📄 একটি দুআর গল্প
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি দুআ শ্রবণকারী। [১৭৬]
সন্তান নিয়ে ভাবনা রাতের আরামের ঘুম হারাম করে দেয় বহু মা-বাবার। ওদেরকে কোন স্কুলে দেব, কোন শিক্ষকের কাছে পড়াব, ওদের কেমন রেজাল্ট হবে ইত্যাদি চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। আর মা-বাবা যদি দ্বীনদার হয়, তা তো হলে ভাবনার ফিরিস্তিতে আরও অনেককিছু যুক্ত হয়। ওরা কেমন মুসলিম হবে, বড়ো হলে কতটুকু ইসলাম পালন করবে, ফিতনার যুগে ইসলামের ওপর কীভাবে অটল থাকবে, আখিরাতকে কতটুকু গুরুত্ব দেবে... ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে আপনি যতই প্রস্তুতি গ্রহণ করুন না কেন, ফলাফল আকাশেই নির্ধারণ করা হয়। তাই চেষ্টার পাশাপাশি এই দুআর বিকল্প নেই।
এই প্রবন্ধের শুরুতে একটি দুআ উল্লেখ করেছি। বলতে পারেন, দুআটি কার? দুআটি নবি যাকারিয়্যা করেছিলেন। আর এই দুআর পেছনে মূল প্রেরণা ছিল একজন নারী। তিনি হলেন মারইয়াম।
মারইয়াম-এর দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন যাকারিয়্যা। দিনকে দিন এটা স্পষ্ট হতে থাকে যে, মারইয়াম কোনো সাধারণ মেয়ে নন। যাকারিয়্যা যখনই মারইয়াম-এর ইবাদাতখানায় প্রবেশ করতেন, রিযকের বাহার দেখতে পেতেন। গ্রীষ্মকালে মারইয়াম-এর কাছে শীতকালের খাবার পাওয়া যেত। আবার শীতকালে গ্রীষ্মের খাবার!
আল্লাহ বলেন, كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزْقًا قَالَ يَا مَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا قَالَتْ هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ 'যখনই যাকারিয়্যা মারইয়ামের কক্ষে প্রবেশ করত, তার কাছে খাদ্যসামগ্রী দেখতে পেত; জিজ্ঞেস করল, "মারইয়াম! এসব কোত্থেকে তোমার কাছে আসে?” মারইয়াম বলল, “ওসব আল্লাহর নিকট হতে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বেহিসাব রিযক দান করেন।" [১৭৭]
আল্লাহর বদান্যতার নজির দেখে যাকারিয়্যা তো যারপরনাই অবাক। তিনি আর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন না। সাথে সাথে ছুটে গেলেন মাওলার দুয়ারে। কড়া নাড়লেন তাঁর রহমতের দরজায়। আর আল্লাহ তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি!
আল্লাহ বলেন, هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُ قَالَ رَبِّ هَبْ লِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةٌ طَيِّبَةٌ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ 'ওখানেই যাকারিয়্যা তার রবের কাছে দুআ করল, "রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি দুআ শ্রবণকারী।”[১৭৮]
সম্ভাবনার সব ক'টা দরজা যাকারিয়্যা-এর জন্য বন্ধ ছিল। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। চুল পাঁকতে শুরু করেছিল অনেক আগেই। শরীরের অস্থিমজ্জাও দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। তাঁর স্ত্রীও ছিলেন সন্তান-দানে অক্ষম। কিন্তু আল্লাহ তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। এই বৃদ্ধ বয়সে যা পাবার আকাঙ্ক্ষায় আল্লাহকে ডেকেছিলেন, তা-ই দান করেছেন। বিস্ময়করভাবে আল্লাহ তাআলা সাড়া দিয়েছেন। আসুন, এই ফাঁকে যাকারিয়্যা-এর দুআয় ব্যবহৃত শব্দগুলো একটু বিশ্লেষণ করি। দেখি, তিনি কী এমন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন যার ফলাফল এরকম আশ্চর্যজনক ছিল!
যাকারিয়্যা-এর দুআটি হলো : رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন।'
আয়াতে 'হিবা' শব্দটি এসেছে, যার অর্থ দান করুন। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ 'হিবা চাওয়া'। আর হিবা এমন এক উপহারকে বলা হয়, যা কখনও ফিরিয়ে নেওয়া হয় না। অর্থাৎ, যাকারিয়্যা আল্লাহর নিকট এমন একটি নেক সন্তান আশা করছিলেন, যা হবে আল্লাহর তরফ থেকে বিশেষ উপহার, কখনও ফিরিয়ে নেওয়া হবে না।
رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةٌ 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন।'
শব্দচয়ন দেখে বোঝা যায় যাকারিয়্যা কোনো সাধারণ সন্তান চাননি। তিনি এমন সন্তান চেয়েছেন, যে হবে আল্লাহর নির্বাচিত বান্দা, তাঁর নিরাপত্তার বেষ্টনীতে রক্ষিত এবং তাঁর দয়ার চাদরে প্রতিপালিত।
আচ্ছা, 'আমাকে একটি উপহার দিন' আর 'আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উপহার দিন'-এ দুটো বাক্যের মধ্যে পার্থক্য কী?
দ্বিতীয় বাক্যে রয়েছে একান্ত ভাবের প্রতিচ্ছবি। অর্থাৎ অনুরোধটা স্রেফ উপহারের জন্য নয়, বরং এমন উপহারের জন্য, যা দানকারী দয়াস্বরূপ দেবেন। করুণাবশত দেবেন। আর উপহারটি হবে তাঁর সম্মান ও রাজত্বের সাথে মানানসই। এখন প্রশ্ন হলো, যাকারিয়্যা তা হলে এমন একজন সত্তাকে ডেকে কী উত্তরে পেয়েছিলেন, যিনি রাজাধিরাজ, ধনীদের ধনী, দয়ার আধার? ইন শা আল্লাহ সামনেই জানতে পারব আমরা। আপাতত দুআয় ফিরে যাই:
رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةٌ 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন।'
সন্তানের বাবা হওয়াই যাকারিয়্যা-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না। স্রেফ বাবা হতে পারাকে তিনি যথেষ্ট মনে করেননি। বরং তাঁর বিবেচ্য-বিষয় ছিল সন্তানের দ্বীনদারিতা। সে যেন নেককার হয়। তাঁর দুআর বাক্যটি দেখুন 'একটি পবিত্র সন্তান।'
কত মুসলিম দম্পতি-ই তো বছরের-পর-বছর আল্লাহর নিকট সন্তান চেয়ে দুআ করে! অতঃপর সেই সন্তান দুনিয়াতেই কারও জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, কারও জন্য আখিরাতে। এসব ক্ষেত্রে ভুল মূলত একটা জায়গাতেই হয়-তারা আল্লাহর কাছে কেমন সন্তান চাইছেন, এ ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথাই থাকে না। তাদের কাছে স্রেফ নিঃসন্তান থাকাটাই বেদনাদায়ক। আর সেই কষ্ট দূর করতে পারাটাই তাদের দুআর মূল উদ্দেশ্য।
আয়াতে 'একটি পবিত্র সন্তান' বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? এ বাক্য দিয়ে দুআ করার বিশেষত্ব কী? আলিমগণ বলেন, 'পবিত্র সন্তান বলতে বোঝায়, যার কথা পবিত্র, কাজ পবিত্র, তেমনি দেহও পবিত্র। অর্থাৎ এ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো দৈহিক ও মানসিক-উভয় পবিত্রতা।[১৭৯]
এই নববি দুআ ব্যবহার করা মানে-আপনি আল্লাহর দরবারে এমন সন্তানের জন্য মিনতি করছেন, যার বিশ্বাস হবে পবিত্র, জবান হবে পবিত্র, কাজ-কর্ম পবিত্র, এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। মোটকথা দুনিয়ার সকল দৃষ্টিকোণ থেকে হবে সেরা।
আমরা দেখছি, আমাদের সন্তানেরা কতভাবে বিপথে চলে যাচ্ছে। তাদের এই বিপথগামীতার জন্য আমাদের বেখেয়ালিপনাও দায়ী। তাদের অধিকার আছে আমাদের বেখেয়ালি আচরণ দেখে হতাশ হবার। কেননা, এই আচরণ তো তাদের সাথে জন্মের আগ থেকেই আমরা করে আসছি। বুঝতে পেরেছেন, কোন বেখেয়ালির কথা বলছি? তাদের কল্যাণের জন্য আমরা উপযুক্ত দুআ করিনি। সত্যিই আমরা দুআ করিনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমনটাই হয়, বাবা-মায়েরা এই কাজটির কথা একদম ভুলে যান।
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন। অবশ্যই আপনি দুআ শ্রবণকারী।'
নবি যাকারিয়্যা তার দুআ শেষে আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম উল্লেখ করেন। নামটি এসেছে শ্রবন করা ক্রিয়া থেকে। যাকারিয়্যা খুব ভালো করেই জানতেন, তার চাওয়া-বিষয়টি দুনিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে কল্পনাতীত। কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। আর তাই এমন এক শ্রোতার প্রয়োজন, যিনি সত্যিই তার দুআ শুনবেন এবং এই অসম্ভবকে সম্ভব করবেন। এভাবে যাকারিয়্যা আমাদের শিখিয়ে দিলেন, দুআর ক্ষেত্রে আল্লাহর গুণবাচক নাম ব্যবহার করা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এমন নাম, যা আমাদের দুআর বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যে ব্যক্তি অর্থনৈতিকভাবে দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে দুআয় আল্লাহর এই নামগুলো উল্লেখ করবে- اَلرَّزَّاقُ (রিযকদাতা), اَلْغَنِيُّ (সবচেয়ে ধনী), اَلْكَرِيْمُ (মহানুভব), এরকম আরও যত নাম আছে। আবার যালিমের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট ন্যায়বিচার কামনাকারী বলবে- اَلْقَيُّুমُ (সবচেয়ে শক্তিধর), الْجَبَّارُ (পরাক্রমশালী), اَلنَّصِيرُ (সাহায্যকারী)। আসলে আল্লাহর নামসমূহ নিয়ে আমাদের পড়াশোনা করা খুব জরুরি।
যাকারিয়্যা-এর দুআর শুরুটা ছিল উত্তম, মাঝের কথাগুলোও উত্তম, এবং শেষটাও ছিল উত্তম। আন্তরিকতা এবং আস্থায় গোটা দুআ ছিল ভরপুর। ফলে এর জবাবও ছিল কল্পনাতীত। দুআ করতে-না-করতেই ফেরেশতাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলো সুসংবাদ দিয়ে। আল্লাহ বলেন, فَنَادَتْهُ الْمَلَائِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي فِي الْمِحْرَابِ أَنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيَى مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِّنَ اللَّهِ وَسَيِّدًا وَحَصُورًا وَنَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ 'তখন এর জবাবে তাঁকে ফেরেশতাগণ বলল, আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দান করেছেন। সে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ফরমানের সত্যতা প্রমাণকারী হিসেবে আসবে। তার মধ্যে নেতৃত্ব ও সততার গুণাবলী থাকবে। সে পরিপূর্ণ সংযমী হবে, নুবুওয়াতের অধিকারী হবে এবং সৎকর্মশীলদের মধ্যে গণ্য হবে।' [১৮০]
দায়িত্ববান মুসলিম পিতা-মাতা-মাত্রই নবি ইয়াহইয়া-এর মতো নেক সন্তানের স্বপ্ন দেখে। তাদের জন্য এই দুআ গুপ্তধনের চেয়েও দামি। এটাই ছিল নবি যাকারিয়্যা-এর দুআর ফসল।
পাশাপাশি দুআ কবুলের কিছু কার্যকরী পদ্ধতি আছে। আসুন জেনে নিই:
১) দুআর শুরুটা যেন ভালো হয়
মূল দুআয় যাবার আগে শুরুটা করুন আপনার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। আল্লাহর দরবারে মেলে ধরুন আপনার দুর্বলতা। দাসত্বের মন নিয়ে দুআ শুরু করুন এবং বোঝান- আপনি আল্লাহর প্রতি কতটা আন্তরিক। এমনটাই করেছিলেন যাকারিয়্যা। সূরা মারইয়ামে আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআর পটভূমি তুলে ধরেছেন এভাবে, قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا 'সে বলল, হে আমার রব, আমার হাড়গুলো পর্যন্ত নরম হয়ে গেছে, মাথা বার্ধক্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। হে পরওয়ারদিগার, আমি কখনও তোমার কাছে দুআ চেয়ে ব্যর্থ হইনি।[১৮১]
অন্যভাবে বললে : আপনি আমাকে কখনোই হতাশ করেননি। কখনোই খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। আমার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, আপনি কতটা দয়াবান, করুণাময় এবং কত উদার। এটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আপনি আমাকে এগুলোর সাথেই অভ্যস্ত করিয়েছেন।
২) নিশ্চিত থাকুন, কবুল হবে
দুআর সময় আল্লাহর কাছে আপনি কী আশা করছেন? তিনি কবুল করবেন—এ ব্যাপারে কতটুকু নিশ্চিত আপনি? যাকারিয়্যা-কে দেখুন, তিনি ঠিক ততটাই নিশ্চিত মনে দুআ করেছিলেন, যতটা নিশ্চিত একজন নবি হতে পারেন। আমরা এও দেখেছি, এই দুআ ছিল মারইয়াম-এর কথার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ। অর্থাৎ যখন তিনি জানালেন যে মারইয়াম-এর রিযক আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তখনি দুআ করলেন। আল্লাহ বলেন, 'ওখানেই যাকারিয়্যা তার রবের কাছে দুআ করল...'
