📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 টুকরির বিনিময় প্রাসাদ

📄 টুকরির বিনিময় প্রাসাদ


একবার এক লোকের গল্প শুনেছিলাম আমাদের এক ভাইয়ের কাছে। সে একটি মাসজিদ নির্মাণের দায়িত্বে ছিল। আসলে পুরো প্রজেক্টটাই তার নিজের। লোকটি এই প্রজেক্টকে সন্তানের চোখে দেখত। মনে-প্রাণে চাইত কিয়ামাতের দিন এটি যেন আল্লাহর সামনে নেক আমল হিসেবে পেশ করতে পারে। সে একজন ধনী মানুষ। তাই এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্যে যাবতীয় খরচ নিজেই বহন করল। পাশাপাশি কড়া নজরদারি রাখল-কেউ যেন এই নির্মাণ-কাজে কোনোভাবে অবদান রাখতে না পারে। মূলত এই আমলের সাওয়াব সে একাই পেতে চাচ্ছিল। তাই কারও অংশীদার থাকবে-এটি সে মেনে নিতে পারেনি।

নির্মাণ-কাজ চলাকালে একদিন এক বৃদ্ধা সেখানে যায় একটি টুকরি নিয়ে। সম্ভবত তিনি কারও কাছে শুনেছেন এখানে মাসজিদ নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সে কী-বা করতে পারবে! তাই একটি ছোট্ট টুকরি বানিয়ে নিয়ে আসেন। এই আশায়, হয়তো এটি দিয়ে শ্রমিকরা দু-একটা ইট বহন করতে পারবে, তাদের কাজে আসবে।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যখন মাসজিদ নির্মাণ-কাজ সমাপ্ত হলো, মাসজিদ নির্মাতা একটি স্বপ্ন দেখল। সে দেখল, দুটো প্রাসাদ। একটি প্রাসাদ দেখিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, 'এটা কার?' স্বপ্নে তাকে বলা হলো, 'মাসজিদ নির্মাণ-কাজে অবদান রাখার জন্য আল্লাহ তোমাকে এই পুরস্কার দিয়েছেন।'

নির্মাণ-কাজে 'অবদান রাখার জন্য'! সে যেন আকাশ থেকে পড়ল এ কথা শুনে! 'অবদান! এ আমার মাসজিদ। আমি বানালাম। আমার আমল এটি। কেন অবদান বলা হচ্ছে?!' ঘুম ভাঙতেই ব্যস্ত হয়ে ছুটে গেল সে। শ্রমিকদের কাছে গিয়ে জানতে চাইল, 'আমি স্বপ্নে এরূপ দেখেছি। সত্যি করে বলো তো, আমার অনুপস্থিতিতে এই মাসজিদের কাজে কেউ কি কোনোভাবে সহায়তা করেছে?' তারা বলল, 'না তো! কাজটি সম্পূর্ণ আমরাই করেছি।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা নিশ্চিত?' তারা বলল, 'হ্যাঁ অবশ্যই। শুধু আমরাই করেছি। তবে একদিন এক বৃদ্ধা এখানে একটি টুকরি রেখে যায়, আমরা তা ব্যবহার করেছিলাম। এ ছাড়া কিছুই না।'

লোকটার বুঝতে বাকি রইল না। আল্লাহ অত্যন্ত মহানুভব। সে টুকরিটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বৃদ্ধার বাড়ি খুঁজতে লাগল। খুঁজেও পেল। দরজায় কড়া নাড়তে বৃদ্ধার দেখা পেল সে। এরপর তাকে করজোড়ে অনুরোধ করল, 'প্লিজ আপনার টুকরিটা ফেরত নিন! টুকরিটা ফেরত নিন প্লিজ!'

সে শুরু থেকেই চায়নি কেউ তার সাওয়াবের ভাগিদার হোক। তাই কাকুতি-মিনতি করে বলল, 'প্লিজ আপনার টুকরিটা ফেরত নিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন।' বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন, 'কেন? কী হয়েছে?!' লোকটি জানাল, 'আসলে আমি স্বপ্নে এই এই দেখেছি।' সব শুনে বৃদ্ধা অবাক। বলল, 'সুবহানাল্লাহ! আমিও ঠিক এমন একটি স্বপ্নই দেখেছি। স্বপ্নে আমিও দুটো প্রাসাদ দেখেছি। আমাকেও অনুরূপ কথা বলা হয়েছে, “মাসজিদ নির্মাণ-াজে অবদান রাখার দরুন আল্লাহ তোমাকে এই পুরষ্কার দিয়েছেন।” আর আমি এই নেক আমল ছাড়া এমন পুরস্কার অর্জন করতে পারতাম না। জাযাকাল্লাহু খাইর।' এই বলে সে টুকরি ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানাল।

আপনি যখন আল্লাহর রাস্তায় দান করেন, তখন আপনি আলি হাম্মুদা, মুহাম্মাদ, জিম... দুনিয়ার কারও সাথে লেনদেন করছেন না; সরাসরি আল্লাহ তাআলার সাথে লেনদেন করছেন। জগৎসমূহের প্রতিপালকের সাথে করছেন। আর আল্লাহর কাছে এটা কোনো বিষয় না আপনি কতটুকু করেছেন। আল্লাহ দানের পরিমাণ নয় বরং মনের নিয়ত দেখেন। আর তাই পুরস্কার তা-ই পাবেন যেমন নিয়ত করবেন। ছোট্ট একটি কাজ নিয়তের ফলে পাহাড়সম পুরস্কারও বয়ে আনতে পারে। অতএব নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন। একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যান। এবং অপেক্ষা করুন কল্পনাতীত সাওয়াব দেখার। আল্লাহ দেবেন।

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 কুরআনের সাথে পথচলা

📄 কুরআনের সাথে পথচলা


إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ 'আসলে এ কুরআন এমন পথ দেখায় যা একেবারেই সোজা।'[১]

আয়াতে 'সবচেয়ে সরল' বোঝাতে আরবি যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা হলো أَقْوَمُ (আকওয়াম)। ইংরেজি ব্যাকরণ অনুযায়ী শব্দটি superlative degree। অর্থাৎ কুরআনের সদৃশ কিছু নেই; এমনকি আংশিক তুলনাযোগ্যও না। কুরআন সবচেয়ে সরল, দৃঢ় ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়। তা ছাড়া أَقْوَمُ শব্দটি বিশেষণ। আমরা ছোটোবেলায় পড়ে এসেছি বিশেষণ বা Adjective এর কাজ কোনোকিছুকে বর্ণনা করা। أَقْوَمُ কী বর্ণনা করছে?

