📄 সংশয়মুক্ত ঈমান
মানুষের অন্তর সদা পরিবর্তনশীল। মুহূর্তে মুহূর্তে তা বদলায়। বদলানোই তার ধর্ম। মানব- হৃদয়ের এই অস্থিরতা চিরন্তন। সকালে যে ব্যক্তি মুসলিম, সন্ধ্যা গড়াতেই সে হয়তো কাফির। একদিন সকালে উঠে আপনি হয়তো ঈমানি জযবা অনুভব করলেন। অথচ ঘণ্টা কয়েক যেতেই দেখলেন, সেই আবেগ হারিয়ে গেছে! অন্তর কঠিন হয়ে গেছে।
মানুষের মন বড়োই জটিল প্রকৃতির। সম্ভবত এ জন্যই এর নাম দেওয়া হয়েছে 'কলব'। সর্বদা সে 'তাকাল্লুব' অর্থাৎ পরিবর্তন হতে থাকে। প্রতিটা মুহূর্তেই সে রূপ পাল্টায়।
কবি বলেন,
وَمَا سُمِّيَ الْإِنْسَانُ إِلَّا لِأُنْسِهِ وَلَا الْقَلْبُ إِلَّا أَنَّهُ يَتَقَلَّبُ
মানুষ ভুলোমনা, তাই তো সে ইনসান। অন্তর পরিবর্তনশীল, তাই তো এর নাম কলব। [৮]
আমাদের নবিজি আরও চমৎকার উপমা দিয়েছেন অন্তরের পরিবর্তন নিয়ে। আবূ মূসা আশআরি থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলেন,
مَثَلُ الْقَلْبِ مَثَلُ الرِّيشَةِ تُقَلِّبُهَا الرِّيَاحُ بِفَلَاةٍ
'কলব (পাখির) পালকের মতো, ধু-ধু মরুতে বাতাস যাকে দিগ্বিদিক নিয়ে চলে।[৯]
এটাই অন্তরের প্রকৃতি। এভাবেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে অন্তর। এই অস্থিরতা অন্তরের একটি জটিল দিক মাত্র। এর আরেকটা দিক আছে; তা খুবই জটিল কিন্তু বাস্তব। আর সেটা হলো ফিতনা অর্থাৎ পরীক্ষা। হারাম খায়েশ তো সবার আগে অন্তরেই বাসা বাঁধে। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই তা অন্তরে আবির্ভূত হয়। কখনও কখনও শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মাধ্যমেও হৃদয়ে ফিতনা প্রবেশ করতে পারে। যেমন: চোখ দিয়ে খারাপ কিছু দেখা, হাত দিয়ে হারাম জিনিস ধরা, কান দিয়ে অশ্লীল কিছু শোনা ইত্যাদি। মোটকথা, দেহের যে-কোনো অঙ্গই ফিতনায় লিপ্ত হতে পারে।
ফিতনার প্রাথমিক লক্ষ্য হলো মানুষের অন্তর। কারণ, এখানেই সে বাসা বাঁধে। এটাই তার আবাসস্থল। এজন্য নবিজি আমাদের সাবধান করে গেছেন।
হুযাইফা থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন,
تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوبِ كَالْحَصِيرِ عُودًا عُودًا فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ وَأَيُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَصِيرَ عَلَى قَلْبَيْنِ
'চাটাইয়ের বুননের মতো একেক করে ফিতনা মানুষের অন্তরে আসতে থাকে। যে অন্তরে তা গেঁথে যায় তাতে একটি করে কালো দাগ পড়ে। আর যে অন্তর তা প্রত্যাখ্যান করে তাতে একটি উজ্জ্বল দাগ পড়ে। এমনি করে দুটি অন্তর দু-ধরনের হয়ে যায়।' [১০]
একটি দুটি নয়, নবিজি বলেছেন ফিতনার-পর-ফিতনা আসতে থাকবে অন্তরের সামনে। ঠিক যেভাবে মাদুরের পাতাগুলো একে অপরের সাথে জুড়ে একটি পরিপূর্ণ মাদুরে রূপ নেয়। অন্তরও এভাবে নানামুখী ফিতনার সম্মুখীন হয়।
দ্বিতীয়ত, আমরা পরিবর্তনশীল যুগে বাস করছি। প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে সবকিছু। মত পাল্টে যাচ্ছে, মতবাদ পাল্টে যাচ্ছে, এমনকি বিশ্বাসও পাল্টে যাচ্ছে। তাই আল্লাহর রাসূল বলেন,
سَيَكُونُ فِي آخِرِ أُمَّتِي أُنَاسٌ يُحَدِّثُونَكُمْ مَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُمْ ، وَلَا آبَاؤُكُمْ ، فَإِيَّاكُمْ وَإِيَّاهُمْ
'শেষ জামানায় আমার উম্মতের একদল মানুষ আসবে, যারা তোমাদের এমন কিছু বলবে, যা তোমরা ইতোপূর্বে শোনোনি। তোমাদের পূর্বপুরুষরাও শোনেনি। কাজেই নিজেদের ব্যাপারে এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো।[১১]
অন্যদিকে কিয়ামাতের দিন আমাদের সাফল্য নির্ভর করছে এমন একটি অন্তরের ওপর, যা থাকবে দৃঢ়। বিশ্বাসের দিক থেকে যার কোনো নড়চড় নেই। নদীতে দুলতে-থাকা নৌকার মতো কোনো অন্তর সফল হবে না। এ জন্য ইবরাহীম তাঁর দু’আয় বলেছেন,
وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
‘আর যেদিন তাদের পুনরুত্থিত করা হবে, সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আসবে না কোনো কাজে। সেদিন শুধু সে উপকৃত হবে, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে।[১২]
ওপরে আলোচিত বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে সাজালে পাওয়া যায়: ১) আমাদের এমন একটি অন্তর আছে, যা সর্বদা পরিবর্তনশীল। ২) আমরা এমন এক পরিবেশে বাস করছি, যা ক্রমাগত পাল্টাতে থাকে। ৩) লোকেরা যা বলে আর আমরা যা শুনি, এগুলোও সর্বদা পরিবর্তন হতে থাকে। ৪) অন্তরে উপস্থিত হওয়া ফিতনাগুলোও পরিবর্তনশীল। ৫) অপরদিকে আল্লাহর কাঠগড়ায় মুক্তি পেতে হলে এমন একটি অন্তর নিয়ে উপস্থিত হতে হবে, যা অস্থিরতার ব্যাধি থেকে মুক্ত।
মোটকথা, যখনই কাউকে আত্মিক বিষয়, সংশয়-সন্দেহ, অন্তরের রোগ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুনবেন, তখন তা গুরুত্বের সাথে নিন। মন দিয়ে শুনুন। কারণ, বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। এর সাথে ইহকাল-পরকালের মুক্তির বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
অন্তর মূলত দুই শ্রেণীর রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। রোগ-ব্যাধিগুলো এই দুই শ্রেণীর সাথে জড়িত। রোগগুলো হলো: ১. শাহওয়াত (প্রবৃত্তি বা হারাম লালসা) ২. শুবুহাত (সন্দেহ-সংশয় বা সাদৃশ্য অবলম্বন করা)
ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন,
إن القلب يعترضه مرضان يتواردان عليه اذا استحكما فيه كان هلاكه وموته وهما مرض الشهوات ومرض الشبهات هذان اصل داء الخلق الا من عافاه الله
'নিশ্চয়ই অন্তর শাহওয়াত ও শুবুহাত এই দুই প্রকার রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। যদি এর একটিও ব্যক্তির অন্তরে শক্তভাবে গেঁড়ে বসতে পারে, তা হলে অন্তরের ধ্বংস অনিবার্য, মৃত্যু সুনিশ্চিত। সকল রোগের সূত্রপাত এ দুটো বিষয় থেকেই ঘটে। তবে তার কথা ব্যতিক্রম, যাকে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। [১৩]
প্রথমটি শাহাওয়াত বা প্রবৃত্তি। যেমন: বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কামনা, খাদ্য-পানীয়র চাহিদা, অর্থবিত্তের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, দ্রুত ধনী হবার তাড়না—এগুলো সবই প্রবৃত্তির অংশ। কখনও এসব চাহিদা হালালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, আবার কখনও তা হারাম পর্যায়ে উপনীত হয়। তখন এগুলো নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর।
দ্বিতীয়টি শুবুহাত বা সংশয়। এটি আরও ভয়ানক, অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংশয় সরাসরি আপনার ঈমানের ওপর আঘাত হানতে পারে। পাল্টে দিতে পারে আপনার বিশ্বাস, আপনার দৃষ্টিভঙ্গি। রবের সাথে আপনার যে সম্পর্ক, এর ওপর সরাসরি প্রভাব খাটাতে পারে। শারঈ হিজাবের ব্যাপারে আপনাকে অনাগ্রহী করে তুলতে পারে। এজন্য বিষয়টি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
শুবুহাত শব্দটি شبه থেকে এসেছে। বাংলায় একে সংশয় বলা হলেও আরবি ভাষা অনুযায়ী তার আরেকটি পরিচয় হলো সাদৃশ্য অবলম্বন করা। অর্থাৎ, এমন-কিছুকে সত্য বলে মনে করা হয়, যা আসলে সত্য নয়। ফলে শুবুহাতে আক্রান্ত ব্যক্তি খারাপ কাজকেও ভালো মনে করতে থাকে। তাই সে খারাপ কাজ করার পরও লজ্জিত হয় না। পরন্তু নিজ কর্মের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকে। যেমন ধরুন কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করার বিষয়টা। অনেকেই কাফিরদের চালচলন অনুসরণ করে। এটা যে স্পষ্ট হারাম, সে কথা কানেও তুলতে চায় না। বরং এর পক্ষে যুক্তি প্রদান করে। আসলে এই ক্ষেত্রে ব্যক্তি শুবুহাতে আক্রান্ত হয়েছে, তাই এমনটা করছে।
এজন্য ইমাম ইবনুল কাইয়িম শুবুহাতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন,
وإنا سميت الشبهة شبهة لاشتباه الحق بالباطل فيها ، فإنها تلبস ثوب الحق على جسم الباطل
'সাদৃশ্য অবলম্বনকে শুবুহাত নাম দেওয়ার কারণ হলো, বাতিলকে হকের সাদৃশ্য মনে করা। অনেকটা বাতিলের শরীরে হকের পোশাক পরানোর মতো।[১৪]