অর্থাৎ এক মিনিটও নষ্ট করেননি তিনি। সকল প্রকার সন্দেহ ও দ্বিধা ব্যতিরেকে হাত তুলেছেন। আল্লাহর দরবারে ভিক্ষা চেয়েছেন দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে। আপনিও তা-ই করুন। যখনই কাউকে ভালো কিছু পেতে দেখবেন-জাগতিক হোক কিংবা পরকালীন-দ্বিতীয়বার ভাববেন না, তাৎক্ষণিক আড়ালে চলে যান এবং মহান আল্লাহর সামনে মনখুলে ভিক্ষা চান।
৩) দুআ হোক আখিরাতমুখী
যাকারিয়্যা কেন নেক সন্তানের জন্য ব্যাকুল হয়েছিলেন, সূরা মারইয়ামে আল্লাহ তাআলা আমাদের তা জানিয়েছেন। কারণটা নবির মুখেই শুনুন, তিনি বলেছিলেন, 'আমি আমার পর নিজের স্বগোত্রীয়দের অসদাচরণের আশংকা করি...'।[১৮২]
এখানে 'স্বগোত্রীয়' কারা যাদের ব্যাপারে তিনি আশঙ্কা করছিলেন? আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুর রহমান ইবনু নাসির সা'দী বলেন, '(যাকারিয়্যা বলছেন) আমার মৃত্যুর পর যারা বানী ইসরাঈলের মধ্যে থাকবে, আমার আশঙ্কা, তারা আপনার দ্বীনকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করবে না, আপনার বান্দাদেরকে আপনার পথে আহ্বান করবে না।' [১৮৩]
মুমিনের ধন, সম্পদ, বিয়ে, সন্তান-সন্তুতি-সবকিছুর পেছনে বৃহত্তর স্বার্থ থাকে। মুমিনের নিয়ত থাকে স্বচ্ছ। সে এগুলোকে জান্নাতে পৌঁছাবার পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে এবং দুনিয়ার জীবনে উজ্জ্বল নিদর্শন রেখে যায়। একজন সচেতন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু পেটপুরে খাওয়া আর রঙ-বেরঙের পানীয় পান করা নয়, তার জীবনটা ক্রীড়াকৌতুক করে কাটিয়ে দেবার জন্য নয়, বরং এসবের ঊর্ধ্বে বসবাস করে সে। তার চিন্তাধারা হয় নিঃস্বার্থ, তার চিন্তাধারা হয় বিস্তৃত। তার সকল কাজেকর্মে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
এই দুআ দ্বারা নবি যাকারিয়্যা আমাদেরকে শেখাচ্ছেন, মুসলিম-মাত্রই চিন্তা-ভাবনায় হবে উন্নত। তাদের পরিকল্পনা হবে আখিরাত-কেন্দ্রিক এবং জীবন হবে ইসলামের জন্য নিবেদিত, তারা এর জন্যই বেঁচে থাকে। দুনিয়া থেকে বিদায়ও নেয় বুকে এই আশা রেখে যে, কাল হাশরের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের পরিশ্রম বৃথা যেতে দেবেন না।
৪) আপনার জীবনের গল্প হোক দুআময়
যদি রিযকের কথা বলি তা হলে মানবজাতির জন্য তো বটেই, সমগ্র সৃষ্টিকুলের দুআ করা প্রয়োজন। কেননা আল্লাহ তাআলা সকলের রিযকদাতা। নবি যাকারিয়্যা-এর জীবনে দুআ ছিল অপরিহার্য বিষয়, যার প্রয়োজন তিনি বারবার অনুভব করতেন। দেখুন, আল্লাহ তাআলা যাকারিয়্যা-এর ব্যাপারে কী বলেছেন: هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُ 'ওখানেই যাকারিয়্যা তার রবের কাছে দুআ করল.. [১৮৪]
এ ছাড়া তার ব্যাপারে এও বলেছেন: إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا 'যখন সে তার রবকে গোপনে ডেকেছিল। [১৮৫]
ভিন্ন এক আয়াতে এসেছে: وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ 'আর স্মরণ করো যাকারিয়্যাকে, যখন সে তার রবকে ডেকেছিল... [১৮৬]
এভাবে কুরআনের তিন-তিন জায়গায় আল্লাহ তাআলা যাকারিয়্যা-এর কথা বলেছেন। আর সবগুলোর মূল বিষয়বস্তু ছিল দুআ। হ্যাঁ, আপনার জীবনও হোক একটি দুআর গল্প।
টিকাঃ
[১৭৬] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৮
[১৭৭] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৭
[১৭৮] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৮
[১৭৯] ইবনু উছাইমীন, তাফসীর, ১/২৩২
[১৮০] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৯।
[১৮১] সূরা মারইয়াম, ১৯:৪
[১৮২] সূরা মারইয়াম, ১৯:৫
[১৮৩] তাফসীর ইবনু সা'দী, ৪৮৯
[১৮৪] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৮
[১৮৫] সূরা মারইয়াম, ১৯:৩
[১৮৬] সূরা আম্বিয়া, ২১ : ৮৯
📄 মুমিনের সামাজিকতা
আমরা সামাজিক জীব। আমাদের জীবনে প্রতি পদে পদে প্রয়োজন হয় সঙ্গী-সাথির। পরিবার এবং বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে থাকতে পছন্দ করি আমরা। অন্যদের সাথে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো ভাগাভাগি করতে আমাদের ভালো লাগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার, ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ঝোঁক—এসবকিছু আমাদের ফিতরাতের দিকটাকেই ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ সামাজিকতা এবং একে অপরের সাথে মত বিনিময়ের প্রতি উদ্গ্রীব থাকা আমাদের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। আলিমদের মুখে প্রচলিত 'মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক জীব' এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। [১৮৭]
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন। মানব-অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম। আর তাই ইসলাম এই সামাজিকতাকে অস্বীকার করে না। বরং সমাজের প্রত্যেকে সদস্যকে এই বিষয়ে পরিপূর্ণ দিক-নির্দেশনা প্রদান করে। সামাজিকতার লাভ-ক্ষতি নির্ভর করে আল্লাহভীতির ওপর। কেউ কেউ আড্ডায় বা মজলিসে এমন সব কল্যাণকর ভূমিকা রাখে, যার দ্বারা সে আল্লাহর কাছে আরও উঁচু মাকাম অর্জন করে। জান্নাতের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। অপরদিকে কেউ হয়তো এই মজলিসে বসেই নিচু স্তরে নেমে যায়, পৌঁছে যায় জাহান্নামে। আমাদের মজলিসগুলো সাধারণ নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে:
১. আল্লাহকে স্মরণ হয়, নয়তো ভুলে যাওয়া হয়,
২. অন্যের সম্মান রক্ষা পায় কিংবা বিনষ্ট হয়,
৩. প্রতিভা প্রকাশিত হয়, অথবা তুচ্ছজ্ঞান করা হয়,
৪. উপদেশ মানা হয় কিংবা অস্বীকার করা হয়,
৫. পাপ অর্জন হয় কিংবা মুছে যায়,
এভাবেই দিনশেষে জান্নাত নসিব হয় নতুবা জাহান্নাম।
আর সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, আমরা প্রতিদিনই এই ধরণের আড্ডায় অংশগ্রহণ করি; হয়তো দৈনিক দশ বারেরও বেশি! আসলে পুরো জীবনটাই এরকম মিটিং বা আড্ডায় ঘেরা। আমাদের কেউ-না-কেউ হয়তো কোনো আড্ডায় বসে আছে। কিছুক্ষণ পর কর্মক্ষেত্রে গিয়ে আরেক দফা বসবে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বসা হবে তৃতীয়বারের মতো। আবার সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে লগিং করার দ্বারা আমরা চতুর্থবারের মতো বসি। এভাবে চলতে থাকে বিরতিহীনভাবে। ঠিক এজন্যই সামাজিকতায় ইসলামি দিক-নির্দেশনাগুলো জানা একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। এটা জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়।
আজ আপনার সামনে এমন কিছু দিক-নির্দেশনা তুলে ধরতে চাই, যেন আজকের পর থেকে আমাদের কোনো মজলিস কিংবা আলোচনাই বৃথা না যায়। বরং এগুলো জান্নাতে পৌঁছোবার মাধ্যম হয়। আমরা এও আশা করি, দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি আলোচনা, প্রতিটি আড্ডা কাল হাশরের ময়দানে আমাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।
১) সালাম দিয়ে প্রবেশ করুন, সালাম দিয়েই বিদায় নিন
কীভাবে একটি মজলিসে অংশগ্রহণ করবেন, এ নিয়ে পদ্ধতির শেষ নেই। বিভিন্ন জন বিভিন্ন অভিবাদনের কথা বলবন। কিন্তু সালামের চেয়ে উত্তম অভিবাদন মিলবে না কোথাও।
রাসূল বলেন, إِذَا انْتَهَى أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَجْلِسِ فَلْيُسَلِّمْ، فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقُومَ فَلْيُسَلِّمْ، فَلَيْسَتِ الأُولَى بِأَحَقَّ مِنَ الآخِرَةِ 'তোমাদের কেউ মজলিসে উপস্থিত হলে যেন সালাম দেয় এবং মজলিস হতে বিদায়ের সময়ও যেন সালাম দেয়। শেষ সালাম প্রথম সালামের মতোই জরুরি। [১৮৮]
এই হাদীস মেনে যে-কোনো মজলিসে অংশগ্রহণের দ্বারা আপনি এই কথাটিই প্রমাণ করেন-'আমি এই বৈঠকে বসলাম শান্তির বার্তা নিয়ে। এখানে উপস্থিত কিংবা অনুপস্থিত কেউই আমার দ্বারা কোনো আঘাত পাবে না। বিদায়বেলাতেও শান্তির বার্তা রেখে আমি প্রস্থান করব।'
২) প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর স্মরণে কাটান
আলোচনার মজলিসে কেউই সর্বক্ষণ কথা বলে না। তা ছাড়া এমনটি করা প্রশংসনীয় কাজও নয়। তাই সাময়িক বিরতির মুহূর্তগুলো আল্লাহর যিকরে কাটান, পরকালের জন্য কিছু বিনিয়োগ করে ফেলুন। রাসূল বলেন, مَا مِنْ قَوْمٍ جَلَسُوا مَجْلِسًا لَّمْ يَذْكُرُوا اللهَ فِيهِ إِلَّا رَأَوْهُ حَسْرَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ 'কোনো জাতি যদি বৈঠকে আল্লাহর যিকর না করে, তা হলে নিশ্চিত তাদের এই বৈঠক কিয়ামাতের দিন আফসোসের কারণ হবে।[১৮৯]
রাসূল-এর মন সর্বদা আল্লাহর সাথে জুড়ে থাকত। আর যারাই তাঁর সাথে বসেছে বিষয়টি লক্ষ্য করেছে, প্রত্যেক বিরতিতে নবিজির ঠোঁট আল্লাহর যিকরে নড়ছে। আবদুল্লাহ ইবনু উমর এমনটাই দেখেছেন: كُنَّا نَعُدُّ لِرَسُولُ اللهِ - صلى الله عليه وسلم - فِي الْمَجْلِسِ الْوَاحِدِ مِئَةَ مَرَّةٍ: «رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 'আমরা গণনা করে দেখলাম এক বৈঠকেই আল্লাহর রাসূল এক শ বার বললেন, رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 'ও আমার রব, আমাকে মাফ করুন, আমার তাওবা কবুল করুন। অবশ্যই আপনি তাওবা কবুলকারী এবং অত্যন্ত দয়াময়।[১৯০]
আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকার মানে এই নয়-মজলিসে গিয়ে ধ্যান ধরে বসে হবে, কারও প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না। এজন্য আমাদের তৃতীয় দিক-নির্দেশনা :
৩) প্রত্যেকের প্রতি মনোযোগী হন
