📄 সাফল্যের এপিঠ-ওপিঠ
বছর কয়েক আগের কথা। অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস মারা গেলেন। এমন কেউই হয়তো নেই, যে কিনা জবসের মৃত্যুসংবাদ শোনেনি। প্রায় একই সময়ে উম্মতে মুহাম্মাদী এমন একজনকে হারিয়েছে, যাঁকে একদিক থেকে একুশ শতকের কিংবদন্তীর খেতাব দেওয়া যায়। মিডিয়া-জুড়ে যখন স্টিব জবসের মৃত্যুর খবর প্রচারিত হচ্ছে, সেই সময় এই মানুষটি চলে যান। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের খবর খুব কম লোকই জানতে পারে।
আজ আপনাদেরকে এমনই এক ব্যক্তির গল্প শোনাব। দুনিয়ার জীবনে তিনি হয়তো যোগ্য আসন পাননি। কিন্তু আমরা আশাবাদী-ওপারে ঠিকই পেয়ে গেছেন, বিইজনিল্লাহ।
বলছি ডা. আবদুর রহমান সুমাইত রহিমাহুল্লাহ-এর কথা। তিনি কুয়েতের একজন ডাক্তার; মেডিসিন এবং সার্জারি-বিশেষজ্ঞ ছিলেন। পড়াশোনা করেছেন বাগদাদ ইউনিভার্সিটি থেকে। আট-দশ জন ছাত্রের মতো তিনিও স্নাতক সমাপ্ত করেন। এরপর পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। University of Liverpool থেকে Tropical diseases এর ওপর ডিপ্লোমা কোর্স করেন ১৯৭৪ সালে। এরপর স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন কানাডার Magil University of Montreal বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই ধাপে তিনি internal diseases এবং gastro enterology the digestive system এর ওপর বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন।
এগুলো বলার উদ্দেশ্য হলো, আমার-আপনার মতোই খেটে-খাওয়া-মানুষ ছিলেন ডা. আবদুর রহমান সুমাইত। বিয়ে করেছিলেন এক নারীকে, যার ডাক-নাম উম্মু সুহাইব। অর্থাৎ সুহাইবের মা। ডা. সুমাইত ছিলেন 'আবু সুহাইব', আর তাঁর স্ত্রী উম্মু সুহাইব। সুখের সংসার ছিল তাঁদের।
উম্মু সুহাইব ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার মহিলা। একদিন তিনি তাঁর স্বামীকে বললেন, 'সুহাইবের বাবা, একটা কথা। আমি চাই না আট-দশজন লোকের মতো স্রেফ খেয়েপরেই আমাদের জীবনটা কেটে যাক। এর চেয়েও মহৎ কোনো উদ্দেশ্যে আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই আমাদের আরও বড়ো কিছু করতে হবে।' স্বামী জানতে চাইলেন, 'প্রিয়তমা, তুমি কী ভাবছ? আমাকে বলো।' স্বামীর বিস্ময় ভেঙে দিয়ে স্ত্রী বললেন, 'আমি মনে করি, আমাদের উচিত মানুষদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা, দাওয়াহ দেওয়া। আপনি কী বলেন?' আবূ সুহাইব বললেন, 'আমিও তাই মনে করি, আমাদের আসলেই উচিত মানুষদের আল্লাহর পথে আহ্বান করা।' স্বামীকে রাজি হতে দেখে স্ত্রী ভীষণ খুশি-'চমৎকার! তা হলে চলুন, আমরা পূর্ব-এশিয়ায় যাই আর সেখানে আমাদের বাকিটা জীবন উজাড় করে দিই! আমি শিক্ষকতার পাশাপাশি দাওয়াহ দিলাম। আর আপনি ডাক্তারি পেশা চালিয়ে গেলেন, সাথে সাথে দাওয়ার কাজও করলেন। আল্লাহ যদি আমাদের মধ্যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দেখতে পান, তা হলেই আমরা সফল।' আল্লাহ বলেন,
إِن يَعْلَمَ اللَّهُ فِي قُلُوبِكُمْ خَيْرًا يُؤْتِكُمْ خَيْرًا مِّمَّا أُخِذَ مِنكُمْ
'যদি আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালো কিছু দেখেন, তা হলে তোমাদের থেকে যা নেওয়া হয়েছে তা থেকে তিনি অনেক বেশি দেবেন।[১]
এ সময় কুয়েতের প্রাক্তন আমীর জাবির-এর স্ত্রী ডা. সুমাইতকে ডেকে পাঠান। তিনি ডা. সুমাইতকে বলেন, 'আমার জমানো কিছু টাকা আছে। ওগুলো আপনাকে দিতে চাই। এই টাকা নিয়ে আপনি আফ্রিকায় যাবেন। আর আমার নামে একটা মাসজিদ করবেন। আমি চাই মাসজিদের নির্মাণকাজ আপনি নিজেই তদারকি করবেন।' তিনি সেই অর্থ গ্রহণ করে বিদায় নেন। এরপর মাসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্যে চলে যান আফ্রিকায়।
আফ্রিকা মহাদেশের এক শহরে অবতরণ করেন তিনি। এরপর শুরু করেন মাসজিদ নির্মাণকাজ। কাজের ফাঁকে আফ্রিকার কিছু গ্রামও হেঁটে হেঁটে দেখতে থাকেন। এসময় তিনি যা দেখলেন, তাতে প্রচণ্ড বিস্ময়, হতাশা ও আতঙ্ক অনুভব করলেন। এতকাল বইপুস্তকে যা পড়েছেন সব যেন চাক্ষুষ দেখতে পাচ্ছেন। তিনি এমন মুসলিমদের দেখা পান, যারা জানে না কীভাবে সূরা ফাতিহা পড়তে হয়। এমন মুসলিমও আছে, যারা জানে না ইসলামের আরকান কী কী, জানে না সালাত কীভাবে পড়তে হয়; সাওম-হাজ্জ- যাকাতের কথা বাদই দিলাম। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো একদমই ভুলে গেছে তারা।
ডা. আবদুর রহমান বলেন, 'শুধু তাই নয়, দেখলাম মাসজিদের ইমামগণ মাসজিদের ভিতরে যিনায় লিপ্ত। তারা জানেই না এগুলো হারাম। সাথে আছে অমুসলিমরাও।' এ ছাড়া আরও যা কিছু দেখলেন, সবই ছিল খারাপির শীর্ষে। শিরক আর পৌত্তলিকতায় ছেয়ে গেছে গোটা সমাজ। দেখলেন, মানুষজন চাঁদ তারার পূজা করছে। সাজদা দিচ্ছে গাছকে, সেই সাথে একে অপরকেও। স্রষ্টার ধারণা তাদের অন্তর থেকে যেন সমূলে উঠে গেছে। খ্রিস্টান মিশনারিরাও এসেছে আফ্রিকায়। তাদের দাওয়াত পেয়ে টাকার লোভে গ্রামের লোকজন ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হতে শুরু করল। তারা আপন ধর্ম ছেড়ে দিচ্ছে কেবল খাদ্য পানির অভাবে, থাকার কোনো জায়গা না পেয়ে। তানযানিয়া, মালাবি, মাদাগাস্কার, দক্ষিণ সুদান, নাইগার ইত্যাদি জায়গায় তিনি এসবের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে এলেন।
এসব দেখার পর ডা. সুমাইত মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়লেন। যেন আত্মযন্ত্রণায় তার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে উম্মতের এই করুণ দশা দেখে। দেশে ফিরে আর দেরি করলেন না। উম্মু সুহাইবকে খুলে বললেন কষ্টের কথাগুলো। কাতর-কণ্ঠে বললেন, 'আমাদের অবশ্যই এসব নিয়ে কিছু করা উচিত।' স্ত্রী বললেন, 'আমরা কী করতে পারি?'
হ্যাঁ, সেদিন থেকেই ডা. সুমাইত আফ্রিকার মানুষগুলোর হিদায়াতের জন্য উৎসর্গ করে চললেন তাঁর জীবন, সময়, শ্রম, অশ্রু, সম্পদ-সবকিছু। সমস্ত-কিছু আল্লাহর জন্য, আল্লাহর পথে দাওয়াতের জন্য ঢেলে দিয়েছেন উম্মতের এই দরদী পিতা। মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে নয়, এসব তিনি একাই করেছেন নিজ পরিবারকে সাথে নিয়ে। এভাবেই আফ্রিকায় শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন একটি অধ্যায়। ড. আবদুর রহমান সুমাইত-এর অভিজ্ঞতার কিছু অংশ আমি সংক্ষেপে উল্লেখ করছি :
ড. মূসা শারিফ হাফিযাহুল্লাহ পরিচালিত একটি ইন্টারভিউতে অংশগ্রহণ করেছিলেন ড. আবদুর রহমান। সেই অনুষ্ঠানে তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে এমন কিছু কথা বলেন, যা আমাদের চিন্তার বাহিরে। তিনি বলেন, 'কিছু গ্রামে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছে দেওয়াটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই গ্রাম এবং আমাদের মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় এক বিশাল নদী। বদ্ধ নদী হলেও এতে পানি ছিল বেশ। কিন্তু ময়লা, আবর্জনায় এত টইটম্বুর যে, পানি একদম কালো হয়ে গেছে। সব রকমের রোগ-বালাই আর পোকামাকড়ের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। হেঁটে হেঁটে এই নদী পার হওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তাও ছিল না আমাদের সামনে।'
তিনি বলেন, 'আমরা নদীতে নামি। ধীরে ধীরে এর পানিও আমাদের গলা পর্যন্ত উঠে আসে।' উপস্থাপক প্রশ্ন করেন, 'নদীর ওপারে পৌঁছোতে এভাবে কতক্ষণ হাঁটতে হয়েছিল?' শাইখ বলেন, 'দুই থেকে চার ঘণ্টা।'
প্রিয় পাঠক, ভেবে দেখুন। তিনি একজন ডাক্তার! tropical diseases এর ওপর তার ডিগ্রি রয়েছে! খুব ভালোকরেই জানেন, বিষাক্ত পানিতে এতক্ষণ থাকা কতটা বিপজ্জনক।
ড. আবদুর রহমান বলেন, 'আফ্রিকার কাঁচাপথ মাড়িয়ে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে কখনও কখনও ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছে আমাদের। আবার এমনও হয়েছে, তিনদিন পেরিয়ে গেছে কিন্তু খাওয়ার মতো কিছু পাইনি। মনে পড়ে একবার আমি হাঁটু গেড়ে বসেছিলাম দুর্গন্ধ আর আবর্জনায় ভর্তি একটা পুকুরের ধারে। হাত দিয়ে গর্ত করছিলাম এই আশায়, যদি গলা ভেজানোর মতো একটু পরিষ্কার পানি পাই...
সত্যিই, দাওয়াতের পথ মোটেও মসৃণ নয়। কেনিয়া, মজাম্বিক এবং মালাবিতে ড. আবদুর রহমান কমপক্ষে তিনবার ভয়ঙ্কর বিষধর গোখরা সাপের ছোবলে পড়তে নিয়েছিলেন। প্রতিবার আল্লাহ তাঁকে অলৌকিকভাবে বাঁচিয়ে দেন। এ ছাড়া দুই-দুইবার তাঁকে গুপ্ত হত্যার চেষ্টা করা হয়, দুবার কারাবরণ করতে হয়, এবং মৃত্যুদণ্ডের শঙ্কা পর্যন্ত তৈরি হয়।
ডা. আবদুর রহমান ইন্টারভিউতে জানান, আফ্রিকা থেকে তিনি কী পরিমাণ রোগ-বালাই নিয়ে ফিরেছিলেন। প্রায়ই এমন গ্রামে যেতে দরকার হতো, যেখানে যেতে তিনি ট্রাকের পিছনে চেপে বসতেন। কিন্তু রাস্তা কাঁচা হওয়ায় ট্রাকের একপাশ থেকে আরেকপাশে ক্রমেই গড়িয়ে পড়েছেন। এভাবে ধাক্কা খেতে খেতে গেছেন পুরোটা পথ!