আয়াতে উহ্য রাখা হয়েছে বিষয়টি। অর্থাৎ পাঠকের বিবেকের কাছে প্রশ্ন ছেড়ে গেছে : এই কুরআন পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল ও মজবুত... কোন বিষয়ে? পারিবারিক বিষয়ে? স্বাস্থ্য বিষয়ে? না অর্থনৈতিক? বলা হয়নি। তাই আলিমগণ বলেন, 'কুরআন সকল বিষয়ে সর্বোত্তম সমাধান দেয়—এই দাবি প্রতিষ্ঠিত করতেই বিষয়বস্তু অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে।'

কুরআন শুধু জীবনের ক্ষুদ্র অংশ নিয়েই কথা বলে না। কেবল নির্দিষ্ট প্রজন্মের জন্য কুরআন নাযিল হয়নি। দুনিয়া ও আখিরাতের যে-কোনো সমস্যার সমাধান পাবার নিয়তে কেউ যখন কুরআনের কাছে আসে, কুরআন তখন সর্বোত্তম সমাধান দিয়ে থাকে!

আপনি হয়তো নিজের ওপর কুরআনের প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন না, কিংবা সামগ্রিকভাবে উম্মতের মধ্যে এর কোনো ভূমিকা দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু কুরআনের দাবি—সে সব বিষয়ে সর্বোত্তম সমাধান দেয়। তা হলে সমাধানের প্রভাব দেখা যাচ্ছে না কেন? দুটোর একটি হবে : হয় কুরআন তার দাবি অনুযায়ী সঠিক পথ দেখায় না; নাউযুবিল্লাহ! নয়তো আমরা কুরআনকে ঠিকভাবে মানতে ব্যর্থ হয়েছি, তাই সঠিক পথ পাচ্ছি না।

হ্যাঁ, দ্বিতীয় কারণটাই আসল সমস্যা। তা হলে আরেকটি প্রশ্ন আসে, কখন এই কুরআন ব্যক্তি থেকে শুরু করে গোটা উম্মাহর সংশোধন করবে?

এর উত্তরে বলব, 'যখন কুরআনের সাথে আমাদের আচরণ ইনসাফপূর্ণ হবে।' পথহারা মরু-পথিকের কথাই চিন্তা করুন। প্রতিটি মুহূর্ত তাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে। আচমকা সে একটি ম্যাপ পেয়ে গেল, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে কীভাবে দ্রুত এবং নিরাপদে মরুভূমি থেকে বের হতে পারবে। ভাবুন, সেই মুহূর্তে তার অনুভূতি কেমন হবে! কল্পনা করুন, তখন তার চোখযুগল কতটা ঝলমলে দেখাবে! তার ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহের কথা ভাবুন, সে দেখছে, বারবার দেখছে ম্যাপটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। আশায় বুক বাঁধছে, এবার সে রেহাই পাবে, মুক্তি পাবে...

কুরআন পড়ার সময় আমাদেরও এরকম অনুভূতি কাজ করা উচিত। এটি আমাদের সর্বোত্তম পথ দেখাবে, নিরাপদে কূলে ফিরিয়ে আনবে। কুরআনের সাথে আমাদের আচরণ এমনই হওয়া কাম্য।

আল্লাহ বলেন, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ 'যাদের হৃদয় আছে কিংবা যারা একাগ্রচিত্তে কথা শোনে তাদের জন্য এ ইতিহাসে অনেক শিক্ষা রয়েছে। [২]

আরেক স্থানে বলেন, أَفَلَمْ يَدَّبَّرُوا الْقَوْلَ 'তারা কি এ বাণী সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না?'[৩]

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا 'তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? না তাদের অন্তরসমূহে তালা লেগে গেছে? '[৪]

আরবিতে তালা শব্দটির একবচন হলো قفل (কুফল) আর বহুবচন হলো أَقْفَالُ (আকফাল)। কুরআনে শব্দটি বহুবচন রূপে এসেছে। যার অর্থ একাধিক তালা। আল্লাহ বলেন, كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ 'আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।'[৫]

কম-বেশি প্রত্যেক মা-বাবারই আশা থাকে সন্তান হাফিয হবে। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় বিষয়। কিন্তু আপনি এমন অভিভাবক খুব কমই পাবেন, যারা সন্তানকে কুরআন বোঝানোর জন্য শিক্ষক খোঁজ করছেন। আসলে, আল্লাহ তাআলা এই উদ্দেশ্যে কুরআন নাযিল করেছেন, যেন আমরা বুঝি, এর শিক্ষা বাস্তবায়ন করি।

কুরআনি জাতি গড়ার শুরুতেই প্রয়োজন হলো কুরআনকে তার প্রাপ্য অধিকার দেওয়া। আয়াতের শিক্ষাগুলোর প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া।

ভুমিকার এই পর্যায়ে এসে আমরা একটি প্রশ্ন করব, তাদাব্বুর (চিন্তা-ভাবনা) এবং তাফসীর (ব্যাখ্যা করা) — এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?

তাফসীর এবং তাদাব্বুরের মধ্যে পার্থক্য
তাদাব্বুর শব্দটির বুৎপত্তিগতভাবে 'দুবুর' থেকে এসেছে। এর অর্থ কোনোকিছুর পেছন দিক বা অভ্যন্তরীণ অবস্থা। অর্থাৎ তাদাব্বুর বলতে বোঝায় 'বিষয়সমূহের ফলাফল এবং পরিণতির দিকে মনোনিবেশ করা।'

সহজ বাংলায় 'তাদাব্বুর করা' মানে আয়াতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। জানা ও মানার উদ্দেশ্য নিয়ে পড়া। তাদাব্বুর শুধুমাত্র নেক আমলের দিকেই ধাবিত করে না, বরং বিষয়টির সাথে আরও অনেককিছু জড়িয়ে আছে। অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিশা পেতে, কপটতা ছেড়ে আন্তরিক হওয়ার ক্ষেত্রে কিংবা অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরে আসার জন্য তাদাব্বর সহায়ক হতে পারে। তিলাওয়াত করার সময় মনকে যদি এগুলোর কোনো একটিতে নিবদ্ধ করা যায়, ব্যক্তি তখনই তাদাব্বুরের পথে চলতে শুরু করবে। সত্যি বলতে তখনই সে আল্লাহর এই নির্দেশটি বাস্তবায়ন করতে পারবে: “আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।” [৬]

তা হলে তাফসীর কী?
তাফসীর শব্দটি এসেছে ‘আল-ফাসর’ থেকে, যার অর্থ ‘আল-কাশফ’ অর্থাৎ উন্মোচন করা। যুরকানি তাফসীর শব্দকে সংজ্ঞায়িত করেছেন: ‘এমন একটি জ্ঞান, যা দ্বারা ব্যক্তির সামর্থ্য অনুযায়ী কুরআনে আল্লাহর উদ্দিষ্ট অর্থ বোঝার চেষ্টা করা হয়।’ [৭]

