📄 যে পথ জান্নাতে গিয়ে মিশেছে
জ্ঞানীগুণী হওয়া সম্মানের বিষয়। আর সম্মান সবাই প্রত্যাশা করে। জাহিল বা মূর্খ উপাধি পছন্দ করে না কেউই। তাই বলে এই সমাজে যে মূর্খদের অস্তিত্ব নেই-তা কিন্তু নয়। স্বাভাবিকভাবে জ্ঞান আমাদের কাছে একটি মর্যাদাপূর্ণ বিষয়। ফেরেশতাদের ওপর আদম-এর শ্রেষ্ঠত্ব এই জ্ঞানের কারণেই ছিল।
আল্লাহ বলেন, عَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا 'আদমকে তিনি সবকিছুর নাম শিক্ষা দিলেন।[১]
কেবল মানুষের বেলাতেই নয়, আল্লাহ তাআলা পশু-পাখিদের ব্যাপারেও প্রশিক্ষিত পশু-পাখিকে অপ্রশিক্ষিতদের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। মুসলিমদের জন্য হালাল খাদ্য-তালিকায় আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمَا عَلَّمْتُمْ مِنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللَّهُ فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ 'আর যেসব শিকারি প্রাণীকে তোমরা শিক্ষিত করে তুলেছ, যাদেরকে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের ভিত্তিতে তোমরা শিকার করা শিখিয়েছ, তারা তোমাদের জন্য যেসব প্রাণী ধরে আনে, তাও তোমরা খেতে পারো।[২]
প্রশিক্ষিত পশু-পাখির ধরে-আনা-শিকার খাওয়া হালাল। পক্ষান্তরে পশু যদি অপ্রশিক্ষিত হয়, তবে সে জিনিস হারাম বলে গণ্য হবে।
এভাবে জ্ঞানের মর্যাদা নিয়ে অসংখ্য দলিল আছে। তা হলে ভাবুন সেগুলো কতটা জোরালোভাবে জ্ঞানকে সমুন্নত স্তরে পৌঁছে দিয়েছে! সেই অগণিত প্রমাণের ভিতর এটি অন্যতম, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জানিয়েছেন মুমিনরা মর্যাদায় একে অপরের সমান নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ 'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার ও যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা আল্লাহ উন্নীত করবেন। [৩]
আরেক আয়াতে বলেছেন, هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ 'যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান? '[৪]
না, তারা এক নয়। জীবনযাপন ও কাজে-কর্মে তারা আলাদা। মৃত্যু, কবরের অবস্থা ও পুনরুত্থানের ক্ষেত্রেও তারা একে অপরের চেয়ে আলাদা। হাশরের ময়দানেও তাদের অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন। পুলসিরাত পারাপারে তাদের গতি এবং জান্নাতে মর্যাদার ক্ষেত্রেও তারা সমান নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা আলাদা।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ 'যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের পথে চলে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।[৫]
ইলমের মর্যাদা আলোচনা করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। যে ইলম আমাদেরকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়, তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানাটাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।
শুরুর দিকে সকল দ্বীন-শিক্ষার্থীর আসল বাড়ি জান্নাতে হবে না। কেননা তাদের সাথে-থাকা ফেরেশতারা এমন কিছু উপস্থাপন করবে, যা তারা কল্পনা করতেও পারেনি। একদিন ওগুলো সব প্রকাশ পেয়ে যাবে। হ্যাঁ, তাদের ইলম ছিল, হয়তো জান্নাতীদের চেয়ে বেশিই ছিল, কিন্তু তারা ইলমের সদ্ব্যবহার করেনি। পথচ্যুত হয়েছে, প্রকৃত লক্ষ্যের প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এরপরেও ধরে নিয়েছে যে, সবকিছু ঠিকভাবেই চলছে।
এই কারনেই আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের সালাত শেষ করে এই দুআটি পড়তেন :
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً
'হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে উপকারী জ্ঞান চাই, পবিত্র রিযক চাই, এবং কবুলযোগ্য আমলের তাওফীক চাই।'[৬]
সাহাবিদেরকেও বলতেন, سَلُوا اللَّهَ عِلْمًا نَافِعًا وَتَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ 'তোমরা আল্লাহর কাছে উপকারী ইলম চাও এবং অনুপকারী ইলম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো। [৭]
উপকারী ইলমের বৈশিষ্ট্যগুলো কী, যা অর্জনের দ্বারা আমরা সত্যিকার অর্থে জান্নাতে পৌঁছে যাব?
১) আল্লাহর ভয় বৃদ্ধি করে
উপকারী ইলমের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো, তা আল্লাহর ভয় বৃদ্ধি করে। এখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব। একটি আয়াতে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ 'শুধুমাত্র তাঁর এমন বান্দারাই আল্লাহকে ভয় করে, যারা ইলমের অধিকারী। [৮]
ইবনু মাসউদ বলেন, لَيْسَ الْعِلْمُ بِكَথْرَةِ الرَّوَايَةِ ، إِنَّمَا الْعِلْمُ الْخَشْيَةُ 'অনেক হাদীস বলতে পারার নাম ইলম নয়, বরং প্রকৃত ইলম হলো আল্লাহকে ভয় করা। [৯] তিনি আরও বলেন, كفى بخشية الله علما وكفى باغترار المرء جهلا 'আল্লাহকে ভয় করাই ইলম হিসেবে যথেষ্ট, আর নিজেকে ধোঁকার মধ্যে রাখা অজ্ঞতা হিসেবে যথেষ্ট। [১০]
ইলম যদি সালাত কাযা করার অভ্যাস পাল্টাতে না পারে, স্ত্রীর প্রতি হিংস্র হওয়া থেকে বিরত না রাখে, বাবা মায়ের সাথে অসদাচরণ করতে বাধা না দেয়, কিংবা অনলাইনে- অফলাইনে প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়, তা হলে এই ইলম আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। উপকারী ইলম আপনার চরিত্র ও চিন্তা-ভাবনা প্রতিনিয়ত বিশুদ্ধ করবে। আপনাকে সরাসরি উপদেশ দেবে। উপকারী ইলম এমন এক কণ্ঠ, যা কখনও নীরবে বসে থাকে না। সে একজন বিশ্বস্ত উপদেষ্টা, বরকতময় পরামর্শদাতা, নিষ্ঠাবান বন্ধু। ব্যক্তির প্রতিটি কাজ সে তদারকি করে, প্রতিক্রিয়ার মুখে লাগাম পড়ায়, সুশৃঙ্খল করে ভালো লাগার বিষয়গুলোকে। আর বিচ্যুতির শুরুতেই বিবেককে জাগ্রত করে তোলে। আতঙ্কের সময় ইলম তাকে সাহস যোগায়, সন্দেহের ফিতনায় পড়লে মনে বিশ্বাস জোগায়, দুর্বলতার সময় দৃঢ় মনোবল তৈরি করে, আর বিপদের সীমানায় যাবার আগেই চিৎকার করে ডাকে- 'সাবধান!' প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর বড়োত্ব, তাঁর মহিমা, নাম ও গুণসমূহের প্রভাব অন্তরে জাগ্রত রাখে। আল্লাহর পছন্দের বিষয়ের দিকে ব্যক্তিকে টেনে নিয়ে যায় এবং সব ধরনের অপ্রিয় বিষয়সমূহ থেকে টেনে বের করে আনে। প্রত্যেকবার হারাম পথে পা বাড়াবার আগ মুহূর্তে, হারাম কিছুর দিকে দ্বিতীয়বার দৃষ্টি দেওয়া কিংবা হারাম পথে বিনিয়োগ করার সময় ইলম আল্লাহর ভয় জোগায় অন্তরে। চিৎকার করে ওঠে, তাকে আল্লাহর ব্যাপারে লজ্জায় ফেলে দেয় এবং সাথে সাথে থামিয়ে দেয়। এটাই ইলমের আসল মাকসাদ। তলিবে ইলম বা জ্ঞান অন্বেষণকারী এই লক্ষ্যে পৌঁছোতে ব্যর্থ হলে সে এমন চারটি বিষয়ের মধ্যে পড়ে যাবে, যে চারটি বিষয় থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইতেন। তিনি বলতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا
'হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই এমন ইলম থেকে, যার মধ্যে কল্যাণ নেই; এমন অন্তর থেকে, যেখানে তোমার ভয় নেই; এমন নফস থেকে, যা কখনও পরিতৃপ্ত হয় না; এবং এমন দুআ থেকে, যার উত্তর পাওয়া যায় না।[১১]
যে ব্যক্তি উপরোক্ত চারটি বিষয়ের ফাঁদে পড়ে গেছে, ইলম তাকে উপকার করতে পারে না। তার অন্তর শক্ত হয়ে গেছে, তার আকাঙ্ক্ষা কখনও পূর্ণ হবার নয়। আর তার দুআর জবাব খুব কমই মেলে।
আবদুল আ'লা-এর কথাগুলো কতই-না সত্য! তিনি বলেন, অর্জিত ইলম যাকে কাঁদায় না, সে মূলত উপকারী ইলম থেকেই বঞ্ছিত। কেননা আল্লাহ তাআলা আলিমদের গুণ বর্ণনায় বলেন, 'নিশ্চয় এর পূর্বে যাদেরকে ইলম দেওয়া হয়েছে, তাদের কাছে যখন তা পাঠ করা হয় তখন তারা সাজদাবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ে। আর তারা বলে, "আমাদের রব মহান, পবিত্র; আমাদের রবের ওয়াদা অবশ্যই পূর্ণ হবে।” আর কাঁদতে কাঁদতে তারা (সাজদায়) লুটিয়ে পড়ে এবং (কুরআন) তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে।' [সূরা ইসরা, ১৭: ১০৭-১০৯][১২]
কঠোর পরিশ্রম এবং চেষ্টা সাধনার ফলে হয়তো আপনার ইলম বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ইলম কি আপনার অন্তরে আল্লাহভীতি বাড়াচ্ছে? অতীতের আপনি আর আজকের আপনির মধ্যে কতটুকু পার্থক্য?