কেন? কেন তিনি এতটা কষ্ট স্বীকার করছিলেন? কারণ, তিনি আল্লাহর কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সস্তা মূল্যের বিনিময়ে নয়, বরং রাজাধিরাজ আল্লাহর জন্য নিজেকে বিক্রি করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা এই শ্রেণীর মানুষদের ব্যাপারে বলেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْرِى نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ
'আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেকে সঁপে দেয়। আর আল্লাহ (তাঁর) বান্দাদের প্রতি স্নেহশীল।[২]
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ চমৎকার কিছু কথা বলেছেন বিলাল সম্পর্কে — বিলাল ইসলামের জন্য বুকে পাথরের চাপা সহ্য করেছেন। ওপরে কয়লার মতো গরম পাথর, আর নিচে তপ্ত বালু, এভাবে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা শুয়ে থাকতে হয়েছে তাঁকে মরুভূমিতে। সেই নির্যাতনের কথা স্মরণ করে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন,
إِلَّا بِلَالًا، فَإِنَّهُ هَانَتْ عَلَيْهِ نَفْسُهُ فِي اللَّهِ
"..বিলাল হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে আল্লাহর জন্য সঁপে দিয়েছিল।”[৩]
ড. আবদুর রহমান বলেন, 'একবার আমরা একটা গ্রামে যাই। সেখানে তখন তীব্র খরা চলছিল। চারিদিকে পানির জন্য হাহাকার। এই সময়ে আমরা উপস্থিত। কিন্তু গ্রামের সরদার আমাদের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিল না। আমরা তাকে খুব করে অনুরোধ করলাম। সে বলল, 'ঠিক আছে ঢুকতে দেব; তবে এক শর্তে, যদি তোমাদের স্রষ্টাকে বলে আমাদের গ্রামে বৃষ্টি বর্ষণ করাতে পারো, তা হলে।' ড. আবদুর রহমান বললেন, 'দয়া করে আমাদের এমন শর্ত দেবেন না। বৃষ্টি হওয়াটা আমার-আপনার কারোর হাতেই নেই।'
সরদার বলল, 'ঠিক আছে, তা হলে তোমরা চলে যাও'। শাইখ বলেন, 'আমাদেরকে একটি সুযোগ দিন প্লিজ!' কিন্তু গ্রামের সরদার নাছোড়বান্দা, 'তোমাদের স্রষ্টাকে বলো বৃষ্টি বর্ষণ করতে।' শাইখ আবারও বললেন, 'বৃষ্টি হওয়া-না হওয়া আমার সামর্থ্যে নেই।' কিন্তু সরদার আপন সিদ্ধান্তে অনড়। ডা. আবদুর রহমান বলেন, 'সে আমাদেরকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিল। এই দিকে আমার অন্তরে যে কী পরিমাণ কষ্ট অনুভূত হচ্ছিল, তা শুধু আল্লাহই জানেন। আমার সাথিদের দিকে তাকালাম, তারা আমার দিকে চেয়ে আছে। কী করব আমরা? কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না।'
এরপর তিনি বলেন, 'আমি আল্লাহর কাছে হাত পাতলাম। ভিক্ষা চাইতে থাকলাম এবং মন থেকে ডাকতে থাকলাম। প্রচুর পরিমাণে কাঁদলাম এই বলে, "রব আমার! আমার পাপের কারণে আপনার বান্দাদের ঈমান থেকে বঞ্চিত করবেন না।" আমি কাঁদতে কাঁদতে আকাশের দিকে তাকালাম, লক্ষ করলাম-হঠাৎ মেঘ জমা হতে শুরু করেছে। ক্রমেই আকাশ কালো হয়ে এলো। বজ্রপাত শুরু হলো, সেই সাথে ঝড়ো বাতাস। এরপর আকাশ ফেটে অঝোরে বৃষ্টি বর্ষণ হলো সেদিন। আল্লাহু আকবার!'
আফ্রিকার এই লোকগুলো জীবনেও এরকম বিস্ময়কর কিছু ঘটতে দেখেনি। তারাও হতবিহ্বল হলো। সদরদারসহ পুরো গ্রামবাসী ইসলামে প্রবেশ করল।
ড. আবদুর রহমান সুমাইত-এর এক আদুরে নাতনী ছিল। কুয়েতে পড়াশোনায় বেশ নাম কামিয়েছিল সে। তো নানাজান তাঁর নাতনীকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। পুরস্কারটা কিন্তু সিনেমার টিকেট, ভাউচার, কিংবা খেলনা পুতুল ছিল না। সেটি ছিল আফ্রিকার টিকেট। তিনি তাকে আফ্রিকায় আসার আমন্ত্রণ জানান। বলেন, 'এখানে আসো! আমার সাথে কিছু সময় দাও দাওয়াতি কাজে। এটাই তোমার পুরস্কার।' তেরো বছর বয়সী এই বালিকা আপন ভূমি ছেড়ে চলে আসে সুদূর আফ্রিকায়। গিয়ে তার আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাৎ করে। সেখানে সে অবস্থান করে কয়েক সপ্তাহ। ওর ওছিলায় এই অল্প সময়ে ২৭ জন ব্যক্তি শাহাদাত পাঠ করে, আলহামদু লিল্লাহ। দেখুন শাইখের আদর্শ! তিনি এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তার পরবর্তী প্রজন্মকেও ঈমানের আলোয় আলোকিত করে গেছেন। ইয়া সালাম!
ড. আবদুর রহমান বলেন, 'আমি সেই মুহূর্তটা কখনও ভুলতে পারব না, যেদিন আমি এবং আমার স্ত্রী উম্মু সুহাইব মাদাগাস্কারের একটি ছোট্ট কুটিরে ছিলাম। মধ্য রাতে আমরা একসাথে বসে আছি বাড়ির আঙিনায়। আমি তার চেহারার দিকে তাকাই। চেহারাজুড়ে অবসাদ আর ক্লান্তির ছাপ। স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিলাম।'
'উম্মু সুহাইব, অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে। তুমি কি হাল ছেড়ে দিয়েছ?'
'আবূ সুহাইব, আমি আপনাকে বলব এইমাত্র আমি কী ভাবছিলাম?'
'হুম, বলো।'
'আমি ভাবছিলাম, আল্লাহ যদি আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেন, আমরা কি সেদিন ঠিক এই পরিমাণ সুখী হতে পারব যতটা সুখ আজ অনুভব করছি?'
কথায় আছে, প্রত্যেক সফল ব্যক্তির পেছনেই একজন নারী থাকে....
দেখতে দেখতে ড. আবদুর রহমান সুমাইত জীবনের তিরিশটি বছর ঢেলে দিলেন আফ্রিকা মহাদেশে। দ্বীনের রাহে ব্যয় করলেন সামর্থ্যের সবটুকু। আল্লাহর শপথ, তার অর্জন এতটা বিস্ময়কর ছিল যে, বিলিয়ন বাজেট নির্ধারণকারী জাতিও তা অর্জন করতে পারেনি। দাওয়াতি কার্যক্রমের তিরিশ বছরে আবদুর রহমানের ফিরিস্তি ছিল বিশাল। তিনি ৫৫০০ মাসজিদ নির্মাণ করেছেন, ৫০,০০০ ইয়াতিমের ভরণপোষণ দিয়েছেন, যাদের অনেকেই এখন ডাক্তার এবং আইনজীবী। ড. আবদুর রহমান বিতরণ করেছেন প্রায় ৭০ লক্ষ কুরআন। প্রতিষ্ঠা করেছেন ৮৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছোটোদের নার্সারি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, যা আজ আফ্রিকার ৫ লক্ষেরও অধিক ছাত্রের আবাস।
ড. আবদুর রহমান নিজে খনন করেছেন এবং খনন করিয়েছেন এমন টিউব ওয়েলের সংখ্যা ১২০০০ এর কম নয়, এবং নির্মাণ করেছেন ৯০টি হাসপাতাল এবং ফার্মেসি।
আর কত লোক তাঁর মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেছে, সেই সংখ্যা কেবল আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। তবে তাঁর সঙ্গীদের অনুমান, শাহাদাত পাঠকারীদের সংখ্যা অন্তত এক কোটি!
এত বড়ো বড়ো অর্জন, এগুলোর কোনোটাই সহজ ছিল না। এজন্য তাঁকে হারাতে হয়েছে অনেক সঙ্গী-সাথি, নির্ঘুম কেটেছে বহু রাত্রি। দুনিয়াবী স্বপ্নকে মাটি করে দিতে হয়েছে। দিতে হয়েছে শারীরিক শ্রম। শরীরে বাসা বেঁধেছে অসংখ্য রোগব্যাধি। ফলে প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে ২০টি করে ট্যাবলেট খেতে হতো তাঁকে। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে এসে ড. আবদুর রহমানকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে দৌড়াতে হয়েছে নিজের চিকিৎসার জন্যে। আরও আগে থেকেই নিজের প্রতি মনোযোগী হওয়া দরকার ছিল, কিন্তু উম্মতের চিন্তায় এই দরদী পিতা ভুলে গেছেন নিজের কথা। এখন মৃত্যু তার দরজায় কড়া নাড়ছে; আফ্রিকা থেকে কুয়েত গেলেন, কুয়েত থেকে জার্মানি। কিন্তু স্বাস্থ্যের অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে। সবশেষে ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে একটি ঘোষণা ভেসে এলো, ড. আবদুর রহমান আর নেই... তিনি ইন্তেকাল করেছেন...
আল্লাহ তাআলা রহম করুক শাইখের ওপর, আমাদের পিতার ওপর। রহিমাহুল্লাহু তাআলা। আল্লাহ তাঁর হাশর করুক নবি-রাসূলদের সাথে, শহীদ এবং সিদ্দীকদের সাথে।
পাঠক একটিবার ভেবে দেখুন, একটি ডিগ্রির পেছনে হাজার হাজার টাকা আপনি ইউনিভার্সিটিতে ঢালছেন। এরপর গ্রাজুয়েশনও সমাপ্ত করলেন। কিন্তু চাকরির বাজারে নামতেই আবিষ্কার করলেন, এই ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই। তখন আপনার কেমন লাগবে? কল্পনা করুন, যে পরীক্ষার জন্য আপনি ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা, রাতের-পর-রাত জেগে প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু পরীক্ষার হলে গিয়ে আবিষ্কার করলেন যে, আপনি ভুল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন! তখন আপনার কেমন লাগবে? কল্পনা করুন, আপনি কয়েক বছর ধরে একটি সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। উঠছেন-তো-উঠছেন... এভাবে উঠতে উঠতে শেষ ধাপে এসে পেলেন দুর্ভেদ্য একটি দেওয়াল! তখন আপনার কেমন লাগবে?
এই তিনটি উদাহরণের আলোকে সবাই যদি নিজেকে প্রশ্ন করি, আমার উদ্দেশ্য কী? আমার লক্ষ্য কী? আমি কী করছি? যে জিনিসের পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে যাচ্ছি, এর শেষটা যদি হয় এমনই হতাশা এবং আফসোসের, তখন আমি কী করব? ফিরে কি পাব খুঁইয়ে-ফেলা এই সময়? ফিরে পাব সুযোগ? কমাতে কি পারব কলিজা-ফাটা বেদনা আর আফসোস?
মূল সমস্যা দুটি শব্দেই প্রকাশ করা যায়-'লক্ষ্য নির্ধারণ'। আপনার জীবনের লক্ষ্য কী? একজন মুমিনের স্থানে দাঁড়িয়ে আপনি যখন জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন, কীভাবে বুঝবেন আপনার লক্ষ্য সঠিক? কিংবা আপনার গন্তব্য সঠিক পথে এগোচ্ছে- কীভাবে যাচাই করবেন? কিয়ামাতের দিন আফসোস করা থেকে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন? বুকফাটা আর্তনাদ থেকে কীভাবে বাঁচাবেন নিজেকে?
সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণের মানদণ্ড কী হবে? ব্যক্তির অর্জিত অর্থ-সম্পদের দ্বারা কি নির্ধারণ করা হবে, না যে স্টেটাস এবং সম্মান সে অর্জন করেছে-তা দ্বারা? ইসলামি মানদণ্ড কী?
ধরতে পারছেন সমস্যা কোথায়? বাস্তবে আমরা হয়তো কেউই নিজেদেরকে প্রশ্নগুলো করি না। দুনিয়া অর্জনে আমাদের অস্থিরতা, দুনিয়াকে ঘিরে সাজানো এই জীবন আমাদেরকে ভুলিয়ে দেয়। সত্যি বলতে, ঠিক সেদিনই আমরা সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারব। যেদিন হাশরের ময়দানে একত্র হব, বুঝতে পারব দুনিয়ার জীবন কতটা মূল্যবান ছিল। সেদিন বাস্তবতা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। জীবনের আসল অর্থ-মর্ম ওইদিন বোঝে আসবে। মিলবে চূড়ান্ত প্রতিদান। বুঝতে পারব, কত বড়ো সুযোগ আমরা হেলায় নষ্ট করেছি। কিয়ামাতের দিন, আসল হার-জিতের দিন আমরা সব বুঝতে পারব। খুব দূরে নয় সেদিন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُو رُءُوسِهِمْ عِندَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَসَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ
'আর তুমি যদি দেখতে, যখন অপরাধীরা তাদের রবের সামনে মাথানত হয়ে থাকবে (তারা বলবে) “আমাদের রব, আমরা দেখেছি ও শুনেছি, কাজেই আমাদেরকে পুনরায় পাঠিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব। নিশ্চয় আমরা দৃঢ়-বিশ্বাসী।" [৪]
অপরাধীরা বলবে, এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। আল্লাহ! এখন আমরা শুনতেও পাচ্ছি। কাজেই আমাদেরকে ফিরিয়ে দিন!
সূরা কফ-এ আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَّقَدْ كُنتَ فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَذَا فَكَشَفْنَا عَنكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْমَ حَدِيدٌ
“এ ব্যাপারে তুমি অজ্ঞ ছিলে। তাই তোমার সামনে যে আবরণ ছিল তা আমি সরিয়ে দিয়েছি। তাই আজ তোমার দৃষ্টি অত্যন্ত প্রখর।” [৫]
বিচার-দিবসে আল্লাহ তাআলা এক পাপী বান্দাকে বলবেন, তুমি গাফেল ছিলে। এই দিনের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে ছিলে। আজ আমি তোমার দৃষ্টির পর্দা সরিয়ে দিয়েছি, এখন তুমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছ। আয়াতে আল্লাহ حَدِيدٌ )হাদীদ) শব্দটি উল্লেখ করেছেন। এর শাব্দিক অর্থ হলো লোহা। অর্থাৎ তোমার দৃষ্টি আজ লোহার মতো তীক্ষ্ণ হবে। এখন তুমি সব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছ।
ভাই-বোনেরা, দুনিয়ার জীবনে আমরা নিজেদের লক্ষ্য নিজেরা নির্ধারণ করতে পারি না। কেননা কোনোকিছুর বাস্তবতা তাৎক্ষণিক প্রত্যক্ষ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। বরং আমাদের কর্মের আসল ফলাফল এখন আমাদের দৃশ্যের বাইরে। কেবল কিয়ামাতের দিনই প্রতিটি কাজের ফলাফল দেখতে পাব। তাই জীবনের লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী, তাঁর বিধান মোতাবেক।
আমরা আবার সেই প্রশ্নে ফিরে যাচ্ছি, সুন্দর লক্ষ্য কী? কিংবা বলতে পারি, সাফল্যের সংজ্ঞা কী? জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের গুরুত্ব আপনাদেরকে, আপনাদের পরিবার, আত্মীয় এবং সন্তানদের বোঝাতে যদি সক্ষম হয়ে থাকি-তা হলে শুনুন, জীবনের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, আল্লাহর কালাম থেকেই শুনুন; কুরআনের তৃতীয় সূরা, সূরা আল ইমরানের ১৮৫ আয়াতে আল্লাহ বলছেন,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيمَةِ
'প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর অবশ্যই কিয়ামাতের দিন তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হবে।'
এরপর আল্লাহ তাআলা বলছেন জীবনের লক্ষ্য নিয়ে:
فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيُوةُ الدُّنْيَا إِلَّا মَتَاعُ الْغُرُورِ
'সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন তো শুধু ধোঁকার সামগ্রী।'
সাফল্য এটাই। সাফল্য ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করতে পারা নয়, সাফল্য বড়ো ব্যবসায়ী হওয়া, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির CEO কিংবা সংসদের এমপি হওয়ায় নয়। তেমনি সাফল্য বিয়ে করতে পারা নয়, সন্তানের বাবা-মা হওয়া কিংবা নোবেল প্রাইজ জেতা নয়। বরং দুনিয়ার জীবনের তাবত সফলতা যদি আখিরাতের জীবনে সফলতা বয়ে আনতে না পারে, তা হলে এগুলো সবই ব্যর্থতা, কোনো মূল্য নেই এসবের। এটাই আল্লাহর নির্ধারিত মানদণ্ড। ওপারে এই মানদণ্ডেই আমাদের কর্মের ওজন হবে, ফলাফল ঘোষণা হবে।
হ্যাঁ, আবদুর রহমান সুমাইত-এর জীবন-মরণও ছিল এই মানদণ্ডকে ঘিরে। তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, অর্জনও করেছেন তেমনটাই বিইযনিল্লাহ।
ভাই আমার, দুজন মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য সর্বদা ইলমের ভিত্তিতে রচিত হয় না। বক্তৃতায় কে উত্তম-এটার ওপর না। এমনকি ঈমান এবং ইখলাসের তারতম্যের কারণেও নয়। হতে পারে উভয়ই এগুলোতে সমান। একজন আখিরাতের প্রতি অত্যন্ত সচেতন মুসলিম, আর অপরজন পিছিয়ে-পড়া গড়পড়তা মুসলিম-এই দুজনের মধ্যে পার্থক্য কখনও স্রেফ একটি কারণে সূচিত হয়, আর তা হলো 'লক্ষ্য'। একজনের লক্ষ্য সুস্পষ্ট এবং সেদিকেই ধাবিত। আর অপরজনের দিনগুলো নিত্যদিনের মতই, নেই কোনো পরিবর্তন।
স্বাস্থ্যের কথা যদি বলি, আমাদের অধিকাংশের স্বাস্থ্য ভালো। অপরদিকে আবদুর রহমান সুমাইত-এর ডায়াবেটিকস ছিল, উচ্চ রক্ত চাপ ছিল, দুই দফা তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং তিনবার রক্ত জমাট বেধে গিয়েছিল। একবার হার্টে হয়েছে, আরেকবার মস্তিষ্কে। আর এই সমস্ত বিপদ তাঁর সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
সম্পদের কথা ধরলে, আমাদের অনেকের সম্পদ তাঁর চেয়ে বেশি। যৌবনের মানদণ্ডে আমাদের অধিকাংশই ড. আবদুর রহমানের চেয়ে যুবক। তা হলে পার্থক্য কোথায়? কবি আল-মুতানাব্বি বলেন,
وَإِذَا كَانَتِ النُفُوسُ كِبَاراً - تَعِبَتْ فِي مُرادِهَا الْأَجْسَامُ
জীবনের লক্ষ্য যদি বড়ো কিছু হয়, শরীর তখন পরিশ্রম প্রিয় হয়। [৬]
ভাই-বোনেরা, আপনাদের কাছে করজোড়ে অনুরোধ করছি, একজন গড়পড়তা মুসলিম হবেন না। প্রতিযোগিতার মাঠে পিছিয়ে থাকবেন না। আপনার জন্য সহজ এমন কিছু করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কীসে দক্ষ? কোন কাজে পারদর্শী? মন থেকে খুঁজে বের করুন। আমি জানি এটা মোটেও সহজ নয়। কেননা এর জন্য নিজের সাথে সৎ হতে হবে, লক্ষ্য পূরণের জন্য এলোমেলো জীবন ছেড়ে আপনাকে শৃঙ্খল জীবন যাপন করতে হবে। আমি জানি এটা কঠিন। কিন্তু আল্লাহর কসম, কাল কিয়ামাতের দিন এটাই আপনাকে সর্বোত্তম ফলাফল এনে দেবে। লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, আপনার বয়স যতই হোক। আপনি পুরুষ কিংবা নারী যা-ই হোন।
আবারও বলছি, নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনার জীবনের লক্ষ্য কী? আগামী দশ বছরে আপনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান? যদি ইঙ্গিত পেতে চান দশ বছর পর আপনি কী হবেন, তা হলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, দশ বছর আগে আমি কেমন ছিলাম? দশ বছর আগের আপনি আর আজকের আপনির মধ্যে যদি তেমন কোনো পার্থক্য না পান, তা হলে খুব সম্ভব দশ বছর পরেও আপনি এমনই থাকবেন।
লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার অধিকারী আলিমদের স্মরণাপন্ন হন। তাদের কাছ থেকে জেনে নিন, আমার লক্ষ্য ঠিক আছে কি না। বলুন, আমার ছন্নছাড়া লক্ষ্যকে সাজিয়ে দিন, সময়সীমা নির্ধারণ করে দিন, সাফল্যের সূত্র শিখিয়ে দিন, চোরাবালি চিনিয়ে দিন। এরপর দেখুন আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সাফল্যের দুয়ার ঠিক সেভাবেই উন্মোচন করে দিচ্ছেন, যেভাবে দিয়েছেন ড. আবদুর রহমান সুমাইত-এর জন্য।
النفس تبكى على الدُنيا وَقَد عَلِمَت - إِنَّ السَّلامَة فيها ترك ما فيها
لا دارَ لِلمَرءِ بَعدَ المَوتِ يَسكُنُها إِلَّا الَّتِي كَانَ قَبلَ المَوتِ بانيها
فَإِن بناها بِخَيرٍ طَابَ مَسكَنُها وإن بناها بَشَرٍ خاب بانيها
'নফস কাঁদে দুনিয়ার জন্যে, যদিও সে ভালো করেই জানে নিরাপদ তো সে, যে এখানে দুনিয়াবিমুখ থাকে। মৃত্যুর পর আপনঘর হবে সেটাই, যা বানানো হয় মরণের আগে। যদি নেক আমল দ্বারা তা বানানো হয়, তো (কবর) হবে সুখের বিছানা। আর যদি বদ আমল দ্বারা তা বানানো হয়, তবে সে ব্যর্থ হবে।'
[আলি ইবনু আবী তালিব] [৭]
টিকাঃ
[১] সূরা আনফাল, ৮:৭০
[২] সূরা বাকারাহ, ২:২০৭
[৩] ইবনু মাজাহ, ১৫০; আহমাদ, ৩৮২২; সহীহ
[৪] সূরা সাজদাহ, ৩২: ১২
[৫] সূরা কফ, ৫০ : ২২
[৬] দিওয়ানুল মুতানাব্বি, ২/২৪৫
[৭] দিওয়ানু আলি, ২১০
📄 সংশয়মুক্ত ঈমান
মানুষের অন্তর সদা পরিবর্তনশীল। মুহূর্তে মুহূর্তে তা বদলায়। বদলানোই তার ধর্ম। মানব- হৃদয়ের এই অস্থিরতা চিরন্তন। সকালে যে ব্যক্তি মুসলিম, সন্ধ্যা গড়াতেই সে হয়তো কাফির। একদিন সকালে উঠে আপনি হয়তো ঈমানি জযবা অনুভব করলেন। অথচ ঘণ্টা কয়েক যেতেই দেখলেন, সেই আবেগ হারিয়ে গেছে! অন্তর কঠিন হয়ে গেছে।