অর্থাৎ একজন মুফাসসিরের দায়িত্ব আয়াতের উদ্দিষ্ট অর্থ উন্মোচন করা। অতএব আমরা বলতে পারি, তাফসীর হচ্ছে তাদাব্বুরের দরজা। সর্বপ্রথম পাঠককে উদ্দিষ্ট অর্থ বুঝতে হবে, এরপর পাঠক তাদাব্বুর করবে। অর্থাৎ আয়াতের মণিমুক্তা-হিকমত-লক্ষ্য-মর্ম-শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করবে।

তাফসীর এবং তাদাব্বুরের মধ্যে দ্বিতীয় পার্থক্য হচ্ছে, তাফসীর করার দায়িত্ব আলিমদের। কারণ, আরবি ভাষায় তাদের পাণ্ডিত্য আছে। অপরিহার্য অন্যান্য বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন তারা। পক্ষান্তরে তাদাব্বুর বা চিন্তা-ভাবনা করার দায়িত্ব গোটা উম্মতের। মজার বিষয় দেখুন, যে দুই আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, ‘তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না?’ অর্থাৎ ৪নং সূরা ও ৪৭ নং সূরা, উভয় আয়াতেই তিনি প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছেন কাফিরদের দিকে!

তৃতীয় পার্থক্য হলো, তাফসীরের সীমা আছে, আর তাদাব্বুরের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। বরং তাদাব্বর চলাকালে আল্লাহ হয়তো কারও মনে এমন কিছু ঢেলে দিতে পারেন, যা ইতিপূর্বে কারও অন্তরেই আসেনি।

তাদাব্বুরের পূর্বশর্ত
তাদাব্বুর বা চিন্তা-ভাবনার বিষয়টা ডুবুরিদের মতো। সমুদ্রে ডুবুরিরা কে কত গভীরে যেতে পারে-এটা নির্ভর করে তাদের চর্চার ওপর। চর্চাভেদে ভিন্নতা দেখা দেয়। তদ্‌রূপ তাদাব্বুরেও মানুষের ভিন্নতা থাকে। আরবি ভাষায় পাণ্ডিত্য, প্রতিটি সূরা ও আয়াতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞান, আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট জানা, অলঙ্কারশাস্ত্র, সিদ্ধান্তে যাবার দৃঢ়তা ইত্যাদি জ্ঞানভেদে তাদাব্বুরের মাত্রাও বিভিন্ন রকম হয়।

তবে তাদাব্বুরের মৌলিক কিছু শর্ত আছে, যেগুলো আলিম ও সাধারণ পাঠক-সবার জন্য প্রযোজ্য এবং জরুরিও। সেই শর্তগুলো পূরণের দ্বারা পাঠক তাদাব্বুরের অকৃত্রিম স্বাদ উপভোগ করতে পারবে। আসুন সেগুলো জেনে নিই:

১) কুরআনকে যথোপযুক্ত সম্মান করা, এর পবিত্রতা অনুধাবন করা
কোন বিষয়ে কতটুকু মনোযোগ দিচ্ছেন-নির্ভর করে ওই বিষয়টি আপনার দৃষ্টিতে কতখানি গুরুত্ব বহন করে। অর্থাৎ সকল শর্তের প্রধান শর্ত এটাই। এর ওপরেই নির্ভর করে তাদাব্বুরের ফলাফল। কুরআনের সম্মান অনুধাবনে যদি আমাদের ত্রুটি থাকে, তা হলে আমাদের তাদাব্বুরেও ত্রুটি থাকবে।

আলি ইবনু আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরআনের সম্মানে কী বলেছেন দেখুন, 'এ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। এতে রয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ঘটনা, আর পরবর্তীদের বার্তা। ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে ফয়সালাকারী। তবে এতে ঠাট্টা রসিকতার স্থান নেই। যে এই কুরআন অহংকারবশত পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন। যে একে ছেড়ে ভিন্ন কিছুতে পথনির্দেশ তালাশ করে, আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেন। এ হচ্ছে আল্লাহর রশি। বড়োই মজবুত এই রশি। প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ, যা শুধু সঠিক পথের দিশা দিয়ে থাকে। কোনো অন্তর এর সান্নিধ্যে এসে দিশেহারা হয় না। কোনো জিহ্বার পদস্খলন ঘটে না এর উচ্চারণে। কোনো আলিম এর ব্যাখ্যা লিখে তৃপ্ত হন না। সুস্থ অন্তর এর তিলাওয়াত করে কখনোই পরিশ্রান্ত হয় না। এর বিস্ময় কখনও কাটবার নয়। এ হচ্ছে সেই কিতাব যা শুনে জিনেরা বলতে বাধ্য হয়েছিল, 'নিশ্চয়ই আমরা শুনেছি এক বিস্ময়কর কুরআন!' [৮] এ হচ্ছে সেই কিতাব, যে বক্তা এর থেকে কিছু বলল, সে সত্য বলল। যে এর দ্বারা বিচার করল, সে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করল। যে এর ওপর আমল করল, সে পুরস্কৃত হলো। আর যে এর দিকে আহ্বান করল, সে সীরাতে মুস্তাকীম পেল।" [৯]

এক হাদীসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন, অতীতের কোনো-এক সময়ে একজন রাখাল এক নেকড়েকে মানুষের মতো কথা বলতে দেখে। এতে রাখাল ভারি অবাক হয়, কিন্তু নেকড়ে রাখালের এই বিস্ময় ভেঙে দিয়ে বলে: 'আমি কি তোমাকে এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা বলব না? মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় মানুষদের অতীতে ঘটে-যাওয়া অনেক বিষয় সম্পর্কে জানিয়ে দিচ্ছেন!' [১০]

যে কুরআন আমার-আপনার ঘরে আছে, এটি এই জগতের নয়। চিন্তা করুন, আপনি যা পড়ছেন, তার প্রতিটি অক্ষর সাত আসমানের মালিকের! এই কথা কোনো মানবের নয়! সত্যিই, এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কী হতে পারে? এ এমন এক গ্রন্থ যা পূর্বে-ঘটিত-বিষয় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করে, এবং আগামীতে যা ঘটতে যাচ্ছে, সে বিষয়গুলোও জানিয়ে দেয়। তা ছাড়া কুরআন শুধু নির্দিষ্ট যুগের জন্য নাযিল হয়নি, বরং কিয়ামাত অবধি সকল যুগের ও প্রজন্মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নেকড়ের ভাষায়, এটাই সবচেয়ে বিস্ময়ের।

