দূর হবে ক্লান্তি আর অবসাদ। মুছে যাবে উদ্বেগ-দুশ্চিন্তার প্রতিটি ফোঁটা। চিরদিনের জন্য জীবন থেকে বিদায় নেবে এগুলো। সেদিন মানুষ শুধু শুনবে : 'সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের থেকে হটিয়ে দিয়েছেন সকল দুঃখ-কষ্ট' [৩০৫]

ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার জীবনের প্রতিটি দিন ঢেলে সাজান এই আয়াতের আলোকে : 'অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনি ইবাদাতে সচেষ্ট হও।' [৩০৬]

টিকাঃ
[২৮৯] সূরা আশ-শারহ, ৯৪: ৭
[২৯০] ইবনুল কাইয়িম এবং ইমাম শাতিবি
[২৯১] যাদুল-মাসির ফি ইলমিত-তাফসীর, ৪/৪৬২
[২৯২] প্রাগুক্ত
[২৯৩] তাফসীর আল-কুরতুবি, ২০/১০৯
[২৯৪] তাফসীর আত-তাবারি, ২৪/৪৯৯
[২৯৫] তাফসীর ইবনু কাসীর, ৮/৪১৮
[২৯৬] মাজমূ' আল-ফাতাওয়া, ২২/৪৯৫
[২৯৭] তাফসীর আদওয়া'উল-বায়ান, ৮/৫৭৯
[২৯৮] প্রাগুক্ত
[২৯৯] সূরা নাসর, ১১০: ১-৩
[৩০০] সূরা আশ-শারহ, ৯৪: ৭
[৩০১] সূরা আনআম, ৬: ১৬২
[৩০২] সূরা আশ-শারহ, ৯৪: ৭
[৩০৩] সূরা আশ-শারহ, ৯৪ : ৭
[৩০৪] তারিখু মাদীনাতি দিমাশক, ৬/১৩
[৩০৫] সূরা ফাতির, ৩৫: ৩৪
[৩০৬] সূরা আশ-শারহ, ৯৪ : ৭

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 মৃত্যুর দোরগোড়ায়

📄 মৃত্যুর দোরগোড়ায়


গত রাতে তারাবি সালাত চলাকালে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক মুসল্লি পড়ে যায়। তখন মাত্র পাঁচ কী ছয় রাকআত শেষ হয়েছে। তাৎক্ষণিক ঘোষণা করা হয়, জামাতে যদি কোনো ডাক্তার উপস্থিত থাকে সে যেন চলে আসে এবং তাকে চেকআপ করে। সে জ্ঞান হারায়নি এবং তাকে সুস্থই মনে হচ্ছিল। ডাক্তার তাকে নিয়ে গেলে আবার জামাত দাঁড়িয়ে যায়। পরবর্তীকালে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

কতই-না উত্তম মৃত্যু! সম্ভবত আল্লাহর কাছে তার দাঁড়ানো এতই প্রিয় ছিল যে, তিনি বান্দাকে ইবাদাতের সময়ে নিয়ে গেলেন! রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তাকে দিয়ে তিনি আমল করান।' সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কী রকম ইয়া রাসূলুল্লাহ?' তিনি বলেন, 'মৃত্যুর পূর্বে তাকে নেক আমলের তাওফীক দেন।' [৩০৭]

সত্যি বলতে রমাদানের শুরুতে চরম আগ্রহ থাকা, তারপর সেই আগ্রহে ভাটা পড়া—এটাই প্রমাণ করে, শেষ ভালো যার সব ভালো তার। ওপারের ডাক কোন মুহূর্তে আসবে—এই চিন্তা বহু দ্বীনদার বান্দার চোখের ঘুম কেড়ে নেয়। অজস্র অশ্রু ঝরায় তাদের এই ভাবনা:

'অন্তিম মুহূর্তে আমি কোন অবস্থায় থাকব?'
'মৃত্যুর ফেরেস্তাকে দেখার ভয় আমাকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেবে না তো?'
'আমার পাপের বোঝা যদি সেদিন শাহাদাত পাঠে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?'
'আমি কি মুসলিম অবস্থায় মরতে পারব?'