২) উপকারী জ্ঞান আমলে উদ্বুদ্ধ করে
ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এমন কোনো হাদীস লিখিনি যার ওপর আমল করিনি।[১৩]
ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ-এর মতো যারা হাজার হাজার হাদীস মুখস্থ করেছেন, তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য এখানেই। তারা প্রত্যেকটি হাদীস ধরে ধরে আমল করতেন।
একদিনের কথা, ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ জানতে পারলেন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক দীনারের বিনিময়ে হিজামা করিয়েছেন। হাদীসটি জানতে পেরে তিনিও হিজামা করালেন এবং বিনিময়ে এক দীনার দিলেন। অন্য-এক-দিন তিনি জানতে পারলেন, মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকালে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন দিন গুহায় অবস্থান করেছিলেন; তাই তিনিও তিন দিন গুহায় অবস্থান করলেন। [১৪]
আরেকবার এক তলিবুল ইলম ইমাম আহমাদের বাড়িতে আসে এবং এক রাত অবস্থান করে। তাহাজ্জুদের সময় সে যেন ওজু করতে পারে, সেজন্য ইমাম আহমাদ তার কক্ষে এক বালতি পানি রেখে আসেন। কিন্তু ফজরের সময় ইমাম আহমাদ তার কক্ষে গিয়ে দেখেন, বালতির পানি আগের মতোই আছে। এ দেখে তিনি বলেন, 'সুবহানাল্লাহ! একজন ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ করে, অথচ কিয়ামুল লাইল আদায় করে না!' [১৫]
হাসান বাসরি বলেন, 'অতীতে যারা ইলম অন্বেষণ করত, ইলমের প্রভাব তাদের চাহনিতে, কথায়, কাজে, সালাতে, বিনয়বনতায় ও দুনিয়া-বিমুখতায় ফুটে উঠত।[১৬]
আবূ কিলাবা তাঁর ছাত্র আইয়ূব সিখতিয়ানি-কে বলেন, 'যখন আল্লাহ তোমাকে নতুন কোনো বিষয়ে ইলম দান করেন, তখন তুমি তাকে আমলে রূপ দাও। (আমল ব্যতীত) কেবল ইলম অর্জনকেই তোমার মূল উদ্দেশ্য বানিয়ো না।'[১৭]
সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা বলেন, 'আমি যদি বেকুবের মতো দিন পার করি, আর মূর্খদের মতো রাত কাটাই, তা হলে যে ইলম আমি লিখেছি, এর মানে কী!'[১৮]
দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা এমন অনেক ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ পেয়েছি, যারা জ্ঞানার্জনের প্রতি আগ্রহ-প্রদর্শন করে। কিন্তু তাদের আচরণ দেখে আমরা তাদের থেকে দূরে সরে যাই। তারা সময়ের খুব কমই কদর করে, গেইমস নিয়ে পড়ে থাকে, মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক হয়ে যায় এবং ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা এমন সব বিষয়ে তর্ক করে, যার কোনো গুরুত্বই নেই। কিংবা বাস্তবিক অর্থে কোনো উপকার নেই। আসলে তারা চায়, একমাত্র তাদের মতামতই অগ্রাধিকার পাক। এটাই তাদের মূল বিবেচ্য বিষয়। এজন্যই অবিরাম তর্ক করতে থাকে।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'হিদায়াত পাওয়ার পর কোনো জাতি অত্যধিক বিতর্কের মাধ্যমেই গোমরাহ হয়।'[১৯]
মা'রূফ কারখি বলেন, 'আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তার জন্য আমলের দরজা খুলে দেন এবং তর্কের দরজা বন্ধ করে দেন। আর আল্লাহ যার অকল্যাণ চান, তার জন্য আমলের দরজা বন্ধ করে দেন এবং তর্কের দরজা খুলে দেন।[২০]
তিনি আরও বলেন, 'তর্ক-বিতর্ক ইলমের নূর নিভিয়ে দেয়।[২১]
এ ধরণের লোকদের কাছে-ইবাদাত, ইলম অর্জন, দাওয়াতি কাজ যেন বোঝার মতো মনে হয়। তাই লাগামহীন তর্ক-বিতর্কিতে ব্যস্ত রাখে নিজেদেরকে। যখন সম্মানের কাজকে উপেক্ষা করা হয়, তুচ্ছজ্ঞান করা হয়, তখন লাঞ্ছনার কাজই কপালে জোটে। এটাই আল্লাহর চিরাচরিত নিয়ম। যদিও ব্যক্তি এবং তার সমাজ সেই কাজকে সম্মানজনক মনে করে, কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে সে অপদস্থ, পরকালের পাল্লায় ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।
৩) উপকারী ইলম বিনয়ের দিকে আহ্বান করে
উপকারী ইলম ব্যক্তিকে সর্বদা নিরাপদ বিষয়ের দিকে আহ্বান করে এবং আখিরাত নিয়ে ফটকাবাজি করা থেকে সাবধান করে। এই ইলমের অধিকারীরা শুধু হারাম থেকেই নয়, বরং সন্দেহজনক বিষয় থেকেও সতর্ক থাকে। বিনয়ের কারণে তারা 'আমি জানি না' বলতে বিন্দুমাত্র পরোয়া করে না।
আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলা বলেন, 'আমি এই মাসজিদে আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ১২০ জন আনসারি সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছি। তাঁদেরকে কোনো হাদীস বলতে বলা হলে তাঁদের সকলেই আশা করতেন যেন অন্য কেউ সেটা বলে দেয়। তদ্রূপ কোনো ফাতওয়া জানতে চাওয়া হলে আশা করতেন যেন অন্য কেউ সেটার উত্তর দিয়ে দেয়। [২২]
ইবনু সীরীন -এর ব্যাপারে বলা হয়, তাকে হালাল-হারাম বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে (ভয়ে) তার চেহারার রঙ পরিবর্তন হয়ে যেত এবং কিছুক্ষণ আগেও তিনি যেমন ছিলেন, সেই অবস্থায় ফিরে যেতে পারতেন না।[২৩]
ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ-এর ব্যাপারেও বর্ণিত আছে, 'মালিক রহিমাহুল্লাহ-কে যখন কোনো প্রশ্ন করা হতো, তাকে দেখে মনে হতো যেন তিনি জান্নাত-জাহান্নামের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন!'[২৪]
আতা ইবনু আবী রাবাহ বলেন, 'আমি এমন মানুষদের সাক্ষাৎ পেয়েছি, তাদের কাউকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জবাব দেবার সময় তারা ভয়ে কাঁপতেন'।[২৫]
উমাইর ইবনু সাঈদ বলেন, 'আমি আলকামা-কে একটি প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, "আবীদাকে জিজ্ঞেস করো।” আমি আবীদার কাছে গেলাম। তিনি বললেন, "আলকামাকে জিজ্ঞেস করো।” আমি বললাম "আলকামা আপনার কাছে আমাকে পাঠিয়েছেন।” তিনি বললেন, "তা হলে মাসরূককে জিজ্ঞেস করো।” কাজেই আমি তার নিকট গেলাম। তিনিও বললেন, "আলকামাকে জিজ্ঞেস করো।” আমি বললাম, "আলকামা-কে আমি জিজ্ঞেস করেছি, তিনি আমাকে আবীদার কাছে পাঠান। আর আবীদা আপনার কাছে পাঠান।” তিনি বললেন, "তা হলে আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলাকে জিজ্ঞেস করো।” তারপর আমি আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলার নিকট গেলে তিনি উত্তর দিতে অস্বীকার করলেন। ফলে আমি কোনো উপায় না দেখে আলকামার কাছে ফিরে গেলাম। এরপর তিনি আমাকে বলেন, 'কথায় আছে-যে জাতি যত দ্রুত ফাতওয়া দেয়, সে-জাতি ততই অজ্ঞ।[২৬]
৪) উপকারী ইলম খ্যাতি থেকে পালাতে বাধ্য করে
