📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 আমি সবাইকে মাফ করে দিয়েছি

📄 আমি সবাইকে মাফ করে দিয়েছি


শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ-এর জীবন-বৃত্তান্ত নিয়ে যত আলোচনা করা হয়, অধিকাংশ আলোচনা থাকে তাঁর জ্ঞান-সমুদ্র, নির্ভয় মনোবল, সাহসিকতা আর বাগ্মিতা নিয়ে। কিংবা প্রখর স্মৃতিশক্তি, জিহাদের ময়দানে বীরদীপ্ত চরিত্র নিয়ে। অথবা সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধের ব্যাপারে তিনি কতটা সোচ্চার ছিলেন— এই বিষয়গুলোর মধ্যেই সাধারণত আলোচনা ঘুরপাক খায়। কিন্তু বিস্ময়ভরা এই মহান ব্যক্তির জীবনের সৌন্দর্যমণ্ডিত আরেকটি দিক আলোচনায় বাদ পড়ে যায়। এমন একটি দিক, যা অন্য যে-কোনো সময়ের তুলনায় আজকের দিনে মুসলিম উম্মাহর খুব জন্য বেশি প্রয়োজন।

তাঁর ব্যক্তিত্বের সেই দিকটি হলো ‘ক্ষমাশীলতা’। ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ-এর জীবনের অন্যতম একটি শ্লোগান ছিল: 'যত মুসলিম আমাকে কষ্ট দিয়েছে, আমি সবাইকে মাফ করে দিয়েছি। [২০১]

সত্যিই, এ ধরণের অভিব্যক্তি মুখে বলা সহজ, আমল করা কঠিন। কিন্তু তিনি এই কথার ওপর যেভাবে আমল করতেন, সেটাও ছিল বিস্ময়কর। ‘সবাইকে মাফ করে দিয়েছি’ এই কথাটা এখন ফটোশপ দিয়ে সুন্দর মডেল দাঁড় করার মতো বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এর সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ফেসবুকে বলুন আর টুইটার, যেখানে-সেখানে এগুলো চোখে পড়ে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়নের বেলায় অধিকাংশ মানুষেরই পদস্খলন ঘটে।

দেখা যাক, ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ সত্যিকারার্থে কতটা অবিচল ছিলেন নিজের বক্তব্যে। ইবনু তাইমিয়্যা এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আলি ইবনু ইয়াকুব বাকরি সৃফির ঘটনা :

'আল-ইস্তিগাছা' নামে ইবনু তাইমিয়্যা-এর একটি বই আছে। এর বিষয়বস্তু দুআ দ্বারা সাহায্য চাওয়া। এটি অ্যাকাডেমিক পদ্ধতিতে লেখা বই। অর্থাৎ প্রতিটি কথা দলিলসহ পাবেন। আলি বাকরি তাঁর লেখার ভুল খণ্ডনোর পরিবর্তে তাঁর বিরুদ্ধে ফাতওয়া জারি করল। সে বলল, ইবনু তাইমিয়্যা কাফির হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, নানাভাবে ইবনু তাইমিয়্যা-এর সম্মানহানীর অপচেষ্টা চালাল সে। আর রাষ্ট্রের কানে মন্ত্র দিল তাঁকে বন্দি করার জন্য। ফলে ৭০৭ হিজরিতে ক্ষমতাসীনরা তাঁকে বন্দি করার সিদ্ধান্ত নিল। তখন সেই আলি বাকরিই জোরাজুরি করতে লাগল, যেন ইবনু তাইমিয়্যা-কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়!

ইবনু তাইমিয়্যা-এর ওপর পরীক্ষার মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলছিল। ৭১১ হিজরিতে আলি বাকরির উস্কে-দেওয়া একদল উগ্র সুফি পথিমধ্যে ইবনু তাইমিয়্যার পিছু নিল। তারা তাকে কোণঠাসা করে বেধর মারপিট করল। এরূপ আকস্মিক আক্রমণ তাঁর সাথে একাধিকবার ঘটেছে। তারপর যখন ইবনু তাইমিয়্যা-এর কল্যাণকামী ব্যক্তিবর্গ আসল সত্যতা জানতে পারল, তখন তারা আলি বাকরিকে উপযুক্ত শিক্ষা দেবার জন্য ওঠেপড়ে লাগল। সুবহানাল্লাহ, সময় যতই গড়াতে থাকল স্বয়ং রাষ্ট্রপক্ষ এবার আলি বাকরির খোঁজ শুরু করে দিল। এখন সে নিজেই দৌড়ের ওপর!

আলি বাকরিকে গ্রেপ্তার করা হলো। রাষ্ট্র এবার ইবনু তাইমিয়্যা-এর কাছে জানতে চাইল, তাকে কী শাস্তি দেওয়া উচিত? কেমন শাস্তি দিলে আপনি খুশি হবেন? দীর্ঘদিনের অত্যাচারের প্রতিশোধ নেবার এটাই ছিল মোক্ষম সময়। কিন্তু ইবনু তাইমিয়্যা সেদিন উত্তরে যা বললেন, সত্যিই অবাক করার মতো। তিনি বললেন, 'আমি নিজের জন্য প্রতিশোধ নিই না।'

কিন্তু কর্তৃপক্ষ এই উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারল না। তাকে জোরাজুরি করতে থাকল প্রতিশোধ নেবার জন্য। তখন তিনি বাধ্য হয়ে বলেন, 'আপনারা (শাস্তি দেবার) যে অধিকারের কথা বলছেন, হয় সেই অধিকার আমার, আপনাদের, নয়তো আল্লাহর। এখন সেই অধিকার যদি আমার হয়, তা হলে (জেনে রাখুন) আমি তাকে মাফ করে দিয়েছি। আর যদি আপনাদের হয়, তা হলে আমার কাছে কোনো ফয়সালা চাইবেন না। আপনাদের যা মনে চায় করুন। আর (শাস্তি দেবার) অধিকার যদি আল্লাহর হয়, তা হলে তিনি নিজেই তাঁর হক আদায় করবেন, এবং যখন ইচ্ছে যেভাবে ইচ্ছে করবেন।'

তা সত্ত্বেও রাষ্ট্র আলি বাকরিকে এভাবে ছেড়ে দিতে নারাজ। এরপর আলি বাকরিকে যখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত জানানো হলে, তখন তিনি কোথায় লুকিয়েছিল জানেন? সে মিশরে চলে যায় এবং শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা-এর বাড়িতেই আশ্রয় নেয়! যাকে হত্যার জন্য এতকাল ছক এঁকেছিল, তার বাড়িতেই আশ্রয় নেয় সে। আর ইবনু তাইমিয়্যা-ও সেই শত্রুর পক্ষ হয়ে আবেদন করলেন এবং রাষ্ট্রকে অনুরোধ করলেন আলি বাকরির মামলা নিষ্পত্তির জন্য।

এভাবে হিংসুকদের মিথ্যাচারের কারণে ইবনু তাইমিয়্যা বহুবার জেল খেটেছেন। বরাবরের মতো বিতর্কে যখন তারা হেরে যেত, তখন কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে রাগে ক্ষোভে ইবনু তাইমিয়্যা-এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে উস্কে দিত। ফলে তাঁকে কারাবন্দি করা হতো এবং ভোগ করতে হতো অপরাধ ছাড়া নির্দয় শাস্তি। এই নিকৃষ্ট কাজগুলোর অন্যতম খলনায়ক ছিল নাসর মিনবাজি, আমীর রুকনুদ্দীন (মিনবাজির ছাত্র), এ ছাড়া তৎকালীন আরও অনেক ফহীহ এবং আলিম-ওলামা। তারা সে সময়কার সুলতানের তোষামোদ করত, যে কিনা পূর্বের সুলতানকে হটিয়ে গদি দখল করেছিল।

একপর্যায়ে পূর্বের সুলতান নাসির কালাউন পুনরায় ক্ষমতা অর্জনে সক্ষম হন। তারপর অনতিবিলম্বে ইবনু তাইমিয়্যা-কে মুক্ত করে দেন। তাঁকে সম্মানিত করেন এবং রাজদরবারে আমন্ত্রণ জানান। তিনি সেখানে গেলে তাঁকে দেখামাত্রই সুলতান দাঁড়িয়ে যান এবং শাইখুল ইসলামকে অনেক সম্মান-প্রদর্শন করেন। এরপর তিনি ইবনু তাইমিয়্যা-এর সাথে একান্ত বৈঠকে বসেন। এবং ক্ষমতা থেকে নামাতে যারা তার বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিল, সেই-সকল ফকিহ ও আলিমদের মৃত্যুদণ্ড দেবার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেন। এরপর তিনি ইবনু তাইমিয়্যাকে অনুরোধ করেন তার উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিতে। তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন-এই আলিমরা অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে কী কী করেছিল। কিন্তু ইবনু তাইমিয়্যা ঊর্ধ্বজগতের মানুষ ছিলেন। সুযোগের সদ্‌ব্যবহারের বদলে তিনি তাদের প্রশংসা শুরু করে দিলেন। এবং বললেন, তাদের যেন কোনো ক্ষতি করা না হয়। সাথে সাথে এটাও বলে দিলেন, 'আপনি যদি তাদের হত্যা করেন, তা হলে তাদের মতো আর কাউকে পাবেন না।'

সুলতান উত্তরে বলেন, 'তারা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে! হত্যার চেষ্টা করেছে! এর পরেও এসব বলছেন!?' ইবনু তাইমিয়্যা বলেন, 'যে আমাকে কষ্ট দেয়, আমি তাকে মাফ করে দিই। আর যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহই তাকে শাস্তি দেবেন। আমি নিজের জন্য প্রতিশোধ নিই না।'

ইবনু তাইমিয়্যাকে রাজি করানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেন সুলতান। কিন্তু তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত স্বীয় মতে অটল রইলেন, যতক্ষণ না সুলতান সবাইকে মাফ করে দিলেন। [২১০]

সুলতানের ক্ষমাপ্রাপ্ত সেই আলিমদের একজন কাদি ইবনু মাখলূফ মালিকি। এই ঘটনার পর তিনি বিস্ময়সুরে বলেছিলেন, 'সত্যিই, ইবনু তাইমিয়্যার মতো কাউকে দেখিনি। আমরা তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে প্ররোচিত করে ব্যর্থ হলাম। আর সে আমাদের ওপর ক্ষমতা লাভ করেও ক্ষমা করে দিলেন এবং আমাদের পক্ষ নিয়ে উল্টো সুলতানের সাথে তর্ক করলেন!'[২১১]

