📄 ক্যালেন্ডারের পাতায় ২১১১ সাল
আজ থেকে এক শ বছর পর। লেখাটি যারা পড়ছেন, আমাদের প্রত্যেকের দেহ তখন মাটির নিচে থাকবে। অস্তিত্ব তখন রূহের জগতে। দেখছি আমাদের নিজেদের তাকদীর, জান্নাতী না জাহান্নামী।
জমিনে-ফেলে-আসা আমাদের সুন্দর বাড়িটি হয়তো অন্যের দখলে চলে গেছে। পছন্দের কাপড়গুলো এখন অন্যরা পরছে, শখের গাড়িটি হয়তো অন্য কেউ চালাচ্ছে। আর আমাদের? খুব কম জনই স্মরণে রেখেছে। কেউ কেউ হয়তো ভুলেই গেছে। আচ্ছা, ব্যস্ততার এই জীবনে আপনার দাদার দাদাকে কতবার স্মরণ করেছেন? আপনার দাদির দাদিকে কখনও কি মনে পড়েছে?
প্রজন্মের-পর-প্রজন্ম পেরিয়ে আমরা এই জীবন লাভ করেছি। তেমনিভাবে নতুন প্রজন্মের ভিড়ে আমরাও একদিন হারিয়ে যাব।
এভাবে অনেক প্রজন্ম আসছে আর যাচ্ছে। কিন্তু দুনিয়াকে বিদায় জানানোর সময় খুব কম জনই ফেলে-যাওয়া জীবনটা একটু ফিরে দেখার সুযোগ পেয়েছে। বাস্তবতা হলো, এই জীবনটা আমাদের কল্পনার চেয়েও সংক্ষিপ্ত।
২১১৯ সালে কবরে শুয়ে আমরা সবাই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারব, সত্যিই দুনিয়াটা কতই-না তুচ্ছ ছিল! একে-ঘিরে-দেখা স্বপ্নগুলো কতই-না নগণ্য ছিল!
২১১৯ সালে আমরা সকলেই চাইব, 'ইশ, যদি জীবনটা মহৎ কিছুতে উৎসর্গ করতে পারতাম! ইসলামের জন্যে! নেক আমল সংগ্রহের পেছনে দিতে পারতাম! মৃত্যুর পরেও যে কাজগুলো আমাদের উপকার করে চলছে, সেগুলোর পেছনে যদি সব উৎসর্গ করতে পারতাম!'
২১১৯ সালে আমরা অনেকেই চিৎকার করে কথাগুলো বলব, কিন্তু কোনো ফল বয়ে আনবে না এই হাহাকার: ‘..আমার রব, আমাকে আবার ফেরত পাঠান। যেন আমি নেক আমল করতে পারি যা আমি আগে করিনি।[৩২]
জবাব মিলবে, ‘না, এটা হবার নয়। এটা তো তার একটা কথামাত্র, যা সে বলার জন্যই বলবে। তাদের সামনে বারযাখ থাকবে উত্থান-দিবস পর্যন্ত।[৩৩]
২১১৯ সালে আমরা অনেকেই আফসোস থেকে নিজেদের হাত কামড়াব, আর বলব, ‘হায়, আমার এ জীবনের জন্য আমি যদি কিছু অগ্রিম পাঠাতাম!’[৩৪]
ভাইরে, মৃত্যুর ফেরেশতা আমাদেরকে নেককার হবার সময় দেবে না। বোনরে, সে অপেক্ষা করবে না আমাদের জন্য...
তাই আসুন না, মালাকুল মাউত আসার আগেই আমরা সংশোধন হয়ে যাই। পাপে-ভরা জীবনটাকে পাল্টে ফেলি। চিরদিনের জন্য পাল্টে ফেলি।
টিকাঃ
[৩২] সূরা আল-মু'মিনুন, ২৩: ১১
[৩৩] আল-মু'মিনুন, ২৩: ১০০
[৩৪] সূরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৪
📄 রহমানের পরিচয়
রাসূল বলেন,
لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ وَنَفَخَ فِيهِ الرُّوح ؛ عَطَسَ ، فَقَالَ : الْحَمْدُ لِلَّهِ ، فَحَمِدَ اللَّهَ بِإِذْنِهِ ، فَقَالَ لَهُ رَبُّهُ : يَرْحَمُكَ اللَّهُ يَا آدَمُ !
'আল্লাহ তাআলা যখন আদমকে সৃষ্টি করে রূহ ফুঁকে দিলেন, তিনি হাঁচি দেন এবং বলেন, “আলহামদু লিল্লাহ।" আল্লাহর তাওফীকেই তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন। এরপর আল্লাহ বলেন, "ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুক) আদম।""[৩৫]
'আর-রহমান', কুরআনের পাতায় বিশেষ স্থান পেয়েছে আল্লাহ তাআলার এই নাম। তাই মুসলিম-মাত্রই এই নামের প্রতি বিশেষ অনুভূতি কাজ করা উচিত। আমরা আল্লাহর ৯৯টি নাম জানি। খেয়াল করলে দেখব, প্রতিটি নাম অতীব মহান, স্ব-স্ব গুণে পরিপূর্ণ এবং মহিমান্বিত। কিন্তু الرَّحْمَن 'আর-রহমান' নামটি সবগুলো থেকে ভিন্ন। এর অনন্যতা এত ব্যাপক যে, সর্বোত্তম নাম 'আল্লাহ' নামের পাশাপাশি 'আর-রহমান' নামটিও বসানো যায়। এমন কিছু গুণের সমষ্টি এই নাম, যা শুধুমাত্র আল্লাহর সাথেই যায়। আর-রহমান নামের অনন্যতা এবং মহত্ব বুঝতে নিচের ছয়টি উদাহরণ যথেষ্ট :
১. আর-রহমান কখনও Indefinite হয় না
ব্যাকরণ অনুযায়ী আর-রহমান নামটি কুরআনে অনির্দিষ্টরূপে—অর্থাৎ শুরুতে আলিফ- লাম ব্যতীত কখনও আসেনি। এই দিকে আল্লাহর অন্য নামগুলো নির্দিষ্ট-অনির্দিষ্ট উভয় রূপেই পাওয়া যায়। কুরআনে দেখবেন الْعَزِيزُ (আল-আযীয), আবার আলিফ-লাম ছাড়া শুধু عَزِيز (আযীয)-দুটোই আছে। তেমনি الْغَفُور আল-গফুর এবং غَفُورُ গফুর। ব্যতিক্রম শুধু الله এবং الرَّحْمَنِ নাম দুটোতে। কুরআনের কোথাও শুধু رحمن পাবেন না।
২. আর-রহমান নাম কাউকে অনুসরণ করে না
আল্লাহ ও আর রহমান নামের আগে আল্লাহ তাআলার অন্য কোনো নাম বসে না। যেমন আমরা কুরআনে وَإِلَهُكُمْ إِلَلَهُ وَاحِدٌ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ (তোমাদের ইলাহ একজন) পাব। কিন্তু الرَّحِيمُ الرَّحْمَنُ (আর-রহীমুর রহমান) কিংবা الْغَفُورُ الرَّحْمَنُ (আল-গফুরুর রহমান) পাব না কুরআনে। 'আল্লাহ' নামের বেলায় এটি প্রযোজ্য। আল্লাহ নামের আগে অন্যকোনো সিফাতি নাম বসে না। একইভাবে শুধুমাত্র আর-রহমান নামটিও এই মর্যাদা লাভ করেছে। আর রহমান নামের আগেও অন্যকোনো সিফাতি নাম বসে না। আল্লাহর অন্যকোনো সিফাতি নাম এই মর্যাদা লাভ করেনি।
৩. আরশের মালিক আর-রহমান
আল্লাহ তাআলা আরশে اِسْتَوَى (আভিধানিক অর্থ ‘অধিষ্ঠান’) গ্রহণের আলোচনায় কুরআনে শুধু ‘আল্লাহ’ নামটি ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ:
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى
'নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও জমিন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর আরশের ওপর সমাসীন হয়েছেন।[৩৬]
এখানেও ব্যতিক্রম দেখা যায় কেবল আর-রহমান নামে। আরশে সমাসীন হওয়ার কথা কুরআনের ভিন্ন এক আয়াতে এসেছে:
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
'রহমান আরশের ওপর সমাসীন হয়েছেন।[৩৭]
৪. আর-রহমান, শিখিয়েছেন কুরআন
কুরআন নাযিল-সংক্রান্ত আয়াতসমূহে ‘আল্লাহ’ নাম এসেছে। যেমন:
اللَّهُ الَّذِي أَنْزَلَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ
'আল্লাহ-যিনি নাযিল করেছেন সত্য-সহকারে কিতাব।'[৩৮]
এখানেও ব্যতিক্রম; আর-রহমান নামকে কুরআন নাযিলের সাথে জুড়ে দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। তিনি বলেন,
الرَّحْمَنُ - عَلَّمَ الْقُرْآنَ 'আর-রহমান—শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন।'[৩৯]
৫. আশ্রয়স্থলের আরেক নাম আর-রহমান
পানাহ বা আশ্রয় চাইতে 'আল্লাহ' নামে দুআ জপি আমরা। যেমন মূসা বলেছিলেন,
قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ 'আমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই'।[৪০]
কুরআনে আশ্রয় চাওয়ার আরেকটি ঘটনা এসেছে। কিন্তু সেখানে আল্লাহ নামের পরিবর্তে অন্য একটি নাম পাবেন, মারইয়াম বলেন,
قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَنِ مِنْكَ إِنْ كُنْتَ تَقِيًّا 'আমি আর-রহমানের আশ্রয় প্রার্থনা করছি তোমার থেকে, (আল্লাহকে ভয় করো) যদি তুমি মুত্তাকী হও।'[৪১]
৬. শাফাআত এবং আর-রহমান
শাফাআত বা সুপারিশ; এই বিষয়ে কুরআনের সব আয়াত আল্লাহ নাম পাবেন। আল্লাহ বলেন:
قُلْ لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا 'বলুন, সকল সুপারিশ আল্লাহর (এখতিয়ারে)।'[৪২]
শাফায়াত-সংক্রান্ত আয়াতে অন্য কোনো নামের দেখা না পেলেও আর-রহমানকে ঠিকই পাবেন।
আল্লাহ বলেন, يَوْمَئِذٍ لَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا
'সেদিন কারও সুপারিশ কাজে আসবে না, কেবল তার ব্যতীত যাকে আর-রহমান অনুমতি দেবেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হবেন।'[৪৩]
গুটিকয়েক উদাহরণ ছিল এগুলো। আর-রহমান নাম কতটা মর্যাদাপূর্ণ ওপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। ঠিক একই কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلِ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَنُ أَيًّا مَا تَدْعُوا فَلَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى
'হে নবি! এদেরকে বলে দাও, আল্লাহ বা আর-রহমান যে নামেই ডাকো না কেন, সব উত্তম নামই তাঁর।।'[৪৪]
নবিজি -ও আমাদের শিখিয়েছেন, আল্লাহর দুটো প্রিয় নাম হতে যে-কোনো একটি দিয়ে বাচ্চাদের নাম রাখা যেতে পারে। প্রথমটি 'আবদুল্লাহ', আর দ্বিতীয়টি 'আবদুর-রহমান'।।
আর-রহমানকে আমরা কতটুকু জানি?