সে যেন ছদ্মবেশী শয়তান, কিন্তু ভান ধরেছে ফেরেশতার। এটাই শুবুহাতের প্রকৃতি।
আপনি যদি শাহাওয়াত তথা প্রবৃত্তির মোহে নিমজ্জিত ভাই-বোনদেরকে কুরআন, হাদীসের বাণী কিংবা জান্নাত-জাহান্নামের কথা বলে নসীহা করেন, তো তাদের অন্তর কেঁপে উঠবে। চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত দেখতে পাবেন। তারা নিজেদের পাল্টানোর তামান্না প্রকাশ করবে। আর যদি নাও করে, তবু তাদের মধ্যে কিছু-না-কিছু অনুশোচনা কাজ করবে। কারণ, তারা হয়তো প্রবৃত্তি দ্বারা আক্রান্ত, কিন্তু আল্লাহ ও রাসূলকে তারা সত্য মানে। আখিরাতকে বিশ্বাস করে, কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলে মানে। ফলে পাপের পরিমাণ যতই হোক না কেন, এগুলোর স্মরণ তাদের অন্তরকে আলোড়িত করবেই।
পক্ষান্তরে যারা শুবুহাতে আক্রান্ত, তাদের বেলায় আমরা অনুরূপ কথা বলতে পারি না। তারা নিজেদের অন্যায় কাজের পক্ষে তর্ক করবে। কারণ, এটাকে তারা খারাপ মনে করে না। 'আমাদের কাছে দলিল আছে' বলবে। আমি ওমুক লেকচারে এটা হালাল বলতে শুনেছি, বা ওমুক বইতে পড়েছি। অথবা বলবে, এ যুগে এসব চলে না। আউযুবিল্লাহ।
কাজেই শুবুহাত অত্যন্ত ভয়ানক একটি বিষয়। বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে আমাদের ঈমানের। তাই শুবুহাত অন্তরে জেঁকে বসার আগেই, আমাদেরকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। এখন আমরা জানব, কীভাবে শুবুহাত থেকে বেঁচে থাকতে হয়।
চারটি মূলনীতি রয়েছে। এগুলোর অনুসরণ অন্তরে শুবুহাত বা সংশয়ের আগমন ঠেকাবে। আপনি যদি নিজেকে নিরাপদ মনে করেন, তবুও এই চারটি মূলনীতি স্মরণে রাখুন। যাতে আল্লাহ আপনাকে আমাকে ভবিষ্যতেও নিরাপদ রাখেন। আর যদি এই মুহূর্তে কোনো ধরনের সংশয়ে আক্রান্ত হয়ে থাকেন কিংবা কোনো কিছু শোনা বা পড়ার কারণে সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়ে থাকেন, তবে চিন্তার কিছু নেই। আপনার জন্যও আরও চারটি মূলনীতি রয়েছে। এগুলো দিয়ে আপনার ভেতরটা একদম ধুয়ে-মুছে সাফ করে ফেলুন।
সত্যি বলতে কী, এ আলোচনার গুরুত্ব তারাই সব থেকে বেশি বুঝবে, যারা এই মুহূর্তে সংশয়ে আক্রান্ত। আপনি যদি সংশয়ে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তা হলে অবশ্যই মনে মনে বলছেন, আমাকে সাহায্য করুন, আমাকে ঔষধ দিন। কারণ, আমার সালাত আর আগের মতো নেই। আমার সিয়াম, সদাকা করার আকাঙ্ক্ষা আর আগের মতো নেই। হালাকা, লেকচারে উপস্থিত হবার মতো উদাম আর জাগে না। আমার অন্তর একেবারে পাল্টে গেছে। আমি এ থেকে বের হয়ে আসতে চাই।
আমরা মোট আটটি মূলনীতি আলোচনা করব। প্রথম চারটি সংশয় থেকে বেঁচে থাকার উপায় নিয়ে। পরের চারটি সংশয়ে আক্রান্ত হওয়ার পর করণীয় বিষয় নিয়ে। এই আটটির ভিতর প্রথম চারটি আপনার অবশ্যই এখন কাজে লাগবে। অথবা আপনার পরিবারের কেউ যদি আক্রান্ত হয়ে থাকে, তারও কাজে লাগবে। তবুও ভবিষ্যতে নিরাপদ থাকার জন্য হলেও এগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন।
কারণ, আমরা জানি না আল্লাহ আমাদের তাকদীরে কী ধরণের পরীক্ষা রেখেছেন। আজ হয়তো নিজেকে আমার দৃঢ় ঈমানের অধিকারী মনে করছি। আমার ভিতর কোনো সংশয় দানা পরিমাণও নেই। আমি আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত। আমি মৃত্যুতে বিশ্বাসী, পরকালে বিশ্বাসী, জান্নাত-জাহান্নাম বিশ্বাস করি। আমার কোনো সমস্যাই হয়তো নেই। তবুও চারটি মূলনীতি আমাদের জানতে হবে।
সংশয় থেকে বেঁচে থাকার উপায় :
১) সদা সতর্ক থাকুন
সব সময় সতর্ক থাকুন। ভুলে যাবেন না সংশয় বলে একটি বিষয় আছে, যার ব্যাপারে মনোযোগ রাখা জরুরি। ক্ষণিকের জন্যও গাফেল হবেন না। তা হলেই আমরা আশা করতে পারি, আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়ে রাখবেন।
আল্লাহ তাআলা বানী ইসরাঈলের ব্যাপারে বলেছেন,
وَحَسিবُوا أَلَّا تَكُونَ فِتْنَةٌ فَعَمُوا وَصَمُّوا
'তারা ভেবেছিল আর কোনো ফিতনা হবে না, এজন্য তারা অন্ধ ও বধির হয়ে গিয়েছিল। [১৫]
তারা ধরে নিয়েছিল তাদের আর পরীক্ষা করা হবে না। অর্থাৎ, তারা সতর্ক ছিল না। ফলে অন্ধ ও বধির হয়ে রইল।
মোটকথা, ভবিষ্যতে সংশয় থেকে বেঁচে থাকতে আপনাকে সদা সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহকে ভয় করুন। সতর্ক হোন আপনার ঈমান নিয়ে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকবেন না আজ আপনি ভালো মুসলিম, সালাত পড়ছেন, সিয়াম রাখছেন, মুমিনদের মতো পোশাক পরছেন, ভবিষ্যতেও এরূপ থাকতে পারবেন। না, এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। আমাদের যে-কারও পরিবর্তন ঘটতে পারে যে-কোনো মুহূর্তে। আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।
এজন্য ইবনু আবী মুলাইকা বলেন,
أدركت ثلاثين من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم كلهم يخاف النفاق على نفسه
'আমি নবি-এর অন্তত তিরিশ জন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছি, যাদের প্রত্যেকে নিজেদের ব্যাপারে নিফাকের ভয় করতেন।[১৬]
সর্বশেষ আপনি কবে নিফাকি থেকে নিরাপত্তা চেয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন? কিংবা শিরক থেকে? একুশ শতকের কোনো ভ্রান্ত মতবাদ থেকে?
২) কান দেবেন না
সংশয়পূর্ণ কোনো বিষয়ে কান দেবেন না। সেসব আলোচনায় বসবেন না। তাদের ব্লগ, বইপত্র ঘাটতে যাবেন না। হতে পারে এগুলো আপনার ঈমানি ভিত নাড়িয়ে দেবে। কাজেই দূরে থাকুন।
শুবুহাত শক্তিশালী আর দ্বীন ইসলাম দুর্বল, ব্যাপারটি এমন নয়। বরং আমাদের অন্তরই দুর্বল। আমাদের পূর্বসূরিগণ সংশয়ের ব্যাপারে এরূপ দৃষ্টিভঙ্গিই রাখতেন।
ইবনু তাউস আমাদের পূর্বসূরিদের একজন। তাঁর সময়কার কথা। একদিন সালিহ নামক এক লোক মজলিশে প্রবেশ করল এবং বিভ্রান্তদের মতো তাকদীর নিয়ে কথা বলতে লাগল। সাথে সাথে ইবনু তাউস কানে আঙুল দিলেন এবং ছেলেকে বললেন,
أدخل أصابعك في أذنيك واشدد، فلا تسمع من قوله شيئاً، فإن القلب ضعيف
'কানে আঙুল দাও! শক্ত করে চেপে ধরো! ওর কোনো কথাই শুনো না। মানুষের অন্তর বড়োই দুর্বল।[১৭]
ইমাম যাহাবি এই ঘটনার ওপর চমৎকার একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন,
أكثر أئمة السلف على هذا التحذير، يرون أن القلوب ضعيفة، والشبه خطافة
‘পূর্বসূরি ইমামগণের ভিতর অধিকাংশ ইমামই এ ব্যাপারে ভয় করতেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন অন্তর দুর্বল, আর শুবুহাত বা সংশয় ধ্বংসাত্মক। [১৮]
অতএব নিজেকে এর সাথে জড়াবেন না। আপনার ঈমানের ওপর সংশয় আঘাত হানতে পারে। হতে পারে আপনি সংশয়পূর্ণ একটি কথা শুনে ফেলেছেন। আর এটি আপনার অন্তরে গেঁথে বসেছে। এমনভাবে বসেছে যে, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত সে আর বেরই হলো না।
কে এমনটা চায়? কে এই চড়া মূল্য দিতে প্রস্তুত?
এর প্রমাণ আমরা পাই আরেকটি হাদীস থেকে। কিয়ামাতের পূর্বে সবচেয়ে বড়ো একটি শুবুহাত বা সংশয় প্রকাশ পাবে। তার নাম, 'মাসীহ আদ-দাজ্জাল'। সবচেয়ে ভয়ানক সংশয় নিয়ে সে উপস্থিত হবে। এক্ষেত্রে আমাদের নবিজি এর নসিহত ছিল,
مَنْ سَمِعَ بِالدَّجَّالِ فَلْيَنَا عَنْهُ ، فَوَاللَّهِ إِنَّ الرَّجُلَ لَيَأْتِيهِ وَهُوَ يَحْسِبُ أَنَّهُ مُؤْمِنٌ فَيَتَّبِعُهُ مِمَّا يَبْعَثُ بِهِ مِنْ الشُّبُهَاتِ
'যে-কেউ দাজ্জালের (আগমনের) ব্যাপারে শুনবে, সে যেন তার থেকে দূরে থাকে। কারণ, আল্লাহর কসম, কিছু মানুষ এই বিশ্বাস নিয়ে তার সামনে যাবে যে, সে একজন মুমিন (তাই দাজ্জাল তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না)। অথচ (দেখা যাবে দাজ্জাল) যে সংশয় নিয়ে এসেছে, তার অনুসারী হয়ে যাবে।[১৯]
নবিজি দাজ্জালকে দেখে আসতে বলেননি। তার থেকে কোনো অর্ডার বা সেলফি নিতে বলেননি। বরং তার থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। কেন? কারণ, সে অনেক সংশয় ছড়িয়ে দেবে। সে নিজেকে আল্লাহ দাবি করবে, আর অনেক দুর্বল মুমিন তা বিশ্বাস করবে। কী ভয়ঙ্কর!
