📄 ধোকাবাজি, ছলচাতুরী ও ষড়যন্ত্র করা
আল্লাহ তা'য়ালা বলেনঃ “যারা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকারীকেই চারদিক থেকে ঘেরাও করে।” রাসূল (সা) বলেছেনঃ ষড়যন্ত্রকারী ও ধোকাবাজের স্থান জাহান্নামে।
রাসূল (সা) বলেছেনঃ "কোন ধোকাবাজ, কৃপণ ও খোটাদানকারী জান্নাতে যাবে না।"
পবিত্র আল কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা ধোকাবাজিকে মুনাফিকদের স্বভাব বলে অভিহিত করেছেনঃ “তারা (মুনাফিকরা) আল্লাহকে ও মুমিনদেরকে ধোকা দিয়ে থাকে।”
সহীহ মুসলিমের হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কারো ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে ধোকা দেয় সে জাহান্নামী।
(পণ্য দ্রব্যের নকল, ভেজাল, মুদ্রা, সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট ও অন্যান্য দলিল জাল করা এবং ভিন্ন পেশার লোকের পোশাক পরে ছদ্মবেশ ধারণ পূর্বক অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করাও প্রতারণা ও জালিয়াতির অন্তর্ভুক্ত। অনুবাদক)।
📄 কৃপণতা, অপচয় ও অপব্যয় তথা অবৈধ ও বিশৃঙ্খল ব্যয়
আল্লাহ তা'য়ালা বলেনঃ “তোমার হাত কাঁধের সাথে বেঁধে রেখনা এবং তা পুরোপুরিভাবে ছড়িয়েও দিওনা।” অর্থাৎ কৃপণতাও করোনা, অপচয় অপব্যয়ও করোনা। আল্লাহ আরো বলেনঃ “অপব্যয় করোনা। অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা বনী ইসরাইল)
রাসূল (সা) বলেনঃ “কৃপণ জান্নাতে যাবে না। আল্লাহ বলেনঃ যারা আল্লাহর দেয়া সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করে, তারা যেন মনে না করে যে, এই কার্পণ্য তাদের জন্য ভালো। বরং ওটা তাদের জন্য খারাপ। যে জিনিস নিয়ে তারা কার্পণ্য করে, তা কিয়ামতের দিন তাদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে।”
আল্লাহ আরো বলেনঃ “যারা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ধার দেয়না তাদের জন্য ধ্বংস। (সূরা মাউন)।
এক কথায়, সম্পদ উপার্জনে যেমন শরীয়তের বিধান মেনে চলতে হবে, তেমনি তা ব্যয়েও শরীয়তের বিধান অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় ও শরীয়ত নির্দেশিত ক্ষেত্রে ব্যয় না করা বা কম ব্যয় করা (কৃপণতা), প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করা (অপচয়) এবং অর্থনষ্ট করা (অপব্যয়) এ সবই অবৈধ ও বিশৃংখল ব্যয়ের আওতাভুক্ত এবং কবীরা গুনাহ। বিলাসিতাও এক ধরনের অপব্যয়।
📄 মুসলমানের গোপনীয় বিষয় শত্রুর নিকট ফাঁস করা
বিশিষ্ট সাহাবী বদরযোদ্ধা হাতিব ইবনে আবি বালতায়া মক্কায় অবস্থানরত নিজের পরিবার পরিজনের নিরাপত্তার খাতিরে রাসূল (সা) এর মক্কা বিজয়ের পরিকল্পনা 'ফাঁস করে দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। সময়মত ওহীর মাধ্যমে এ বিষয়টি জানতে পেরে রাসূল (সা) ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়ায় তার চিঠি মক্কা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। হযরত উমর এ ঘটনার নায়ক উক্ত সাহাবীকে মুনাফিক আখ্যায়িত করে হত্যা করার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল (সা) অনুমিত দেননি। তিনি হাতিবের ওযর ও ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন। তবে এ কাজটি যে অন্যায় ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। শুধুমাত্র বদরযোদ্ধা হওয়ার কারণে তিনি ক্ষমার যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন। এমন কাজ অন্য কারো বেলায় ক্ষমার যোগ্য হবেনা।
📄 কোন সাহাবীকে গালি দেয়া