প্রথম তিন প্রজন্মের বিখ্যাত আলিম সুফইয়ান সাওরি। তিনি তখন মৃত্যুশয্যায়, অঝোরে কাঁদছেন। জিজ্ঞেস করা হলো, এই ক্রন্দন কি তার পাপের জন্য? তিনি মাটি থেকে একটি লাঠি ওপরের দিকে তুললেন এবং বললেন, 'বিশাল জমিন হতে এই লাঠি সরিয়ে নেওয়া জমিনের জন্য যতটা মামুলি বিষয়, আমার কাছে আমার পাপ এর চেয়েও তুচ্ছ (অর্থাৎ পরিমাণে অনেক কম)। বরং আমার ভয় হচ্ছে, মৃত্যুর সময় যদি আমার ঈমান তুলে নেওয়া হয়!' [৩০৮]

ইমাম শাফিয়ি-এর সাথেও অনুরূপ ঘটেছিল। তিনি যখন মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, তাঁর এক ছাত্র আল-মুযানি ঘরে প্রবেশ করে জানতে চায়, 'ইমাম, আপনি কেমন আছেন?' তিনি বলেন, 'বুঝতে পারছি যাত্রার অবসান ঘটতে যাচ্ছে, ভাইদের বিদায় দেবার সময় ঘনিয়ে এসেছে, এবং সময় চলে এসেছে রবের সাথে সাক্ষাতের। অথচ আমি জানি না, আমার রূহ কি জান্নাতে প্রবেশের দ্বারা আমার সম্মান বৃদ্ধি করবে, না জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে আফসোসের মধ্যে ফেলে দেবে!' [৩০৯]

এমনকি রাসূল-এর সাহাবি মুয়াজ ইবনু জাবাল-এর জীবনেও অনেকটা এরকম ঘটনা ঘটেছিল। তিনি তখন মৃত্যুর বিছানায়, উপস্থিত লোকেরা তাঁকে বলতে শুনল, 'বাহিরে দেখে আসো তো, এখনও সকাল হয়েছে কি না?' তারা বলল, রাত এখনও বাকি আছে। তিনি কিছুক্ষণ পর আবার একই প্রশ্ন করলেন। তারা তাঁকে আশ্বাস দিল সূর্য এখনও ওঠেনি। তৃতীয়বারের মতো যখন প্রশ্নটা করতে যাবেন এবার তিনি চিৎকার করে বললেন, 'আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই এমন রাত থেকে, যার সকাল হবে জাহান্নামে।' [৩১০]

জাহান্নামের ভয়ে সদা তটস্থ থাকতেন মুয়াজ। তাই আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে পানাহ চাইছিলেন। এই রাতেই যদি তার মৃত্যু হয়, তবে সকালবেলায় যেন তার রূহ জাহান্নামে না চলে যায়। তাই তিনি এই দুআ করছিলেন। দেখে মনে হচ্ছে যেন এই কথাগুলো এমন কেউ বলছেন, যাদের জীবনটা ছিল পাপে টইটম্বুর, বিভিন্ন প্রকার নেশায় এবং খেলতামাশায় কেটেছে। বাস্তবে এমন কিছুই না। এই মানুষগুলোর পুরো জীবনটাই ছিল ইবাদাত, শিক্ষাপ্রদান এবং তাওবার সমষ্টি। তবুও তারা উপলব্ধি করতে পারতেন, মৃত্যু এমন এক পরীক্ষার সময়, যখন জীবনের সকল আমল ভেস্তে যেতে পারে।

এমন ব্যক্তির ব্যাপারে কী বলবেন, যে ব্যক্তি দিনভর সিয়াম রাখল, তারপর সূর্য ডোবার আগ মুহূর্তে খুব অল্প পরিমাণ খেয়ে নিল? নিশ্চয়ই বলবেন, তার সিয়াম নষ্ট হয়ে গেছে! আচ্ছা, এমন ব্যক্তির ব্যাপারে কী মনে হয়, যিনি ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা সালাতে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু সালাম ফেরার আগে হঠাৎ মনে হলো তিনি ওযু অবস্থায় নেই? তার সালাত নষ্ট হয়ে গেছে। তদ্‌রূপ কেউ হয়তো বাহ্যিক ধার্মিকতায় এবং ইবাদাত পাবন্দির এক লম্বা জীবন কাটিয়েছে। কিন্তু দেখা গেল সব বিগড়ে গেছে অন্তিম মুহূর্তে এসে। তার সব আমল ধূলিকণায় পরিণত হয়েছে। কিংবা সে শেষ মুহূর্তে এসে আমল ছেড়ে দিল।