উপকারী ইলম তালাশকারী ব্যক্তি লোকদের প্রশংসায় অভিভূত হয় না। এর কুপ্রভাব থেকে সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। এমন ব্যক্তি বিভিন্ন উপাধির বদলে স্রেফ নিজের নামটুকু ব্যবহার করাকেই পছন্দ করে, এবং পছন্দ করে যেন সেই নামে তাকে ডাকা হয়। সে হারাম কাজের ব্যাপারে তটস্থ থাকে। সে মনে করে, পাহাড়সম আমল ধসিয়ে দিতে অণু পরিমাণ গোনাহই যথেষ্ট। আর তাই ইবনু মুহায়রীয বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে সাদামাটা প্রশংসাই কামনা করি।[২৭]
তারা আল্লাহর কাছে পানাহ চায়, যেন তাদের ওপর খ্যাতির আলো না জ্বলে। কারণ, তারা চায় না সবাই তাদের চিনে নিক। একদিন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বাইরে বের হলেন। পথিমধ্যে কিছু ভক্ত তাঁর পিছু পিছু হাঁটা ধরল। এ দেখে ইবনু মাসউদ বলেন, 'আমার পিছু নিয়েছ কেন? আল্লাহর কসম, দরজার ওপারে আমি কেমন তা যদি তোমরা জানতে, তা হলে তোমাদের একজনও আমাকে অনুসরণ করতে না।'[২৮]
ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ-এর চাচা একদিন তাঁর বাড়িতে আসেন। এসে দেখেন, ইমাম আহমাদ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বসে আছেন। তাঁকে এতটাই দুর্দশাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল যে, কষ্টে তিনি মাথা নিচু করে ছিলেন। তাঁর চাচা এর কারণ জানতে চাইলে ইমাম আহমাদ মাথা তুলে বলেন, 'চাচাজান, এমন ব্যক্তি কতই-না সৌভাগ্যবান যাকে আল্লাহ তাআলা খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা করেছেন!'[২৯]
তিনি আরও বলতেন, 'আমি মক্কার প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকতে চাই, যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না। আমি খ্যাতির বিড়ম্বনায় ডুবে আছি। সকাল-সাঁঝে আমি মৃত্যু কামনা করি।[৩০]
ইবরাহীম ইবনু আদহাম বলেন, 'যে ব্যক্তি খ্যাতি পছন্দ করে, সে আল্লাহর প্রতি সৎ নয়। [৩১]
আইয়ূব সিখতিয়ানি যখন কোনো সমাবেশের সামনে দিয়ে যেতেন এবং সবাইকে সালাম দিতেন, লোকজন তাকে চিনতে পেরে অত্যধিক সম্মানের সাথে জবাব দিত। এ দেখে তিনি বলে উঠতেন, 'আমাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে! আমাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে!'
আমাদের সালাফরা ভিআইপি টিকেট চাইতেন না, তাঁরা সম্মান আশা করতেন না; প্রথম সারিতে জায়গা, স্পেশাল কেয়ারিং কিংবা সার্ভিস পছন্দ করতেন না। 'আমি সকলের চেয়ে আলাদা' এই ধারণা যেন মনে না আসে, সেজন্য তারা সতর্ক থাকতেন। আর তাই সাধারণদের মতো থাকতেই পছন্দ করতেন। তাদের খাবার ছিল সাধারণ, এবং আল্লাহর সত্যিকারের বান্দার মতো তারাও মাটিতে বসতেন।
তাঁরা খ্যাতিকে এতটাই ঘৃণা করতেন যে, খালিদ ইবনু মা'দান -এর দরসে মানুষদের উপস্থিতি যখন বেড়ে যেত, তিনি খ্যাতির ভয়ে উঠে যেতেন। তদ্রূপ আবুল আলিয়া -এর হালাকায় যখন তিন জনের অধিক শ্রোতা জড়ো হতো, তিনি উঠে যেতেন।
আবূ বকর ইবনু আইয়াস-কে একবার জিজ্ঞেস করা হলো, 'ইবরাহীম নাখঈ-এর দরসে আপনি সর্বোচ্চ কতজন দেখেছেন?' তিনি বলেন, 'চার কী পাঁচ হবে।'
আজকের এই যুগে বিশ, দশ কিংবা পাঁচজন নিয়ে কয়জন শাইখ হালাকার আয়োজন করতে রাজি হবে? এরপর কেউই যদি আলোচনায় মুগ্ধ না হয়, তা হলে তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
অনেকের জীবনে সফলতাই নির্ণীত হয় অনুসারীদের সংখ্যা বিবেচনায়। তাদের লেখা কী পরিমাণ শেয়ার হলো, কী পরিমাণ লাইক পেল, ইত্যাদি মানদণ্ডে। বস্তুত আল্লাহ যদি আপনার দ্বারা একজন ব্যক্তিকেও উপকৃত করেন, তার জীবন সংশোধন করে দেন, অতঃপর তার দ্বারা অন্যরাও উপকৃত হয়, তা হলে এতটুকুই আপনার জন্য যথেষ্ট।
আল্লাহর শোকর আদায় করুন তিনি আপনার পাপগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করে দেননি। আপনার অন্তরকে তিনি নিফাক থেকে মুক্ত রাখছেন, এই জন্যে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। বারবার শোকর আদায় করুন, পানাহ চান, কাঁদুন; যেন হাশরের ময়দানে আপনার কষ্টের নেক আমলগুলো ধূলিকণায় পরিণত না হয়।
এগুলো উপকারী ইলমের কিছু নমুনা। উপকারী ইলম ব্যক্তিকে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়, এবং আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয়ে পরিতৃপ্ত রাখে। এই ইলম পাথরের মতো শক্ত অন্তরকেও ভেঙে চুরমার করে দেয়। নিজের দুর্বলতা এবং মৃত্যু-পরবর্তী দীর্ঘ যাত্রার ভয়ে এই জ্ঞান তাকে কাঁদায়। এ হলো কিছু ফিল্টার। জ্ঞানার্জনের পথে আপনি এগুলো ব্যবহার করবেন। যাচাই করে দেখবেন কোন ইলম কতটা উপকারী। যেন যাত্রার শেষ প্রান্তে এসে জান্নাতের দেখা পান। আল্লাহর সন্তুষ্টি পান।
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারাহ, ২: ৩১
[২] সূরা মাইদা, ৫:৪
[৩] সূরা মুজাদিলা, ৫৮ : ১১
[৪] সূরা আয-যুমার, ৩৯ : ৯
[৫] ইবনু মাজাহ, ১৮৩; সহীহ
[৬] ইবনু মাজাহ, ৯২৫
[৭] ইবনু মাজাহ, ৩২৭; হাসান
[৮] সূরা ফাতির, ৩৫: ২৮
[৯] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/১৩১
[১০] আদ-দুর আল-মানছুর, ৭/২০
[১১] আহমাদ, ৬৫৬১, সহীহ
[১২] সুনান আদ-দারিমি, ২৯৯
[১৩] মানাকিবু ইমাম আহমাদ, ২৪৬
[১৪] মানাকিবু ইমাম আহমাদ, ২৪৬
[১৫] মানাকিবু ইমাম আহমাদ, ২৭৩
[১৬] ইবনুল মুবারক, আয-যুহুদ, ৭৯
[১৭] ইবনু আব্দিল বার্, জামিউ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাদ্বলিহ, ১১৩৪
[১৮] হিলইয়া, ৭/২৭১
[১৯] তিরমিযি, ৩২৫৩, হাসান
[২০] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল-আউলিয়া, ৮/৩৬১
[২১] জামিউল উলূম, ১/২৪৮
[২২] ইবনুল কাইয়িম, ই'লামুল মুওয়াক্কিয়ীন, ১/২৮
[২৩] ইবনু রজব, মাজমুআতু রাসাইল, ১/২৩
[২৪] ই'লামুল মুওয়াক্বিয়ীন, ৪/১৬৭
[২৫] ফাতহুল মান্নান, ২/১৩৭
[২৬] ফাতহুল মান্নান, ২/১০৭
[২৭] হিলইয়া, ৫/১৪০
[২৮] আত-তাওয়াদু' ওয়াল-খুমূল, ৫২
[২৯] ইবনু আসাকির, তারিখু দিমাশ্ক, ৫/৩০৯
[৩০] সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১১/২১৬
[৩১] সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৭/৭৩
📄 হারাম দরজা
যখন কেউ রিযক তালাশে ক্ষেত্রে হারাম দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, তার জন্য হালাল দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটাই বাস্তবতা।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যারাই হারাম উপার্জনের দারস্থ হয়, তাদের অনেকেরই একাধিক ফ্ল্যাট আছে, আয়ের বিভিন্ন উৎস আছে, কারও-বা বিরাট অঙ্কের ব্যাংক ব্যালেন্সও আছে। তবুও সে হারাম পন্থা থেকে বিরত থাকতে পারেনি। এমন ব্যক্তিদের নিয়ে এ ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে— হালাল দরজা তাদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে?