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এ হাদীসে ইতিপূর্বেও আলোচিত হয়েছে যে, "আল্লাহ বলেন : (হাদীসে কুদসী) "যে ব্যক্তি আমার কোন বন্ধুর সাথে শত্রুসুলভ আচরণ করবে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছি। রাসূল (সা) বলেন : তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালি দিওনা। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ করে বলছি, তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড়ের সমান স্বর্ণ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তবুও সে কোন সাহাবীর সমান বা অর্ধেক মর্যাদারও অধিকারী হতে পারবেনা। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন : আমার সাহাবীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আমার তিরোধানের পর তাদেরকে গালি দেয়ার লক্ষ্য বানিওনা। তাদেরকে যে ভালোবাসবে, সে আমার ভালো বাসায় উদ্বুদ্ধ হয়েই ভালোবাসবে। আর যে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে, সে আমার প্রতি বিদ্বেষ বশতঃই তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে। তাদেরকে যে কষ্ট দেবে, সে আমাকে কষ্ট দেবে। আর আমাকে যে কষ্ট দেবে, সে আল্লাহকে কষ্ট দেবে। আর যে আল্লাহকে কষ্ট দেবে, তাকে তিনি অচিরে পাকড়াও করবেন।" (জামে তিরমিযী)
সাহাবায়ে কেরামের গুরুত্ব ও মর্যাদার মূল কারণ এই যে, তারা রাসূল (সা) এর কাছে সরাসরি ঈমান এনেছেন, তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছেন, আর তাঁর সাথে জিহাদ এবং দীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজ করেছেন। তাঁরাই এ উম্মাতের শ্রেষ্ঠ ও প্রথম প্রজন্ম। তাঁরা না থাকলে আমরা আল কুরআন, আল হাদীস ও শরীয়তের কিছুই পেতামনা। কাজেই তাদেরকে গালি দেয়া ও তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ স্বয়ং আল্লাহ, রাসূল ও দীনের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ ও ইসলাম থেকে খারিজ হওয়ার নামান্তর।
সকল সাহাবীর মধ্যে দশজন সাহাবী হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ। এরা আশারায়ে মুবাশ্শারা। অর্থাৎ জীবিত থাকতেই তাঁরা জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আবার চার খলিফা শ্রেষ্ঠতম। তাদের সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন: "তোমরা আমার নীতি আকড়ে ধর, আর আমার পর হেদায়াত প্রাপ্ত খলিফাগণের নীতি অনুসরণ কর। তাদেরকে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ কর এবং নতুন উদ্ভাবিত শরীয়ত বহির্ভূত নীতি প্রত্যাখ্যান কর।"
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যে সব বিষয়ে মতভেদ হয়েছে। সে সব বিষয় নিয়ে কিছু সমস্যায় পড়তে হয় বটে। তবে এ ক্ষেত্রে নীরবতা অবলম্বন করাই নিরাপদ। একান্তই যদি মতামত ব্যক্ত করা অপরিহার্য হয় তাহলে অধিকাংশ সাহাবীর মতের পক্ষে ও খোলাফায়ে রাশেদীনের নীতির পক্ষে মত দিতে হবে। আর আল কুরআন ও সুন্নাহর মতকে সর্বোচ্চে স্থান দিতে হবে। কিন্তু ভিন্ন মতাবলম্বী সাহাবীদের ব্যাপারে কোন বিরূপ মন্তব্য করা কখনো বৈধ হবেনা। তাদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, সততা ও সত্যবাদিতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা যাবেনা।
সামগ্রিকভাবে তাদের সম্পর্কে আমাদের সেই আকীদাই পোষণ করতে হবে যা আল কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে। সেটি হলো, "আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট।" সুতরাং তাঁরা উম্মাতের সকল মতভেদের উর্দ্ধে। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক কিছু মতভেদ থাকা সত্ত্বেও এমনকি তাদের মধ্যে উষ্ট্র যুদ্ধ ও সিফফীন যুদ্ধ সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা সকলেই সন্দেহাতীতভাবে জান্নাতী। আমাদের তাদের কার্যকলাপ নিয়ে মাথা ঘামানোর পরিবর্তে নিজেদের পরিণাম নিয়ে মাথা ঘামানো কর্তব্য।