ইবনু তাইমিয়্যা আরও একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল: 'আমার ওপর মিথ্যারোপের কারণে কারও প্রতিশোধ নেব—এটা পছন্দ করি না। সে জুলুম কিংবা শত্রুতা, যা-ই করুক না কেন। অবশ্যই মুসলিম-মাত্র সবাইকে মাফ করে দিয়েছি। আর আমি সকল মুসলিমদের জন্য কল্যাণ পছন্দ করি। নিজের জন্য যা পছন্দ করি, প্রত্যেক মুমিনের জন্য সেটাই পছন্দ করি। যারা মিথ্যা বলেছে, জুলুম করেছে, তারা সবাই আমার দিক থেকে মুক্ত।।'[২১২]

বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কেননা আমাদের অতীত পঙ্কিলতা মুক্ত নয়। এখনও প্রতিনিয়ত অনেক গুনাহ হয়ে যাচ্ছে। আর তাই এমন কেউ তো অবশ্যই আছে যাদের প্রতি আমরা অন্যায় করেছি। আল্লাহর ক্ষমা-লাভের আগে তাদের ক্ষমা অর্জন করা প্রথম শর্ত। তেমনিভাবে অন্যদের প্রতিও আমাদের এরূপ আচরণ প্রদর্শন উচিত, যা আমরা নিজেদের বেলায় আশা করি। মানুষদের মাফ করে দেওয়া উচিত, কারণ, অন্যদের ক্ষেত্রে আমরা মাফ পাওয়ার আশা রাখি। 'তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন?' আমরা যদি আন্তরিক হই, তা হলে তাৎক্ষণিক সংশোধন করে নেওয়ার জন্য এই একটি আয়াতই যথেষ্ট, অন্যদের মাফ করে দিতে এবং পুনরায় সালাম প্রসার করার জন্য।

আপনি কি জানেন, আয়াতটি শোনার পর আবূ বকর (রা)-এর অনুভূতি কেমন ছিল? তিনি অঝোরে কেঁদেছিলেন এবং যে লোক তাঁর প্রতি জুলুম করেছিল, তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সে ছিল তাঁর আপন চাচাতো ভাই মিসতাহ ইবনু উছাছা ; একজন গরীব হিজরতকারী সাহাবি। আবূ বকর তার যাবতীয় খরচাপাতি বহন করতেন। যেদিন আমাদের মা আয়িশা (রা)-এর নামে কুৎসা রটানো হলো, শহরের দিগ্বিদিক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। খুব কম-সংখ্যক সাহাবি মা আয়িশা (রা)-এর ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন সেদিন। পরবর্তীকালে আল্লাহ তাআলা সূরা নূরের আয়াতগুলো নাযিল করে মুনাফিকদের-রটানো সেই কলঙ্ক থেকে উম্মুল মুমিনীনকে নিষ্পাপ ঘোষণা করলেন। এ সময়ে আয়িশা (রা)-এর ব্যাপারে মিসতার বক্তব্যের কারণে আবূ বকর তার ওপর ক্ষিপ্ত হোন এবং কসম কাটেন তিনি আর কখনও মিসতারের পেছনে টাকা ঢালবেন না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আবূ বকর (রা)-কে উদ্দেশ্য করে আয়াত নাযিল করলেন, 'আর তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে, তারা নিকটাত্মীয়দের, মিসকীনদের ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'[২১৩]

আয়াতটি সরাসরি আবূ বকর-এর বুকে গিয়ে বিঁধল। তিনি অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। বললেন, 'অবশ্যই চাই, আমাকে আপনি মাফ করে দিন!' তিনি দ্রুত ছুটে যান মিসতাহ এবং তার পরিবারের কাছে। সংকল্প প্রকাশ করেন তিনি কখনোই খরচ দেওয়া বন্ধ করবেন না। আবূ বকর আয়াতটি এভাবেই নিয়েছিলেন। আস-সিদ্দীক আল-আকবার। এটাই ছিল তাঁর চরিত্র। নবি-রাসূলদের পর পৃথিবীর-বুকে-বিচরণ-করা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটিও চাইতেন আল্লাহ তাকে মাফ করে দিক। মাওলার ক্ষমা তিনি পেয়েছিলেনও বটে।

আমরা আয়াতটিকে কীভাবে নেব? আমরা কী অতীতের পাপ নিয়ে ভয় পাচ্ছি? আমাদের আমলনামায় কি এমন কোনো সাংঘাতিক পাপ আছে যা আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের পূর্বে মুছে নেওয়া জরুরি? যদি উত্তর হয় 'হ্যাঁ' তা হলে নবিদের অনুকরণ করুন, সিদ্দীকদের অনুকরণ করুন। যারা আপনার প্রতি অন্যায় করেছে, তাদেরকে ক্ষমা করে দেবার দ্বারা প্রমাণ করুন, আপনিও ক্ষমা পেতে আগ্রহী।

আল্লাহর পথে ফেরার যাত্রায় আমাদের প্রত্যেকের সম্মুখে শয়তান দেওয়াল তৈরি করবে। পূর্বের রাস্তায় ফিরে যাবার জন্য নানানভাবে ফুসলাবে, আগের জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইবে। আর সেই পথ নির্ঘাত ধ্বংসের পথ। '(শয়তান) বলেছিল, "তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।” [২১৪]

আমরা যখনই ভালো কিছু করতে আগ্রহী হব, তখনই ইবলিশ উপস্থিত হবে। আমাদেরকে বাধা দিতে সে কিন্তু চেষ্টার কোনো ত্রুটি করবে না। বিশেষ করে আত্মশুদ্ধির পথচলায়। সে এখানে বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং আপনার সাথে তর্ক জুড়ে দেবে। একজন মুসলিম যখন অপর মুসলিমের সাথে সবকিছু মিটমাট করতে চায়, তখন শয়তান তাকে অনেকটা এ ধরণের যুক্ত দিয়ে আটকায়:
সে বলে, 'তুমি যদি রাগ দমন করে ফেলো, প্রতিশোধ না নাও, তা হলে তোমার অন্তর বিষে ভরে যাবে এবং এই বিষ তোমার জন্য ক্ষতিকর। কাজেই নিজেকে শান্তি দাও! একটু হলেও রাগকে প্রকাশ পেতে দাও!' এর জবাব কী হবে? আমরা তা-ই বলব যা আমাদের রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখিয়েছেন: 'সকল ধরণের গিলে ফেলার ভেতর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো যখন বান্দা আল্লাহর জন্য স্বীয় ক্রোধ গিলে ফেলে (অর্থাৎ রাগ দমন করে)। আর যে এই কাজ করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ঈমান দ্বারা তাকে পূর্ণ করে দেবেন।[২১৫]

লক্ষ করুন, শয়তান বলছে 'রাগ দমন তোমার ভেতরটা বিষে পরিপূর্ণ করে দেবে।' আল্লাহ বলছেন, 'রাগ দমন তোমার ভেতরটা ঈমানে পরিপূর্ণ করে দেবে।'
তবে শয়তান এখানেই হাল ছাড়বে না। সে আরও বলবে, 'দেখো, তোমার তো বহু নেক আমল আছে। তুমি তাহাজ্জুদ পড়ো, কুরআন পড়ো, ইলম অন্বেষণের আসরে বসো। অতএব নিশ্চিত থাকো-আল্লাহ তোমার এই পদস্খলন ক্ষমা করে দেবেন।'
এর জবাবও আমরা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস দিয়ে দেব : 'প্রত্যেক ব্যক্তির আমল সোমবার এবং বৃহস্পতিবার আল্লাহর সামনে পেশ করা হয়। অতঃপর আল্লাহর সাথে শিরক করেনি এমন সব ব্যক্তিকে তিনি মাফ করে দেন। তবে সেই ব্যক্তিকে নয়, যার সাথে তার মুসলিম ভাইয়ের বিদ্বেষ রয়েছে। বলা হয়, 'এই দুজনকে মাফ করা হবে না যতক্ষণ না তারা মিটমাট করে নিচ্ছে।[২১৬]
কারও হয়তো অঢেল নেক আমল আছে, তথাপি একটি পদস্খলনের দরুন তারা ক্ষমা পাবে না। আর তা হলো রাগ ধরে রাখা, মুসলিম ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ রাখা।

এদিকে শয়তান ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। সে বলবে, 'এখনই ফিরিয়ে নিয়ো না। ঠিকাছে বন্ধু বানিয়ো, কিন্তু এখন না। বছরখানেক পর করো,' এর উত্তরে কী বলব? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস শুনিয়ে দেব: 'যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের সাথে এক বছর যাবৎ সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকে, সে যেন তার রক্ত ঝরাল।[২১৭]

এবার শয়তান বলবে, 'ঠিকাছে, এক বছর লাগবে না। এক সপ্তাহ সময় নাও। এরপর মিটামাট করে নিও। তোমাদের উভয়ের মন-মেজাজ ঠান্ডা হওয়াটা জরুরি।' এর উত্তরে কী বলব? রাসূল-এর হাদীস দিয়েই দেব : 'এক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের সাথে তিনদিনের বেশি সময় সম্পর্কচ্ছেদ থাকা বৈধ নয়। যে ব্যক্তি তিনদিনের বেশি থাকবে এবং এই অবস্থায় মৃতুবরণ করবে, সে জাহান্নামে যাবে।[২১৮]

শয়তান যদি আবার বলে, 'আচ্ছা বাবা আচ্ছা, ঘৃণা করতে হবে না, এক সপ্তাহ অপেক্ষাও করা লাগবে না। বরং তার মধ্যে অপরাধ-বোধটুকু জাগ্রত হওয়ার জন্য অন্তত একটু সবর করো! তাকে আগে ক্ষমা চাইতে দাও!' এবারও নবিজির হাদীস শুনিয়ে দেব: 'মনোমালিন্য হওয়া দুজনের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে আগে সালাম দেয়।[২১৯]

