📄 আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “বল, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের জীবনকে হেলায় নষ্ট করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়োনা। আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দিয়ে থাকেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াশীল।” (সূরা আয যুমার)
"কাফিররা ছাড়া কেউ আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ হয়না।” (সূরা ইউসুফ)
এক হাদীসে আছে যে, কিয়ামতের দিন আরশের দিক থেকে জনৈক আহবানকারী উচ্চস্বরে বলতে থাকবে “অমুক কোথায়? অমুক কোথায়?” “এই ডাক যে ব্যক্তি শুনবে, সে ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকবে। আল্লাহ তাকে বলবেন: “তোমাকেই ডাকা হয়েছে। তুমি এস, আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টার নিকট নিজেকে পেশ কর। এই সময় আল্লাহর বান্দারা সকলে শুয়ে চক্ষু বিস্ফারিত করে আরশের দিকে তাকাবে। আয় যার নাম ধরে ডাকা হয়েছে, সেই ব্যক্তি আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। তখন আল্লাহ নিজের নূর দিয়ে তাকে অন্য সকলের দৃষ্টির আড়াল করে ফেলবেন। তারপর তাকে বলবেন হে আমার বান্দা! তুমি কি জানতে না যে, আমি সৃষ্টিজগতের তোমার যাবতীয় কার্যকলাপ দেখতাম? সে বলবে: হাঁ, আমার মনিব আমি তা জানতাম। আল্লাহ বলবেন হে আমার বান্দা! তুমি কি শোননি যে, আমার অবাধ্য বান্দাকে আমি কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকি? সে বলবে! হাঁ, শুনেছি। আল্লাহ বলবেন: আমার অনুগত বান্দার জন্য আমার কত পুরস্কার রয়েছে, তা কি শোননি? সে বলবে: হাঁ, শুনেছি। আল্লাহ বলবেন: হে আমার বান্দা, তুমি কি আমার নাফরমানী করেছ? সে বলবে! হাঁ কখনো কখনো করেছি। আল্লাই বলবেন? আজ আমার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? সে বলবেঃ হে আমার প্রভু! আমার ধারণা এই যে, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাই বলবেন হে আমার বান্দা। তুমি কি নিশ্চিত ছিলে যে, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব? সে বলবেঃ "হাঁ, কেননা আপনি আমাকে গুনাহের কাজ করতে দেখেছিলেন, কিন্তু আপনি লুকিয়ে রেখেছিলেন।” আল্লাহ বলবেনঃ তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম, এবং তোমার ধারণা সত্য প্রমাণিত করলাম। এই নাও, তোমার আমলনামা ডান হাতে নাও। এতে তোমার যে সৎকাজ আছে তা আমি কবুল করে নিয়েছি। আর যত খারাপ কাজ আছে তা মাফ করে দিয়েছি। আমি মহানুভব ও দয়ালু।
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূল (সা) এর কাছে কিছু সংখ্যক বন্দীকে আনা হলো। দেখলেন, বন্দীদের মধ্যে থেকে এক মহিলা স্বীয় শিশু সন্তানকে দেখেই তাকে কোলে তুলে নিল এবং দুধ খাওয়াতে লাগল। রাসূল (সা) সাহাবীদের বললেন : তোমরা কি মনে কর যে, এই মহিলা স্বীয় সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে/ সাহাবীগণ বললেনঃ না। তখন রাসূল (সা) বললেন : এই মহিলা তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি তার চেয়েও বেশী দয়ালু।"
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এ হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেনঃ "আমার প্রতি আমার বান্দা যেমন ধারণা করে আমি তেমনি। সে যেখানে আমাকে স্মরণ করে, আমি সেখানেই তার সাথে থাকি। আল্লাহ তার গুনাহগার বান্দার তওবায় সেই ব্যক্তির চেয়েও বেশী খুশী হন, যার উট মরুভূমিতে হারিয়ে গেছে এবং হতাশায় সে যখন মৃত্যুর মুখোমুখী, তখন সেই উটকে ফিরে পেয়েছে। যে ব্যক্তি আমার দিকে এক হাত এগোয়, আমি তার দিকে দুই হাত এগোই। আর সে যখন আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তখন তার দিকে দৌড়ে যাই।"
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন : "মুমিন যদি জানতো আল্লাহর কাছে পাপের কি শাস্তি নির্দিষ্ট রয়েছে, তাহলে তাঁর জান্নাতের প্রত্যাশা কেউ করতোনা। আর সে যদি জানতো আল্লাহর কাছে কত দয়া ও করুণা রয়েছে, তাহলে তাঁর জান্নাত থেকে কেউ নিরাশ হতোনা।"