الرَّحْمَنُ এবং الرَّحِيمُ দুটো নামই রহমত থেকে এসেছে।
ইবনু মানসুর এর ব্যাখ্যায় বলেন, الرقة والتنظف অর্থাৎ 'অন্তরের দুর্বলতা, সদয় হওয়া।'
এটা হলো রহমতের শব্দের আভিধানিক অর্থ। মানুষ হিসেবে আমরা এই সংজ্ঞা নিজেদের বেলায় ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে? মোটেও না। এটা আল্লাহর সাথে শোভা পায় না। আমাদের আল্লাহকে কোনো দুর্বলতা স্পর্শ করে না। আমাদের স্রষ্টা আবেগ দ্বারা পরিচালিত হন না, যেমনটা আমরা হয়ে থাকি।
কোনো শিশুকে কষ্ট পেতে দেখলে আমাদের হৃদয় ভেঙে যায়, চোখযুগল অশ্রুসিক্ত হয়ে আসে। এই অনুভূতির কারণে শিশুটির প্রতি যত্নশীল হতে আমরা বাধ্য হই। মানব হৃদয়ের রহমত, দয়া, মমতা এমনই। কিন্তু মনের এই দুর্বলতার উদাহরণ কি আমরা আল্লাহর শানেও ব্যবহার করতে পারি? মোটেই না।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দয়া এবং আল্লাহর দয়ার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। আমরা দয়ার দ্বারা দুইভাবে উপকৃত হই। দয়ার মাধ্যমে দয়াপ্রার্থী উপকৃত হয়, আর দয়াকারী অপরাধবোধ ও আফসোস দূর করে। অর্থাৎ মানুষের দয়া করার ব্যাপারটা উভয়মুখী। কিন্তু আল্লাহর দয়া এরূপ নয়।
কাজেই, আল্লাহ তাআলার ‘আর-রহমান’—যা এসেছে ‘রহম’ ধাতু থেকে—এবং আমাদের রহম যদিও আপাতদৃষ্টিতে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়, তথাপি আল্লাহর দয়া এবং আমাদের দয়ার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য।
ইবনুল কাইয়িম এর সমাধান দিয়েছেন। আল্লাহর দয়ার সংজ্ঞা কী হবে, মানুষের দয়া এবং আল্লাহর দয়ার মধ্যে পার্থক্য কী—এ প্রশ্নের উত্তরে দিয়েছেন একটি বাক্যে। তিনি বলেন,
الرحمة صفة تقتضى إيصال المنافع والمصالح إلى العبد، وإن كرهتها نفسه، وشقت عليها
“আর-রহমান একটি সিফাত (গুণ)। এ দ্বারা বান্দার জন্য যা কিছু উপকারী ও কল্যাণকর—আল্লাহ সেগুলো পৌঁছে দেন। যদিও-বা বান্দার নফস তা অপছন্দ করে এবং কষ্টদায়ক মনে করে।”[৪৫]
আরও সহজ করে বলছি:
ধরুন, একজন মা। তিনি তাঁর সন্তানকে পরীক্ষার পড়া রিভাইস করতে বাধ্য করেন এবং সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধুদের সাথে দেখা করা বন্ধ করে দেন। এখন সন্তানের অনুভূতি কেমন হবে? অবশ্যই সন্তান অপছন্দ করবে, কিন্তু তার মা এটাকে মমতা হিসেবেই দেখেন। আর সত্যি বলতে, মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক।
যখন সন্তান ডান-বাম না দেখেই রাস্তা পার হতে নেয়, মা চিৎকার করতে থাকেন। সন্তানের ওপর কঠোর হন। তেমনিভাবে আল্লাহ তাআলাও আমাদেরকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন। শ্রেফ আমাদের ভালোর জন্যই, এখানে তাঁর কোনো স্বার্থ নেই। আল্লাহ বলেন,
وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَاللَّهُ رَءُوفُ بِالْعِبَادِ
'আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদেরকে সাবধান করছেন, বস্তুত আল্লাহ বান্দাদের প্রতি খুবই স্নেহশীল। '[৪৬]
ইবনুল কাইয়িম-এর দেওয়া সংজ্ঞা এত গুরুত্ব দেবার কারণ কী? আমরা হয়তো প্রায়ই দেখে থাকি, মানুষ তার আশা পূরণে যখন ব্যর্থ হয়। দিনের-পর-দিন-বোনা-স্বপ্ন যখন স্বপ্নই থেকে যায়, তখন সে আল্লাহকে দোষারোপ করে। বস্তুত এই ধরণের মন্তব্য কেবল তারাই করে, যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর রহমত বুঝতে পারেনি। আল্লাহ ভালো করেই জানেন, যার জন্য আপনি এত অস্থির হয়েছিলেন, সেটা আপনার জন্য ক্ষতিকর। তাই আল্লাহর দয়া আপনার এবং আপনার ইচ্ছার মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন আপনি ক্ষতিকর জিনিস থেকে বেঁচে যান। আপনাকে বাঁচানোর জন্যই আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় ওই বিষয়টিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের ক্ষীণ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আর-রহমানের রহমত দেখতে পাই না। কৃতজ্ঞতার বদলে আর-রহমানকেই দোষারোপ করে বসি। তাই তো কবি বলেন,
فَلَرُبَّمَا كَانَ الدُّخُولُ إِلَى العُلا وَالْمَجْدِ مِنْ بَوَّابَةِ الْأَحْزَانِ
'সফলতা এবং শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় পৌঁছোতে কখনও কখনও দুঃখ-কষ্টের অসংখ্য দরজা অতিক্রম করতে হয়।'
জীবনের পরতে পরতে আর-রহমান
প্রায়ই মাসজিদের ইমামকে মিনতি-সুরে দুআ করতে শুনি। আমাদের শাইখগণ আল্লাহর দয়া চাইতে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। তারা নিজেরাও বলতে থাকেন, 'হে আল্লাহ, আমাদের প্রতি দয়া করো।'
তাত্ত্বিকভাবে এখন আমরা জানি দয়া বলতে কী বোঝায়। কিন্তু এরপরেও অনেকের মনে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্নটি নিয়ে তারা দোটানায় থাকেন। অনেক সময় লজ্জায় মুখ ফুটে তা বলতে পারেন না। প্রশ্নটা হলো- 'আমার ওপর যদি আল্লাহর দয়া থেকেই থাকে, তা হলে আবার দয়া ভিক্ষা চাওয়ার মানে কী?'
নিচের পয়েন্টগুলো মন দিয়ে পড়ুন, আল্লাহর দয়ার ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে ইন শা আল্লাহ:
১. কুরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে আর-রহমানের দয়া
আপনি যখন আল্লাহর কাছে এই বলে ফরিয়াদ করেন—'আল্লাহ, আমার প্রতি দয়া করুন', তখন আপনি মূলত আল্লাহর কাছে কুরআনের জ্ঞান চাচ্ছেন। আল্লাহ বলেন,
الرَّحْمَنُ - عَلَّمَ الْقُرْآنَ – خَلَقَ الْإِنْسَانَ – عَلَّمَهُ الْبَيَانَ
'আর-রহমান; এ কুরআনের শিক্ষা দিয়েছেন; তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন; এবং তাকে কথা শিখিয়েছেন।[৪৭]
এই আয়াতের ব্যাপারে ইমাম ইবনুল কায়্যিম তাঁর (الصواعق المرسلة) গ্রন্থে বলেন,
تأمل كيف جعل الخلق والتعليم ناشئا عن صفة الرحمة متعلقا باسم الرحمن
'গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ করুন, কীভাবে আল্লাহ তাআলা এখানে সৃষ্টি-করা এবং শিক্ষা-দেওয়ার কাজ দুটোকে 'রহমাহ'র গুণের সাথে সম্পর্কিত করেছেন এবং আর-রহমান নামের সাথে জুড়ে দিয়েছেন![৪৮]
২. দাওয়াতি কাজে দয়া
রহমত চাওয়ার আরেকটি অর্থ হলো সফল দাঈ হবার তাওফীক পাওয়া। যখন আল্লাহর দয়ার জন্য আপনি কাঁদছেন, তখন আল্লাহর কাছে সফল দাঈ হিসেবে কবুল হওয়ার জন্যই বলছেন। আল্লাহ তাআলা নবি ﷺ-কে বলেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
'আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রুঢ় ও কঠোর-চিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।[৪৯]
সমাজের গড়পড়তা মুসলিমদের মতো জীবনটা কাটিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? মন থেকে চান আপনার ওসিলায় মানুষ আল্লাহর পথে ফিরে আসুক? জান্নাতের ভূমিতে আপনার জন্য ঘর নির্মাণ করা হোক? জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যেতে চান? তা হলে আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে চলে আসুন, তাঁর দয়ার ভিক্ষা চান।
৩. পাপমোচনে দয়া
খুব আশা কাজ করে, যদি সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হতো! স্মরণে আছে কিংবা ভুলে গেছেন—এমন সকল পাপের শাস্তি থেকে নিস্তার পেতে চান আপনি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
'তোমাদের কেউ যদি অজ্ঞতাবশত কোনো খারাপ কাজ করে বসে, তারপর তাওবা করে এবং সংশোধন করে নেয়, তা হলে তিনি তাকে মাফ করে দেন এবং নরম নীতি অবলম্বন করেন, এটি তাঁর দয়া ও অনুগ্রহেরই প্রকাশ।।[৫০]
দয়াময়ের রহমত যদি একটি বারের জন্য আপনার দিকে চোখ তুলে তাকায়, তা হলে পাহাড়সম পাপ নিমিষেই ধূলিকণায় পরিণত হবে। তিনি পরম দয়ালু, তাঁর দয়া ছাড়া আদম-সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
৪. স্বপ্ন পূরণে দয়া
আল্লাহর দয়া ভিক্ষা চাওয়া মানে জীবনের সকল বাধা-বিপত্তি থেকে মুক্তি পাওয়া। আল্লাহর দয়া পাওয়া মানে জীবনের স্বপ্নগুলো সত্য হওয়া। আর দয়া থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে হারিয়ে-যাওয়া, তলিয়ে-যাওয়া সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে। আল্লাহর শপথ, কেউ হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে নরম রেশমি বিছানায় ঘুমানোর সামর্থ্য রাখে, সামর্থ্য রাখে সর্বোত্তম খাবার ক্রয়ের, কিন্তু এসবে যদি আল্লাহর দয়া না থাকে তা হলে রেশম হবে পাথরের বিছানা, আর দামি সুস্বাদু খাবার বিষে পরিণত হবে। পক্ষান্তরে কেউ হয়তো পাথরের ওপরেই ঘুমায়, আয়-রোজগার সামান্য, দিন আনে দিন খায়, কিন্তু এতে যদি আল্লাহর দয়া থাকে তা হলে পাথরের বিছানাাতেও সে রেশমি বিছানার মতো আরাম পাবে। দরিদ্রের কষাঘাতেও থাকবে প্রশান্ত। চরম মানসিক আঘাতের মুহূর্তগুলোও মনে হবে জান্নাতী সুখের মতো।
