📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 দুআ : মুমিনের প্রাণ

📄 দুআ : মুমিনের প্রাণ


আচ্ছা, জীবনে কখনও কষ্টে জর্জরিত হয়নি, কখনও কাঁদেনি এমন কেউ কি আছে? না। পৃথিবীতে এমন মানুষ মেলা ভার। এমন মানুষও আছে, রাতে যাদের ঘুম আসে না। চিন্তার মধ্য দিয়েই তাদের রাত কেটে যায়! কিন্তু এগুলো যে সর্বদা নিজের কারণেই হয়, তাও কিন্তু না। কখনও হয় সন্তানের কল্যাণের কথা চিন্তা করে। কখনও স্ত্রী-বাবা- মা কিংবা বন্ধুবান্ধবের জন্য। কখনও-বা মাসজিদ আল-আকসার মতো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে!

এ ছাড়া আমরা প্রত্যেকেই এমন কিছু বাস্তবতার সম্মুখীন হই, যা কখনও রোধ করা যায় না। যেমন: অসুস্থতা, অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ আপদ, বার্ধক্য ইত্যাদি। এগুলো থেমে থাকে না। আর সবশেষে মৃত্যুর মাধ্যমে জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সে জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। সে জীবন হবে চির আনন্দের, নতুবা দুঃখের।

আল্লাহ তাআলা তাঁর কালামে বলেন, وَخُلِقَ الْإِنْسَانُ ضَعِيفًا 'আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে।' [১]

আরেক আয়াতে এসেছে: لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانُ فِي كَبَدٍ 'অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে। [২]

পরহেজগার বান্দা হোক কিংবা গাফেল, কেউই দুনিয়াতে দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত নয়। মানুষ এসব থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কেউ অন্যদের বলে বেড়ানোর মাধ্যমে কষ্টকে হালকা করার চেষ্টা করে। কেউ কেউ সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লাগাতার মাদক সেবন করে, কেউ-বা হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে মুক্তি খোঁজে। আবার কেউ বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। পক্ষান্তরে এমন মানুষও কিন্তু আছে, যারা এগুলোর কোনোটাই করে না। তারা বোঝে সব সমস্যা সমাধান হবার নয়। আর যে ব্যক্তি মন থেকে ভালো থাকতে চায়, তার শান্তি কেড়ে নেবার ক্ষমতা কারও নেই।

এই জীবন আকাশের মতো। এতে কখনও আনন্দের মেঘ ভাসে, কখনও বেদনার বৃষ্টি ঝরে। হয়তো সচ্ছলতা কিংবা দারিদ্রের কষাঘাতে কারও জীবন টইটম্বুর। তথাপি তাদের মধ্যে একটি বিষয়ের মিল পাবেন; তারা দু-হাত তুলে দুআ করতে জানে। তারা সেই সত্তার কাছে চায়, যিনি সত্যিই প্রতিটি আহ্বান শোনেন। আহ্বানকারী ধনী হোক কী গরীব, মুত্তাকী কী পাপী, তিনি সবার ডাকই শোনেন। তাঁর কাছেই রয়েছে সকল সমস্যার সমাধান। জীবনে যত কঠিন মুহূর্তই আসুক, তারা প্রশান্তি খুঁজে পায় সেই একজনের সান্নিধ্যে, সেই একজনের সাথে নিবিড় আলাপনে, আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সাথে।

অতীতের মানুষের কথা আজ নাই-বা বললাম, বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবলে ইচ্ছে করে চিৎকার করে বলি, 'কোথায় গেলে আল্লাহর বান্দারা! কোথায় হারিয়ে গেল তোমাদের অশ্রুঝরা দুআ?' ওয়াল্লাহি, বর্তমানে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া আমাদের বড্ড প্রয়োজন। অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাঁর কাছে বেশি বেশি দুআ করা, তাঁকে বারবার ডাকা। নিত্যনতুন রোগ-বালাই দেখা দিচ্ছে, পাপের জগৎ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, সংসারের বাঁধন ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, সংশয়- সন্দেহ আদর্শে রূপ নিচ্ছে, আল-আকসা কাঁদছে, অপরদিকে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম উম্মাহ যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে লাঞ্ছনাকর সময়ের মধ্য দিয়ে।

মোদ্দা কথা আমাদের সবার প্রয়োজন আল্লাহকে ডাকা, তাঁর কাছে মুক্তির ভিক্ষা চাওয়া। তাঁকে আমাদের বড্ড প্রয়োজন। আপনার রবকে বোঝান-রহমত পাবার জন্য কতটা মরিয়া আপনি, কতটা অসহায় আপনি। আর নিজেকে আল্লাহর দরবারে এভাবে উপস্থিত করার উপায় একটাই, তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে দুআ করা।

তাই আজকের আলোচনার বিষয় 'দুআ কবুলের চাবি'। দুআ কবুল আমাদের অনেকের কাছে এখন রূপকথার গল্পের মতো। মানুষ আশা হারিয়ে ফেলছে, দুআ ছেড়ে দিচ্ছে। তাই আজ আমরা আবিষ্কার করব দুআ কবুলের চাবি। যে চাবি দ্বারা আমরা মাওলার নুসরতের দুয়ার উন্মোচন করব ইন শা আল্লাহ।

১) অন্তরকে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিন, আন্তরিক হোন
এমনটা প্রায়ই ঘটে, ব্যক্তি আল্লাহর নিকট দুআ করছে, কিন্তু তার অন্তর ভিন্ন কিছুতে ব্যস্ত। মুখ নড়ছে, আমীন বলছে, কিন্তু মন অনুপস্থিত। আসলে এমনটা হবার অন্যতম কারণ, আল্লাহর নিকট যা আছে এর চেয়ে মানুষের হাতে যা আছে-মন সেটার প্রতিই বেশি আকৃষ্ট থাকে সেই মুহূর্তে। তাই ওই বিষয়গুলো নিয়ে সে ভাবতে থাকে দুআর সময়েও।

আল্লাহ বলেন, وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ 'এবং তোমার রবের প্রতিই মনোনিবেশ করো।[৩]

অন্তরকে শুধু সুস্পষ্ট হারাম সম্পর্ক, মূর্তি কিংবা কবরপূজা থেকেই দূরে রাখা যথেষ্ট নয়। অপছন্দনীয় বিষয়সমূহ থেকেও পবিত্র করাটাও জরুরি। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস- আদালত, লাভ-বিনিয়োগ, ইত্যাদি যত রকমের প্রতিবন্ধকতা আছে-অন্তর থেকে এসব বিদায় জানাতে হবে দুআর সময়। দুআর মুহূর্তটি কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করুন, মন-দিল লাগিয়ে তাঁর সাথে কথা বলুন। আল্লাহ বলেন, وَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ '..এবং তাঁরই ইবাদাতের জন্য একনিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ডাকো।'[৪] আমাদের মুখের আবদার যেভাবে আল্লাহর কাছে মেলে ধরি, ঠিক সেভাবেই আমাদের মনের ব্যাকুলতা আল্লাহর কাছে মেলে ধরতে হবে। অন্তরের অন্তস্তল থেকে চাইতে হবে।

২) দুআর শুরুটা যেন ভালো হয়
দুআর শুরুতে আল্লাহর গুণকীর্তন করুন এবং নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর দরুদ পাঠ করুন। দুনিয়ার মন্ত্রীদের কাছে সাহায্য চাইতে গেলে কত গুণকীর্তনই-না করতে হয়, কত আদবের ধারই-না ধারতে হয়! অথচ আমাদের রব রাজাধিরাজ, সমগ্র সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক, যাকে ছাড়া প্রতিটি সৃষ্টি অচল। তাঁর দরবারে কোনো প্রশংসাপত্র ছাড়াই আপনার প্রয়োজন পেশ করবেন!?

একদিনের ঘটনা। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন এক ব্যক্তি কোনো প্রকার আদব ছাড়াই দুআ করছে। নবিজি বললেন, 'তাড়াহুড়ো করছে লোকটি।' এরপর বললেন, 'তোমাদের কেউ যখন দুআ করে, সে যেন শুরুতে তার রবের গুণকীর্তন ও প্রশংসা করে। এরপর যেন দরুদ পাঠ করে নবি-এর ওপর। তারপর নিজের প্রয়োজন পেশ করে।' [৫]

আলি ইবনু আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'প্রত্যেক দুআই ঢাকা থাকে, যতক্ষণ না নবি-এর ওপর দরুদ পাঠ করা হয়। [৬]
অর্থাৎ নবিজির ওপর দরুদ পাঠের পরই দুআ উন্মুক্ত হয়।

উমর (রা) বলেন, 'নিশ্চয়ই দুআ আকাশ ও জমিনের মাঝখানে অবস্থান করে। এর কিছুই ওপরে ওঠে না, যতক্ষণ না তুমি নবি-এর ওপর দরুদ পাঠ করছ। [৭]

নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অনেকভাবে দরুদ পাঠ করা যায়। যেমন: ১. দুআর আগে দরুদ পাঠ করা, তবে এর আগে আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে। ২. দুআর শুরুতে, মধ্যে, এবং শেষে দরুদ পড়া। ৩. দুআর শুরুতে এবং শেষে পাঠ করা, আর এর মধ্যবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় বিষয়টি দুআয় তুলে ধরা। [৮]
সবগুলো পন্থাই গ্রহণযোগ্য।

৩) নিশ্চিত হয়ে দুআ করুন
দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে চাইবেন না। চাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হোন। এভাবে বলুন : ‘আল্লাহ আমাকে দিন, আল্লাহ আমাকে দান করুন, আল্লাহ আমার ওপর বর্ষণ করুন...’। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন এমনটা না বলে “আল্লাহ, আপনি যদি চান আমাকে মাফ করুন। আল্লাহ আপনি আপনি যদি চান আমার ওপর রহম করুন।” বরং সে যেন অবশ্যই দৃঢ়তার সাথে দুআ করে। কেননা আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই।’[৯]