মানুষের মন বড়োই জটিল প্রকৃতির। সম্ভবত এ জন্যই এর নাম দেওয়া হয়েছে 'কলব'। সর্বদা সে 'তাকাল্লুব' অর্থাৎ পরিবর্তন হতে থাকে। প্রতিটা মুহূর্তেই সে রূপ পাল্টায়।
কবি বলেন,
وَمَا سُمِّيَ الْإِنْسَانُ إِلَّا لِأُنْسِهِ وَلَا الْقَلْبُ إِلَّا أَنَّهُ يَتَقَلَّبُ
মানুষ ভুলোমনা, তাই তো সে ইনসান। অন্তর পরিবর্তনশীল, তাই তো এর নাম কলব। [৮]
আমাদের নবিজি আরও চমৎকার উপমা দিয়েছেন অন্তরের পরিবর্তন নিয়ে। আবূ মূসা আশআরি থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলেন,
مَثَلُ الْقَلْبِ مَثَلُ الرِّيشَةِ تُقَلِّبُهَا الرِّيَاحُ بِفَلَاةٍ
'কলব (পাখির) পালকের মতো, ধু-ধু মরুতে বাতাস যাকে দিগ্বিদিক নিয়ে চলে।[৯]
এটাই অন্তরের প্রকৃতি। এভাবেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে অন্তর। এই অস্থিরতা অন্তরের একটি জটিল দিক মাত্র। এর আরেকটা দিক আছে; তা খুবই জটিল কিন্তু বাস্তব। আর সেটা হলো ফিতনা অর্থাৎ পরীক্ষা। হারাম খায়েশ তো সবার আগে অন্তরেই বাসা বাঁধে। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই তা অন্তরে আবির্ভূত হয়। কখনও কখনও শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মাধ্যমেও হৃদয়ে ফিতনা প্রবেশ করতে পারে। যেমন: চোখ দিয়ে খারাপ কিছু দেখা, হাত দিয়ে হারাম জিনিস ধরা, কান দিয়ে অশ্লীল কিছু শোনা ইত্যাদি। মোটকথা, দেহের যে-কোনো অঙ্গই ফিতনায় লিপ্ত হতে পারে।
ফিতনার প্রাথমিক লক্ষ্য হলো মানুষের অন্তর। কারণ, এখানেই সে বাসা বাঁধে। এটাই তার আবাসস্থল। এজন্য নবিজি আমাদের সাবধান করে গেছেন।
হুযাইফা থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন,
تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوبِ كَالْحَصِيرِ عُودًا عُودًا فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ وَأَيُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَصِيرَ عَلَى قَلْبَيْنِ
'চাটাইয়ের বুননের মতো একেক করে ফিতনা মানুষের অন্তরে আসতে থাকে। যে অন্তরে তা গেঁথে যায় তাতে একটি করে কালো দাগ পড়ে। আর যে অন্তর তা প্রত্যাখ্যান করে তাতে একটি উজ্জ্বল দাগ পড়ে। এমনি করে দুটি অন্তর দু-ধরনের হয়ে যায়।' [১০]
একটি দুটি নয়, নবিজি বলেছেন ফিতনার-পর-ফিতনা আসতে থাকবে অন্তরের সামনে। ঠিক যেভাবে মাদুরের পাতাগুলো একে অপরের সাথে জুড়ে একটি পরিপূর্ণ মাদুরে রূপ নেয়। অন্তরও এভাবে নানামুখী ফিতনার সম্মুখীন হয়।
দ্বিতীয়ত, আমরা পরিবর্তনশীল যুগে বাস করছি। প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে সবকিছু। মত পাল্টে যাচ্ছে, মতবাদ পাল্টে যাচ্ছে, এমনকি বিশ্বাসও পাল্টে যাচ্ছে। তাই আল্লাহর রাসূল বলেন,
سَيَكُونُ فِي آخِرِ أُمَّتِي أُنَاسٌ يُحَدِّثُونَكُمْ مَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُمْ ، وَلَا آبَاؤُكُمْ ، فَإِيَّاكُمْ وَإِيَّاهُمْ
'শেষ জামানায় আমার উম্মতের একদল মানুষ আসবে, যারা তোমাদের এমন কিছু বলবে, যা তোমরা ইতোপূর্বে শোনোনি। তোমাদের পূর্বপুরুষরাও শোনেনি। কাজেই নিজেদের ব্যাপারে এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো।[১১]
অন্যদিকে কিয়ামাতের দিন আমাদের সাফল্য নির্ভর করছে এমন একটি অন্তরের ওপর, যা থাকবে দৃঢ়। বিশ্বাসের দিক থেকে যার কোনো নড়চড় নেই। নদীতে দুলতে-থাকা নৌকার মতো কোনো অন্তর সফল হবে না। এ জন্য ইবরাহীম তাঁর দু’আয় বলেছেন,
وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
‘আর যেদিন তাদের পুনরুত্থিত করা হবে, সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আসবে না কোনো কাজে। সেদিন শুধু সে উপকৃত হবে, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে।[১২]
ওপরে আলোচিত বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে সাজালে পাওয়া যায়: ১) আমাদের এমন একটি অন্তর আছে, যা সর্বদা পরিবর্তনশীল। ২) আমরা এমন এক পরিবেশে বাস করছি, যা ক্রমাগত পাল্টাতে থাকে। ৩) লোকেরা যা বলে আর আমরা যা শুনি, এগুলোও সর্বদা পরিবর্তন হতে থাকে। ৪) অন্তরে উপস্থিত হওয়া ফিতনাগুলোও পরিবর্তনশীল। ৫) অপরদিকে আল্লাহর কাঠগড়ায় মুক্তি পেতে হলে এমন একটি অন্তর নিয়ে উপস্থিত হতে হবে, যা অস্থিরতার ব্যাধি থেকে মুক্ত।
মোটকথা, যখনই কাউকে আত্মিক বিষয়, সংশয়-সন্দেহ, অন্তরের রোগ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুনবেন, তখন তা গুরুত্বের সাথে নিন। মন দিয়ে শুনুন। কারণ, বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। এর সাথে ইহকাল-পরকালের মুক্তির বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
অন্তর মূলত দুই শ্রেণীর রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। রোগ-ব্যাধিগুলো এই দুই শ্রেণীর সাথে জড়িত। রোগগুলো হলো: ১. শাহওয়াত (প্রবৃত্তি বা হারাম লালসা) ২. শুবুহাত (সন্দেহ-সংশয় বা সাদৃশ্য অবলম্বন করা)
ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন,
إن القلب يعترضه مرضان يتواردان عليه اذا استحكما فيه كان هلاكه وموته وهما مرض الشهوات ومرض الشبهات هذان اصل داء الخلق الا من عافاه الله
'নিশ্চয়ই অন্তর শাহওয়াত ও শুবুহাত এই দুই প্রকার রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। যদি এর একটিও ব্যক্তির অন্তরে শক্তভাবে গেঁড়ে বসতে পারে, তা হলে অন্তরের ধ্বংস অনিবার্য, মৃত্যু সুনিশ্চিত। সকল রোগের সূত্রপাত এ দুটো বিষয় থেকেই ঘটে। তবে তার কথা ব্যতিক্রম, যাকে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। [১৩]
প্রথমটি শাহাওয়াত বা প্রবৃত্তি। যেমন: বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কামনা, খাদ্য-পানীয়র চাহিদা, অর্থবিত্তের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, দ্রুত ধনী হবার তাড়না—এগুলো সবই প্রবৃত্তির অংশ। কখনও এসব চাহিদা হালালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, আবার কখনও তা হারাম পর্যায়ে উপনীত হয়। তখন এগুলো নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর।
দ্বিতীয়টি শুবুহাত বা সংশয়। এটি আরও ভয়ানক, অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংশয় সরাসরি আপনার ঈমানের ওপর আঘাত হানতে পারে। পাল্টে দিতে পারে আপনার বিশ্বাস, আপনার দৃষ্টিভঙ্গি। রবের সাথে আপনার যে সম্পর্ক, এর ওপর সরাসরি প্রভাব খাটাতে পারে। শারঈ হিজাবের ব্যাপারে আপনাকে অনাগ্রহী করে তুলতে পারে। এজন্য বিষয়টি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
শুবুহাত শব্দটি شبه থেকে এসেছে। বাংলায় একে সংশয় বলা হলেও আরবি ভাষা অনুযায়ী তার আরেকটি পরিচয় হলো সাদৃশ্য অবলম্বন করা। অর্থাৎ, এমন-কিছুকে সত্য বলে মনে করা হয়, যা আসলে সত্য নয়। ফলে শুবুহাতে আক্রান্ত ব্যক্তি খারাপ কাজকেও ভালো মনে করতে থাকে। তাই সে খারাপ কাজ করার পরও লজ্জিত হয় না। পরন্তু নিজ কর্মের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকে। যেমন ধরুন কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করার বিষয়টা। অনেকেই কাফিরদের চালচলন অনুসরণ করে। এটা যে স্পষ্ট হারাম, সে কথা কানেও তুলতে চায় না। বরং এর পক্ষে যুক্তি প্রদান করে। আসলে এই ক্ষেত্রে ব্যক্তি শুবুহাতে আক্রান্ত হয়েছে, তাই এমনটা করছে।
এজন্য ইমাম ইবনুল কাইয়িম শুবুহাতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন,
وإنا سميت الشبهة شبهة لاشتباه الحق بالباطل فيها ، فإنها تلبস ثوب الحق على جسم الباطل
'সাদৃশ্য অবলম্বনকে শুবুহাত নাম দেওয়ার কারণ হলো, বাতিলকে হকের সাদৃশ্য মনে করা। অনেকটা বাতিলের শরীরে হকের পোশাক পরানোর মতো।[১৪]
সে যেন ছদ্মবেশী শয়তান, কিন্তু ভান ধরেছে ফেরেশতার। এটাই শুবুহাতের প্রকৃতি।
আপনি যদি শাহাওয়াত তথা প্রবৃত্তির মোহে নিমজ্জিত ভাই-বোনদেরকে কুরআন, হাদীসের বাণী কিংবা জান্নাত-জাহান্নামের কথা বলে নসীহা করেন, তো তাদের অন্তর কেঁপে উঠবে। চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত দেখতে পাবেন। তারা নিজেদের পাল্টানোর তামান্না প্রকাশ করবে। আর যদি নাও করে, তবু তাদের মধ্যে কিছু-না-কিছু অনুশোচনা কাজ করবে। কারণ, তারা হয়তো প্রবৃত্তি দ্বারা আক্রান্ত, কিন্তু আল্লাহ ও রাসূলকে তারা সত্য মানে। আখিরাতকে বিশ্বাস করে, কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলে মানে। ফলে পাপের পরিমাণ যতই হোক না কেন, এগুলোর স্মরণ তাদের অন্তরকে আলোড়িত করবেই।
পক্ষান্তরে যারা শুবুহাতে আক্রান্ত, তাদের বেলায় আমরা অনুরূপ কথা বলতে পারি না। তারা নিজেদের অন্যায় কাজের পক্ষে তর্ক করবে। কারণ, এটাকে তারা খারাপ মনে করে না। 'আমাদের কাছে দলিল আছে' বলবে। আমি ওমুক লেকচারে এটা হালাল বলতে শুনেছি, বা ওমুক বইতে পড়েছি। অথবা বলবে, এ যুগে এসব চলে না। আউযুবিল্লাহ।