ঘটনাটি আমরা অনেকেই জানি, একদল জিন একবার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনল। অদৃশ্যে বসে তারা যে কুরআন শুনে যাচ্ছে, নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে অবগত ছিলেন না। পরবর্তীকালে আল্লাহ তাকে জিনদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আয়াত নাযিল করেন, قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرُ مِنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا “(মুহাম্মাদ) বলো, আমার প্রতি ওহি করা হয়েছে যে, নিশ্চয় জিনদের একটি দল মনোযোগ-সহকারে শুনেছে। অতঃপর বলেছে, "আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি।””[১১]

মানুষের মতো কথা বলতে পারে এমন প্রাণীদের নিয়ে কেউ যখন গল্প করে, কিংবা ভুতুরে জিনদের সাক্ষাতের কাহিনি শোনায়, তখন আমরা কতই-না মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি! অথচ সেই জিনদের কাছেই সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল আল-কুরআন। হ্যাঁ, এই কুরআনই সবচেয়ে বিস্ময়ের দাবি রাখে। আর এই বিস্ময়ের প্রভাব যদি আমাদের প্রত্যহ জীবনে না মেলে, কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক উন্নত না করে, তা হলে বুঝতে হবে আমরা সত্যিকারার্থে কুরআনের বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। এর মর্যাদা প্রকৃত অর্থে আমাদের অন্তরে খুব একটা জায়গা করে নিতে পারেনি। অথচ এ কিতাব যদি পাহাড়ের ওপর নাযিল হতো, তা হলে পাহাড় ধসে পড়ত।

আহমাদ ইবনু আবী হাআরি বিস্ময়-সুরে বলেন, 'আমি যখন কুরআন পড়তে গিয়ে একের-পর-এক আয়াতের দিকে তাকাই, হতবুদ্ধি হয়ে যাই! হাফিজদের কথা ভেবে যারপরনাই অবাক হই! কীভাবে তারা রাত্রে ঘুমাতে পারে! কীভাবে তারা দুনিয়ার কোনো কাজ নিয়ে ব্যস্ত হতে পারে! দয়াময় আল্লাহর যে কালাম তারা তিলাওয়াত করে, এর অর্থ যদি বুঝত, তা হলে এর হক জানতে পারত; এর মধ্যে প্রশান্তি খুঁজে পেত। আর এর দ্বারা আল্লাহকে ডাকার মধ্যে যে কী আনন্দ, তা যদি অনুধাবন করতে পারত, তা হলে আনন্দের আতিশয্যেই তারা নির্ঘুম কাটিয়ে দিত সারা রাত; এই ভেবে— কত বড়ো নিয়ামাত তারা লাভ করেছে! '[১২]

সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'হায়, আমি যদি শুধু কুরআনের সাথে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতাম!'[১৩]

যে-কেউ ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ-এর রেখে-যাওয়া কাজসমূহের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করবে, সে একটাই কথা বলবে, 'এ যেন এক কুরআনীয় মানব!' তিনি ছিলেন কুরআনের জন্য নিবেদিত প্রাণ। তাঁর পুরো জীবন কেটেছে এই কালাম বোঝার পেছনে। কুরআন নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকতেন যে, বিয়ে করার সময়টুকু পাননি এই মহান ইমাম। বরং জীবনেও কুরআন দেখেনি-এরকম কাউকে যদি ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ-এর কাজ দ্বারা কুরআনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, সে যখন দেখবে ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ 'আল্লাহ বলেছেন' 'আল্লাহ বলেছেন' কতবার পুনরাবৃত্তি করেছেন-লোকটা ধরে নেবে কুরআন হয়তো ১০ খণ্ডের বিশাল কিতাব!

স্বাভাবিক সময়ে ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ প্রতি দশ দিনে এক খতম দিতেন। কিন্তু তাঁকে যখন কারাবন্দি করা হলে, তিনি তিলাওয়াতের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেন। তিন দিনে এক খতম দেওয়া শুরু করেন। কারাগারের চার-দেওয়ালে বন্দি থেকে এভাবে খতম দিয়ে ফেললেন ৮০ বার! তারপর ৮১তম খতম-চলা-অবস্থায় আল্লাহর ডাক চলে এল। জীবনের অন্তিম মূহূর্তে তিনি এই আয়াত দুটো পড়ছিলেন, إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَنَهَرٍ فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِندَ مَلِيكٍ مُقْتَدِرٍ 'নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝরনাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে। [১৪]

কেন আমি এগুলো বলছি? তাক লাগিয়ে দেবার মতো বিষয় হলো, জীবনের শেষ সময়ে তাঁকে বলতে শোনা গেছে: 'আমার আফসোস হয় সেই অগণিত সময়ের কথা ভেবে, যা আমি কুরআনের অর্থ না বোঝে নষ্ট করেছি।'[১৫]

মালিক ইবনু দীনার বলেন, 'আল্লাহর কসম করে তোমাদেরকে বলছি, কুরআনের প্রতি ঈমান রাখে এমন বান্দার অন্তর অবশ্যই এর দ্বারা চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে। (নয়তো তার ঈমান সঠিক নয়)।'[১৬]

সত্যিই, এই কথাগুলো যে মাথায় রাখে এবং যে রাখে না, তিলাওয়াতের সময় উভয়ের অনুভূতি কক্ষনও এক হবে না।

২) বিশ্বাস রাখুন, কুরআন আপনার সাথেই কথা বলছে
চিঠির শুরুতে 'প্রিয় প্রজা' আর 'প্রিয় আবদুল্লাহ' শব্দ দুটোর পার্থক্য ব্যাপক। তা ছাড়া চিঠির গুরুত্ব প্রেরকের মর্যাদার ওপরেও নির্ভর করে। আর এই কারণে সকল নবি-রাসূল সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন আপন জাতিকে বোঝাতে, যে ওহি নিয়ে তারা এসেছেন তা রাজাধিরাজের পক্ষ থেকে এসেছে। বিশ্বজগতের প্রতিপালক-আল্লাহ তাআলার নিকট হতে।

নূহ ও হৃদ-দুজনই তাদের জাতিকে বলেছেন, أُبَلِّغُكُمْ رِسَالَاتِ رَبِّي 'আমি তোমাদের নিকট আমার রবের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি... '[১৭]

হাসান বাসরি বলেন, 'তোমাদের পূর্ববর্তীরা কুরআনকে তাদের রবের-পক্ষ-থেকে-আসা-বার্তা (মেসেজ) হিসেবে দেখত।।[১৮]