৪) বারবার চান
পরিবারের কাছে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের কাছে চাইবার সময় কতবার চাই? দুবার কি তিনবার। এতেও যদি সাড়া না মেলে, তা হলে পরের বার চাইতে লজ্জাবোধ করি। বারবার চাওয়া আমরা সবাই কম-বেশি অপছন্দ করি। কাউকে বিরক্ত করতে চাই না। কিন্তু আল্লাহর নিকট বারবার চাওয়া ‘বিরক্তি’ নয়; তিনি সবচেয়ে ধনী, দান-দীক্ষায় তাঁর নেই কোনো ভয়, বরং তিনি বারবার চাওয়াকেই পছন্দ করেন। তিনি চান বান্দা তাঁর দরজায় লাগাতার কড়া নাড়ুক। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআর ধরন নিয়ে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, ‘রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার করে দুআ করা এবং তিনবার করে মাফ চাওয়া পছন্দ করতেন।’[১০]

অধিকাংশ সময় এমনটি করতেন তিনি। বর্ণিত আছে কখনও কখনও তিনবারের বেশিও দুআ করেছেন। যেমন আহমাস গোত্রের বরকতের জন্য করা দুআ। এ ছাড়া অসুস্থ ব্যক্তির জন্য একটি দুআ আমাদেরকে সাতবার পুনরাবৃত্তি করতে বলেছেন তিনি। আল্লাহর দরবারে বারবার ফিরে যাওয়া, অনুনয় বিনয় করা দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ। এতে প্রমাণিত হয় আপনি শুধু তাঁরই সাহায্যের মুখাপেক্ষী। মন থেকে বিশ্বাস রাখেন, আল্লাহ ছাড়া আপনার কোনো গতি নেই। ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'সবচেয়ে উপকারী একটি ঔষধ হলো-দুআয় লেগে থাকা।[১১]

৫) মন উপস্থিত তো?
দুআ কবুলের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো অন্তরায় অমনোযোগী অন্তর। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'দুআ কবুল হবে এই দৃঢ়-বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহকে ডাকো। এবং জেনে রেখো, গাফেল ও অন্যমনস্ক অন্তর নিয়ে করা দুআর জবাব আল্লাহ তাআলা দেন না।[১২] তাঁকে ডাকুন অন্তরের অন্তস্তল থেকে। এমন ভাবনা নিয়ে ডাকুন, যেন তিনি আপনার সামনেই আছেন। আপনার প্রতিটি বিষয় তাঁর জ্ঞানের আওতাভুক্ত। তিনি সবকিছুই দেখেন ও শোনেন। এই বিশ্বাস নিয়ে তাঁকে ডাকুন। যে ব্যক্তি এভাবে মন থেকে দুআ করে, সে কি অন্যমনস্ক হতে পারে?

৬) কিবলামুখী হোন
বদর প্রান্তর। অল্প-সংখ্যক সাহাবিদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নবিজি। সামনে বিশাল- সংখ্যক মুশরিক বাহিনী। সংখ্যায় দ্বিগুণেরও বেশি। তাদের প্রত্যেকেই যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। সে তুলনায় সাহাবিগণের প্রস্তুতি আপাত-দৃষ্টিতে নেই বললেই চলে। টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল তখন। এমতাবস্থায় নবিজি এক মিনিটও বেকার যেতে দিলেন না। কিবলামুখী হয়ে দুআয় বসে পড়লেন। [১৩]

তবে নবিজি ভিন্ন দিকে মুখ রেখে দুআ করেছেন এমন ঘটনাও কিন্তু বিরল নয়। এজন্য ইমাম নববি বলেন, 'কিবলামুখী হয়ে দুআ করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)।[১৪]

৭) হাত পাতুন
এক হাদীসে কুদসিতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'নিশ্চয়ই তোমাদের মহিমান্বিত রব অত্যন্ত লজ্জাশীল এবং দয়াবান। বান্দা যখন তাঁর সমীপে হাত ওঠায়, তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে তিনি লজ্জাবোধ করেন। [১৫]

দু-হাত পেতে চাওয়া বিনয় এবং অসহায়ত্বের পরিচায়ক। আল্লাহর প্রতি দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু দুআয় হাত তোলার পদ্ধতি কী? আলিমগণ পরিস্থিত বিবেচনায় তিনটি পদ্ধতির কথা বলেছেন:
- প্রথম পদ্ধতি : শাহাদাত আঙুল উত্তোলন করা। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটা করতেন বেশকিছু জায়গায়, যেমন মিম্বারে দাঁড়িয়ে দুআ করার সময়, তাশাহহুদের সময়। তেমনিভাবে কেউ যদি জনসাধারণের পক্ষ থেকে দুআ করতে চায়, সেও অনুরূপ করতে পারে।
- দ্বিতীয় পদ্ধতি: স্বাভাবিক নিয়ম এটি। অর্থাৎ হাতের তালু দুটো একত্রে লাগিয়ে, আকাশের দিকে উত্তোলন করে, কাঁধ বরাবর রেখে দুআ করা।
- তৃতীয় পদ্ধতি: দুআর পেছনে যখন বৃহৎ কোনো স্বার্থ থাকে। আরবিতে একে বলা হয় ইবতিহাল। উদাহরণস্বরূপ, সমগ্র উম্মতের জন্য কার্যকরী কোনো দুআ, কাফিরদের ক্ষেত্রে বদদুআ ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত এত উঁচুতে তুলে ধরতেন যে, তার বগলের শুভ্রতা প্রকাশ পেয়ে যেত। বদরের দিন এরকম করেছিলেন তিনি।

৮) সুখে-দুঃখে, সর্বাবস্থায় দুআ করা
আদবের অংশ এটি। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই এই আদবের বরখেলাপ করে। শুধু প্রয়োজনের সময় দুআর দ্বারস্থ হয়। কেবল বিপদে পড়লে আল্লাহকে চেনে। অন্য সময়গুলোতে দুআর কোনো প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করে না। যখন প্রচণ্ড আঘাত পাই, শত্রুর সম্মুখীন হই, অর্থনৈতিকভাবে একটু দোটানায় থাকি, সিভি জমা দিয়েও ইন্টারভিউয়ের ডাক আসে না, কিংবা অন্যকোনো বিপদাপদের সম্মুখীন হই—তখনই আমরা দুআ করি কেবল। নিঃসন্দেহে দুর্দিনে আল্লাহর অভিমুখী হওয়া প্রশংসনীয় কাজ, তদ্রূপ সুদিনেও অনুরূপ করা চাই।

নবিদের দুআ কেন কবুল হয়—এর উত্তরে আল্লাহ বলেছেন, 'নিশ্চয় তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। এবং আমাকে আশা ও ভয় নিয়ে ডাকত। আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়ী। [১৬]

এই আয়াতে দুআ কবুলের পেছনে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ এসেছে:
১) 'সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত' তাদের জীবন ছিল ইসলামের আলোয় আলোকিত, আল্লাহর ইবাদাত এবং তাঁর গুণকীর্তনের সমষ্টি। ঠিক এই কারণে আল্লাহকে ডাকা-মাত্রই তারা সাড়া পেয়েছেন।
২) 'আমাকে আশা ও ভয় নিয়ে ডাকত' অবস্থা যেমনই হোক, তারা আল্লাহর কাছে হাত তুলতেন। সুখে আছে না দুঃখে, নিরাপদে আছে না ভয়ে—এগুলো তাদের দুআর পথে প্রতিবন্ধক হতে পারত না।
৩) 'আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়ী' আত্মতুষ্টি, জেদ, দাম্ভিকতা-অহংকারের ছিটেফোঁটাও ছিল না নবিদের অন্তরে। এগুলো তাঁরা গোড়া থেকে উচ্ছেদ করে ফেলেছেন। তা ছাড়া যে অন্তর আল্লাহর বিরুদ্ধাচারণে লিপ্ত, তার দুআ কীভাবে কবুল হবে?

মোদ্দা কথা, আপনি যদি চান দুর্দিনে আপনার ডাক শোনা হোক, তা হলে সুদিনে দুআর পরিপূর্ণ ঝুড়ি নিশ্চিত করুন। এটাই সহজ পদ্ধতি। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যে চায় কঠিন সময় আল্লাহ তার দুআর জবাব দিক, সে যেন স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে বেশি বেশি দুআ করে।[১৭]

নবি ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর অগ্নিপরীক্ষার কাহিনি আমরা সবাই জানি। কওমের প্রতি হতাশ হয়ে তিনি যখন স্বদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, এক তিমি তাঁকে গিলে ফেলে। মুহূর্তেই ইউনুস আলাইহিস সালাম নিগূঢ় অন্ধকারে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। রাতের অন্ধকার, সমুদ্রের অন্ধকার, তিমির পেটের অন্ধকার। চারিদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। তবুও হাল ছেড়ে দেননি তিনি। দুআ করলেন : لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ 'আপনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি জালিমদের একজন ছিলাম।[১৮]

দুআ কবুল হয়েছিল। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে আল্লাহ তাকে এই অন্ধকার থেকে মুক্তি দেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তার দুআ কবুল হয়েছিল? আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন: فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ, لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ 'সে যদি আল্লাহর মহিমা ঘোষণাকারীদের একজন না হতো, তা হলে কিয়ামাতের দিন পর্যন্ত মাছের পেটে থাকত' [১৯]

অর্থাৎ অগ্নিপরীক্ষায় পতিত হবার পূর্বেই যদি তিনি কোনো নেক আমল না করতেন, তা হলে তিমির পেটেই তাঁর কবর রচিত হতো। 'সে যদি আল্লাহর মহিমা ঘোষণাকারীদের একজন না হতো' এই আয়াতাংশের তাফসীরে কাতাদা বলেন, 'স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে তিনি অনেক সালাত পড়তেন। তাই আল্লাহ এর বদৌলতে তাকে রক্ষা করলেন। বর্ণিত আছে “নেক আমলকারী হোঁচট খেলে তার আমল তাকে তুলে ধরে। আর সে যদি পড়ে যায়, ভর দেবার কিছু-না-কিছু পেয়েই যায়। [২০]