'আহা! সে যে তোমার ক্ষমা মঞ্জুর করবে, এর নিশ্চয়তা কী?!' শয়তান বলবে, 'দেখা যাবে তোমার পুরো চেষ্টাটাই ভেস্তে যাবে।' রাসূল বলেন: 'এক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের সাথে তিনদিনের বেশি সময় সম্পর্কচ্ছেদ থাকা বৈধ নয়। তিনদিন অতিক্রম হয়ে গেলে সে যেন তার সাথে সাক্ষাৎ করে এবং সালাম দেয়। এরপর সে যদি সালামের জবাব দেয়, তা হলে দুজনই পুরস্কৃত হবে। আর যদি জবাব না দেয়, তা হলে সে নিজেই গুনাহগার হবে। অপরদিকে প্রথমজন দোষমুক্ত হয়ে যাবে।[২২০]

এবার শয়তান সর্বশেষ চেষ্টাটুকু করবে। কেননা সে এটাই চায়, আমাদের অন্তর যেন পরিবর্তন হয়ে যায়। সে বলবে, 'তোমার বিনয় যদি প্রত্যাখ্যান করা হয়, তা হলে তোমার সম্মান ধূলিসাৎ হবে। মান-সম্মান বলে আর কিছুই থাকবে না।' এবার তাকে রাসূল-এর এই হাদীসটি শুনিয়ে দিন, যেখানে তিনি কসম করে জানিয়েছেন শয়তানের এই কথা ডাহা মিথ্যে : 'তিনটি বিষয়ে আমি আল্লাহর কসম করে বলছি: (১) দান-সদাকা করলে সম্পদ কমে না। (২) বান্দা যখন ক্ষমা চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সম্মান বাড়িয়ে দেন। (৩) আর যে আল্লাহর জন্য বিনয়বনতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে উঁচু করে দেন।'[২২১]

এতকিছু পড়ার পরেও যে ব্যক্তি সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকে, তার ব্যাপারে আর কীই-বা বলা যেতে পারে? যে-কোনো-ক্রমেই ফোন ধরবে না-এমন জেদ ধরে থাকে? আসলে এ ব্যক্তি অহংকারী, তার অন্তর মরে গেছে। সে জান্নাত চায় না, জাহান্নামেরও ভয় করে না। সর্বদা একজন উত্তম মুমিনের পরিচয় দিন। আর শয়তানকে সব সময় লাঞ্ছনার মধ্যে ফেলে রাখুন। ফোন ধরুন মুসলিম ভাইয়ের, তার কাছে ক্ষমা চান এবং আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াবার আগেই সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো আমলনামা থেকে মুছে ফেলুন। এমন ব্যক্তির মতো হবেন না, যাকে সংশোধন করা অনেক কঠিন।

আ'মাশ থেকে বর্ণিত, শা'বি বলেছেন, 'সম্মানিত ব্যক্তিগণ ভালোবাসার বন্ধন গড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দ্রুতগামী, আর শত্রুতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধীরস্থির। তারা রুপোর পাত্রের মতো। ভাঙা কঠিন কিন্তু মেরামত সহজ। অপরদিকে সবচেয়ে বদ চরিত্রের ব্যক্তিরা ভালোবাসার বন্ধন গড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধীরস্থির। আর শত্রুতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাড়াহুড়ো- প্রবণ। এরা কাচের পাত্রের মতো। ভাঙা সহজ, কিন্তু মেরামত করা বেজায় কঠিন।[২২২]

আসুন সব মুছে দিই, নিজের ভুলগুলো স্বীকার করে সব মেনে নিই, আর শত্রুতা যতটা কম সম্ভব রেখে জান্নাত-পানে এগিয়ে চলি। পরিশেষে সেই ভাই-বোনদের উদ্দেশে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চাই-যারা আল্লাহর জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছেন, দাওয়াতি কাজ করছেন, বিভিন্ন পরিকল্পনা করছেন এবং সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছেন। আপনারা ক্ষমা চাইবার এই চারিত্রিক গুণ আরও দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরুন। কেননা আল্লাহর পথে-চলা মানুষগুলো বাতিলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, পদে পদে নিন্দিত হতে পারে। কখনও-বা মুসলিমরাই তাদের নির্যাতন করবে, অভিযুক্ত করবে, উগ্রপন্থী তকমা জুড়ে দেবে। আর তাই ক্ষমা করার এই গুণ অর্জন ছাড়া আপনি এই পথে টিকে থাকতে পারবেন না। এটি প্রত্যেক নবি-রাসূলের ব্যক্তিত্বের অংশ ছিল। আর তাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন আমাদের রাসূল। তাওরাতে তাঁর ব্যাপারে এভাবে বলা হয়েছে:
'আতা ইবনু ইয়াসার বলেন, 'আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা)-এর সাক্ষাৎ পেয়েছি এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি, 'আমাকে বলুন, তাওরাত-গ্রন্থে রাসূল-এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?' তিনি বলেন, 'হাঁ আল্লাহর কসম, তাওরাতে তাঁর ব্যাপারে কুরআন বর্ণিত কিছু গুণ এসেছে। যেমন: 'হে নবি, আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে।[২২৩] 'নিরক্ষরদের একজন। তুমি আমার দাস এবং রাসূল। আমি তোমার নাম রেখেছি মুতাওয়াক্কিল (ভরসাকারী)। তুমি কঠোর নও, তুমি নির্দয়ও নয়। বাজারে তুমি শোরগোল সৃষ্টিকারী নও। খারাপকে খারাপ দ্বারা প্রতিহত করবে না। তুমি মাফ করে দাও এবং ক্ষমা করে দাও। আর আল্লাহ তাআলা তার দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করা ব্যতীত তাঁর মৃত্যু দেবেন না; যতক্ষণ না তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সাক্ষ্য দেয়, আর যতক্ষণ না অন্ধ চোখ, বধির কান এবং গাফেল অন্তর তার দ্বারা খুলে যায়।' [২২৪]

নিশ্চয়ই ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ দ্বীন, অতি সূক্ষ্ম এবং মানবীয় বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর তাই ক্ষমা করা মানে সব ভুল এড়িয়ে চলতে হবে-বিষয়টা এমনও না। উদাহরণস্বরূপ: যে-পাপ অন্যের অধিকার হরণ করে, কিংবা যিনি অবিরাম নির্যাতন চালায়, এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই উপযুক্ত পন্থায় আসামিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। তা ছাড়া এই অধ্যায়ে যে ক্ষমার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত মুসলিমদের মধ্যে তুচ্ছ বিরোধগুলো গুঁটিয়ে নেবার আহ্বান জানিয়ে লেখা। অর্থাৎ তুচ্ছ কিংবা ক্ষুদ্র-থেকে-ক্ষুদ্র যে বিষয়গুলোর কারণে আমরা শত্রুতা করি, 'আল-হিজর' (বৈধ বয়কট) করার শর্তগুলো পূরণ না হলেও। মুসলিম ভাই-বোনদের সাথে আমাদের অধিকাংশ সম্পর্কচ্ছেদের মূলে থাকে এ ধরণের তুচ্ছ বিষয়ই, যা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পর্ক ছেদ করার কোনো বৈধ কারণ নয়। এমনকি যারা দাবি করে, আল্লাহর জন্য সম্পর্কচ্ছেদ করেছে-তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, 'আল-হিজর করার শর্তগুলো কী?' দেখবেন, তারা উত্তর দিতে পারবে না। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, তাদের এই বয়কট বিন্দুমাত্র আল্লাহর জন্য নয়। বরং স্বীয় প্রবৃত্তির খায়েশ মেটানোর জন্য।

সবশেষে আমি আহ্বান করব, আসুন আল্লাহর এই কথাটি আমরা অন্তরে গেঁথে নিই: 'অতপর যে মাফ করে দেয় এবং সংশোধন করে তাকে পুরস্কৃত করা আল্লাহর দায়িত্ব। আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।' [২২৫]

আর এসব বান্দাদের দলভুক্ত হই: 'যখন রাগান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।' [২২৬]

এবং আল্লাহর এই উপদেশ মেনে চলি, 'মন্দকে প্রতিহত করো উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো। ধৈর্যশীল ছাড়া এ গুণ আর কারও ভাগ্যে জোটে না। এবং অতি ভাগ্যবান ছাড়া এ মর্যাদা আর কেউ লাভ করতে পারে না।' [২২৭]

টিকাঃ
[২০১] মানহাজু ইবনি তাইমিয়্যা, ২৩১
[২১০] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৪/৬০-৬১
[২১১] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৪/৬১
[২১২] মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৫৫
[২১৩] সূরা আন-নূর, ২৪: ২২
[২১৪] সূরা আল-আ'রাফ, ৭: ১৭
[২১৫] মুসনাদ আহমাদ, ৬১১৪
[২১৬] মুসলিম, ১৫৯৩
[২১৭] আবূ দাউদ, ৪৯১৫; সহীহ
[২১৮] আবূ দাউদ, ৪৯১৪; সহীহ
[২১৯] বুখারি, ৬৩০৯
[২২০] আবূ দাউদ, ৪৯১২
[২২১] তিরমিজি, ২৩২৫
[২২২] রওদাতুল উকালা, ১৭৪
[২২৩] সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৪৫।
[২২৪] বুখারি, ২১২৫
[২২৫] সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৪০
[২২৬] সূরা সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৩৭
[২২৭] সূরা, ৪১: ৩৪-৩৫

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 খুশু : সবচেয়ে কঠিন যে ইবাদাত

📄 খুশু : সবচেয়ে কঠিন যে ইবাদাত


'খুশু' একজন মুসলিমের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত। সাথে সাথে সবচেয়ে উপেক্ষিত ইবাদাতগুলোর একটি। সন্দেহাতীতভাবে সর্বাধিক কঠিন ইবাদাতও বটে। এজন্য অন্তর এতে স্থির হবার আগ পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় প্রয়োজন।

খুশু-অন্তরের বিনম্রতা, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ অনুগত, তাঁর জন্য বিগলিত হওয়া। খুশু এমন কোনো আমল নয়, যা আপনি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে করবেন। কেবল সালাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এটি। খুশু-অন্তরের এমন এক অবস্থা যা সময়ের পরিক্রমায় আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। অনেকটা জমিনে হেঁটে চলেও মনকে সাত আসমানের রবের সাথে জুড়ে রাখার মতো। তাঁকে পাবার জন্য ব্যাকুল হওয়া। আপনি বড়োই অসহায়, তাঁকে ছাড়া কিছু করার সামর্থ্য নেই আপনার, তাঁর সাহায্য ছাড়া আপনি নিতান্তই একজন প্যারালাইজড ব্যক্তির মতো-এরকম অনুভূতি মনে জাগ্রত করা।

সত্যি বলতে খুশু এমন এক মুহূর্ত, যখন আপনি সাজদা থেকে মাথা তুলে অনুভব করবেন-মাটি থেকে মাথা তুললেও আপনার অন্তর তুলতে পারেননি, সে সাজদাবনতই রয়ে গেছে মাওলার জমিনে। এ হচ্ছে এমন এক অবস্থা যখন ব্যক্তি কেনা-বেচা, সামাজিকতা ইত্যাদির সাথে জড়িত থেকেও তার অন্তর ডেকে চলে, 'আল্লাহ, আমাকে আমার অবস্থার ওপর ছেড়ে দিয়েন না। আমি তো আপনারই দয়ার ভিখারি ইয়া রব। আল্লাহ, আমার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দিন। আপনি সবকিছুই জানেন এবং সব দেখেন, যা কেউ দেখে না। আল্লাহ গো, আপনি যেমন ইবাদাত পাওয়ার হকদার, আমি তো সেভাবে ইবাদাত করতে পারিনি ইয়া গফুর!'