ইমাম গাযালি রহিমাহুল্লাহ বলেন, '(তাদাব্বুরের স্বাদ পেতে) ব্যক্তিকে অবশ্যই বুঝতে হবে, কুরআনে বর্ণিত যাবতীয় কথা তাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে। তা হলে সে যখন কোনো নির্দেশ কিংবা নিষেধাজ্ঞা শুনবে, তখন বুঝতে পারবে, তাকেই আদেশ ও নিষেধ করা হচ্ছে। যখন কোনো ওয়াদা কিংবা ধমক শুনবে, তখনও তার অনুরূপ অভিব্যক্তি হবে। সে যদি পূর্ববর্তী নবিদের ঘটনা শোনে, তা হলে বুঝবে এগুলো স্রেফ উপভোগ করার জন্য বলা হয়নি। বরং আসল উদ্দেশ্য হলো এসব থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পথনির্দেশ গ্রহণ করা। [১৯]

৩) অন্তরকে প্রস্তুত করুন
আলোর প্রভাব চোখে পড়ে আর শব্দের প্রভাব কানে। তেমনি কুরআনের প্রভাব পড়ে অন্তরে। এজন্য আল্লাহ তাআলা মানব-অন্তরকে বেছে নিয়েছেন তাঁর কালাম নাযিলের জন্য। একে নাযিল করেছেন সর্বশেষ নবি, শ্রেষ্ঠ মানব, পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের অধিকারী রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তরে।

আল্লাহ বলেন, وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ ۞ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ ۞ عَلَى قَلْبِكَ 'আর নিশ্চয় এ কুরআন রব্বুল আলামীনের নাযিলকৃত। একে নিয়ে আমানতদার রূহ অবতরণ করেছে তোমার অন্তরে... '[২০]

আমরা জেনেছি, কুরআনের প্রভাব ব্যক্তিভেদে রকমারি ধরনের হয়। এজন্যই কুরআনের মতো মহান উপহার নাযিলের পূর্বে আল্লাহ তাআলা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তর প্রস্তুত করে নিয়েছেন। সীরাতের গ্রন্থে আমরা পড়েছি, শিশুবয়সে দুজন ফেরেশতা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্ষ বিদীর্ণ করেছিল। তাঁর অন্তর বের করে এবং এর কলুষতা পরিষ্কার করে পুনরায় স্থাপন করে দেয় তারা। নবিজির জীবনে এটি ঘটেছিল দুবার।

আসলে কুরআনের জন্য অন্তরকে প্রস্তুত করতে হয়। এক্ষেত্রে আমরাও ব্যতিক্রম নই। অন্তরের পরিশুদ্ধি প্রয়োজন। যেন অন্তরের জমিনে কুরআন জন্ম দেয় ঈমানের উৎকৃষ্ট ফলফলাদি। দুনিয়ার সবচেয়ে স্বচ্ছ পানিও যদি অপরিষ্কার পাত্রে রাখা হয়, পানি নষ্ট হয়ে যাবে। তার বিশুদ্ধতা বজায় থাকবে না। এইটাই বাস্তবতা।

এজন্য যারকাশি বলেন, 'জেনে রাখো, কোনো ব্যক্তির অন্তর যদি বিদআত কিংবা অনবরত পাপের কালিমা দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে, তবে সে কখনোই ওহির আসল মর্ম অনুধাবন করতে পারবে না, গায়েবি ইলমের গোপন ভাণ্ডার তার সম্মুখে উন্মোচিত হবে না।' [২১]

কুরআনের আলোয় জীবন আলোকিত করার এই যাত্রা আপনার কাছে বারবার কঠিন ঠেকলে বুঝতে হবে-আপনার অন্তরে এমন কিছু পাচিল তৈরি হয়েছে, যা কুরআন প্রবেশের পথে প্রতিবন্ধক। ফলে অন্তর কুরআনের গোপন ভাণ্ডার গ্রহণ করতে পারছে না। আর এই প্রাচীরগুলো ধ্বংসের উপায় একটাই-তাওবা।

৪) তারতীল বা ধীরেসুস্থে কুরআন তিলাওয়াত করুন, তাড়াহুড়ো ছাড়ুন
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَقُرْآنًا فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثٍ وَنَزَّلْنَاهُ تَنْزِيلًا 'আর এ কুরআনকে আমি সামান্য সামান্য করে নাযিল করেছি, যাতে তুমি থেমে থেমে তা লোকদেরকে শুনিয়ে দাও এবং তাকে আমি (বিভিন্ন সময়) পর্যায়ক্রমে নাযিল করেছি।'[২২]

আয়াতটির ব্যাখ্যায় তাবিয়ি মুজাহিদ বলেন, '(আমি সামান্য সামান্য করে নাযিল করেছি) যেন তুমি মানুষদের ধীরেসুস্থে ও স্পষ্টভাবে তিলাওয়াত করে শোনাও। তিলাওয়াতে তাড়াহুড়ো করবে না। নয়তো মানুষ বুঝবে না।' [২৩]

আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا .... কুরআন পড়ার ব্যাপারে দ্রুততা অবলম্বন কোরো না, যতক্ষণ না তোমার প্রতি তার ওহি পূর্ণ হয়ে যায় এবং দুআ করো, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমাকে আরও জ্ঞান দান করো।[২৪]

ধীরেসুস্থে পড়া এবং জ্ঞানের প্রবৃদ্ধি-দুটো বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি ছাড়া অপরটি অর্জন অসম্ভব ব্যাপার।

৫) হারিয়ে যান কুরআনের জগতে
কোনোকিছুর গভীরে যাবার অন্যতম উপায় হলো, সে বিষয়টি পুনরাবৃত্তি করা। কথায় আছে 'যা বারবার করা হয়, তা অন্তরে গেঁথে যায়।' পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে ১৭ বার সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে বলার পেছনে হয়তো এটাই গোপন রহস্য। এই সূরা আল্লাহর প্রতি আমাদের দাসত্ব নবায়ন করে। নবায়ন করে আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সেই সাথে পৌঁছে দেয় ঈমানের দরিয়ায়।

সূরা ইখলাসের কথাই ভাবুন, প্রত্যেক ফরজ সালাত শেষে আমরা তিলাওয়াত করি এবং মাসনুন দুআ হিসেবে সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে তিলাওয়াত করি। আবার ফজরের দুই রাকআত সুন্নাহ সালাতের দ্বিতীয় রাকাতে, বিতর সালাতের শেষ রাকাতে পড়ি, এবং ঘুমানোর আগে। (কারণ, এগুলো রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ) এতবার সূরা ইখলাস আমরা একদিনেই পড়ি! এখন কেউ যদি প্রতিবার ধীরে ধীরে পড়ে এবং আয়াতগুলো নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে, তা হলে শুধু আমলে আন্তরিকতাই বৃদ্ধি পাবে না, অন্তরেও গেঁথে যাবে।

সূরা আর-রহমানের একটি আয়াতের দিকে তাকান : فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ 'অতএব (হে জিন ও মানুষ!) তোমরা তোমাদের রবের কোন নিয়ামাত অস্বীকার করবে?'