আবুল আলিয়া এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, 'তিনি আগেই নেক আমল পাঠিয়েছিলেন। [২১]

ঠিক এই জন্যই ইউনুস আলাইহিস সালাম পরীক্ষায় পতিত হলে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে পাশ করে বেরিয়েছেন। অতএব কেবল বিপদে পড়লেই দুআ করবেন না। নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুব-সমাজকে শিখিয়ে গেছেন: 'স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে চেনো, তা হলে কঠিন সময়ে তিনি তোমাকে জানবেন।' (অর্থাৎ তোমাকে সাহায্য করবেন)। [২২]

আলহামদু লিল্লাহ অনেক বিপদ থেকে আপনি বেঁচে আছেন, যা থেকে নিস্তার পেতে অন্যরা হয়তো দিবারাত্রি লড়াই করে চলছে। আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা হয়তো বেগতিক নয় এতটা। অপরদিকে এমন মানুষ পাবেন, যারা বিভিন্ন রোগ-শোকে আক্রান্ত। চিকিৎসায় তাদের কষ্টে অর্জিত প্রায় সব সহায় সম্পদ ঢেলে দিতে হচ্ছে। কিন্তু আপনি একদম সুস্থ, দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে এইসব বিপদাপদ থেকে নিরাপদ রেখেছেন।

তা সত্ত্বেও আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কিছু পরীক্ষা অবধারিত। মৃত্যুর যন্ত্রণা, কবরের অন্ধকার, মুনকার নাকিরের প্রশ্ন, হাশরের ভয়াবহতা, হিসাবের জন্য ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা; অনিশ্চিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা, জাহান্নামের ওপর বসানো পিচ্ছিল পুলসিরাত অতিক্রম করা, এ ছাড়া কিয়ামাত-দিবসে বহু ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে আমাদের।

এই পরীক্ষাগুলোর মধ্য দিয়ে আমাদের সবাইকে যেতে হবে। আমরা বড়োজোর এগুলোর ভয়াবহতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারি। জানেন কীভাবে? ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর মতো করে। কঠিন পরীক্ষায় দেবার আগেই পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে, নেক আমল দিয়ে। ভাইরে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে জেনেছে এবং দুনিয়ার জীবন তাঁর ইবাদাতে কাটিয়েছে, অপরদিকে যে ব্যক্তি কোনো-প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই কিয়ামাতের দিন আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়াবে- উভয়ের ফলাফল কিন্তু কখনোই এক হবে না। আজ বোঝা না গেলেও সেদিন উভয়ের মধ্যে কল্পনাতীত পার্থক্য সূচিত হবে।

তেমনি এটাও স্মরণে রাখতে হবে, যারা সত্যিকারার্থে মন থেকে দুআ করে, তারা কখনোই 'বিপদের' অপেক্ষায় থাকে না। বরং দুআ তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী, আল্লাহর দরজাতেই কাটে তাদের দিবারাত্রি। বর্তমান বিপদাপদ দূরীকরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বিপদাপদ ধেয়ে আসার পূর্বেই তারা আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তাদের তাবত প্রস্তুতি গ্রহণে একটি অস্ত্রই থাকে- দুআ। দুআই সেই অস্ত্র। মুমিনের হাতিয়ার। দুর্দিনে দুআ তাদের সুরক্ষা-দ্বার, আর সুদিনে ভালোবাসার চাদর। দুআ তাদের জীবন, তাদের ভালোবাসা। দুআর মাধ্যমে তারা ছুটে যায় সাত আসমান ছাড়িয়ে এবং হারিয়ে যায় মাওলার সাথে নিবিড় আলাপনে।

আর কতকাল আমরা এই ইবাদাতের স্বাদ গ্রহণ থেকে বিরত থাকব? আসুন না শুরু করি নতুন একটি দিন! যে দিনটি শুরু হবে নিবিড় আলাপন দিয়ে, শেষও হবে নিবিড় আলাপন দিয়ে... আল্লাহর সাথে!

টিকাঃ
[১] সূরা নিসা, ৪: ২৮
[২] সূরা বালাদ, ৯০: ৪
[৩] সূরা ইনশিরাহ, ৯৪:৮
[৪] সূরা আ'রাফ, ৭:২৯
[৫] আবূ দাউদ, ১৪৮১; সহীহ
[৬] শুআবুল-ঈমান, ১৪৭৪
[৭] তিরমিযি, ৪৮৬
[৮] ইবনুল কাইয়িম, জালাউল আফহাম, ৩৭৫
[৯] বুখারি, ৭৪৭৭
[১০] মুসনাদ আহমাদ, ২৯০/৫; সহীহ
[১১] আল-জাওয়াবুল কাফী, ১১
[১২] তিরমিযি, ৩৪৭৯
[১৩] মুসলিম, ১৭৬৩
[১৪] নববি, শারহু মুসলিম, ৬/১৮০
[১৫] সহীহ ইবনু হিব্বান, ৮৭৬
[১৬] সূরা আম্বিয়া, ২১:৯০।
[১৭] তিরমিযি, ৩৩৮২
[১৮] সূরা আম্বিয়া ২১:৮৭
[১৯] সূরা সাফফাত, ৩৭: ১৪৩-১৪৪
[২০] তাফসীর আত-তাবারি, ১৯/৬২৮
[২১] প্রাগুক্ত, ১৯/৬২৯
[২২] কুরতুবি, ৬/৩৯৮; হাসান

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 সব রোগের কার্যকরী ঔষধ

📄 সব রোগের কার্যকরী ঔষধ


বিখ্যাত হাদীস-বিশারদ আবূ আবদুল্লাহ হাকিম নিশাপুরি রহিমাহুল্লাহ। মাসের-পর-মাস তিনি একটি রোগে ভুগছিলেন। বেশ কিছু ফোসকা ছিল তাঁর চেহারায়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে এর চিকিৎসা করিয়েছেন দীর্ঘ এক বছর যাবৎ। কিন্তু আশানুরূপ কোনো ফল পাননি।

এক জুমার দিন তিনি ইমাম আবূ উসমান সাবৃনির কাছে যান। খুতবা চলাকালে তার জন্য দুআ করতে অনুরোধ করলেন। ইমাম আবূ উসমান দুআ করলেন। উপস্থিত মুসল্লিরাও শরীক হলো সেই দুআয়।

সপ্তাহ খানেক পরের কথা। এক মহিলা একটি চিঠি পাঠান হাকিম রহিমাহুল্লাহ-কে। চিঠিতে তিনি জানান, সেদিনের দুআয় তিনিও উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর অসুস্থতা শুনে ব্যথিত হয়েছেন। তাই তিনি বাসায় ফিরে তাঁর জন্য দুআ করেন। অতঃপর সেদিন সন্ধ্যায় রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে স্বপ্নে বলতে শুনলেন: 'আবূ আবদুল্লাহ-কে বলো, সে যেন মুসলিমদের জন্য পানির ব্যবস্থা করে।'

চিঠিটি হাকিমকে দেখানো হলে তিনি তাৎক্ষণিক নিজের বাগানে যান। সেখানে একটি পুকুর খনন করে তাতে বরফ ছেড়ে দেন এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এরপর কী হলো? এক সপ্তাহ যেতে-না-যেতেই তার ফোসকা নিরাময় হতে শুরু করল। এবং একপর্যায়ে তা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার চেহারা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। পরবর্তীকালে আরও কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন তিনি।[১]

দান-সদাকা করা—এ এমন এক ঔষধ, অধিকাংশ ডাক্তারই রোগীদের প্রেসক্রিপশনে লিখতে ভুলে যান। এরকম আরেকটি ঘটনা আমরা জানতে পারি লেখক শাইখ আলি ফীফীর ‘লি আন্নাকাল্লাহ’ বই থেকে। তিনি তার এক বন্ধুর গল্প শুনিয়েছেন এতে, একদিন মাসজিদে যাবার পথে তিনি অ্যাক্সিডেন্ট করেন। তার দুই বছরের ভাগ্নির ওপর চাকা উঠে গেছে। বাচ্চাটিকে বের করে দ্রুতবেগে হাসপাতালে ছুটে যান তিনি। এর মধ্যে মৃত্যু ছুঁইছুঁই অবস্থা। ডাক্তারগণ চেকাপ করে পরিবারকে জানান, বাচ্চাটির মৃত্যুর সম্ভাবনা ৮০%!

