📄 জেনে শুনে নিজেকে পিতা ব্যতীত অন্যের সন্তান বলে পরিচয় দেয়া
সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজের পিতা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, তার জন্য জান্নাত হারাম।
সহীহ আল বুখারীর অপর হাদীসে এরূপ ব্যক্তিকে কাফির বলা হয়েছে এবং অভিশাপ ও লা'নত বর্ষণ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি নিজের পিতা ব্যতীত অন্য কাউকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, অথচ সে জানে যে, সে তার পিতা নয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং সে কাফির। যে ব্যক্তি নিজে যা নয় তাই দাবী করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, তার উচিত জাহান্নামে নিজের বাসস্থান গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি কাউকে কাফির বা আল্লাহর দুশমন বলে অভিহিত করে, অথচ আসলে সে তা নয়, তার উক্তি তার ওপরই প্রযুক্ত হবে। অর্থাৎ সে নিজেই কাফির ও আল্লাহর দুশমনে পরিণত হবে।
📄 জেনে শুনে অন্যায়ের পক্ষে তর্ক, ঝগড়া ও দ্বন্দ্ব
আল্লাহ তায়ালা বলেন: মানুষের মধ্যে অনেকে এমন আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কে যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে, এবং তাঁর অন্তরে যা আছে, সে সম্বন্ধে সে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে। অথচ সে কট্টর দুশমন।"
ইমাম গাযযালী (রহ) বলেছেন: ইসলামী শরীয়তে তর্ক তিন প্রকারের এবং তিনটিই নিন্দনীয়। একটি হচ্ছে "মিরা"। এর অর্থ হলো, কারো কথায় নিছক ভাষাগত খুঁত ধরে আপত্তি জানানো। এর উদ্দেশ্য বক্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা ও নিজেকে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা ছাড়া আর কিছু হয়না। দ্বিজীয়টি হচ্ছে "জিদাল"। এর অর্থ হলো, মতের বিভিন্নতা প্রকাশ করা এবং নিজের মতকে অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা। আর তৃতীয়টি হলো "খুশুমাত”। এর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে অর্থ বা অন্য কোন ধরনের স্বার্থ উদ্ধার। এটি কখনো গায়ে পড়ে বাঁধানো হয়। আবার কখনো অপরের কথার সূত্র ধরে বলা হয়। প্রথমটি অর্থাৎ "মিরা" কখনো প্রথমে গায়ে পড়ে করা হয় না, অন্য কোন বক্তব্যের ছুঁতো ধরেই করা হয়। আর শেষের দুটি প্রথমেও করা হয়। পরেও করা হয়। তবে তিনটিরই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে অসৎ ও অন্যায়।
ইমাম নবাবী বলেন: তর্ক দু'রকমই হতে পারে: অন্যায়ের পক্ষে অথবা ন্যায়ের পক্ষে। আল্লাহ বলেছেন: "তোমরা আহলে কিতাবের সাথে সুন্দরতম উপায় ব্যতীত তর্ক করোনা।" "আল্লাহর আয়াতগুলো নিয়ে তর্ক করা কাফিরদের ছাড়া আর কারো কাজ নয় তর্কের উদ্দেশ্যে যদি হয় সত্যুতে জানা ও প্রতিষ্ঠিত করা তবে তা প্রশংসনীয়; আর সত্যকে প্রতিহত করার জন্য তর্ক করা এবং অজীনা বিষয়ে তর্ক করা নিন্দনীয়। এই ব্যাখ্যার আলোকেই কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত তর্ক' সংক্রান্ত উক্তিগুলোকে বুঝতে হবে। ন্যায়সংগত দাবীর পক্ষেও যদি তর্ক করা হয়, তবে তা যদি মিথ্যাচার, কষ্টদায়ক কথাবার্ত ও অশালীন কথাবার্তায় রূপ ধারণ করে, তাহলে তা নিন্দনীয়।
রাসূল (সা) বলেছেন: এক নাগাড়ে তর্ক চালিয়ে যাওয়া গুনাহে লিপ্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (তিরমিযী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "যে ব্যক্তি অজানা বিষয়ে তর্ক করে, সে ঐ তর্ক পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার ওপর আল্লাহ অসন্তুষ্ট থাকবেন।” (তিরমিযী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন : কোন ব্যক্তি যখনই বিপথগামী হয়, তখন সে ঝগড়াটে স্বভাবের হয়ে যায়। (তিরমিয়ী), রাসুল (সা) আরো বলেছেন: "তোমাদের সম্পর্কে আমি তিনটে জিনিসের সবচেয়ে বেশী ভয় করি: যাদের মধ্যে কুরআন ও হাদীসের পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে তাদের পদস্খলন। মুসলিম নামধারী মুনাফিক কর্তৃক কুরআন নিয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়া। এবং দুনিয়ার লোভ-যা তোমাদের মধ্যে খুনোখুনীর প্ররোচনা দেবে।” (তাবরানী)