আসলে এ ব্যাপারে আমরা কেউই নিশ্চয়তা দিতে পারি না, আমাদের মৃত্যু কেমন হবে। হ্যাঁ, কিছু ইঙ্গিত তো অবশ্যই রয়েছে। ইমাম ইবনু কাসীর রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সুস্থতা এবং নিরাপদ থাকাকালে ইসলাম পালনে সচেষ্ট হও, যেন তুমি এর ওপরেই মৃত্যুবরণ করতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহ আল-কারীম, অত্যন্ত উদার। তিনি তাঁর অসীম উদারতা প্রদর্শনের ধারা চলমান রেখেছেন এবং তিনিই নির্ধারণ করেছেন, যে ব্যক্তি যেভাবে জীবন অতিবাহিত করবে, তার মৃত্যুও হবে সেভাবে। আর যে ব্যক্তি যে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে উত্থিতও ওই অবস্থায়।' [৩১১]

রমাদানের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করছি আমরা। এই বিদায়-বেলাই বলে দেবে সত্যিকারার্থে কে আল্লাহর দৃষ্টিতে দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিল। প্রতিজ্ঞা করুন, অটল থাকবেন শেষ পর্যন্ত। অটল থাকবেন রমাদানের শেষেও, থাকবেন জীবনকে বিদায় জানাবার দিনেও।

টিকাঃ
[৩০৭] তিরমিযি, ২২১৩
[৩০৮] সিয়ার, ১৩/২৯৭
[৩০৯] বায়হাকি, যুহদুল কাবীর, ৫৭৫
[৩১০] আহমাদ, আয-যুহদ, ১০১১
[৩১১] ইবনু কাসীর, ২/৭৫

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 প্রকৃত স্বস্তি তাঁরই সান্নিধ্যে

📄 প্রকৃত স্বস্তি তাঁরই সান্নিধ্যে


প্রকৃত স্বস্তি আর প্রশান্তি শুধু এক সত্তার সান্নিধ্যে মধ্যেই। এই অন্তর কখনোই ক্লান্ত হয় না তাঁর অবিরাম স্মরণে ও বিরতিহীন প্রশংসায়। বরং আত্মা-মনন সব একাগ্র হয়ে যায় তাঁকে পাবার আকাঙ্ক্ষায়। তাঁকে ডেকে চলার মধ্যে হৃদয়ে যে উষ্ণতা মেলে, এর কোনো তুলনা নেই। তাঁর রহমতের ভিখারির চোখ বেয়ে যে অশ্রু ঝরে পড়ে, এর নেই কোনো উপমা। তাঁর দরজায় অনবরত কড়া নাড়ার মাধ্যমে যে প্রশান্তি লাভ হয়, রাজা বাদশাহরা তা কল্পনাও করতে পারবে না।

তিনিই মাবুদ, সীমাহীন দয়াবান। তিনি অপরাজেয়, অসীম রাজত্বের অধিকারী, অসীম দানশীল। তিনিই মাবুদ, আর তাই দাসেরা তাঁকে মেনে চলে পরমানন্দে। তিনিই মাবুদ, তাঁর সাহায্য ছাড়া কোনোকিছুই করা যায় না। তিনি ব্যতীত সমগ্র সৃষ্টিকুলের কোনো পরিচয় নেই। প্রাণের স্পন্দন থেমে যাবে যদি তিনি একমুহূর্তের জন্যও আড়াল হয়ে যান। বস্তুত তাঁকে ছাড়া একমূহূর্তও বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

আমরা মানুষদের ভালোবাসি তাদের কাজের জন্য, যে গুণগুলো তারা অর্জন করেছে সেসবের জন্য। তথাপি কেবল সত্তাগত কারণে চূড়ান্ত ভালোবাসার অধিকার রাখে বাস্তবে এমন কেউ নেই; এমনকি নবি রসূলগণও নন। এই নিয়মের ব্যতিক্রম কেবল একজনই। আর তিনি হলেন আমাদের রব, আল্লাহ তাআলা।

ওপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার, কেন রসূল বলেছিলেন, কবিদের ভিতর সর্বাধিক সত্য কথা কবি লাবীদের কথা। যিনি বলেছেন, 'জেনে রেখো, আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই মিথ্যে'। [৩১২]

এমন গুণসম্পন্ন রবকে যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে, সে তো অন্যদের মতো নয়। তাই তোমার দিন-রাতের ঘণ্টাগুলো অন্যদের মতো হতে পারে না। তোমার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য মুহূর্তগুলো অন্যদের মতো হতে পারে না। অতএব লুটিয়ে পড়ো তাঁর সাজদায়। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ক্রন্দনে ভাসিয়ে দাও জমিন। সত্যনিষ্ঠ একজন মুসলিমের ছাঁচে নিজেকে গড়ে তোলো এবং প্রকৃত সুখের সন্ধানে লেগে যাও নতুন উদ্যমে।

টিকাঃ
[৩১২] বুখারি: ৬১৪৭; মুসলিম: ২২৫৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px