এ হলো সে রহমত, যা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পেয়েছিলেন, যখন তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। তীব্র আগুনের তাপ গায়ে স্পর্শ করার আগেই তা রূপ নেয় সুশীতল হয়ে যায়।
এ হলো সেই রহমত, যা কারাগারের বন্দিদশায় পেয়েছিলেন ইউসুফ আলাইহিস সালাম। ফলে অন্ধকার-প্রকৌষ্ঠ হয়েছিল সূর্যের আলোর থেকেও দীপ্তিমান।
এ হলো সেই রহমত, যা মূসা সন্ধান পেয়েছিলেন একজন জালিমের ঘরে বেড়ে ওঠার সময়। ফলে বাল্যকালে রক্তপিপাসু ফিরআউনের ঘরেও ছিলেন সবচেয়ে নিরাপদ, নিশ্চিন্ত।
এ হলো সেই রহমত, যা ইউনুস পেয়েছিলেন মাছের পেটে বসে। ফলে মৃত্যুর খাদে পড়েও বেঁচে ফিরেছিলেন।
এ হলো সেই রহমত, যার সন্ধান আসহাবে কাহাফের যুবকেরা পেয়েছিল গুহার গভীর অন্ধকারে। ফলে সেই গুহা পরিণত হয়েছিল সর্বোত্তম আশ্রয়কেন্দ্রে।
এ হলো সেই রহমত, যা নসিব হলে দুঃখে-ভরা জীবনে সুখের দেখা মেলে। কষ্টগুলো পাল্টে যায়। আনন্দের বারিধারায় সিক্ত হয় গোটা জীবন। আর পদে-পদে-আসা পরীক্ষাগুলো প্রশান্তিকর মনে হয়।
আল্লাহ তাআলা যদি আপনার দুআ কবুল করেন, তাঁর অগণিত রহমত থেকে একটু দয়া বর্ষণ করেন, তবে আপনি হবেন পৃথিবীর সব থেকে সুখী। একবার নসিব হলে এই রহমত ছিনিয়ে নেবার শক্তি কারও নেই। আল্লাহ বলেন,
مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكُ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
'মানুষের জন্য যে রহমত আল্লাহ উন্মুক্ত করে দেন, তা আটকে রাখবার কেউ নেই। এবং যা তিনি আটকে রাখেন, তা পাঠাবার কেউ নেই। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [৫১]
দয়াময়ের দয়া থেকে বঞ্চিত যারা
এতকিছুর পরেও এমন মানুষ থাকবেই, যারা আল্লাহর দয়া থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে। মানুষগুলো অতি আশাবাদী প্রকৃতির। এরা বোঝে না দয়া পেতে চেষ্টা করতে হয়, সাধনা করতে হয়। সাময়িক সময়ের চেষ্টা-সাধনা করতে তারা অপারগ। ফলে আল্লাহর বিশেষ দয়া থেকে বঞ্চিত থেকে যায় আজীবন। আল্লাহর দয়া পেতে হলে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। চোখের পানি ঝরিয়ে কাঁদতে হয়। ত্যাগের দরিয়া পাড়ি দিতে হয়। এই বিষয়গুলো তারা এড়িয়ে যায়। খুব সম্ভব তারা এই আয়াতটি পড়েনি, যেখানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, কারা তাঁর রহমত পাওয়ার যোগ্য:
وَرَحمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ
'আর আমার অনুগ্রহ সব জিনিসের ওপর পরিব্যপ্ত হয়ে আছে। কাজেই তা আমি এমন লোকদের নামে লিখবে যারা নাফরমানি থেকে দূরে থাকবে, যাকাত দেবে এবং আমার আয়াতের প্রতি ঈমান আনবে।'[৫২]
أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِداً وَقَابِما يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ
'যে ব্যক্তি রাতের প্রহরে সাজদাবনত থাকে এবং দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার রবের দয়া আশা করে (সে কি তার মতো, যে এরূপ করে না)?'[৫৩]
قَالَ يَا قَوْمِ لِمَ تَسْتَعْجِلُونَ بِالسَّيِّئَةِ قَبْلَ الْحَسَنَةِ لَوْلَا تَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
'(সালিহ) বলল, “হে আমার জাতির লোকেরা! ভালোর পূর্বে তোমরা মন্দকে ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ কেন? আল্লাহর কাছে মাগফিরাত চাচ্ছ না কেন? হয়তো তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করা যেতে পারে।[৫৪]
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
'আর তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য করো, যাতে তোমার প্রতি দয়া করা হয়।[৫৫]
ادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ
'তাঁকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।[৫৬]
নিছক আশা দিয়ে দয়া নসিব হয় না। দয়া পেতে কাজে নামতে হয়, কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়, পাপের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও ছেড়ে দিতে হয়। আর আল্লাহ যখন আপনার মধ্যে দৃঢ় ইচ্ছা দেখবেন, তিনি তাঁর অসীম রহমত বর্ষণ করবেন। কাজেই আল্লাহর রহমতের বারিধারায় নিজেকে সিক্ত করুন। আর-রহমানের অসীম দয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।
একটি বার ভাবুন, মুখে সিগারেট রেখে আমরা আল্লাহর দয়া পাবার আশা করতে পারি না। টিভিতে কিংবা ইন্টারনেটে অশ্লীল দৃশ্য দেখার সময়, কিংবা কান দিয়ে হারাম গান শোনার মুহূর্তে আমাদের ওপর আল্লাহ দয়া করবেন, এটাও আমরা আশা করতে পারি না।
সত্যি করে বলুন তো, কীভাবে আমরা তাঁর দয়া আশা করতে পারি? আমরা তো নানান অজুহাত দেখিয়ে পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ এড়িয়ে চলছি! কীভাবে আমরা আল্লাহর দয়া আশা করতে পারি, অথচ পাপের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি!
পাপের দরিয়া ছেড়ে আসার বাসনা সবার হৃদয়েই থাকা উচিত। পাপীদের আড্ডাখানা ছেড়ে আসাটা গুহায় আশ্রয় নেবার সিদ্ধান্তের মতোই। যখন পাপাচার চারিদিক ঘিরে ফেলল, তখন আসহাবে কাহাফের যুবকেরা একে অপরকে বলেছিল:
فَأْوُوا إِلَى الْكَهْفِ يَنْشُرْ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِنْ رَحْمَتِهِ وَيُهَيِّئْ لَكُمْ مِنْ أَمْرِكُمْ مِرفَقًا
'গুহায় আশ্রয় নাও। তা হলে তোমাদের রব তোমাদের জন্য তাঁর রহমত উন্মুক্ত করে দেবেন এবং তোমাদের জন্য তোমাদের জীবনোপকরণের বিষয়টি সহজ করে দেবেন।'[৫৭]
গুহা কোনো আরামের জায়গা নয়। বড়োই অস্বস্তিকর, জনমানবশূন্য, অন্ধকারচ্ছন্ন একটি জায়গার নাম গুহা। তা স্বত্ত্বেও তাদের দৃঢ়-বিশ্বাস, দয়াময়ের অনুগ্রহ একদিন আসবেই। এই কঠিন পরীক্ষা থেকে একদিন নিস্তার মিলবেই। হ্যাঁ, এসেছিল। সত্যিই এসেছিল। এমনভাবে এসেছিল, যা মানব-ইতিহাসকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আর আল্লাহর সাহায্য যখন আসে, এভাবেই আসে।
তাই বলে সবাইকে কি আক্ষরিক অর্থেই গুহায় আশ্রয় নিতে হবে?
না। কারও জন্য গুহায় আশ্রয় নেওয়া মানে হলো অন্তরের অন্তস্তল থেকে তাওবা করা। পাপে জর্জরিত সমাজে দ্বীনদার সঙ্গী খুঁজে পাওয়া, তার সাথে জান্নাতের দিকে ছুটে চলা। কারও জন্য গুহায় আশ্রয় নেওয়া মানে প্রতিদিন কুরআনের সাথে কিছু মুহূর্ত কাটানো, কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। কারও জন্য গুহায় আশ্রয় নেওয়া মানে মাসজিদে যাওয়া, আল্লাহর ঘরের সাথে অন্তর জুড়ে রাখা।
যখন সমাজের সর্বস্তরে পাপ ঢুকে পড়েছিল, তখন নির্মল পরিবেশেও তাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তাওহীদের কথা বলায় আপন মানুষগুলোও শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। তখন আসহাবে কাহাফের যুবকেরা আল্লাহর দয়ার সাক্ষাৎ পেয়েছিল। হ্যাঁ গুহাতেই। তদ্রূপ গুহা কিন্তু আমার আপনার জীবনেও আছে। আপাতদৃষ্টিতে তা গুহা মনে হলেও আসলে সেটি গুহা নয়, মুক্তি!
মুক্তির সেই দরজা আজও খোলা আছে। আল্লাহর রহমত আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। জীবনের কান্নাকে হাসিতে পরিণত করতে এবং দুঃখকে সুখের চাদরে ঢেকে দিতে সে অপেক্ষা করছে। ফিরে আসুন, ফিরে আসুন আর-রহমানের ছায়াতলে...
টিকাঃ
[৩৫] তিরমিযি, ৩৩৬৮; সহীহ
[৩৬] সূরা আ'রাফ, ৭:৫৪
[৩৭] সূরা ত্বহা, ২০:৫
[৩৮] সূরা শুআরা, ৪২: ১৭
[৩৯] সূরা আর-রহমান, ৫৫: ১-২
[৪০] সূরা বাকারাহ, ২: ৬৭
[৪১] সূরা মারইয়াম, ১৯ : ১৮
[৪২] সূরা যুমার, ৩৯: ৪৪
[৪৩] সূরা ত্বহা, ২০: ১০১
[৪৪] সূরা আল-ইসরা, ১৭: ১১০
[৪৫] ইয়াছাউন, ২/২৭৪
[৪৬] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩০
[৪৭] সূরা আর-রহমান, ৫৫: ১-৪
[৪৮] মুখতাসারু সাওয়াইকিল মুরসালাহ, ৩৬৯
[৪৯] সূরা আল ইমরান, ৩ : ১৫৯
[৫০] সূরা আনআম, ৬:৫৪
[৫১] সূরা ফাতির, ৩৫:২
[৫২] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৫৬
[৫৩] সূরা যুমার, ৩৯ : ৯
[৫৪] সূরা নামাল, ২৭:৪৬
[৫৫] সূরা নূর, ২৪:৫৬
[৫৬] সূরা আ'রাফ, ৭:৫৬
[৫৭] সূরা কাহাফ, ১৮:১৬
📄 ইবাদুর রহমান যারা
সদ্য-গ্রাজুয়েশন-সম্পন্ন-করা এক যুবক, দীর্ঘ প্রতিক্ষা শেষে স্বপ্নের চাকরিটা যখন পেয়ে যায়, তার মনে খুব আগ্রহ কাজ করে; জানতে চায় তার বস তার কাছে কী আশা করে।
নতুন দম্পতীর বেলাতেও এমনটা ঘটে। যারা দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের সঙ্গীর জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। সেই প্রিয় মানুষটিকে কাছে পেলে তারা ব্যাকুল হয়ে ওঠে, কীভাবে তাকে খুশি করা যায়!