আপনি কি এরকম অনুভব করেছেন কখনও? পেয়েছেন এরকম স্বাদ? নাকি আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্কটা এখনও অনুভূতিহীন যন্ত্রের মতোই রয়ে গেছে?

আল্লাহ বলেন, أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ 'ঈমান-গ্রহণকারীদের জন্য এখনও কি সে সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে তাদের মন বিগলিত হবে, তাঁর নাযিলকৃত মহাসত্যের সামনে অবনত হবে?'[২২৯]

সত্যি করে বলুন তো, আপনার অন্তর কি আয়াতটি পড়ে নাড়া দিয়েছে? যদি উত্তর হয়, 'এ আর তেমন কী!', তা হলে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, আয়াতটি সাহাবিদের কানে কতটা ভারী ঠেকেছিল আসুন দেখি :
ইবনু মাসউদ বলেন, 'আমাদের ইসলাম কবুল এবং আল্লাহর এই আয়াত নাযিলের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র চার বছর।'[২৩০]
ইবনু উমর যখন আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন, তিনি এতই কাঁদতেন, তাঁর দাড়ি বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ত। আর তিনি বলতেন, "অবশ্যই আমার রব, অবশ্যই! (সময় চলে এসেছে)।”[২৩১]
ইবনু আব্বাস বলেন, 'আল্লাহ মুমিনদের অন্তরকে ধীরগতির দেখতে পেয়েছেন। (তাই এই আয়াত নাযিল করে সতর্ক করেছেন)। [২৩২]

সাহাবিদের মুখে এমন বাক্য শোনা সত্যিই আশ্চর্যজনক। অথচ কুরআনের ভাষায় তাঁরা ছিলেন "সেসব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর যিকর, সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা সেদিনকে ভয় করে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।”[২০৩] এবং তাঁরা, "আল্লাহর সাথে তাদের প্রতিশ্রুতি সত্যে বাস্তবায়ন করেছে।”[২০৪] তথাপি আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরকে আরও উঁচু স্তরে নেবার জন্য বলছেন। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর হক আদায়ে আমাদের অন্তরের খুশু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১) কিন্তু খুশু আসলে কী?
শাব্দিক অর্থে খুশু হলো: 'নিচুতা, নম্রতা এবং স্থিরতা'[২০৫]
অর্থ আরও ভালোভাবে বুঝতে আসুন কুরআনের দিকে ফিরে যাই, কুরআনের পাতায় দেখি আল্লাহ তাআলা শব্দটিকে কীভাবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, وَمِنْ آيَاتِهِ أَنَّكَ تَرَى الْأَرْضَ خَاشِعَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ 'আর এটিও আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি যে, তোমরা দেখতে পা—ভূমি শুষ্ক শস্যহীন পড়ে আছে। অতপর আমি যেইমাত্র সেখানে পানি বর্ষণ করি হঠাৎ তা অঙ্কুরোদগমে সুসজ্জিত হয়ে ওঠে।'[২০৬]
'শুষ্ক শস্যহীন' শব্দটি আরবি আয়াতে এসেছে خَاشِعَةٌ 'খশিআহ' শব্দে, যা খুশু অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
বিচার-দিবসের আলোচনায় আল্লাহ বলেন, وَخَشَعَتِ الْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسًا 'এবং পরম করুণাময়ের সামনে সকল আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে। তাই মৃদু আওয়াজ ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না'।[২০৭]
'নিচু হয়ে যাবে' বোঝাতে আরবি আয়াতে এসেছে খশাআত। খুশু, খশিআহ, খশাআত শব্দগুলো আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী একই শব্দমূল থেকে নির্গত।

তা হলে খুশুর প্রায়োগিক অর্থ কী দাঁড়াচ্ছে? আল্লাহ তাআলা আমাদের মধ্যে কী দেখতে চাচ্ছেন? ইবনু রজব বলেন, 'খুশু হলো আল্লাহর জন্য চূর্ণবিচূর্ণ হওয়া, তাঁর জন্য নিচু হওয়া। এবং আল্লাহর সম্মুখে থাকাবস্থায় অন্তর স্থির হওয়া। অতঃপর অন্তর যখন খুশু অর্জন করে, সমগ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তা প্রকাশ পায়'।[২০৮]

২) খুশু অর্জনকারীদের কিছু নজির
মন-দিয়ে নবিজি-এর নিম্নোক্ত দুআটি পড়ুন, দেখুন কী ভাষায় তিনি সাজদাবস্থায় আল্লাহর গুণকীর্তন করতেন: 'ও আল্লাহ, শুধু তোমার জন্যই আমি রুকু করেছি, শুধু তোমার ওপরেই ঈমান এনেছি, শুধু তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি, শুধু তোমার জন্যই বিনম্র হয়েছে আমার শ্রবণ, আমার দৃষ্টি, আমার মস্তিষ্ক, আমার অস্থি-মজ্জা, আর আমার শিরা-উপশিরা'।[২০৯]

সাহাবিদের বিরতিহীন খুশুর ব্যাপারে তাবিয়ি হাসান বাসরি বলেন, 'আল্লাহর কসম, তাদের দিকে তাকালে দেখতাম, তাঁরা এমন এক প্রজন্ম যেন স্বচক্ষে জান্নাত জাহান্নাম দেখতে পাচ্ছে! আল্লাহর কসম, তাঁরা ঝগড়াটে ছিলেন না, ছিলেন না বাতিলপন্থীদের মতো। শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাবেই পরিতৃপ্তি খুঁজে পেতেন। আর তাঁরা এমন কিছু প্রকাশ করতেন না যা তাদের অন্তরে নেই।[২৬০] অর্থাৎ তাদের মধ্যে কৃত্রিমতার লেশমাত্র ছিল না।

একবার সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু উমর সূরা আল-মুতাফফিফিন তিলাওয়াত করছিলেন। যখন এই আয়াতে এসে পৌঁছোলেন, 'যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ জগৎসমূহের রবের সম্মুখে।'[২৬১] তিনি অঝোরে কাঁদলেন। কাঁদতে কাঁদতে পড়েই গেলেন, এরপর আর তিলাওয়াত শুরু করতে পারলেন না।[২৬২]

মাসরূক বলেন, 'মক্কার এক অধিবাসী আমাকে বলল, 'তোমার ভাই (সাহাবি) তামীম আদ-দারী-এর স্থান এটি। সকাল হবার আগ পর্যন্ত তিনি রাতভর এখানে সালাত আদায় করতেন অথবা এক আয়াত পড়েই কাটিয়ে দিতেন গোটা রাত। বারবার আয়াতটি পড়তেন এবং কাঁদতেন, 'যেসব লোক অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে তারা কি মনে করেছে যে, আমি তাদেরকে এবং মু'মিন ও সৎকর্মশীলদেরকে সমপর্যায়ের করে দেব, যেন তাদের জীবন ও মৃত্যু সমান হয়ে যায়? তারা যে ফয়সালা করে, তা অত্যন্ত জঘন্য!' [২৪৩]

একবার তাবিয়ি ছাবিত বুনানি ডাক্তারের কাছে গেলেন চোখব্যথা নিয়ে। ডাক্তার তাঁর চোখ দেখে বলল, 'আমাকে ওয়াদা দিন, তা হলে আপনার চোখ ভালো হয়ে যাবে।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কীসের ওয়াদা?' ডাক্তার বলল, 'আপনি কাঁদবেন না।' এ কথা শুনে ছাবিত বলেন, 'যদি কাঁদতেই না পারলাম, তা হলে এই চোখ থেকে লাভ কী?!'[২৪৪]

৩) খুশু কেন এত দামি?
- আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে প্রশস্ত দরজা খুশু
ইবাদাতের মূল এবং সারনির্যাস খুশু, আল্লাহর সন্তুষ্ট লাভের সবচেয়ে প্রশস্ত এবং দ্রুতগামী পথ। তথাপি এটা বলা মোটেও অতিরঞ্জন হবে না যে, আমাদের অধিকাংশের জীবনে খুশুর অভিজ্ঞতা নেই। জীবনে কখনোই অনুভব করিনি খুশুর স্বাদ। কত চমৎকারভাবেই-না ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এই বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, তিনি বলেন, 'আল্লাহর কাছে যাবার জন্য ইবাদাতের সবকটি দরজা দিয়ে আমি প্রবেশের চেষ্টা করেছি। প্রতিটি দরজার কাছেই দেখতে পেয়েছি ভিড় লেগে আছে। ফলে ঢুকতে পারিনি...' অর্থাৎ লোকসমাজে প্রচলিত ইবাদাত; যেমন: সালাত, সিয়াম, সদাকা, দাওয়াহ, কুরআন এবং এ-জাতীয় যত আমল আছে, এগুলো দিয়ে আবিদ-শ্রেণীর মানুষদের সাথে প্রতিযোগিতা করা কঠিন, আলহামদু লিল্লাহ। এরপর তিনি বললেন, '...এভাবে (চলতে চলতে) আমি নীচুতা এবং দরিদ্রের দরজার কাছে পৌঁছোলাম। দেখলাম এটা আল্লাহর কাছে যাবার সবচেয়ে দ্রুতগামী এবং প্রশস্ত দরজা। কিন্তু এর সামনে কোনো ভিড় পেলাম না, কোনো বাধারও সম্মুখীন হলাম না! তারপর আমার পা ভিতরে রাখতেই আল্লাহ আমার হাত ধরে টেনে নিলেন। এরপর তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন।[২৪৫]