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বর্ণনা করেন, রাসূল একটি আংটি বানিয়ে নিয়েছিলেন, সেটি পড়ে থাকতেন। পরবর্তীকালে তিনি সাহাবিদের বলেন, شَغَلَنِي هَذَا عَنْكُمْ مُنْذُ الْيَوْمِ، إِلَيْهِ نَظْرَةٌ، وَإِلَيْكُمْ نَظْرَةٌ 'আজ এই আংটি আমাকে তোমাদের থেকে গাফেল করে দিয়েছে। একবার আমি এর দিকে তাকাই, আরেকবার তোমাদের দিকে।' অতঃপর রাসূল সেই আংটি ফেলে দিলেন।[১৯১]
আলোচনা চলাকালে আপনার মোবাইল দূরে রাখুন। ল্যাপটপ বন্ধ করে দিন। আইপ্যাড একপাশে সরিয়ে রাখুন। আরও যতকিছু আছে মনোযোগ ছিনিয়ে নিতে পারে, সব সরিয়ে রাখুন। বিশেষ করে মা এবং বাবা এবং পরিবারের সাথে বসার সময় এসব যেন আপনার মনোযোগ ছিনিয়ে না নেয়, সে ব্যবস্থা করুন।
৪) সাহস নিয়ে অন্যের সংশোধন করুন
আলোচনার শুরুটা হয়তো ভালো কথা দিয়েই হয়েছিল, কিংবা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে এর মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যেতে থাকল। একপর্যায়ে তা পাপের কারণ হয়ে গেল! এই মোড় পরিবর্তন হতে পারে গীবত, দ্বীন নিয়ে হাসি-তামাশা করা, কিংবা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করা, অনিশ্চিত বা যাচাই ছাড়া কোনো বিষয়ে আলোচনা করা, কিংবা কুদৃষ্টি দেওয়া, মাদক-সেবন, অথবা সালাতের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়া। এই ধরণের অনেক কিছুই হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আপনার কাজ হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে মার্জিত ভাষায় নসিহত করা। আর এতে যদি কাজ না হয়, তা হলে সেই বৈঠক পরিহার করা। এটিই সর্বোত্তম। কিন্তু আপনি যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকেন, চুপচাপ দেখে যান তাদের অন্যায়গুলো, তা হলে আল্লাহর কাছে আপনিও তাদের মতোই সমান দোষী সাব্যস্ত হবেন।
আল্লাহ বলেন, وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ 'আর হে মুহাম্মাদ, যখন তুমি দেখো, লোকেরা আমার আয়াতের মধ্যে দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছে তখন তাদের কাছ থেকে সরে যাও, যে পর্যন্ত না তারা এ আলোচনা বাদ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়।' [১৯২]
অন্য এক আয়াতে আরও কঠিন ভাষায় সাবধান করা হয়েছে : وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ 'আর আল্লাহ এই কিতাবে তোমাদের পূর্বেই হুকুম দিয়েছে—যেখানে তোমরা আল্লাহর আয়াতের বিরুদ্ধে কুফরি কথা ও তাঁর প্রতি বিদ্রুপ করতে করতে শুনবে, সেখানে বসবে না; যতক্ষণ না লোকেরা অন্য প্রসঙ্গে ফিরে আসে।[১৯৩]
পাপে অংশগ্রহণ করা আর পাপের স্থানে চুপটি মেরে বসে থাকা একই কথা। এজন্য ইমাম কুরতুবী ওপরের আয়াতের তাফসীরে বলেন, 'কেউ যদি কোনো পাপের আড্ডায় বসে এবং তাদের প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়, তবে পাপের দিক থেকে তারা সবাই সমান।[১৯৪]
ইবরাহীম নাখঈ বলেন, 'এক লোক এক মজলিসে বসল, এবং এমন কথা বলল যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে। ফলে তার ওপর রহমত বর্ষিত হয় এবং তার সাথে-বসা সকলের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে আরেক লোক হয়তো মজলিসে বসে এমন কথা বলল, যা আল্লাহর ক্রোধের কারণ হলো। ফলে তার ওপর ক্রোধ বর্ষিত হয় এবং তার সাথে বসা বাকিরাও এই ক্রোধের মধ্যে পড়ে।[১৯৫]
৫) গোপন কথা বলতে মানা
অন্যের গোপন কথা বলে বেড়ানোর স্বভাব আমাদের একটু বেশিই। বিশেষ করে স্বামী- স্ত্রীরা আড্ডা দেবার সময় কে কী বলেছে তা সূক্ষ্মভাবে একে অপরকে বলে দেয়। অথচ যাদের গোপনীয়তা আমরা ফাঁস করে দিলাম, তারা আমাদেরকে বিশ্বাস করেই কথাগুলো শেয়ার করেছিল। আমরা তাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করলাম। আর বন্ধুকে এটা বলার মানে হয় না 'এই কথা কাউকে বলবি না।' কারণ, একজনের কথা অন্য জনকে না বলাটাই তো স্বাভাবিক হওয়ার কথা। অনুরোধ করতে হবে কেন? রাসূল বলেন, المجالس بالأمانة অর্থাৎ 'মজলিস আমানতের অন্তর্ভুক্ত।[১৯৬]
আনমনে আপনার মুখে যা এল বলে দিলেন, অথচ সে বিষয়টিই অন্য কারও চোখে বিশাল সমস্যার কারণ হতে পারে। আলোচনায় সর্বদা এমন গোপন কথা বলার দরকার নেই। যখন বুঝা যাচ্ছে এসব প্রকাশ করে সত্যিকারার্থে কোনো ফায়দা নেই, তখন গোপন কথা ফাঁস করারও প্রয়োজন নেই।
৬) উত্তম-সঙ্গ নির্বাচন করুন
কত মানুষ যে স্রেফ সঙ্গীর কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আল্লাহই ভালো জানেন। তদ্রূপ কত মানুষ যে শুধুমাত্র সঙ্গীর কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, আল্লাহই ভালো জানেন। সঙ্গী বাছাইয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হাশরের ময়দানে অনেকেই তার পরিণতির জন্য বন্ধুদের দায়ী করবে। আল্লাহ বলেন, وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا 'আর সেদিন জালিম নিজের হাত দুটো কামড়িয়ে বলবে, “হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোনো পথ অবলম্বন করতাম!” “হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।”[১৯৭]
জীবনে সবকিছুর মানদণ্ড সব সময় এক রকম থাকে না। রকমারি খাবার, খেলাধুলা, দাওয়া, জ্ঞানার্জন, ইবাদাত, মানুষের সাথে ওঠাবসা করা-সবকিছুরই প্রভাব জীবনে পড়ে। আপনি অনুধাবন করতে পারেন কিংবা না পারেন, আপনার সঙ্গীসাথিদের ভালো লাগার বিষয়গুলো সময়ের ব্যবধানে একদিন আপনারও ভালো লাগায় পরিণত হবে।
এজন্য আমাদের পূর্বসূরিগণ সঙ্গ-গ্রহণের ব্যাপারে খুব সতর্কতা অবলম্বন করতেন। বিশেষ করে নতুন কোনো শহরে গেলে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। তাবিয়ি আলকমা বলেন, 'আমি শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) শহরে পৌঁছে সেখানে দু রাকআত সালাত আদায় করলাম। এরপর দুআ করলাম, "আল্লাহ, আমার জন্য নেক মজলিস (খুঁজে পাওয়া) সহজ করে দিন।' দুআ শেষ করে এক বৈঠকে গিয়ে বসে পড়লাম। সেখানে একজন শাইখ এলেন। আমার কাছাকাছি বসলেন তিনি। আমি জানতে চাইলাম, উনি কে। লোকেরা বলল, উনি রাসূল-এর সাহাবি আবুদ দারদা [১৯৮]।
একইভাবে হুরাইস ইবনু কাবীসা বলেন, 'আমি মদীনায় পৌঁছে দুআ করলাম, "আল্লাহ, আমার জন্য নেক বৈঠক সহজ করে দিন।” ফলে আবূ হুরায়রা-এর মজলিসে বসার তাওফীক পেয়ে গেলাম। [১৯৯]
আসলে আমাদের সালাফগণ নিম্নোক্ত হাদীসটির আসল মর্ম বুঝতে পেরেছিলেন: الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلْ 'ব্যক্তি তার বন্ধুর দ্বীনের ওপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়। কাজেই, তোমাদের প্রত্যেকেই যেন খেয়াল করে সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে। [২০০]
আর এটা কোনো অজুহাত হতে পারে না যে, বর্তমানে মুত্তাকী, পরকাল-অভিমুখী লোক নেই। আপনার কাজ হলো ইখলাসের সাথে আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাওয়া, যেন তিনি আপনাকে তাদের নিকটবর্তী করে দেন। এবং তাদেরকেও আপনার কাছে পৌঁছে দেন।
৭) উপকারী কথাই শুধু বলুন
কী বলছেন এবং কীভাবে বলছেন—এর ওপর অনেক ফলাফল নির্ভর করছে, এরকম পরিস্থিতিতে আপনি প্রায়ই পড়বেন। আপনার কথা যেমন দুনিয়া সাজায়, তেমনি সাজায় আখিরাতের জীবন।
আর তাই রাসূল বলেন, مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং কিয়ামাত-দিবসের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে নতুবা চুপ থাকে’।[২০১]
মনের ভাব প্রকাশে কথা বলা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে খুব দ্রুত মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। মুখের ওপর লাগাম পরানোর অর্থ হলো, নিজের বদ-অভ্যাসের ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আর আল্লাহ যে আপনাকে দেখছেন, এটার ওপরও আপনার বিশ্বাস আছে। তাই তো কথা বলার সময় আপনি সচেতন হচ্ছেন। কী বলতে যাচ্ছেন, তা বলার আগে যাচাই করে নিচ্ছেন।
‘আমি কোনো অকল্যাণকর কথা বলব না’—যে ব্যক্তি নিজের জীবনে এটি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তার ব্যক্তিগত-সমস্যা, সামাজিক-সমস্যা, সর্বোপরি আখিরাত-কেন্দ্রিক সমস্যা এবং বিপদাপদ আগেভাগেই দূর হয়ে যাবে বিইজনিল্লাহ।
৮) রসিকতা আর বিদ্রুপ এক নয়
রসিকতার উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবেশ কিছুটা হালকা করা এবং উপস্থিত জনতার মধ্যে আনন্দের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু এটা যদি সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দেবার উপক্রম হয় কিংবা কাউকে দুঃখ পৌঁছায়, তখন সেটা আর রসিকতা থাকে না, বরং উপহাস-বিদ্রুপে পরিণত হয়। আর আল্লাহ এ ধরণের কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِسَاءٍ عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُসَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ 'ঈমানদারগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে সে বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা কোরো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ নাম কতই-না নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম। [২০২]
যাকে নিয়ে মজা করা হচ্ছে, সে হয়তো আমাদের কথায় মুখ ফুটে হাসছে। কিছু বলছে না। এর মানে কিন্তু এই নয়, সে আমাদের উপহাস ভালোভাবে নিয়েছে বা মন থেকে গ্রহণ করেছে। বরং হাসি দ্বারা হয়তো প্রচণ্ড আঘাত সে আড়াল করতে চাইছে। কবির ভাষায়: 'কখনও কখনও সম্মানিত ব্যক্তি চুপ থাকে উত্তর দেবার ভয়ে যদিও-বা সে পারদর্শী বাগ্বিতণ্ডায়। কখনও কখনও সম্মানিত ব্যক্তি মুচকি হাসে, যদিও-বা অন্তরটা পুড়ে যাচ্ছে কষ্ট যাতনায়। [২০৩]
একদিন নবিজি-কে রসিকতা করতে দেখে সাহাবিগণ প্রশ্ন করলেন : আল্লাহর রাসূল, আপনিও আমাদের সাথে রসিকতায় অংশগ্রহণ করছেন? তিনি উত্তরে বললে, 'তবে আমি শুধু সত্য কথাই বলি।[২০৪]
