📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 আল্লাহর সাথে কথা বলতে

📄 আল্লাহর সাথে কথা বলতে


আজ অবধি কয়টি রমাদান চলে যেতে দেখলেন? ৫, ১০, ২০... কারও জীবনে সংখ্যাটি হয়তো আরও বেশি। কিন্তু এখনও আপনি বুঝে উঠতে পারেননি তারাবিতে কী তিলাওয়াত করা হয়। নিজেকে প্রশ্ন করুন,
- জীবন থেকে আর কয়টা রমাদান চলে গেলে আমার পরিবর্তন আসবে?
- নিজেকে বদলে ফেলার জন্য আর কয়টি রমাদান আমার প্রয়োজন?

প্রতিদিন তারাবিতে তিলাওয়াত শুনছেন কয়েক ঘণ্টা করে। কিন্তু তবুও আপনার অন্তর বিগলিত হয় না; এর কারণ কিন্তু এই নয় আপনার ঈমান সব সময় দুর্বল থাকে, কিংবা গোপন পাপগুলো পাঁচিল হয়ে থাকে। বিষয়টি এর চেয়েও সাধারণ এবং দিবালোকের মতো স্বচ্ছ—আপনি কুরআনের ভাষাকে এখনও আপন করে নিতে পারেননি।

বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম তাবারি বলেন, ‘এমন ব্যক্তিকে দেখে আমি অবাক হই, যে কুরআন পড়ে কিন্তু এর অর্থ বোঝে না। সে কীভাবে এর মজা বুঝবে?!'

আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বশেষ ঐশী বাণীর জন্য আরবি ভাষা নির্বাচন করেছেন, অথচ এই কিতাব সমগ্র মানবজাতির জন্য পাঠানো হয়েছে! তা হলে কেন আরবি ভাষায়? অন্য ভাষায় নয় কেন? অবশ্যই এর পেছনে হিকমাহ আছে।

আল্লাহ বলেন, إِنَّا جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ ‘আমি একে আরবি ভাষার কুরআন বানিয়েছি যাতে তোমরা তা বুঝতে পারো’।[১]

তিনি আরও বলেন, قُرْآنًا عَرَبِيًّا غَيْرَ ذِي عِوَجٍ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ 'আরবি ভাষার কুরআন, যাতে কোনো বক্রতা নেই। যেন তারা মন্দ পরিণাম থেকে রক্ষা পায়।।'[২]

আরেক স্থানে বলেন, وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ بِلِسَانٍ عَرَبِي مُبِينٍ 'এটি (কুরআন) রব্বুল আলামীনের নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত রূহ (জিবরীল) তা নিয়ে অবতরণ করেছে-তোমার হৃদয়ে, যেন তুমি সতর্ককারী হতে পারো। (অবতীর্ণ করা হয়েছে) সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।'[৩]

বিখ্যাত ভাষাবিদ আহমাদ ইবনু ফারিস বলেন, 'আরবি ভাষাকে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট শব্দ দিয়ে গুণান্বিত করার দ্বারা এটাই বোঝাচ্ছেন, পৃথিবীর তাবত ভাষার চেয়ে আরবি সেরা।'

আরবি ভাষা ইসলামের ভাষা। যুগ যুগ ধরে এইভাবেই ইসলাম এসেছে, কখনও পাল্টাবে না। তা সত্ত্বেও আমরা যারা এখনও এই ভাষা রপ্ত করার জন্য চেষ্টা করছি না। অনুবাদ পড়ে আল্লাহর কালামের ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে অনেককিছু হারাচ্ছি আমরা, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কুরআনের অলঙ্কার, ভাষাগত মু'জিযা, অন্তস্পর্শী ভাব-এগুলো তরজমার মাধ্যমে কখনোই পরিপূর্ণভাবে ফুটে ওঠে না। আর তাই আমাদের পূর্ববর্তীরা অনেক জোরালোভাবে আরবি ভাষা শিখতে বলতেন।

উবাই ইবনু কা'ব (রা) বলেন, 'যে গুরুত্ব নিয়ে তোমরা কুরআন মুখস্থ করো, সেভাবে আরবি ভাষাও শিখো।'

আবূ বকর (রা) বলেন, 'তিলাওয়াত করার সময় ব্যাকরণগত ভুল করার চেয়ে কুরআনের কিছু অংশের (হিফয) ভুলে যাওয়াটা আমার কাছে উত্তম।'

একবার উমর (রা) সদ্য-মুসলিম-হয়ে-আসা কিছু লোকদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তারা তির ছোড়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। একপর্যায়ে তির লক্ষ্যচ্যুত হলে উমর (রা) তাদের তিরস্কার করেন। কিন্তু আরবি ভাষায় উত্তর দিতে গিয়ে তারা ভুল আরবি বলে ফেলে। তাদের কথা শুনে উমর (রা) বলেন, 'তোমাদের এই ব্যাকরণগত ভুল আমার কাছে তির লক্ষ্যচ্যুত হওয়া থেকেও বেশি কষ্টদায়ক।'

হাজ্জ-এর সময়কার কথা। উমর (রা) এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি হাজ্জ করার সময় ফারসি ভাষায় কথা বলছিল। উমর (রা) তার কাঁধে হাত রেখে বলেন, 'আরবিতে কথা বলা শেখো।'