এ অবস্থায় তাদের এক আত্মীয় উপদেশ ও সান্ত্বনা লাভের আশায় একজন তলিবে ইলমকে ফোন করে। ঘটনা শুনে সে বলে, ‘একটি পশু যবেহ করুন এবং মেয়েটির সুস্থতার নিয়ত করে এর মাংস বিতরণ করে দিন।’ তারা সেটাই করল। পরবর্তীকালে সেই বন্ধুটি বলেন, ‘ভোর হতে-না-হতেই আমার ভাগ্নি একদম সুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়ে গেল।’

ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'বিভিন্ন প্রকারের বিপদ-আপদ দূরীকরণে দান-সদাকার প্রভাব আশ্চর্যদায়ক; যদিও দানকারী পাপী, জালিম কিংবা কাফির। [২]

মুনাওয়ি বলেন, 'আল্লাহর সৌভাগ্যবান (বান্দাগণ দানের) বিষয়টি প্রয়োগ করে এমন আধ্যাত্মিক সমাধান পেয়েছেন, যা অতি কার্যকরী ঔষধও দিতে পারে না। আর এর সত্যতা কেবল সে ব্যক্তিই অস্বীকার করবে, যে নিজেকে সত্য দেখা থেকে আড়াল করে রাখে। [৩]

দান-সদাকা বিপদাপদ হটিয়ে দেয়, ব্যথা লাঘব করে, দুর্দশা থেকে মুক্তি দেয়। আর ভেতরে ভেতরে রহমতের এমন বিশাল ময়দান তৈরি করে, যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপা যায় না। আপনি কি স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত? দুর্দশাগ্রস্ত? এখনই বসে পড়ুন এবং এই নিয়তে দান-সদাকার জন্য কিছু টাকা রেডি করে ফেলুন। আর এ কাজের জন্য রমাদানের চেয়ে উত্তম মাস আর কী হতে পারে? ভবিষ্যৎ-জীবনে-আসন্ন-বিপদাপদ এখনই নিশ্চিহ্ন করে ফেলুন ইন শা আল্লাহ।

ইবনু আব্বাস বলেন, 'আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল ছিলেন। কিন্তু রমাদান এলে দান-সদাকা আরও বাড়িয়ে দিতেন।'[৪]

টিকাঃ
[১] শুআবুল ঈমান, ৩১০৯
[২] আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব, ৩১
[৩] ফাইযুল কাদীর, ৩/৫১৫
[৪] বুখারি, ৩৫৫৪

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 একটি দুআর গল্প

📄 একটি দুআর গল্প


رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি দুআ শ্রবণকারী। [১৭৬]

সন্তান নিয়ে ভাবনা রাতের আরামের ঘুম হারাম করে দেয় বহু মা-বাবার। ওদেরকে কোন স্কুলে দেব, কোন শিক্ষকের কাছে পড়াব, ওদের কেমন রেজাল্ট হবে ইত্যাদি চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। আর মা-বাবা যদি দ্বীনদার হয়, তা তো হলে ভাবনার ফিরিস্তিতে আরও অনেককিছু যুক্ত হয়। ওরা কেমন মুসলিম হবে, বড়ো হলে কতটুকু ইসলাম পালন করবে, ফিতনার যুগে ইসলামের ওপর কীভাবে অটল থাকবে, আখিরাতকে কতটুকু গুরুত্ব দেবে... ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবে আপনি যতই প্রস্তুতি গ্রহণ করুন না কেন, ফলাফল আকাশেই নির্ধারণ করা হয়। তাই চেষ্টার পাশাপাশি এই দুআর বিকল্প নেই।

এই প্রবন্ধের শুরুতে একটি দুআ উল্লেখ করেছি। বলতে পারেন, দুআটি কার? দুআটি নবি যাকারিয়্যা করেছিলেন। আর এই দুআর পেছনে মূল প্রেরণা ছিল একজন নারী। তিনি হলেন মারইয়াম।

মারইয়াম-এর দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন যাকারিয়্যা। দিনকে দিন এটা স্পষ্ট হতে থাকে যে, মারইয়াম কোনো সাধারণ মেয়ে নন। যাকারিয়্যা যখনই মারইয়াম-এর ইবাদাতখানায় প্রবেশ করতেন, রিযকের বাহার দেখতে পেতেন। গ্রীষ্মকালে মারইয়াম-এর কাছে শীতকালের খাবার পাওয়া যেত। আবার শীতকালে গ্রীষ্মের খাবার!

আল্লাহ বলেন, كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزْقًا قَالَ يَا مَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا قَالَتْ هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ 'যখনই যাকারিয়্যা মারইয়ামের কক্ষে প্রবেশ করত, তার কাছে খাদ্যসামগ্রী দেখতে পেত; জিজ্ঞেস করল, "মারইয়াম! এসব কোত্থেকে তোমার কাছে আসে?” মারইয়াম বলল, “ওসব আল্লাহর নিকট হতে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বেহিসাব রিযক দান করেন।" [১৭৭]

আল্লাহর বদান্যতার নজির দেখে যাকারিয়্যা তো যারপরনাই অবাক। তিনি আর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন না। সাথে সাথে ছুটে গেলেন মাওলার দুয়ারে। কড়া নাড়লেন তাঁর রহমতের দরজায়। আর আল্লাহ তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি!

আল্লাহ বলেন, هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُ قَالَ رَبِّ هَبْ লِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةٌ طَيِّبَةٌ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ 'ওখানেই যাকারিয়্যা তার রবের কাছে দুআ করল, "রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি দুআ শ্রবণকারী।”[১৭৮]

সম্ভাবনার সব ক'টা দরজা যাকারিয়্যা-এর জন্য বন্ধ ছিল। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। চুল পাঁকতে শুরু করেছিল অনেক আগেই। শরীরের অস্থিমজ্জাও দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। তাঁর স্ত্রীও ছিলেন সন্তান-দানে অক্ষম। কিন্তু আল্লাহ তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। এই বৃদ্ধ বয়সে যা পাবার আকাঙ্ক্ষায় আল্লাহকে ডেকেছিলেন, তা-ই দান করেছেন। বিস্ময়করভাবে আল্লাহ তাআলা সাড়া দিয়েছেন। আসুন, এই ফাঁকে যাকারিয়্যা-এর দুআয় ব্যবহৃত শব্দগুলো একটু বিশ্লেষণ করি। দেখি, তিনি কী এমন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন যার ফলাফল এরকম আশ্চর্যজনক ছিল!

যাকারিয়্যা-এর দুআটি হলো : رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন।'

আয়াতে 'হিবা' শব্দটি এসেছে, যার অর্থ দান করুন। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ 'হিবা চাওয়া'। আর হিবা এমন এক উপহারকে বলা হয়, যা কখনও ফিরিয়ে নেওয়া হয় না। অর্থাৎ, যাকারিয়‍্যা আল্লাহর নিকট এমন একটি নেক সন্তান আশা করছিলেন, যা হবে আল্লাহর তরফ থেকে বিশেষ উপহার, কখনও ফিরিয়ে নেওয়া হবে না।

رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةٌ 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন।'

শব্দচয়ন দেখে বোঝা যায় যাকারিয়‍্যা কোনো সাধারণ সন্তান চাননি। তিনি এমন সন্তান চেয়েছেন, যে হবে আল্লাহর নির্বাচিত বান্দা, তাঁর নিরাপত্তার বেষ্টনীতে রক্ষিত এবং তাঁর দয়ার চাদরে প্রতিপালিত।

আচ্ছা, 'আমাকে একটি উপহার দিন' আর 'আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উপহার দিন'-এ দুটো বাক্যের মধ্যে পার্থক্য কী?

দ্বিতীয় বাক্যে রয়েছে একান্ত ভাবের প্রতিচ্ছবি। অর্থাৎ অনুরোধটা স্রেফ উপহারের জন্য নয়, বরং এমন উপহারের জন্য, যা দানকারী দয়াস্বরূপ দেবেন। করুণাবশত দেবেন। আর উপহারটি হবে তাঁর সম্মান ও রাজত্বের সাথে মানানসই। এখন প্রশ্ন হলো, যাকারিয়‍্যা তা হলে এমন একজন সত্তাকে ডেকে কী উত্তরে পেয়েছিলেন, যিনি রাজাধিরাজ, ধনীদের ধনী, দয়ার আধার? ইন শা আল্লাহ সামনেই জানতে পারব আমরা। আপাতত দুআয় ফিরে যাই:

رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةٌ 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন।'

সন্তানের বাবা হওয়াই যাকারিয়‍্যা-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না। স্রেফ বাবা হতে পারাকে তিনি যথেষ্ট মনে করেননি। বরং তাঁর বিবেচ্য-বিষয় ছিল সন্তানের দ্বীনদারিতা। সে যেন নেককার হয়। তাঁর দুআর বাক্যটি দেখুন 'একটি পবিত্র সন্তান।'

কত মুসলিম দম্পতি-ই তো বছরের-পর-বছর আল্লাহর নিকট সন্তান চেয়ে দুআ করে! অতঃপর সেই সন্তান দুনিয়াতেই কারও জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, কারও জন্য আখিরাতে। এসব ক্ষেত্রে ভুল মূলত একটা জায়গাতেই হয়-তারা আল্লাহর কাছে কেমন সন্তান চাইছেন, এ ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথাই থাকে না। তাদের কাছে স্রেফ নিঃসন্তান থাকাটাই বেদনাদায়ক। আর সেই কষ্ট দূর করতে পারাটাই তাদের দুআর মূল উদ্দেশ্য।

আয়াতে 'একটি পবিত্র সন্তান' বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? এ বাক্য দিয়ে দুআ করার বিশেষত্ব কী? আলিমগণ বলেন, 'পবিত্র সন্তান বলতে বোঝায়, যার কথা পবিত্র, কাজ পবিত্র, তেমনি দেহও পবিত্র। অর্থাৎ এ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো দৈহিক ও মানসিক-উভয় পবিত্রতা।[১৭৯]

এই নববি দুআ ব্যবহার করা মানে-আপনি আল্লাহর দরবারে এমন সন্তানের জন্য মিনতি করছেন, যার বিশ্বাস হবে পবিত্র, জবান হবে পবিত্র, কাজ-কর্ম পবিত্র, এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। মোটকথা দুনিয়ার সকল দৃষ্টিকোণ থেকে হবে সেরা।

আমরা দেখছি, আমাদের সন্তানেরা কতভাবে বিপথে চলে যাচ্ছে। তাদের এই বিপথগামীতার জন্য আমাদের বেখেয়ালিপনাও দায়ী। তাদের অধিকার আছে আমাদের বেখেয়ালি আচরণ দেখে হতাশ হবার। কেননা, এই আচরণ তো তাদের সাথে জন্মের আগ থেকেই আমরা করে আসছি। বুঝতে পেরেছেন, কোন বেখেয়ালির কথা বলছি? তাদের কল্যাণের জন্য আমরা উপযুক্ত দুআ করিনি। সত্যিই আমরা দুআ করিনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমনটাই হয়, বাবা-মায়েরা এই কাজটির কথা একদম ভুলে যান।