এগুলো দুনিয়ার মানুষদের সন্তুষ্টি অর্জনে আমাদের আগ্রহের নমুনা। তারা কিন্তু আমাদের সৃষ্টি করেনি আর রিযকও দেয় না। তা হলে একজন বান্দা হিসেবে তার রবকে, তার মালিককে সন্তুষ্ট করার জন্য কী পরিমাণ আগ্রহ থাকা উচিত? অথচ তাঁর হাতেই দুনিয়া এবং আখিরাত—উভয় জাহানের সফলতার চাবি।
সত্যি বলতে কী, স্রেফ আমলের জোরে আল্লাহর সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি এবং তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব নয় কারও পক্ষেই। তা হলে আমরা কীভাবে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারব? কী করলে তিনি আমার প্রতি রাজি-খুশি হবেন?
আল্লাহ তাআলা গোপন রাখেননি। যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তাদের পুরস্কার আমি পাঠকদের কল্পনার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। আজ শুধু আমরা সেসব বান্দাদের বৈশিষ্ট্য জানবো, যাদের কথা সূরা ফুরকানে এসেছে। আল্লাহ তাআলা তাদের নাম দিয়েছেন 'ইবাদুর-রহমান' অর্থাৎ রহমানের বান্দাগণ।
চলুন, আমরা রহমানের প্রকৃত বান্দাদের সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করি।
১) বিনয় চলে তাদের পায়ে পায়ে
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আর-রহমানের বান্দা তারাই, যারা জমিনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে।[৫৮]
আপনি বলতে পারেন, এখানে বিশেষ শ্রেণীর মানুষদের কথা বলা হচ্ছে। তারা হাঁটার সময় সচেতন থাকে। শুধু কি এতটুকুই? না, বরং তাদের হাঁটায় থাকে না দাম্ভিকতার ছাপ। তারা দুনিয়ার বিষয়সমূহকে গ্রহণ করে নম্রতার সাথে। এই অনুধাবন নিয়ে তারা তারা জমিনে হাঁটছে, আল্লাহর দেওয়া অক্সিজেনে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। যানবাহন, নিজেদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবকিছুকে 'আল্লাহ ধার দিয়েছেন', এভাবেই তারা চিন্তা করে।
লুকমান তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, 'জমিনে দম্ভভরে চলো না। তুমি জমিনকে চিরে ফেলতেও পারবে না, পাহাড়ের উচ্চতাতেও পৌঁছোতে পারবে না।[৫৯]
রাসূল বলেন, 'একবার (পূর্ববর্তী উম্মতের) এক ব্যক্তি একজোড়া পোশাক পরে, চুল পরিপাটি করে অহংকারের সাথে চলাফেরা করছিল। এমন সময় আল্লাহ তার (পায়ের নিচের মাটিকে) ধসিয়ে দিলেন। সুতরাং সে কিয়ামাত-দিবস পর্যন্ত মাটির নিচে যেতেই থাকবে। [৬০]
রহমানের সত্যিকারের বান্দারা আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় উপলব্ধি করতে পারে। আর এর প্রভাব তাদের চলাফেরাতেও ফুটে ওঠে।
২) ক্রোধের মুখেও লাগাম ছুটে না তাদের
আল্লাহ বলেন, '..এবং তাদেরকে যখন মূর্খরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, "সালাম।”।[৬১]
রহমানের বান্দারা অজ্ঞদের সাথে মূর্খসুলভ আচরণ করে না। অপমানের জবাবে অপমান করে না। বরং বৃহত্তর কল্যাণের কথা মাথায় রেখে সংযমের পথ অবলম্বন করে। একবার আবুদ দারদা -কে এক ব্যক্তি অপমানসূচক কথা বলল। তিনি জবাব দিলেন,
'হে অমুক! আমাকে গালি দিতে দিতে বিরক্ত হয়ে যেয়ো না, সংশোধনের পথটাও খোলা রেখো। শুনো, যে আমার জন্য আল্লাহর অবাধ্য হয় আমি তার জবাব আল্লাহর আনুগত্যের দ্বারা দিই।'
আরেকবার ইমাম শা'বি -কে এক ব্যক্তি অপমান করে। তিনি উত্তর দেন, 'তুমি যা বললে আমি যদি তা হয়ে থাকি, আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করেন। আর যদি আমি না হয়ে থাকি, তা হলে দুআ করছি তিনি যেন তোমাকে ক্ষমা করে দেন।'
এক ব্যক্তি দিরার ইবনু কা'কা -কে বলল, 'আল্লাহর শপথ, আপনি যদি একটা বলেন, আমি এর উত্তরে দশটা পাল্টা জবাব দেব।'
তিনি উত্তর দিলেন, 'আল্লাহর শপথ, তুমি যদি দশটা বলো, আমি একটারও পাল্টা জবাব দেব না।'
এই দুনিয়াতে চলতে-ফিরতে একজন মুমিনকে অনেককিছুই স্মরণে রাখতে হয়। কারণ, সে আল্লাহর পথের পথিক। তার অন্তরে কারও অপমান ঢোকার জায়গা নেই। তাদের নিয়ে ভাবারও সময় নেই। জীবনকে সে একটা বাজারের মতো করে দেখে। খানিক বাদেই তা বন্ধ হয়ে যাবে। এখানে কেউ লাভ করে ফিরে, কেউ-বা সব খুইয়ে।
৩) কিয়ামুল লাইল তাদের পরিচয়
রাতের আঁধারে রহমানের বান্দারা কেমন? মানুষ যখন নরম বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন রুকু, সাজদায়, আল্লাহর দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে রাত কাটায়।
আল্লাহ বলেন, 'এবং যারা রাত অতিবাহিত করে তাদের রবের উদ্দেশ্যে সাজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে।[৬২]
মদীনায় পৌঁছে রাসূল সর্বপ্রথম এই দাওয়াহ দিয়েছিলেন, 'হে মানবসকল! মানুষদের খাওয়াও, এবং সালাম ছড়িয়ে দাও, আত্মীয়তার সম্পর্ক ধরে রাখো, এবং রাতে সালাত আদায় করো যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। তা হলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' [৬৩]
কিয়াম হলো আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া। এটা কীভাবে সম্ভব, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ডাকছেন অথচ আপনি তাঁর ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না? আপনার সহকর্মী, অফিসের বস কিংবা বন্ধু যদি আপনাকে ফোনকল অথবা মেসেজ দিত, তবে কি আপনি এর উত্তর দিতেন না? অবশ্যই দিতেন। তারা যে আপনার খোঁজখবর নিচ্ছে, এটা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতেন। তা হলে আল্লাহর ডাকে কেন সাডা দেবেন না? আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِذَا كَانَ شَطْرُ اللَّيْلِ نَزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُوْلُ هَلْ مِنْ سَابِلٍ فَأُعْطِيَهُ هَلْ مِنْ دَاعٍ فَأُسْتَجِيبُ لَهُ هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأُغْفِرُ لَهُ
'আল্লাহ তাআলা প্রতিরাতে রাতের তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন-কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে এমন, যে আমার কাছে চাইবে আর আমি তাকে তা দেব? কে আছে এমন, যে কিনা আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করব?'[৬৪]
আল্লাহ তাআলা আমাদের ডাকছেন। জানতে চাচ্ছেন-কার কী প্রয়োজন আছে। অথচ এ সময় মানুষ গভীর ঘুমে নাক ডাকতে থাকে। আল্লাহর ডাকে সারা দেবার কোনো প্রয়োজনই বোধ করে না। আফসোস আমাদের জন্য। অথচ সালাফ আস-সালিহীনদের কাছে তাহাজ্জুদ ছিল প্রথম সারির ইবাদাত। এর মাধ্যমে তারা অন্তরে তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করতেন। রাতের সালাত আদায় করতে না পারলে তারা বলতেন, 'হে আল্লাহ! আমাকে রাতের সালাত আদায়ের তাওফিক দিন। আর এটা যদি আমার তাকদিরে না লেখা থাকে, তবে আমাকে দুনিয়ার বুক থেকে উঠিয়ে নিন।'
তাহাজ্জুদকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে। এটা খুবই জরুরি। নিজের যত প্রয়োজন আছে, সেগুলো গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে পেশ করতে হবে। সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে কথা বলতে হবে। শেষরাতে আল্লাহ যখন বান্দার সবচেয়ে কাছে চলে আসেন, তখন তাঁর হামদ ও তাসবীহ পাঠ করতে হবে। তবেই আমাদের জীবন সুন্দর হবে। আর রহমানের বান্দা হিসেবে কিয়ামাতের দিন আমরা বিশেষ মর্যাদা লাভ করব ইন শা আল্লাহ।
৪) দুআয় তারা অনন্য
আল্লাহ বলেন, 'এবং যারা বলে, "আমাদের রব, আপনি আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি হটিয়ে দিন, তার শাস্তি তো নিশ্চিতভাবে ধ্বংসাত্মক।"'।[৬৫]
রহমানের বান্দাদের দুআ কেবল দুনিয়াকে ঘিরে হয় না। বরং প্রত্যেক দুআয় তারা আল্লাহর কাছে ভয়াবহ আযাব থেকে পানাহ চায়। জাহান্নামের হিংস্রতা থেকে আশ্রয় চায়। তারা যদিও ধার্মিক, তাহাজ্জুদগুজার ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী, তবুও তারা আশঙ্কা করতে থাকে—'হয়তো আমি জান্নাতে পৌঁছোতে পারব না।' তারা অল্প আমল করেই আত্মতুষ্টিতে ভোগে না।
আবদুল্লাহ ইবনু শিখখির বলেন, 'আমি রাসূল ﷺ-এর নিকট গেলাম, তিনি তখন সালাত আদায় করছিলেন। তখন কান্নার ফলে তাঁর বুক থেকে যে শব্দ বের হচ্ছিল, তা ফুটন্ত পানির মতো শোনাচ্ছিল।[৬৬]
৫) তাদের দানে অপচয় থাকে না
'এবং যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না, আর তাদের পন্থা হয় এই দুয়ের মধ্যবর্তী।।[৬৭]
রহমানের বান্দারা সর্বদা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে চলে; এমনকি দানের বেলাতেও। মুজাহিদ বলেন, 'তুমি এক পর্বত সমতুল্য সোনাও যদি আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করো, এটা অপচয় হবে না। আর আল্লাহর অবাধ্যতায় কয়েক মুষ্টিও যদি ব্যয় করো, তা হবে নির্ঘাত অপচয়।[৬৮]
ইবনু যাইদ বলেন, 'কৃপণতা হচ্ছে—যখন ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করা হতে বিরত থাকে।'