শুধু তাই নয়, আইয়ূব সিখতিয়ানি আরবিতে যদি কখনও ব্যাকরণগত করে ফেলতেন, তখন তিনি ইস্তিগফার করতেন। বলতেন, 'আল্লাহ, আমাকে মাফ করুন!' আলি ইবনু আবী তালিব এবং আবদুল্লাহ ইবনু উমর দুজনই তাদের সন্তাদের শাসন করতেন আরবিতে ভুল করলে।

মূলত তাঁরা নিজেদের মানদণ্ড অনেক উঁচুতে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন-মুসলিমদের অন্তরের সাথে আরবি ভাষাকে জুড়ে-দেওয়া মানে তাদের পুরো জীবনকেই কুরআনের সাথে জুড়ে-দেওয়া। আর তাই অতীতে ইসলামের বার্তা প্রসারের সাথে সাথে আরবি ভাষাও দিদিগন্ত ছড়িয়ে যেত। মানুষ ইসলাম কবুলের পর দলে দলে আরবি ভাষা শিখত। ফলে সেই সময়ে মুসলিমরা আল্লাহর কালামকে ভিন্ন ভাষায় তরজমা করার প্রয়োজনবোধ মনে করেনি।

বর্তমানে অসংখ্য ভাষায় কুরআনের তরজমা হচ্ছে। এর ফলে এক দিক থেকে অনেক উপকার হয়েছে। কিন্তু একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করলে, এটা আমাদের জন্য দুঃখজনকও বলেও মনে হয়। মুসলিমরা আজ নিজেদের ভাষা আরবি জানে না। এটা তাদের অন্যতম দুর্বলতা।

আপনার অর্জনের ফিরিস্তি হয়তো অনেক দীর্ঘ। হয়তো যে বিষয়ের দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দেন, ওই বিষয়টি অর্জন করেই ছাড়েন। অতএব এখনি সময় আপনার সেই যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে জীবন পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্ত নেবার। 'আগামী রমাদানে আমি আল্লাহর কালাম সরাসরি বুঝব।' বলুন, 'ইন শা আল্লাহ।' এরপর কাজে নেমে পড়ুন!

টিকাঃ
[১] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩।
[২] সূরা যুমার, ৩৯: ২৮
[৩] সূরা শুআরা, ২৬: ১৯২-১৯৫

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 আমলের স্বাদ হারিয়ে গেলে

📄 আমলের স্বাদ হারিয়ে গেলে


দেখতে দেখতে রমাদানের একটি সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। তা সত্ত্বেও আমাদের অনেকের অভিযোগ আছে— ‘অন্তরে কোনো পরিবর্তন নেই।’

হ্যাঁ, বাহ্যিক আমলে আমরা কোনো কমতি করছি না হয়তো। তবে দুঃখের বিষয় হলো, অন্তরে কোনো রেখাপাত সৃষ্টি হচ্ছে না। যেন ভেতরটা শুষ্ক ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কোনো ফলন নেই। কেন এমনটা হচ্ছে?

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ এমন নিষ্ক্রিয়তার একটি সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমলের স্বাদ অন্তর অনুভব করতে ব্যর্থ হলে তোমার আমলকেই দোষারোপ কোরো। কেননা আল্লাহ তায়ালা বড়োই কৃতজ্ঞ; অর্থাৎ আমলকারীকে পুরস্কারস্বরূপ দুনিয়াতেই তিনি আমলের স্বাদ আস্বাদন করান। ফলে বান্দা অন্তর দিয়ে এর মিষ্টতা অনুভব করে। তার ভেতরটা প্রফুল্লতা এবং প্রশান্তিতে ভরে যায়। আর যদি সে এমন অনুভূতি না পায়, তা হলে (বুঝে নিতে হবে, তার) আমলের মধ্যেই গণ্ডগোল আছে।’ [১]

কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে আমরা আমলের স্বাদ অনুভব করতে ব্যর্থ হচ্ছি এবং ইবাদাতের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের পাপই হচ্ছে সেই প্রতিবন্ধক। যদি এই বাধাকে হটাতে চান, তা হলে সত্য মনে তাকে খুঁজে বের করুন;
- 'এটা কি আমার আন্তরিকতার অভাবের দরুন হচ্ছে?'
- 'আমি কি আত্মতুষ্টিতে ভুগছি?'
- 'অনলাইনে কিংবা অফলাইনে নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করি, এসব কি দায়ী?'
- ওমুকের সাথে ঝগড়া করার কারণে নয় তো?
- 'আচ্ছা, আমার আর্থিক অবস্থা কি আমাকে ব্যহত করছে?'
- 'এটা কি হিংসার কারণে যা আমার ভেতরটা জ্বালিয়ে দিচ্ছে?'
- 'বাবা-মায়ের সাথে খারাপ সম্পর্কের কারণে নয় তো?'
- 'না কি আমার গোপন পাপের অভ্যাস এসবের পেছনে মূল হোতা?'
- 'আমার পাপ কম—এমন অহংকারী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য নয় তো?'