অর্থাৎ সংশয়পূর্ণ বিষয় থেকে দূরে থাকতে হবে। নিজেকে শক্তিশালী ঈমানদার মনে করে ঈমানকে পরীক্ষায় ফেলা যাবে না।
৩) বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হোন
মাঝে মাঝে একটি ভালোসঙ্গ আমাদের কয়েক বছর এগিয়ে দেয়। আবার একটি খারাপ সঙ্গ আমাদের রাতারাতি পাল্টে দেয়। আপনি হয়তো ভাবছেন-আপনার ঈমান বেশ পাকা-এরপর খারাপ লোকদের মজলিসে বসলেন। পরক্ষণেই আবিষ্কার করলেন আপনার ঈমানের দালান ধসে পড়েছে।
আমরা সঙ্গ দ্বারা প্রভাবিত হই। শুধু মানুষের সঙ্গই নয়, আমরা আবহাওয়া দ্বারাও প্রভাবিত হই। মেঘ সরে সূর্য দেখা দিলে আমরা আনন্দ অনুভব করি, জরুরি কাজের সময় বৃষ্টি নামলে বিরক্ত হই। নানান আবহাওয়ায় নানান অনুভূতি বিরাজ করে আমাদের মনোজগতে। এমনকি আমরা জমিন দ্বারাও প্রভাবিত হই! উঁচু নিচু হলে এক রকম অনুভূতি, সমতল হলে আরেক রকম।
প্রাচীন সমাজবিজ্ঞানী ইবনু খালদুন আরও বিস্ময়কর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, 'আমরা পশু-পাখির দ্বারাও প্রভাবিত হই। উদাহরণস্বরূপ উট পালনকারী ব্যক্তি আর ভেড়া পালনকারীর ব্যক্তি-দুজন দুই রকম। তাদের স্বভাব-চরিত্রের মাঝে পার্থক্য থাকে।'
অতএব মানুষ একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এজন্য আমাদের নবিজি বলেন,
المرء على دين خليله فلينظر أحدكم من يخالل
'ব্যক্তি তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। অতএব তোমাদের প্রত্যেকেই যেন খেয়াল করে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব গড়ছে। [২০]
অতীতে ইমরান ইবনু হিত্তান নামক এক নেককার বুজুর্গ ছিল। কিন্তু তার এই পরহেজগারিতা বিয়ের আগ পর্যন্ত টিকল। সে তার এক চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে চাইল, যে কিনা খারেজি মতাদর্শের অনুসারী। খারেজিরা তাকফীর এবং হত্যার মতো বিষয়গুলোতে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। লোকেরা ইমরানকে সাবধান করল সে খারেজি। কিন্তু ইমরান তাদের অভয় দিয়ে বলল, 'চিন্তা কোরো না। ইন শা আল্লাহ আমি তাকে পাল্টে ফেলব।' সে তাকে বিয়ে করে নিল। তারপর যা হবার তা-ই হলো। মেয়েটিই তাকে পাল্টে ফেলল। শুধু তাই নয়, পরবর্তীকালে ইমরান খারেজিদের একজন প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হলো!
বাস্তবতা অত্যন্ত রূঢ়। আমাদের সঙ্গ প্রয়োজন, আমাদের পরিবার প্রয়োজন, বন্ধু-বান্ধব প্রয়োজন-অস্বীকার করছি না। কারণ, আমরা সামাজিক জীব। আমরা ভালোবাসার বন্ধনে জুড়ে থাকি। তবে কখনও কখনও দুটো জিনিস মুখোমুখী হয়ে দাঁড়ায়; সত্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, আর সম্পর্ক রক্ষার প্রতি আকাঙ্ক্ষা। তারা পরস্পর একে অপরের বিরুদ্ধে এসে দাঁড়ায়। আর আমার অভিজ্ঞতা বলে, দশভাগের নয়ভাগ মানুষই এসব ক্ষেত্রে সত্যের ওপর সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে বসে।
মানুষের মস্তিষ্ক এভাবেই কাজ করে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাইকোলজিস্ট স্টিভেন পিনকার এমনটাই বলেছেন। তিনি বলেন,
'the brain sometimes pushes a person to accept a belief even though it may be factually incorrect but it is socially correct.'
'মস্তিষ্ক মাঝে মধ্যে ব্যক্তিকে এমন কিছুতে বিশ্বাস করতে জোর প্রদান করে, যা বাস্তবিক অর্থে ভুল, কিন্তু সমাজে সঠিক বলে বিবেচিত।'
আপনি জানেন এটা ভুল। হতে পারে এটা একটা শুবুহাত, ভ্রান্ত বিষয়। হয়তো গুটি কয়েক মানুষ একে দ্বীনের অংশ বলেছে। কিন্তু আপনি যে দলের সাথে চলছেন, যাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ছেন, তাদের বিশ্বাসের দ্বারা আপনি প্রভাবিত হয়ে গেলেন। ফলে একসময় যাকে ভুল জানতেন, তাকে এখন সঠিক ভাবছেন।
কাজেই বন্ধুত্বের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। যেভাবে আপনি আপনার শরীরের যত্ন নিচ্ছেন, ঠিক সেভাবেই আপনার ঈমানের যত্ন নিন।
৪) দ্বীন নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনা করুন
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বারবার একটি কথা বলছে আর তা হলো, আমাদের দেহের রোগ- প্রতিরোধ-ব্যবস্থা প্রতিটি মুহূর্তে ক্যান্সার কোষ ধ্বংসের কাজে নিয়োজিত। আমাদের শরীরের এই ক্ষমতা আছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলেছে, আমরা যখন সুস্থ খাদ্যাভাস ছেড়ে দিই, অস্বাস্থ্যকর খাবার খাই, ব্যায়াম করি না, দৌড়াই না, ঘুমের অভ্যাসের ব্যাপারে সচেতন হই না, তখন আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে। দুর্বল হয়ে যায় সে। ফলে ক্যান্সার কোষগুলো প্রভাব বিস্তার করতে থাকে এবং ছড়িয়ে পড়ে।
একই কথা ইসলামের ক্ষেত্রেও খাটে। শুবুহাত বা সংশয় তখনই আমাদের অন্তরে জায়গা করে নিতে পারে, যখন আমরা ইলম অর্জন ছেড়ে দিই। অথবা যে পরিমাণ মনোযোগ দেবার কথা ছিল সে পরিমাণ দিই না। ইলম ও আমলের ব্যাপারে নিজের সর্বোচ্চটা প্রয়োগ করি না। ফলে সংশয় আমাদের ঈমানের পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে আমরা দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ি। অথচ ঠিক একই সময় একজন দ্বীন শিক্ষার্থীর কাছে এই সংশয় হাস্যকর ঠেকে! তারা বলে, 'আমি এই সংশয় ভেদ করে সত্য দেখতে পাচ্ছি।'
পার্থক্য কোথায়? ইলম বা জ্ঞানই হলো মূল পার্থক্য। অতএব দ্বীন নিয়ে কার্যকরী সিলেবাস তৈরি করুন, এরপর পড়াশোনায় নেমে পড়ুন। সংশয়ের জালে আটকে যাবার আগেই শুরু করুন। আজ থেকেই।
শুবুহাত বা সংশয়ে আক্রান্ত হলে করণীয় :
এবার আমরা এমন চারটি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করব তাদের জন্য, যারা এই মুহূর্তে সংশয়ে ভুগছেন। হতে পারে আপনি নিজেই শুবুহাতে বা সংশয়ে আক্রান্ত অথবা আপনার চেনা পরিচিত কেউ। যদি তা-ও না হয়, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে হলেও এই চারটি পয়েন্ট মগজে গেঁথে ফেলুন:
১) মন্দ চিন্তাকে হটিয়ে বিদায় করুন
খারাপ চিন্তাকে প্রশ্রয় দেবেন না। সন্দেহযুক্ত কোনো চিন্তা আসলেই সেটা শুবুহাত নয়, বরং শুরুর দিকে সেটা থাকে স্রেফ ওয়াসওয়াসা, শয়তানের কুমন্ত্রণা। দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু এই চিন্তাকে মনের ভেতর লালন করা শুরু করলেই তা সংশয়ে রূপ নিতে শুরু করে। আর তখনই বিপত্তি বাঁধে। এজন্য ওয়াসওয়াসাকে পাত্তা দেওয়া যাবে না।
আমাদের নবিজি বলেছেন,
يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ : مَنْ خَلَقَ كَذَا وَكَذَا ؟ حَتَّى يَقُولَ لَهُ : مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ ؟ فَإِذَا بَلَغَ ذَلِكَ ، فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ
'শয়তান তোমাদের কারও কারও (চিন্তায়) এসে বলে, "এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে?” এভাবে একপর্যায়ে সে বলে, "তোমার রবকে তা হলে কে সৃষ্টি করেছে?” যখন এমন অবস্থা হলে ব্যক্তি যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং চিন্তাকে ঝেড়ে ফেলে।[২১]
মন্দ চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। মনে জায়গা দেবেন না। আল্লাহর কাছে পানাহ চান। বলুন, 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ-শাইতনির রজীম।' মন্দ চিন্তা দৃঢ়-বিশ্বাসে পরিণত হবার আগেই তার রশি কেটে দিন।
একটি মজার ঘটনা বলি। একবার আমাদের এখানকার শারীআ-কাউন্সিলে এক ভাই এসেছিল তার স্ত্রীকে নিয়ে। সে বলল, আমরা বিয়ে নবায়ন করতে চাই। আমি বললাম, কেন ভাই? কী হয়েছে?
-আমি দ্বীন ত্যাগ করে ফেলেছি। - এমনটি মনে হচ্ছে কেন আপনার?