রহমানের সত্যিকারের বান্দারা নিজেদের যাকাত দ্রুত আদায় করে, উত্তম কাজে সম্পদ দ্রুত ব্যয় করে। পরিবার এবং অধীনস্থদের পেছনে প্রয়োজন-অনুপাতে ব্যয় করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। অপরদিকে একটি টাকা কিংবা এর চেয়েও কম পরিমাণ অর্থ হারাম পথে ব্যয় করাকে অপচয় গণ্য করে। সুদী কারবারে এক টাকা লাগানোকেও নিন্দনীয় দৃষ্টিতে দেখে। তবে রহমানের সত্যিকারের বান্দাগণ কেবল হারাম পথেই নয়, বরং হালাল পথেও অপব্যয় করা হতে বিরত থাকে।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'অপচয়কারী হবার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট, ব্যক্তির যখন যা ইচ্ছে করবে, সে কিনবে আর খাবে।[৬৯]
৬) তারা পাপ থেকে দূরে থাকে
'তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রাণকে হারাম করেছেন কোনো সংগত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। এসব যে-ই করে সে তার গোনাহের শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামাতের দিন তাকে উপর্যুপরি শাস্তি দেওয়া হবে এবং সেখানেই সে পড়ে থাকবে চিরকাল লাঞ্ছিত অবস্থায়। [৭০]
মোদ্দা কথা, তারা কবিরা গুনাহের ব্যাপারে সদা সতর্ক। পাশাপাশি ছগিরা গুনাহ থেকেও যথাসম্ভব দূরে থাকে।
একবার রাসূল -কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়ো?' তিনি বলেন, 'তুমি আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করবে, অথচ তিনি তোমার স্রষ্টা।' এরপর কোনটা? তিনি বললেন, 'তোমার খাবার খেয়ে ফেলবে এই ভয়ে সন্তানকে হত্যা করা।' তারপর? 'প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যিনা করা।' বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, 'এরপর ওপরের আয়াতগুলো নাযিল হয়। [৭১]
পাঠক হয়তো ভাবছেন, 'আমি তো এসব পাপের মধ্যে কিছু পাপ ইতিমধ্যে করে ফেলেছি! এখন এই শাস্তি থেকে পরিত্রাণের উপায় আছে কী? দ্বিগুণ শাস্তি নিয়ে আমার খুব ভয় হচ্ছে।'
উত্তরটি এর পরের আয়াতেই আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন, 'তারা ব্যতীত যারা তাওবা করে এবং ঈমান আনে ও নেক আমল করে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে নেক আমল দ্বারা পাল্টে দেবেন। আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।' [৭২]
'আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে নেক আমল দ্বারা পাল্টে দেবেন'-এই কথার অর্থ কী? মুফাসসিরদের একাধিক মত বর্ণিত রয়েছে।
সাহাবি ইবনু আব্বাস, হাসান বাসরি এবং অন্যরা বলেছেন, 'পাপের বদলে আল্লাহ তাদের নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবেন এবং তাদের খারাপ গুণগুলো ভালো গুণ দ্বারা পাল্টে দেবেন।' কেউ আবার আয়াতের আক্ষরিক অর্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাদের কৃত-পাপসমূহ নেক আমলে পাল্টে দেবেন।
রাসূল বলেন, '(কিয়ামাতের দিন) এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করে বলা হবে: তার ছগিরা গুনাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করো এবং কবিরা গুনাহগুলো গোপন রাখো। তাকে বলা হবে, তুমি অমুক অমুক দিন এই এই পাপ করেছ। অতঃপর তাকে বলা হবে, আমরা তোমার এই পাপগুলোকে ভালো আমলে পাল্টে দিচ্ছি। তখন সে ব্যক্তি বলে উঠবে, আমার রব, আমি তো আরও পাপ করেছি। সেগুলো এখানে দেখতে পাচ্ছি না!' বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর রাসূল হেসে দিলেন। এমনকি তাঁর মাড়ির দাঁতও দেখা যাচ্ছিল।[৭৩]
৭) পাপ কাজে হয় না কারও সঙ্গী
'(আর রহমানের বান্দা হচ্ছে তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং কোনো বাজে জিনিসের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকলে ভদ্রলোকের মতো অতিক্রম করে যায়।[৭৪]
টেলিভিশন, কম্পিউটার-মোবাইলের পর্দায়, কিংবা বন্ধুর সাথে একান্ত আলাপনে মিথ্যা বা অমার্জিত কিছু শুনলে রহমানের সত্যিকারের বান্দারা দ্রুত কেটে পড়ে। নিজেদের মর্যাদা রক্ষার্থে দূরে সরে যায়। এগুলো আমলে নেয় না।
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, '... কোনো বাজে জিনিসের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকলে ভদ্রলোকের মতো অতিক্রম করে যায়।' অর্থাৎ তারা এসবে মন দেয় না, এগুলো এড়িয়ে চলে।
৮) কুরআনের সাথে জুড়ে থাকে মন
'তাদের যদি তাদের রবের আয়াত শুনিয়ে উপদেশ দেওয়া হয়, তা হলে তারা তার প্রতি অন্ধ বধির হয়ে থাকে না।[৭৫]
তাদের জীবনে পরিলক্ষিত হয় কুরআনের অভূতপূর্ব প্রভাব। তারা গানের মতো করে কুরআন তিলাওয়াত করে না, কিংবা পত্রিকার মতো এক নিঃশ্বাসে পড়ে যায় না। ধীরে ধীরে পড়ে, অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। ফলে তাদের চোখ হয় অশ্রুসিক্ত এবং জীবনে আসে অকৃত্রিম পরিবর্তন। তাদের এই কুরআন তিলাওয়াত পাল্টে দেয় অন্যদেরও। আল্লাহ তাআলা বলেন,
'মুমিন তো কেবল তারাই, আল্লাহর আয়াত স্মরণ করিয়ে দিলে যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, এবং যখন তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। আর তারা শুধু তাদের রবের ওপরেই তাওয়াক্কুল করে।'[৭৬]
৯) শুধু নিজের কথাই ভাবে না
'তারা প্রার্থনা করে থাকে, “হে আমাদের রব, আমাদের নিজেদের স্ত্রীদের ও নিজেদের সন্তানদেরকে, চক্ষুশীতলকারী বানাও এবং আমাদের করে দাও মুত্তাকিদের ইমাম।”[৭৭]
রহমানের সত্যিকারের বান্দারা আশা করে, তাদের উত্তরসূরিরা দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে তাদের জন্য হবে চোখজুড়ানো প্রশান্তির। সন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি, সহায়-সম্পদ এবং দুনিয়াবি সফলতা-এগুলো তাদের কাছে মানদণ্ড নয়। বরং সন্তানকে নেককার, মুত্তাকী দেখতে চায়, আল্লাহর ইবাদাতগুজার এবং তাঁর পথের দাঈ হিসেবে দেখতে চায় তারা। এটাই তাদের কাছে চোখজুড়ানো প্রশান্তি, কুররাতু আইয়ুন।
সেই সাথে শুধু স্ত্রী-সন্তানের জন্য দুআ করেই ক্ষান্ত হয় না, তারা নিজেদেরকেও দ্বীন ইসলামের আলোকে একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বরূপে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর; যাতে ইন্তেকালের পরও তাদের সাওয়াবের রাস্তা বন্ধ না হয়।
রাসূল বলেন, 'আদম-সন্তান যখন মারা যায়, তিনটি বিষয় ব্যতীত তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়: (১) সদাকায়ে জারিয়াহ (অর্থাৎ যে দানের ফলে তার মৃত্যুর পরেও অন্যরা উপকৃত হয়); (২) উপকারী ইলম (অর্থাৎ যে ইলম সে শিখিয়ে গেছে মানবকল্যাণে); (৩) নেক সন্তান, যে কিনা তার জন্য দুআ করে।'[৭৮]
১০) তাদের জন্য আল্লাহর অসীম পুরস্কার
উৎকৃষ্ট গুণসমূহ অর্জনে নিরলস পরিশ্রমের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাদের কাঙ্ক্ষিত পুরষ্কার দেবেন, বরং তাদের কল্পনার চেয়েও বেশি দেবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তারাই, যাদেরকে প্রতিদান হিসেবে দেওয়া হবে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ, যেহেতু তারা ছিল ধৈর্যশীল। এবং তাদেরকে সেখানে অভিবাদন ও সালাম-সহকারে অভ্যর্থনা জানানো হবে। সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। আশ্রয়স্থল ও বাসস্থান হিসেবে তা কতই-না উৎকৃষ্ট![৭৯]
আল্লাহর নির্দেশ পালনে রহমানের বান্দারা ধৈর্যের পরিচয় দেয়। হারাম বিষয় থেকে বিরত থাকে। নফসের তাবেদারি করে না। একমাত্র আল্লাহর হুকুমের সামনে নিজের ইচ্ছাকে ছেড়ে দেয়। এমন কর্মের প্রতিদান জান্নাতের চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে?
'(জান্নাতে) তোমরা থাকবে সদা জীবিত, মৃত্যু তোমাদের কখনও গ্রাস করবে না। এবং তোমরা থাকবে সদা সুস্থ, অসুস্থতা তোমাদের কখনও স্পর্শ করবে না। তোমরা হবে চির-যৌবনের অধিকারী, বার্ধক্য তোমাদের পেয়ে বসবে না। এবং তোমরা থাকবে সন্তুষ্ট, হতাশা কখনও স্পর্শ করবে না।'[৮০]
নবি বলেন, জান্নাতবাসীরা তাদের ওপরের স্তরের বাসিন্দাদের এমনভাবে দেখতে পাবে, যেমনটা তোমরা পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের দীপ্তিমান নক্ষত্রকে দেখতে পাও। এটা হবে তাদের মর্যাদাগত পার্থ্যকের কারণে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, ওটা তো নবিদের জায়গা। তাঁরা ব্যতীত কেউই তো সেখানে পৌঁছোতে পারবে না। নবি বললেন, হ্যাঁ। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! (ওসব লোকেরাও সেখানে পৌঁছে যাবে), যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং রাসূলগণকে সত্য বলে মেনে নেবে।[৮১]
অবশ্যই, যারা মনের তীব্র আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি কঠোর সাধনা করে, তাদের জন্যই এমন সম্মানজনক স্থান। তারাই হচ্ছে সত্যিকারার্থে রহমানের বান্দা-ইবাদুর রহমান।
হে আল্লাহ, আমরা ঈমান এনেছি আপনার ওপর, আপনার নবি-রাসূলদের সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছি এবং তাদের শেখানো পথেই নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছি। অতএব আল্লাহ, আমাদেরকে ও আমাদের পরিবারকে এমন সম্মানজনক স্থান প্রদান করুন যার ওয়াদা আপনি দিয়েছেন, আমাদেরকে আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। ইয়া রহমান!