মূল সমস্যা আমাদের চোখের সামনেই দণ্ডায়মান। প্রয়োজন শুধু নিজেকে আত্ম- জিজ্ঞাসার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। উহাইব ইবনু ওয়ারদ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'পাপে-নিমজ্জিত-ব্যক্তি কি ইবাদাতের স্বাদ অনুভব করতে পারে?' তিনি বললেন 'না, এমনকি সেও না, যে পাপ কামনা করে।'

অসুস্থ শরীরে ভালো খাবারের স্বাদ অনুভব করতে যেমন বেগ পেতে হয়, তেমনি অসুস্থ অন্তরেও ইবাদাতের স্বাদ অনুভব করতে বেগ পেতে হয়। নিজের দোষ দেখতে পাওয়া কঠিন। আর সেগুলো প্রতিহত করা আরও কঠিন। কিন্তু এটি অবশ্যই করতে হবে। আর আনন্দের বিষয় হচ্ছে, চেষ্টা অব্যহত থাকলে এটা শুধু সময়ের ব্যাপার, আপনার নফস আপনার কাছে একদিন আত্মসমর্পণ করবেই ইন শা আল্লাহ।

আবূ যাইদ বলেন, 'যখন আমার নফসকে আল্লাহর দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকলাম, সে কাঁদতে লাগল। এভাবে চলতে চলতে একটা পর্যায় সে আত্মসমর্পণ করল এবং হাসিমুখে মেনে নিল। [২]

নফসকে এভাবে পরিশুদ্ধ করার জন্য রমাদানের চেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর কী হতে পারে?

টিকাঃ
[১] মাদারিজুস সালিকীন, ২/৬৮
[২] সাইদুল খাতির, ১১৪

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 দুআ : মুমিনের প্রাণ

📄 দুআ : মুমিনের প্রাণ


আচ্ছা, জীবনে কখনও কষ্টে জর্জরিত হয়নি, কখনও কাঁদেনি এমন কেউ কি আছে? না। পৃথিবীতে এমন মানুষ মেলা ভার। এমন মানুষও আছে, রাতে যাদের ঘুম আসে না। চিন্তার মধ্য দিয়েই তাদের রাত কেটে যায়! কিন্তু এগুলো যে সর্বদা নিজের কারণেই হয়, তাও কিন্তু না। কখনও হয় সন্তানের কল্যাণের কথা চিন্তা করে। কখনও স্ত্রী-বাবা- মা কিংবা বন্ধুবান্ধবের জন্য। কখনও-বা মাসজিদ আল-আকসার মতো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে!

এ ছাড়া আমরা প্রত্যেকেই এমন কিছু বাস্তবতার সম্মুখীন হই, যা কখনও রোধ করা যায় না। যেমন: অসুস্থতা, অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ আপদ, বার্ধক্য ইত্যাদি। এগুলো থেমে থাকে না। আর সবশেষে মৃত্যুর মাধ্যমে জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সে জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। সে জীবন হবে চির আনন্দের, নতুবা দুঃখের।

আল্লাহ তাআলা তাঁর কালামে বলেন, وَخُلِقَ الْإِنْسَانُ ضَعِيفًا 'আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে।' [১]

আরেক আয়াতে এসেছে: لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانُ فِي كَبَدٍ 'অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে। [২]

পরহেজগার বান্দা হোক কিংবা গাফেল, কেউই দুনিয়াতে দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত নয়। মানুষ এসব থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কেউ অন্যদের বলে বেড়ানোর মাধ্যমে কষ্টকে হালকা করার চেষ্টা করে। কেউ কেউ সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লাগাতার মাদক সেবন করে, কেউ-বা হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে মুক্তি খোঁজে। আবার কেউ বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। পক্ষান্তরে এমন মানুষও কিন্তু আছে, যারা এগুলোর কোনোটাই করে না। তারা বোঝে সব সমস্যা সমাধান হবার নয়। আর যে ব্যক্তি মন থেকে ভালো থাকতে চায়, তার শান্তি কেড়ে নেবার ক্ষমতা কারও নেই।

এই জীবন আকাশের মতো। এতে কখনও আনন্দের মেঘ ভাসে, কখনও বেদনার বৃষ্টি ঝরে। হয়তো সচ্ছলতা কিংবা দারিদ্রের কষাঘাতে কারও জীবন টইটম্বুর। তথাপি তাদের মধ্যে একটি বিষয়ের মিল পাবেন; তারা দু-হাত তুলে দুআ করতে জানে। তারা সেই সত্তার কাছে চায়, যিনি সত্যিই প্রতিটি আহ্বান শোনেন। আহ্বানকারী ধনী হোক কী গরীব, মুত্তাকী কী পাপী, তিনি সবার ডাকই শোনেন। তাঁর কাছেই রয়েছে সকল সমস্যার সমাধান। জীবনে যত কঠিন মুহূর্তই আসুক, তারা প্রশান্তি খুঁজে পায় সেই একজনের সান্নিধ্যে, সেই একজনের সাথে নিবিড় আলাপনে, আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সাথে।

অতীতের মানুষের কথা আজ নাই-বা বললাম, বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবলে ইচ্ছে করে চিৎকার করে বলি, 'কোথায় গেলে আল্লাহর বান্দারা! কোথায় হারিয়ে গেল তোমাদের অশ্রুঝরা দুআ?' ওয়াল্লাহি, বর্তমানে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া আমাদের বড্ড প্রয়োজন। অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাঁর কাছে বেশি বেশি দুআ করা, তাঁকে বারবার ডাকা। নিত্যনতুন রোগ-বালাই দেখা দিচ্ছে, পাপের জগৎ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, সংসারের বাঁধন ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, সংশয়- সন্দেহ আদর্শে রূপ নিচ্ছে, আল-আকসা কাঁদছে, অপরদিকে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম উম্মাহ যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে লাঞ্ছনাকর সময়ের মধ্য দিয়ে।