رَبِّ هَبْ لِي مِن لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ 'রব আমার, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করুন। অবশ্যই আপনি দুআ শ্রবণকারী।'

নবি যাকারিয়‍্যা তার দুআ শেষে আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম উল্লেখ করেন। নামটি এসেছে শ্রবন করা ক্রিয়া থেকে। যাকারিয়‍্যা খুব ভালো করেই জানতেন, তার চাওয়া-বিষয়টি দুনিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে কল্পনাতীত। কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। আর তাই এমন এক শ্রোতার প্রয়োজন, যিনি সত্যিই তার দুআ শুনবেন এবং এই অসম্ভবকে সম্ভব করবেন। এভাবে যাকারিয়্যা আমাদের শিখিয়ে দিলেন, দুআর ক্ষেত্রে আল্লাহর গুণবাচক নাম ব্যবহার করা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এমন নাম, যা আমাদের দুআর বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

যে ব্যক্তি অর্থনৈতিকভাবে দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে দুআয় আল্লাহর এই নামগুলো উল্লেখ করবে- اَلرَّزَّاقُ (রিযকদাতা), اَلْغَنِيُّ (সবচেয়ে ধনী), اَلْكَرِيْمُ (মহানুভব), এরকম আরও যত নাম আছে। আবার যালিমের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট ন্যায়বিচার কামনাকারী বলবে- اَلْقَيُّুমُ (সবচেয়ে শক্তিধর), الْجَبَّارُ (পরাক্রমশালী), اَلنَّصِيرُ (সাহায্যকারী)। আসলে আল্লাহর নামসমূহ নিয়ে আমাদের পড়াশোনা করা খুব জরুরি।

যাকারিয়্যা-এর দুআর শুরুটা ছিল উত্তম, মাঝের কথাগুলোও উত্তম, এবং শেষটাও ছিল উত্তম। আন্তরিকতা এবং আস্থায় গোটা দুআ ছিল ভরপুর। ফলে এর জবাবও ছিল কল্পনাতীত। দুআ করতে-না-করতেই ফেরেশতাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলো সুসংবাদ দিয়ে। আল্লাহ বলেন, فَنَادَتْهُ الْمَلَائِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي فِي الْمِحْرَابِ أَنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيَى مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِّنَ اللَّهِ وَسَيِّدًا وَحَصُورًا وَنَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ 'তখন এর জবাবে তাঁকে ফেরেশতাগণ বলল, আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দান করেছেন। সে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ফরমানের সত্যতা প্রমাণকারী হিসেবে আসবে। তার মধ্যে নেতৃত্ব ও সততার গুণাবলী থাকবে। সে পরিপূর্ণ সংযমী হবে, নুবুওয়াতের অধিকারী হবে এবং সৎকর্মশীলদের মধ্যে গণ্য হবে।' [১৮০]

দায়িত্ববান মুসলিম পিতা-মাতা-মাত্রই নবি ইয়াহইয়া-এর মতো নেক সন্তানের স্বপ্ন দেখে। তাদের জন্য এই দুআ গুপ্তধনের চেয়েও দামি। এটাই ছিল নবি যাকারিয়্যা-এর দুআর ফসল।

পাশাপাশি দুআ কবুলের কিছু কার্যকরী পদ্ধতি আছে। আসুন জেনে নিই:

১) দুআর শুরুটা যেন ভালো হয়
মূল দুআয় যাবার আগে শুরুটা করুন আপনার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। আল্লাহর দরবারে মেলে ধরুন আপনার দুর্বলতা। দাসত্বের মন নিয়ে দুআ শুরু করুন এবং বোঝান- আপনি আল্লাহর প্রতি কতটা আন্তরিক। এমনটাই করেছিলেন যাকারিয়্যা। সূরা মারইয়ামে আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআর পটভূমি তুলে ধরেছেন এভাবে, قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا 'সে বলল, হে আমার রব, আমার হাড়গুলো পর্যন্ত নরম হয়ে গেছে, মাথা বার্ধক্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। হে পরওয়ারদিগার, আমি কখনও তোমার কাছে দুআ চেয়ে ব্যর্থ হইনি।[১৮১]

অন্যভাবে বললে : আপনি আমাকে কখনোই হতাশ করেননি। কখনোই খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। আমার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, আপনি কতটা দয়াবান, করুণাময় এবং কত উদার। এটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আপনি আমাকে এগুলোর সাথেই অভ্যস্ত করিয়েছেন।

২) নিশ্চিত থাকুন, কবুল হবে
দুআর সময় আল্লাহর কাছে আপনি কী আশা করছেন? তিনি কবুল করবেন—এ ব্যাপারে কতটুকু নিশ্চিত আপনি? যাকারিয়্যা-কে দেখুন, তিনি ঠিক ততটাই নিশ্চিত মনে দুআ করেছিলেন, যতটা নিশ্চিত একজন নবি হতে পারেন। আমরা এও দেখেছি, এই দুআ ছিল মারইয়াম-এর কথার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ। অর্থাৎ যখন তিনি জানালেন যে মারইয়াম-এর রিযক আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তখনি দুআ করলেন। আল্লাহ বলেন, 'ওখানেই যাকারিয়‍্যা তার রবের কাছে দুআ করল...'

অর্থাৎ এক মিনিটও নষ্ট করেননি তিনি। সকল প্রকার সন্দেহ ও দ্বিধা ব্যতিরেকে হাত তুলেছেন। আল্লাহর দরবারে ভিক্ষা চেয়েছেন দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে। আপনিও তা-ই করুন। যখনই কাউকে ভালো কিছু পেতে দেখবেন-জাগতিক হোক কিংবা পরকালীন-দ্বিতীয়বার ভাববেন না, তাৎক্ষণিক আড়ালে চলে যান এবং মহান আল্লাহর সামনে মনখুলে ভিক্ষা চান।

৩) দুআ হোক আখিরাতমুখী
যাকারিয়‍্যা কেন নেক সন্তানের জন্য ব্যাকুল হয়েছিলেন, সূরা মারইয়ামে আল্লাহ তাআলা আমাদের তা জানিয়েছেন। কারণটা নবির মুখেই শুনুন, তিনি বলেছিলেন, 'আমি আমার পর নিজের স্বগোত্রীয়দের অসদাচরণের আশংকা করি...'।[১৮২]

এখানে 'স্বগোত্রীয়' কারা যাদের ব্যাপারে তিনি আশঙ্কা করছিলেন? আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুর রহমান ইবনু নাসির সা'দী বলেন, '(যাকারিয়‍্যা বলছেন) আমার মৃত্যুর পর যারা বানী ইসরাঈলের মধ্যে থাকবে, আমার আশঙ্কা, তারা আপনার দ্বীনকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করবে না, আপনার বান্দাদেরকে আপনার পথে আহ্বান করবে না।' [১৮৩]

মুমিনের ধন, সম্পদ, বিয়ে, সন্তান-সন্তুতি-সবকিছুর পেছনে বৃহত্তর স্বার্থ থাকে। মুমিনের নিয়ত থাকে স্বচ্ছ। সে এগুলোকে জান্নাতে পৌঁছাবার পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে এবং দুনিয়ার জীবনে উজ্জ্বল নিদর্শন রেখে যায়। একজন সচেতন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু পেটপুরে খাওয়া আর রঙ-বেরঙের পানীয় পান করা নয়, তার জীবনটা ক্রীড়াকৌতুক করে কাটিয়ে দেবার জন্য নয়, বরং এসবের ঊর্ধ্বে বসবাস করে সে। তার চিন্তাধারা হয় নিঃস্বার্থ, তার চিন্তাধারা হয় বিস্তৃত। তার সকল কাজেকর্মে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

এই দুআ দ্বারা নবি যাকারিয়‍্যা আমাদেরকে শেখাচ্ছেন, মুসলিম-মাত্রই চিন্তা-ভাবনায় হবে উন্নত। তাদের পরিকল্পনা হবে আখিরাত-কেন্দ্রিক এবং জীবন হবে ইসলামের জন্য নিবেদিত, তারা এর জন্যই বেঁচে থাকে। দুনিয়া থেকে বিদায়ও নেয় বুকে এই আশা রেখে যে, কাল হাশরের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের পরিশ্রম বৃথা যেতে দেবেন না।

৪) আপনার জীবনের গল্প হোক দুআময়
যদি রিযকের কথা বলি তা হলে মানবজাতির জন্য তো বটেই, সমগ্র সৃষ্টিকুলের দুআ করা প্রয়োজন। কেননা আল্লাহ তাআলা সকলের রিযকদাতা। নবি যাকারিয়‍্যা-এর জীবনে দুআ ছিল অপরিহার্য বিষয়, যার প্রয়োজন তিনি বারবার অনুভব করতেন। দেখুন, আল্লাহ তাআলা যাকারিয়‍্যা-এর ব্যাপারে কী বলেছেন: هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُ 'ওখানেই যাকারিয়‍্যা তার রবের কাছে দুআ করল.. [১৮৪]

এ ছাড়া তার ব্যাপারে এও বলেছেন: إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا 'যখন সে তার রবকে গোপনে ডেকেছিল। [১৮৫]

ভিন্ন এক আয়াতে এসেছে: وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ 'আর স্মরণ করো যাকারিয়্যাকে, যখন সে তার রবকে ডেকেছিল... [১৮৬]

এভাবে কুরআনের তিন-তিন জায়গায় আল্লাহ তাআলা যাকারিয়‍্যা-এর কথা বলেছেন। আর সবগুলোর মূল বিষয়বস্তু ছিল দুআ। হ্যাঁ, আপনার জীবনও হোক একটি দুআর গল্প।