টিকাঃ
[৫৮] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৩
[৫৯] সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭: ৩৭
[৬০] বুখারি: ৫৭৮১
[৬১] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৩
[৬২] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৪
[৬৩] তিরমিযি, ২৪৮৭
[৬৪] আস-সুন্নাহ: ১০৮৯; আশ-শারীআত: ৭০১; আন-নুযুল: ১২
[৬৫] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৫
[৬৬] আবূ দাউদ, ১০৪; সহীহ
[৬৭] সূরা আল-ফুরকান, ২৫ : ৬৭
[৬৮] তাফসীর আত-তাবারি, ১৭/৪৯৮
[৬৯] তাফসীর আল-কুরতুবি, ১৩/৭৩
[৭০] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৮-৬৯
[৭১] বুখারি, ৭৫৩২
[৭২] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭০
[৭৩] মুসলিম, ১৯০
[৭৪] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭২
[৭৫] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭৩।
[৭৬] সূরা আল-আনফাল, ৮:২
[৭৭] সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪
[৭৮] মুসলিম, ১৬৩১
[৭৯] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭৫-৭৬
[৮০] মুসলিম, ২৮৩৭
[৮১] বুখারি, ৩২৫৬
সদ্য-গ্রাজুয়েশন-সম্পন্ন-করা এক যুবক, দীর্ঘ প্রতিক্ষা শেষে স্বপ্নের চাকরিটা যখন পেয়ে যায়, তার মনে খুব আগ্রহ কাজ করে; জানতে চায় তার বস তার কাছে কী আশা করে।
নতুন দম্পতীর বেলাতেও এমনটা ঘটে। যারা দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের সঙ্গীর জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। সেই প্রিয় মানুষটিকে কাছে পেলে তারা ব্যাকুল হয়ে ওঠে, কীভাবে তাকে খুশি করা যায়!
এগুলো দুনিয়ার মানুষদের সন্তুষ্টি অর্জনে আমাদের আগ্রহের নমুনা। তারা কিন্তু আমাদের সৃষ্টি করেনি আর রিযকও দেয় না। তা হলে একজন বান্দা হিসেবে তার রবকে, তার মালিককে সন্তুষ্ট করার জন্য কী পরিমাণ আগ্রহ থাকা উচিত? অথচ তাঁর হাতেই দুনিয়া এবং আখিরাত—উভয় জাহানের সফলতার চাবি।
সত্যি বলতে কী, স্রেফ আমলের জোরে আল্লাহর সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি এবং তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব নয় কারও পক্ষেই। তা হলে আমরা কীভাবে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারব? কী করলে তিনি আমার প্রতি রাজি-খুশি হবেন?
আল্লাহ তাআলা গোপন রাখেননি। যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তাদের পুরস্কার আমি পাঠকদের কল্পনার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। আজ শুধু আমরা সেসব বান্দাদের বৈশিষ্ট্য জানবো, যাদের কথা সূরা ফুরকানে এসেছে। আল্লাহ তাআলা তাদের নাম দিয়েছেন 'ইবাদুর-রহমান' অর্থাৎ রহমানের বান্দাগণ।
চলুন, আমরা রহমানের প্রকৃত বান্দাদের সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করি।
১) বিনয় চলে তাদের পায়ে পায়ে
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আর-রহমানের বান্দা তারাই, যারা জমিনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে।
আপনি বলতে পারেন, এখানে বিশেষ শ্রেণীর মানুষদের কথা বলা হচ্ছে। তারা হাঁটার সময় সচেতন থাকে। শুধু কি এতটুকুই? না, বরং তাদের হাঁটায় থাকে না দাম্ভিকতার ছাপ। তারা দুনিয়ার বিষয়সমূহকে গ্রহণ করে নম্রতার সাথে। এই অনুধাবন নিয়ে তারা আল্লাহর জমিনে হাঁটছে, আল্লাহর দেওয়া অক্সিজেনে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। যানবাহন, নিজেদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবকিছুকে 'আল্লাহ ধার দিয়েছেন', এভাবেই তারা চিন্তা করে।
লুকমান তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, 'জমিনে দম্ভভরে চলো না। তুমি জমিনকে চিরে ফেলতেও পারবে না, পাহাড়ের উচ্চতাতেও পৌঁছোতে পারবে না।[১]
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'একবার (পূর্ববর্তী উম্মতের) এক ব্যক্তি একজোড়া পোশাক পরে, চুল পরিপাটি করে অহংকারের সাথে চলাফেরা করছিল। এমন সময় আল্লাহ তার (পায়ের নিচের মাটিকে) ধসিয়ে দিলেন। সুতরাং সে কিয়ামাত-দিবস পর্যন্ত মাটির নিচে যেতেই থাকবে। [২]
রহমানের সত্যিকারের বান্দারা আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় উপলব্ধি করতে পারে। আর এর প্রভাব তাদের চলাফেরাতেও ফুটে ওঠে।
২) ক্রোধের মুখেও লাগাম ছুটে না তাদের
আল্লাহ বলেন, '..এবং তাদেরকে যখন মূর্খরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, "সালাম।”।[৩]
রহমানের বান্দারা অজ্ঞদের সাথে মূর্খসুলভ আচরণ করে না। অপমানের জবাবে অপমান করে না। বরং বৃহত্তর কল্যাণের কথা মাথায় রেখে সংযমের পথ অবলম্বন করে। একবার আবুদ দারদা (রা) -কে এক ব্যক্তি অপমানসূচক কথা বলল। তিনি জবাব দিলেন, 'হে অমুক! আমাকে গালি দিতে দিতে বিরক্ত হয়ে যেয়ো না, সংশোধনের পথটাও খোলা রেখো। শুনো, যে আমার জন্য আল্লাহর অবাধ্য হয় আমি তার জবাব আল্লাহর আনুগত্যের দ্বারা দিই।'
আরেকবার ইমাম শা'বি -কে এক ব্যক্তি অপমান করে। তিনি উত্তর দেন, 'তুমি যা বললে আমি যদি তা হয়ে থাকি, আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করেন। আর যদি আমি না হয়ে থাকি, তা হলে দুআ করছি তিনি যেন তোমাকে ক্ষমা করে দেন।'
এক ব্যক্তি দিরার ইবনু কা'কা -কে বলল, 'আল্লাহর শপথ, আপনি যদি একটা বলেন, আমি এর উত্তরে দশটা পাল্টা জবাব দেব।'
তিনি উত্তর দিলেন, 'আল্লাহর শপথ, তুমি যদি দশটা বলো, আমি একটারও পাল্টা জবাব দেব না।'
এই দুনিয়াতে চলতে-ফিরতে একজন মুমিনকে অনেককিছুই স্মরণে রাখতে হয়। কারণ, সে আল্লাহর পথের পথিক। তার অন্তরে কারও অপমান ঢোকার জায়গা নেই। তাদের নিয়ে ভাবারও সময় নেই। জীবনকে সে একটা বাজারের মতো করে দেখে। খানিক বাদেই তা বন্ধ হয়ে যাবে। এখানে কেউ লাভ করে ফিরে, কেউ-বা সব খুইয়ে।
৩) কিয়ামুল লাইল তাদের পরিচয়
রাতের আঁধারে রহমানের বান্দারা কেমন? মানুষ যখন নরম বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন রুকু, সাজদায়, আল্লাহর দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে রাত কাটায়।
আল্লাহ বলেন, 'এবং যারা রাত অতিবাহিত করে তাদের রবের উদ্দেশ্যে সাজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে।' [৪]
মদীনায় পৌঁছে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম এই দাওয়াহ দিয়েছিলেন, 'হে মানবসকল! মানুষদের খাওয়াও, এবং সালাম ছড়িয়ে দাও, আত্মীয়তার সম্পর্ক ধরে রাখো, এবং রাতে সালাত আদায় করো যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। তা হলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' [৫]
কিয়াম হলো আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া। এটা কীভাবে সম্ভব, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ডাকছেন অথচ আপনি তাঁর ডাকে সাড়া দিবেন না? আপনার সহকর্মী, অফিসের বস কিংবা বন্ধু যদি আপনাকে ফোনকল অথবা মেসেজ দিত, তবে কি আপনি এর উত্তর দিতেন না? অবশ্যই দিতেন। তারা যে আপনার খোঁজখবর নিচ্ছে, এটা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতেন। তা হলে আল্লাহর ডাকে কেন সাডা দেবেন না? আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا كَانَ شَطْرُ اللَّيْلِ نَزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُوْلُ هَلْ مِنْ سَابِلٍ فَأُعْطِيَهُ هَلْ مِنْ دَاعٍ فَأُسْتَجِيبُ لَهُ هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأُغْفِرُ لَهُ
'আল্লাহ তাআলা প্রতিরাতে রাতের তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন-কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে এমন, যে আমার কাছে চাইবে আর আমি তাকে তা দেব? কে আছে এমন, যে কিনা আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করব?'[৬]
আল্লাহ তাআলা আমাদের ডাকছেন। জানতে চাচ্ছেন-কার কী প্রয়োজন আছে। অথচ এ সময় মানুষ গভীর ঘুমে নাক ডাকতে থাকে। আল্লাহর ডাকে সারা দেবার কোনো প্রয়োজনই বোধ করে না। আফসোস আমাদের জন্য। অথচ সালাফ আস-সালিহীনদের কাছে তাহাজ্জুদ ছিল প্রথম সারির ইবাদাত। এর মাধ্যমে তারা অন্তরে তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করতেন। রাতের সালাত আদায় করতে না পারলে তারা বলতেন, 'হে আল্লাহ! আমাকে রাতের সালাত আদায়ের তাওফিক দিন। আর এটা যদি আমার তাকদিরে না লেখা থাকে, তবে আমাকে দুনিয়ার বুক থেকে উঠিয়ে নিন।'
তাহাজ্জুদকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে। এটা খুবই জরুরি। নিজের যত প্রয়োজন আছে, সেগুলো গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে পেশ করতে হবে। সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে কথা বলতে হবে। শেষরাতে আল্লাহ যখন বান্দার সবচেয়ে কাছে চলে আসেন, তখন তাঁর হামদ ও তাসবীহ পাঠ করতে হবে। তবেই আমাদের জীবন সুন্দর হবে। আর রহমানের বান্দা হিসেবে কিয়ামাতের দিন আমরা বিশেষ মর্যাদা লাভ করব ইন শা আল্লাহ।
৪) দুআয় তারা অনন্য