এই আয়াতটি একবার দুবার নয়, তিরিশ বারেরও বেশি পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। অথচ সূরা আর-রহমানের মোট আয়াত সংখ্যা মাত্র ৭৮!

বারবার তিলাওয়াতের ফলে অন্তরে আয়াতটি গেঁথে যায়; আয়াতের বাক্য-অর্থ-মর্ম- শিক্ষা, সবকিছু অন্তরে বদ্ধমূল করার কার্যকরী পদ্ধতি এটি। আমাদের পূর্ববর্তীগণ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, আর তাই জীবনভর তাঁরা এভাবেই তিলাওয়াত করেছেন। এমনকি আমাদের নবি মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও কখনও কখনও সারা রাত সালাতে কাটিয়ে দিতেন একটি আয়াত দিয়ে। যেমন: إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ 'যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [২৫]

সাহাবি তামীম আদ-দারি-ও সারা রাত একটি আয়াত পড়ে কাটিয়ে দিতেন। সামনে আগাতে পারতেন না: أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ 'যেসব লোক অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে তারা কি মনে করে, আমি তাদেরকে এবং মু'মিন ও সৎকর্মশীলদেরকে সমপর্যায়ভুক্ত করে দেব, যেন তাদের জীবন ও মৃত্যু সমান হয়ে যায়? তারা যে ফয়সালা করে তা অত্যন্ত জঘন্য। [২৬]

সাঈদ ইবনু যুবাইর এই আয়াত বারবার পড়তেন: يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ 'ওহে মানবসকল, কীসে তোমাকে তোমার মহান রবের ব্যাপারে ধোঁকাগ্রস্ত করল? '[২৭]

ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ-ও একটি আয়াত দিয়ে গোটা রাত পার করে দিতেন, বারবার পড়তেন, গভীর চিন্তায় হারিয়ে যেতেন। আয়াতটি হলো: وَبَدَا لَهُمْ مِنَ اللَّهِ مَا لَمْ يَكُونُوا يَحْتَسِبُونَ ... আর আল্লাহর কাছে থেকে তাদের জন্য এমন-কিছু প্রকাশিত হবে, যা তারা কখনও কল্পনাও করত না। [২৮]

সবশেষে নিম্নোক্ত দুটো বিষয়কে শারীআ আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে, যখন দুটো একসাথে আসে: ১. কুরআন তিলাওয়াত করা ২. একে অপরকে শেখানো

আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর ঘরে যখন একদল মানুষ একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে এবং একে অপরকে শিক্ষা দেয়, তখন তাদের ওপর অবশ্যই প্রশান্তি অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদের আচ্ছাদন করে রাখে। এবং ফেরেস্তাগণ তাদের ঘিরে রাখে। আর আল্লাহ তাদের নিয়ে আলোচনা করেন তাঁর সাথে যারা আছে।' [২৯]

দ্বিতীয় বাক্যটি খেয়াল করুন-'এবং একে অপরকে শিক্ষা দেয়।' অর্থাৎ চিন্তা-ভাবনার ফলাফল একে অপরের সাথে শেয়ার করে। তাদাব্বুরের ফলে যে গোপন রহস্য তার মনের পর্দায় ভেসে ওঠেছে, অন্যদের তা শেখায়।

কুরআনের এই ধরণের বৈঠক আল্লাহর নিকট জগতের সর্বোত্তম বৈঠক। সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টার জন্য হলেও এরকম বৈঠকের ব্যবস্থা করুন; বিজ্ঞ আলিম কিংবা বড়ো মাপের কোনো ব্যক্তির সাথে করতে হবে-ব্যাপারটা এমন নয়। পরিবারের সদস্যদের নিয়েই শুরু করুন। সেখানে আপনারা কুরআন থেকে অংশ বিশেষ পড়বেন, একে অপরের তিলাওয়াত শুধরে দেবেন। সেই সাথে গ্রহণযোগ্য কোনো তাফসীর-গ্রন্থ থেকেও পড়ে শোনাবেন; যেমন তাফসীর আস-সা'দী। এরপর চিন্তার জগতে হারিয়ে যাবেন সবাই একসাথে। একে অপরের তাদাব্বর-থেকে-প্রাপ্ত শিক্ষা শেয়ার করবেন। এভাবে আয়াতের হিকমতগুলো বের করে আনুন, আপনার সন্তানকেও অনুপ্রাণিত করুন, পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখুন। এভাবে প্রতি সপ্তাহে বসুন। এরপর দেখবেন কত বরকত যে লাভ হয় এই ধরণের বৈঠক থেকে, তা গুণে শেষ করতে পারবেন না। অতীতে কল্পনাও করেননি আপনি।

মাদরাসাপড়ুয়া ভাই-বোনদেরকেও আমি একই কথা বলব। জীবনে যতই ব্যস্ততা থাকুক, দ্বীনের রাহে নিবেদিত কিছু বন্ধু তালাশ করো। তাদের নিয়ে সপ্তাহে একবার হলেও বসো এবং কুরআনের কোনো-একটি সূরা ধরে একসাথে সেই সমুদ্রে ডুব দাও। এর গুপ্ত ভাণ্ডার জাতির সামনে তুলে আনো তোমরা। রোজনামচায় সেই শিক্ষাগুলো টুকে রাখো। প্রবৃত্তির খায়েশকে লাগাম পরাতে এই বৈঠকগুলো শুধু উপকারীই নয়, অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে। সংশয়ের এই যুগে আমাদের ঈমান ও দ্বীনের বাঁধন মজবুত করবে। মুছে দেবে পাপের কালিমা, আলোকিত করবে অন্ধকার কবর, এবং পৌঁছে দেবে জান্নাতের চূড়ায় ইন শা আল্লাহ।