মোদ্দা কথা আমাদের সবার প্রয়োজন আল্লাহকে ডাকা, তাঁর কাছে মুক্তির ভিক্ষা চাওয়া। তাঁকে আমাদের বড্ড প্রয়োজন। আপনার রবকে বোঝান-রহমত পাবার জন্য কতটা মরিয়া আপনি, কতটা অসহায় আপনি। আর নিজেকে আল্লাহর দরবারে এভাবে উপস্থিত করার উপায় একটাই, তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে দুআ করা।

তাই আজকের আলোচনার বিষয় 'দুআ কবুলের চাবি'। দুআ কবুল আমাদের অনেকের কাছে এখন রূপকথার গল্পের মতো। মানুষ আশা হারিয়ে ফেলছে, দুআ ছেড়ে দিচ্ছে। তাই আজ আমরা আবিষ্কার করব দুআ কবুলের চাবি। যে চাবি দ্বারা আমরা মাওলার নুসরতের দুয়ার উন্মোচন করব ইন শা আল্লাহ।

১) অন্তরকে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিন, আন্তরিক হোন
এমনটা প্রায়ই ঘটে, ব্যক্তি আল্লাহর নিকট দুআ করছে, কিন্তু তার অন্তর ভিন্ন কিছুতে ব্যস্ত। মুখ নড়ছে, আমীন বলছে, কিন্তু মন অনুপস্থিত। আসলে এমনটা হবার অন্যতম কারণ, আল্লাহর নিকট যা আছে এর চেয়ে মানুষের হাতে যা আছে-মন সেটার প্রতিই বেশি আকৃষ্ট থাকে সেই মুহূর্তে। তাই ওই বিষয়গুলো নিয়ে সে ভাবতে থাকে দুআর সময়েও।

আল্লাহ বলেন, وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ 'এবং তোমার রবের প্রতিই মনোনিবেশ করো।[৩]

অন্তরকে শুধু সুস্পষ্ট হারাম সম্পর্ক, মূর্তি কিংবা কবরপূজা থেকেই দূরে রাখা যথেষ্ট নয়। অপছন্দনীয় বিষয়সমূহ থেকেও পবিত্র করাটাও জরুরি। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস- আদালত, লাভ-বিনিয়োগ, ইত্যাদি যত রকমের প্রতিবন্ধকতা আছে-অন্তর থেকে এসব বিদায় জানাতে হবে দুআর সময়। দুআর মুহূর্তটি কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করুন, মন-দিল লাগিয়ে তাঁর সাথে কথা বলুন। আল্লাহ বলেন, وَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ '..এবং তাঁরই ইবাদাতের জন্য একনিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ডাকো।'[৪] আমাদের মুখের আবদার যেভাবে আল্লাহর কাছে মেলে ধরি, ঠিক সেভাবেই আমাদের মনের ব্যাকুলতা আল্লাহর কাছে মেলে ধরতে হবে। অন্তরের অন্তস্তল থেকে চাইতে হবে।

২) দুআর শুরুটা যেন ভালো হয়
দুআর শুরুতে আল্লাহর গুণকীর্তন করুন এবং নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর দরুদ পাঠ করুন। দুনিয়ার মন্ত্রীদের কাছে সাহায্য চাইতে গেলে কত গুণকীর্তনই-না করতে হয়, কত আদবের ধারই-না ধারতে হয়! অথচ আমাদের রব রাজাধিরাজ, সমগ্র সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক, যাকে ছাড়া প্রতিটি সৃষ্টি অচল। তাঁর দরবারে কোনো প্রশংসাপত্র ছাড়াই আপনার প্রয়োজন পেশ করবেন!?

একদিনের ঘটনা। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন এক ব্যক্তি কোনো প্রকার আদব ছাড়াই দুআ করছে। নবিজি বললেন, 'তাড়াহুড়ো করছে লোকটি।' এরপর বললেন, 'তোমাদের কেউ যখন দুআ করে, সে যেন শুরুতে তার রবের গুণকীর্তন ও প্রশংসা করে। এরপর যেন দরুদ পাঠ করে নবি-এর ওপর। তারপর নিজের প্রয়োজন পেশ করে।' [৫]

আলি ইবনু আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'প্রত্যেক দুআই ঢাকা থাকে, যতক্ষণ না নবি-এর ওপর দরুদ পাঠ করা হয়। [৬]
অর্থাৎ নবিজির ওপর দরুদ পাঠের পরই দুআ উন্মুক্ত হয়।

উমর (রা) বলেন, 'নিশ্চয়ই দুআ আকাশ ও জমিনের মাঝখানে অবস্থান করে। এর কিছুই ওপরে ওঠে না, যতক্ষণ না তুমি নবি-এর ওপর দরুদ পাঠ করছ। [৭]

নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অনেকভাবে দরুদ পাঠ করা যায়। যেমন: ১. দুআর আগে দরুদ পাঠ করা, তবে এর আগে আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে। ২. দুআর শুরুতে, মধ্যে, এবং শেষে দরুদ পড়া। ৩. দুআর শুরুতে এবং শেষে পাঠ করা, আর এর মধ্যবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় বিষয়টি দুআয় তুলে ধরা। [৮]
সবগুলো পন্থাই গ্রহণযোগ্য।