সোনালি যুগের একটি গল্প বলি। একদিন আলি ইবনু আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু মাসজিদুল কুফায় গেলেন। প্রবেশের সময় এক বালককে তাঁর বাহন (পশু) দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়ে গেলেন। এরপর আলি সালাত শেষ করে বালকটিকে এক দীনার হাদিয়া দেবার মনস্থির করলেন। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে তিনি দেখলেন, বালকটি বসার বাহন নিয়ে পালিয়ে গেছে! অবাক কাণ্ড। তো আলি আরেক ব্যক্তিকে দীনারটি দিয়ে অনুরোধ করলেন বাজার থেকে যেন একটি বসার বাহন কিনে আনে।
বাজার ঘুরে সেই লোকটি যে বসার বাহন নিয়ে ফিরে এল, তা দেখে আলি এবার আরও অবাক।
- সুবহানাল্লাহ! একি! এটা তো আমারই বাহন!
- কিন্তু আমি তো বাজারে এক বালকের কাছ থেকে এক দীনারের বিনিময়ে কিনে এটি আনলাম!
আলি-এর কৌতূহল বেড়ে গেল। বিস্ময়সুরে তিনি বলে উঠলেন, সুবহানাল্লাহ! আমি তাকে দীনারটি হালালভাবে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে তা হারাম পন্থায় অর্জন করল!
আপনার তাকদীরে যে রিযক আছে তা আপনি পাবেনই। পরীক্ষা নেওয়া হয়, আপনি তা কীভাবে অর্জন করছেন; হালালভাবে না হারামভাবে। ঘুরে-ফিরে রিযক আপনার কাছেই আসবে।
আপনি হারাম-চক্র থেকে বেরিয়ে আসুন। আপনি যদি চান আমি হারাম ছেড়ে দেব, তখন আপনার জন্য হালালের দরজা পুনরায় খোলা হবে। প্রয়োজন শুধু একটি পদক্ষেপ। সেই হারামের দরজাগুলো এমনভাবে বন্ধ করার পদক্ষেপ নিন, যেন সেগুলো আর কখনও খোলা না হয়।
📄 টুকরির বিনিময় প্রাসাদ
একবার এক লোকের গল্প শুনেছিলাম আমাদের এক ভাইয়ের কাছে। সে একটি মাসজিদ নির্মাণের দায়িত্বে ছিল। আসলে পুরো প্রজেক্টটাই তার নিজের। লোকটি এই প্রজেক্টকে সন্তানের চোখে দেখত। মনে-প্রাণে চাইত কিয়ামাতের দিন এটি যেন আল্লাহর সামনে নেক আমল হিসেবে পেশ করতে পারে। সে একজন ধনী মানুষ। তাই এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্যে যাবতীয় খরচ নিজেই বহন করল। পাশাপাশি কড়া নজরদারি রাখল-কেউ যেন এই নির্মাণ-কাজে কোনোভাবে অবদান রাখতে না পারে। মূলত এই আমলের সাওয়াব সে একাই পেতে চাচ্ছিল। তাই কারও অংশীদার থাকবে-এটি সে মেনে নিতে পারেনি।
নির্মাণ-কাজ চলাকালে একদিন এক বৃদ্ধা সেখানে যায় একটি টুকরি নিয়ে। সম্ভবত তিনি কারও কাছে শুনেছেন এখানে মাসজিদ নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সে কী-বা করতে পারবে! তাই একটি ছোট্ট টুকরি বানিয়ে নিয়ে আসেন। এই আশায়, হয়তো এটি দিয়ে শ্রমিকরা দু-একটা ইট বহন করতে পারবে, তাদের কাজে আসবে।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যখন মাসজিদ নির্মাণ-কাজ সমাপ্ত হলো, মাসজিদ নির্মাতা একটি স্বপ্ন দেখল। সে দেখল, দুটো প্রাসাদ। একটি প্রাসাদ দেখিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, 'এটা কার?' স্বপ্নে তাকে বলা হলো, 'মাসজিদ নির্মাণ-কাজে অবদান রাখার জন্য আল্লাহ তোমাকে এই পুরস্কার দিয়েছেন।'
নির্মাণ-কাজে 'অবদান রাখার জন্য'! সে যেন আকাশ থেকে পড়ল এ কথা শুনে! 'অবদান! এ আমার মাসজিদ। আমি বানালাম। আমার আমল এটি। কেন অবদান বলা হচ্ছে?!' ঘুম ভাঙতেই ব্যস্ত হয়ে ছুটে গেল সে। শ্রমিকদের কাছে গিয়ে জানতে চাইল, 'আমি স্বপ্নে এরূপ দেখেছি। সত্যি করে বলো তো, আমার অনুপস্থিতিতে এই মাসজিদের কাজে কেউ কি কোনোভাবে সহায়তা করেছে?' তারা বলল, 'না তো! কাজটি সম্পূর্ণ আমরাই করেছি।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা নিশ্চিত?' তারা বলল, 'হ্যাঁ অবশ্যই। শুধু আমরাই করেছি। তবে একদিন এক বৃদ্ধা এখানে একটি টুকরি রেখে যায়, আমরা তা ব্যবহার করেছিলাম। এ ছাড়া কিছুই না।'
লোকটার বুঝতে বাকি রইল না। আল্লাহ অত্যন্ত মহানুভব। সে টুকরিটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বৃদ্ধার বাড়ি খুঁজতে লাগল। খুঁজেও পেল। দরজায় কড়া নাড়তে বৃদ্ধার দেখা পেল সে। এরপর তাকে করজোড়ে অনুরোধ করল, 'প্লিজ আপনার টুকরিটা ফেরত নিন! টুকরিটা ফেরত নিন প্লিজ!'
সে শুরু থেকেই চায়নি কেউ তার সাওয়াবের ভাগিদার হোক। তাই কাকুতি-মিনতি করে বলল, 'প্লিজ আপনার টুকরিটা ফেরত নিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন।' বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন, 'কেন? কী হয়েছে?!' লোকটি জানাল, 'আসলে আমি স্বপ্নে এই এই দেখেছি।' সব শুনে বৃদ্ধা অবাক। বলল, 'সুবহানাল্লাহ! আমিও ঠিক এমন একটি স্বপ্নই দেখেছি। স্বপ্নে আমিও দুটো প্রাসাদ দেখেছি। আমাকেও অনুরূপ কথা বলা হয়েছে, “মাসজিদ নির্মাণ-াজে অবদান রাখার দরুন আল্লাহ তোমাকে এই পুরষ্কার দিয়েছেন।” আর আমি এই নেক আমল ছাড়া এমন পুরস্কার অর্জন করতে পারতাম না। জাযাকাল্লাহু খাইর।' এই বলে সে টুকরি ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানাল।
আপনি যখন আল্লাহর রাস্তায় দান করেন, তখন আপনি আলি হাম্মুদা, মুহাম্মাদ, জিম... দুনিয়ার কারও সাথে লেনদেন করছেন না; সরাসরি আল্লাহ তাআলার সাথে লেনদেন করছেন। জগৎসমূহের প্রতিপালকের সাথে করছেন। আর আল্লাহর কাছে এটা কোনো বিষয় না আপনি কতটুকু করেছেন। আল্লাহ দানের পরিমাণ নয় বরং মনের নিয়ত দেখেন। আর তাই পুরস্কার তা-ই পাবেন যেমন নিয়ত করবেন। ছোট্ট একটি কাজ নিয়তের ফলে পাহাড়সম পুরস্কারও বয়ে আনতে পারে। অতএব নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন। একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যান। এবং অপেক্ষা করুন কল্পনাতীত সাওয়াব দেখার। আল্লাহ দেবেন।
📄 কুরআনের সাথে পথচলা
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ 'আসলে এ কুরআন এমন পথ দেখায় যা একেবারেই সোজা।'[১]
আয়াতে 'সবচেয়ে সরল' বোঝাতে আরবি যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা হলো أَقْوَمُ (আকওয়াম)। ইংরেজি ব্যাকরণ অনুযায়ী শব্দটি superlative degree। অর্থাৎ কুরআনের সদৃশ কিছু নেই; এমনকি আংশিক তুলনাযোগ্যও না। কুরআন সবচেয়ে সরল, দৃঢ় ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়। তা ছাড়া أَقْوَمُ শব্দটি বিশেষণ। আমরা ছোটোবেলায় পড়ে এসেছি বিশেষণ বা Adjective এর কাজ কোনোকিছুকে বর্ণনা করা। أَقْوَمُ কী বর্ণনা করছে?