রাসূল (সা) বলেছেনঃ "কুরআন নিয়ে তর্ক করা কুফরী।" (আবু দাউদ) রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি নিজের মতের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তর্ক থেকে বিরত হয়, তার বাসস্থান জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে হবে। আর যে নিজের মতের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই তর্ক পরিহার করে, তাকে জান্নাতের সাধারণ জায়গায় বাসস্থান দেয়া হবে।
📄 উদ্বৃত্ত পানি অন্যকে না দেয়া
"আল্লাহতায়ালা বলেন: 'তোমরা কি ভেবে দেখেছ, তোমাদের পানি যদি ভূগর্ভে শুকিয়ে যায়, তাইলে কে তৌমাদেরকে প্রবহমান পানি দেবে?" (সূরা আল মুল্ক) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ "তোমরা উদ্বৃত্ত পানি দানে কুণ্ঠিত হয়োনা, যাতে অল্লিাহ তোমাদেরকে ফসল দানে কুষ্ঠিত না হন। মুসনাদে বর্ণিত্যাহয়েছে যে, রাসূল। ইয়া) বলেছেন যে ব্যক্তি তার উদ্বৃত্ত পানি ও উদ্বৃত্ত য়াস দিতে অস্বীকার করে, আল্লাহ্, তাকে কিয়ামতের দিন আপন অনুগ্রহ দিতে, অস্বীকার করবেন।
সহীহ মুসলিম ও সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে *তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নির্দিষ্ট রয়েছে: যে ব্যক্তির উদ্বৃক্ত পানি আছে, কিন্তু পথিককে তা দেয়না, যে ব্যক্তি নিছক দুনিয়ার স্বার্থের জন্য কোন নেতার আনুগত্যের অংগীকার করে, নেতা যদি তাকে তার স্বার্থ দেয় তবে সে অংগীকার বজায় রাখে, নচেত ভংগ করে, আর যে ব্যক্তি কোন জিনিসকে চড়া দামে বিক্রি করার জন্য কসম খেয়ে বলে যে, এটা আমি এত দামে কিনেছি, অথচ আসলে সে সেই দামে কেনেনি, আর ক্রেতা তাকে বিশ্বাস করে।" সহীহ আল বুখারী প্রথম ব্যক্তির বর্ণনা দিয়েছে এইভাবে: "যে ব্যক্তি তার উদ্বৃত্ত পানি অন্য কাউকে দেয় না, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বলবেন, তুমি যে জিনিস নিজের হাতে তৈরী করোনি, তার উদ্বৃত্ত অংশ যেমন কাউকে দাওনি, তেমনি আমি আজ আমার অনুগ্রহ তোমাকে দেবনা।”
📄 মাপে ও ওজনে কম দেয়া
আল্লাহ বলেন: “যারা ওজনে ও মাপে কম দেয়, তাদের জন্য সর্বনাশ। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে আনার সময় ঠিকমত আনে, আর মেপে দেয়ার সময় কম দেয়।" ইমাম সুদী বলেন: রাসূল (সা) যখন হিযরত করেন তখন সেখানে আবু জুহায়না নামক একজন ব্যবসায়ী ছিল। তার দুটো পাল্লা ছিল। একটা দিয়ে নিজের জিনিস মেপে নিত, অপরটি দিয়ে অন্যের জিনিস মেপে দিত। তার প্রসংগে এ আয়াত নাযিল হয়।
রাসূল (সা) বলেছেন: "পাঁচটি জিনিসের ফলে পাঁচটি জিনিস অনিবার্য: কোন জাতি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে আল্লাহ তার ওপর তার শত্রুকে চাপিয়ে দেবেন। কোন জাতি আল্লাহর বিধান ছাড়া মনগড়া বিধান দ্বারা দেশ শাসন করলে তাদর মধ্যে দারিদ্র ছড়িয়ে পড়বে, কোন জাতিতে অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেলে তাদের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি মাবে, মাপে ও ওজনে কম দিলে ফসল কম হবে ও দুর্ভিক্ষ হবে, আর যাকাত দেয়া বন্ধ করলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে।" লক্ষণীয় যে, মাপে কম দেয়া ব্যক্তি প্রকৃত পক্ষে তিল তিল করে অলক্ষ্যে চুরি করে এবং হারাম উপার্জন করে।