টিকাঃ
[১] সূরা আল-ইসরা, ১৭: ১
[২] সূরা কফ, ৫০: ৩৭
[৩] সূরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৬৮
[৪] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ২৪
[৫] সূরা সোয়াদ, ৩৮: ২৯
[৬] সূরা সোয়াদ, ৩৮ : ২৯
[৭] মানাহিলুল ইরফান, ২/১৩৩
[৮] সূরা জিন, ৭২: ১
[৯] তিরমিযি, ২৯০৬
[১০] মুসনাদ আহমাদ, ১১৬২২
[১১] সূরা জিন, ৭২:১
[১২] হিলইয়া, ১০/২২
[১৩] আহমাদ, আল ইলালু ওয়া মা'রিফাতুর রিজাল, ১০৮৩
[১৪] সূরা আল-কমার, ৫৪ : ৫৪-৫৫
[১৫] মানহাজু ইবনি তাইমিয়্যা, ৯০
[১৬] মাজমূ' রাসাঈল, ১/২৯৮
[১৭] সূরা আ'রাফ, ৭: ৬২
[১৮] আল-মাজমূ' শারহ আল-মুহাযাব, ২/১৬৯
[১৯] গাযালি, ইহইয়াউ উলুম-আদ-দ্বীন, ১/২৮৫
[২০] সূরা আশ-শুআরা, ২৬: ১৯২-১৯৪
[২১] আল-বুরহান ফি উলুমিল-কুরআন, ২/১৮০
[২২] সূরা আল-ইসরা, ১৭: ১০৬
[২৩] তাফসীর আত-তাবারি, ১৫/১১৬
[২৪] সূরা ত্ব-হা, ২০: ১১৪
[২৫] সূরা আল-মাইদা, ৫: ১১৮
[২৬] সূরা আল-জাসিয়া, ৪৫: ২১
[২৭] সূরা আল-ইনফিতার, ৮২ : ৬
[২৮] সূরা আয-যুমার, ৩৯:৪৭
[২৯] মুসলিম, ১০২৩/৯

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 আল্লাহর সাথে কথা বলতে

📄 আল্লাহর সাথে কথা বলতে


আজ অবধি কয়টি রমাদান চলে যেতে দেখলেন? ৫, ১০, ২০... কারও জীবনে সংখ্যাটি হয়তো আরও বেশি। কিন্তু এখনও আপনি বুঝে উঠতে পারেননি তারাবিতে কী তিলাওয়াত করা হয়। নিজেকে প্রশ্ন করুন,
- জীবন থেকে আর কয়টা রমাদান চলে গেলে আমার পরিবর্তন আসবে?
- নিজেকে বদলে ফেলার জন্য আর কয়টি রমাদান আমার প্রয়োজন?

প্রতিদিন তারাবিতে তিলাওয়াত শুনছেন কয়েক ঘণ্টা করে। কিন্তু তবুও আপনার অন্তর বিগলিত হয় না; এর কারণ কিন্তু এই নয় আপনার ঈমান সব সময় দুর্বল থাকে, কিংবা গোপন পাপগুলো পাঁচিল হয়ে থাকে। বিষয়টি এর চেয়েও সাধারণ এবং দিবালোকের মতো স্বচ্ছ—আপনি কুরআনের ভাষাকে এখনও আপন করে নিতে পারেননি।

বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম তাবারি বলেন, ‘এমন ব্যক্তিকে দেখে আমি অবাক হই, যে কুরআন পড়ে কিন্তু এর অর্থ বোঝে না। সে কীভাবে এর মজা বুঝবে?!'

আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বশেষ ঐশী বাণীর জন্য আরবি ভাষা নির্বাচন করেছেন, অথচ এই কিতাব সমগ্র মানবজাতির জন্য পাঠানো হয়েছে! তা হলে কেন আরবি ভাষায়? অন্য ভাষায় নয় কেন? অবশ্যই এর পেছনে হিকমাহ আছে।

আল্লাহ বলেন, إِنَّا جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ ‘আমি একে আরবি ভাষার কুরআন বানিয়েছি যাতে তোমরা তা বুঝতে পারো’।[১]

তিনি আরও বলেন, قُرْآنًا عَرَبِيًّا غَيْرَ ذِي عِوَجٍ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ 'আরবি ভাষার কুরআন, যাতে কোনো বক্রতা নেই। যেন তারা মন্দ পরিণাম থেকে রক্ষা পায়।।'[২]

আরেক স্থানে বলেন, وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ بِلِسَانٍ عَرَبِي مُبِينٍ 'এটি (কুরআন) রব্বুল আলামীনের নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত রূহ (জিবরীল) তা নিয়ে অবতরণ করেছে-তোমার হৃদয়ে, যেন তুমি সতর্ককারী হতে পারো। (অবতীর্ণ করা হয়েছে) সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।'[৩]

বিখ্যাত ভাষাবিদ আহমাদ ইবনু ফারিস বলেন, 'আরবি ভাষাকে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট শব্দ দিয়ে গুণান্বিত করার দ্বারা এটাই বোঝাচ্ছেন, পৃথিবীর তাবত ভাষার চেয়ে আরবি সেরা।'

আরবি ভাষা ইসলামের ভাষা। যুগ যুগ ধরে এইভাবেই ইসলাম এসেছে, কখনও পাল্টাবে না। তা সত্ত্বেও আমরা যারা এখনও এই ভাষা রপ্ত করার জন্য চেষ্টা করছি না। অনুবাদ পড়ে আল্লাহর কালামের ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে অনেককিছু হারাচ্ছি আমরা, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কুরআনের অলঙ্কার, ভাষাগত মু'জিযা, অন্তস্পর্শী ভাব-এগুলো তরজমার মাধ্যমে কখনোই পরিপূর্ণভাবে ফুটে ওঠে না। আর তাই আমাদের পূর্ববর্তীরা অনেক জোরালোভাবে আরবি ভাষা শিখতে বলতেন।

উবাই ইবনু কা'ব (রা) বলেন, 'যে গুরুত্ব নিয়ে তোমরা কুরআন মুখস্থ করো, সেভাবে আরবি ভাষাও শিখো।'

আবূ বকর (রা) বলেন, 'তিলাওয়াত করার সময় ব্যাকরণগত ভুল করার চেয়ে কুরআনের কিছু অংশের (হিফয) ভুলে যাওয়াটা আমার কাছে উত্তম।'

একবার উমর (রা) সদ্য-মুসলিম-হয়ে-আসা কিছু লোকদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তারা তির ছোড়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। একপর্যায়ে তির লক্ষ্যচ্যুত হলে উমর (রা) তাদের তিরস্কার করেন। কিন্তু আরবি ভাষায় উত্তর দিতে গিয়ে তারা ভুল আরবি বলে ফেলে। তাদের কথা শুনে উমর (রা) বলেন, 'তোমাদের এই ব্যাকরণগত ভুল আমার কাছে তির লক্ষ্যচ্যুত হওয়া থেকেও বেশি কষ্টদায়ক।'

হাজ্জ-এর সময়কার কথা। উমর (রা) এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি হাজ্জ করার সময় ফারসি ভাষায় কথা বলছিল। উমর (রা) তার কাঁধে হাত রেখে বলেন, 'আরবিতে কথা বলা শেখো।'