আয়াতে উহ্য রাখা হয়েছে বিষয়টি। অর্থাৎ পাঠকের বিবেকের কাছে প্রশ্ন ছেড়ে গেছে : এই কুরআন পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল ও মজবুত... কোন বিষয়ে? পারিবারিক বিষয়ে? স্বাস্থ্য বিষয়ে? না অর্থনৈতিক? বলা হয়নি। তাই আলিমগণ বলেন, 'কুরআন সকল বিষয়ে সর্বোত্তম সমাধান দেয়—এই দাবি প্রতিষ্ঠিত করতেই বিষয়বস্তু অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে।'
কুরআন শুধু জীবনের ক্ষুদ্র অংশ নিয়েই কথা বলে না। কেবল নির্দিষ্ট প্রজন্মের জন্য কুরআন নাযিল হয়নি। দুনিয়া ও আখিরাতের যে-কোনো সমস্যার সমাধান পাবার নিয়তে কেউ যখন কুরআনের কাছে আসে, কুরআন তখন সর্বোত্তম সমাধান দিয়ে থাকে!
আপনি হয়তো নিজের ওপর কুরআনের প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন না, কিংবা সামগ্রিকভাবে উম্মতের মধ্যে এর কোনো ভূমিকা দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু কুরআনের দাবি—সে সব বিষয়ে সর্বোত্তম সমাধান দেয়। তা হলে সমাধানের প্রভাব দেখা যাচ্ছে না কেন? দুটোর একটি হবে : হয় কুরআন তার দাবি অনুযায়ী সঠিক পথ দেখায় না; নাউযুবিল্লাহ! নয়তো আমরা কুরআনকে ঠিকভাবে মানতে ব্যর্থ হয়েছি, তাই সঠিক পথ পাচ্ছি না।
হ্যাঁ, দ্বিতীয় কারণটাই আসল সমস্যা। তা হলে আরেকটি প্রশ্ন আসে, কখন এই কুরআন ব্যক্তি থেকে শুরু করে গোটা উম্মাহর সংশোধন করবে?
এর উত্তরে বলব, 'যখন কুরআনের সাথে আমাদের আচরণ ইনসাফপূর্ণ হবে।' পথহারা মরু-পথিকের কথাই চিন্তা করুন। প্রতিটি মুহূর্ত তাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে। আচমকা সে একটি ম্যাপ পেয়ে গেল, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে কীভাবে দ্রুত এবং নিরাপদে মরুভূমি থেকে বের হতে পারবে। ভাবুন, সেই মুহূর্তে তার অনুভূতি কেমন হবে! কল্পনা করুন, তখন তার চোখযুগল কতটা ঝলমলে দেখাবে! তার ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহের কথা ভাবুন, সে দেখছে, বারবার দেখছে ম্যাপটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। আশায় বুক বাঁধছে, এবার সে রেহাই পাবে, মুক্তি পাবে...
কুরআন পড়ার সময় আমাদেরও এরকম অনুভূতি কাজ করা উচিত। এটি আমাদের সর্বোত্তম পথ দেখাবে, নিরাপদে কূলে ফিরিয়ে আনবে। কুরআনের সাথে আমাদের আচরণ এমনই হওয়া কাম্য।
আল্লাহ বলেন, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ 'যাদের হৃদয় আছে কিংবা যারা একাগ্রচিত্তে কথা শোনে তাদের জন্য এ ইতিহাসে অনেক শিক্ষা রয়েছে। [২]
আরেক স্থানে বলেন, أَفَلَمْ يَدَّبَّرُوا الْقَوْلَ 'তারা কি এ বাণী সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না?'[৩]
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا 'তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? না তাদের অন্তরসমূহে তালা লেগে গেছে? '[৪]
আরবিতে তালা শব্দটির একবচন হলো قفل (কুফল) আর বহুবচন হলো أَقْفَالُ (আকফাল)। কুরআনে শব্দটি বহুবচন রূপে এসেছে। যার অর্থ একাধিক তালা। আল্লাহ বলেন, كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ 'আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।'[৫]
কম-বেশি প্রত্যেক মা-বাবারই আশা থাকে সন্তান হাফিয হবে। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় বিষয়। কিন্তু আপনি এমন অভিভাবক খুব কমই পাবেন, যারা সন্তানকে কুরআন বোঝানোর জন্য শিক্ষক খোঁজ করছেন। আসলে, আল্লাহ তাআলা এই উদ্দেশ্যে কুরআন নাযিল করেছেন, যেন আমরা বুঝি, এর শিক্ষা বাস্তবায়ন করি।
কুরআনি জাতি গড়ার শুরুতেই প্রয়োজন হলো কুরআনকে তার প্রাপ্য অধিকার দেওয়া। আয়াতের শিক্ষাগুলোর প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া।
ভুমিকার এই পর্যায়ে এসে আমরা একটি প্রশ্ন করব, তাদাব্বুর (চিন্তা-ভাবনা) এবং তাফসীর (ব্যাখ্যা করা) — এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?
তাফসীর এবং তাদাব্বুরের মধ্যে পার্থক্য
তাদাব্বুর শব্দটির বুৎপত্তিগতভাবে 'দুবুর' থেকে এসেছে। এর অর্থ কোনোকিছুর পেছন দিক বা অভ্যন্তরীণ অবস্থা। অর্থাৎ তাদাব্বুর বলতে বোঝায় 'বিষয়সমূহের ফলাফল এবং পরিণতির দিকে মনোনিবেশ করা।'
সহজ বাংলায় 'তাদাব্বুর করা' মানে আয়াতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। জানা ও মানার উদ্দেশ্য নিয়ে পড়া। তাদাব্বুর শুধুমাত্র নেক আমলের দিকেই ধাবিত করে না, বরং বিষয়টির সাথে আরও অনেককিছু জড়িয়ে আছে। অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিশা পেতে, কপটতা ছেড়ে আন্তরিক হওয়ার ক্ষেত্রে কিংবা অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরে আসার জন্য তাদাব্বর সহায়ক হতে পারে। তিলাওয়াত করার সময় মনকে যদি এগুলোর কোনো একটিতে নিবদ্ধ করা যায়, ব্যক্তি তখনই তাদাব্বুরের পথে চলতে শুরু করবে। সত্যি বলতে তখনই সে আল্লাহর এই নির্দেশটি বাস্তবায়ন করতে পারবে: “আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।” [৬]
তা হলে তাফসীর কী?
তাফসীর শব্দটি এসেছে ‘আল-ফাসর’ থেকে, যার অর্থ ‘আল-কাশফ’ অর্থাৎ উন্মোচন করা। যুরকানি তাফসীর শব্দকে সংজ্ঞায়িত করেছেন: ‘এমন একটি জ্ঞান, যা দ্বারা ব্যক্তির সামর্থ্য অনুযায়ী কুরআনে আল্লাহর উদ্দিষ্ট অর্থ বোঝার চেষ্টা করা হয়।’ [৭]
অর্থাৎ একজন মুফাসসিরের দায়িত্ব আয়াতের উদ্দিষ্ট অর্থ উন্মোচন করা। অতএব আমরা বলতে পারি, তাফসীর হচ্ছে তাদাব্বুরের দরজা। সর্বপ্রথম পাঠককে উদ্দিষ্ট অর্থ বুঝতে হবে, এরপর পাঠক তাদাব্বুর করবে। অর্থাৎ আয়াতের মণিমুক্তা-হিকমত-লক্ষ্য-মর্ম-শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করবে।
তাফসীর এবং তাদাব্বুরের মধ্যে দ্বিতীয় পার্থক্য হচ্ছে, তাফসীর করার দায়িত্ব আলিমদের। কারণ, আরবি ভাষায় তাদের পাণ্ডিত্য আছে। অপরিহার্য অন্যান্য বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন তারা। পক্ষান্তরে তাদাব্বুর বা চিন্তা-ভাবনা করার দায়িত্ব গোটা উম্মতের। মজার বিষয় দেখুন, যে দুই আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, ‘তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না?’ অর্থাৎ ৪নং সূরা ও ৪৭ নং সূরা, উভয় আয়াতেই তিনি প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছেন কাফিরদের দিকে!