সে জানাল, একদিনকার কথা। আমি তখন বাসায় ছিলাম। হঠাৎ আমার মাথায় এমন কিছু ভাবনা জন্ম নিল, যা কুফরের শামিল। অতএব আমি দ্বীন থেকে বেরিয়ে গেছি। আমি পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে আমার স্ত্রীকে বিয়ে করতে চাই।
না ভাই, বিষয়টি এত সহজ নয়। এটা তো স্রেফ শয়তানের ওয়াসওয়াসা ছিল। আপনার এই ভয় প্রমাণ করে আপনার ঈমান এখনও মজবুত আছে। এই ধরণের ওয়াসওয়াসা সাহাবিদের মনেও এসেছিল।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : جَاءَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَسَأَلُوهُ : إِنَّا نَجِدُ فِي أَنْفُسِنَا مَا يَتَعَاظَمُ أَحَدُنَا أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهِ ، قَالَ : وَقَدْ وَجَدْتُمُوهُ ؟ قَالُوا : نَعَمْ ، قَالَ : ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদল সাহাবি নবিজির কাছে এসে বললেন, 'আমরা নিজেদের (মনের) ভিতর এমন কিছু পাই, যা আমাদের কারও কারও কাছে অত্যন্ত সাঙ্ঘাতিক ঠেকে।' নবিজি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা সত্যিই এমন কিছু পাও?' তারা বলল, 'জি, হ্যাঁ।' তিনি বলেন, 'এটাই খাঁটি ঈমান।[২২]
এই যে ঈমানের ব্যাপারে ভয়, এটাই খাঁটি ঈমানের পরিচয়। কারণ, এগুলো শুবুহাত নয়, স্রেফ ওয়াসওয়াসা। অতএব ওয়াসওয়াসাকে প্রাধান্য দেবেন না। মাথায় এলে দুশ্চিন্তাও করবেন না।
২) জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করুন
মাঝে মাঝে আমি খুব অবাক হই সেসব ভাই-বোনদের দেখলে, যারা সামান্য সংশয়ের মুখে ভেঙে পড়ে। তারা বলতে থাকে— "আমি শুধু একটি লেখা পড়েছি, তাতেই আমার ঈমান উবে গেল! একটু কথাবার্তা শোনার দ্বারাই অন্তরে সংশয় গেঁড়ে বসল! আমি তো শেষ, আমার মুক্তি নেই।'
আপনি কেন ভেঙে পড়ছেন? কেন বিষয়টাকে এত বাড়াবাড়ির স্তরে নিয়ে যাচ্ছেন? আল্লাহ আপনার আমার কাছে এমনটা চান না। শান্ত হয়ে বসুন। নিঃশ্বাস ছাড়ুন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আপনার সামনে কী এসেছে? এটা কি অকাট্য কিছু? বাহ্যিকভাবে একদম স্বচ্ছ? ভাবুন। আপনার অন্তরকে স্পঞ্জের মতো বানাবেন না, সামনে যা পায়, তা-ই চুষে নেয়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করুন। প্রশ্ন করতে শিখুন। যে কোনটা আপনার অন্তরে সংশয় সৃষ্টি করে, তার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুন। কিছু একটা পেলেই তাকে এত বেশি গুরুত্ব দেবেন না।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আমি একবার আমার শাইখ ইবনু তাইমিয়্যাকে অনেক প্রশ্ন করছিলাম। শাইখ আমাকে বললেন, "শুনো, তোমার অন্তরকে স্পঞ্জ বানিয়ে ফেলো না, যার সামনে সংশয়পূর্ণ যা-ই আসে, তা-ই সে শুষে নেয়। বরং তোমার অন্তরকে কঠিন ও স্বচ্ছ কাচের মতো বানাও। সংশয় যেন তাকে অতিক্রম করতে গেলে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যায়। কাচটি এতই স্বচ্ছ যে, সংশয়ে ভিতরেও সে সত্যকে দেখতে পারে।”
পরবর্তীকালে ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আমার গোটা জীবনে আমার শাইখের এই নসিহতের চেয়ে উপকারী আর কিছুই পাইনি, যা আমাকে সংশয়পূর্ণ চিন্তা থেকে বেঁচে থাকতে এতটা কাজে দিয়েছে।'
সুতরাং দ্বিতীয় মূলনীতি হলো, সংশয় সৃষ্টিকারী যে-কোনো কথা বা লেখাকে প্রশ্ন করুন। সামনে উপস্থিত যে-কোনো কিছুকেই সত্য বলে ধরে নেবেন না।
৩) জ্ঞানী ব্যক্তি খুঁজে বের করুন
আপনি যে বিষয়ে সংশয়ে ভুগছেন, সে বিষয়ে জ্ঞানী, দক্ষ ব্যক্তির শরণাপন্ন হোন। জ্ঞানী বলতে আমি আপনার এলাকার মসজিদের ইমামের কথা বোঝাচ্ছি না। আমাদের ইমাম, মাশায়েখের প্রতি সম্মান এবং শ্রদ্ধা রেখেই বলছি-মাঝে মাঝে ইমামের যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ সুমধুর কণ্ঠ। এদিকে আপনি বুকভরা আশা নিয়ে তার কাছে যাচ্ছেন, ভাবছেন আপনার সব প্রশ্নের উত্তর তার কাছে আছে। অতঃপর আপনি হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। দুবার, তিনবার, কোনো বারই সঠিক উত্তর পেলেন না। ফলে আপনি ভাবতে লাগলেন, হয়তো এর কোনো উত্তরই নেই। বিষয়টি এমন নয়। এই ক্ষেত্রে একটি নীতি মাথায় রাখবেন,
عدم العلم ليس دليلا على العدم 'কোনো বিষয়ে কারও জ্ঞান না থাকা মানে এই নয় যে ওই বিষয়ে জ্ঞানই নেই।'
আলি হাম্মুদা জানে না তার মানে এই নয় যে, আপনার প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। আপনার সমস্যার জন্য দক্ষ কাউকে খুঁজে বের করুন। কুরআনও আপনাকে তা-ই করতে বলে।
আল্লাহ তাআলার বাণী:
وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ
'অথচ তারা যদি এটা রাসূল ও তাদের দায়িত্বশীল লোকদের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়, তা হলে তা এমন লোকদের দৃষ্টিগোচর হয়, যারা তাদের মধ্যে কথা বলার যোগ্যতা রাখে এবং তা থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।'[২৩]
বিজ্ঞ ব্যক্তির শরণাপন্ন হোন। কারণ, সে আপনার সামনে সংশয়ের স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে পারবে। খণ্ডন করতে পারবে। যা আমি আপনি একাকী করতে পারব না।
৪) ঈমান রক্ষায় দুআ
আমাদের ভিতর যদি জরিপ চালানো হয় কে কে নেককার জীবনসঙ্গিনীর জন্য দুআ করেছে, তা হলে আমিসহ হয়তো সবার নামই চলে আসবে। আলহামদু লিল্লাহ। সুস্থ জীবন, সুদমুক্ত বাড়ি নির্মাণ, ভালো গাড়ি, সন্তানের শিক্ষাখাতে খরচ কমিয়ে আনা, এগুলো আমরা সবাই চাই। এ জন্য দুআও করি। দুআর দরজা তো সর্বদাই উন্মুক্ত। এগুলো অবশ্যই চাওয়া যেতে পারে।
কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আছে। তা হলো, আমাদের ঈমান। সর্বশেষ আমরা কবে ঈমান রক্ষার জন্য দুআ করেছিলাম? মনে পড়ে কি সর্বশেষ আপনি কবে হাত তুলে ঈমানের নিরাপত্তা চেয়েছেন? ইবরাহীম -এর এই দুআটি কি কখনও করেছিলেন?
وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ
'...এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন[২৪]
ইবরাহীম -এর মতো একজন নবি এই দুআ করেছেন! হ্যাঁ, তিনি নিজের ব্যাপারে এই ভয় করতেন। সেখানে আমরা কোথায়!
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ 'আমাদের সরল পথ দেখান' অন্তরের অন্তস্তল থেকে এই দুআটি করুন। এরপর দেখুন, আপনার সালাত কীভাবে পাল্টে যায়। সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
একদিন আমাদের মা আয়িশা দেখলেন নবিজি তাহাজ্জুদ পড়ছেন। তিনি তাঁকে নিম্নোক্ত দুআটি করতে শুনলেন। মুখস্থ করে ফেলুন: اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرَائِيلَ، وَمِيكَابِيلَ، وَإِسْرَافِيلَ، فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ، اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ، إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
'আল্লাহ-তুমি জিবরাঈল, মিকাঈল এবং ইসরাফীলের রব। তুমিই আসমান জমিনের স্রষ্টা। অদৃশ্য এবং দৃশ্য সম্পর্ক তুমিই অবগত। তুমি তোমার বান্দাদের মাঝে মীমাংসা করো, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করে। যে সত্য নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে, তোমার ইচ্ছায় ওই বিষয়ে আমাকে সঠিক পথ দেখাও। নিশ্চয়ই তুমি যাকে ইচ্ছা তাকেই সঠিক পথে পরিচালিত করো।[২৫]
জিবরাঈল-এর মাধ্যমে, ওহির মাধ্যমে সরাসরি রবের সাথে যে মানুষটির যোগাযোগ ছিল, সে কিনা দুআ করছে, 'আমাকে হক পথ দেখাও, যে বিষয়ে মতভেদ করা হয়!' সেখানে আমরা কোথায়? কাজেই আপনিও এই দুআ করুন। এরপর দেখুন আপনার ঈমানি সুস্থতা কীভাবে ফিরে আসে।
পরিশেষে প্রিয় পাঠক, জীবনের লক্ষ্য স্থির করুন। খুঁজে বের করুন আপনার দক্ষতা কোথায়। ভালো কোনো কাজে যুক্ত হয়ে যান। এমন কাজ যা কিয়ামাতের দিন আপনার জন্য অকল্পনীয় ফলাফল নিয়ে আসবে, মৃত্যুর পরেও যে কাজের সুমিষ্ট ফল আপনি ভোগ করতে থাকবেন।
হয়তো ভাবছেন, সংশয়ের সাথে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের কী সম্পর্ক? শেষে এসে এটা বলার হেতু কী?
সত্যি বলতে কী, অধিকাংশ সময় আমাদের সংশয়ের মূলে একটাই কারণ থাকে, অত্যধিক অবসর সময়। এ ছাড়া আর কিছুই না। আমরা খারাপ মানুষ, অজ্ঞ-জাহিল, এজন্য নয়। বরং এর চেয়েও সাধারণ বিষয় দায়ী; আমাদের অবসর সময়। আমরা অনেকেই অত্যধিক ফ্রি সময় কাটাই। কর্মহীন এই সময়গুলো শয়তানের জন্য মোক্ষম সুযোগ। খালি ময়দান পেয়ে সে তাতে সংশয়ের দানা ছুড়ে মারে। উদ্ভট সব চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে দেয়।
সংশয় নিরসন করার জন্য একজন বিজ্ঞ আলিম আছেন আমার পরিচিত। শায়খ আহমাদ। তিনি সম্প্রতি একটি চমৎকার ঘটনা বলেছেন আমাকে।
এক বোন ছিল, আমার কাছে প্রায়ই আসতেন বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে। প্রশ্নগুলোর সবকটাই সংশয়-বিষয়ক থাকত। আমি উত্তর দিতে থাকলাম। কিন্তু একটি প্রশ্ন শেষ হতে-না- হতেই সে আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপন করত। যেন সংশয়ের ঝড় বইছে তার ভিতর! আমি বুঝতে পারছিলাম না, কী করব। একদিন মনে হলো, আমি সম্ভবত সমস্যাটা ধরতে পেরেছি। তাকে ডেকে বললাম, “বোন, আমার কাছে কিছু লেকচার আছে। আমি সেগুলোর লিখিত প্রতিলিপি (transcript) করাতে চাচ্ছি। আপনার কি সময় হবে এই কাজটি নেবার? তা হলে আমার উপকার হতো।” সে বলল, “অবশ্যই, আমি পারব ইন শা আল্লাহ।” আমি তাকে ফাইলগুলো দিলাম। সে প্রতিলিপি লেখা শুরু করল। কিছু দিন যেতেই খেয়াল করলাম, প্রশ্ন আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর আর কোনো দিন সে আমার কাছে সংশয়পূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে আসেনি।'
মাত্রাতিরিক্ত অবসর সময় অধিকাংশ রোগের মূল। অতএব আপনি আখিরাতের জন্য কাজে লেগে পড়ুন। জীবনের একটি বড়ো অংশ এতে ঢেলে দিন। আজকে থেকেই। এটা স্রেফ আপনার সংশয় থেকেই রক্ষা করবে না, পরকালেও আপনাকে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করবে ইন শা আল্লাহ।
আল্লাহর কাছে দুআ করি, তিনি যেন আমাকে আপনাকে ঈমানের স্বাদ উপভোগ করার তাওফীক দেন, আমাদের ইয়াকীনের চাদরে মুড়িয়ে দেন। এবং আমাদের বাবা-মা, সন্তান-সন্ততিদের মাফ করে দেন। আমীন!