৩) নিশ্চিত হয়ে দুআ করুন
দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে চাইবেন না। চাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হোন। এভাবে বলুন : ‘আল্লাহ আমাকে দিন, আল্লাহ আমাকে দান করুন, আল্লাহ আমার ওপর বর্ষণ করুন...’। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন এমনটা না বলে “আল্লাহ, আপনি যদি চান আমাকে মাফ করুন। আল্লাহ আপনি আপনি যদি চান আমার ওপর রহম করুন।” বরং সে যেন অবশ্যই দৃঢ়তার সাথে দুআ করে। কেননা আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই।’[৯]

৪) বারবার চান
পরিবারের কাছে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের কাছে চাইবার সময় কতবার চাই? দুবার কি তিনবার। এতেও যদি সাড়া না মেলে, তা হলে পরের বার চাইতে লজ্জাবোধ করি। বারবার চাওয়া আমরা সবাই কম-বেশি অপছন্দ করি। কাউকে বিরক্ত করতে চাই না। কিন্তু আল্লাহর নিকট বারবার চাওয়া ‘বিরক্তি’ নয়; তিনি সবচেয়ে ধনী, দান-দীক্ষায় তাঁর নেই কোনো ভয়, বরং তিনি বারবার চাওয়াকেই পছন্দ করেন। তিনি চান বান্দা তাঁর দরজায় লাগাতার কড়া নাড়ুক। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআর ধরন নিয়ে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, ‘রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার করে দুআ করা এবং তিনবার করে মাফ চাওয়া পছন্দ করতেন।’[১০]

অধিকাংশ সময় এমনটি করতেন তিনি। বর্ণিত আছে কখনও কখনও তিনবারের বেশিও দুআ করেছেন। যেমন আহমাস গোত্রের বরকতের জন্য করা দুআ। এ ছাড়া অসুস্থ ব্যক্তির জন্য একটি দুআ আমাদেরকে সাতবার পুনরাবৃত্তি করতে বলেছেন তিনি। আল্লাহর দরবারে বারবার ফিরে যাওয়া, অনুনয় বিনয় করা দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ। এতে প্রমাণিত হয় আপনি শুধু তাঁরই সাহায্যের মুখাপেক্ষী। মন থেকে বিশ্বাস রাখেন, আল্লাহ ছাড়া আপনার কোনো গতি নেই। ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'সবচেয়ে উপকারী একটি ঔষধ হলো-দুআয় লেগে থাকা।[১১]

৫) মন উপস্থিত তো?
দুআ কবুলের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো অন্তরায় অমনোযোগী অন্তর। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'দুআ কবুল হবে এই দৃঢ়-বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহকে ডাকো। এবং জেনে রেখো, গাফেল ও অন্যমনস্ক অন্তর নিয়ে করা দুআর জবাব আল্লাহ তাআলা দেন না।[১২] তাঁকে ডাকুন অন্তরের অন্তস্তল থেকে। এমন ভাবনা নিয়ে ডাকুন, যেন তিনি আপনার সামনেই আছেন। আপনার প্রতিটি বিষয় তাঁর জ্ঞানের আওতাভুক্ত। তিনি সবকিছুই দেখেন ও শোনেন। এই বিশ্বাস নিয়ে তাঁকে ডাকুন। যে ব্যক্তি এভাবে মন থেকে দুআ করে, সে কি অন্যমনস্ক হতে পারে?

৬) কিবলামুখী হোন
বদর প্রান্তর। অল্প-সংখ্যক সাহাবিদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নবিজি। সামনে বিশাল- সংখ্যক মুশরিক বাহিনী। সংখ্যায় দ্বিগুণেরও বেশি। তাদের প্রত্যেকেই যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। সে তুলনায় সাহাবিগণের প্রস্তুতি আপাত-দৃষ্টিতে নেই বললেই চলে। টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল তখন। এমতাবস্থায় নবিজি এক মিনিটও বেকার যেতে দিলেন না। কিবলামুখী হয়ে দুআয় বসে পড়লেন। [১৩]

তবে নবিজি ভিন্ন দিকে মুখ রেখে দুআ করেছেন এমন ঘটনাও কিন্তু বিরল নয়। এজন্য ইমাম নববি বলেন, 'কিবলামুখী হয়ে দুআ করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)।[১৪]

৭) হাত পাতুন
এক হাদীসে কুদসিতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'নিশ্চয়ই তোমাদের মহিমান্বিত রব অত্যন্ত লজ্জাশীল এবং দয়াবান। বান্দা যখন তাঁর সমীপে হাত ওঠায়, তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে তিনি লজ্জাবোধ করেন। [১৫]

দু-হাত পেতে চাওয়া বিনয় এবং অসহায়ত্বের পরিচায়ক। আল্লাহর প্রতি দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু দুআয় হাত তোলার পদ্ধতি কী? আলিমগণ পরিস্থিত বিবেচনায় তিনটি পদ্ধতির কথা বলেছেন:
- প্রথম পদ্ধতি : শাহাদাত আঙুল উত্তোলন করা। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটা করতেন বেশকিছু জায়গায়, যেমন মিম্বারে দাঁড়িয়ে দুআ করার সময়, তাশাহহুদের সময়। তেমনিভাবে কেউ যদি জনসাধারণের পক্ষ থেকে দুআ করতে চায়, সেও অনুরূপ করতে পারে।
- দ্বিতীয় পদ্ধতি: স্বাভাবিক নিয়ম এটি। অর্থাৎ হাতের তালু দুটো একত্রে লাগিয়ে, আকাশের দিকে উত্তোলন করে, কাঁধ বরাবর রেখে দুআ করা।
- তৃতীয় পদ্ধতি: দুআর পেছনে যখন বৃহৎ কোনো স্বার্থ থাকে। আরবিতে একে বলা হয় ইবতিহাল। উদাহরণস্বরূপ, সমগ্র উম্মতের জন্য কার্যকরী কোনো দুআ, কাফিরদের ক্ষেত্রে বদদুআ ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত এত উঁচুতে তুলে ধরতেন যে, তার বগলের শুভ্রতা প্রকাশ পেয়ে যেত। বদরের দিন এরকম করেছিলেন তিনি।