টিকাঃ
[১৭৬] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৮
[১৭৭] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৭
[১৭৮] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৮
[১৭৯] ইবনু উছাইমীন, তাফসীর, ১/২৩২
[১৮০] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৯।
[১৮১] সূরা মারইয়াম, ১৯:৪
[১৮২] সূরা মারইয়াম, ১৯:৫
[১৮৩] তাফসীর ইবনু সা'দী, ৪৮৯
[১৮৪] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩৮
[১৮৫] সূরা মারইয়াম, ১৯:৩
[১৮৬] সূরা আম্বিয়া, ২১ : ৮৯

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 মুমিনের সামাজিকতা

📄 মুমিনের সামাজিকতা


আমরা সামাজিক জীব। আমাদের জীবনে প্রতি পদে পদে প্রয়োজন হয় সঙ্গী-সাথির। পরিবার এবং বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে থাকতে পছন্দ করি আমরা। অন্যদের সাথে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো ভাগাভাগি করতে আমাদের ভালো লাগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার, ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ঝোঁক—এসবকিছু আমাদের ফিতরাতের দিকটাকেই ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ সামাজিকতা এবং একে অপরের সাথে মত বিনিময়ের প্রতি উদ্‌গ্রীব থাকা আমাদের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। আলিমদের মুখে প্রচলিত 'মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক জীব' এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। [১৮৭]

ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন। মানব-অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম। আর তাই ইসলাম এই সামাজিকতাকে অস্বীকার করে না। বরং সমাজের প্রত্যেকে সদস্যকে এই বিষয়ে পরিপূর্ণ দিক-নির্দেশনা প্রদান করে। সামাজিকতার লাভ-ক্ষতি নির্ভর করে আল্লাহভীতির ওপর। কেউ কেউ আড্ডায় বা মজলিসে এমন সব কল্যাণকর ভূমিকা রাখে, যার দ্বারা সে আল্লাহর কাছে আরও উঁচু মাকাম অর্জন করে। জান্নাতের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। অপরদিকে কেউ হয়তো এই মজলিসে বসেই নিচু স্তরে নেমে যায়, পৌঁছে যায় জাহান্নামে। আমাদের মজলিসগুলো সাধারণ নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে:
১. আল্লাহকে স্মরণ হয়, নয়তো ভুলে যাওয়া হয়,
২. অন্যের সম্মান রক্ষা পায় কিংবা বিনষ্ট হয়,
৩. প্রতিভা প্রকাশিত হয়, অথবা তুচ্ছজ্ঞান করা হয়,
৪. উপদেশ মানা হয় কিংবা অস্বীকার করা হয়,
৫. পাপ অর্জন হয় কিংবা মুছে যায়,
এভাবেই দিনশেষে জান্নাত নসিব হয় নতুবা জাহান্নাম।

আর সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, আমরা প্রতিদিনই এই ধরণের আড্ডায় অংশগ্রহণ করি; হয়তো দৈনিক দশ বারেরও বেশি! আসলে পুরো জীবনটাই এরকম মিটিং বা আড্ডায় ঘেরা। আমাদের কেউ-না-কেউ হয়তো কোনো আড্ডায় বসে আছে। কিছুক্ষণ পর কর্মক্ষেত্রে গিয়ে আরেক দফা বসবে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বসা হবে তৃতীয়বারের মতো। আবার সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে লগিং করার দ্বারা আমরা চতুর্থবারের মতো বসি। এভাবে চলতে থাকে বিরতিহীনভাবে। ঠিক এজন্যই সামাজিকতায় ইসলামি দিক-নির্দেশনাগুলো জানা একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। এটা জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়।

আজ আপনার সামনে এমন কিছু দিক-নির্দেশনা তুলে ধরতে চাই, যেন আজকের পর থেকে আমাদের কোনো মজলিস কিংবা আলোচনাই বৃথা না যায়। বরং এগুলো জান্নাতে পৌঁছোবার মাধ্যম হয়। আমরা এও আশা করি, দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি আলোচনা, প্রতিটি আড্ডা কাল হাশরের ময়দানে আমাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।

১) সালাম দিয়ে প্রবেশ করুন, সালাম দিয়েই বিদায় নিন
কীভাবে একটি মজলিসে অংশগ্রহণ করবেন, এ নিয়ে পদ্ধতির শেষ নেই। বিভিন্ন জন বিভিন্ন অভিবাদনের কথা বলবন। কিন্তু সালামের চেয়ে উত্তম অভিবাদন মিলবে না কোথাও।

রাসূল বলেন, إِذَا انْتَهَى أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَجْلِسِ فَلْيُسَلِّمْ، فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقُومَ فَلْيُسَلِّمْ، فَلَيْسَتِ الأُولَى بِأَحَقَّ مِنَ الآخِرَةِ 'তোমাদের কেউ মজলিসে উপস্থিত হলে যেন সালাম দেয় এবং মজলিস হতে বিদায়ের সময়ও যেন সালাম দেয়। শেষ সালাম প্রথম সালামের মতোই জরুরি। [১৮৮]

এই হাদীস মেনে যে-কোনো মজলিসে অংশগ্রহণের দ্বারা আপনি এই কথাটিই প্রমাণ করেন-'আমি এই বৈঠকে বসলাম শান্তির বার্তা নিয়ে। এখানে উপস্থিত কিংবা অনুপস্থিত কেউই আমার দ্বারা কোনো আঘাত পাবে না। বিদায়বেলাতেও শান্তির বার্তা রেখে আমি প্রস্থান করব।'

২) প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর স্মরণে কাটান
আলোচনার মজলিসে কেউই সর্বক্ষণ কথা বলে না। তা ছাড়া এমনটি করা প্রশংসনীয় কাজও নয়। তাই সাময়িক বিরতির মুহূর্তগুলো আল্লাহর যিকরে কাটান, পরকালের জন্য কিছু বিনিয়োগ করে ফেলুন। রাসূল বলেন, مَا مِنْ قَوْمٍ جَلَسُوا مَجْلِسًا لَّمْ يَذْكُرُوا اللهَ فِيهِ إِلَّا رَأَوْهُ حَسْرَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ 'কোনো জাতি যদি বৈঠকে আল্লাহর যিকর না করে, তা হলে নিশ্চিত তাদের এই বৈঠক কিয়ামাতের দিন আফসোসের কারণ হবে।[১৮৯]

রাসূল-এর মন সর্বদা আল্লাহর সাথে জুড়ে থাকত। আর যারাই তাঁর সাথে বসেছে বিষয়টি লক্ষ্য করেছে, প্রত্যেক বিরতিতে নবিজির ঠোঁট আল্লাহর যিকরে নড়ছে। আবদুল্লাহ ইবনু উমর এমনটাই দেখেছেন: كُنَّا نَعُدُّ لِرَسُولُ اللهِ - صلى الله عليه وسلم - فِي الْمَجْلِسِ الْوَاحِدِ مِئَةَ مَرَّةٍ: «رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 'আমরা গণনা করে দেখলাম এক বৈঠকেই আল্লাহর রাসূল এক শ বার বললেন, رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 'ও আমার রব, আমাকে মাফ করুন, আমার তাওবা কবুল করুন। অবশ্যই আপনি তাওবা কবুলকারী এবং অত্যন্ত দয়াময়।[১৯০]

আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকার মানে এই নয়-মজলিসে গিয়ে ধ্যান ধরে বসে হবে, কারও প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না। এজন্য আমাদের তৃতীয় দিক-নির্দেশনা :

৩) প্রত্যেকের প্রতি মনোযোগী হন
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বর্ণনা করেন, রাসূল একটি আংটি বানিয়ে নিয়েছিলেন, সেটি পড়ে থাকতেন। পরবর্তীকালে তিনি সাহাবিদের বলেন, شَغَلَنِي هَذَا عَنْكُمْ مُنْذُ الْيَوْمِ، إِلَيْهِ نَظْرَةٌ، وَإِلَيْكُمْ نَظْرَةٌ 'আজ এই আংটি আমাকে তোমাদের থেকে গাফেল করে দিয়েছে। একবার আমি এর দিকে তাকাই, আরেকবার তোমাদের দিকে।' অতঃপর রাসূল সেই আংটি ফেলে দিলেন।[১৯১]

আলোচনা চলাকালে আপনার মোবাইল দূরে রাখুন। ল্যাপটপ বন্ধ করে দিন। আইপ্যাড একপাশে সরিয়ে রাখুন। আরও যতকিছু আছে মনোযোগ ছিনিয়ে নিতে পারে, সব সরিয়ে রাখুন। বিশেষ করে মা এবং বাবা এবং পরিবারের সাথে বসার সময় এসব যেন আপনার মনোযোগ ছিনিয়ে না নেয়, সে ব্যবস্থা করুন।

৪) সাহস নিয়ে অন্যের সংশোধন করুন
আলোচনার শুরুটা হয়তো ভালো কথা দিয়েই হয়েছিল, কিংবা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে এর মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যেতে থাকল। একপর্যায়ে তা পাপের কারণ হয়ে গেল! এই মোড় পরিবর্তন হতে পারে গীবত, দ্বীন নিয়ে হাসি-তামাশা করা, কিংবা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করা, অনিশ্চিত বা যাচাই ছাড়া কোনো বিষয়ে আলোচনা করা, কিংবা কুদৃষ্টি দেওয়া, মাদক-সেবন, অথবা সালাতের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়া। এই ধরণের অনেক কিছুই হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আপনার কাজ হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে মার্জিত ভাষায় নসিহত করা। আর এতে যদি কাজ না হয়, তা হলে সেই বৈঠক পরিহার করা। এটিই সর্বোত্তম। কিন্তু আপনি যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকেন, চুপচাপ দেখে যান তাদের অন্যায়গুলো, তা হলে আল্লাহর কাছে আপনিও তাদের মতোই সমান দোষী সাব্যস্ত হবেন।