টিকাঃ
[৮] আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, ৬৬
[৯] ইবনু মাজাহ : ৮৮; আল-জামিউ আস-সগীর: ১/১০৭৮; সহীহ
[১০] মুসলিম: ২৩৯
[১১] মুসলিম, মুকাদ্দিমা
[১২] সূরা শুআরা, ২৬:৮৭-৮৯
[১৩] মিফতাহু দারিস-সায়াদাহ: ১/১১০
[১৪] মিফতাহু দারিস-সায়াদাহ: ১/১৪০
[১৫] সূরা আল-মাইদা, ৫: ৭১
[১৬] যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ৭/৪০২
[১৭] আবদুর রাজ্জাক, আল-মুসান্নাফ, ২০০৯৯
[১৮] সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭/২৬১
[১৯] আবূ দাউদ: ৪৩১৯; সহীহ
[২০] আবূ দাউদ, ৪৮৩৩; সহীহ
[২১] মুসলিম: ২২২
[২২] মুসলিম: ২১৯
[২৩] সূরা নিসা, ৪:৮৩
[২৪] সূরা ইবরাহীম, ১৪: ৩৫
[২৫] মুসলিম, ৭৭0
📄 শুদ্ধ জীবন শুদ্ধ মনন
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর একটি বিখ্যাত দুআ আছে:
وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سليم
“..(ও আল্লাহ) পুনরুত্থান-দিবসে আমাকে অপমানিত কোরো না। যেদিন ধন- সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি কোনো কাজে আসবে না। সে ব্যতীত, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তর (কলবুন সালীম) নিয়ে।”[২৬]
আজ যদি আমাদেরকে জানানো হয়, ‘আপনার হার্টের কিছু অংশ ব্লক হয়ে গেছে।’ তা হলে আমরা অনেকেই এর চিকিৎসায় অর্জিত সকল অর্থসম্পদ ব্যয় করতেও কুণ্ঠাবোধ করব না। জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড এর পেছনে দেব, তবুও এটা নিশ্চিত হতে হবে, আমার হার্ট সুস্থ। আমরা জানি, ব্লক নিয়ে নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকা যায় না। জীবন এভাবে চলতে পারে না।
সত্যিকার অর্থে অন্তরের মৃত্যু কাকে বলে—ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আমাদের জন্য সেই শিক্ষা রেখে গেছেন। আসলে অন্তরের মৃত্যু তখন ঘটে না, যখন এর স্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়, কিংবা কোলেস্টরল জমে ব্লক হয়ে যায়; বরং অন্তরের প্রকৃত মৃত্যু তখনই ঘটে, যখন এর ভিতরের ঈমান মরে যায়, বিশ্বাসটুকু নষ্ট হয়ে যায়। যখন আপনি ইসলামের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করবেন, তখনই অন্তর মৃত্যুর মুখে পড়ে।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আমাদের বলছেন, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলা সুস্থ অন্তর ছাড়া কিছুই গ্রহণ করবেন না। খুবই ভয়াবহ একটি আয়াত ভাই ও বোনেরা। যে নিষ্পাপ অন্তর নিয়ে আমরা প্রত্যেকে জন্মিয়েছি, আল্লাহ সেই অন্তর ধারস্বরূপ আমাদের দিয়েছেন। এই অন্তর আমাদের জন্য আমানত। তেমনি আমাদের কাছে আশা করা হয়েছে, দিন শেষে এই আমানতকে সেই অবস্থাতেই ফিরিয়ে দেব, যে অবস্থায় প্রথমে পেয়েছিলাম। নয়তো আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন না। মোটেও গ্রহণ করবেন না।
প্রশ্ন হচ্ছে, কলবুন সালীম বা সুস্থ অন্তর কী? সেই অন্তরের বৈশিষ্ট্য কী, যা ব্যতীত আল্লাহ তাআলা কোনোকিছুই গ্রহণ করবেন না?
মুজাহিদ বলেন,
لا شك فيه. "কলবুন সালীম হলো, যে অন্তরে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।”[২৭]
কাতাদা বলেন,
سليم من الشرك "কলবুন সালীম হচ্ছে, যে অন্তর সকল প্রকার শিরক থেকে মুক্ত।"[২৮] অর্থাৎ প্রকৃত তাওহীদে বিশ্বাসী।
দাহহাক বলেন,
هو الخالص "যে অন্তর একনিষ্ঠ।"[২৯] যে অন্তরে লোকদেখানো স্বভাব নেই। শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য।
আবূ উসমান বলেন,
القلب السليم هو القلب الخالي من البدعة المطمئن إلى السنة "কলবুন সালীম হলো, যে অন্তর বিদআত থেকে মুক্ত এবং সুন্নাহ নিয়ে পরিতৃপ্ত।"[৩০]
ইবনুল কাইয়িম ওপরের সবগুলো মণিমুক্তা একত্র করে চমৎকার একটি বাক্য দাঁড় করিয়েছেন:
ولا يتم له سلامته مطلقا حتى يسلم من خمسة أشياء: من شرك يناقض التوحيد، وبدعة تخالف السنة، وشهوة تخالف الأمر، وغفلة تناقض الذكر، وهوى يناقض التجريد والإخلاص
'একজন মুসলিমের অন্তর ততক্ষণ পর্যন্ত কলবুন সালীম হতে পারবে না, যতক্ষণ না ৫টি রোগ থেকে মুক্ত হচ্ছে:
১) শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত হওয়া, যা তাওহীদ বিনষ্ট করে।
২) বিদআত থেকে মুক্ত হওয়া, যা সুন্নাহ বিনষ্ট করে।
৩) (হারাম) খায়েশ থেকে মুক্ত হওয়া, যা (আল্লাহ ও রাসূলের) নির্দেশের বিরুদ্ধে যায়।
৪) গাফলতি থেকে মুক্ত হওয়া, যা আল্লাহর স্মরণ নষ্ট করে দেয়।
৫) প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হওয়া, যা ঈমানী দৃঢ়তা এবং ইখলাস নষ্ট করে দেয়।'[৩১]
এগুলো মনে রাখতে কষ্ট হলে শুধু এই বাক্য মনে রাখুন, 'কলবুন সালীম হচ্ছে, যে অন্তর পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।'
কুফর-শিরকের কোনো স্থান নেই এতে। বিদআতী কর্মের প্রতি আগ্রহ নেই। সংশয়বাদীদের কিংবা মুনাফিকদের সংশয়মূলক কথা-বার্তায় এই অন্তর মোটেও প্রভাবিত হয় না। বিভিন্ন প্রকার তন্ত্রমন্ত্র, আদর্শ, কিংবা পূর্ব-পশ্চিমের কোনো দর্শনে পরিচালিত হয় না। কে কী ভাবল, এসবের প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করে না, এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। সে কেবল আল্লাহর মনোযোগ চায়, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। এমন অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি অপর মুসলিমের সাথে তিন দিনের বেশি বয়কট করে থাকতে পারে না। কারণ, তার অন্তর পরিশুদ্ধ, পঙ্কিলতামুক্ত। এতে নেই মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ, কারও প্রতি আক্রোশ। কারও কল্যাণ দেখলে সে বিচলিত হয় না, হিংসা করে না। সেই কল্যাণ হতে পারে একজন সুন্দরী স্ত্রী, নতুন মডেলের গাড়ি, কিংবা চোখধাঁধানো বাড়ি... যাই হোক। এসব দেখে বলে, 'হে আমার রব, এগুলো যদি তার জন্য কল্যাণকর হয়, তা হলে আরও বাড়িয়ে দিন।'
আর কারও সাথে খারাপ কিছু হতে দেখলে সে আত্মতুষ্টিতে ভোগে না। বরং তাদের জন্য দুআ করে—'হে আমার রব, তাদের হিদায়াত দিন। তাদের কল্যাণ করুন। তাদের সুস্বাস্থ্য দিন।'
এটাই হলো প্রশান্ত আত্মার নমুনা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সমগ্র কুরআনে কলবুন সালীমের আলোচনা মাত্র দুবার এসেছে। সর্বপ্রথম এসেছে ইবরাহীম-কে উদ্দেশ্য করে। দ্বিতীয়বারও এসেছে ইবরাহীম-কেই উদ্দেশ্য করে।
প্রথমটি আমাদের আলোচ্য আয়াতগুলো। অর্থাৎ সূরা আশ-শুআরা, এর ৮৭ থেকে ৮৯ আয়াত। আর দ্বিতীয়টি সূরা সফফাতের ৮৩-৮৪ নং আয়াতগুলো:
وَإِنَّ مِنْ شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ إِذْ جَاءَ رَبَّهُ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
"আর নিশ্চয়ই ইবরাহীম তার দ্বীনের অনুসারীদের একজন। (স্মরণ করো) যখন সে তার রবের নিকট বিশুদ্ধ অন্তর (কলবুন সালীম) নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল।"
অন্তরকে মোটেও সাপবিচ্ছুর ঘর বানাবেন না ভাই-বোনেরা। হিংসাবশত কাউকে ছোবল মারা, ফাঁসিয়ে দেওয়া, কীভাবে আমি তার চেয়ে ওপরে উঠব-এই ধরণের মানসিকতা লালন করে অন্তরটাকে কীটপতঙ্গের ঘর বানাবেন না। এমন অগ্নিকুণ্ড অন্তরে প্রজ্জ্বলন করবেন না, যা আপনাকেই পুড়িয়ে মারবে, আপনারই বিপদ ডেকে আনবে। দিনশেষে আপনি নিজেই এর মধ্যে পড়ে যাবেন, এসব করে শুধু নিজেরই ক্ষতি করবেন।
তাই প্রতিদিন ঘুমোতে যাবার পূর্বে চিন্তা করুন, আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্কের বাঁধন নিয়ে। তারপর চিন্তা করুন, মানুষদের সাথে আপনি কেমন। চিন্তা করুন, কৃত- পাপগুলো নিয়ে, শিরক নিয়ে, যা আপনার তাওহীদকে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। বিদআত নিয়ে, যা আপনার কর্মপন্থায় ঢুকে যাচ্ছে। ভাবুন আপনার প্রবৃত্তির খায়েশ নিয়ে, যা আপনি সেদিন বাস্তবায়ন করেছেন। ভাবুন, আর আল্লাহর কাছে মাফ চান। ইস্তিগফার করুন, আন্তরিকভাবে তাওবা করুন।
এরপর মানুষদের দিকে মনোনিবেশ করুন। তাদের কথা ভাবুন, যারা আপনার দ্বারা কষ্ট পেয়েছে এবং যারা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে। যারা আপনার দ্বারা কষ্ট পেয়েছে, তাদের কাছে মাফ চাওয়ার মনস্থির করুন। আর যারা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের সবাইকে একে একে মাফ করে দিন। নাম ধরে ধরে তাদের জন্য দুআ করুন।
আর এসব করবেন এই আশা নিয়ে, যেন আল্লাহ আপনাকে এমন একটি অন্তর দান করেন, যা হবে পাপ-পঙ্কিলতা-মুক্ত, পবিত্র, একদম স্বচ্ছ। কলবুন সালীম।
টিকাঃ
[২৬] সূরা আশ-শুআরা, ২৬: ৮৭-৮৯
[২৭] তাবারি, আত-তাফসীর, ১৭/৫১৬
[২৮] প্রাগুক্ত
[২৯] প্রাগুক্ত
[৩০] কুরতুবি, আত-তাফসীর, ১৩/১১৪
[৩১] ইবনুল কাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফি, ১২১
📄 ক্যালেন্ডারের পাতায় ২১১১ সাল
আজ থেকে এক শ বছর পর। লেখাটি যারা পড়ছেন, আমাদের প্রত্যেকের দেহ তখন মাটির নিচে থাকবে। অস্তিত্ব তখন রূহের জগতে। দেখছি আমাদের নিজেদের তাকদীর, জান্নাতী না জাহান্নামী।
জমিনে-ফেলে-আসা আমাদের সুন্দর বাড়িটি হয়তো অন্যের দখলে চলে গেছে। পছন্দের কাপড়গুলো এখন অন্যরা পরছে, শখের গাড়িটি হয়তো অন্য কেউ চালাচ্ছে। আর আমাদের? খুব কম জনই স্মরণে রেখেছে। কেউ কেউ হয়তো ভুলেই গেছে। আচ্ছা, ব্যস্ততার এই জীবনে আপনার দাদার দাদাকে কতবার স্মরণ করেছেন? আপনার দাদির দাদিকে কখনও কি মনে পড়েছে?