৮) সুখে-দুঃখে, সর্বাবস্থায় দুআ করা
আদবের অংশ এটি। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই এই আদবের বরখেলাপ করে। শুধু প্রয়োজনের সময় দুআর দ্বারস্থ হয়। কেবল বিপদে পড়লে আল্লাহকে চেনে। অন্য সময়গুলোতে দুআর কোনো প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করে না। যখন প্রচণ্ড আঘাত পাই, শত্রুর সম্মুখীন হই, অর্থনৈতিকভাবে একটু দোটানায় থাকি, সিভি জমা দিয়েও ইন্টারভিউয়ের ডাক আসে না, কিংবা অন্যকোনো বিপদাপদের সম্মুখীন হই—তখনই আমরা দুআ করি কেবল। নিঃসন্দেহে দুর্দিনে আল্লাহর অভিমুখী হওয়া প্রশংসনীয় কাজ, তদ্রূপ সুদিনেও অনুরূপ করা চাই।

নবিদের দুআ কেন কবুল হয়—এর উত্তরে আল্লাহ বলেছেন, 'নিশ্চয় তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। এবং আমাকে আশা ও ভয় নিয়ে ডাকত। আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়ী। [১৬]

এই আয়াতে দুআ কবুলের পেছনে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ এসেছে:
১) 'সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত' তাদের জীবন ছিল ইসলামের আলোয় আলোকিত, আল্লাহর ইবাদাত এবং তাঁর গুণকীর্তনের সমষ্টি। ঠিক এই কারণে আল্লাহকে ডাকা-মাত্রই তারা সাড়া পেয়েছেন।
২) 'আমাকে আশা ও ভয় নিয়ে ডাকত' অবস্থা যেমনই হোক, তারা আল্লাহর কাছে হাত তুলতেন। সুখে আছে না দুঃখে, নিরাপদে আছে না ভয়ে—এগুলো তাদের দুআর পথে প্রতিবন্ধক হতে পারত না।
৩) 'আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়ী' আত্মতুষ্টি, জেদ, দাম্ভিকতা-অহংকারের ছিটেফোঁটাও ছিল না নবিদের অন্তরে। এগুলো তাঁরা গোড়া থেকে উচ্ছেদ করে ফেলেছেন। তা ছাড়া যে অন্তর আল্লাহর বিরুদ্ধাচারণে লিপ্ত, তার দুআ কীভাবে কবুল হবে?

মোদ্দা কথা, আপনি যদি চান দুর্দিনে আপনার ডাক শোনা হোক, তা হলে সুদিনে দুআর পরিপূর্ণ ঝুড়ি নিশ্চিত করুন। এটাই সহজ পদ্ধতি। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যে চায় কঠিন সময় আল্লাহ তার দুআর জবাব দিক, সে যেন স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে বেশি বেশি দুআ করে।[১৭]

নবি ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর অগ্নিপরীক্ষার কাহিনি আমরা সবাই জানি। কওমের প্রতি হতাশ হয়ে তিনি যখন স্বদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, এক তিমি তাঁকে গিলে ফেলে। মুহূর্তেই ইউনুস আলাইহিস সালাম নিগূঢ় অন্ধকারে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। রাতের অন্ধকার, সমুদ্রের অন্ধকার, তিমির পেটের অন্ধকার। চারিদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। তবুও হাল ছেড়ে দেননি তিনি। দুআ করলেন : لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ 'আপনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি জালিমদের একজন ছিলাম।[১৮]

দুআ কবুল হয়েছিল। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে আল্লাহ তাকে এই অন্ধকার থেকে মুক্তি দেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তার দুআ কবুল হয়েছিল? আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন: فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ, لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ 'সে যদি আল্লাহর মহিমা ঘোষণাকারীদের একজন না হতো, তা হলে কিয়ামাতের দিন পর্যন্ত মাছের পেটে থাকত' [১৯]

অর্থাৎ অগ্নিপরীক্ষায় পতিত হবার পূর্বেই যদি তিনি কোনো নেক আমল না করতেন, তা হলে তিমির পেটেই তাঁর কবর রচিত হতো। 'সে যদি আল্লাহর মহিমা ঘোষণাকারীদের একজন না হতো' এই আয়াতাংশের তাফসীরে কাতাদা বলেন, 'স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে তিনি অনেক সালাত পড়তেন। তাই আল্লাহ এর বদৌলতে তাকে রক্ষা করলেন। বর্ণিত আছে “নেক আমলকারী হোঁচট খেলে তার আমল তাকে তুলে ধরে। আর সে যদি পড়ে যায়, ভর দেবার কিছু-না-কিছু পেয়েই যায়। [২০]

আবুল আলিয়া এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, 'তিনি আগেই নেক আমল পাঠিয়েছিলেন। [২১]