আল্লাহ বলেন, وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ 'আর হে মুহাম্মাদ, যখন তুমি দেখো, লোকেরা আমার আয়াতের মধ্যে দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছে তখন তাদের কাছ থেকে সরে যাও, যে পর্যন্ত না তারা এ আলোচনা বাদ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়।' [১৯২]

অন্য এক আয়াতে আরও কঠিন ভাষায় সাবধান করা হয়েছে : وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ 'আর আল্লাহ এই কিতাবে তোমাদের পূর্বেই হুকুম দিয়েছে—যেখানে তোমরা আল্লাহর আয়াতের বিরুদ্ধে কুফরি কথা ও তাঁর প্রতি বিদ্রুপ করতে করতে শুনবে, সেখানে বসবে না; যতক্ষণ না লোকেরা অন্য প্রসঙ্গে ফিরে আসে।[১৯৩]

পাপে অংশগ্রহণ করা আর পাপের স্থানে চুপটি মেরে বসে থাকা একই কথা। এজন্য ইমাম কুরতুবী ওপরের আয়াতের তাফসীরে বলেন, 'কেউ যদি কোনো পাপের আড্ডায় বসে এবং তাদের প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়, তবে পাপের দিক থেকে তারা সবাই সমান।[১৯৪]

ইবরাহীম নাখঈ বলেন, 'এক লোক এক মজলিসে বসল, এবং এমন কথা বলল যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে। ফলে তার ওপর রহমত বর্ষিত হয় এবং তার সাথে-বসা সকলের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে আরেক লোক হয়তো মজলিসে বসে এমন কথা বলল, যা আল্লাহর ক্রোধের কারণ হলো। ফলে তার ওপর ক্রোধ বর্ষিত হয় এবং তার সাথে বসা বাকিরাও এই ক্রোধের মধ্যে পড়ে।[১৯৫]

৫) গোপন কথা বলতে মানা
অন্যের গোপন কথা বলে বেড়ানোর স্বভাব আমাদের একটু বেশিই। বিশেষ করে স্বামী- স্ত্রীরা আড্ডা দেবার সময় কে কী বলেছে তা সূক্ষ্মভাবে একে অপরকে বলে দেয়। অথচ যাদের গোপনীয়তা আমরা ফাঁস করে দিলাম, তারা আমাদেরকে বিশ্বাস করেই কথাগুলো শেয়ার করেছিল। আমরা তাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করলাম। আর বন্ধুকে এটা বলার মানে হয় না 'এই কথা কাউকে বলবি না।' কারণ, একজনের কথা অন্য জনকে না বলাটাই তো স্বাভাবিক হওয়ার কথা। অনুরোধ করতে হবে কেন? রাসূল বলেন, المجالس بالأمانة অর্থাৎ 'মজলিস আমানতের অন্তর্ভুক্ত।[১৯৬]

আনমনে আপনার মুখে যা এল বলে দিলেন, অথচ সে বিষয়টিই অন্য কারও চোখে বিশাল সমস্যার কারণ হতে পারে। আলোচনায় সর্বদা এমন গোপন কথা বলার দরকার নেই। যখন বুঝা যাচ্ছে এসব প্রকাশ করে সত্যিকারার্থে কোনো ফায়দা নেই, তখন গোপন কথা ফাঁস করারও প্রয়োজন নেই।

৬) উত্তম-সঙ্গ নির্বাচন করুন
কত মানুষ যে স্রেফ সঙ্গীর কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আল্লাহই ভালো জানেন। তদ্‌রূপ কত মানুষ যে শুধুমাত্র সঙ্গীর কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, আল্লাহই ভালো জানেন। সঙ্গী বাছাইয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হাশরের ময়দানে অনেকেই তার পরিণতির জন্য বন্ধুদের দায়ী করবে। আল্লাহ বলেন, وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا 'আর সেদিন জালিম নিজের হাত দুটো কামড়িয়ে বলবে, “হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোনো পথ অবলম্বন করতাম!” “হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।”[১৯৭]

জীবনে সবকিছুর মানদণ্ড সব সময় এক রকম থাকে না। রকমারি খাবার, খেলাধুলা, দাওয়া, জ্ঞানার্জন, ইবাদাত, মানুষের সাথে ওঠাবসা করা-সবকিছুরই প্রভাব জীবনে পড়ে। আপনি অনুধাবন করতে পারেন কিংবা না পারেন, আপনার সঙ্গীসাথিদের ভালো লাগার বিষয়গুলো সময়ের ব্যবধানে একদিন আপনারও ভালো লাগায় পরিণত হবে।

এজন্য আমাদের পূর্বসূরিগণ সঙ্গ-গ্রহণের ব্যাপারে খুব সতর্কতা অবলম্বন করতেন। বিশেষ করে নতুন কোনো শহরে গেলে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। তাবিয়ি আলকমা বলেন, 'আমি শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) শহরে পৌঁছে সেখানে দু রাকআত সালাত আদায় করলাম। এরপর দুআ করলাম, "আল্লাহ, আমার জন্য নেক মজলিস (খুঁজে পাওয়া) সহজ করে দিন।' দুআ শেষ করে এক বৈঠকে গিয়ে বসে পড়লাম। সেখানে একজন শাইখ এলেন। আমার কাছাকাছি বসলেন তিনি। আমি জানতে চাইলাম, উনি কে। লোকেরা বলল, উনি রাসূল-এর সাহাবি আবুদ দারদা [১৯৮]।

একইভাবে হুরাইস ইবনু কাবীসা বলেন, 'আমি মদীনায় পৌঁছে দুআ করলাম, "আল্লাহ, আমার জন্য নেক বৈঠক সহজ করে দিন।” ফলে আবূ হুরায়রা-এর মজলিসে বসার তাওফীক পেয়ে গেলাম। [১৯৯]

আসলে আমাদের সালাফগণ নিম্নোক্ত হাদীসটির আসল মর্ম বুঝতে পেরেছিলেন: الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلْ 'ব্যক্তি তার বন্ধুর দ্বীনের ওপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়। কাজেই, তোমাদের প্রত্যেকেই যেন খেয়াল করে সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে। [২০০]

আর এটা কোনো অজুহাত হতে পারে না যে, বর্তমানে মুত্তাকী, পরকাল-অভিমুখী লোক নেই। আপনার কাজ হলো ইখলাসের সাথে আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাওয়া, যেন তিনি আপনাকে তাদের নিকটবর্তী করে দেন। এবং তাদেরকেও আপনার কাছে পৌঁছে দেন।

৭) উপকারী কথাই শুধু বলুন
কী বলছেন এবং কীভাবে বলছেন—এর ওপর অনেক ফলাফল নির্ভর করছে, এরকম পরিস্থিতিতে আপনি প্রায়ই পড়বেন। আপনার কথা যেমন দুনিয়া সাজায়, তেমনি সাজায় আখিরাতের জীবন।

আর তাই রাসূল বলেন, مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং কিয়ামাত-দিবসের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে নতুবা চুপ থাকে’।[২০১]

মনের ভাব প্রকাশে কথা বলা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে খুব দ্রুত মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। মুখের ওপর লাগাম পরানোর অর্থ হলো, নিজের বদ-অভ্যাসের ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আর আল্লাহ যে আপনাকে দেখছেন, এটার ওপরও আপনার বিশ্বাস আছে। তাই তো কথা বলার সময় আপনি সচেতন হচ্ছেন। কী বলতে যাচ্ছেন, তা বলার আগে যাচাই করে নিচ্ছেন।

‘আমি কোনো অকল্যাণকর কথা বলব না’—যে ব্যক্তি নিজের জীবনে এটি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তার ব্যক্তিগত-সমস্যা, সামাজিক-সমস্যা, সর্বোপরি আখিরাত-কেন্দ্রিক সমস্যা এবং বিপদাপদ আগেভাগেই দূর হয়ে যাবে বিইজনিল্লাহ।

৮) রসিকতা আর বিদ্রুপ এক নয়
রসিকতার উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবেশ কিছুটা হালকা করা এবং উপস্থিত জনতার মধ্যে আনন্দের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু এটা যদি সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দেবার উপক্রম হয় কিংবা কাউকে দুঃখ পৌঁছায়, তখন সেটা আর রসিকতা থাকে না, বরং উপহাস-বিদ্রুপে পরিণত হয়। আর আল্লাহ এ ধরণের কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِسَاءٍ عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُসَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ 'ঈমানদারগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে সে বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা কোরো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ নাম কতই-না নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম। [২০২]

যাকে নিয়ে মজা করা হচ্ছে, সে হয়তো আমাদের কথায় মুখ ফুটে হাসছে। কিছু বলছে না। এর মানে কিন্তু এই নয়, সে আমাদের উপহাস ভালোভাবে নিয়েছে বা মন থেকে গ্রহণ করেছে। বরং হাসি দ্বারা হয়তো প্রচণ্ড আঘাত সে আড়াল করতে চাইছে। কবির ভাষায়: 'কখনও কখনও সম্মানিত ব্যক্তি চুপ থাকে উত্তর দেবার ভয়ে যদিও-বা সে পারদর্শী বাগ্বিতণ্ডায়। কখনও কখনও সম্মানিত ব্যক্তি মুচকি হাসে, যদিও-বা অন্তরটা পুড়ে যাচ্ছে কষ্ট যাতনায়। [২০৩]

একদিন নবিজি-কে রসিকতা করতে দেখে সাহাবিগণ প্রশ্ন করলেন : আল্লাহর রাসূল, আপনিও আমাদের সাথে রসিকতায় অংশগ্রহণ করছেন? তিনি উত্তরে বললে, 'তবে আমি শুধু সত্য কথাই বলি।[২০৪]

নবিজি রসিকতার সাথে উপহাস গুলিয়ে ফেলতেন না। শ্রোতার মানসিকতার জন্য ক্ষতিকর কিছু বলতেন না তিনি। তাঁর মধ্যে ছিল না মিথ্যাবাদিতা কিংবা কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার করার স্বভাব। তেমনি তাঁর রসিকতা মাত্রাতিরিক্ত হতো না।