কাজেই শুবুহাত অত্যন্ত ভয়ানক একটি বিষয়। বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে আমাদের ঈমানের। তাই শুবুহাত অন্তরে জেঁকে বসার আগেই, আমাদেরকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। এখন আমরা জানব, কীভাবে শুবুহাত থেকে বেঁচে থাকতে হয়।
চারটি মূলনীতি রয়েছে। এগুলোর অনুসরণ অন্তরে শুবুহাত বা সংশয়ের আগমন ঠেকাবে। আপনি যদি নিজেকে নিরাপদ মনে করেন, তবুও এই চারটি মূলনীতি স্মরণে রাখুন। যাতে আল্লাহ আপনাকে আমাকে ভবিষ্যতেও নিরাপদ রাখেন। আর যদি এই মুহূর্তে কোনো ধরনের সংশয়ে আক্রান্ত হয়ে থাকেন কিংবা কোনো কিছু শোনা বা পড়ার কারণে সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়ে থাকেন, তবে চিন্তার কিছু নেই। আপনার জন্যও আরও চারটি মূলনীতি রয়েছে। এগুলো দিয়ে আপনার ভেতরটা একদম ধুয়ে-মুছে সাফ করে ফেলুন।
সত্যি বলতে কী, এ আলোচনার গুরুত্ব তারাই সব থেকে বেশি বুঝবে, যারা এই মুহূর্তে সংশয়ে আক্রান্ত। আপনি যদি সংশয়ে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তা হলে অবশ্যই মনে মনে বলছেন, আমাকে সাহায্য করুন, আমাকে ঔষধ দিন। কারণ, আমার সালাত আর আগের মতো নেই। আমার সিয়াম, সদাকা করার আকাঙ্ক্ষা আর আগের মতো নেই। হালাকা, লেকচারে উপস্থিত হবার মতো উদাম আর জাগে না। আমার অন্তর একেবারে পাল্টে গেছে। আমি এ থেকে বের হয়ে আসতে চাই।
আমরা মোট আটটি মূলনীতি আলোচনা করব। প্রথম চারটি সংশয় থেকে বেঁচে থাকার উপায় নিয়ে। পরের চারটি সংশয়ে আক্রান্ত হওয়ার পর করণীয় বিষয় নিয়ে। এই আটটির ভিতর প্রথম চারটি আপনার অবশ্যই এখন কাজে লাগবে। অথবা আপনার পরিবারের কেউ যদি আক্রান্ত হয়ে থাকে, তারও কাজে লাগবে। তবুও ভবিষ্যতে নিরাপদ থাকার জন্য হলেও এগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন।
কারণ, আমরা জানি না আল্লাহ আমাদের তাকদীরে কী ধরণের পরীক্ষা রেখেছেন। আজ হয়তো নিজেকে আমার দৃঢ় ঈমানের অধিকারী মনে করছি। আমার ভিতর কোনো সংশয় দানা পরিমাণও নেই। আমি আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত। আমি মৃত্যুতে বিশ্বাসী, পরকালে বিশ্বাসী, জান্নাত-জাহান্নাম বিশ্বাস করি। আমার কোনো সমস্যাই হয়তো নেই। তবুও চারটি মূলনীতি আমাদের জানতে হবে।
সংশয় থেকে বেঁচে থাকার উপায় :
১) সদা সতর্ক থাকুন
সব সময় সতর্ক থাকুন। ভুলে যাবেন না সংশয় বলে একটি বিষয় আছে, যার ব্যাপারে মনোযোগ রাখা জরুরি। ক্ষণিকের জন্যও গাফেল হবেন না। তা হলেই আমরা আশা করতে পারি, আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়ে রাখবেন।
আল্লাহ তাআলা বানী ইসরাঈলের ব্যাপারে বলেছেন,
وَحَسিবُوا أَلَّا تَكُونَ فِتْنَةٌ فَعَمُوا وَصَمُّوا
'তারা ভেবেছিল আর কোনো ফিতনা হবে না, এজন্য তারা অন্ধ ও বধির হয়ে গিয়েছিল। [১৫]
তারা ধরে নিয়েছিল তাদের আর পরীক্ষা করা হবে না। অর্থাৎ, তারা সতর্ক ছিল না। ফলে অন্ধ ও বধির হয়ে রইল।
মোটকথা, ভবিষ্যতে সংশয় থেকে বেঁচে থাকতে আপনাকে সদা সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহকে ভয় করুন। সতর্ক হোন আপনার ঈমান নিয়ে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকবেন না আজ আপনি ভালো মুসলিম, সালাত পড়ছেন, সিয়াম রাখছেন, মুমিনদের মতো পোশাক পরছেন, ভবিষ্যতেও এরূপ থাকতে পারবেন। না, এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। আমাদের যে-কারও পরিবর্তন ঘটতে পারে যে-কোনো মুহূর্তে। আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।
এজন্য ইবনু আবী মুলাইকা বলেন,
أدركت ثلاثين من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم كلهم يخاف النفاق على نفسه
'আমি নবি-এর অন্তত তিরিশ জন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছি, যাদের প্রত্যেকে নিজেদের ব্যাপারে নিফাকের ভয় করতেন।[১৬]
সর্বশেষ আপনি কবে নিফাকি থেকে নিরাপত্তা চেয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন? কিংবা শিরক থেকে? একুশ শতকের কোনো ভ্রান্ত মতবাদ থেকে?
২) কান দেবেন না
সংশয়পূর্ণ কোনো বিষয়ে কান দেবেন না। সেসব আলোচনায় বসবেন না। তাদের ব্লগ, বইপত্র ঘাটতে যাবেন না। হতে পারে এগুলো আপনার ঈমানি ভিত নাড়িয়ে দেবে। কাজেই দূরে থাকুন।
শুবুহাত শক্তিশালী আর দ্বীন ইসলাম দুর্বল, ব্যাপারটি এমন নয়। বরং আমাদের অন্তরই দুর্বল। আমাদের পূর্বসূরিগণ সংশয়ের ব্যাপারে এরূপ দৃষ্টিভঙ্গিই রাখতেন।
ইবনু তাউস আমাদের পূর্বসূরিদের একজন। তাঁর সময়কার কথা। একদিন সালিহ নামক এক লোক মজলিশে প্রবেশ করল এবং বিভ্রান্তদের মতো তাকদীর নিয়ে কথা বলতে লাগল। সাথে সাথে ইবনু তাউস কানে আঙুল দিলেন এবং ছেলেকে বললেন,
أدخل أصابعك في أذنيك واشدد، فلا تسمع من قوله شيئاً، فإن القلب ضعيف
'কানে আঙুল দাও! শক্ত করে চেপে ধরো! ওর কোনো কথাই শুনো না। মানুষের অন্তর বড়োই দুর্বল।[১৭]
ইমাম যাহাবি এই ঘটনার ওপর চমৎকার একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন,
أكثر أئمة السلف على هذا التحذير، يرون أن القلوب ضعيفة، والشبه خطافة
‘পূর্বসূরি ইমামগণের ভিতর অধিকাংশ ইমামই এ ব্যাপারে ভয় করতেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন অন্তর দুর্বল, আর শুবুহাত বা সংশয় ধ্বংসাত্মক। [১৮]
অতএব নিজেকে এর সাথে জড়াবেন না। আপনার ঈমানের ওপর সংশয় আঘাত হানতে পারে। হতে পারে আপনি সংশয়পূর্ণ একটি কথা শুনে ফেলেছেন। আর এটি আপনার অন্তরে গেঁথে বসেছে। এমনভাবে বসেছে যে, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত সে আর বেরই হলো না।
কে এমনটা চায়? কে এই চড়া মূল্য দিতে প্রস্তুত?
এর প্রমাণ আমরা পাই আরেকটি হাদীস থেকে। কিয়ামাতের পূর্বে সবচেয়ে বড়ো একটি শুবুহাত বা সংশয় প্রকাশ পাবে। তার নাম, 'মাসীহ আদ-দাজ্জাল'। সবচেয়ে ভয়ানক সংশয় নিয়ে সে উপস্থিত হবে। এক্ষেত্রে আমাদের নবিজি এর নসিহত ছিল,
مَنْ سَمِعَ بِالدَّجَّالِ فَلْيَنَا عَنْهُ ، فَوَاللَّهِ إِنَّ الرَّجُلَ لَيَأْتِيهِ وَهُوَ يَحْسِبُ أَنَّهُ مُؤْمِنٌ فَيَتَّبِعُهُ مِمَّا يَبْعَثُ بِهِ مِنْ الشُّبُهَاتِ
'যে-কেউ দাজ্জালের (আগমনের) ব্যাপারে শুনবে, সে যেন তার থেকে দূরে থাকে। কারণ, আল্লাহর কসম, কিছু মানুষ এই বিশ্বাস নিয়ে তার সামনে যাবে যে, সে একজন মুমিন (তাই দাজ্জাল তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না)। অথচ (দেখা যাবে দাজ্জাল) যে সংশয় নিয়ে এসেছে, তার অনুসারী হয়ে যাবে।[১৯]
নবিজি দাজ্জালকে দেখে আসতে বলেননি। তার থেকে কোনো অর্ডার বা সেলফি নিতে বলেননি। বরং তার থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। কেন? কারণ, সে অনেক সংশয় ছড়িয়ে দেবে। সে নিজেকে আল্লাহ দাবি করবে, আর অনেক দুর্বল মুমিন তা বিশ্বাস করবে। কী ভয়ঙ্কর!
অর্থাৎ সংশয়পূর্ণ বিষয় থেকে দূরে থাকতে হবে। নিজেকে শক্তিশালী ঈমানদার মনে করে ঈমানকে পরীক্ষায় ফেলা যাবে না।
৩) বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হোন
মাঝে মাঝে একটি ভালোসঙ্গ আমাদের কয়েক বছর এগিয়ে দেয়। আবার একটি খারাপ সঙ্গ আমাদের রাতারাতি পাল্টে দেয়। আপনি হয়তো ভাবছেন-আপনার ঈমান বেশ পাকা-এরপর খারাপ লোকদের মজলিসে বসলেন। পরক্ষণেই আবিষ্কার করলেন আপনার ঈমানের দালান ধসে পড়েছে।
আমরা সঙ্গ দ্বারা প্রভাবিত হই। শুধু মানুষের সঙ্গই নয়, আমরা আবহাওয়া দ্বারাও প্রভাবিত হই। মেঘ সরে সূর্য দেখা দিলে আমরা আনন্দ অনুভব করি, জরুরি কাজের সময় বৃষ্টি নামলে বিরক্ত হই। নানান আবহাওয়ায় নানান অনুভূতি বিরাজ করে আমাদের মনোজগতে। এমনকি আমরা জমিন দ্বারাও প্রভাবিত হই! উঁচু নিচু হলে এক রকম অনুভূতি, সমতল হলে আরেক রকম।
প্রাচীন সমাজবিজ্ঞানী ইবনু খালদুন আরও বিস্ময়কর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, 'আমরা পশু-পাখির দ্বারাও প্রভাবিত হই। উদাহরণস্বরূপ উট পালনকারী ব্যক্তি আর ভেড়া পালনকারীর ব্যক্তি-দুজন দুই রকম। তাদের স্বভাব-চরিত্রের মাঝে পার্থক্য থাকে।'
অতএব মানুষ একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এজন্য আমাদের নবিজি বলেন,
المرء على دين خليله فلينظر أحدكم من يخالل
'ব্যক্তি তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। অতএব তোমাদের প্রত্যেকেই যেন খেয়াল করে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব গড়ছে। [২০]
অতীতে ইমরান ইবনু হিত্তান নামক এক নেককার বুজুর্গ ছিল। কিন্তু তার এই পরহেজগারিতা বিয়ের আগ পর্যন্ত টিকল। সে তার এক চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে চাইল, যে কিনা খারেজি মতাদর্শের অনুসারী। খারেজিরা তাকফীর এবং হত্যার মতো বিষয়গুলোতে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। লোকেরা ইমরানকে সাবধান করল সে খারেজি। কিন্তু ইমরান তাদের অভয় দিয়ে বলল, 'চিন্তা কোরো না। ইন শা আল্লাহ আমি তাকে পাল্টে ফেলব।' সে তাকে বিয়ে করে নিল। তারপর যা হবার তা-ই হলো। মেয়েটিই তাকে পাল্টে ফেলল। শুধু তাই নয়, পরবর্তীকালে ইমরান খারেজিদের একজন প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হলো!