তৃতীয় পার্থক্য হলো, তাফসীরের সীমা আছে, আর তাদাব্বুরের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। বরং তাদাব্বর চলাকালে আল্লাহ হয়তো কারও মনে এমন কিছু ঢেলে দিতে পারেন, যা ইতিপূর্বে কারও অন্তরেই আসেনি।
তাদাব্বুরের পূর্বশর্ত
তাদাব্বুর বা চিন্তা-ভাবনার বিষয়টা ডুবুরিদের মতো। সমুদ্রে ডুবুরিরা কে কত গভীরে যেতে পারে-এটা নির্ভর করে তাদের চর্চার ওপর। চর্চাভেদে ভিন্নতা দেখা দেয়। তদ্রূপ তাদাব্বুরেও মানুষের ভিন্নতা থাকে। আরবি ভাষায় পাণ্ডিত্য, প্রতিটি সূরা ও আয়াতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞান, আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট জানা, অলঙ্কারশাস্ত্র, সিদ্ধান্তে যাবার দৃঢ়তা ইত্যাদি জ্ঞানভেদে তাদাব্বুরের মাত্রাও বিভিন্ন রকম হয়।
তবে তাদাব্বুরের মৌলিক কিছু শর্ত আছে, যেগুলো আলিম ও সাধারণ পাঠক-সবার জন্য প্রযোজ্য এবং জরুরিও। সেই শর্তগুলো পূরণের দ্বারা পাঠক তাদাব্বুরের অকৃত্রিম স্বাদ উপভোগ করতে পারবে। আসুন সেগুলো জেনে নিই:
১) কুরআনকে যথোপযুক্ত সম্মান করা, এর পবিত্রতা অনুধাবন করা
কোন বিষয়ে কতটুকু মনোযোগ দিচ্ছেন-নির্ভর করে ওই বিষয়টি আপনার দৃষ্টিতে কতখানি গুরুত্ব বহন করে। অর্থাৎ সকল শর্তের প্রধান শর্ত এটাই। এর ওপরেই নির্ভর করে তাদাব্বুরের ফলাফল। কুরআনের সম্মান অনুধাবনে যদি আমাদের ত্রুটি থাকে, তা হলে আমাদের তাদাব্বুরেও ত্রুটি থাকবে।
আলি ইবনু আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরআনের সম্মানে কী বলেছেন দেখুন, 'এ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। এতে রয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ঘটনা, আর পরবর্তীদের বার্তা। ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে ফয়সালাকারী। তবে এতে ঠাট্টা রসিকতার স্থান নেই। যে এই কুরআন অহংকারবশত পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন। যে একে ছেড়ে ভিন্ন কিছুতে পথনির্দেশ তালাশ করে, আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেন। এ হচ্ছে আল্লাহর রশি। বড়োই মজবুত এই রশি। প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ, যা শুধু সঠিক পথের দিশা দিয়ে থাকে। কোনো অন্তর এর সান্নিধ্যে এসে দিশেহারা হয় না। কোনো জিহ্বার পদস্খলন ঘটে না এর উচ্চারণে। কোনো আলিম এর ব্যাখ্যা লিখে তৃপ্ত হন না। সুস্থ অন্তর এর তিলাওয়াত করে কখনোই পরিশ্রান্ত হয় না। এর বিস্ময় কখনও কাটবার নয়। এ হচ্ছে সেই কিতাব যা শুনে জিনেরা বলতে বাধ্য হয়েছিল, 'নিশ্চয়ই আমরা শুনেছি এক বিস্ময়কর কুরআন!' [৮] এ হচ্ছে সেই কিতাব, যে বক্তা এর থেকে কিছু বলল, সে সত্য বলল। যে এর দ্বারা বিচার করল, সে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করল। যে এর ওপর আমল করল, সে পুরস্কৃত হলো। আর যে এর দিকে আহ্বান করল, সে সীরাতে মুস্তাকীম পেল।" [৯]
এক হাদীসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন, অতীতের কোনো-এক সময়ে একজন রাখাল এক নেকড়েকে মানুষের মতো কথা বলতে দেখে। এতে রাখাল ভারি অবাক হয়, কিন্তু নেকড়ে রাখালের এই বিস্ময় ভেঙে দিয়ে বলে: 'আমি কি তোমাকে এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা বলব না? মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় মানুষদের অতীতে ঘটে-যাওয়া অনেক বিষয় সম্পর্কে জানিয়ে দিচ্ছেন!' [১০]
যে কুরআন আমার-আপনার ঘরে আছে, এটি এই জগতের নয়। চিন্তা করুন, আপনি যা পড়ছেন, তার প্রতিটি অক্ষর সাত আসমানের মালিকের! এই কথা কোনো মানবের নয়! সত্যিই, এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কী হতে পারে? এ এমন এক গ্রন্থ যা পূর্বে-ঘটিত-বিষয় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করে, এবং আগামীতে যা ঘটতে যাচ্ছে, সে বিষয়গুলোও জানিয়ে দেয়। তা ছাড়া কুরআন শুধু নির্দিষ্ট যুগের জন্য নাযিল হয়নি, বরং কিয়ামাত অবধি সকল যুগের ও প্রজন্মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নেকড়ের ভাষায়, এটাই সবচেয়ে বিস্ময়ের।
ঘটনাটি আমরা অনেকেই জানি, একদল জিন একবার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনল। অদৃশ্যে বসে তারা যে কুরআন শুনে যাচ্ছে, নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে অবগত ছিলেন না। পরবর্তীকালে আল্লাহ তাকে জিনদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আয়াত নাযিল করেন, قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرُ مِنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا “(মুহাম্মাদ) বলো, আমার প্রতি ওহি করা হয়েছে যে, নিশ্চয় জিনদের একটি দল মনোযোগ-সহকারে শুনেছে। অতঃপর বলেছে, "আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি।””[১১]
মানুষের মতো কথা বলতে পারে এমন প্রাণীদের নিয়ে কেউ যখন গল্প করে, কিংবা ভুতুরে জিনদের সাক্ষাতের কাহিনি শোনায়, তখন আমরা কতই-না মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি! অথচ সেই জিনদের কাছেই সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল আল-কুরআন। হ্যাঁ, এই কুরআনই সবচেয়ে বিস্ময়ের দাবি রাখে। আর এই বিস্ময়ের প্রভাব যদি আমাদের প্রত্যহ জীবনে না মেলে, কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক উন্নত না করে, তা হলে বুঝতে হবে আমরা সত্যিকারার্থে কুরআনের বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। এর মর্যাদা প্রকৃত অর্থে আমাদের অন্তরে খুব একটা জায়গা করে নিতে পারেনি। অথচ এ কিতাব যদি পাহাড়ের ওপর নাযিল হতো, তা হলে পাহাড় ধসে পড়ত।
আহমাদ ইবনু আবী হাআরি বিস্ময়-সুরে বলেন, 'আমি যখন কুরআন পড়তে গিয়ে একের-পর-এক আয়াতের দিকে তাকাই, হতবুদ্ধি হয়ে যাই! হাফিজদের কথা ভেবে যারপরনাই অবাক হই! কীভাবে তারা রাত্রে ঘুমাতে পারে! কীভাবে তারা দুনিয়ার কোনো কাজ নিয়ে ব্যস্ত হতে পারে! দয়াময় আল্লাহর যে কালাম তারা তিলাওয়াত করে, এর অর্থ যদি বুঝত, তা হলে এর হক জানতে পারত; এর মধ্যে প্রশান্তি খুঁজে পেত। আর এর দ্বারা আল্লাহকে ডাকার মধ্যে যে কী আনন্দ, তা যদি অনুধাবন করতে পারত, তা হলে আনন্দের আতিশয্যেই তারা নির্ঘুম কাটিয়ে দিত সারা রাত; এই ভেবে— কত বড়ো নিয়ামাত তারা লাভ করেছে! '[১২]
সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'হায়, আমি যদি শুধু কুরআনের সাথে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতাম!'[১৩]
যে-কেউ ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ-এর রেখে-যাওয়া কাজসমূহের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করবে, সে একটাই কথা বলবে, 'এ যেন এক কুরআনীয় মানব!' তিনি ছিলেন কুরআনের জন্য নিবেদিত প্রাণ। তাঁর পুরো জীবন কেটেছে এই কালাম বোঝার পেছনে। কুরআন নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকতেন যে, বিয়ে করার সময়টুকু পাননি এই মহান ইমাম। বরং জীবনেও কুরআন দেখেনি-এরকম কাউকে যদি ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ-এর কাজ দ্বারা কুরআনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, সে যখন দেখবে ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ 'আল্লাহ বলেছেন' 'আল্লাহ বলেছেন' কতবার পুনরাবৃত্তি করেছেন-লোকটা ধরে নেবে কুরআন হয়তো ১০ খণ্ডের বিশাল কিতাব!