৯) সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করুন
যৌবনকালে কখনও অপমানিত হলে, তা আমাদের সব সময় তাড়া করে বেড়ায়। তেমনিভাবে প্রেরণাদায়ক মুহূর্তগুলো এবং উৎসাহ-প্রদানকারী কথাগুলোও আমরা ভুলতে পারি না। আর তাই আপনি যখন কোনো বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন, চেষ্টা করবেন উপস্থিত জনতার সুপ্ত প্রতিভাগুলো বিকশিত করতে। উৎসাহ দেবেন এবং তাদের প্রতিভাগুলো বেঁধে দেবেন পরকালের সুতোয়। অর্থাৎ কীভাবে তারা এই গুণ কাজে লাগিয়ে জান্নাত-পানে ছুটে যেতে পারে, সে ব্যাপারে নির্দেশনা প্রদান করবেন।

ইতিহাসের পাতায় এমন মহৎ ব্যক্তি অনেক, যাদের জীবনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল স্রেফ একটি উক্তি থেকে। হ্যাঁ, মজলিসের একটি কথাই তাদের গোটা জীবন পাল্টে দিয়েছিল। দুটো উদাহরণ দিই:

সাধারণ একটি বৈঠক চলছিল। উপস্থিত জনতা একে অপরের সাথে মত বিনিময় করছিল সেখানে। ইমাম যাহাবি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ শাইখ বিরযালি ইমাম যাহাবি-কে ডেকে বললেন, 'তোমার হাতের লেখা হাদীস-বিশারদদের মতো।' এই কথাটিই যাহাবি-এর জীবনের মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়। পরবর্তীকালে যাহাবি বলেন, 'সেদিন থেকে আল্লাহ তাআলা আমার অন্তরে হাদীসশাস্ত্রের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে দিলেন।'[২০৫]

পরবর্তী জীবনে তিনি ইলমের ময়দানের বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং এমন অসংখ্য বই রচনা করেন যেগুলো ছাড়া আজ আমরা লাইব্রেরি তৈরির কথা কল্পনাও করতে পারি না।

তেমনিভাবে একটি সাধারণ মন্তব্য ইমাম বুখারি-কে হাদীস সংকলন করতে উৎসাহ প্রদান করে। আজ তার সংকলিত 'সহীহ বুখারি' সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যে কুরআনের পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ। ইমাম বুখারি-এর ভাষ্যমতে এর শুরুটা যেভাবে হয়েছিল: 'আমরা ইসহাক ইবনু রাহাউইহ-এর দারসে বসে ছিলাম। তিনি বললেন, "তোমরা যদি নবিজি-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত হাদীস-গ্রন্থ সংকলন করতে!”” ইমাম বুখারি বলেন, 'তাৎক্ষণিক আমার মনে এই কাজ করার ইচ্ছা উদয় হলো। সেদিন থেকেই আমি বিশুদ্ধ হাদীস সংকলনের যাত্রা শুরু করি।।[২০৬]

বলে রাখা ভালো, ইমাম বুখারি যখন এই কাজ শুরু করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১৬ বছর। সেদিন থেকে পরবর্তী ১৬ বছর তিনি এই সহীহ বুখারির পেছনেই ব্যয় করেন।

আপনি হয়তো কোনো-এক বৈঠকে অনুপ্রেরণাদায়ক কিছু কথা বললেন। কিন্তু দেখা গেল, আপনার সেই কথাগুলো কারও অন্তরে গিয়ে বিঁধেছে। আপনার কথার দ্বারাই পাল্টে গেছে তার পুরো জীবন। আমূল পরিবর্তন হয়েছে তার দৃষ্টিভঙ্গির। দিনশেষে তার অর্জিত সাওয়াবের ভাগীদার আপনিও হবেন ইন শা আল্লাহ।

১০) দুআ দ্বারা শেষ করুন
আমাদের অভিজ্ঞতা বলে সব আলোচনার পরিসমাপ্তি ভালো কিছু দিয়ে হয় না। গুরুত্বপূর্ণ কথা থেকে অহেতুক আড্ডার দিকে গড়ায়। তারপর রাগের মাথায় গলার স্বর উচু হয়ে যাওয়া, খারাপ শব্দ ব্যবহার করা, দুনিয়াবি আলোচনায় ডুবে যাওয়া, কিংবা খুব বেশি- মাত্রায় ঠাট্টা মশকরা করা-এভাবে বহু মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

আমি নিশ্চিত, এরকম কোনো আড্ডা থেকে কেটে পড়তে আপনি খুব উদ্‌গ্রীব হয়েছিলেন। সুযোগ খুঁজতে খুঁজতে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। আমাদের এই অধ্যায়ের সর্বশেষ নির্দেশিকা আপনার অস্থিরতা দূর করতে এবং অন্তরের প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বিইজনিল্লাহ।

রাসূল বলেন, مَنْ جَلَسَ في مَجْلِسٍ، فَكَثُرَ فِيهِ لَغَطُهُ فَقَالَ قَبْلَ أَنْ يَقُومَ مِنْ مَجْلِسِهِ ذَلِكَ: سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لا إلهَ إِلا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ، إِلَّا غُفِرَ لَهُ مَا كَانَ في مَجْلِسِهِ ذَلِكَ
'কেউ এমন বৈঠকে বসল যেখানে (অহেতুক) শোরগোল বেড়ে গেল, কিন্তু প্রস্থানের পূর্বে সে যদি বলে, "আল্লাহ, আপনি বড়োই পবিত্র, আপনার জন্যই প্রশংসা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনার কাছে মাফ চাচ্ছি এবং আপনার কাছে তাওবা করছি।” তা হলে সেই বৈঠকে-হওয়া যাবতীয় গুনাহ থেকে সেই ব্যক্তি ক্ষমা পেয়ে যাবে।' [২০৭]

এ থেকেই বোঝা যায় কেন রাসূল-এর জিহ্বায় সর্বদা ওপরের দুআটি লেগেই থাকত। আমাদের মা আয়িশা বলেন, 'এমন কোনো বৈঠক নেই, তিলাওয়াত নেই, সালাত নেই, যা শেষ করার পর আল্লাহর রাসূল এই দুআ পড়তেন না।' [২০৮]

এই যদি হয় রাসূল-এর ইতি টানা, অথচ যারা তাঁর সঙ্গ গ্রহণ করত, তারা ছিল নির্ভেজাল যিকরকারী এবং সর্বদা আল্লাহর প্রশংসাকারী। তা হলে আমার আপনার বৈঠকের সমাপ্তি কেমন হওয়া উচিত!

রেস্টুরেন্টের টেবিল থেকে ওঠার সময়, পরিবারের সাথে সন্ধ্যার বৈঠক শেষে, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে করা চ্যাট করার পর—আল্লাহর রাসূলের হারিয়ে-যাওয়া এই সুন্নাহ পুনরুজ্জীবিত করুন এবং অন্যদেরও করতে উৎসাহিত করুন।

সবশেষে আদবের অনেক বিষয় রয়ে গেছে যা আমি উল্লেখ করতে পারিনি। আশা করি পাঠক ব্যক্তিগত তাগিদে সেগুলো জেনে নেবেন। তবে পুরো লেখাটির মূল উপপাদ্য ছিল দ্বীন ইসলামের সৌন্দর্য বোঝানো। ইসলাম আমাদেরকে কোনো বিষয়েই অজ্ঞতার অন্ধকারে ফেলে রাখে না। যে ব্যক্তি মনে-প্রাণে আল্লাহকে চায় এবং চায় জান্নাতে একটি ঘর বানাতে, তাকে জীবনের পরতে পরতে নিখুঁত পথনির্দেশ প্রদান করে ইসলাম।

অধ্যায়টি কেবল বৈঠকের আদবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং মুখের ওপর লাগাম, দৃষ্টি অবনত, আল্লাহর যিকরের গুরুত্ব, মানুষের সম্মান রক্ষা করা, দুআ, আমানত রক্ষা করা, ভালো কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা, এ ছাড়া আরও অনেক কিছুই উদ্দেশ্য ছিল। এগুলো সব আমাদের আড্ডা কিংবা মজলিসেরই অংশ। আর সত্যি বলতে কী। জীবনটা স্রেফ কিছু বৈঠকেরই সমষ্টি।

ও আল্লাহ, আজকের পর থেকে আমাদের সকল বৈঠক, সকল আলোচনা, আড্ডাকে তুমি জান্নাতে প্রবেশের ওসীলা বানিয়ে দিয়ো!

টিকাঃ
[১৮৭] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৬২
[১৮৮] মুসলিম: ৫২০৮
[১৮৯] সহীহ ইবনু হিব্বান, ৮৫৩
[১৯০] আবূ দাউদ, ১৫১৬; সহীহ
[১৯১] নাসাঈ, ৫২৮৯
[১৯২] সূরা আনআম, ৬ : ৬৮
[১৯৩] সূরা আন-নিসা, ৪: ১৪০
[১৯৪] তাফসীর আল-কুরতুবী, ৫/৪১৮
[১৯৫] ইবনুল জাওযী, যাদুল-মাসির, ১/৪৮৮
[১৯৬] আবূ দাউদ, ৪৮৬৯
[১৯৭] সূরা ফুরকান, ২৫: ২৬-১৭
[১৯৮] বুখারি, ৩৭৮৭
[১৯৯] তিরমিযি, ৪১৩
[২০০] তিরমিযি, ২৩৭৮
[২০১] বুখারি, ৬২০৮
[২০২] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১১
[২০৩] শুআবুল ঈমান, ৯৬২৫
[২০৪] তিরমিযি, ১৯৯০
[২০৫] সিয়ার, ১/৩৬
[২০৬] তাদরীবুর রাবী, ১/৮৮
[২০৭] তিরমিযি, ৩৪৩৩
[২০৮] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ১০০৬৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px