ঠিক এই জন্যই ইউনুস আলাইহিস সালাম পরীক্ষায় পতিত হলে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে পাশ করে বেরিয়েছেন। অতএব কেবল বিপদে পড়লেই দুআ করবেন না। নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুব-সমাজকে শিখিয়ে গেছেন: 'স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে চেনো, তা হলে কঠিন সময়ে তিনি তোমাকে জানবেন।' (অর্থাৎ তোমাকে সাহায্য করবেন)। [২২]

আলহামদু লিল্লাহ অনেক বিপদ থেকে আপনি বেঁচে আছেন, যা থেকে নিস্তার পেতে অন্যরা হয়তো দিবারাত্রি লড়াই করে চলছে। আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা হয়তো বেগতিক নয় এতটা। অপরদিকে এমন মানুষ পাবেন, যারা বিভিন্ন রোগ-শোকে আক্রান্ত। চিকিৎসায় তাদের কষ্টে অর্জিত প্রায় সব সহায় সম্পদ ঢেলে দিতে হচ্ছে। কিন্তু আপনি একদম সুস্থ, দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে এইসব বিপদাপদ থেকে নিরাপদ রেখেছেন।

তা সত্ত্বেও আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কিছু পরীক্ষা অবধারিত। মৃত্যুর যন্ত্রণা, কবরের অন্ধকার, মুনকার নাকিরের প্রশ্ন, হাশরের ভয়াবহতা, হিসাবের জন্য ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা; অনিশ্চিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা, জাহান্নামের ওপর বসানো পিচ্ছিল পুলসিরাত অতিক্রম করা, এ ছাড়া কিয়ামাত-দিবসে বহু ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে আমাদের।

এই পরীক্ষাগুলোর মধ্য দিয়ে আমাদের সবাইকে যেতে হবে। আমরা বড়োজোর এগুলোর ভয়াবহতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারি। জানেন কীভাবে? ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর মতো করে। কঠিন পরীক্ষায় দেবার আগেই পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে, নেক আমল দিয়ে। ভাইরে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে জেনেছে এবং দুনিয়ার জীবন তাঁর ইবাদাতে কাটিয়েছে, অপরদিকে যে ব্যক্তি কোনো-প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই কিয়ামাতের দিন আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়াবে- উভয়ের ফলাফল কিন্তু কখনোই এক হবে না। আজ বোঝা না গেলেও সেদিন উভয়ের মধ্যে কল্পনাতীত পার্থক্য সূচিত হবে।

তেমনি এটাও স্মরণে রাখতে হবে, যারা সত্যিকারার্থে মন থেকে দুআ করে, তারা কখনোই 'বিপদের' অপেক্ষায় থাকে না। বরং দুআ তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী, আল্লাহর দরজাতেই কাটে তাদের দিবারাত্রি। বর্তমান বিপদাপদ দূরীকরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বিপদাপদ ধেয়ে আসার পূর্বেই তারা আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তাদের তাবত প্রস্তুতি গ্রহণে একটি অস্ত্রই থাকে- দুআ। দুআই সেই অস্ত্র। মুমিনের হাতিয়ার। দুর্দিনে দুআ তাদের সুরক্ষা-দ্বার, আর সুদিনে ভালোবাসার চাদর। দুআ তাদের জীবন, তাদের ভালোবাসা। দুআর মাধ্যমে তারা ছুটে যায় সাত আসমান ছাড়িয়ে এবং হারিয়ে যায় মাওলার সাথে নিবিড় আলাপনে।

আর কতকাল আমরা এই ইবাদাতের স্বাদ গ্রহণ থেকে বিরত থাকব? আসুন না শুরু করি নতুন একটি দিন! যে দিনটি শুরু হবে নিবিড় আলাপন দিয়ে, শেষও হবে নিবিড় আলাপন দিয়ে... আল্লাহর সাথে!

টিকাঃ
[১] সূরা নিসা, ৪: ২৮
[২] সূরা বালাদ, ৯০: ৪
[৩] সূরা ইনশিরাহ, ৯৪:৮
[৪] সূরা আ'রাফ, ৭:২৯
[৫] আবূ দাউদ, ১৪৮১; সহীহ
[৬] শুআবুল-ঈমান, ১৪৭৪
[৭] তিরমিযি, ৪৮৬
[৮] ইবনুল কাইয়িম, জালাউল আফহাম, ৩৭৫
[৯] বুখারি, ৭৪৭৭
[১০] মুসনাদ আহমাদ, ২৯০/৫; সহীহ
[১১] আল-জাওয়াবুল কাফী, ১১
[১২] তিরমিযি, ৩৪৭৯
[১৩] মুসলিম, ১৭৬৩
[১৪] নববি, শারহু মুসলিম, ৬/১৮০
[১৫] সহীহ ইবনু হিব্বান, ৮৭৬
[১৬] সূরা আম্বিয়া, ২১:৯০।
[১৭] তিরমিযি, ৩৩৮২
[১৮] সূরা আম্বিয়া ২১:৮৭
[১৯] সূরা সাফফাত, ৩৭: ১৪৩-১৪৪
[২০] তাফসীর আত-তাবারি, ১৯/৬২৮
[২১] প্রাগুক্ত, ১৯/৬২৯
[২২] কুরতুবি, ৬/৩৯৮; হাসান