- খুশু ছোটো আমলকেও অমূল্য সম্পদ বানায়
সত্যিই, খুশু এক অলৌকিক হরমনের মতো। যখনই কোনো আমলের সাথে একে জুড়ে দেওয়া হয়, তখনই সেই আমলের পরিণাম এবং মর্যাদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। খুশুহীন সারা রাত সালাতের চেয়ে খুশু-সম্পন্ন আপনার দুই রাকআত সালাত আল্লাহর নিকট অনেক অনেক প্রিয়। আল্লাহর প্রিয় হবার শর্টকাট পদ্ধতি এটি। ভেবে দেখুন, এই ক্ষুদ্র জীবনে এমন শর্টকাট পথ আসলেই কতটা জরুরি আমার আপনার।

সূরা ইখলাসের তাফসীরে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা বলেন: 'যদিও-বা এই সূরা (ইখলাস) পড়লে অনেক সাওয়াব এবং পুরস্কার নসিব হয়, তথাপি বান্দা যদি এই সূরা ছাড়াও অন্য কোনো আয়াত খুশুর সাথে তিলাওয়াত করে, তা হলে তার পুরস্কার এই সূরা পাঠ থেকেও বেশি হবে।' তিনি আরও বলেন, 'বান্দা যখন মন থেকে, অর্থ বুঝে বুঝে সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার বলে, তখন অজ্ঞতা এবং অন্যমনস্ক অবস্থায় সূরা ইখলাস পাঠ করার চেয়েও বেশি সাওয়াব নসিব হয়।' [২৪৬]

- শয়তানের ওয়াসওয়াসা দূরীকরণে খুশু
শয়তানের ওয়াসওয়াসা কি আপনাকে কাবু করে ফেলেছে? আপনার চালচলন নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গেছে? যদি তাই হয়, তা হলে খুশুকে নিজের জন্য আবশ্যক করে নিন। কেননা শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং খুশু একসাথে অন্তরে অবস্থান করতে পারে না। আলিমগণের ভাষায়: 'যে অন্তরে খুশু আছে, শয়তান তার নিকটবর্তী হতে পারে না।' [২৬৭]

৪) কীভাবে এমন বিস্ময়কর আমলে অভ্যস্ত হওয়া যায়?
- মা'রিফাতুল্লাহ বা আল্লাহকে চিনুন
হয়তো ভাবছেন, 'আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্ক ভাটা পড়েছে। আগের মতো আর আগ্রহ পাই না।' এর মানে এ নয়, আপনি খারাপ। আসল কারণটা হয়তো এর থেকেও সাধারণ। হয়তো আপনি এখনও আপনার রবকে চিনতে পারেননি। ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহকে চিনতে পেরেছে, সে অবশ্যই তাঁকে ভালোবাসবে।' [২৬৮] সেই মাওলাকে চিনতে, তাঁকে জানতে নেমে পড়ুন। কঠোর মুজাহাদা করুন। তাদাব্বুরের সাথে কুরআন তিলাওয়াত করুন, তাঁর নাম ও গুণসমূহ নিয়ে পড়াশোনা করুন। ইত্যাদি মাধ্যমে তাঁকে জানার চেষ্টা করুন। এরপর নিজেই দেখুন, আপনার মনের আকাশে হারিয়ে-যাওয়া খুশু-নামক সূর্যটি কীভাবে উদয় হচ্ছে।

- তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তারা কি কখনও আকাশ ও পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা করেনি? এবং আল্লাহর সৃষ্ট কোনো জিনিসের দিকে চোখ মেলে তাকায়নি?' [২৬৯] তিনি আরও বলেন, '(হে নবি,) এদেরকে বলে দাও, "আমি তোমাদেরকে একটিই উপদেশ দিচ্ছি-আল্লাহর জন্য তোমরা একা এবং দুজন মিলে নিজেদের মাথা ঘামাও এবং চিন্তা করো।..." [২৫০]

সমগ্র দুনিয়া একটি বৃহৎ মাসজিদরূপে তৈরি করা হয়েছে যেন আপনি চিন্তা-ভাবনা করেন। একদিন সাহাবি উম্মু দারদা-কে তাঁর স্বামী আবুদ দারদা-এর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলো, 'তিনি কোন আমল বেশি করতেন?' উম্মু দারদা বলেন, 'গভীর চিন্তা-ভাবনা।' [২৫১]

- খুশু অর্জনে প্রয়োজন নির্মল অন্তর
আমরা জেনে এসেছি খুশু কোনো বাহ্যিক আমলের নাম নয়। এটি অন্তরের আমল। এবং এও বুঝতে পেরেছি, কেন আমাদের অনেকের জন্য এটি বেশ কষ্টসাধ্য। আসলে আমরা খুশুর জন্য অন্তরে কোনো জায়গা রাখিনি। মানব-অন্তরে অনেকগুলো ঘর রয়েছে। এই ঘরগুলোতে অনেক বিষয় একসাথে অবস্থান করে। কিন্তু সেই ঘরগুলো যদি আপনি পাপ, গানবাজনা, অনর্থক বিষয়াদি এবং যৌন-উদ্দীপনায় মাতিয়ে রাখেন, তা হলে কীভাবে সেই অন্তরে খুশু নসিব হবে? বরং কল্যাণ প্রবেশের আগেই তা উচ্ছেদের সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, আমরা প্রত্যেকেই জানি, এই খুশু অর্জনের প্রক্রিয়া কীভাবে শুরু করতে হবে, এবং অন্তর থেকে কোন কোন বিষয়গুলো সর্বপ্রথম বের করে ফেলতে হবে।

- আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চান
যায়দ ইবনু আরকাম থেকে বর্ণিত, রাসূল-এর একটি দুআ ছিল: 'আল্লাহ, আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, কৃপণতা, বার্ধক্য ও কবরের আযাব থেকে। আল্লাহ, তুমি আমার মধ্যে তাকওয়ার অনুভূতি দাও, আমার নফসকে পবিত্র করো, নফস পবিত্রকরণে তুমিই সর্বোত্তম। তুমিই এর অভিভাবক এবং মাওলা। আল্লাহ, আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই এমন ইলম থেকে যা কোনো উপকারে আসে না, এমন হৃদয় থেকে যা বিনম্র হয় না, এমন আত্মা থেকে যা পরিতৃপ্ত হয় না এবং এমন দুআ থেকে যার উত্তর মেলে না।[২৫২]

সত্যি বলছি, কেবল বাহ্যিক পোশাক-আশাকে নয়, অলঙ্কারপূর্ণ উপদেশ-দানে নয়, এবং হৃদয়গ্রাহী পোস্ট লিখতে পারাই নয়, বরং এই খুশু হলো আপনার এবং আল্লাহর মধ্যে একটি গোপন সম্পর্ক। আল্লাহ এবং আপনি ছাড়া এই সম্পর্ক কেউই টের পায় না। আর পাহাড়সম খুশুহীন-নিষ্প্রাণ আমলের চেয়ে খুশুযুক্ত সরষের দানা পরিমাণ আমলও আল্লাহর কাছে অনেক প্রিয়। যে অন্তরগুলো খুশু অর্জন করতে পেরেছে, সেই অন্তরের অধিকারীরা কতই-না সৌভাগ্যবান! আল্লাহর রহমতের কতই-না নিকটে পৌঁছে গেছে তারা! এদের মুক্তি দ্রুত হবে না তো কাদের?

আল্লাহ, তুমি আমাদের দয়া করো, যদিও আমরা দয়ার অযোগ্য.. তুমি আমাদের মাফ করো, যদিও আমরা ক্ষমার যোগ্য নই.. আমাদের খুশু দাও, যদিও আমাদের অন্তর পাথরের মতো শক্ত.. আমাদের মুক্তি দাও, যদিও আমরা শাস্তির দিকে দৌড়ে যাই.. ও আল্লাহ!

টিকাঃ
[২২৯] সূরা আল-হাদীদ, ৫৭: ১৬।
[২৩০] মুসলিম, ৩০২৭
[২৩১] আদ-দুরারিল-মানছুর ফিত-তাফসীর বিল-মা'ছুর, ৮/৫৯
[২৩২] তাফসীর ইবনু কাসীর, ৮/৫২
[২০৩] সূরা আন-নূর, ২৪ : ৩৭
[২০৪] সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ২৩
[২০৫] ইবনুল কাইয়িন, মাদারিজুস সালিকীন, ১/৫১৬
[২০৬] সূরা হা-মীম সাজদা, ৪১ : ৩৯
[২০৭] সূরা ত্বহা, ২০: ১০৮
[২০৮] ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৬/৩৬৭
[২০৯] মুসলিম, ১৮৪৮
[২৬০] মুহাম্মাদ ইবনু নাসর, কিয়ামুল-লাইল, ১/৪২
[২৬১] সূরা আল-মুতাফফিফীন, ৮৩: ৬
[২৬২] আহমাদ, আয-যুহুদ, ১০৬৯
[২৪৩] সূরা আল-জাসিয়া ৪৫: ২১
[২৪৪] মুহাম্মাদ ইবনু নাসর, কিয়ামুল-লাইল, ১/১৪৬
[২৪৫] মাদারিজুস সালিকীন, ১/৪২৯
[২৪৬] মাজমু' আল-ফাতাওয়া, ১৭/১৪০
[২৬৭] মাদারিজুস সালিকীন, ১/৫১৭
[২৬৮] তরিকুল হিজরাতাইন, ২৮০
[২৬৯] সূরা আল-আ'রাফ, ৭: ১৮৫
[২৫০] সূরা সাবা, ৩৪ : ৪৬
[২৫১] তারিখু মাদীনাতি দিমাশক, ৪৭/১৪৯
[২৫২] মুসলিম, ৭০৮১