স্বাভাবিক সময়ে ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ প্রতি দশ দিনে এক খতম দিতেন। কিন্তু তাঁকে যখন কারাবন্দি করা হলে, তিনি তিলাওয়াতের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেন। তিন দিনে এক খতম দেওয়া শুরু করেন। কারাগারের চার-দেওয়ালে বন্দি থেকে এভাবে খতম দিয়ে ফেললেন ৮০ বার! তারপর ৮১তম খতম-চলা-অবস্থায় আল্লাহর ডাক চলে এল। জীবনের অন্তিম মূহূর্তে তিনি এই আয়াত দুটো পড়ছিলেন, إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَنَهَرٍ فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِندَ مَلِيكٍ مُقْتَدِرٍ 'নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝরনাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে। [১৪]
কেন আমি এগুলো বলছি? তাক লাগিয়ে দেবার মতো বিষয় হলো, জীবনের শেষ সময়ে তাঁকে বলতে শোনা গেছে: 'আমার আফসোস হয় সেই অগণিত সময়ের কথা ভেবে, যা আমি কুরআনের অর্থ না বোঝে নষ্ট করেছি।'[১৫]
মালিক ইবনু দীনার বলেন, 'আল্লাহর কসম করে তোমাদেরকে বলছি, কুরআনের প্রতি ঈমান রাখে এমন বান্দার অন্তর অবশ্যই এর দ্বারা চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে। (নয়তো তার ঈমান সঠিক নয়)।'[১৬]
সত্যিই, এই কথাগুলো যে মাথায় রাখে এবং যে রাখে না, তিলাওয়াতের সময় উভয়ের অনুভূতি কক্ষনও এক হবে না।
২) বিশ্বাস রাখুন, কুরআন আপনার সাথেই কথা বলছে
চিঠির শুরুতে 'প্রিয় প্রজা' আর 'প্রিয় আবদুল্লাহ' শব্দ দুটোর পার্থক্য ব্যাপক। তা ছাড়া চিঠির গুরুত্ব প্রেরকের মর্যাদার ওপরেও নির্ভর করে। আর এই কারণে সকল নবি-রাসূল সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন আপন জাতিকে বোঝাতে, যে ওহি নিয়ে তারা এসেছেন তা রাজাধিরাজের পক্ষ থেকে এসেছে। বিশ্বজগতের প্রতিপালক-আল্লাহ তাআলার নিকট হতে।
নূহ ও হৃদ-দুজনই তাদের জাতিকে বলেছেন, أُبَلِّغُكُمْ رِسَالَاتِ رَبِّي 'আমি তোমাদের নিকট আমার রবের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি... '[১৭]
হাসান বাসরি বলেন, 'তোমাদের পূর্ববর্তীরা কুরআনকে তাদের রবের-পক্ষ-থেকে-আসা-বার্তা (মেসেজ) হিসেবে দেখত।।[১৮]
ইমাম গাযালি রহিমাহুল্লাহ বলেন, '(তাদাব্বুরের স্বাদ পেতে) ব্যক্তিকে অবশ্যই বুঝতে হবে, কুরআনে বর্ণিত যাবতীয় কথা তাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে। তা হলে সে যখন কোনো নির্দেশ কিংবা নিষেধাজ্ঞা শুনবে, তখন বুঝতে পারবে, তাকেই আদেশ ও নিষেধ করা হচ্ছে। যখন কোনো ওয়াদা কিংবা ধমক শুনবে, তখনও তার অনুরূপ অভিব্যক্তি হবে। সে যদি পূর্ববর্তী নবিদের ঘটনা শোনে, তা হলে বুঝবে এগুলো স্রেফ উপভোগ করার জন্য বলা হয়নি। বরং আসল উদ্দেশ্য হলো এসব থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পথনির্দেশ গ্রহণ করা। [১৯]
৩) অন্তরকে প্রস্তুত করুন
আলোর প্রভাব চোখে পড়ে আর শব্দের প্রভাব কানে। তেমনি কুরআনের প্রভাব পড়ে অন্তরে। এজন্য আল্লাহ তাআলা মানব-অন্তরকে বেছে নিয়েছেন তাঁর কালাম নাযিলের জন্য। একে নাযিল করেছেন সর্বশেষ নবি, শ্রেষ্ঠ মানব, পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের অধিকারী রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তরে।
আল্লাহ বলেন, وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ ۞ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ ۞ عَلَى قَلْبِكَ 'আর নিশ্চয় এ কুরআন রব্বুল আলামীনের নাযিলকৃত। একে নিয়ে আমানতদার রূহ অবতরণ করেছে তোমার অন্তরে... '[২০]
আমরা জেনেছি, কুরআনের প্রভাব ব্যক্তিভেদে রকমারি ধরনের হয়। এজন্যই কুরআনের মতো মহান উপহার নাযিলের পূর্বে আল্লাহ তাআলা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তর প্রস্তুত করে নিয়েছেন। সীরাতের গ্রন্থে আমরা পড়েছি, শিশুবয়সে দুজন ফেরেশতা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্ষ বিদীর্ণ করেছিল। তাঁর অন্তর বের করে এবং এর কলুষতা পরিষ্কার করে পুনরায় স্থাপন করে দেয় তারা। নবিজির জীবনে এটি ঘটেছিল দুবার।
আসলে কুরআনের জন্য অন্তরকে প্রস্তুত করতে হয়। এক্ষেত্রে আমরাও ব্যতিক্রম নই। অন্তরের পরিশুদ্ধি প্রয়োজন। যেন অন্তরের জমিনে কুরআন জন্ম দেয় ঈমানের উৎকৃষ্ট ফলফলাদি। দুনিয়ার সবচেয়ে স্বচ্ছ পানিও যদি অপরিষ্কার পাত্রে রাখা হয়, পানি নষ্ট হয়ে যাবে। তার বিশুদ্ধতা বজায় থাকবে না। এইটাই বাস্তবতা।
এজন্য যারকাশি বলেন, 'জেনে রাখো, কোনো ব্যক্তির অন্তর যদি বিদআত কিংবা অনবরত পাপের কালিমা দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে, তবে সে কখনোই ওহির আসল মর্ম অনুধাবন করতে পারবে না, গায়েবি ইলমের গোপন ভাণ্ডার তার সম্মুখে উন্মোচিত হবে না।' [২১]
কুরআনের আলোয় জীবন আলোকিত করার এই যাত্রা আপনার কাছে বারবার কঠিন ঠেকলে বুঝতে হবে-আপনার অন্তরে এমন কিছু পাচিল তৈরি হয়েছে, যা কুরআন প্রবেশের পথে প্রতিবন্ধক। ফলে অন্তর কুরআনের গোপন ভাণ্ডার গ্রহণ করতে পারছে না। আর এই প্রাচীরগুলো ধ্বংসের উপায় একটাই-তাওবা।
৪) তারতীল বা ধীরেসুস্থে কুরআন তিলাওয়াত করুন, তাড়াহুড়ো ছাড়ুন
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَقُرْآنًا فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثٍ وَنَزَّلْنَاهُ تَنْزِيلًا 'আর এ কুরআনকে আমি সামান্য সামান্য করে নাযিল করেছি, যাতে তুমি থেমে থেমে তা লোকদেরকে শুনিয়ে দাও এবং তাকে আমি (বিভিন্ন সময়) পর্যায়ক্রমে নাযিল করেছি।'[২২]
আয়াতটির ব্যাখ্যায় তাবিয়ি মুজাহিদ বলেন, '(আমি সামান্য সামান্য করে নাযিল করেছি) যেন তুমি মানুষদের ধীরেসুস্থে ও স্পষ্টভাবে তিলাওয়াত করে শোনাও। তিলাওয়াতে তাড়াহুড়ো করবে না। নয়তো মানুষ বুঝবে না।' [২৩]
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا .... কুরআন পড়ার ব্যাপারে দ্রুততা অবলম্বন কোরো না, যতক্ষণ না তোমার প্রতি তার ওহি পূর্ণ হয়ে যায় এবং দুআ করো, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমাকে আরও জ্ঞান দান করো।[২৪]
ধীরেসুস্থে পড়া এবং জ্ঞানের প্রবৃদ্ধি-দুটো বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি ছাড়া অপরটি অর্জন অসম্ভব ব্যাপার।
৫) হারিয়ে যান কুরআনের জগতে
কোনোকিছুর গভীরে যাবার অন্যতম উপায় হলো, সে বিষয়টি পুনরাবৃত্তি করা। কথায় আছে 'যা বারবার করা হয়, তা অন্তরে গেঁথে যায়।' পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে ১৭ বার সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে বলার পেছনে হয়তো এটাই গোপন রহস্য। এই সূরা আল্লাহর প্রতি আমাদের দাসত্ব নবায়ন করে। নবায়ন করে আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সেই সাথে পৌঁছে দেয় ঈমানের দরিয়ায়।
সূরা ইখলাসের কথাই ভাবুন, প্রত্যেক ফরজ সালাত শেষে আমরা তিলাওয়াত করি এবং মাসনুন দুআ হিসেবে সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে তিলাওয়াত করি। আবার ফজরের দুই রাকআত সুন্নাহ সালাতের দ্বিতীয় রাকাতে, বিতর সালাতের শেষ রাকাতে পড়ি, এবং ঘুমানোর আগে। (কারণ, এগুলো রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ) এতবার সূরা ইখলাস আমরা একদিনেই পড়ি! এখন কেউ যদি প্রতিবার ধীরে ধীরে পড়ে এবং আয়াতগুলো নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে, তা হলে শুধু আমলে আন্তরিকতাই বৃদ্ধি পাবে না, অন্তরেও গেঁথে যাবে।
সূরা আর-রহমানের একটি আয়াতের দিকে তাকান : فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ 'অতএব (হে জিন ও মানুষ!) তোমরা তোমাদের রবের কোন নিয়ামাত অস্বীকার করবে?'