শুধু তাই নয়, আইয়ূব সিখতিয়ানি আরবিতে যদি কখনও ব্যাকরণগত করে ফেলতেন, তখন তিনি ইস্তিগফার করতেন। বলতেন, 'আল্লাহ, আমাকে মাফ করুন!' আলি ইবনু আবী তালিব এবং আবদুল্লাহ ইবনু উমর দুজনই তাদের সন্তাদের শাসন করতেন আরবিতে ভুল করলে।

মূলত তাঁরা নিজেদের মানদণ্ড অনেক উঁচুতে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন-মুসলিমদের অন্তরের সাথে আরবি ভাষাকে জুড়ে-দেওয়া মানে তাদের পুরো জীবনকেই কুরআনের সাথে জুড়ে-দেওয়া। আর তাই অতীতে ইসলামের বার্তা প্রসারের সাথে সাথে আরবি ভাষাও দিদিগন্ত ছড়িয়ে যেত। মানুষ ইসলাম কবুলের পর দলে দলে আরবি ভাষা শিখত। ফলে সেই সময়ে মুসলিমরা আল্লাহর কালামকে ভিন্ন ভাষায় তরজমা করার প্রয়োজনবোধ মনে করেনি।

বর্তমানে অসংখ্য ভাষায় কুরআনের তরজমা হচ্ছে। এর ফলে এক দিক থেকে অনেক উপকার হয়েছে। কিন্তু একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করলে, এটা আমাদের জন্য দুঃখজনকও বলেও মনে হয়। মুসলিমরা আজ নিজেদের ভাষা আরবি জানে না। এটা তাদের অন্যতম দুর্বলতা।

আপনার অর্জনের ফিরিস্তি হয়তো অনেক দীর্ঘ। হয়তো যে বিষয়ের দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দেন, ওই বিষয়টি অর্জন করেই ছাড়েন। অতএব এখনি সময় আপনার সেই যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে জীবন পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্ত নেবার। 'আগামী রমাদানে আমি আল্লাহর কালাম সরাসরি বুঝব।' বলুন, 'ইন শা আল্লাহ।' এরপর কাজে নেমে পড়ুন!

টিকাঃ
[১] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩।
[২] সূরা যুমার, ৩৯: ২৮
[৩] সূরা শুআরা, ২৬: ১৯২-১৯৫

📘 কলবুন সালীম (নির্মল অন্তর, নির্মল জীবন) 📄 আমলের স্বাদ হারিয়ে গেলে

📄 আমলের স্বাদ হারিয়ে গেলে


দেখতে দেখতে রমাদানের একটি সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। তা সত্ত্বেও আমাদের অনেকের অভিযোগ আছে— ‘অন্তরে কোনো পরিবর্তন নেই।’

হ্যাঁ, বাহ্যিক আমলে আমরা কোনো কমতি করছি না হয়তো। তবে দুঃখের বিষয় হলো, অন্তরে কোনো রেখাপাত সৃষ্টি হচ্ছে না। যেন ভেতরটা শুষ্ক ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কোনো ফলন নেই। কেন এমনটা হচ্ছে?

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ এমন নিষ্ক্রিয়তার একটি সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমলের স্বাদ অন্তর অনুভব করতে ব্যর্থ হলে তোমার আমলকেই দোষারোপ কোরো। কেননা আল্লাহ তায়ালা বড়োই কৃতজ্ঞ; অর্থাৎ আমলকারীকে পুরস্কারস্বরূপ দুনিয়াতেই তিনি আমলের স্বাদ আস্বাদন করান। ফলে বান্দা অন্তর দিয়ে এর মিষ্টতা অনুভব করে। তার ভেতরটা প্রফুল্লতা এবং প্রশান্তিতে ভরে যায়। আর যদি সে এমন অনুভূতি না পায়, তা হলে (বুঝে নিতে হবে, তার) আমলের মধ্যেই গণ্ডগোল আছে।’ [১]

কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে আমরা আমলের স্বাদ অনুভব করতে ব্যর্থ হচ্ছি এবং ইবাদাতের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের পাপই হচ্ছে সেই প্রতিবন্ধক। যদি এই বাধাকে হটাতে চান, তা হলে সত্য মনে তাকে খুঁজে বের করুন;
- 'এটা কি আমার আন্তরিকতার অভাবের দরুন হচ্ছে?'
- 'আমি কি আত্মতুষ্টিতে ভুগছি?'
- 'অনলাইনে কিংবা অফলাইনে নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করি, এসব কি দায়ী?'
- ওমুকের সাথে ঝগড়া করার কারণে নয় তো?
- 'আচ্ছা, আমার আর্থিক অবস্থা কি আমাকে ব্যহত করছে?'
- 'এটা কি হিংসার কারণে যা আমার ভেতরটা জ্বালিয়ে দিচ্ছে?'
- 'বাবা-মায়ের সাথে খারাপ সম্পর্কের কারণে নয় তো?'
- 'না কি আমার গোপন পাপের অভ্যাস এসবের পেছনে মূল হোতা?'
- 'আমার পাপ কম—এমন অহংকারী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য নয় তো?'

মূল সমস্যা আমাদের চোখের সামনেই দণ্ডায়মান। প্রয়োজন শুধু নিজেকে আত্ম- জিজ্ঞাসার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। উহাইব ইবনু ওয়ারদ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'পাপে-নিমজ্জিত-ব্যক্তি কি ইবাদাতের স্বাদ অনুভব করতে পারে?' তিনি বললেন 'না, এমনকি সেও না, যে পাপ কামনা করে।'

অসুস্থ শরীরে ভালো খাবারের স্বাদ অনুভব করতে যেমন বেগ পেতে হয়, তেমনি অসুস্থ অন্তরেও ইবাদাতের স্বাদ অনুভব করতে বেগ পেতে হয়। নিজের দোষ দেখতে পাওয়া কঠিন। আর সেগুলো প্রতিহত করা আরও কঠিন। কিন্তু এটি অবশ্যই করতে হবে। আর আনন্দের বিষয় হচ্ছে, চেষ্টা অব্যহত থাকলে এটা শুধু সময়ের ব্যাপার, আপনার নফস আপনার কাছে একদিন আত্মসমর্পণ করবেই ইন শা আল্লাহ।

আবূ যাইদ বলেন, 'যখন আমার নফসকে আল্লাহর দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকলাম, সে কাঁদতে লাগল। এভাবে চলতে চলতে একটা পর্যায় সে আত্মসমর্পণ করল এবং হাসিমুখে মেনে নিল। [২]

নফসকে এভাবে পরিশুদ্ধ করার জন্য রমাদানের চেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর কী হতে পারে?

টিকাঃ
[১] মাদারিজুস সালিকীন, ২/৬৮
[২] সাইদুল খাতির, ১১৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px