নবিজি রসিকতার সাথে উপহাস গুলিয়ে ফেলতেন না। শ্রোতার মানসিকতার জন্য ক্ষতিকর কিছু বলতেন না তিনি। তাঁর মধ্যে ছিল না মিথ্যাবাদিতা কিংবা কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার করার স্বভাব। তেমনি তাঁর রসিকতা মাত্রাতিরিক্ত হতো না।
৯) সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করুন
যৌবনকালে কখনও অপমানিত হলে, তা আমাদের সব সময় তাড়া করে বেড়ায়। তেমনিভাবে প্রেরণাদায়ক মুহূর্তগুলো এবং উৎসাহ-প্রদানকারী কথাগুলোও আমরা ভুলতে পারি না। আর তাই আপনি যখন কোনো বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন, চেষ্টা করবেন উপস্থিত জনতার সুপ্ত প্রতিভাগুলো বিকশিত করতে। উৎসাহ দেবেন এবং তাদের প্রতিভাগুলো বেঁধে দেবেন পরকালের সুতোয়। অর্থাৎ কীভাবে তারা এই গুণ কাজে লাগিয়ে জান্নাত-পানে ছুটে যেতে পারে, সে ব্যাপারে নির্দেশনা প্রদান করবেন।
ইতিহাসের পাতায় এমন মহৎ ব্যক্তি অনেক, যাদের জীবনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল স্রেফ একটি উক্তি থেকে। হ্যাঁ, মজলিসের একটি কথাই তাদের গোটা জীবন পাল্টে দিয়েছিল। দুটো উদাহরণ দিই:
সাধারণ একটি বৈঠক চলছিল। উপস্থিত জনতা একে অপরের সাথে মত বিনিময় করছিল সেখানে। ইমাম যাহাবি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ শাইখ বিরযালি ইমাম যাহাবি-কে ডেকে বললেন, 'তোমার হাতের লেখা হাদীস-বিশারদদের মতো।' এই কথাটিই যাহাবি-এর জীবনের মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়। পরবর্তীকালে যাহাবি বলেন, 'সেদিন থেকে আল্লাহ তাআলা আমার অন্তরে হাদীসশাস্ত্রের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে দিলেন।'[২০৫]
পরবর্তী জীবনে তিনি ইলমের ময়দানের বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং এমন অসংখ্য বই রচনা করেন যেগুলো ছাড়া আজ আমরা লাইব্রেরি তৈরির কথা কল্পনাও করতে পারি না।
তেমনিভাবে একটি সাধারণ মন্তব্য ইমাম বুখারি-কে হাদীস সংকলন করতে উৎসাহ প্রদান করে। আজ তার সংকলিত 'সহীহ বুখারি' সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যে কুরআনের পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ। ইমাম বুখারি-এর ভাষ্যমতে এর শুরুটা যেভাবে হয়েছিল: 'আমরা ইসহাক ইবনু রাহাউইহ-এর দারসে বসে ছিলাম। তিনি বললেন, "তোমরা যদি নবিজি-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত হাদীস-গ্রন্থ সংকলন করতে!”” ইমাম বুখারি বলেন, 'তাৎক্ষণিক আমার মনে এই কাজ করার ইচ্ছা উদয় হলো। সেদিন থেকেই আমি বিশুদ্ধ হাদীস সংকলনের যাত্রা শুরু করি।।[২০৬]
বলে রাখা ভালো, ইমাম বুখারি যখন এই কাজ শুরু করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১৬ বছর। সেদিন থেকে পরবর্তী ১৬ বছর তিনি এই সহীহ বুখারির পেছনেই ব্যয় করেন।
আপনি হয়তো কোনো-এক বৈঠকে অনুপ্রেরণাদায়ক কিছু কথা বললেন। কিন্তু দেখা গেল, আপনার সেই কথাগুলো কারও অন্তরে গিয়ে বিঁধেছে। আপনার কথার দ্বারাই পাল্টে গেছে তার পুরো জীবন। আমূল পরিবর্তন হয়েছে তার দৃষ্টিভঙ্গির। দিনশেষে তার অর্জিত সাওয়াবের ভাগীদার আপনিও হবেন ইন শা আল্লাহ।
১০) দুআ দ্বারা শেষ করুন
আমাদের অভিজ্ঞতা বলে সব আলোচনার পরিসমাপ্তি ভালো কিছু দিয়ে হয় না। গুরুত্বপূর্ণ কথা থেকে অহেতুক আড্ডার দিকে গড়ায়। তারপর রাগের মাথায় গলার স্বর উচু হয়ে যাওয়া, খারাপ শব্দ ব্যবহার করা, দুনিয়াবি আলোচনায় ডুবে যাওয়া, কিংবা খুব বেশি- মাত্রায় ঠাট্টা মশকরা করা-এভাবে বহু মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।
আমি নিশ্চিত, এরকম কোনো আড্ডা থেকে কেটে পড়তে আপনি খুব উদ্গ্রীব হয়েছিলেন। সুযোগ খুঁজতে খুঁজতে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। আমাদের এই অধ্যায়ের সর্বশেষ নির্দেশিকা আপনার অস্থিরতা দূর করতে এবং অন্তরের প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বিইজনিল্লাহ।
রাসূল বলেন, مَنْ جَلَسَ في مَجْلِسٍ، فَكَثُرَ فِيهِ لَغَطُهُ فَقَالَ قَبْلَ أَنْ يَقُومَ مِنْ مَجْلِسِهِ ذَلِكَ: سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لا إلهَ إِلا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ، إِلَّا غُفِرَ لَهُ مَا كَانَ في مَجْلِسِهِ ذَلِكَ
'কেউ এমন বৈঠকে বসল যেখানে (অহেতুক) শোরগোল বেড়ে গেল, কিন্তু প্রস্থানের পূর্বে সে যদি বলে, "আল্লাহ, আপনি বড়োই পবিত্র, আপনার জন্যই প্রশংসা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনার কাছে মাফ চাচ্ছি এবং আপনার কাছে তাওবা করছি।” তা হলে সেই বৈঠকে-হওয়া যাবতীয় গুনাহ থেকে সেই ব্যক্তি ক্ষমা পেয়ে যাবে।' [২০৭]
এ থেকেই বোঝা যায় কেন রাসূল-এর জিহ্বায় সর্বদা ওপরের দুআটি লেগেই থাকত। আমাদের মা আয়িশা বলেন, 'এমন কোনো বৈঠক নেই, তিলাওয়াত নেই, সালাত নেই, যা শেষ করার পর আল্লাহর রাসূল এই দুআ পড়তেন না।' [২০৮]
এই যদি হয় রাসূল-এর ইতি টানা, অথচ যারা তাঁর সঙ্গ গ্রহণ করত, তারা ছিল নির্ভেজাল যিকরকারী এবং সর্বদা আল্লাহর প্রশংসাকারী। তা হলে আমার আপনার বৈঠকের সমাপ্তি কেমন হওয়া উচিত!
রেস্টুরেন্টের টেবিল থেকে ওঠার সময়, পরিবারের সাথে সন্ধ্যার বৈঠক শেষে, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে করা চ্যাট করার পর—আল্লাহর রাসূলের হারিয়ে-যাওয়া এই সুন্নাহ পুনরুজ্জীবিত করুন এবং অন্যদেরও করতে উৎসাহিত করুন।
সবশেষে আদবের অনেক বিষয় রয়ে গেছে যা আমি উল্লেখ করতে পারিনি। আশা করি পাঠক ব্যক্তিগত তাগিদে সেগুলো জেনে নেবেন। তবে পুরো লেখাটির মূল উপপাদ্য ছিল দ্বীন ইসলামের সৌন্দর্য বোঝানো। ইসলাম আমাদেরকে কোনো বিষয়েই অজ্ঞতার অন্ধকারে ফেলে রাখে না। যে ব্যক্তি মনে-প্রাণে আল্লাহকে চায় এবং চায় জান্নাতে একটি ঘর বানাতে, তাকে জীবনের পরতে পরতে নিখুঁত পথনির্দেশ প্রদান করে ইসলাম।
অধ্যায়টি কেবল বৈঠকের আদবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং মুখের ওপর লাগাম, দৃষ্টি অবনত, আল্লাহর যিকরের গুরুত্ব, মানুষের সম্মান রক্ষা করা, দুআ, আমানত রক্ষা করা, ভালো কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা, এ ছাড়া আরও অনেক কিছুই উদ্দেশ্য ছিল। এগুলো সব আমাদের আড্ডা কিংবা মজলিসেরই অংশ। আর সত্যি বলতে কী। জীবনটা স্রেফ কিছু বৈঠকেরই সমষ্টি।
ও আল্লাহ, আজকের পর থেকে আমাদের সকল বৈঠক, সকল আলোচনা, আড্ডাকে তুমি জান্নাতে প্রবেশের ওসীলা বানিয়ে দিয়ো!
টিকাঃ
[১৮৭] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৬২
[১৮৮] মুসলিম: ৫২০৮
[১৮৯] সহীহ ইবনু হিব্বান, ৮৫৩
[১৯০] আবূ দাউদ, ১৫১৬; সহীহ
[১৯১] নাসাঈ, ৫২৮৯
[১৯২] সূরা আনআম, ৬ : ৬৮
[১৯৩] সূরা আন-নিসা, ৪: ১৪০
[১৯৪] তাফসীর আল-কুরতুবী, ৫/৪১৮
[১৯৫] ইবনুল জাওযী, যাদুল-মাসির, ১/৪৮৮
[১৯৬] আবূ দাউদ, ৪৮৬৯
[১৯৭] সূরা ফুরকান, ২৫: ২৬-১৭
[১৯৮] বুখারি, ৩৭৮৭
[১৯৯] তিরমিযি, ৪১৩
[২০০] তিরমিযি, ২৩৭৮
[২০১] বুখারি, ৬২০৮
[২০২] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১১
[২০৩] শুআবুল ঈমান, ৯৬২৫
[২০৪] তিরমিযি, ১৯৯০
[২০৫] সিয়ার, ১/৩৬
[২০৬] তাদরীবুর রাবী, ১/৮৮
[২০৭] তিরমিযি, ৩৪৩৩
[২০৮] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ১০০৬৭
📄 আমি সবাইকে মাফ করে দিয়েছি
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ-এর জীবন-বৃত্তান্ত নিয়ে যত আলোচনা করা হয়, অধিকাংশ আলোচনা থাকে তাঁর জ্ঞান-সমুদ্র, নির্ভয় মনোবল, সাহসিকতা আর বাগ্মিতা নিয়ে। কিংবা প্রখর স্মৃতিশক্তি, জিহাদের ময়দানে বীরদীপ্ত চরিত্র নিয়ে। অথবা সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধের ব্যাপারে তিনি কতটা সোচ্চার ছিলেন— এই বিষয়গুলোর মধ্যেই সাধারণত আলোচনা ঘুরপাক খায়। কিন্তু বিস্ময়ভরা এই মহান ব্যক্তির জীবনের সৌন্দর্যমণ্ডিত আরেকটি দিক আলোচনায় বাদ পড়ে যায়। এমন একটি দিক, যা অন্য যে-কোনো সময়ের তুলনায় আজকের দিনে মুসলিম উম্মাহর খুব জন্য বেশি প্রয়োজন।
তাঁর ব্যক্তিত্বের সেই দিকটি হলো ‘ক্ষমাশীলতা’। ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ-এর জীবনের অন্যতম একটি শ্লোগান ছিল: 'যত মুসলিম আমাকে কষ্ট দিয়েছে, আমি সবাইকে মাফ করে দিয়েছি। [২০১]
সত্যিই, এ ধরণের অভিব্যক্তি মুখে বলা সহজ, আমল করা কঠিন। কিন্তু তিনি এই কথার ওপর যেভাবে আমল করতেন, সেটাও ছিল বিস্ময়কর। ‘সবাইকে মাফ করে দিয়েছি’ এই কথাটা এখন ফটোশপ দিয়ে সুন্দর মডেল দাঁড় করার মতো বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এর সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ফেসবুকে বলুন আর টুইটার, যেখানে-সেখানে এগুলো চোখে পড়ে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়নের বেলায় অধিকাংশ মানুষেরই পদস্খলন ঘটে।
দেখা যাক, ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ সত্যিকারার্থে কতটা অবিচল ছিলেন নিজের বক্তব্যে। ইবনু তাইমিয়্যা এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আলি ইবনু ইয়াকুব বাকরি সৃফির ঘটনা :
'আল-ইস্তিগাছা' নামে ইবনু তাইমিয়্যা-এর একটি বই আছে। এর বিষয়বস্তু দুআ দ্বারা সাহায্য চাওয়া। এটি অ্যাকাডেমিক পদ্ধতিতে লেখা বই। অর্থাৎ প্রতিটি কথা দলিলসহ পাবেন। আলি বাকরি তাঁর লেখার ভুল খণ্ডনোর পরিবর্তে তাঁর বিরুদ্ধে ফাতওয়া জারি করল। সে বলল, ইবনু তাইমিয়্যা কাফির হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, নানাভাবে ইবনু তাইমিয়্যা-এর সম্মানহানীর অপচেষ্টা চালাল সে। আর রাষ্ট্রের কানে মন্ত্র দিল তাঁকে বন্দি করার জন্য। ফলে ৭০৭ হিজরিতে ক্ষমতাসীনরা তাঁকে বন্দি করার সিদ্ধান্ত নিল। তখন সেই আলি বাকরিই জোরাজুরি করতে লাগল, যেন ইবনু তাইমিয়্যা-কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়!