শুধু আখিরাতের মুক্তির ব্যাপারেই নয়, দুনিয়ার সুখশান্তির ব্যাপারেও হতাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ সব রকমের হতাশাই নিষিদ্ধ করেছেন। কেননা হতাশা মানুষকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। গুনাহগারকে আরো গুনাহগার হতে প্ররোচিত করে এবং বিপদ মুসিবত ও অভাব পীড়িত ব্যক্তিকে আত্মহত্যা, মৃত্যু কামনা ও অবৈধ উপায়ে অর্থোপার্জনের মত পাপকাজে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষ যত দুরবস্থায়ই পতিত হোকনা কেন, আল্লার রহমতের আশার ওপর নির্ভর করে ধৈর্য সহকারে বৈধ পন্থায় সব রকমের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কর্তব্য।
টিকাঃ
১. আলোচ্য ৬৪তম কবীরা গুনাহ মূল গ্রন্থে অসম্পূর্ণ অবস্থায় ছিল। এর প্রথম হাদীসটি ব্যতীত আর কিছুই সেখানে ছিলনা। এমনকি শিরোনামও ছিলনা। কেবল প্রথম হাদীসটির বিষয়বস্তুর আলোকে ৬৪তম কবীরা গুনাহর শিরোনাম, বাদবাকী আয়াত, হাদীসসমূহ সংযোজিত করে অনুবাদক কর্তৃক পূর্ণতা দান করা হয়েছে।
📄 বিনা ওযরে জামাআত ত্যাগ করা ও একাকী নামায পড়া
সহীহ মুসলিম ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) জামায়াত ত্যাগে অভ্যস্ত একদল লোক সম্পর্কে বলেছেন: "আমার ইচ্ছা হয়, অন্য কাউকে নামায পড়ানোর দায়িত্বে নিয়োজিত করে জামায়াত ত্যাগকারীদের ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দিয়ে আসি।" সহীহ মুসলিমের আর একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেনঃ "যারা জামায়াত ত্যাগে অভ্যস্ত, তাদের এই অভ্যাস ত্যাগ করতেই হবে, নচেত আল্লাহ তাদের হৃদয়ে অবশ্যই মোহর মেরে দেবেন এবং তারা অবশ্যই শিথিল হয়ে যাবে।"
সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি অবজ্ঞার মনোভাব নিয়ে তিনটি জুময়া ত্যাগ করবে, আল্লাহ তার হৃদয়ে সিল মেরে দেবেন। রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি বিনা ওযরে ও কোন ক্ষতির আশংকা ব্যতীতই জুময়ার নামায ত্যাগ করে, তাকে এমন এক খাতায় মুনাফিক লেখা হয়, যে খাতা থেকে কিছুই মোছা হয়নি এবং কোন কিছুই রদবদল করা হয়না।"
সুনানে নাসায়ীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ "প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ওপর জুময়ার নামায পড়া অবশ্য কর্তব্য"
সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আযান শুনলো এবং কোন ওযর ছাড়াই জামায়াতে যাওয়া থেকে বিরত থাকলো, তার (ঘরের মধ্যে পড়া) নামায কবুল হবে না।"
📄 ওসিয়্যতের মাধ্যমে কোন উত্তরাধিকারীর ক্ষতি সাধন
জামে তিরমিযী, সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "কোন পুরুষ ও স্ত্রী ষাট বছর ব্যাপী আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য করে অতঃপর মৃত্যুর সম্মুখীন হয় এবং ওসিয়তের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি সাধন করে। এর ফলে জাহান্নাম তার জন্য অনিবার্য হয়ে যায়।"
সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি কারো উত্তরাধিকার হরণ করে, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর জান্নাতের উত্তরাধিকার হরণ করবেন।"
জামে তিরমিযীতে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের জন্য তার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছেন। সুতরাং কোন উত্তরাধিকারীর জন্য ওসিয়ত করা চলবেনা।"
📄 ধোকাবাজি, ছলচাতুরী ও ষড়যন্ত্র করা
আল্লাহ তা'য়ালা বলেনঃ “যারা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকারীকেই চারদিক থেকে ঘেরাও করে।” রাসূল (সা) বলেছেনঃ ষড়যন্ত্রকারী ও ধোকাবাজের স্থান জাহান্নামে।
রাসূল (সা) বলেছেনঃ "কোন ধোকাবাজ, কৃপণ ও খোটাদানকারী জান্নাতে যাবে না।"
পবিত্র আল কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা ধোকাবাজিকে মুনাফিকদের স্বভাব বলে অভিহিত করেছেনঃ “তারা (মুনাফিকরা) আল্লাহকে ও মুমিনদেরকে ধোকা দিয়ে থাকে।”
সহীহ মুসলিমের হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কারো ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে ধোকা দেয় সে জাহান্নামী।
(পণ্য দ্রব্যের নকল, ভেজাল, মুদ্রা, সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট ও অন্যান্য দলিল জাল করা এবং ভিন্ন পেশার লোকের পোশাক পরে ছদ্মবেশ ধারণ পূর্বক অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করাও প্রতারণা ও জালিয়াতির অন্তর্ভুক্ত। অনুবাদক)।