প্রজন্মের-পর-প্রজন্ম পেরিয়ে আমরা এই জীবন লাভ করেছি। তেমনিভাবে নতুন প্রজন্মের ভিড়ে আমরাও একদিন হারিয়ে যাব।
এভাবে অনেক প্রজন্ম আসছে আর যাচ্ছে। কিন্তু দুনিয়াকে বিদায় জানানোর সময় খুব কম জনই ফেলে-যাওয়া জীবনটা একটু ফিরে দেখার সুযোগ পেয়েছে। বাস্তবতা হলো, এই জীবনটা আমাদের কল্পনার চেয়েও সংক্ষিপ্ত।
২১১৯ সালে কবরে শুয়ে আমরা সবাই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারব, সত্যিই দুনিয়াটা কতই-না তুচ্ছ ছিল! একে-ঘিরে-দেখা স্বপ্নগুলো কতই-না নগণ্য ছিল!
২১১৯ সালে আমরা সকলেই চাইব, 'ইশ, যদি জীবনটা মহৎ কিছুতে উৎসর্গ করতে পারতাম! ইসলামের জন্যে! নেক আমল সংগ্রহের পেছনে দিতে পারতাম! মৃত্যুর পরেও যে কাজগুলো আমাদের উপকার করে চলছে, সেগুলোর পেছনে যদি সব উৎসর্গ করতে পারতাম!'
২১১৯ সালে আমরা অনেকেই চিৎকার করে কথাগুলো বলব, কিন্তু কোনো ফল বয়ে আনবে না এই হাহাকার: ‘..আমার রব, আমাকে আবার ফেরত পাঠান। যেন আমি নেক আমল করতে পারি যা আমি আগে করিনি।[৩২]
জবাব মিলবে, ‘না, এটা হবার নয়। এটা তো তার একটা কথামাত্র, যা সে বলার জন্যই বলবে। তাদের সামনে বারযাখ থাকবে উত্থান-দিবস পর্যন্ত।[৩৩]
২১১৯ সালে আমরা অনেকেই আফসোস থেকে নিজেদের হাত কামড়াব, আর বলব, ‘হায়, আমার এ জীবনের জন্য আমি যদি কিছু অগ্রিম পাঠাতাম!’[৩৪]
ভাইরে, মৃত্যুর ফেরেশতা আমাদেরকে নেককার হবার সময় দেবে না। বোনরে, সে অপেক্ষা করবে না আমাদের জন্য...
তাই আসুন না, মালাকুল মাউত আসার আগেই আমরা সংশোধন হয়ে যাই। পাপে-ভরা জীবনটাকে পাল্টে ফেলি। চিরদিনের জন্য পাল্টে ফেলি।
টিকাঃ
[৩২] সূরা আল-মু'মিনুন, ২৩: ১১
[৩৩] আল-মু'মিনুন, ২৩: ১০০
[৩৪] সূরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৪
📄 রহমানের পরিচয়
রাসূল বলেন,
لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ وَنَفَخَ فِيهِ الرُّوح ؛ عَطَسَ ، فَقَالَ : الْحَمْدُ لِلَّهِ ، فَحَمِدَ اللَّهَ بِإِذْنِهِ ، فَقَالَ لَهُ رَبُّهُ : يَرْحَمُكَ اللَّهُ يَا آدَمُ !
'আল্লাহ তাআলা যখন আদমকে সৃষ্টি করে রূহ ফুঁকে দিলেন, তিনি হাঁচি দেন এবং বলেন, “আলহামদু লিল্লাহ।" আল্লাহর তাওফীকেই তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন। এরপর আল্লাহ বলেন, "ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুক) আদম।""[৩৫]
'আর-রহমান', কুরআনের পাতায় বিশেষ স্থান পেয়েছে আল্লাহ তাআলার এই নাম। তাই মুসলিম-মাত্রই এই নামের প্রতি বিশেষ অনুভূতি কাজ করা উচিত। আমরা আল্লাহর ৯৯টি নাম জানি। খেয়াল করলে দেখব, প্রতিটি নাম অতীব মহান, স্ব-স্ব গুণে পরিপূর্ণ এবং মহিমান্বিত। কিন্তু الرَّحْمَن 'আর-রহমান' নামটি সবগুলো থেকে ভিন্ন। এর অনন্যতা এত ব্যাপক যে, সর্বোত্তম নাম 'আল্লাহ' নামের পাশাপাশি 'আর-রহমান' নামটিও বসানো যায়। এমন কিছু গুণের সমষ্টি এই নাম, যা শুধুমাত্র আল্লাহর সাথেই যায়। আর-রহমান নামের অনন্যতা এবং মহত্ব বুঝতে নিচের ছয়টি উদাহরণ যথেষ্ট :
১. আর-রহমান কখনও Indefinite হয় না
ব্যাকরণ অনুযায়ী আর-রহমান নামটি কুরআনে অনির্দিষ্টরূপে—অর্থাৎ শুরুতে আলিফ- লাম ব্যতীত কখনও আসেনি। এই দিকে আল্লাহর অন্য নামগুলো নির্দিষ্ট-অনির্দিষ্ট উভয় রূপেই পাওয়া যায়। কুরআনে দেখবেন الْعَزِيزُ (আল-আযীয), আবার আলিফ-লাম ছাড়া শুধু عَزِيز (আযীয)-দুটোই আছে। তেমনি الْغَفُور আল-গফুর এবং غَفُورُ গফুর। ব্যতিক্রম শুধু الله এবং الرَّحْمَنِ নাম দুটোতে। কুরআনের কোথাও শুধু رحمن পাবেন না।
২. আর-রহমান নাম কাউকে অনুসরণ করে না
আল্লাহ ও আর রহমান নামের আগে আল্লাহ তাআলার অন্য কোনো নাম বসে না। যেমন আমরা কুরআনে وَإِلَهُكُمْ إِلَلَهُ وَاحِدٌ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ (তোমাদের ইলাহ একজন) পাব। কিন্তু الرَّحِيمُ الرَّحْمَنُ (আর-রহীমুর রহমান) কিংবা الْغَفُورُ الرَّحْمَنُ (আল-গফুরুর রহমান) পাব না কুরআনে। 'আল্লাহ' নামের বেলায় এটি প্রযোজ্য। আল্লাহ নামের আগে অন্যকোনো সিফাতি নাম বসে না। একইভাবে শুধুমাত্র আর-রহমান নামটিও এই মর্যাদা লাভ করেছে। আর রহমান নামের আগেও অন্যকোনো সিফাতি নাম বসে না। আল্লাহর অন্যকোনো সিফাতি নাম এই মর্যাদা লাভ করেনি।
৩. আরশের মালিক আর-রহমান
আল্লাহ তাআলা আরশে اِسْتَوَى (আভিধানিক অর্থ ‘অধিষ্ঠান’) গ্রহণের আলোচনায় কুরআনে শুধু ‘আল্লাহ’ নামটি ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ:
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى
'নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও জমিন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর আরশের ওপর সমাসীন হয়েছেন।[৩৬]
এখানেও ব্যতিক্রম দেখা যায় কেবল আর-রহমান নামে। আরশে সমাসীন হওয়ার কথা কুরআনের ভিন্ন এক আয়াতে এসেছে:
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
'রহমান আরশের ওপর সমাসীন হয়েছেন।[৩৭]
৪. আর-রহমান, শিখিয়েছেন কুরআন
কুরআন নাযিল-সংক্রান্ত আয়াতসমূহে ‘আল্লাহ’ নাম এসেছে। যেমন:
اللَّهُ الَّذِي أَنْزَلَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ
'আল্লাহ-যিনি নাযিল করেছেন সত্য-সহকারে কিতাব।'[৩৮]
এখানেও ব্যতিক্রম; আর-রহমান নামকে কুরআন নাযিলের সাথে জুড়ে দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। তিনি বলেন,
الرَّحْمَنُ - عَلَّمَ الْقُرْآنَ 'আর-রহমান—শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন।'[৩৯]
৫. আশ্রয়স্থলের আরেক নাম আর-রহমান
পানাহ বা আশ্রয় চাইতে 'আল্লাহ' নামে দুআ জপি আমরা। যেমন মূসা বলেছিলেন,
قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ 'আমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই'।[৪০]
কুরআনে আশ্রয় চাওয়ার আরেকটি ঘটনা এসেছে। কিন্তু সেখানে আল্লাহ নামের পরিবর্তে অন্য একটি নাম পাবেন, মারইয়াম বলেন,
قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَنِ مِنْكَ إِنْ كُنْتَ تَقِيًّا 'আমি আর-রহমানের আশ্রয় প্রার্থনা করছি তোমার থেকে, (আল্লাহকে ভয় করো) যদি তুমি মুত্তাকী হও।'[৪১]
৬. শাফাআত এবং আর-রহমান
শাফাআত বা সুপারিশ; এই বিষয়ে কুরআনের সব আয়াত আল্লাহ নাম পাবেন। আল্লাহ বলেন:
قُلْ لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا 'বলুন, সকল সুপারিশ আল্লাহর (এখতিয়ারে)।'[৪২]
শাফায়াত-সংক্রান্ত আয়াতে অন্য কোনো নামের দেখা না পেলেও আর-রহমানকে ঠিকই পাবেন।
আল্লাহ বলেন, يَوْمَئِذٍ لَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا
'সেদিন কারও সুপারিশ কাজে আসবে না, কেবল তার ব্যতীত যাকে আর-রহমান অনুমতি দেবেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হবেন।'[৪৩]
গুটিকয়েক উদাহরণ ছিল এগুলো। আর-রহমান নাম কতটা মর্যাদাপূর্ণ ওপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। ঠিক একই কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلِ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَنُ أَيًّا مَا تَدْعُوا فَلَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى
'হে নবি! এদেরকে বলে দাও, আল্লাহ বা আর-রহমান যে নামেই ডাকো না কেন, সব উত্তম নামই তাঁর।।'[৪৪]
নবিজি -ও আমাদের শিখিয়েছেন, আল্লাহর দুটো প্রিয় নাম হতে যে-কোনো একটি দিয়ে বাচ্চাদের নাম রাখা যেতে পারে। প্রথমটি 'আবদুল্লাহ', আর দ্বিতীয়টি 'আবদুর-রহমান'।।
আর-রহমানকে আমরা কতটুকু জানি?