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 সব রোগের কার্যকরী ঔষধ

📄 সব রোগের কার্যকরী ঔষধ


বিখ্যাত হাদীস-বিশারদ আবূ আবদুল্লাহ হাকিম নিশাপুরি রহিমাহুল্লাহ। মাসের-পর-মাস তিনি একটি রোগে ভুগছিলেন। বেশ কিছু ফোসকা ছিল তাঁর চেহারায়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে এর চিকিৎসা করিয়েছেন দীর্ঘ এক বছর যাবৎ। কিন্তু আশানুরূপ কোনো ফল পাননি।

এক জুমার দিন তিনি ইমাম আবূ উসমান সাবৃনির কাছে যান। খুতবা চলাকালে তার জন্য দুআ করতে অনুরোধ করলেন। ইমাম আবূ উসমান দুআ করলেন। উপস্থিত মুসল্লিরাও শরীক হলো সেই দুআয়।

সপ্তাহ খানেক পরের কথা। এক মহিলা একটি চিঠি পাঠান হাকিম রহিমাহুল্লাহ-কে। চিঠিতে তিনি জানান, সেদিনের দুআয় তিনিও উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর অসুস্থতা শুনে ব্যথিত হয়েছেন। তাই তিনি বাসায় ফিরে তাঁর জন্য দুআ করেন। অতঃপর সেদিন সন্ধ্যায় রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে স্বপ্নে বলতে শুনলেন: 'আবূ আবদুল্লাহ-কে বলো, সে যেন মুসলিমদের জন্য পানির ব্যবস্থা করে।'

চিঠিটি হাকিমকে দেখানো হলে তিনি তাৎক্ষণিক নিজের বাগানে যান। সেখানে একটি পুকুর খনন করে তাতে বরফ ছেড়ে দেন এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এরপর কী হলো? এক সপ্তাহ যেতে-না-যেতেই তার ফোসকা নিরাময় হতে শুরু করল। এবং একপর্যায়ে তা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার চেহারা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। পরবর্তীকালে আরও কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন তিনি।[১]

দান-সদাকা করা—এ এমন এক ঔষধ, অধিকাংশ ডাক্তারই রোগীদের প্রেসক্রিপশনে লিখতে ভুলে যান। এরকম আরেকটি ঘটনা আমরা জানতে পারি লেখক শাইখ আলি ফীফীর ‘লি আন্নাকাল্লাহ’ বই থেকে। তিনি তার এক বন্ধুর গল্প শুনিয়েছেন এতে, একদিন মাসজিদে যাবার পথে তিনি অ্যাক্সিডেন্ট করেন। তার দুই বছরের ভাগ্নির ওপর চাকা উঠে গেছে। বাচ্চাটিকে বের করে দ্রুতবেগে হাসপাতালে ছুটে যান তিনি। এর মধ্যে মৃত্যু ছুঁইছুঁই অবস্থা। ডাক্তারগণ চেকাপ করে পরিবারকে জানান, বাচ্চাটির মৃত্যুর সম্ভাবনা ৮০%!

এ অবস্থায় তাদের এক আত্মীয় উপদেশ ও সান্ত্বনা লাভের আশায় একজন তলিবে ইলমকে ফোন করে। ঘটনা শুনে সে বলে, ‘একটি পশু যবেহ করুন এবং মেয়েটির সুস্থতার নিয়ত করে এর মাংস বিতরণ করে দিন।’ তারা সেটাই করল। পরবর্তীকালে সেই বন্ধুটি বলেন, ‘ভোর হতে-না-হতেই আমার ভাগ্নি একদম সুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়ে গেল।’

ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'বিভিন্ন প্রকারের বিপদ-আপদ দূরীকরণে দান-সদাকার প্রভাব আশ্চর্যদায়ক; যদিও দানকারী পাপী, জালিম কিংবা কাফির। [২]

মুনাওয়ি বলেন, 'আল্লাহর সৌভাগ্যবান (বান্দাগণ দানের) বিষয়টি প্রয়োগ করে এমন আধ্যাত্মিক সমাধান পেয়েছেন, যা অতি কার্যকরী ঔষধও দিতে পারে না। আর এর সত্যতা কেবল সে ব্যক্তিই অস্বীকার করবে, যে নিজেকে সত্য দেখা থেকে আড়াল করে রাখে। [৩]

দান-সদাকা বিপদাপদ হটিয়ে দেয়, ব্যথা লাঘব করে, দুর্দশা থেকে মুক্তি দেয়। আর ভেতরে ভেতরে রহমতের এমন বিশাল ময়দান তৈরি করে, যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপা যায় না। আপনি কি স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত? দুর্দশাগ্রস্ত? এখনই বসে পড়ুন এবং এই নিয়তে দান-সদাকার জন্য কিছু টাকা রেডি করে ফেলুন। আর এ কাজের জন্য রমাদানের চেয়ে উত্তম মাস আর কী হতে পারে? ভবিষ্যৎ-জীবনে-আসন্ন-বিপদাপদ এখনই নিশ্চিহ্ন করে ফেলুন ইন শা আল্লাহ।

ইবনু আব্বাস বলেন, 'আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল ছিলেন। কিন্তু রমাদান এলে দান-সদাকা আরও বাড়িয়ে দিতেন।'[৪]

টিকাঃ
[১] শুআবুল ঈমান, ৩১০৯
[২] আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব, ৩১
[৩] ফাইযুল কাদীর, ৩/৫১৫
[৪] বুখারি, ৩৫৫৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px