বাস্তবতা অত্যন্ত রূঢ়। আমাদের সঙ্গ প্রয়োজন, আমাদের পরিবার প্রয়োজন, বন্ধু-বান্ধব প্রয়োজন-অস্বীকার করছি না। কারণ, আমরা সামাজিক জীব। আমরা ভালোবাসার বন্ধনে জুড়ে থাকি। তবে কখনও কখনও দুটো জিনিস মুখোমুখী হয়ে দাঁড়ায়; সত্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, আর সম্পর্ক রক্ষার প্রতি আকাঙ্ক্ষা। তারা পরস্পর একে অপরের বিরুদ্ধে এসে দাঁড়ায়। আর আমার অভিজ্ঞতা বলে, দশভাগের নয়ভাগ মানুষই এসব ক্ষেত্রে সত্যের ওপর সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে বসে।
মানুষের মস্তিষ্ক এভাবেই কাজ করে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাইকোলজিস্ট স্টিভেন পিনকার এমনটাই বলেছেন। তিনি বলেন,
'the brain sometimes pushes a person to accept a belief even though it may be factually incorrect but it is socially correct.'
'মস্তিষ্ক মাঝে মধ্যে ব্যক্তিকে এমন কিছুতে বিশ্বাস করতে জোর প্রদান করে, যা বাস্তবিক অর্থে ভুল, কিন্তু সমাজে সঠিক বলে বিবেচিত।'
আপনি জানেন এটা ভুল। হতে পারে এটা একটা শুবুহাত, ভ্রান্ত বিষয়। হয়তো গুটি কয়েক মানুষ একে দ্বীনের অংশ বলেছে। কিন্তু আপনি যে দলের সাথে চলছেন, যাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ছেন, তাদের বিশ্বাসের দ্বারা আপনি প্রভাবিত হয়ে গেলেন। ফলে একসময় যাকে ভুল জানতেন, তাকে এখন সঠিক ভাবছেন।
কাজেই বন্ধুত্বের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। যেভাবে আপনি আপনার শরীরের যত্ন নিচ্ছেন, ঠিক সেভাবেই আপনার ঈমানের যত্ন নিন।
৪) দ্বীন নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনা করুন
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বারবার একটি কথা বলছে আর তা হলো, আমাদের দেহের রোগ- প্রতিরোধ-ব্যবস্থা প্রতিটি মুহূর্তে ক্যান্সার কোষ ধ্বংসের কাজে নিয়োজিত। আমাদের শরীরের এই ক্ষমতা আছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলেছে, আমরা যখন সুস্থ খাদ্যাভাস ছেড়ে দিই, অস্বাস্থ্যকর খাবার খাই, ব্যায়াম করি না, দৌড়াই না, ঘুমের অভ্যাসের ব্যাপারে সচেতন হই না, তখন আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে। দুর্বল হয়ে যায় সে। ফলে ক্যান্সার কোষগুলো প্রভাব বিস্তার করতে থাকে এবং ছড়িয়ে পড়ে।
একই কথা ইসলামের ক্ষেত্রেও খাটে। শুবুহাত বা সংশয় তখনই আমাদের অন্তরে জায়গা করে নিতে পারে, যখন আমরা ইলম অর্জন ছেড়ে দিই। অথবা যে পরিমাণ মনোযোগ দেবার কথা ছিল সে পরিমাণ দিই না। ইলম ও আমলের ব্যাপারে নিজের সর্বোচ্চটা প্রয়োগ করি না। ফলে সংশয় আমাদের ঈমানের পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে আমরা দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ি। অথচ ঠিক একই সময় একজন দ্বীন শিক্ষার্থীর কাছে এই সংশয় হাস্যকর ঠেকে! তারা বলে, 'আমি এই সংশয় ভেদ করে সত্য দেখতে পাচ্ছি।'
পার্থক্য কোথায়? ইলম বা জ্ঞানই হলো মূল পার্থক্য। অতএব দ্বীন নিয়ে কার্যকরী সিলেবাস তৈরি করুন, এরপর পড়াশোনায় নেমে পড়ুন। সংশয়ের জালে আটকে যাবার আগেই শুরু করুন। আজ থেকেই।
শুবুহাত বা সংশয়ে আক্রান্ত হলে করণীয় :
এবার আমরা এমন চারটি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করব তাদের জন্য, যারা এই মুহূর্তে সংশয়ে ভুগছেন। হতে পারে আপনি নিজেই শুবুহাতে বা সংশয়ে আক্রান্ত অথবা আপনার চেনা পরিচিত কেউ। যদি তা-ও না হয়, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে হলেও এই চারটি পয়েন্ট মগজে গেঁথে ফেলুন:
১) মন্দ চিন্তাকে হটিয়ে বিদায় করুন
খারাপ চিন্তাকে প্রশ্রয় দেবেন না। সন্দেহযুক্ত কোনো চিন্তা আসলেই সেটা শুবুহাত নয়, বরং শুরুর দিকে সেটা থাকে স্রেফ ওয়াসওয়াসা, শয়তানের কুমন্ত্রণা। দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু এই চিন্তাকে মনের ভেতর লালন করা শুরু করলেই তা সংশয়ে রূপ নিতে শুরু করে। আর তখনই বিপত্তি বাঁধে। এজন্য ওয়াসওয়াসাকে পাত্তা দেওয়া যাবে না।
আমাদের নবিজি বলেছেন,
يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ : مَنْ خَلَقَ كَذَا وَكَذَا ؟ حَتَّى يَقُولَ لَهُ : مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ ؟ فَإِذَا بَلَغَ ذَلِكَ ، فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ
'শয়তান তোমাদের কারও কারও (চিন্তায়) এসে বলে, "এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে?” এভাবে একপর্যায়ে সে বলে, "তোমার রবকে তা হলে কে সৃষ্টি করেছে?” যখন এমন অবস্থা হলে ব্যক্তি যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং চিন্তাকে ঝেড়ে ফেলে।[২১]
মন্দ চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। মনে জায়গা দেবেন না। আল্লাহর কাছে পানাহ চান। বলুন, 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ-শাইতনির রজীম।' মন্দ চিন্তা দৃঢ়-বিশ্বাসে পরিণত হবার আগেই তার রশি কেটে দিন।
একটি মজার ঘটনা বলি। একবার আমাদের এখানকার শারীআ-কাউন্সিলে এক ভাই এসেছিল তার স্ত্রীকে নিয়ে। সে বলল, আমরা বিয়ে নবায়ন করতে চাই। আমি বললাম, কেন ভাই? কী হয়েছে?
-আমি দ্বীন ত্যাগ করে ফেলেছি। - এমনটি মনে হচ্ছে কেন আপনার?
সে জানাল, একদিনকার কথা। আমি তখন বাসায় ছিলাম। হঠাৎ আমার মাথায় এমন কিছু ভাবনা জন্ম নিল, যা কুফরের শামিল। অতএব আমি দ্বীন থেকে বেরিয়ে গেছি। আমি পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে আমার স্ত্রীকে বিয়ে করতে চাই।
না ভাই, বিষয়টি এত সহজ নয়। এটা তো স্রেফ শয়তানের ওয়াসওয়াসা ছিল। আপনার এই ভয় প্রমাণ করে আপনার ঈমান এখনও মজবুত আছে। এই ধরণের ওয়াসওয়াসা সাহাবিদের মনেও এসেছিল।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : جَاءَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَسَأَلُوهُ : إِنَّا نَجِدُ فِي أَنْفُسِنَا مَا يَتَعَاظَمُ أَحَدُنَا أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهِ ، قَالَ : وَقَدْ وَجَدْتُمُوهُ ؟ قَالُوا : نَعَمْ ، قَالَ : ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদল সাহাবি নবিজির কাছে এসে বললেন, 'আমরা নিজেদের (মনের) ভিতর এমন কিছু পাই, যা আমাদের কারও কারও কাছে অত্যন্ত সাঙ্ঘাতিক ঠেকে।' নবিজি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা সত্যিই এমন কিছু পাও?' তারা বলল, 'জি, হ্যাঁ।' তিনি বলেন, 'এটাই খাঁটি ঈমান।[২২]
এই যে ঈমানের ব্যাপারে ভয়, এটাই খাঁটি ঈমানের পরিচয়। কারণ, এগুলো শুবুহাত নয়, স্রেফ ওয়াসওয়াসা। অতএব ওয়াসওয়াসাকে প্রাধান্য দেবেন না। মাথায় এলে দুশ্চিন্তাও করবেন না।
২) জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করুন
মাঝে মাঝে আমি খুব অবাক হই সেসব ভাই-বোনদের দেখলে, যারা সামান্য সংশয়ের মুখে ভেঙে পড়ে। তারা বলতে থাকে— "আমি শুধু একটি লেখা পড়েছি, তাতেই আমার ঈমান উবে গেল! একটু কথাবার্তা শোনার দ্বারাই অন্তরে সংশয় গেঁড়ে বসল! আমি তো শেষ, আমার মুক্তি নেই।'
আপনি কেন ভেঙে পড়ছেন? কেন বিষয়টাকে এত বাড়াবাড়ির স্তরে নিয়ে যাচ্ছেন? আল্লাহ আপনার আমার কাছে এমনটা চান না। শান্ত হয়ে বসুন। নিঃশ্বাস ছাড়ুন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আপনার সামনে কী এসেছে? এটা কি অকাট্য কিছু? বাহ্যিকভাবে একদম স্বচ্ছ? ভাবুন। আপনার অন্তরকে স্পঞ্জের মতো বানাবেন না, সামনে যা পায়, তা-ই চুষে নেয়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করুন। প্রশ্ন করতে শিখুন। যে কোনটা আপনার অন্তরে সংশয় সৃষ্টি করে, তার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুন। কিছু একটা পেলেই তাকে এত বেশি গুরুত্ব দেবেন না।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আমি একবার আমার শাইখ ইবনু তাইমিয়্যাকে অনেক প্রশ্ন করছিলাম। শাইখ আমাকে বললেন, "শুনো, তোমার অন্তরকে স্পঞ্জ বানিয়ে ফেলো না, যার সামনে সংশয়পূর্ণ যা-ই আসে, তা-ই সে শুষে নেয়। বরং তোমার অন্তরকে কঠিন ও স্বচ্ছ কাচের মতো বানাও। সংশয় যেন তাকে অতিক্রম করতে গেলে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যায়। কাচটি এতই স্বচ্ছ যে, সংশয়ে ভিতরেও সে সত্যকে দেখতে পারে।”
পরবর্তীকালে ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আমার গোটা জীবনে আমার শাইখের এই নসিহতের চেয়ে উপকারী আর কিছুই পাইনি, যা আমাকে সংশয়পূর্ণ চিন্তা থেকে বেঁচে থাকতে এতটা কাজে দিয়েছে।'
সুতরাং দ্বিতীয় মূলনীতি হলো, সংশয় সৃষ্টিকারী যে-কোনো কথা বা লেখাকে প্রশ্ন করুন। সামনে উপস্থিত যে-কোনো কিছুকেই সত্য বলে ধরে নেবেন না।
৩) জ্ঞানী ব্যক্তি খুঁজে বের করুন
আপনি যে বিষয়ে সংশয়ে ভুগছেন, সে বিষয়ে জ্ঞানী, দক্ষ ব্যক্তির শরণাপন্ন হোন। জ্ঞানী বলতে আমি আপনার এলাকার মসজিদের ইমামের কথা বোঝাচ্ছি না। আমাদের ইমাম, মাশায়েখের প্রতি সম্মান এবং শ্রদ্ধা রেখেই বলছি-মাঝে মাঝে ইমামের যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ সুমধুর কণ্ঠ। এদিকে আপনি বুকভরা আশা নিয়ে তার কাছে যাচ্ছেন, ভাবছেন আপনার সব প্রশ্নের উত্তর তার কাছে আছে। অতঃপর আপনি হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। দুবার, তিনবার, কোনো বারই সঠিক উত্তর পেলেন না। ফলে আপনি ভাবতে লাগলেন, হয়তো এর কোনো উত্তরই নেই। বিষয়টি এমন নয়। এই ক্ষেত্রে একটি নীতি মাথায় রাখবেন,
عدم العلم ليس دليلا على العدم 'কোনো বিষয়ে কারও জ্ঞান না থাকা মানে এই নয় যে ওই বিষয়ে জ্ঞানই নেই।'
আলি হাম্মুদা জানে না তার মানে এই নয় যে, আপনার প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। আপনার সমস্যার জন্য দক্ষ কাউকে খুঁজে বের করুন। কুরআনও আপনাকে তা-ই করতে বলে।
আল্লাহ তাআলার বাণী:
وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ
'অথচ তারা যদি এটা রাসূল ও তাদের দায়িত্বশীল লোকদের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়, তা হলে তা এমন লোকদের দৃষ্টিগোচর হয়, যারা তাদের মধ্যে কথা বলার যোগ্যতা রাখে এবং তা থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।'[২৩]
বিজ্ঞ ব্যক্তির শরণাপন্ন হোন। কারণ, সে আপনার সামনে সংশয়ের স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে পারবে। খণ্ডন করতে পারবে। যা আমি আপনি একাকী করতে পারব না।
৪) ঈমান রক্ষায় দুআ
আমাদের ভিতর যদি জরিপ চালানো হয় কে কে নেককার জীবনসঙ্গিনীর জন্য দুআ করেছে, তা হলে আমিসহ হয়তো সবার নামই চলে আসবে। আলহামদু লিল্লাহ। সুস্থ জীবন, সুদমুক্ত বাড়ি নির্মাণ, ভালো গাড়ি, সন্তানের শিক্ষাখাতে খরচ কমিয়ে আনা, এগুলো আমরা সবাই চাই। এ জন্য দুআও করি। দুআর দরজা তো সর্বদাই উন্মুক্ত। এগুলো অবশ্যই চাওয়া যেতে পারে।
কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আছে। তা হলো, আমাদের ঈমান। সর্বশেষ আমরা কবে ঈমান রক্ষার জন্য দুআ করেছিলাম? মনে পড়ে কি সর্বশেষ আপনি কবে হাত তুলে ঈমানের নিরাপত্তা চেয়েছেন? ইবরাহীম -এর এই দুআটি কি কখনও করেছিলেন?
وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ
'...এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন[২৪]
ইবরাহীম -এর মতো একজন নবি এই দুআ করেছেন! হ্যাঁ, তিনি নিজের ব্যাপারে এই ভয় করতেন। সেখানে আমরা কোথায়!
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ 'আমাদের সরল পথ দেখান' অন্তরের অন্তস্তল থেকে এই দুআটি করুন। এরপর দেখুন, আপনার সালাত কীভাবে পাল্টে যায়। সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
একদিন আমাদের মা আয়িশা দেখলেন নবিজি তাহাজ্জুদ পড়ছেন। তিনি তাঁকে নিম্নোক্ত দুআটি করতে শুনলেন। মুখস্থ করে ফেলুন: اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرَائِيلَ، وَمِيكَابِيلَ، وَإِسْرَافِيلَ، فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ، اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ، إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
'আল্লাহ-তুমি জিবরাঈল, মিকাঈল এবং ইসরাফীলের রব। তুমিই আসমান জমিনের স্রষ্টা। অদৃশ্য এবং দৃশ্য সম্পর্ক তুমিই অবগত। তুমি তোমার বান্দাদের মাঝে মীমাংসা করো, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করে। যে সত্য নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে, তোমার ইচ্ছায় ওই বিষয়ে আমাকে সঠিক পথ দেখাও। নিশ্চয়ই তুমি যাকে ইচ্ছা তাকেই সঠিক পথে পরিচালিত করো।[২৫]
জিবরাঈল-এর মাধ্যমে, ওহির মাধ্যমে সরাসরি রবের সাথে যে মানুষটির যোগাযোগ ছিল, সে কিনা দুআ করছে, 'আমাকে হক পথ দেখাও, যে বিষয়ে মতভেদ করা হয়!' সেখানে আমরা কোথায়? কাজেই আপনিও এই দুআ করুন। এরপর দেখুন আপনার ঈমানি সুস্থতা কীভাবে ফিরে আসে।
পরিশেষে প্রিয় পাঠক, জীবনের লক্ষ্য স্থির করুন। খুঁজে বের করুন আপনার দক্ষতা কোথায়। ভালো কোনো কাজে যুক্ত হয়ে যান। এমন কাজ যা কিয়ামাতের দিন আপনার জন্য অকল্পনীয় ফলাফল নিয়ে আসবে, মৃত্যুর পরেও যে কাজের সুমিষ্ট ফল আপনি ভোগ করতে থাকবেন।
হয়তো ভাবছেন, সংশয়ের সাথে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের কী সম্পর্ক? শেষে এসে এটা বলার হেতু কী?
সত্যি বলতে কী, অধিকাংশ সময় আমাদের সংশয়ের মূলে একটাই কারণ থাকে, অত্যধিক অবসর সময়। এ ছাড়া আর কিছুই না। আমরা খারাপ মানুষ, অজ্ঞ-জাহিল, এজন্য নয়। বরং এর চেয়েও সাধারণ বিষয় দায়ী; আমাদের অবসর সময়। আমরা অনেকেই অত্যধিক ফ্রি সময় কাটাই। কর্মহীন এই সময়গুলো শয়তানের জন্য মোক্ষম সুযোগ। খালি ময়দান পেয়ে সে তাতে সংশয়ের দানা ছুড়ে মারে। উদ্ভট সব চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে দেয়।
সংশয় নিরসন করার জন্য একজন বিজ্ঞ আলিম আছেন আমার পরিচিত। শায়খ আহমাদ। তিনি সম্প্রতি একটি চমৎকার ঘটনা বলেছেন আমাকে।
এক বোন ছিল, আমার কাছে প্রায়ই আসতেন বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে। প্রশ্নগুলোর সবকটাই সংশয়-বিষয়ক থাকত। আমি উত্তর দিতে থাকলাম। কিন্তু একটি প্রশ্ন শেষ হতে-না- হতেই সে আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপন করত। যেন সংশয়ের ঝড় বইছে তার ভিতর! আমি বুঝতে পারছিলাম না, কী করব। একদিন মনে হলো, আমি সম্ভবত সমস্যাটা ধরতে পেরেছি। তাকে ডেকে বললাম, “বোন, আমার কাছে কিছু লেকচার আছে। আমি সেগুলোর লিখিত প্রতিলিপি (transcript) করাতে চাচ্ছি। আপনার কি সময় হবে এই কাজটি নেবার? তা হলে আমার উপকার হতো।” সে বলল, “অবশ্যই, আমি পারব ইন শা আল্লাহ।” আমি তাকে ফাইলগুলো দিলাম। সে প্রতিলিপি লেখা শুরু করল। কিছু দিন যেতেই খেয়াল করলাম, প্রশ্ন আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর আর কোনো দিন সে আমার কাছে সংশয়পূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে আসেনি।'
মাত্রাতিরিক্ত অবসর সময় অধিকাংশ রোগের মূল। অতএব আপনি আখিরাতের জন্য কাজে লেগে পড়ুন। জীবনের একটি বড়ো অংশ এতে ঢেলে দিন। আজকে থেকেই। এটা স্রেফ আপনার সংশয় থেকেই রক্ষা করবে না, পরকালেও আপনাকে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করবে ইন শা আল্লাহ।
আল্লাহর কাছে দুআ করি, তিনি যেন আমাকে আপনাকে ঈমানের স্বাদ উপভোগ করার তাওফীক দেন, আমাদের ইয়াকীনের চাদরে মুড়িয়ে দেন। এবং আমাদের বাবা-মা, সন্তান-সন্ততিদের মাফ করে দেন। আমীন!
টিকাঃ
[৮] আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, ৬৬
[৯] ইবনু মাজাহ : ৮৮; আল-জামিউ আস-সগীর: ১/১০৭৮; সহীহ
[১০] মুসলিম: ২৩৯
[১১] মুসলিম, মুকাদ্দিমা
[১২] সূরা শুআরা, ২৬:৮৭-৮৯
[১৩] মিফতাহু দারিস-সায়াদাহ: ১/১১০
[১৪] মিফতাহু দারিস-সায়াদাহ: ১/১৪০
[১৫] সূরা আল-মাইদা, ৫: ৭১
[১৬] যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ৭/৪০২
[১৭] আবদুর রাজ্জাক, আল-মুসান্নাফ, ২০০৯৯
[১৮] সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭/২৬১
[১৯] আবূ দাউদ: ৪৩১৯; সহীহ
[২০] আবূ দাউদ, ৪৮৩৩; সহীহ
[২১] মুসলিম: ২২২
[২২] মুসলিম: ২১৯
[২৩] সূরা নিসা, ৪:৮৩
[২৪] সূরা ইবরাহীম, ১৪: ৩৫
[২৫] মুসলিম, ৭৭0
📄 শুদ্ধ জীবন শুদ্ধ মনন
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর একটি বিখ্যাত দুআ আছে:
وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سليم
“..(ও আল্লাহ) পুনরুত্থান-দিবসে আমাকে অপমানিত কোরো না। যেদিন ধন- সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি কোনো কাজে আসবে না। সে ব্যতীত, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তর (কলবুন সালীম) নিয়ে।”[২৬]
আজ যদি আমাদেরকে জানানো হয়, ‘আপনার হার্টের কিছু অংশ ব্লক হয়ে গেছে।’ তা হলে আমরা অনেকেই এর চিকিৎসায় অর্জিত সকল অর্থসম্পদ ব্যয় করতেও কুণ্ঠাবোধ করব না। জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড এর পেছনে দেব, তবুও এটা নিশ্চিত হতে হবে, আমার হার্ট সুস্থ। আমরা জানি, ব্লক নিয়ে নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকা যায় না। জীবন এভাবে চলতে পারে না।
সত্যিকার অর্থে অন্তরের মৃত্যু কাকে বলে—ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আমাদের জন্য সেই শিক্ষা রেখে গেছেন। আসলে অন্তরের মৃত্যু তখন ঘটে না, যখন এর স্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়, কিংবা কোলেস্টরল জমে ব্লক হয়ে যায়; বরং অন্তরের প্রকৃত মৃত্যু তখনই ঘটে, যখন এর ভিতরের ঈমান মরে যায়, বিশ্বাসটুকু নষ্ট হয়ে যায়। যখন আপনি ইসলামের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করবেন, তখনই অন্তর মৃত্যুর মুখে পড়ে।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আমাদের বলছেন, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলা সুস্থ অন্তর ছাড়া কিছুই গ্রহণ করবেন না। খুবই ভয়াবহ একটি আয়াত ভাই ও বোনেরা। যে নিষ্পাপ অন্তর নিয়ে আমরা প্রত্যেকে জন্মিয়েছি, আল্লাহ সেই অন্তর ধারস্বরূপ আমাদের দিয়েছেন। এই অন্তর আমাদের জন্য আমানত। তেমনি আমাদের কাছে আশা করা হয়েছে, দিন শেষে এই আমানতকে সেই অবস্থাতেই ফিরিয়ে দেব, যে অবস্থায় প্রথমে পেয়েছিলাম। নয়তো আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন না। মোটেও গ্রহণ করবেন না।
প্রশ্ন হচ্ছে, কলবুন সালীম বা সুস্থ অন্তর কী? সেই অন্তরের বৈশিষ্ট্য কী, যা ব্যতীত আল্লাহ তাআলা কোনোকিছুই গ্রহণ করবেন না?