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকা

📄 নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকা


আত্মতৃপ্তি
কুরআনে একটি আয়াত আমরা প্রায়ই পড়ি, কিন্তু সে অনুযায়ী খুব একটা মনোযোগ দিই না। সত্যি বলতে কী, আয়াতটি গভীর চিন্তার দাবি রাখে। "...পা দৃঢ় হওয়ার পর পিছলে যাবে।”[২৫৩] আল্লাহ বলেননি 'পা দুর্বল হওয়ার পর পিছলে যাবে।' বরং বলছেন 'দৃঢ় হওয়ার পর'। দুনিয়ার এই জীবন অসংখ্য পরীক্ষার সমষ্টি। পালাবদল করে পরীক্ষা আসতে থাকে। আর আল্লাহ যদি আমাদের অন্তরকে দৃঢ় না রাখতেন, তা হলে আমাদের ভিতরটা কষ্টে, আঘাতে দুমড়ে-মুচড়ে যেত। আমরা নিজেরাই অবাক হয়ে যেতাম! কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই দ্বীনের পথে আমাদের পদস্খলন ঘটিয়ে দিত এই পরীক্ষাগুলো।

এ ধরনের পদস্খলন যে সব সময় ধীর গতিতে হবে, তাও না। আসলে দ্বীনের ওপর দৃঢ়তা স্রেফ নসিহত শোনা বা পড়ার দ্বারা বজায় থাকে না। বরং তা বজায় থাকে তাৎক্ষণিক আমলে নেবার দ্বারা। এর প্রমাণ আল্লাহর এই বাণী, "...অথচ তাদেরকে যে নসিহত করা হয় তাকে যদি তারা কার্যকর করত, তা হলে এটি হতো তাদের জন্য কল্যাণকর এবং অধিকতর দৃঢ়তা ও অবিচলতার প্রমাণ।” [২৫৪]

আপনার উপদেশ কেউ না বুঝতে পারলে, তাকে তুচ্ছজ্ঞান করবেন না। তদ্‌রূপ অবিরাম পাপ করে চলছে, এমন কারও ওপর আশাও ছেড়ে দেবেন না। অবাক হবেন না সেই বোনকে দেখে, যিনি এখনও ঠিকভাবে হিজাব করছেন না। আর আপনি যে আল্লাহর প্রশংসা করতে পারছেন, দ্বীনের ওপর আছেন, এগুলো আপনার কৃতিত্ব নয়; বরং আল্লাহর করুণারই ফল। বিশ্বাস হলো না? বেশি কিছু করতে হবে না, শুধু তাদের কাছে যান, যারা হিদায়াত পাওয়ার পর আবার খুইয়ে ফেলেছে, জাহিলিয়াতের জীবনে পুনরায় ফিরে গেছে। তাদের জিজ্ঞেস করুন, বুঝতে পারবেন—তারা ফেঁসে গেছে।

আপনি কি জানেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর নবিকেও অনুরূপ বলেছেন? “আমি তোমাকে অবিচল না রাখলে তুমি তাদের দিকে প্রায় কিছুটা ঝুঁকেই পড়তে।”[২৫৫] হ্যাঁ, আল্লাহর দয়া না থাকলে নবিজির অন্তরও ভ্রান্তির সম্মুখীন হতো। তা হলে আপনার আমার অবস্থান কোথায়?

দ্বীনের পথে আপনার অবিচলতা, প্রত্যহ নিজেকে আরও এগিয়ে নেবার আগ্রহ-উদ্দীপনা—এগুলো কোনোটাই আপনার হাতের কামাই নয়। এগুলো কেবল আল্লাহরই দয়া। ‘তা হলে আমরা কী করব? ফিতনার এই যুগে কীভাবে আমরা দ্বীনের ওপর অবিচল থাকব?’

৫টি নসিহত লিখে রাখুন। এগুলো দ্বারা আপনি দ্বীনের ওপর অবিচল থাকতে পারবেন ইন শা আল্লাহ :
১. কুরআন পড়ুন, কুরআন নিয়ে ভাবুন: আল্লাহ বলেন, ‘আপনার হৃদয়কে তা দ্বারা মজবুত করার জন্য।[২৫৬]
২. পূর্ববর্তী নেককারদের জীবনী পড়ুন: ‘আর হে মুহাম্মাদ, রাসূলদের যেসব বৃত্তান্ত যা আমি তোমাকে শোনাচ্ছি, এসব এমন জিনিস যাার মাধ্যমে আমি তোমাকে হৃদয়কে মজবুত করি।।[২৫৭]
৩. জানা-মাত্রই ইলমের ওপর আমল করুন: “...যা করতে তাদেরকে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তারা তা করলে তাদের জন্য নিশ্চয়ই কল্যাণকর হতো এবং চিত্তস্থিরতায় দৃঢ়তর হতো।”[২৫৮]
৪. বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হোন: “আর নিজের অন্তরকে তাদের সংগ লাভে নিশ্চিন্ত করো যারা নিজেদের রবের সন্তুষ্টির সন্ধানে সকাল-ঝাঁঝে তাঁকে ডাকে এবং কখনও তাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরাবে না। তুমি কি পার্থিব সৌন্দর্য পছন্দ করো? এমন কোনো লোকের আনুগত্য কোরো না, যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে কিনা নিজের প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার অনুসরণ করেছে এবং যার কর্মপদ্ধতি কখনও উগ্র, কখনও উদাসীন।” [২৫৯]
৫. এবং সবশেষে দুআয় লেগে থাকুন: “হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল থাকুন।” [২৬০]

টিকাঃ
[২৫৩] সূরা আন নাহল, ১৬: ১৪
[২৫৪] সূরা আন-নিসা, ৪: ৬৬
[২৫৫] সূরা আল-ইসরা, ১৭: ৭৪
[২৫৬] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৩২
[২৫৭] সূরা হুদ, ১১: ১২০
[২৫৮] সূরা আন-নিসা, ৪: ৬৬
[২৫৯] সূরা আল-কাহাফ, ১৮: ২৮
[২৬০] তিরমিযি, ৩৫৮৭

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 নিশিরাতে আল্লাহর সাথে

📄 নিশিরাতে আল্লাহর সাথে


লেখাটা যখন লিখছি, তখন রমাদান মাস চলছে। চারিদিকে রমাদানের বরকতে শান্তি বিরাজমান। বরকতময় এই মাসের জন্য, এই শান্তিময় রাতের জন্যে আমরা অধীর অপেক্ষায় ছিলাম। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হতে চাচ্ছিল না। আলহামদু লিল্লাহ, আমরা আবারও রমাদানের মতো শ্রেষ্ঠ মাসটি পেলাম।

তবে আজকের এই রাত আমরা নবিদের সাথে কাটাব। আলোচনা করব নবিদের চলার পথ নিয়ে, যে পথে তাঁরা সকলে চলেছেন আপন গতিতে। শুধু তাঁরাই নয়, যুগে যুগে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক মুজাদ্দিদের[২৬১] পথ এটি। আজ আমরা শিখব অন্তর নরম করার হাতিয়ার, মৃতপ্রায় ঈমানকে তরতাজা করার উপায় এবং আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক গড়ার কার্যকরী কৌশল। এমন এক আমল আমরা শিখব, যা মুসলিমরা মনে আনন্দ নিয়ে করে। অন্তরের ভালোবাসা নিয়ে রমাদানের প্রথম রাত থেকেই করা শুরু করে। আবার অনেকেই একে অবহেলা করে তাচ্ছিল্যের সাথে। এমনকি রমাদানের শেষ রাত্রিগুলোতেও অবহেলায় একে বিনষ্ট করে। আমি আপনাকে সে বিষয়টা সম্পর্কে সচেতন করছি। মানবজাতিকে দেওয়া আল্লাহর সেই মহান পুরস্কারের কথা আমি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছি দুনিয়ার জান্নাতের কথা। হ্যাঁ, আমি কিয়ামুল লাইলের কথাই শোনাচ্ছি, যাকে আমরা তাহাজ্জুদ বলে থাকি।

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তোমরা অবশ্যই কিয়ামুল লাইল আদায় করবে। কারণ, তা তোমাদের পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস ছিল। তোমাদের রবের নৈকট্য লাভের মাধ্যম এটি। এ ছাড়া পাপ থেকে আত্মরক্ষার পথ এবং দেহের রোগব্যাধি দূরকারী।[২৬২]

রমাদানের প্রতি রাতে তারাবির সালাতে অংশগ্রহণের দ্বারা আমরা এই আমলটি করে থাকি। কিন্তু কিয়ামুল লাইল যে কতটা গুরুত্ব বহন করে, এটা বোঝার জন্য এই একটি বর্ণনাই যথেষ্ট। এটি কোনো সাধারণ আমল নয়। এটি স্রেফ রুকু-সাজদার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তেমনি শুধু রমাদানের জন্যই নির্দিষ্ট নয় এটি; বরং কিয়ামুল লাইল হলো :