এই আয়াতটি একবার দুবার নয়, তিরিশ বারেরও বেশি পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। অথচ সূরা আর-রহমানের মোট আয়াত সংখ্যা মাত্র ৭৮!
বারবার তিলাওয়াতের ফলে অন্তরে আয়াতটি গেঁথে যায়; আয়াতের বাক্য-অর্থ-মর্ম- শিক্ষা, সবকিছু অন্তরে বদ্ধমূল করার কার্যকরী পদ্ধতি এটি। আমাদের পূর্ববর্তীগণ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, আর তাই জীবনভর তাঁরা এভাবেই তিলাওয়াত করেছেন। এমনকি আমাদের নবি মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও কখনও কখনও সারা রাত সালাতে কাটিয়ে দিতেন একটি আয়াত দিয়ে। যেমন: إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ 'যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [২৫]
সাহাবি তামীম আদ-দারি-ও সারা রাত একটি আয়াত পড়ে কাটিয়ে দিতেন। সামনে আগাতে পারতেন না: أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ 'যেসব লোক অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে তারা কি মনে করে, আমি তাদেরকে এবং মু'মিন ও সৎকর্মশীলদেরকে সমপর্যায়ভুক্ত করে দেব, যেন তাদের জীবন ও মৃত্যু সমান হয়ে যায়? তারা যে ফয়সালা করে তা অত্যন্ত জঘন্য। [২৬]
সাঈদ ইবনু যুবাইর এই আয়াত বারবার পড়তেন: يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ 'ওহে মানবসকল, কীসে তোমাকে তোমার মহান রবের ব্যাপারে ধোঁকাগ্রস্ত করল? '[২৭]
ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ-ও একটি আয়াত দিয়ে গোটা রাত পার করে দিতেন, বারবার পড়তেন, গভীর চিন্তায় হারিয়ে যেতেন। আয়াতটি হলো: وَبَدَا لَهُمْ مِنَ اللَّهِ مَا لَمْ يَكُونُوا يَحْتَسِبُونَ ... আর আল্লাহর কাছে থেকে তাদের জন্য এমন-কিছু প্রকাশিত হবে, যা তারা কখনও কল্পনাও করত না। [২৮]
সবশেষে নিম্নোক্ত দুটো বিষয়কে শারীআ আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে, যখন দুটো একসাথে আসে: ১. কুরআন তিলাওয়াত করা ২. একে অপরকে শেখানো
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর ঘরে যখন একদল মানুষ একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে এবং একে অপরকে শিক্ষা দেয়, তখন তাদের ওপর অবশ্যই প্রশান্তি অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদের আচ্ছাদন করে রাখে। এবং ফেরেস্তাগণ তাদের ঘিরে রাখে। আর আল্লাহ তাদের নিয়ে আলোচনা করেন তাঁর সাথে যারা আছে।' [২৯]
দ্বিতীয় বাক্যটি খেয়াল করুন-'এবং একে অপরকে শিক্ষা দেয়।' অর্থাৎ চিন্তা-ভাবনার ফলাফল একে অপরের সাথে শেয়ার করে। তাদাব্বুরের ফলে যে গোপন রহস্য তার মনের পর্দায় ভেসে ওঠেছে, অন্যদের তা শেখায়।
কুরআনের এই ধরণের বৈঠক আল্লাহর নিকট জগতের সর্বোত্তম বৈঠক। সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টার জন্য হলেও এরকম বৈঠকের ব্যবস্থা করুন; বিজ্ঞ আলিম কিংবা বড়ো মাপের কোনো ব্যক্তির সাথে করতে হবে-ব্যাপারটা এমন নয়। পরিবারের সদস্যদের নিয়েই শুরু করুন। সেখানে আপনারা কুরআন থেকে অংশ বিশেষ পড়বেন, একে অপরের তিলাওয়াত শুধরে দেবেন। সেই সাথে গ্রহণযোগ্য কোনো তাফসীর-গ্রন্থ থেকেও পড়ে শোনাবেন; যেমন তাফসীর আস-সা'দী। এরপর চিন্তার জগতে হারিয়ে যাবেন সবাই একসাথে। একে অপরের তাদাব্বর-থেকে-প্রাপ্ত শিক্ষা শেয়ার করবেন। এভাবে আয়াতের হিকমতগুলো বের করে আনুন, আপনার সন্তানকেও অনুপ্রাণিত করুন, পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখুন। এভাবে প্রতি সপ্তাহে বসুন। এরপর দেখবেন কত বরকত যে লাভ হয় এই ধরণের বৈঠক থেকে, তা গুণে শেষ করতে পারবেন না। অতীতে কল্পনাও করেননি আপনি।
মাদরাসাপড়ুয়া ভাই-বোনদেরকেও আমি একই কথা বলব। জীবনে যতই ব্যস্ততা থাকুক, দ্বীনের রাহে নিবেদিত কিছু বন্ধু তালাশ করো। তাদের নিয়ে সপ্তাহে একবার হলেও বসো এবং কুরআনের কোনো-একটি সূরা ধরে একসাথে সেই সমুদ্রে ডুব দাও। এর গুপ্ত ভাণ্ডার জাতির সামনে তুলে আনো তোমরা। রোজনামচায় সেই শিক্ষাগুলো টুকে রাখো। প্রবৃত্তির খায়েশকে লাগাম পরাতে এই বৈঠকগুলো শুধু উপকারীই নয়, অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে। সংশয়ের এই যুগে আমাদের ঈমান ও দ্বীনের বাঁধন মজবুত করবে। মুছে দেবে পাপের কালিমা, আলোকিত করবে অন্ধকার কবর, এবং পৌঁছে দেবে জান্নাতের চূড়ায় ইন শা আল্লাহ।
টিকাঃ
[১] সূরা আল-ইসরা, ১৭: ১
[২] সূরা কফ, ৫০: ৩৭
[৩] সূরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৬৮
[৪] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ২৪
[৫] সূরা সোয়াদ, ৩৮: ২৯
[৬] সূরা সোয়াদ, ৩৮ : ২৯
[৭] মানাহিলুল ইরফান, ২/১৩৩
[৮] সূরা জিন, ৭২: ১
[৯] তিরমিযি, ২৯০৬
[১০] মুসনাদ আহমাদ, ১১৬২২
[১১] সূরা জিন, ৭২:১
[১২] হিলইয়া, ১০/২২
[১৩] আহমাদ, আল ইলালু ওয়া মা'রিফাতুর রিজাল, ১০৮৩
[১৪] সূরা আল-কমার, ৫৪ : ৫৪-৫৫
[১৫] মানহাজু ইবনি তাইমিয়্যা, ৯০
[১৬] মাজমূ' রাসাঈল, ১/২৯৮
[১৭] সূরা আ'রাফ, ৭: ৬২
[১৮] আল-মাজমূ' শারহ আল-মুহাযাব, ২/১৬৯
[১৯] গাযালি, ইহইয়াউ উলুম-আদ-দ্বীন, ১/২৮৫
[২০] সূরা আশ-শুআরা, ২৬: ১৯২-১৯৪
[২১] আল-বুরহান ফি উলুমিল-কুরআন, ২/১৮০
[২২] সূরা আল-ইসরা, ১৭: ১০৬
[২৩] তাফসীর আত-তাবারি, ১৫/১১৬
[২৪] সূরা ত্ব-হা, ২০: ১১৪
[২৫] সূরা আল-মাইদা, ৫: ১১৮
[২৬] সূরা আল-জাসিয়া, ৪৫: ২১
[২৭] সূরা আল-ইনফিতার, ৮২ : ৬
[২৮] সূরা আয-যুমার, ৩৯:৪৭
[২৯] মুসলিম, ১০২৩/৯