আল্লাহ বলেন, 'এবং যারা বলে, "আমাদের রব, আপনি আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি হটিয়ে দিন, তার শাস্তি তো নিশ্চিতভাবে ধ্বংসাত্মক।"'।[৭]
রহমানের বান্দাদের দুআ কেবল দুনিয়াকে ঘিরে হয় না। বরং প্রত্যেক দুআয় তারা আল্লাহর কাছে ভয়াবহ আযাব থেকে পানাহ চায়। জাহান্নামের হিংস্রতা থেকে আশ্রয় চায়। তারা যদিও ধার্মিক, তাহাজ্জুদগুজার ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী, তবুও তারা আশঙ্কা করতে থাকে—'হয়তো আমি জান্নাতে পৌঁছোতে পারব না।' তারা অল্প আমল করেই আত্মতুষ্টিতে ভোগে না।
আবদুল্লাহ ইবনু শিখখির বলেন, 'আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট গেলাম, তিনি তখন সালাত আদায় করছিলেন। তখন কান্নার ফলে তাঁর বুক থেকে যে শব্দ বের হচ্ছিল, তা ফুটন্ত পানির মতো শোনাচ্ছিল।[৮]
৫) তাদের দানে অপচয় থাকে না
'এবং যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না, আর তাদের পন্থা হয় এই দুয়ের মধ্যবর্তী।।[৯]
রহমানের বান্দারা সর্বদা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে চলে; এমনকি দানের বেলাতেও। মুজাহিদ বলেন, 'তুমি এক পর্বত সমতুল্য সোনাও যদি আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করো, এটা অপচয় হবে না। আর আল্লাহর অবাধ্যতায় কয়েক মুষ্টিও যদি ব্যয় করো, তা হবে নির্ঘাত অপচয়।[১০]
ইবনু যাইদ বলেন, 'কৃপণতা হচ্ছে—যখন ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করা হতে বিরত থাকে।'
রহমানের সত্যিকারের বান্দারা নিজেদের যাকাত দ্রুত আদায় করে, উত্তম কাজে সম্পদ দ্রুত ব্যয় করে। পরিবার এবং অধীনস্থদের পেছনে প্রয়োজন-অনুপাতে ব্যয় করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। অপরদিকে একটি টাকা কিংবা এর চেয়েও কম পরিমাণ অর্থ হারাম পথে ব্যয় করাকে অপচয় গণ্য করে। সুদী কারবারে এক টাকা লাগানোকেও নিন্দনীয় দৃষ্টিতে দেখে। তবে রহমানের সত্যিকারের বান্দাগণ কেবল হারাম পথেই নয়, বরং হালাল পথেও অপব্যয় করা হতে বিরত থাকে।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'অপচয়কারী হবার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট, ব্যক্তির যখন যা ইচ্ছে করবে, সে কিনবে আর খাবে।[১১]
৬) তারা পাপ থেকে দূরে থাকে
'তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রাণকে হারাম করেছেন কোনো সংগত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। এসব যে-ই করে সে তার গোনাহের শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামাতের দিন তাকে উপর্যুপরি শাস্তি দেওয়া হবে এবং সেখানেই সে পড়ে থাকবে চিরকাল লাঞ্ছিত অবস্থায়। [১২]
মোদ্দা কথা, তারা কবিরা গুনাহের ব্যাপারে সদা সতর্ক। পাশাপাশি ছগিরা গুনাহ থেকেও যথাসম্মব দূরে থাকে।
একবার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়ো?' তিনি বলেন, 'তুমি আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করবে, অথচ তিনি তোমার স্রষ্টা।' এরপর কোনটা? তিনি বললেন, 'তোমার খাবার খেয়ে ফেলবে এই ভয়ে সন্তানকে হত্যা করা।' তারপর? 'প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যিনা করা।' বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, 'এরপর ওপরের আয়াতগুলো নাযিল হয়। [১৩]
পাঠক হয়তো ভাবছেন, 'আমি তো এসব পাপের মধ্যে কিছু পাপ ইতিমধ্যে করে ফেলেছি! এখন এই শাস্তি থেকে পরিত্রাণের উপায় আছে কী? দ্বিগুণ শাস্তি নিয়ে আমার খুব ভয় হচ্ছে।'
উত্তরটি এর পরের আয়াতেই আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন, 'তারা ব্যতীত যারা তাওবা করে এবং ঈমান আনে ও নেক আমল করে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে নেক আমল দ্বারা পাল্টে দেবেন। আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।' [১৪]
'আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে নেক আমল দ্বারা পাল্টে দেবেন'-এই কথার অর্থ কী? মুফাসসিরদের একাধিক মত বর্ণিত রয়েছে।
সাহাবি ইবনু আব্বাস, হাসান বাসরি এবং অন্যরা বলেছেন, 'পাপের বদলে আল্লাহ তাদের নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবেন এবং তাদের খারাপ গুণগুলো ভালো গুণ দ্বারা পাল্টে দেবেন।' কেউ আবার আয়াতের আক্ষরিক অর্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাদের কৃত-পাপসমূহ নেক আমলে পাল্টে দেবেন।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, '(কিয়ামাতের দিন) এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করে বলা হবে: তার ছগিরা গুনাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করো এবং কবিরা গুনাহগুলো গোপন রাখো। তাকে বলা হবে, তুমি অমুক অমুক দিন এই এই পাপ করেছ। অতঃপর তাকে বলা হবে, আমরা তোমার এই পাপগুলোকে ভালো আমলে পাল্টে দিচ্ছি। তখন সে ব্যক্তি বলে উঠবে, আমার রব, আমি তো আরও পাপ করেছি। সেগুলো এখানে দেখতে পাচ্ছি না!' বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিলেন। এমনকি তাঁর মাড়ির দাঁতও দেখা যাচ্ছিল।[১৫]
৭) পাপ কাজে হয় না কারও সঙ্গী
'(আর রহমানের বান্দা হচ্ছে তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং কোনো বাজে জিনিসের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকলে ভদ্রলোকের মতো অতিক্রম করে যায়।[১৬]
টেলিভিশন, কম্পিউটার-মোবাইলের পর্দায়, কিংবা বন্ধুর সাথে একান্ত আলাপনে মিথ্যা বা অমার্জিত কিছু শুনলে রহমানের সত্যিকারের বান্দারা দ্রুত কেটে পড়ে। নিজেদের মর্যাদা রক্ষার্থে দূরে সরে যায়। এগুলো আমলে নেয় না।
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, '... কোনো বাজে জিনিসের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকলে ভদ্রলোকের মতো অতিক্রম করে যায়।' অর্থাৎ তারা এসবে মন দেয় না, এগুলো এড়িয়ে চলে।
৮) কুরআনের সাথে জুড়ে থাকে মন
'তাদের যদি তাদের রবের আয়াত শুনিয়ে উপদেশ দেওয়া হয়, তা হলে তারা তার প্রতি অন্ধ বধির হয়ে থাকে না।[১৭]
তাদের জীবনে পরিলক্ষিত হয় কুরআনের অভূতপূর্ব প্রভাব। তারা গানের মতো করে কুরআন তিলাওয়াত করে না, কিংবা পত্রিকার মতো এক নিঃশ্বাসে পড়ে যায় না। ধীরে ধীরে পড়ে, অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। ফলে তাদের চোখ হয় অশ্রুসিক্ত এবং জীবনে আসে অকৃত্রিম পরিবর্তন। তাদের এই কুরআন তিলাওয়াত পাল্টে দেয় অন্যদেরও। আল্লাহ তাআলা বলেন,
'মুমিন তো কেবল তারাই, আল্লাহর আয়াত স্মরণ করিয়ে দিলে যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, এবং যখন তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। আর তারা শুধু তাদের রবের ওপরেই তাওয়াক্কুল করে।'[১৮]
৯) শুধু নিজের কথাই ভাবে না
'তারা প্রার্থনা করে থাকে, “হে আমাদের রব, আমাদের নিজেদের স্ত্রীদের ও নিজেদের সন্তানদেরকে, চক্ষুশীতলকারী বানাও এবং আমাদের করে দাও মুত্তাকিদের ইমাম।”[১৯]
রহমানের সত্যিকারের বান্দারা আশা করে, তাদের উত্তরসূরিরা দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে তাদের জন্য হবে চোখজুড়ানো প্রশান্তির। সন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি, সহায়-সম্পদ এবং দুনিয়াবি সফলতা-এগুলো তাদের কাছে মানদণ্ড নয়। বরং সন্তানকে নেককার, মুত্তাকী দেখতে চায়, আল্লাহর ইবাদাতগুজার এবং তাঁর পথের দাঈ হিসেবে দেখতে চায় তারা। এটাই তাদের কাছে চোখজুড়ানো প্রশান্তি, কুররাতু আইয়ুন।
সেই সাথে শুধু স্ত্রী-সন্তানের জন্য দুআ করেই ক্ষান্ত হয় না, তারা নিজেদেরকেও দ্বীন ইসলামের আলোকে একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বরূপে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর; যাতে ইন্তেকালের পরও তাদের সাওয়াবের রাস্তা বন্ধ না হয়।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আদম-সন্তান যখন মারা যায়, তিনটি বিষয় ব্যতীত তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়: (১) সদাকায়ে জারিয়াহ (অর্থাৎ যে দানের ফলে তার মৃত্যুর পরেও অন্যরা উপকৃত হয়); (২) উপকারী ইলম (অর্থাৎ যে ইলম সে শিখিয়ে গেছে মানবকল্যাণে); (৩) নেক সন্তান, যে কিনা তার জন্য দুআ করে।'[২০]
১০) তাদের জন্য আল্লাহর অসীম পুরস্কার
উৎকৃষ্ট গুণসমূহ অর্জনে নিরলস পরিশ্রমের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাদের কাঙ্ক্ষিত পুরষ্কার দেবেন, বরং তাদের কল্পনার চেয়েও বেশি দেবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তারাই, যাদেরকে প্রতিদান হিসেবে দেওয়া হবে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ, যেহেতু তারা ছিল ধৈর্যশীল। এবং তাদেরকে সেখানে অভিবাদন ও সালাম-সহকারে অভ্যর্থনা জানানো হবে। সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। আশ্রয়স্থল ও বাসস্থান হিসেবে তা কতই-না উৎকৃষ্ট![২১]
আল্লাহর নির্দেশ পালনে রহমানের বান্দারা ধৈর্যের পরিচয় দেয়। হারাম বিষয় থেকে বিরত থাকে। নফসের তাবেদারি করে না। একমাত্র আল্লাহর হুকুমের সামনে নিজের ইচ্ছাকে ছেড়ে দেয়। এমন কর্মের প্রতিদান জান্নাতের চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে?