১) 'পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস'
পূর্ববর্তী নেককারদের কথা যদি বলতে হয়, তা হলে সবার আগে আসবে আমাদের নবি মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম। তিনি ছিলেন নেককারদের ভিতর সর্বোত্তম, সবচেয়ে পবিত্র সৃষ্টি। সূরা মুজাম্মিল হলো নবিজির ওপর নাযিল হওয়া প্রথম দিকের সূরা। আলিমগণের ভাষ্যমতে সূরাটি নবিজির ওপর অবতীর্ণ হওয়া তৃতীয় কিংবা চতুর্থ সূরা। এই সূরায় আল্লাহ তাঁর নবিকে নির্দেশ দিয়েছেন: 'রাতের বেলা সালাতে দাঁড়াও, তবে কিছু সময় ছাড়া। অর্ধেক রাত কিংবা তার চেয়ে কিছু কম করো। অথবা তার ওপর কিছু বাড়িয়ে নাও। আর ধীরেসুস্থে স্পষ্টভাবে কুরআন তিলাওয়াত করো।'[২৬৩]
যেহেতু সূরা মুজাম্মিল প্রথম দিকের নাযিলকৃত সূরা, তার মানে নবিজিকে দেওয়া আল্লাহর প্রথম নির্দেশসমূহের একটি ছিল কিয়ামুল লাইল। কিয়ামাত-অবধি-আসা মানুষদের হিদায়াতের লক্ষ্যে যে গুরুদায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হবে, কিয়ামুল লাইল ছিল এর পূর্বপ্রস্তুতি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সালাতের বর্ণনা দেবার সময় বলেছেন: '(হে নবি) তোমার রব জানেন যে, তুমি কোনো সময় রাতের প্রায় দুই- তৃতীয়াংশ, কোনো সময় অর্ধাংশ এবং কোনো সময় এক-তৃতীয়াংশ সময় ইবাদাতে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দাও। তোমার সঙ্গী একদল লোকও এ কাজ করে।' [২৬৪]
এই আয়াত নাযিল হয় নুবুওয়তী জীবনের শুরুর দিকে। তখন তিন কী চারটি সূরা নাযিল হয়েছিল মাত্র। অপরদিকে আল্লাহ তাআলা নবিজিকে বললেন, রাতের দুই তৃতীয়াংশের কিছু কম, কিংবা অর্ধরাত সালাতে দাঁড়িয়ে কাটাতেন! অথচ তাকে দেওয়া হয়েছে এই গুটিকয়েক সূরা। তা হলে রাতের এতটা সময় দাঁড়িয়ে তিনি কী করতেন? তিনি কি একই সূরা পুনরাবৃত্তি করে কাটাতেন? না দুআ-যিকর? উত্তর না জানা থাকলেও এটি আমরা সবাই জানি, নুবুওয়াতের সূচনা থেকে জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত নবিজি কিয়ামুল লাইল আদায় করেছেন। সত্যিই কিয়ামুল লাইল ছিল 'তোমাদের পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস।'
আবুয যিনাদ বলেন, 'রাতের শেষ প্রহরে আমি মাসজিদে নববির উদ্দেশে বের হলে প্রতিবার সেখানে কুরআন তিলাওয়াতকারীদের শব্দ পেতাম।' তিনি আরও বলেন, 'ছোটোবেলায় যখন কোনো দরকারে সাক্ষাতের প্রয়োজন হতো, আমরা বলতাম: কারীদের কিয়ামের সময় বের হব।' [২৬৫]
তাউস বলেন, 'আমি রাতের শেষ প্রহরে কাউকে ঘুমোতে দেখিনি।[২৬৬]
ঘটনাটি একবার উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি: একবার এক তলিবুল ইলম ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ-এর বাড়িতে আসে এবং রাত্রিযাপন করে। রাত্রিকালে ইমাম আহমাদ তার কক্ষে এক বালতি পানি রেখে যান, তাহাজ্জুতের সময় সে যেন ওজু করতে পারে এই আশায়। কিন্তু ফজরের সময় ইমাম আহমাদ তাঁর কক্ষে গিয়ে দেখেন, বালতির পানি আগের মতোই আছে। এ দেখে তিনি বলেন, 'সুবহানাল্লাহ! একজন ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ করে, অথচ কিয়ামুল লাইল আদায় করে না!' [২৬৭]
সুবহানাল্লাহ! বিষয়টি সত্যিই আশ্চর্যের। এটা কেবল তলিবুল ইলমের ক্ষেত্রেই নয়, মাসজিদ কমিটির মেম্বার, শিক্ষাখাতে নিযুক্ত ব্যক্তি, দাঈ, কুরআনের শিক্ষার্থী কিংবা আদর্শ সন্তান গঠনে দৃঢ় প্রত্যয়ী মা-বাবা যখন রাতের সালাত আদায় করে না, তখন বড্ড কষ্ট হয়। আমি আরও আশ্চর্য তাদের কথা চিন্তা করে যারা জানে কবরের আযাবের কথা, হাশরের মাঠে পঞ্চাশ হাজার বছর দাঁড়িয়ে থাকার কথাও যারা জানে কিন্তু কিয়ামুল লাইল আদায় করে না।

২) কিয়ামুল লাইল: 'তোমাদের রবের নৈকট্য লাভের মাধ্যম।'
আপনি কি জানতে চান, কীভাবে আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায়? আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে সহজ রাস্তা কোনটা? উত্তরটি পেতে রাতের সালাতে দাঁড়িয়ে যান। নিশ্চিত পেয়ে যাবেন। সম্ভবত এজন্যই ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপনকারীদের আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তারা যেন এই আমল দ্বারা তাঁর প্রশংসা করে। কারণ, এটা আল্লাহর নিকট খুবই মূল্যবান। আর তাদের পুরস্কার? সত্যি বলতে, বিষয়টি আমাদের কল্পনার বাইরে। আল্লাহ বলেন, 'তারা শয্যা ত্যাগ করে, তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশা নিয়ে, এবং তাদেরকে যে রিযক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।[২৬৮]
বিনিময়ে তারা কী পাবে? এর পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'অতঃপর কোনো ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ-জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত তার বিনিময়-স্বরূপ।[২৬৯]
পুরস্কার কী হবে কেন স্পষ্ট করে বলা হলো না? ইমাম ইবনুল কাইয়িম একটি সুন্দর নসিহত দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'গভীরভাবে ভেবে দেখুন, তারা যেমন তাদের রাতের সালাত গোপন রাখত, তেমনি তাদের পুরস্কারও গোপন রাখা হয়েছে, কেউ জানে না।'[২৭০]
তার মানে এই নয় যে, কিয়ামুল লাইলের সবগুলো পুরস্কারই আল্লাহ গোপন রেখেছেন। রাসূল বলেন, 'জান্নাতে একটি প্রাসাদ রয়েছে যার ভিতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভিতর দেখা যাবে।' তখন জনৈক বেদুইন বলল, হে আল্লাহর রাসূল, এটি কার হবে? তিনি বললেন, এটি হবে তার, যে ভালোকথা বলে, অন্যদের আহার করায়, সিয়াম অব্যাহত রাখে এবং রাতে যখন সব মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন উঠে সালাত আদায় করে।'[২৭১]
রাসূল আরও বলেন, 'তিন শ্রেণীর ব্যক্তিকে আল্লাহ ভালোবাসেন, তাদের দেখে হাসেন এবং খুশি হন।... (তিন শ্রেণীর এক শ্রেণী হলো) সেই ব্যক্তি, যার সুন্দরী স্ত্রী এবং নরম বিছানা আছে, কিন্তু সে রাতে সালাতে দাঁড়ায়। আর তাই আল্লাহ বলেন, “সে তার প্রবৃত্তি চাহিদাকে ত্যাগ করেছে এবং আমাকে স্মরণ করেছে। আর সে যদি চাইত, ঘুমিয়ে থাকতে পারত।”[২৭২]
প্রশ্ন আসতে পারে, 'আল্লাহ আমাকে দেখে হাসেন! এর অর্থ কী?' রাসূল বলেন, 'আর তোমার রব যখন কোনো বান্দাকে দুনিয়াতে দেখে হাসেন, (কিয়ামাতের দিন) তার কোনো হিসাব-নিকাশ নেই।' (অর্থাৎ বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে) [২৭৩]

৩) কিয়ামুল লাইল : 'পাপের কাফফারা, পাপ থেকে আত্মরক্ষার পথ।'
কী হতে কী হয়ে গেল বুঝে উঠতে পারেননি। এখন কৃত-পাপ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে আপনাকে। রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। কোনো কাজে শান্তি পাচ্ছেন না। কবরের আযাব, আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর ভয় আপনার মনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। ইউটিউব ঘাটছেন, ফেসবুকের বিভিন্ন পেইজ ঘুড়ছেন, তবুও মনকে শান্ত করতে পারছেন না। দংশন করেই চলেছে। যদি এমন কিছু হয়ে থাকে তা হলে উঠে পড়ুন। কিয়ামুল লাইলকে আঁকড়ে ধরুন, এটাই আপনার চিকিৎসা। কিয়ামুল লাইল পাপের আযাব থেকে নিষ্কৃতি দেয়, আল্লাহর নূর দ্বারা অন্তর পরিপূর্ণ করে দেয়। শুধু তাই নয়, তাওবার পর সেই পাপগুলো পুনরায় সংগঠিত হওয়া ঠেকাতে কিয়ামুল লাইল ঢালের মতো কাজ করে। কিয়ামুল লাইলের সবচেয়ে বিস্ময়কর বাস্তবতা এটাই-এই সালাত শুধু অতীতের পাপই মিটে দেয় না, সাথে আগামীর সম্ভাব্য পাপ অনুপ্রবেশের ছিদ্রগুলোও বন্ধ করে দেয়। ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এজন্যই হয়তো নবিজি কিয়ামুল লাইলকে বলেছেন, 'মুমিনের সম্মান'। পাপ লাঞ্ছনা বয়ে আনে। পাপে জড়িয়ে যাবার পর অন্তরে অপরাধবোধ কাজ করে, নিজের প্রতি ঘৃণা জাগ্রত হয়। আর এ থেকে নিষ্কৃতির পথ কিয়ামুল লাইল। পাপের শৃঙ্খল ভেঙে কিয়ামুল লাইল এনে দেয় স্বাধীনতা, মৃত অন্তরকে করে জাগ্রত, বিইজনিল্লাহ।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আমার কাছে জিবরীল এসে বলল, “মুহাম্মাদ, যতদিন ইচ্ছা বাঁচো, (তবে জেনে রেখো) মৃত্যু তোমার কাছেও আসবে। যাকে ইচ্ছা ভালোবাসো, একদিন তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটবে। যা ইচ্ছা আমল করো, এর প্রতিদান তুমি পাবে। জেনে রাখো, কিয়ামুল লাইল মুমিনের সম্মান। আর ইজ্জত হলো মানুষের থেকে অমুখাপেক্ষী হওয়া।” [২৭৪]
দেখবেন, সাধারণত যারা সালাত ছেড়ে দেয়, তারাই পাপের জগতে হাবুডুবু খাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তারপর এদের পর এমন অপদার্থ লোকেরা এদের স্থলাভিষিক্ত হলো, যারা সালাত নষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব করল। শীঘ্রই তারা এই গোমরাহীর (মন্দ) পরিণামের মুখোমুখি হবে।'[২৭৫] আপনার অতীত কিংবা বর্তমানকে এই মূলনীতির আলোকে যাচাই করুন। আপনি স্পষ্ট দেখতে পাবেন-জীবনের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তগুলোতে সালাতের ব্যাপারে অমনোযোগী ছিলেন। কিয়ামুল লাইল বা রাতের সালাত হচ্ছে মুমিনের সম্মান। এমন এক সম্মান, যা আল্লাহ তাআলা লোকসমাজে প্রকাশ করে দেন। যদিও-বা সেই মুমিন তা গোপন রাখার চেষ্টা করে।
আতা' খুরাসানি বলেন, 'কিয়ামুল লাইল হলো শরীরের জন্য জীবন, কলবের জন্য নূর, দৃষ্টির জন্য আলো, আর অঙ্গ-প্রতঙ্গের জন্য শক্তি। ব্যক্তি যখন রাতের সালাত আদায় করে, পরের দিন এমন আনন্দ নিয়ে জাগ্রত হয়, যা সে অন্তর থেকে অনুভব করতে পারে।' [২৭৬]
তাবিয়ি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, 'যে ব্যক্তি কিয়ামুল লাইল আদায় করে, আল্লাহ তার চেহারায় নূর উদ্ভাসিত করে দেন। তাকে মুসলিমরা ভালোবাসে, যদিও-বা তাকে প্রথম দেখে। বলে, "সত্যিই লোকটাকে আমার খুব ভালো লাগে।” [২৭৭]
ইমাম ওয়াকি' ইবনু জাররাহ রহিমাহুল্লাহ-কে যারাই দেখেছে, একবাক্যে বলেছে— 'এ তো মানুষ নয়, যেন ফেরেশতা!' আর ওয়াকি' ইবনু জাররাহ তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। তেমনিভাবে যারা তাবিয়ি মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন রহিমাহুল্লাহ-কে দেখেছে, তার উজ্জ্বলতায় মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে, 'সুবহানাল্লাহ!' কারণ, তিনিও তাহাজ্জুদ আদায় করতেন।
এর চেয়েও অবাক-করার মতো কথা ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, 'কিছু নারীরা অত্যধিক পরিমাণে রাতের সালাত আদায় করত। তাদেরকে এর কারণ জানতে চাওয়া হলে তারা বলে, "কিয়ামুল লাইল চেহারার মাধুর্য বৃদ্ধি করে। তাই আমি পছন্দ করি, এই সালাত দ্বারা আমার চেহারার রূপ লাবণ্য বেড়ে যাক।” [২৭৮]