ইবনু তাইমিয়্যা-এর ওপর পরীক্ষার মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলছিল। ৭১১ হিজরিতে আলি বাকরির উস্কে-দেওয়া একদল উগ্র সুফি পথিমধ্যে ইবনু তাইমিয়্যার পিছু নিল। তারা তাকে কোণঠাসা করে বেধর মারপিট করল। এরূপ আকস্মিক আক্রমণ তাঁর সাথে একাধিকবার ঘটেছে। তারপর যখন ইবনু তাইমিয়্যা-এর কল্যাণকামী ব্যক্তিবর্গ আসল সত্যতা জানতে পারল, তখন তারা আলি বাকরিকে উপযুক্ত শিক্ষা দেবার জন্য ওঠেপড়ে লাগল। সুবহানাল্লাহ, সময় যতই গড়াতে থাকল স্বয়ং রাষ্ট্রপক্ষ এবার আলি বাকরির খোঁজ শুরু করে দিল। এখন সে নিজেই দৌড়ের ওপর!
আলি বাকরিকে গ্রেপ্তার করা হলো। রাষ্ট্র এবার ইবনু তাইমিয়্যা-এর কাছে জানতে চাইল, তাকে কী শাস্তি দেওয়া উচিত? কেমন শাস্তি দিলে আপনি খুশি হবেন? দীর্ঘদিনের অত্যাচারের প্রতিশোধ নেবার এটাই ছিল মোক্ষম সময়। কিন্তু ইবনু তাইমিয়্যা সেদিন উত্তরে যা বললেন, সত্যিই অবাক করার মতো। তিনি বললেন, 'আমি নিজের জন্য প্রতিশোধ নিই না।'
কিন্তু কর্তৃপক্ষ এই উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারল না। তাকে জোরাজুরি করতে থাকল প্রতিশোধ নেবার জন্য। তখন তিনি বাধ্য হয়ে বলেন, 'আপনারা (শাস্তি দেবার) যে অধিকারের কথা বলছেন, হয় সেই অধিকার আমার, আপনাদের, নয়তো আল্লাহর। এখন সেই অধিকার যদি আমার হয়, তা হলে (জেনে রাখুন) আমি তাকে মাফ করে দিয়েছি। আর যদি আপনাদের হয়, তা হলে আমার কাছে কোনো ফয়সালা চাইবেন না। আপনাদের যা মনে চায় করুন। আর (শাস্তি দেবার) অধিকার যদি আল্লাহর হয়, তা হলে তিনি নিজেই তাঁর হক আদায় করবেন, এবং যখন ইচ্ছে যেভাবে ইচ্ছে করবেন।'
তা সত্ত্বেও রাষ্ট্র আলি বাকরিকে এভাবে ছেড়ে দিতে নারাজ। এরপর আলি বাকরিকে যখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত জানানো হলে, তখন তিনি কোথায় লুকিয়েছিল জানেন? সে মিশরে চলে যায় এবং শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা-এর বাড়িতেই আশ্রয় নেয়! যাকে হত্যার জন্য এতকাল ছক এঁকেছিল, তার বাড়িতেই আশ্রয় নেয় সে। আর ইবনু তাইমিয়্যা-ও সেই শত্রুর পক্ষ হয়ে আবেদন করলেন এবং রাষ্ট্রকে অনুরোধ করলেন আলি বাকরির মামলা নিষ্পত্তির জন্য।
এভাবে হিংসুকদের মিথ্যাচারের কারণে ইবনু তাইমিয়্যা বহুবার জেল খেটেছেন। বরাবরের মতো বিতর্কে যখন তারা হেরে যেত, তখন কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে রাগে ক্ষোভে ইবনু তাইমিয়্যা-এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে উস্কে দিত। ফলে তাঁকে কারাবন্দি করা হতো এবং ভোগ করতে হতো অপরাধ ছাড়া নির্দয় শাস্তি। এই নিকৃষ্ট কাজগুলোর অন্যতম খলনায়ক ছিল নাসর মিনবাজি, আমীর রুকনুদ্দীন (মিনবাজির ছাত্র), এ ছাড়া তৎকালীন আরও অনেক ফহীহ এবং আলিম-ওলামা। তারা সে সময়কার সুলতানের তোষামোদ করত, যে কিনা পূর্বের সুলতানকে হটিয়ে গদি দখল করেছিল।
একপর্যায়ে পূর্বের সুলতান নাসির কালাউন পুনরায় ক্ষমতা অর্জনে সক্ষম হন। তারপর অনতিবিলম্বে ইবনু তাইমিয়্যা-কে মুক্ত করে দেন। তাঁকে সম্মানিত করেন এবং রাজদরবারে আমন্ত্রণ জানান। তিনি সেখানে গেলে তাঁকে দেখামাত্রই সুলতান দাঁড়িয়ে যান এবং শাইখুল ইসলামকে অনেক সম্মান-প্রদর্শন করেন। এরপর তিনি ইবনু তাইমিয়্যা-এর সাথে একান্ত বৈঠকে বসেন। এবং ক্ষমতা থেকে নামাতে যারা তার বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিল, সেই-সকল ফকিহ ও আলিমদের মৃত্যুদণ্ড দেবার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেন। এরপর তিনি ইবনু তাইমিয়্যাকে অনুরোধ করেন তার উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিতে। তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন-এই আলিমরা অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে কী কী করেছিল। কিন্তু ইবনু তাইমিয়্যা ঊর্ধ্বজগতের মানুষ ছিলেন। সুযোগের সদ্ব্যবহারের বদলে তিনি তাদের প্রশংসা শুরু করে দিলেন। এবং বললেন, তাদের যেন কোনো ক্ষতি করা না হয়। সাথে সাথে এটাও বলে দিলেন, 'আপনি যদি তাদের হত্যা করেন, তা হলে তাদের মতো আর কাউকে পাবেন না।'
সুলতান উত্তরে বলেন, 'তারা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে! হত্যার চেষ্টা করেছে! এর পরেও এসব বলছেন!?' ইবনু তাইমিয়্যা বলেন, 'যে আমাকে কষ্ট দেয়, আমি তাকে মাফ করে দিই। আর যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহই তাকে শাস্তি দেবেন। আমি নিজের জন্য প্রতিশোধ নিই না।'
ইবনু তাইমিয়্যাকে রাজি করানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেন সুলতান। কিন্তু তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত স্বীয় মতে অটল রইলেন, যতক্ষণ না সুলতান সবাইকে মাফ করে দিলেন। [২১০]
সুলতানের ক্ষমাপ্রাপ্ত সেই আলিমদের একজন কাদি ইবনু মাখলূফ মালিকি। এই ঘটনার পর তিনি বিস্ময়সুরে বলেছিলেন, 'সত্যিই, ইবনু তাইমিয়্যার মতো কাউকে দেখিনি। আমরা তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে প্ররোচিত করে ব্যর্থ হলাম। আর সে আমাদের ওপর ক্ষমতা লাভ করেও ক্ষমা করে দিলেন এবং আমাদের পক্ষ নিয়ে উল্টো সুলতানের সাথে তর্ক করলেন!'[২১১]
ইবনু তাইমিয়্যা আরও একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল: 'আমার ওপর মিথ্যারোপের কারণে কারও প্রতিশোধ নেব—এটা পছন্দ করি না। সে জুলুম কিংবা শত্রুতা, যা-ই করুক না কেন। অবশ্যই মুসলিম-মাত্র সবাইকে মাফ করে দিয়েছি। আর আমি সকল মুসলিমদের জন্য কল্যাণ পছন্দ করি। নিজের জন্য যা পছন্দ করি, প্রত্যেক মুমিনের জন্য সেটাই পছন্দ করি। যারা মিথ্যা বলেছে, জুলুম করেছে, তারা সবাই আমার দিক থেকে মুক্ত।।'[২১২]
বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কেননা আমাদের অতীত পঙ্কিলতা মুক্ত নয়। এখনও প্রতিনিয়ত অনেক গুনাহ হয়ে যাচ্ছে। আর তাই এমন কেউ তো অবশ্যই আছে যাদের প্রতি আমরা অন্যায় করেছি। আল্লাহর ক্ষমা-লাভের আগে তাদের ক্ষমা অর্জন করা প্রথম শর্ত। তেমনিভাবে অন্যদের প্রতিও আমাদের এরূপ আচরণ প্রদর্শন উচিত, যা আমরা নিজেদের বেলায় আশা করি। মানুষদের মাফ করে দেওয়া উচিত, কারণ, অন্যদের ক্ষেত্রে আমরা মাফ পাওয়ার আশা রাখি। 'তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন?' আমরা যদি আন্তরিক হই, তা হলে তাৎক্ষণিক সংশোধন করে নেওয়ার জন্য এই একটি আয়াতই যথেষ্ট, অন্যদের মাফ করে দিতে এবং পুনরায় সালাম প্রসার করার জন্য।
আপনি কি জানেন, আয়াতটি শোনার পর আবূ বকর (রা)-এর অনুভূতি কেমন ছিল? তিনি অঝোরে কেঁদেছিলেন এবং যে লোক তাঁর প্রতি জুলুম করেছিল, তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সে ছিল তাঁর আপন চাচাতো ভাই মিসতাহ ইবনু উছাছা ; একজন গরীব হিজরতকারী সাহাবি। আবূ বকর তার যাবতীয় খরচাপাতি বহন করতেন। যেদিন আমাদের মা আয়িশা (রা)-এর নামে কুৎসা রটানো হলো, শহরের দিগ্বিদিক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। খুব কম-সংখ্যক সাহাবি মা আয়িশা (রা)-এর ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন সেদিন। পরবর্তীকালে আল্লাহ তাআলা সূরা নূরের আয়াতগুলো নাযিল করে মুনাফিকদের-রটানো সেই কলঙ্ক থেকে উম্মুল মুমিনীনকে নিষ্পাপ ঘোষণা করলেন। এ সময়ে আয়িশা (রা)-এর ব্যাপারে মিসতার বক্তব্যের কারণে আবূ বকর তার ওপর ক্ষিপ্ত হোন এবং কসম কাটেন তিনি আর কখনও মিসতারের পেছনে টাকা ঢালবেন না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আবূ বকর (রা)-কে উদ্দেশ্য করে আয়াত নাযিল করলেন, 'আর তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে, তারা নিকটাত্মীয়দের, মিসকীনদের ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'[২১৩]
আয়াতটি সরাসরি আবূ বকর-এর বুকে গিয়ে বিঁধল। তিনি অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। বললেন, 'অবশ্যই চাই, আমাকে আপনি মাফ করে দিন!' তিনি দ্রুত ছুটে যান মিসতাহ এবং তার পরিবারের কাছে। সংকল্প প্রকাশ করেন তিনি কখনোই খরচ দেওয়া বন্ধ করবেন না। আবূ বকর আয়াতটি এভাবেই নিয়েছিলেন। আস-সিদ্দীক আল-আকবার। এটাই ছিল তাঁর চরিত্র। নবি-রাসূলদের পর পৃথিবীর-বুকে-বিচরণ-করা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটিও চাইতেন আল্লাহ তাকে মাফ করে দিক। মাওলার ক্ষমা তিনি পেয়েছিলেনও বটে।
আমরা আয়াতটিকে কীভাবে নেব? আমরা কী অতীতের পাপ নিয়ে ভয় পাচ্ছি? আমাদের আমলনামায় কি এমন কোনো সাংঘাতিক পাপ আছে যা আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের পূর্বে মুছে নেওয়া জরুরি? যদি উত্তর হয় 'হ্যাঁ' তা হলে নবিদের অনুকরণ করুন, সিদ্দীকদের অনুকরণ করুন। যারা আপনার প্রতি অন্যায় করেছে, তাদেরকে ক্ষমা করে দেবার দ্বারা প্রমাণ করুন, আপনিও ক্ষমা পেতে আগ্রহী।
আল্লাহর পথে ফেরার যাত্রায় আমাদের প্রত্যেকের সম্মুখে শয়তান দেওয়াল তৈরি করবে। পূর্বের রাস্তায় ফিরে যাবার জন্য নানানভাবে ফুসলাবে, আগের জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইবে। আর সেই পথ নির্ঘাত ধ্বংসের পথ। '(শয়তান) বলেছিল, "তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।” [২১৪]
আমরা যখনই ভালো কিছু করতে আগ্রহী হব, তখনই ইবলিশ উপস্থিত হবে। আমাদেরকে বাধা দিতে সে কিন্তু চেষ্টার কোনো ত্রুটি করবে না। বিশেষ করে আত্মশুদ্ধির পথচলায়। সে এখানে বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং আপনার সাথে তর্ক জুড়ে দেবে। একজন মুসলিম যখন অপর মুসলিমের সাথে সবকিছু মিটমাট করতে চায়, তখন শয়তান তাকে অনেকটা এ ধরণের যুক্ত দিয়ে আটকায়:
সে বলে, 'তুমি যদি রাগ দমন করে ফেলো, প্রতিশোধ না নাও, তা হলে তোমার অন্তর বিষে ভরে যাবে এবং এই বিষ তোমার জন্য ক্ষতিকর। কাজেই নিজেকে শান্তি দাও! একটু হলেও রাগকে প্রকাশ পেতে দাও!' এর জবাব কী হবে? আমরা তা-ই বলব যা আমাদের রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখিয়েছেন: 'সকল ধরণের গিলে ফেলার ভেতর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো যখন বান্দা আল্লাহর জন্য স্বীয় ক্রোধ গিলে ফেলে (অর্থাৎ রাগ দমন করে)। আর যে এই কাজ করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ঈমান দ্বারা তাকে পূর্ণ করে দেবেন।[২১৫]
লক্ষ করুন, শয়তান বলছে 'রাগ দমন তোমার ভেতরটা বিষে পরিপূর্ণ করে দেবে।' আল্লাহ বলছেন, 'রাগ দমন তোমার ভেতরটা ঈমানে পরিপূর্ণ করে দেবে।'
তবে শয়তান এখানেই হাল ছাড়বে না। সে আরও বলবে, 'দেখো, তোমার তো বহু নেক আমল আছে। তুমি তাহাজ্জুদ পড়ো, কুরআন পড়ো, ইলম অন্বেষণের আসরে বসো। অতএব নিশ্চিত থাকো-আল্লাহ তোমার এই পদস্খলন ক্ষমা করে দেবেন।'
এর জবাবও আমরা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস দিয়ে দেব : 'প্রত্যেক ব্যক্তির আমল সোমবার এবং বৃহস্পতিবার আল্লাহর সামনে পেশ করা হয়। অতঃপর আল্লাহর সাথে শিরক করেনি এমন সব ব্যক্তিকে তিনি মাফ করে দেন। তবে সেই ব্যক্তিকে নয়, যার সাথে তার মুসলিম ভাইয়ের বিদ্বেষ রয়েছে। বলা হয়, 'এই দুজনকে মাফ করা হবে না যতক্ষণ না তারা মিটমাট করে নিচ্ছে।[২১৬]
কারও হয়তো অঢেল নেক আমল আছে, তথাপি একটি পদস্খলনের দরুন তারা ক্ষমা পাবে না। আর তা হলো রাগ ধরে রাখা, মুসলিম ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ রাখা।
এদিকে শয়তান ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। সে বলবে, 'এখনই ফিরিয়ে নিয়ো না। ঠিকাছে বন্ধু বানিয়ো, কিন্তু এখন না। বছরখানেক পর করো,' এর উত্তরে কী বলব? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস শুনিয়ে দেব: 'যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের সাথে এক বছর যাবৎ সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকে, সে যেন তার রক্ত ঝরাল।[২১৭]
এবার শয়তান বলবে, 'ঠিকাছে, এক বছর লাগবে না। এক সপ্তাহ সময় নাও। এরপর মিটামাট করে নিও। তোমাদের উভয়ের মন-মেজাজ ঠান্ডা হওয়াটা জরুরি।' এর উত্তরে কী বলব? রাসূল-এর হাদীস দিয়েই দেব : 'এক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের সাথে তিনদিনের বেশি সময় সম্পর্কচ্ছেদ থাকা বৈধ নয়। যে ব্যক্তি তিনদিনের বেশি থাকবে এবং এই অবস্থায় মৃতুবরণ করবে, সে জাহান্নামে যাবে।[২১৮]
শয়তান যদি আবার বলে, 'আচ্ছা বাবা আচ্ছা, ঘৃণা করতে হবে না, এক সপ্তাহ অপেক্ষাও করা লাগবে না। বরং তার মধ্যে অপরাধ-বোধটুকু জাগ্রত হওয়ার জন্য অন্তত একটু সবর করো! তাকে আগে ক্ষমা চাইতে দাও!' এবারও নবিজির হাদীস শুনিয়ে দেব: 'মনোমালিন্য হওয়া দুজনের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে আগে সালাম দেয়।[২১৯]
'আহা! সে যে তোমার ক্ষমা মঞ্জুর করবে, এর নিশ্চয়তা কী?!' শয়তান বলবে, 'দেখা যাবে তোমার পুরো চেষ্টাটাই ভেস্তে যাবে।' রাসূল বলেন: 'এক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের সাথে তিনদিনের বেশি সময় সম্পর্কচ্ছেদ থাকা বৈধ নয়। তিনদিন অতিক্রম হয়ে গেলে সে যেন তার সাথে সাক্ষাৎ করে এবং সালাম দেয়। এরপর সে যদি সালামের জবাব দেয়, তা হলে দুজনই পুরস্কৃত হবে। আর যদি জবাব না দেয়, তা হলে সে নিজেই গুনাহগার হবে। অপরদিকে প্রথমজন দোষমুক্ত হয়ে যাবে।[২২০]
এবার শয়তান সর্বশেষ চেষ্টাটুকু করবে। কেননা সে এটাই চায়, আমাদের অন্তর যেন পরিবর্তন হয়ে যায়। সে বলবে, 'তোমার বিনয় যদি প্রত্যাখ্যান করা হয়, তা হলে তোমার সম্মান ধূলিসাৎ হবে। মান-সম্মান বলে আর কিছুই থাকবে না।' এবার তাকে রাসূল-এর এই হাদীসটি শুনিয়ে দিন, যেখানে তিনি কসম করে জানিয়েছেন শয়তানের এই কথা ডাহা মিথ্যে : 'তিনটি বিষয়ে আমি আল্লাহর কসম করে বলছি: (১) দান-সদাকা করলে সম্পদ কমে না। (২) বান্দা যখন ক্ষমা চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সম্মান বাড়িয়ে দেন। (৩) আর যে আল্লাহর জন্য বিনয়বনতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে উঁচু করে দেন।'[২২১]
এতকিছু পড়ার পরেও যে ব্যক্তি সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকে, তার ব্যাপারে আর কীই-বা বলা যেতে পারে? যে-কোনো-ক্রমেই ফোন ধরবে না-এমন জেদ ধরে থাকে? আসলে এ ব্যক্তি অহংকারী, তার অন্তর মরে গেছে। সে জান্নাত চায় না, জাহান্নামেরও ভয় করে না। সর্বদা একজন উত্তম মুমিনের পরিচয় দিন। আর শয়তানকে সব সময় লাঞ্ছনার মধ্যে ফেলে রাখুন। ফোন ধরুন মুসলিম ভাইয়ের, তার কাছে ক্ষমা চান এবং আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াবার আগেই সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো আমলনামা থেকে মুছে ফেলুন। এমন ব্যক্তির মতো হবেন না, যাকে সংশোধন করা অনেক কঠিন।
আ'মাশ থেকে বর্ণিত, শা'বি বলেছেন, 'সম্মানিত ব্যক্তিগণ ভালোবাসার বন্ধন গড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দ্রুতগামী, আর শত্রুতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধীরস্থির। তারা রুপোর পাত্রের মতো। ভাঙা কঠিন কিন্তু মেরামত সহজ। অপরদিকে সবচেয়ে বদ চরিত্রের ব্যক্তিরা ভালোবাসার বন্ধন গড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধীরস্থির। আর শত্রুতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাড়াহুড়ো- প্রবণ। এরা কাচের পাত্রের মতো। ভাঙা সহজ, কিন্তু মেরামত করা বেজায় কঠিন।[২২২]
আসুন সব মুছে দিই, নিজের ভুলগুলো স্বীকার করে সব মেনে নিই, আর শত্রুতা যতটা কম সম্ভব রেখে জান্নাত-পানে এগিয়ে চলি। পরিশেষে সেই ভাই-বোনদের উদ্দেশে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চাই-যারা আল্লাহর জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছেন, দাওয়াতি কাজ করছেন, বিভিন্ন পরিকল্পনা করছেন এবং সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছেন। আপনারা ক্ষমা চাইবার এই চারিত্রিক গুণ আরও দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরুন। কেননা আল্লাহর পথে-চলা মানুষগুলো বাতিলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, পদে পদে নিন্দিত হতে পারে। কখনও-বা মুসলিমরাই তাদের নির্যাতন করবে, অভিযুক্ত করবে, উগ্রপন্থী তকমা জুড়ে দেবে। আর তাই ক্ষমা করার এই গুণ অর্জন ছাড়া আপনি এই পথে টিকে থাকতে পারবেন না। এটি প্রত্যেক নবি-রাসূলের ব্যক্তিত্বের অংশ ছিল। আর তাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন আমাদের রাসূল। তাওরাতে তাঁর ব্যাপারে এভাবে বলা হয়েছে:
'আতা ইবনু ইয়াসার বলেন, 'আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা)-এর সাক্ষাৎ পেয়েছি এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি, 'আমাকে বলুন, তাওরাত-গ্রন্থে রাসূল-এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?' তিনি বলেন, 'হাঁ আল্লাহর কসম, তাওরাতে তাঁর ব্যাপারে কুরআন বর্ণিত কিছু গুণ এসেছে। যেমন: 'হে নবি, আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে।[২২৩] 'নিরক্ষরদের একজন। তুমি আমার দাস এবং রাসূল। আমি তোমার নাম রেখেছি মুতাওয়াক্কিল (ভরসাকারী)। তুমি কঠোর নও, তুমি নির্দয়ও নয়। বাজারে তুমি শোরগোল সৃষ্টিকারী নও। খারাপকে খারাপ দ্বারা প্রতিহত করবে না। তুমি মাফ করে দাও এবং ক্ষমা করে দাও। আর আল্লাহ তাআলা তার দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করা ব্যতীত তাঁর মৃত্যু দেবেন না; যতক্ষণ না তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সাক্ষ্য দেয়, আর যতক্ষণ না অন্ধ চোখ, বধির কান এবং গাফেল অন্তর তার দ্বারা খুলে যায়।' [২২৪]
নিশ্চয়ই ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ দ্বীন, অতি সূক্ষ্ম এবং মানবীয় বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর তাই ক্ষমা করা মানে সব ভুল এড়িয়ে চলতে হবে-বিষয়টা এমনও না। উদাহরণস্বরূপ: যে-পাপ অন্যের অধিকার হরণ করে, কিংবা যিনি অবিরাম নির্যাতন চালায়, এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই উপযুক্ত পন্থায় আসামিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। তা ছাড়া এই অধ্যায়ে যে ক্ষমার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত মুসলিমদের মধ্যে তুচ্ছ বিরোধগুলো গুঁটিয়ে নেবার আহ্বান জানিয়ে লেখা। অর্থাৎ তুচ্ছ কিংবা ক্ষুদ্র-থেকে-ক্ষুদ্র যে বিষয়গুলোর কারণে আমরা শত্রুতা করি, 'আল-হিজর' (বৈধ বয়কট) করার শর্তগুলো পূরণ না হলেও। মুসলিম ভাই-বোনদের সাথে আমাদের অধিকাংশ সম্পর্কচ্ছেদের মূলে থাকে এ ধরণের তুচ্ছ বিষয়ই, যা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পর্ক ছেদ করার কোনো বৈধ কারণ নয়। এমনকি যারা দাবি করে, আল্লাহর জন্য সম্পর্কচ্ছেদ করেছে-তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, 'আল-হিজর করার শর্তগুলো কী?' দেখবেন, তারা উত্তর দিতে পারবে না। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, তাদের এই বয়কট বিন্দুমাত্র আল্লাহর জন্য নয়। বরং স্বীয় প্রবৃত্তির খায়েশ মেটানোর জন্য।