মুজাহিদ বলেন,
لا شك فيه. "কলবুন সালীম হলো, যে অন্তরে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।”[২৭]
কাতাদা বলেন,
سليم من الشرك "কলবুন সালীম হচ্ছে, যে অন্তর সকল প্রকার শিরক থেকে মুক্ত।"[২৮] অর্থাৎ প্রকৃত তাওহীদে বিশ্বাসী।
দাহহাক বলেন,
هو الخالص "যে অন্তর একনিষ্ঠ।"[২৯] যে অন্তরে লোকদেখানো স্বভাব নেই। শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য।
আবূ উসমান বলেন,
القلب السليم هو القلب الخالي من البدعة المطمئن إلى السنة "কলবুন সালীম হলো, যে অন্তর বিদআত থেকে মুক্ত এবং সুন্নাহ নিয়ে পরিতৃপ্ত।"[৩০]
ইবনুল কাইয়িম ওপরের সবগুলো মণিমুক্তা একত্র করে চমৎকার একটি বাক্য দাঁড় করিয়েছেন:
ولا يتم له سلامته مطلقا حتى يسلم من خمسة أشياء: من شرك يناقض التوحيد، وبدعة تخالف السنة، وشهوة تخالف الأمر، وغفلة تناقض الذكر، وهوى يناقض التجريد والإخلاص
'একজন মুসলিমের অন্তর ততক্ষণ পর্যন্ত কলবুন সালীম হতে পারবে না, যতক্ষণ না ৫টি রোগ থেকে মুক্ত হচ্ছে:
১) শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত হওয়া, যা তাওহীদ বিনষ্ট করে।
২) বিদআত থেকে মুক্ত হওয়া, যা সুন্নাহ বিনষ্ট করে।
৩) (হারাম) খায়েশ থেকে মুক্ত হওয়া, যা (আল্লাহ ও রাসূলের) নির্দেশের বিরুদ্ধে যায়।
৪) গাফলতি থেকে মুক্ত হওয়া, যা আল্লাহর স্মরণ নষ্ট করে দেয়।
৫) প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হওয়া, যা ঈমানী দৃঢ়তা এবং ইখলাস নষ্ট করে দেয়।'[৩১]
এগুলো মনে রাখতে কষ্ট হলে শুধু এই বাক্য মনে রাখুন, 'কলবুন সালীম হচ্ছে, যে অন্তর পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।'
কুফর-শিরকের কোনো স্থান নেই এতে। বিদআতী কর্মের প্রতি আগ্রহ নেই। সংশয়বাদীদের কিংবা মুনাফিকদের সংশয়মূলক কথা-বার্তায় এই অন্তর মোটেও প্রভাবিত হয় না। বিভিন্ন প্রকার তন্ত্রমন্ত্র, আদর্শ, কিংবা পূর্ব-পশ্চিমের কোনো দর্শনে পরিচালিত হয় না। কে কী ভাবল, এসবের প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করে না, এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। সে কেবল আল্লাহর মনোযোগ চায়, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। এমন অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি অপর মুসলিমের সাথে তিন দিনের বেশি বয়কট করে থাকতে পারে না। কারণ, তার অন্তর পরিশুদ্ধ, পঙ্কিলতামুক্ত। এতে নেই মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ, কারও প্রতি আক্রোশ। কারও কল্যাণ দেখলে সে বিচলিত হয় না, হিংসা করে না। সেই কল্যাণ হতে পারে একজন সুন্দরী স্ত্রী, নতুন মডেলের গাড়ি, কিংবা চোখধাঁধানো বাড়ি... যাই হোক। এসব দেখে বলে, 'হে আমার রব, এগুলো যদি তার জন্য কল্যাণকর হয়, তা হলে আরও বাড়িয়ে দিন।'
আর কারও সাথে খারাপ কিছু হতে দেখলে সে আত্মতুষ্টিতে ভোগে না। বরং তাদের জন্য দুআ করে—'হে আমার রব, তাদের হিদায়াত দিন। তাদের কল্যাণ করুন। তাদের সুস্বাস্থ্য দিন।'
এটাই হলো প্রশান্ত আত্মার নমুনা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সমগ্র কুরআনে কলবুন সালীমের আলোচনা মাত্র দুবার এসেছে। সর্বপ্রথম এসেছে ইবরাহীম-কে উদ্দেশ্য করে। দ্বিতীয়বারও এসেছে ইবরাহীম-কেই উদ্দেশ্য করে।
প্রথমটি আমাদের আলোচ্য আয়াতগুলো। অর্থাৎ সূরা আশ-শুআরা, এর ৮৭ থেকে ৮৯ আয়াত। আর দ্বিতীয়টি সূরা সফফাতের ৮৩-৮৪ নং আয়াতগুলো:
وَإِنَّ مِنْ شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ إِذْ جَاءَ رَبَّهُ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
"আর নিশ্চয়ই ইবরাহীম তার দ্বীনের অনুসারীদের একজন। (স্মরণ করো) যখন সে তার রবের নিকট বিশুদ্ধ অন্তর (কলবুন সালীম) নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল।"
অন্তরকে মোটেও সাপবিচ্ছুর ঘর বানাবেন না ভাই-বোনেরা। হিংসাবশত কাউকে ছোবল মারা, ফাঁসিয়ে দেওয়া, কীভাবে আমি তার চেয়ে ওপরে উঠব-এই ধরণের মানসিকতা লালন করে অন্তরটাকে কীটপতঙ্গের ঘর বানাবেন না। এমন অগ্নিকুণ্ড অন্তরে প্রজ্জ্বলন করবেন না, যা আপনাকেই পুড়িয়ে মারবে, আপনারই বিপদ ডেকে আনবে। দিনশেষে আপনি নিজেই এর মধ্যে পড়ে যাবেন, এসব করে শুধু নিজেরই ক্ষতি করবেন।
তাই প্রতিদিন ঘুমোতে যাবার পূর্বে চিন্তা করুন, আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্কের বাঁধন নিয়ে। তারপর চিন্তা করুন, মানুষদের সাথে আপনি কেমন। চিন্তা করুন, কৃত- পাপগুলো নিয়ে, শিরক নিয়ে, যা আপনার তাওহীদকে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। বিদআত নিয়ে, যা আপনার কর্মপন্থায় ঢুকে যাচ্ছে। ভাবুন আপনার প্রবৃত্তির খায়েশ নিয়ে, যা আপনি সেদিন বাস্তবায়ন করেছেন। ভাবুন, আর আল্লাহর কাছে মাফ চান। ইস্তিগফার করুন, আন্তরিকভাবে তাওবা করুন।
এরপর মানুষদের দিকে মনোনিবেশ করুন। তাদের কথা ভাবুন, যারা আপনার দ্বারা কষ্ট পেয়েছে এবং যারা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে। যারা আপনার দ্বারা কষ্ট পেয়েছে, তাদের কাছে মাফ চাওয়ার মনস্থির করুন। আর যারা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের সবাইকে একে একে মাফ করে দিন। নাম ধরে ধরে তাদের জন্য দুআ করুন।
আর এসব করবেন এই আশা নিয়ে, যেন আল্লাহ আপনাকে এমন একটি অন্তর দান করেন, যা হবে পাপ-পঙ্কিলতা-মুক্ত, পবিত্র, একদম স্বচ্ছ। কলবুন সালীম।
টিকাঃ
[২৬] সূরা আশ-শুআরা, ২৬: ৮৭-৮৯
[২৭] তাবারি, আত-তাফসীর, ১৭/৫১৬
[২৮] প্রাগুক্ত
[২৯] প্রাগুক্ত
[৩০] কুরতুবি, আত-তাফসীর, ১৩/১১৪
[৩১] ইবনুল কাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফি, ১২১
📄 ক্যালেন্ডারের পাতায় ২১১১ সাল
আজ থেকে এক শ বছর পর। লেখাটি যারা পড়ছেন, আমাদের প্রত্যেকের দেহ তখন মাটির নিচে থাকবে। অস্তিত্ব তখন রূহের জগতে। দেখছি আমাদের নিজেদের তাকদীর, জান্নাতী না জাহান্নামী।
জমিনে-ফেলে-আসা আমাদের সুন্দর বাড়িটি হয়তো অন্যের দখলে চলে গেছে। পছন্দের কাপড়গুলো এখন অন্যরা পরছে, শখের গাড়িটি হয়তো অন্য কেউ চালাচ্ছে। আর আমাদের? খুব কম জনই স্মরণে রেখেছে। কেউ কেউ হয়তো ভুলেই গেছে। আচ্ছা, ব্যস্ততার এই জীবনে আপনার দাদার দাদাকে কতবার স্মরণ করেছেন? আপনার দাদির দাদিকে কখনও কি মনে পড়েছে?
প্রজন্মের-পর-প্রজন্ম পেরিয়ে আমরা এই জীবন লাভ করেছি। তেমনিভাবে নতুন প্রজন্মের ভিড়ে আমরাও একদিন হারিয়ে যাব।
এভাবে অনেক প্রজন্ম আসছে আর যাচ্ছে। কিন্তু দুনিয়াকে বিদায় জানানোর সময় খুব কম জনই ফেলে-যাওয়া জীবনটা একটু ফিরে দেখার সুযোগ পেয়েছে। বাস্তবতা হলো, এই জীবনটা আমাদের কল্পনার চেয়েও সংক্ষিপ্ত।
২১১৯ সালে কবরে শুয়ে আমরা সবাই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারব, সত্যিই দুনিয়াটা কতই-না তুচ্ছ ছিল! একে-ঘিরে-দেখা স্বপ্নগুলো কতই-না নগণ্য ছিল!
২১১৯ সালে আমরা সকলেই চাইব, 'ইশ, যদি জীবনটা মহৎ কিছুতে উৎসর্গ করতে পারতাম! ইসলামের জন্যে! নেক আমল সংগ্রহের পেছনে দিতে পারতাম! মৃত্যুর পরেও যে কাজগুলো আমাদের উপকার করে চলছে, সেগুলোর পেছনে যদি সব উৎসর্গ করতে পারতাম!'
২১১৯ সালে আমরা অনেকেই চিৎকার করে কথাগুলো বলব, কিন্তু কোনো ফল বয়ে আনবে না এই হাহাকার: ‘..আমার রব, আমাকে আবার ফেরত পাঠান। যেন আমি নেক আমল করতে পারি যা আমি আগে করিনি।[৩২]
জবাব মিলবে, ‘না, এটা হবার নয়। এটা তো তার একটা কথামাত্র, যা সে বলার জন্যই বলবে। তাদের সামনে বারযাখ থাকবে উত্থান-দিবস পর্যন্ত।[৩৩]
২১১৯ সালে আমরা অনেকেই আফসোস থেকে নিজেদের হাত কামড়াব, আর বলব, ‘হায়, আমার এ জীবনের জন্য আমি যদি কিছু অগ্রিম পাঠাতাম!’[৩৪]
ভাইরে, মৃত্যুর ফেরেশতা আমাদেরকে নেককার হবার সময় দেবে না। বোনরে, সে অপেক্ষা করবে না আমাদের জন্য...
তাই আসুন না, মালাকুল মাউত আসার আগেই আমরা সংশোধন হয়ে যাই। পাপে-ভরা জীবনটাকে পাল্টে ফেলি। চিরদিনের জন্য পাল্টে ফেলি।
টিকাঃ
[৩২] সূরা আল-মু'মিনুন, ২৩: ১১
[৩৩] আল-মু'মিনুন, ২৩: ১০০
[৩৪] সূরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৪