আমি নিশ্চিত, ওপরের বর্ণনাটি পড়ে অনেকে হয়তো আজ রাত থেকেই তাহাজ্জুদ শুরু করে দেবেন। হ্যাঁ, এগুলো প্রতিদান। তবে এর চূড়ান্ত প্রতিদান কিয়ামাতের দিনেই প্রকাশ পাবে। এর আগে আসুন, আজকের রাতের প্রস্তুতি নিয়ে কিছু কথা বলি:
কিয়ামুল লাইলে কী পরিমাণ আয়াত আমার পড়া উচিত? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি রাতের সালাতে দশটি আয়াত পড়বে, তার (নাম) গাফেলদের তালিকায় উঠবে না। যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে এক শ আয়াত পড়বে, তার (নাম) অনুগতদের তালিকায় উঠবে। আর যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে এক হাজার আয়াত পড়বে, তার নাম উঠবে মুকান্তিরীন ('কিন্তার' সংগ্রহকারীদের) তালিকায়।[২৭৯]
কিন্তার শব্দের অর্থ: “প্রচুর স্বর্ণ। অধিকাংশ ভাষাবিদদের মতে চার হাজার দিনারের সমান। [...] অন্যদের মতে অসীম ধন-সম্পদকে কিন্তার বলা হয়।[২৮০]
তথাপি কিন্তার দ্বারা আসলে নবিজি কী বুঝিয়েছেন, এর ব্যাখ্যা আরেক হাদীসে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, 'এক কিন্তার দুনিয়া এবং এতে যা কিছু আছে—এসব থেকে উত্তম।[২৮১]
এদিকে সহীহ বুখারির বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার ইমাম ইবনু হাজার একটি চমৎকার তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'সূরা মুলক (৬৭ নং সূরা) থেকে কুরআনের শেষ সূরা পর্যন্ত ১০০০ আয়াত রয়েছে।[২৮২]

- কিন্তু আমার যদি এই পরিমাণ আয়াত মুখস্থ না থাকে? আল্লাহ বলেন, '..অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকু পড়ো...।[২৮৩]
কোনো-এক ভোরে ইবনু উমর আবূ গালিব রহিমাহুল্লাহ-কে বলেন, 'আবূ গালিব, তুমি কি রাতের সালাতে দাঁড়াবে না? অন্তত এক তৃতীয়াংশ কুরআন পড়ো।' আবূ গালিব উত্তরে বলেন, 'এখন তো প্রায় ভোর হয়ে গেছে, কীভাবে সম্ভব?' ইবনু উমর বলেন, 'সূরা ইখলাস-ই কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান।[২৮৪]

- এলার্ম দিয়ে রেখেও যদি উঠতে না পারি? দুশ্চিন্তার কিছু নেই, আল্লাহ আপনাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন না। রাসূল বলেন, 'যে ব্যক্তি রাতের সালাত আদায় করার নিয়ত করে বিছানায় যাবে, অতঃপর সকাল পর্যন্ত ঘুম তাকে কাবু করে ফেললেও নিয়ত অনুযায়ী সে পূর্ণ পুরস্কার পাবে। তখন তার ঘুম হবে মহামহিম রবের পক্ষ থেকে তার জন্য সদাকা-স্বরূপ।' [২৮৫]

- এরপরেও যদি কিয়ামুল লাইলের মিষ্টতা চেখে দেখতে ব্যর্থ হই? নিশিরাতে প্রিয় রবের সাথে গোপন আলাপনের যে সুখ, তা কবিদের কলমেও অবর্ণনীয়। এই আলাপের জন্য প্রতিটি প্রহর গুনতে থাকে রাতের আবিদরা। আল্লাহর সাথে গোপন আলাপ এবং তাঁর সামনে দুআয় হারিয়ে যাবার উৎকণ্ঠা তাদেরকে অস্থির করে রাখে সারাবেলা।
ইমাম আবূ সুলাইমান দারানি বলেন, 'রাতের আবিদরা যে মিষ্টতা রাতে অনুভব করে, তা খেলতামাশায় রত ব্যক্তিদের চেয়েও মিষ্টি। আর রাত বলে যদি কিছু না থাকত, তা হলে আমার বেঁচে থাকাই বৃথা হয়ে যেত। [২৮৬]
আসলে কিয়ামুল লাইলের গুরুত্ব, ব্যাখ্যা, মধুরতা-কোনোটাই ভাষায় প্রকাশ করার মতো না, যতক্ষণ না ব্যক্তি নিজে চেখে দেখছে। ইমাম ইবনু রজব বলেছেন, 'যারা মুনাজাতের স্বাদ পাওয়া ব্যক্তিদের কাতারে নিজেদের শামিল করেনি, তাদের গোপন মুনাজাতের মিষ্টতা দেখেনি, তারা কখনোই বুঝবে না, কোন জিনিসের কারণে মুনাজাতকারীরা কাঁদে। যে ব্যক্তি ইউসুফের সৌন্দর্য দেখেনি, ইয়াকূবের অন্তরের যন্ত্রণা সে কী করে বুঝবে।।[২৮৭]

'কিন্তু আমি তাহাজ্জুদের স্বাদ পাই না কেন?' আপনার মনে হয়তো এই প্রশ্নটি কাজ করছে। আসলে এই রূহানি স্বাদ উপভোগ করতে সময় প্রয়োজন, প্রয়োজন লেগে থাকা। নফস প্রথম প্রথম অনুযোগ করবে, ঘ্যানঘ্যান করবে, বিশ্রামকে প্রাধান্য দেবে, ঘুমানোর বায়না ধরবে, বলবে সময় নেই। অতঃপর যখন নফস অনুধাবন করতে পারবে, আপনি আল্লাহকে পেতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, পরকালের আবাস নির্মাণে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে আছেন, তখন সে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। না করে যে উপায় নেই তার।
তাবিয়ি ইমাম ছাবিত বুনানি বলেন, 'বিশ বছর যাবৎ আমি কিয়ামুল লাইলে সময় ব্যয় করেছি। বিশতম বছরে এসে এর স্বাদ অনুভব করতে পেরেছি।' [২৮৮]

সুসংবাদ তাদের জন্য, যারা নিজেদের কবরগুলো আলোকিত করে এতে নামার পূর্বেই, তাদের রবকে সন্তুষ্ট করে রবের সাথে সাক্ষাতের পূর্বেই, এবং যারা সালাত আদায় করে তাদের ওপর জানাযার সালাত অনুষ্ঠিত হবার আগেই।

টিকাঃ
[২৬১] সমাজ সংস্কারক
[২৬২] তিরমিযি, ৩৫৪৯; হাসান
[২৬৩] সূরা মুজাম্মিল, ৭৩: ২-৪
[২৬৪] সূরা মুজাম্মিল, ৭৩: ২০
[২৬৫] মারুযি, মুখতাসার কিয়ামিল লাইল, ১/৯৮
[২৬৬] আবু নাঈম, হিলতিয়াতুল আওলিয়া, ৪/৫
[২৬৭] মানাকিবু ইমাম আহমাদ, ২৭৩
[২৬৮] সূরা সাজদাহ, ৩২: ১৬
[২৬৯] সূরা সাজদাহ, ৩২: ১৭
[২৭০] ইবনুল কাইয়িম, হাদিল আরওয়াহ, ২৭৮
[২৭১] তিরমিযি, ২৭১৮
[২৭২] মুসতাদরাক হাকীম, ৬৮; সহীহ
[২৭৩] সহীহ আত-তারগীব, ১৩৭১
[২৭৪] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪৬৩/৫
[২৭৫] সূরা মারইয়াম, ১৯ : ৫৯
[২৭৬] ইবনু আবিদ দুনইয়া, আত-তাহাজ্জুদ ওয়া কিয়ামুল লাইল, ১৭
[২৭৭] আবদুল হক, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, ১০৫৪
[২৭৮] রওদাতুল মুহিব্বীন, ২২১
[২৭৯] আবূ দাউদ, ১৩৯৮; সহীহ
[২৮০] ইবনুল আসীর, আন-নিহায়া ফি গারীবিল-হাদীস, ৪/১১৩
[২৮১] সহীহ আত-তারগীব, ৬৩৮
[২৮২] তারগীব, ১/২৪৮
[২৮৩] সূরা মুজাম্মিল, ৭৩: ২০
[২৮৪] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ১/৩০৪
[২৮৫] নাসাঈ, ১৭৮৭
[২৮৬] আদ-দীনূরি, আল-মুজালাসা ওয়া জাওাহিরুল-ইলম, ১/৪৭৩
[২৮৭] লাতাইফুল মাআরিফ, ৪৫
[২৮৮] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ২/৩২০

ফন্ট সাইজ
15px
17px