الرَّحْمَنُ এবং الرَّحِيمُ দুটো নামই রহমত থেকে এসেছে।
ইবনু মানসুর এর ব্যাখ্যায় বলেন, الرقة والتنظف অর্থাৎ 'অন্তরের দুর্বলতা, সদয় হওয়া।'
এটা হলো রহমতের শব্দের আভিধানিক অর্থ। মানুষ হিসেবে আমরা এই সংজ্ঞা নিজেদের বেলায় ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে? মোটেও না। এটা আল্লাহর সাথে শোভা পায় না। আমাদের আল্লাহকে কোনো দুর্বলতা স্পর্শ করে না। আমাদের স্রষ্টা আবেগ দ্বারা পরিচালিত হন না, যেমনটা আমরা হয়ে থাকি।
কোনো শিশুকে কষ্ট পেতে দেখলে আমাদের হৃদয় ভেঙে যায়, চোখযুগল অশ্রুসিক্ত হয়ে আসে। এই অনুভূতির কারণে শিশুটির প্রতি যত্নশীল হতে আমরা বাধ্য হই। মানব হৃদয়ের রহমত, দয়া, মমতা এমনই। কিন্তু মনের এই দুর্বলতার উদাহরণ কি আমরা আল্লাহর শানেও ব্যবহার করতে পারি? মোটেই না।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দয়া এবং আল্লাহর দয়ার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। আমরা দয়ার দ্বারা দুইভাবে উপকৃত হই। দয়ার মাধ্যমে দয়াপ্রার্থী উপকৃত হয়, আর দয়াকারী অপরাধবোধ ও আফসোস দূর করে। অর্থাৎ মানুষের দয়া করার ব্যাপারটা উভয়মুখী। কিন্তু আল্লাহর দয়া এরূপ নয়।
কাজেই, আল্লাহ তাআলার ‘আর-রহমান’—যা এসেছে ‘রহম’ ধাতু থেকে—এবং আমাদের রহম যদিও আপাতদৃষ্টিতে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়, তথাপি আল্লাহর দয়া এবং আমাদের দয়ার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য।
ইবনুল কাইয়িম এর সমাধান দিয়েছেন। আল্লাহর দয়ার সংজ্ঞা কী হবে, মানুষের দয়া এবং আল্লাহর দয়ার মধ্যে পার্থক্য কী—এ প্রশ্নের উত্তরে দিয়েছেন একটি বাক্যে। তিনি বলেন,
الرحمة صفة تقتضى إيصال المنافع والمصالح إلى العبد، وإن كرهتها نفسه، وشقت عليها
“আর-রহমান একটি সিফাত (গুণ)। এ দ্বারা বান্দার জন্য যা কিছু উপকারী ও কল্যাণকর—আল্লাহ সেগুলো পৌঁছে দেন। যদিও-বা বান্দার নফস তা অপছন্দ করে এবং কষ্টদায়ক মনে করে।”[৪৫]
আরও সহজ করে বলছি:
ধরুন, একজন মা। তিনি তাঁর সন্তানকে পরীক্ষার পড়া রিভাইস করতে বাধ্য করেন এবং সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধুদের সাথে দেখা করা বন্ধ করে দেন। এখন সন্তানের অনুভূতি কেমন হবে? অবশ্যই সন্তান অপছন্দ করবে, কিন্তু তার মা এটাকে মমতা হিসেবেই দেখেন। আর সত্যি বলতে, মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক।
যখন সন্তান ডান-বাম না দেখেই রাস্তা পার হতে নেয়, মা চিৎকার করতে থাকেন। সন্তানের ওপর কঠোর হন। তেমনিভাবে আল্লাহ তাআলাও আমাদেরকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন। শ্রেফ আমাদের ভালোর জন্যই, এখানে তাঁর কোনো স্বার্থ নেই। আল্লাহ বলেন,
وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَاللَّهُ رَءُوفُ بِالْعِبَادِ
'আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদেরকে সাবধান করছেন, বস্তুত আল্লাহ বান্দাদের প্রতি খুবই স্নেহশীল। '[৪৬]
ইবনুল কাইয়িম-এর দেওয়া সংজ্ঞা এত গুরুত্ব দেবার কারণ কী? আমরা হয়তো প্রায়ই দেখে থাকি, মানুষ তার আশা পূরণে যখন ব্যর্থ হয়। দিনের-পর-দিন-বোনা-স্বপ্ন যখন স্বপ্নই থেকে যায়, তখন সে আল্লাহকে দোষারোপ করে। বস্তুত এই ধরণের মন্তব্য কেবল তারাই করে, যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর রহমত বুঝতে পারেনি। আল্লাহ ভালো করেই জানেন, যার জন্য আপনি এত অস্থির হয়েছিলেন, সেটা আপনার জন্য ক্ষতিকর। তাই আল্লাহর দয়া আপনার এবং আপনার ইচ্ছার মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন আপনি ক্ষতিকর জিনিস থেকে বেঁচে যান। আপনাকে বাঁচানোর জন্যই আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় ওই বিষয়টিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের ক্ষীণ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আর-রহমানের রহমত দেখতে পাই না। কৃতজ্ঞতার বদলে আর-রহমানকেই দোষারোপ করে বসি। তাই তো কবি বলেন,
فَلَرُبَّمَا كَانَ الدُّخُولُ إِلَى العُلا وَالْمَجْدِ مِنْ بَوَّابَةِ الْأَحْزَانِ
'সফলতা এবং শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় পৌঁছোতে কখনও কখনও দুঃখ-কষ্টের অসংখ্য দরজা অতিক্রম করতে হয়।'
জীবনের পরতে পরতে আর-রহমান
প্রায়ই মাসজিদের ইমামকে মিনতি-সুরে দুআ করতে শুনি। আমাদের শাইখগণ আল্লাহর দয়া চাইতে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। তারা নিজেরাও বলতে থাকেন, 'হে আল্লাহ, আমাদের প্রতি দয়া করো।'
তাত্ত্বিকভাবে এখন আমরা জানি দয়া বলতে কী বোঝায়। কিন্তু এরপরেও অনেকের মনে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্নটি নিয়ে তারা দোটানায় থাকেন। অনেক সময় লজ্জায় মুখ ফুটে তা বলতে পারেন না। প্রশ্নটা হলো- 'আমার ওপর যদি আল্লাহর দয়া থেকেই থাকে, তা হলে আবার দয়া ভিক্ষা চাওয়ার মানে কী?'
নিচের পয়েন্টগুলো মন দিয়ে পড়ুন, আল্লাহর দয়ার ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে ইন শা আল্লাহ:
১. কুরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে আর-রহমানের দয়া
আপনি যখন আল্লাহর কাছে এই বলে ফরিয়াদ করেন—'আল্লাহ, আমার প্রতি দয়া করুন', তখন আপনি মূলত আল্লাহর কাছে কুরআনের জ্ঞান চাচ্ছেন। আল্লাহ বলেন,
الرَّحْمَنُ - عَلَّمَ الْقُرْآنَ – خَلَقَ الْإِنْسَانَ – عَلَّمَهُ الْبَيَانَ
'আর-রহমান; এ কুরআনের শিক্ষা দিয়েছেন; তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন; এবং তাকে কথা শিখিয়েছেন।[৪৭]
এই আয়াতের ব্যাপারে ইমাম ইবনুল কায়্যিম তাঁর (الصواعق المرسلة) গ্রন্থে বলেন,
تأمل كيف جعل الخلق والتعليم ناشئا عن صفة الرحمة متعلقا باسم الرحمن
'গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ করুন, কীভাবে আল্লাহ তাআলা এখানে সৃষ্টি-করা এবং শিক্ষা-দেওয়ার কাজ দুটোকে 'রহমাহ'র গুণের সাথে সম্পর্কিত করেছেন এবং আর-রহমান নামের সাথে জুড়ে দিয়েছেন![৪৮]
২. দাওয়াতি কাজে দয়া
রহমত চাওয়ার আরেকটি অর্থ হলো সফল দাঈ হবার তাওফীক পাওয়া। যখন আল্লাহর দয়ার জন্য আপনি কাঁদছেন, তখন আল্লাহর কাছে সফল দাঈ হিসেবে কবুল হওয়ার জন্যই বলছেন। আল্লাহ তাআলা নবি ﷺ-কে বলেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
'আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রুঢ় ও কঠোর-চিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।[৪৯]
সমাজের গড়পড়তা মুসলিমদের মতো জীবনটা কাটিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? মন থেকে চান আপনার ওসিলায় মানুষ আল্লাহর পথে ফিরে আসুক? জান্নাতের ভূমিতে আপনার জন্য ঘর নির্মাণ করা হোক? জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যেতে চান? তা হলে আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে চলে আসুন, তাঁর দয়ার ভিক্ষা চান।
৩. পাপমোচনে দয়া
খুব আশা কাজ করে, যদি সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হতো! স্মরণে আছে কিংবা ভুলে গেছেন—এমন সকল পাপের শাস্তি থেকে নিস্তার পেতে চান আপনি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
'তোমাদের কেউ যদি অজ্ঞতাবশত কোনো খারাপ কাজ করে বসে, তারপর তাওবা করে এবং সংশোধন করে নেয়, তা হলে তিনি তাকে মাফ করে দেন এবং নরম নীতি অবলম্বন করেন, এটি তাঁর দয়া ও অনুগ্রহেরই প্রকাশ।।[৫০]
দয়াময়ের রহমত যদি একটি বারের জন্য আপনার দিকে চোখ তুলে তাকায়, তা হলে পাহাড়সম পাপ নিমিষেই ধূলিকণায় পরিণত হবে। তিনি পরম দয়ালু, তাঁর দয়া ছাড়া আদম-সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
৪. স্বপ্ন পূরণে দয়া
আল্লাহর দয়া ভিক্ষা চাওয়া মানে জীবনের সকল বাধা-বিপত্তি থেকে মুক্তি পাওয়া। আল্লাহর দয়া পাওয়া মানে জীবনের স্বপ্নগুলো সত্য হওয়া। আর দয়া থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে হারিয়ে-যাওয়া, তলিয়ে-যাওয়া সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে। আল্লাহর শপথ, কেউ হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে নরম রেশমি বিছানায় ঘুমানোর সামর্থ্য রাখে, সামর্থ্য রাখে সর্বোত্তম খাবার ক্রয়ের, কিন্তু এসবে যদি আল্লাহর দয়া না থাকে তা হলে রেশম হবে পাথরের বিছানা, আর দামি সুস্বাদু খাবার বিষে পরিণত হবে। পক্ষান্তরে কেউ হয়তো পাথরের ওপরেই ঘুমায়, আয়-রোজগার সামান্য, দিন আনে দিন খায়, কিন্তু এতে যদি আল্লাহর দয়া থাকে তা হলে পাথরের বিছানাাতেও সে রেশমি বিছানার মতো আরাম পাবে। দরিদ্রের কষাঘাতেও থাকবে প্রশান্ত। চরম মানসিক আঘাতের মুহূর্তগুলোও মনে হবে জান্নাতী সুখের মতো।