সবশেষে আমি আহ্বান করব, আসুন আল্লাহর এই কথাটি আমরা অন্তরে গেঁথে নিই: 'অতপর যে মাফ করে দেয় এবং সংশোধন করে তাকে পুরস্কৃত করা আল্লাহর দায়িত্ব। আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।' [২২৫]
আর এসব বান্দাদের দলভুক্ত হই: 'যখন রাগান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।' [২২৬]
এবং আল্লাহর এই উপদেশ মেনে চলি, 'মন্দকে প্রতিহত করো উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো। ধৈর্যশীল ছাড়া এ গুণ আর কারও ভাগ্যে জোটে না। এবং অতি ভাগ্যবান ছাড়া এ মর্যাদা আর কেউ লাভ করতে পারে না।' [২২৭]
টিকাঃ
[২০১] মানহাজু ইবনি তাইমিয়্যা, ২৩১
[২১০] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৪/৬০-৬১
[২১১] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৪/৬১
[২১২] মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৫৫
[২১৩] সূরা আন-নূর, ২৪: ২২
[২১৪] সূরা আল-আ'রাফ, ৭: ১৭
[২১৫] মুসনাদ আহমাদ, ৬১১৪
[২১৬] মুসলিম, ১৫৯৩
[২১৭] আবূ দাউদ, ৪৯১৫; সহীহ
[২১৮] আবূ দাউদ, ৪৯১৪; সহীহ
[২১৯] বুখারি, ৬৩০৯
[২২০] আবূ দাউদ, ৪৯১২
[২২১] তিরমিজি, ২৩২৫
[২২২] রওদাতুল উকালা, ১৭৪
[২২৩] সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৪৫।
[২২৪] বুখারি, ২১২৫
[২২৫] সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৪০
[২২৬] সূরা সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৩৭
[২২৭] সূরা, ৪১: ৩৪-৩৫
📄 খুশু : সবচেয়ে কঠিন যে ইবাদাত
'খুশু' একজন মুসলিমের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত। সাথে সাথে সবচেয়ে উপেক্ষিত ইবাদাতগুলোর একটি। সন্দেহাতীতভাবে সর্বাধিক কঠিন ইবাদাতও বটে। এজন্য অন্তর এতে স্থির হবার আগ পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় প্রয়োজন।
খুশু-অন্তরের বিনম্রতা, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ অনুগত, তাঁর জন্য বিগলিত হওয়া। খুশু এমন কোনো আমল নয়, যা আপনি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে করবেন। কেবল সালাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এটি। খুশু-অন্তরের এমন এক অবস্থা যা সময়ের পরিক্রমায় আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। অনেকটা জমিনে হেঁটে চলেও মনকে সাত আসমানের রবের সাথে জুড়ে রাখার মতো। তাঁকে পাবার জন্য ব্যাকুল হওয়া। আপনি বড়োই অসহায়, তাঁকে ছাড়া কিছু করার সামর্থ্য নেই আপনার, তাঁর সাহায্য ছাড়া আপনি নিতান্তই একজন প্যারালাইজড ব্যক্তির মতো-এরকম অনুভূতি মনে জাগ্রত করা।
সত্যি বলতে খুশু এমন এক মুহূর্ত, যখন আপনি সাজদা থেকে মাথা তুলে অনুভব করবেন-মাটি থেকে মাথা তুললেও আপনার অন্তর তুলতে পারেননি, সে সাজদাবনতই রয়ে গেছে মাওলার জমিনে। এ হচ্ছে এমন এক অবস্থা যখন ব্যক্তি কেনা-বেচা, সামাজিকতা ইত্যাদির সাথে জড়িত থেকেও তার অন্তর ডেকে চলে, 'আল্লাহ, আমাকে আমার অবস্থার ওপর ছেড়ে দিয়েন না। আমি তো আপনারই দয়ার ভিখারি ইয়া রব। আল্লাহ, আমার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দিন। আপনি সবকিছুই জানেন এবং সব দেখেন, যা কেউ দেখে না। আল্লাহ গো, আপনি যেমন ইবাদাত পাওয়ার হকদার, আমি তো সেভাবে ইবাদাত করতে পারিনি ইয়া গফুর!'
আপনি কি এরকম অনুভব করেছেন কখনও? পেয়েছেন এরকম স্বাদ? নাকি আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্কটা এখনও অনুভূতিহীন যন্ত্রের মতোই রয়ে গেছে?
আল্লাহ বলেন, أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ 'ঈমান-গ্রহণকারীদের জন্য এখনও কি সে সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে তাদের মন বিগলিত হবে, তাঁর নাযিলকৃত মহাসত্যের সামনে অবনত হবে?'[২২৯]
সত্যি করে বলুন তো, আপনার অন্তর কি আয়াতটি পড়ে নাড়া দিয়েছে? যদি উত্তর হয়, 'এ আর তেমন কী!', তা হলে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, আয়াতটি সাহাবিদের কানে কতটা ভারী ঠেকেছিল আসুন দেখি :
ইবনু মাসউদ বলেন, 'আমাদের ইসলাম কবুল এবং আল্লাহর এই আয়াত নাযিলের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র চার বছর।'[২৩০]
ইবনু উমর যখন আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন, তিনি এতই কাঁদতেন, তাঁর দাড়ি বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ত। আর তিনি বলতেন, "অবশ্যই আমার রব, অবশ্যই! (সময় চলে এসেছে)।”[২৩১]
ইবনু আব্বাস বলেন, 'আল্লাহ মুমিনদের অন্তরকে ধীরগতির দেখতে পেয়েছেন। (তাই এই আয়াত নাযিল করে সতর্ক করেছেন)। [২৩২]
সাহাবিদের মুখে এমন বাক্য শোনা সত্যিই আশ্চর্যজনক। অথচ কুরআনের ভাষায় তাঁরা ছিলেন "সেসব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর যিকর, সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা সেদিনকে ভয় করে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।”[২০৩] এবং তাঁরা, "আল্লাহর সাথে তাদের প্রতিশ্রুতি সত্যে বাস্তবায়ন করেছে।”[২০৪] তথাপি আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরকে আরও উঁচু স্তরে নেবার জন্য বলছেন। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর হক আদায়ে আমাদের অন্তরের খুশু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১) কিন্তু খুশু আসলে কী?
শাব্দিক অর্থে খুশু হলো: 'নিচুতা, নম্রতা এবং স্থিরতা'[২০৫]
অর্থ আরও ভালোভাবে বুঝতে আসুন কুরআনের দিকে ফিরে যাই, কুরআনের পাতায় দেখি আল্লাহ তাআলা শব্দটিকে কীভাবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, وَمِنْ آيَاتِهِ أَنَّكَ تَرَى الْأَرْضَ خَاشِعَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ 'আর এটিও আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি যে, তোমরা দেখতে পা—ভূমি শুষ্ক শস্যহীন পড়ে আছে। অতপর আমি যেইমাত্র সেখানে পানি বর্ষণ করি হঠাৎ তা অঙ্কুরোদগমে সুসজ্জিত হয়ে ওঠে।'[২০৬]
'শুষ্ক শস্যহীন' শব্দটি আরবি আয়াতে এসেছে خَاشِعَةٌ 'খশিআহ' শব্দে, যা খুশু অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
বিচার-দিবসের আলোচনায় আল্লাহ বলেন, وَخَشَعَتِ الْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسًا 'এবং পরম করুণাময়ের সামনে সকল আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে। তাই মৃদু আওয়াজ ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না'।[২০৭]
'নিচু হয়ে যাবে' বোঝাতে আরবি আয়াতে এসেছে খশাআত। খুশু, খশিআহ, খশাআত শব্দগুলো আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী একই শব্দমূল থেকে নির্গত।
তা হলে খুশুর প্রায়োগিক অর্থ কী দাঁড়াচ্ছে? আল্লাহ তাআলা আমাদের মধ্যে কী দেখতে চাচ্ছেন? ইবনু রজব বলেন, 'খুশু হলো আল্লাহর জন্য চূর্ণবিচূর্ণ হওয়া, তাঁর জন্য নিচু হওয়া। এবং আল্লাহর সম্মুখে থাকাবস্থায় অন্তর স্থির হওয়া। অতঃপর অন্তর যখন খুশু অর্জন করে, সমগ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তা প্রকাশ পায়'।[২০৮]
২) খুশু অর্জনকারীদের কিছু নজির
মন-দিয়ে নবিজি-এর নিম্নোক্ত দুআটি পড়ুন, দেখুন কী ভাষায় তিনি সাজদাবস্থায় আল্লাহর গুণকীর্তন করতেন: 'ও আল্লাহ, শুধু তোমার জন্যই আমি রুকু করেছি, শুধু তোমার ওপরেই ঈমান এনেছি, শুধু তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি, শুধু তোমার জন্যই বিনম্র হয়েছে আমার শ্রবণ, আমার দৃষ্টি, আমার মস্তিষ্ক, আমার অস্থি-মজ্জা, আর আমার শিরা-উপশিরা'।[২০৯]
সাহাবিদের বিরতিহীন খুশুর ব্যাপারে তাবিয়ি হাসান বাসরি বলেন, 'আল্লাহর কসম, তাদের দিকে তাকালে দেখতাম, তাঁরা এমন এক প্রজন্ম যেন স্বচক্ষে জান্নাত জাহান্নাম দেখতে পাচ্ছে! আল্লাহর কসম, তাঁরা ঝগড়াটে ছিলেন না, ছিলেন না বাতিলপন্থীদের মতো। শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাবেই পরিতৃপ্তি খুঁজে পেতেন। আর তাঁরা এমন কিছু প্রকাশ করতেন না যা তাদের অন্তরে নেই।[২৬০] অর্থাৎ তাদের মধ্যে কৃত্রিমতার লেশমাত্র ছিল না।
একবার সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু উমর সূরা আল-মুতাফফিফিন তিলাওয়াত করছিলেন। যখন এই আয়াতে এসে পৌঁছোলেন, 'যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ জগৎসমূহের রবের সম্মুখে।'[২৬১] তিনি অঝোরে কাঁদলেন। কাঁদতে কাঁদতে পড়েই গেলেন, এরপর আর তিলাওয়াত শুরু করতে পারলেন না।[২৬২]
মাসরূক বলেন, 'মক্কার এক অধিবাসী আমাকে বলল, 'তোমার ভাই (সাহাবি) তামীম আদ-দারী-এর স্থান এটি। সকাল হবার আগ পর্যন্ত তিনি রাতভর এখানে সালাত আদায় করতেন অথবা এক আয়াত পড়েই কাটিয়ে দিতেন গোটা রাত। বারবার আয়াতটি পড়তেন এবং কাঁদতেন, 'যেসব লোক অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে তারা কি মনে করেছে যে, আমি তাদেরকে এবং মু'মিন ও সৎকর্মশীলদেরকে সমপর্যায়ের করে দেব, যেন তাদের জীবন ও মৃত্যু সমান হয়ে যায়? তারা যে ফয়সালা করে, তা অত্যন্ত জঘন্য!' [২৪৩]
একবার তাবিয়ি ছাবিত বুনানি ডাক্তারের কাছে গেলেন চোখব্যথা নিয়ে। ডাক্তার তাঁর চোখ দেখে বলল, 'আমাকে ওয়াদা দিন, তা হলে আপনার চোখ ভালো হয়ে যাবে।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কীসের ওয়াদা?' ডাক্তার বলল, 'আপনি কাঁদবেন না।' এ কথা শুনে ছাবিত বলেন, 'যদি কাঁদতেই না পারলাম, তা হলে এই চোখ থেকে লাভ কী?!'[২৪৪]
৩) খুশু কেন এত দামি?
- আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে প্রশস্ত দরজা খুশু
ইবাদাতের মূল এবং সারনির্যাস খুশু, আল্লাহর সন্তুষ্ট লাভের সবচেয়ে প্রশস্ত এবং দ্রুতগামী পথ। তথাপি এটা বলা মোটেও অতিরঞ্জন হবে না যে, আমাদের অধিকাংশের জীবনে খুশুর অভিজ্ঞতা নেই। জীবনে কখনোই অনুভব করিনি খুশুর স্বাদ। কত চমৎকারভাবেই-না ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এই বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, তিনি বলেন, 'আল্লাহর কাছে যাবার জন্য ইবাদাতের সবকটি দরজা দিয়ে আমি প্রবেশের চেষ্টা করেছি। প্রতিটি দরজার কাছেই দেখতে পেয়েছি ভিড় লেগে আছে। ফলে ঢুকতে পারিনি...' অর্থাৎ লোকসমাজে প্রচলিত ইবাদাত; যেমন: সালাত, সিয়াম, সদাকা, দাওয়াহ, কুরআন এবং এ-জাতীয় যত আমল আছে, এগুলো দিয়ে আবিদ-শ্রেণীর মানুষদের সাথে প্রতিযোগিতা করা কঠিন, আলহামদু লিল্লাহ। এরপর তিনি বললেন, '...এভাবে (চলতে চলতে) আমি নীচুতা এবং দরিদ্রের দরজার কাছে পৌঁছোলাম। দেখলাম এটা আল্লাহর কাছে যাবার সবচেয়ে দ্রুতগামী এবং প্রশস্ত দরজা। কিন্তু এর সামনে কোনো ভিড় পেলাম না, কোনো বাধারও সম্মুখীন হলাম না! তারপর আমার পা ভিতরে রাখতেই আল্লাহ আমার হাত ধরে টেনে নিলেন। এরপর তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন।[২৪৫]
- খুশু ছোটো আমলকেও অমূল্য সম্পদ বানায়
সত্যিই, খুশু এক অলৌকিক হরমনের মতো। যখনই কোনো আমলের সাথে একে জুড়ে দেওয়া হয়, তখনই সেই আমলের পরিণাম এবং মর্যাদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। খুশুহীন সারা রাত সালাতের চেয়ে খুশু-সম্পন্ন আপনার দুই রাকআত সালাত আল্লাহর নিকট অনেক অনেক প্রিয়। আল্লাহর প্রিয় হবার শর্টকাট পদ্ধতি এটি। ভেবে দেখুন, এই ক্ষুদ্র জীবনে এমন শর্টকাট পথ আসলেই কতটা জরুরি আমার আপনার।
সূরা ইখলাসের তাফসীরে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা বলেন: 'যদিও-বা এই সূরা (ইখলাস) পড়লে অনেক সাওয়াব এবং পুরস্কার নসিব হয়, তথাপি বান্দা যদি এই সূরা ছাড়াও অন্য কোনো আয়াত খুশুর সাথে তিলাওয়াত করে, তা হলে তার পুরস্কার এই সূরা পাঠ থেকেও বেশি হবে।' তিনি আরও বলেন, 'বান্দা যখন মন থেকে, অর্থ বুঝে বুঝে সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার বলে, তখন অজ্ঞতা এবং অন্যমনস্ক অবস্থায় সূরা ইখলাস পাঠ করার চেয়েও বেশি সাওয়াব নসিব হয়।' [২৪৬]
- শয়তানের ওয়াসওয়াসা দূরীকরণে খুশু
শয়তানের ওয়াসওয়াসা কি আপনাকে কাবু করে ফেলেছে? আপনার চালচলন নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গেছে? যদি তাই হয়, তা হলে খুশুকে নিজের জন্য আবশ্যক করে নিন। কেননা শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং খুশু একসাথে অন্তরে অবস্থান করতে পারে না। আলিমগণের ভাষায়: 'যে অন্তরে খুশু আছে, শয়তান তার নিকটবর্তী হতে পারে না।' [২৬৭]
৪) কীভাবে এমন বিস্ময়কর আমলে অভ্যস্ত হওয়া যায়?
- মা'রিফাতুল্লাহ বা আল্লাহকে চিনুন
হয়তো ভাবছেন, 'আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্ক ভাটা পড়েছে। আগের মতো আর আগ্রহ পাই না।' এর মানে এ নয়, আপনি খারাপ। আসল কারণটা হয়তো এর থেকেও সাধারণ। হয়তো আপনি এখনও আপনার রবকে চিনতে পারেননি। ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহকে চিনতে পেরেছে, সে অবশ্যই তাঁকে ভালোবাসবে।' [২৬৮] সেই মাওলাকে চিনতে, তাঁকে জানতে নেমে পড়ুন। কঠোর মুজাহাদা করুন। তাদাব্বুরের সাথে কুরআন তিলাওয়াত করুন, তাঁর নাম ও গুণসমূহ নিয়ে পড়াশোনা করুন। ইত্যাদি মাধ্যমে তাঁকে জানার চেষ্টা করুন। এরপর নিজেই দেখুন, আপনার মনের আকাশে হারিয়ে-যাওয়া খুশু-নামক সূর্যটি কীভাবে উদয় হচ্ছে।
- তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তারা কি কখনও আকাশ ও পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা করেনি? এবং আল্লাহর সৃষ্ট কোনো জিনিসের দিকে চোখ মেলে তাকায়নি?' [২৬৯] তিনি আরও বলেন, '(হে নবি,) এদেরকে বলে দাও, "আমি তোমাদেরকে একটিই উপদেশ দিচ্ছি-আল্লাহর জন্য তোমরা একা এবং দুজন মিলে নিজেদের মাথা ঘামাও এবং চিন্তা করো।..." [২৫০]
সমগ্র দুনিয়া একটি বৃহৎ মাসজিদরূপে তৈরি করা হয়েছে যেন আপনি চিন্তা-ভাবনা করেন। একদিন সাহাবি উম্মু দারদা-কে তাঁর স্বামী আবুদ দারদা-এর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলো, 'তিনি কোন আমল বেশি করতেন?' উম্মু দারদা বলেন, 'গভীর চিন্তা-ভাবনা।' [২৫১]
- খুশু অর্জনে প্রয়োজন নির্মল অন্তর
আমরা জেনে এসেছি খুশু কোনো বাহ্যিক আমলের নাম নয়। এটি অন্তরের আমল। এবং এও বুঝতে পেরেছি, কেন আমাদের অনেকের জন্য এটি বেশ কষ্টসাধ্য। আসলে আমরা খুশুর জন্য অন্তরে কোনো জায়গা রাখিনি। মানব-অন্তরে অনেকগুলো ঘর রয়েছে। এই ঘরগুলোতে অনেক বিষয় একসাথে অবস্থান করে। কিন্তু সেই ঘরগুলো যদি আপনি পাপ, গানবাজনা, অনর্থক বিষয়াদি এবং যৌন-উদ্দীপনায় মাতিয়ে রাখেন, তা হলে কীভাবে সেই অন্তরে খুশু নসিব হবে? বরং কল্যাণ প্রবেশের আগেই তা উচ্ছেদের সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, আমরা প্রত্যেকেই জানি, এই খুশু অর্জনের প্রক্রিয়া কীভাবে শুরু করতে হবে, এবং অন্তর থেকে কোন কোন বিষয়গুলো সর্বপ্রথম বের করে ফেলতে হবে।
- আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চান
যায়দ ইবনু আরকাম থেকে বর্ণিত, রাসূল-এর একটি দুআ ছিল: 'আল্লাহ, আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, কৃপণতা, বার্ধক্য ও কবরের আযাব থেকে। আল্লাহ, তুমি আমার মধ্যে তাকওয়ার অনুভূতি দাও, আমার নফসকে পবিত্র করো, নফস পবিত্রকরণে তুমিই সর্বোত্তম। তুমিই এর অভিভাবক এবং মাওলা। আল্লাহ, আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই এমন ইলম থেকে যা কোনো উপকারে আসে না, এমন হৃদয় থেকে যা বিনম্র হয় না, এমন আত্মা থেকে যা পরিতৃপ্ত হয় না এবং এমন দুআ থেকে যার উত্তর মেলে না।[২৫২]
সত্যি বলছি, কেবল বাহ্যিক পোশাক-আশাকে নয়, অলঙ্কারপূর্ণ উপদেশ-দানে নয়, এবং হৃদয়গ্রাহী পোস্ট লিখতে পারাই নয়, বরং এই খুশু হলো আপনার এবং আল্লাহর মধ্যে একটি গোপন সম্পর্ক। আল্লাহ এবং আপনি ছাড়া এই সম্পর্ক কেউই টের পায় না। আর পাহাড়সম খুশুহীন-নিষ্প্রাণ আমলের চেয়ে খুশুযুক্ত সরষের দানা পরিমাণ আমলও আল্লাহর কাছে অনেক প্রিয়। যে অন্তরগুলো খুশু অর্জন করতে পেরেছে, সেই অন্তরের অধিকারীরা কতই-না সৌভাগ্যবান! আল্লাহর রহমতের কতই-না নিকটে পৌঁছে গেছে তারা! এদের মুক্তি দ্রুত হবে না তো কাদের?
আল্লাহ, তুমি আমাদের দয়া করো, যদিও আমরা দয়ার অযোগ্য.. তুমি আমাদের মাফ করো, যদিও আমরা ক্ষমার যোগ্য নই.. আমাদের খুশু দাও, যদিও আমাদের অন্তর পাথরের মতো শক্ত.. আমাদের মুক্তি দাও, যদিও আমরা শাস্তির দিকে দৌড়ে যাই.. ও আল্লাহ!
টিকাঃ
[২২৯] সূরা আল-হাদীদ, ৫৭: ১৬।
[২৩০] মুসলিম, ৩০২৭
[২৩১] আদ-দুরারিল-মানছুর ফিত-তাফসীর বিল-মা'ছুর, ৮/৫৯
[২৩২] তাফসীর ইবনু কাসীর, ৮/৫২
[২০৩] সূরা আন-নূর, ২৪ : ৩৭
[২০৪] সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ২৩
[২০৫] ইবনুল কাইয়িন, মাদারিজুস সালিকীন, ১/৫১৬
[২০৬] সূরা হা-মীম সাজদা, ৪১ : ৩৯
[২০৭] সূরা ত্বহা, ২০: ১০৮
[২০৮] ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৬/৩৬৭
[২০৯] মুসলিম, ১৮৪৮
[২৬০] মুহাম্মাদ ইবনু নাসর, কিয়ামুল-লাইল, ১/৪২
[২৬১] সূরা আল-মুতাফফিফীন, ৮৩: ৬
[২৬২] আহমাদ, আয-যুহুদ, ১০৬৯
[২৪৩] সূরা আল-জাসিয়া ৪৫: ২১
[২৪৪] মুহাম্মাদ ইবনু নাসর, কিয়ামুল-লাইল, ১/১৪৬
[২৪৫] মাদারিজুস সালিকীন, ১/৪২৯
[২৪৬] মাজমু' আল-ফাতাওয়া, ১৭/১৪০
[২৬৭] মাদারিজুস সালিকীন, ১/৫১৭
[২৬৮] তরিকুল হিজরাতাইন, ২৮০
[২৬৯] সূরা আল-আ'রাফ, ৭: ১৮৫
[২৫০] সূরা সাবা, ৩৪ : ৪৬
[২৫১] তারিখু মাদীনাতি দিমাশক, ৪৭/১৪৯
[২৫২] মুসলিম, ৭০৮১