'(জান্নাতে) তোমরা থাকবে সদা জীবিত, মৃত্যু তোমাদের কখনও গ্রাস করবে না। এবং তোমরা থাকবে সদা সুস্থ, অসুস্থতা তোমাদের কখনও স্পর্শ করবে না। তোমরা হবে চির-যৌবনের অধিকারী, বার্ধক্য তোমাদের পেয়ে বসবে না। এবং তোমরা থাকবে সন্তুষ্ট, হতাশা কখনও স্পর্শ করবে না।'[২২]
নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, জান্নাতবাসীরা তাদের ওপরের স্তরের বাসিন্দাদের এমনভাবে দেখতে পাবে, যেমনটা তোমরা পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের দীপ্তিমান নক্ষত্রকে দেখতে পাও। এটা হবে তাদের মর্যাদাগত পার্থ্যকের কারণে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, ওটা তো নবিদের জায়গা। তাঁরা ব্যতীত কেউই তো সেখানে পৌঁছোতে পারবে না। নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! (ওসব লোকেরাও সেখানে পৌঁছে যাবে), যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং রাসূলগণকে সত্য বলে মেনে নেবে।[২৩]
অবশ্যই, যারা মনের তীব্র আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি কঠোর সাধনা করে, তাদের জন্যই এমন সম্মানজনক স্থান। তারাই হচ্ছে সত্যিকারার্থে রহমানের বান্দা-ইবাদুর রহমান।
হে আল্লাহ, আমরা ঈমান এনেছি আপনার ওপর, আপনার নবি-রাসূলদের সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছি এবং তাদের শেখানো পথেই নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছি। অতএব আল্লাহ, আমাদেরকে ও আমাদের পরিবারকে এমন সম্মানজনক স্থান প্রদান করুন যার ওয়াদা আপনি দিয়েছেন, আমাদেরকে আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। ইয়া রহমান!
টিকাঃ
[১] সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭: ৩৭
[২] বুখারি: ৫৭৮১
[৩] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৩
[৪] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৪
[৫] তিরমিযি, ২৪৮৭
[৬] আস-সুন্নাহ: ১০৮৯; আশ-শারীআত: ৭০১; আন-নুযুল: ১২
[৭] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৫
[৮] আবূ দাউদ, ১০৪; সহীহ
[৯] সূরা আল-ফুরকান, ২৫ : ৬৭
[১০] তাফসীর আত-তাবারি, ১৭/৪৯৮
[১১] তাফসীর আল-কুরতুবি, ১৩/৭৩
[১২] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৮-৬৯
[১৩] বুখারি, ৭৫৩২
[১৪] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭০
[১৫] মুসলিম, ১৯০
[১৬] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭২
[১৭] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭৩।
[১৮] সূরা আল-আনফাল, ৮:২
[১৯] সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪
[২০] মুসলিম, ১৬৩১
[২১] সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭৫-৭৬
[২২] মুসলিম, ২৮৩৭
[২৩] বুখারি, ৩২৫৬
📄 নির্মল অন্তর
এক দেশে এক জেলে বাস করত। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত সমুদ্র-সৈকতের উদ্দেশ্যে। কিন্তু দিনশেষে মাত্র দুটো মাছ নিয়ে ফিরত। একটি মাছ ঘরের লোকদের দিত রান্না করার জন্য, আরেকটি বাজারে বিক্রি করত।
তার এই স্বভাব দেখে একদিন তার এক বন্ধু জানতে চাইল, 'কেন তুমি দুটো মাছ ধরেই ক্ষান্ত থাকো? চার-পাঁচটা কিংবা দশটা ধরো না কেন?'
সে বলল, আচ্ছা। তা না হয় ধরলাম। তারপর?
-তা হলে তুমি আরও ধনী হতে পারবে।
-আচ্ছা। তারপর?
-তুমি লোক খাটাতে পারবে। তারা তোমার হয়ে মাছ ধরবে।
-তারপর?
-এভাবে চলতে থাকলে একদিন তুমি অনেক টাকার মালিক হয়ে যাবে। বড়ো একটা নৌকা কিনতে পারবে। নৌকা দিয়ে বেশি বেশি মাছ ধরতে পারবে।
-তারপর?
-তুমি নৌবহরে টাকা খাটাতে পারবে। ফলে আরও ধনী হতে থাকবে।
-তারপর কী হবে?
-তারপর নিজেই একটা মাছের আড়ত খুলে বসতে পারবে শহরে।
-তারপর?
-ব্যবসা আরও বড়ো পরিসরে করতে পারবে এবং বাজারের নেতা পর্যায়ের ব্যবসায়ী হতে পারবে।
-তারপর কী?
-এভাবে একদিন তুমি কোটিপতি হয়ে যাবে!
-আচ্ছা! এরপর?
-এরপর শুধু শান্তি আর শান্তি।
সব শুনে লোকটি বলল, 'ভাই আমার, আমি তো এখন শান্তিতেই আছি!' অর্থাৎ তুমি আমাকে এমন এক দেশে কেন নিয়ে যেতে চাও, যেখানে আমি ইতিপূর্বেই পৌঁছে গেছি?! আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা নিয়েই আমি সন্তুষ্ট। আমার আর প্রয়োজন নেই।
কতই-না চমৎকার আল্লাহর রাসূলের কথা! তিনি এই গল্পের পুরো শিক্ষাটি এক বাক্যে বলে দিয়েছেন,
ليس الغني عن كثرَةِ العَرَضِ، وَلَكِنَّ الغني عنى النَّفْسِ
'অঢেল অর্থ সম্পদের মধ্যে ধনাঢ্যতা নেই। প্রকৃত ধনাঢ্যতা হলো অন্তরের ধনাঢ্যতা।[৮২]
অঢেল অর্থ সম্পদ, কিংবা ভালো পজিশনে থাকলেই ধনী হওয়া যায় না। তিনি বলেছেন, প্রকৃত ধনাঢ্যতা হলো যখন আপনার অন্তর পরিতৃপ্ত থাকে, প্রশান্ত থাকে। তখনই আপনি ধনী, সমৃদ্ধিশালী।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, দুনিয়ার এই জীবনে আমরা সকলেই মুসাফির। আর একজন মুসাফির হিসেবে আপনার কতটুকু পাথেয় প্রয়োজন? সোশ্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশন অনেককিছুরই লোভ দেখাবে। বস্তুত আমাদের যাত্রাপথে সেগুলোর প্রয়োজন নেই। মুসাফিরের ব্যাগে অতিরিক্ত কীই-বা থাকতে পারে?
মনে রাখবেন, কিয়ামাতের দিন যার বোঝা যত হালকা হবে, সে জান্নাত-পানে সে ততই দ্রুতগতিতে ছুটে যাবে।
কাজেই আমাদের জীবনের একটিই স্লোগান হোক, একটিই লক্ষ্য হোক: 'ওগো আল্লাহ, তুমি যদি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে থাকো, তা হলে তুমি আমাকে কী দিয়েছ আর কী দাওনি এগুলোর তোয়াক্কা করি না। হে আল্লাহ, তুমি শুধু আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। তা হলেই আমি সফল!'
টিকাঃ
[৮২] বুখারি: ৬৪৪৬
এক দেশে এক জেলে বাস করত। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত সমুদ্র-সৈকতের উদ্দেশ্যে। কিন্তু দিনশেষে মাত্র দুটো মাছ নিয়ে ফিরত। একটি মাছ ঘরের লোকদের দিত রান্না করার জন্য, আরেকটি বাজারে বিক্রি করত।
তার এই স্বভাব দেখে একদিন তার এক বন্ধু জানতে চাইল, 'কেন তুমি দুটো মাছ ধরেই ক্ষান্ত থাকো? চার-পাঁচটা কিংবা দশটা ধরো না কেন?'
সে বলল, আচ্ছা। তা না হয় ধরলাম। তারপর?
-তা হলে তুমি আরও ধনী হতে পারবে।
-আচ্ছা। তারপর?
-তুমি লোক খাটাতে পারবে। তারা তোমার হয়ে মাছ ধরবে।
-তারপর?
-এভাবে চলতে থাকলে একদিন তুমি অনেক টাকার মালিক হয়ে যাবে। বড়ো একটা নৌকা কিনতে পারবে। নৌকা দিয়ে বেশি বেশি মাছ ধরতে পারবে।
-তারপর?
-তুমি নৌবহরে টাকা খাটাতে পারবে। ফলে আরও ধনী হতে থাকবে।
-তারপর কী হবে?
-তারপর নিজেই একটা মাছের আড়ত খুলে বসতে পারবে শহরে।
-তারপর?
-ব্যবসা আরও বড়ো পরিসরে করতে পারবে এবং বাজারের নেতা পর্যায়ের ব্যবসায়ী হতে পারবে।
-তারপর কী?
-এভাবে একদিন তুমি কোটিপতি হয়ে যাবে!
-আচ্ছা! এরপর?
-এরপর শুধু শান্তি আর শান্তি।
সব শুনে লোকটি বলল, 'ভাই আমার, আমি তো এখন শান্তিতেই আছি!' অর্থাৎ তুমি আমাকে এমন এক দেশে কেন নিয়ে যেতে চাও, যেখানে আমি ইতিপূর্বেই পৌঁছে গেছি?! আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা নিয়েই আমি সন্তুষ্ট। আমার আর প্রয়োজন নেই।
কতই-না চমৎকার আল্লাহর রাসূলের কথা! তিনি এই গল্পের পুরো শিক্ষাটি এক বাক্যে বলে দিয়েছেন,
ليس الغني عن كثرَةِ العَرَضِ، وَلَكِنَّ الغني عنى النَّفْسِ
'অঢেল অর্থ সম্পদের মধ্যে ধনাঢ্যতা নেই। প্রকৃত ধনাঢ্যতা হলো অন্তরের ধনাঢ্যতা।[১]
অঢেল অর্থ সম্পদ, কিংবা ভালো পজিশনে থাকলেই ধনী হওয়া যায় না। তিনি বলেছেন, প্রকৃত ধনাঢ্যতা হলো যখন আপনার অন্তর পরিতৃপ্ত থাকে, প্রশান্ত থাকে। তখনই আপনি ধনী, সমৃদ্ধিশালী।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, দুনিয়ার এই জীবনে আমরা সকলেই মুসাফির। আর একজন মুসাফির হিসেবে আপনার কতটুকু পাথেয় প্রয়োজন? সোশ্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশন অনেককিছুরই লোভ দেখাবে। বস্তুত আমাদের যাত্রাপথে সেগুলোর প্রয়োজন নেই। মুসাফিরের ব্যাগে অতিরিক্ত কীই-বা থাকতে পারে?
মনে রাখবেন, কিয়ামাতের দিন যার বোঝা যত হালকা হবে, সে জান্নাত-পানে সে ততই দ্রুতগতিতে ছুটে যাবে।
কাজেই আমাদের জীবনের একটিই স্লোগান হোক, একটিই লক্ষ্য হোক: 'ওগো আল্লাহ, তুমি যদি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে থাকো, তা হলে তুমি আমাকে কী দিয়েছ আর কী দাওনি এগুলোর তোয়াক্কা করি না। হে আল্লাহ, তুমি শুধু আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। তা হলেই আমি সফল!'
টিকাঃ
[১] বুখারি: ৬৪৪৬