এ হলো সে রহমত, যা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পেয়েছিলেন, যখন তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। তীব্র আগুনের তাপ গায়ে স্পর্শ করার আগেই তা রূপ নেয় সুশীতল হয়ে যায়।
এ হলো সেই রহমত, যা কারাগারের বন্দিদশায় পেয়েছিলেন ইউসুফ আলাইহিস সালাম। ফলে অন্ধকার-প্রকৌষ্ঠ হয়েছিল সূর্যের আলোর থেকেও দীপ্তিমান।
এ হলো সেই রহমত, যা মূসা সন্ধান পেয়েছিলেন একজন জালিমের ঘরে বেড়ে ওঠার সময়। ফলে বাল্যকালে রক্তপিপাসু ফিরআউনের ঘরেও ছিলেন সবচেয়ে নিরাপদ, নিশ্চিন্ত।
এ হলো সেই রহমত, যা ইউনুস পেয়েছিলেন মাছের পেটে বসে। ফলে মৃত্যুর খাদে পড়েও বেঁচে ফিরেছিলেন।
এ হলো সেই রহমত, যার সন্ধান আসহাবে কাহাফের যুবকেরা পেয়েছিল গুহার গভীর অন্ধকারে। ফলে সেই গুহা পরিণত হয়েছিল সর্বোত্তম আশ্রয়কেন্দ্রে।
এ হলো সেই রহমত, যা নসিব হলে দুঃখে-ভরা জীবনে সুখের দেখা মেলে। কষ্টগুলো পাল্টে যায়। আনন্দের বারিধারায় সিক্ত হয় গোটা জীবন। আর পদে-পদে-আসা পরীক্ষাগুলো প্রশান্তিকর মনে হয়।
আল্লাহ তাআলা যদি আপনার দুআ কবুল করেন, তাঁর অগণিত রহমত থেকে একটু দয়া বর্ষণ করেন, তবে আপনি হবেন পৃথিবীর সব থেকে সুখী। একবার নসিব হলে এই রহমত ছিনিয়ে নেবার শক্তি কারও নেই। আল্লাহ বলেন,
مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكُ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
'মানুষের জন্য যে রহমত আল্লাহ উন্মুক্ত করে দেন, তা আটকে রাখবার কেউ নেই। এবং যা তিনি আটকে রাখেন, তা পাঠাবার কেউ নেই। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [৫১]
দয়াময়ের দয়া থেকে বঞ্চিত যারা
এতকিছুর পরেও এমন মানুষ থাকবেই, যারা আল্লাহর দয়া থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে। মানুষগুলো অতি আশাবাদী প্রকৃতির। এরা বোঝে না দয়া পেতে চেষ্টা করতে হয়, সাধনা করতে হয়। সাময়িক সময়ের চেষ্টা-সাধনা করতে তারা অপারগ। ফলে আল্লাহর বিশেষ দয়া থেকে বঞ্চিত থেকে যায় আজীবন। আল্লাহর দয়া পেতে হলে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। চোখের পানি ঝরিয়ে কাঁদতে হয়। ত্যাগের দরিয়া পাড়ি দিতে হয়। এই বিষয়গুলো তারা এড়িয়ে যায়। খুব সম্ভব তারা এই আয়াতটি পড়েনি, যেখানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, কারা তাঁর রহমত পাওয়ার যোগ্য:
وَرَحمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ
'আর আমার অনুগ্রহ সব জিনিসের ওপর পরিব্যপ্ত হয়ে আছে। কাজেই তা আমি এমন লোকদের নামে লিখবে যারা নাফরমানি থেকে দূরে থাকবে, যাকাত দেবে এবং আমার আয়াতের প্রতি ঈমান আনবে।'[৫২]
أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِداً وَقَابِما يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ
'যে ব্যক্তি রাতের প্রহরে সাজদাবনত থাকে এবং দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার রবের দয়া আশা করে (সে কি তার মতো, যে এরূপ করে না)?'[৫৩]
قَالَ يَا قَوْمِ لِمَ تَسْتَعْجِلُونَ بِالسَّيِّئَةِ قَبْلَ الْحَسَنَةِ لَوْلَا تَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
'(সালিহ) বলল, “হে আমার জাতির লোকেরা! ভালোর পূর্বে তোমরা মন্দকে ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ কেন? আল্লাহর কাছে মাগফিরাত চাচ্ছ না কেন? হয়তো তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করা যেতে পারে।[৫৪]
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
'আর তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য করো, যাতে তোমার প্রতি দয়া করা হয়।[৫৫]
ادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ
'তাঁকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।[৫৬]
নিছক আশা দিয়ে দয়া নসিব হয় না। দয়া পেতে কাজে নামতে হয়, কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়, পাপের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও ছেড়ে দিতে হয়। আর আল্লাহ যখন আপনার মধ্যে দৃঢ় ইচ্ছা দেখবেন, তিনি তাঁর অসীম রহমত বর্ষণ করবেন। কাজেই আল্লাহর রহমতের বারিধারায় নিজেকে সিক্ত করুন। আর-রহমানের অসীম দয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।
একটি বার ভাবুন, মুখে সিগারেট রেখে আমরা আল্লাহর দয়া পাবার আশা করতে পারি না। টিভিতে কিংবা ইন্টারনেটে অশ্লীল দৃশ্য দেখার সময়, কিংবা কান দিয়ে হারাম গান শোনার মুহূর্তে আমাদের ওপর আল্লাহ দয়া করবেন, এটাও আমরা আশা করতে পারি না।
সত্যি করে বলুন তো, কীভাবে আমরা তাঁর দয়া আশা করতে পারি? আমরা তো নানান অজুহাত দেখিয়ে পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ এড়িয়ে চলছি! কীভাবে আমরা আল্লাহর দয়া আশা করতে পারি, অথচ পাপের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি!
পাপের দরিয়া ছেড়ে আসার বাসনা সবার হৃদয়েই থাকা উচিত। পাপীদের আড্ডাখানা ছেড়ে আসাটা গুহায় আশ্রয় নেবার সিদ্ধান্তের মতোই। যখন পাপাচার চারিদিক ঘিরে ফেলল, তখন আসহাবে কাহাফের যুবকেরা একে অপরকে বলেছিল:
فَأْوُوا إِلَى الْكَهْفِ يَنْشُرْ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِنْ رَحْمَتِهِ وَيُهَيِّئْ لَكُمْ مِنْ أَمْرِكُمْ مِرفَقًا
'গুহায় আশ্রয় নাও। তা হলে তোমাদের রব তোমাদের জন্য তাঁর রহমত উন্মুক্ত করে দেবেন এবং তোমাদের জন্য তোমাদের জীবনোপকরণের বিষয়টি সহজ করে দেবেন।'[৫৭]
গুহা কোনো আরামের জায়গা নয়। বড়োই অস্বস্তিকর, জনমানবশূন্য, অন্ধকারচ্ছন্ন একটি জায়গার নাম গুহা। তা স্বত্ত্বেও তাদের দৃঢ়-বিশ্বাস, দয়াময়ের অনুগ্রহ একদিন আসবেই। এই কঠিন পরীক্ষা থেকে একদিন নিস্তার মিলবেই। হ্যাঁ, এসেছিল। সত্যিই এসেছিল। এমনভাবে এসেছিল, যা মানব-ইতিহাসকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আর আল্লাহর সাহায্য যখন আসে, এভাবেই আসে।
তাই বলে সবাইকে কি আক্ষরিক অর্থেই গুহায় আশ্রয় নিতে হবে?
না। কারও জন্য গুহায় আশ্রয় নেওয়া মানে হলো অন্তরের অন্তস্তল থেকে তাওবা করা। পাপে জর্জরিত সমাজে দ্বীনদার সঙ্গী খুঁজে পাওয়া, তার সাথে জান্নাতের দিকে ছুটে চলা। কারও জন্য গুহায় আশ্রয় নেওয়া মানে প্রতিদিন কুরআনের সাথে কিছু মুহূর্ত কাটানো, কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। কারও জন্য গুহায় আশ্রয় নেওয়া মানে মাসজিদে যাওয়া, আল্লাহর ঘরের সাথে অন্তর জুড়ে রাখা।
যখন সমাজের সর্বস্তরে পাপ ঢুকে পড়েছিল, তখন নির্মল পরিবেশেও তাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তাওহীদের কথা বলায় আপন মানুষগুলোও শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। তখন আসহাবে কাহাফের যুবকেরা আল্লাহর দয়ার সাক্ষাৎ পেয়েছিল। হ্যাঁ গুহাতেই। তদ্রূপ গুহা কিন্তু আমার আপনার জীবনেও আছে। আপাতদৃষ্টিতে তা গুহা মনে হলেও আসলে সেটি গুহা নয়, মুক্তি!
মুক্তির সেই দরজা আজও খোলা আছে। আল্লাহর রহমত আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। জীবনের কান্নাকে হাসিতে পরিণত করতে এবং দুঃখকে সুখের চাদরে ঢেকে দিতে সে অপেক্ষা করছে। ফিরে আসুন, ফিরে আসুন আর-রহমানের ছায়াতলে...
টিকাঃ
[৩৫] তিরমিযি, ৩৩৬৮; সহীহ
[৩৬] সূরা আ'রাফ, ৭:৫৪
[৩৭] সূরা ত্বহা, ২০:৫
[৩৮] সূরা শুআরা, ৪২: ১৭
[৩৯] সূরা আর-রহমান, ৫৫: ১-২
[৪০] সূরা বাকারাহ, ২: ৬৭
[৪১] সূরা মারইয়াম, ১৯ : ১৮
[৪২] সূরা যুমার, ৩৯: ৪৪
[৪৩] সূরা ত্বহা, ২০: ১০১
[৪৪] সূরা আল-ইসরা, ১৭: ১১০
[৪৫] ইয়াছাউন, ২/২৭৪
[৪৬] সূরা আল ইমরান, ৩: ৩০
[৪৭] সূরা আর-রহমান, ৫৫: ১-৪
[৪৮] মুখতাসারু সাওয়াইকিল মুরসালাহ, ৩৬৯
[৪৯] সূরা আল ইমরান, ৩ : ১৫৯
[৫০] সূরা আনআম, ৬:৫৪
[৫১] সূরা ফাতির, ৩৫:২
[৫২] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৫৬
[৫৩] সূরা যুমার, ৩৯ : ৯
[৫৪] সূরা নামাল, ২৭:৪৬
[৫৫] সূরা নূর, ২৪:৫৬
[৫৬] সূরা আ'রাফ, ৭:৫৬
[৫৭] সূরা কাহাফ, ১৮:১৬