📄 বিদ্রোহ, গুন্ডামী ও দাম্ভিকতা
আল্লাহতায়ালা বলেছেন: "শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যারা মানুষের ওপর যুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে বেড়ায়। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরই জন্য নির্ধারিত রয়েছে।” (সূরা আশূরা)
রাসূল (সা) বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা আমার কাছে এই মর্মে ওহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, যাতে একজন অপরজনের ওপর আগ্রাসন না চালায় ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন না করে।" (সহীহ মুসলিম, সুনানু আবীদাউদ ও সুনানু ইবনে মাজা)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের মত এমন অপরাধ আর নাই যা আখিরাতের আযাব ছাড়াও দুনিয়াতেও আযাব অনিবার্য করে তোলে।" (জামে'তিরমিযী ও সুনানু ইবনু মাজাহ)
এই অপরাধের সবচেয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছিল কারন। সে ছিল হযরত মূসা (আ) এর আপন চাচাতো ভাই এবং ফিরাওনের অন্যতম উপদেষ্টা। তার বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তাকে তার সমস্ত সহায় সম্পদসহ জ্যান্ত মাটিতে পুতে ফেলেন। এই ঘটনার বিবরণ সূরা আল কাসাসে নিম্নরূপ দেয়া হয়েছে:
"নিশ্চয় কারূন মূসার গোত্রের লোক ছিল। সে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলো। আমি তাকে এমন ধনভান্ডার দিয়েছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, তার গোত্র তাকে বলেছিল যে, দম্ভ করোনা, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পসন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা কিছু দিয়েছেন, তাদ্বারা আখিরাতের বাসস্থান খুঁজে নাও। তবে দুনিয়া থেকে তোমার প্রাপ্য অংশ ভুলনা। অন্যের প্রতি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না। সে বললো: এ সম্পদ তো আমি নিজের জ্ঞানের সাহায্যে অর্জন করেছি। সে কি জানতোনা যে, আল্লাহ তার পূর্বে তার চেয়েও অধিক শক্তিশালী ও ধনশালী বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছেন? আর অপরাধীদেরকে তো তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবেনা। (কেননা তাদের আমলনামায় সবই লেখা থাকবে।) কারূন জাঁকজমক সহকারে আপন সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থিত হয়েছিল। তখন যারা পার্থিব জীবনের জন্য লালায়িত ছিল। তারা বলতে লাগলো: আহা কারূনকে যেরূপ সম্পদ দেয়া হয়েছে, তদ্রূপ আমাদেরকেও যদি দেয়া হতো! সে সত্যই খুব ভাগ্যবান। পক্ষান্তরে যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল, তারা বললো ধিক, তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই উত্তম। ধৈর্যশীল ব্যতীত আর কেউ তা পাবেনা। অতঃপর আমি কারূনকে ও তার প্রাসাদকে মাটির নিচে পুতে ফেললাম। আল্লাহর শান্তি থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে-এমন কোন দল তার পক্ষে ছিলনা এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলনা। আগের দিন যারা কারূনের মত হবার অভিলাষ পোষণ করেছিল, তারা (কারূনের পরিণতি দেখে) বলতে লাগলো, আসলে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা জীবিকা বাড়িয়ে দেন, যাকে ইচ্ছা কমিয়ে দেন। আল্লাহ আমাদের ওপর সদয় না হলে আমাদেরকেও তিনি মাটির নিচে পুতে দিতেন। আসলে কাফেররা সফলকাম হয়না।"
ইমাম ইবনুল জাওসী বলেন: কারন কিভাবে ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহ প্রকাশ করেছিল, সে সম্পর্কে একাধিক উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাসের মতে, সে জালিয়াতির মাধ্যমে জনৈকা দুশ্চরিত্রা মহিলাকে হযরত মূসার (আ) এর বিরুদ্ধে এই মর্মে দুর্নাম রটাতে প্ররোচিত করে যে, তিনি তার সাথে ব্যভিচার করেছেন। হযরত মূসা (আ) ঐ মহিলাকে শপথপূর্বক সত্য কথা বলতে বাধ্য করলে সে ফাঁস করে দেয় যে, কারূনের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই তাকে এই অপবাদ রটাতে প্ররোচিত করেছে। যুহহাকের ও কাতাদার মতে, কারুন আল্লাহর নবীকে অস্বীকার করে কুফরীতে লিপ্ত হয়। মাওয়ার্দীর মতে, সে ফেরাউনের দরবারে চাকুরী করতো এবং সেই খুঁটির জোরে আপন গোত্র বনী ইসরাইলের ওপর নির্যাতন চালাতো।
হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আ) এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনায় তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বদদোয়া করলে আল্লাহ বলেনঃ হে মূসা! আমি মাটিকে নির্দেশ দিয়েছি তোমার আদেশ মানতে। তুমি তাকে যা ইচ্ছা আদেশ দাও। মূসা (আ) আদেশ দিলেন: হে মাটি, কারূনকে গ্রাস কর। তৎক্ষণাৎ কারুনের খাট মাটিতে অদৃশ্য হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে কারূন মূসা (আ) এর দয়া ভিক্ষা করলো। কিন্তু মূসা (আ) পুনরায় মাটিকে আদেশ দিলেন: ওকে গ্রাস কর। এবার তার পা মাটির নিচে তলিয়ে গেল। এভাবে তিনি বারবার আদেশ দিতে দিতে কারূন সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল।
(পবিত্র আল কুরআনে বর্ণিত উপরোক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে কারূনের বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের যে দিকগুলো প্রকাশ পেয়েছে, তো হলো: (১) ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুর সাথে যোগসাজশ করে মুসলমানদের ও স্বজাতির স্বার্থের ক্ষতি সাধন (২) নিজের অর্জিত সম্পদকে আল্লাহর অনুগ্রহের দান মনে করার পরিবর্তে নিজের জ্ঞানের ফল ভেবে বাহাদুরী প্রদর্শন (৩) নিজ সম্পদে সমাজের দরিদ্র জনগণের যে অধিকার রয়েছে, তা উপলব্ধি না করা ও দিতে অস্বীকার করা, উপরন্তু জনগণকে নিজের বিত্তবৈভবের জৌলুস দেখিয়ে বেড়ানো, যাতে বঞ্চিতদের মানসিক যন্ত্রণা আরো বেড়ে যায় এবং তাদের বঞ্চনার অনুভূতি আরো তীব্রতর হয়। (ঘ) কার্পণ্য লাগামহীন পুঁজিবাদ, দাম্ভিক সুলভ ও একচেটিয়া ভোগবাদী মানসিকতা। - অনুবাদক)
📄 দুর্বল শ্রেণী, দাসদাসী বা চাকর-চাকরাণী ও জীবজন্তুর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : “তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তার সাথে কাউকে শরীক করোনা, এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর, আরো সদ্ব্যবহার কর আত্মীয়স্বজনদের সাথে, এতীমদের সাথে, দরিদ্রদের সাথে, আত্মীয় প্রতিবেশীরর সাথে, অনাত্মীয় প্রতিবেশীর সাথে, সফরসংগীর সাথে, পথিকের সাথে এবং দাসদাসীর সাথে। আল্লাহ দাম্ভিক ও গর্বিত লোককে পছন্দ করেন না।” (সূরা আন-নিসা)
রাসূল (সা) তাঁর ইন্তিকালের পূর্ব মুহূর্তেও তাকিদ দিয়েছেন যে, “নামায ও অধীনস্থদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।” (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন : “অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহার সৌভাগ্যের উৎস আর তাদের সাথে দুর্ব্যবহার দুর্ভাগ্যের উৎস।” (মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবুদাউদ)
হযরত আবু মাসউদ (রা) বলেন : আমি একজন ভৃত্যকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিলাম। এই সময় আমার পশ্চাতে একটা শব্দ শুনলাম : “জেনে রেখ, হে আবু মাসউদ, আল্লাহ তায়ালাই তোমাকে এই ভৃত্যের ওপর কর্তৃত্ব দিয়েছেন।” আমি বললাম : হে রাসূলুল্লাহ! আমি আর কখনো দাসদাসী ও চাকর চাকরানীকে প্রহার করবোনা। আমি ওকে স্বাধীন করে দিলাম। রাসূল (সা) বললেন : “এই কাজটি না করলে আগুন তোমাকে কিয়ামতের দিন ভস্মীভূত করে দিত।” (সহীহ মুসলিম)
রাসূল (সা) বলেছেন : যারা দুনিয়াতে মানুষকে নির্যাতন করে, আল্লাহ তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবেন। জামে' তিরমিযী ও সুনানে আবু দাউদে আছে যে, “রাসূলকে (সা) জিজ্ঞাসা করা হলো, অধীনস্থদেরকে কতবার ক্ষমা করবো। রাসূল (সা) বললেন : প্রতিদিন ৭০ বার।”
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) তাঁর এক ভৃত্যকে ডাকলেন। সে অনেক দেরীতে এল। তখন রাসূল (সা) নিজের হাতের মেসওয়াক দেখিয়ে বললেন, “কিয়ামতের দিন বদলা পাওয়ার ভয় না থাকলে তোমাকে এই মেসওয়াক দিয়ে পিটাতাম।”
এক হাদীসে আছে যে, এক মহিলা রাসূল (সা) কে এসে বললোঃ হে রাসূল! আমি নিজের বাঁদীকে "ব্যভিচারিনী" বলে গাল দিয়েছি। রাসূল (সা) বললেন : তুমি কি ব্যভিচারের কোন লক্ষণ তার মধ্যে দেখেছ? মহিলা বললো : না। রাসূল (সা) বললেন: “সাবধান, এই মেয়েটি কিয়ামতের দিন তোমার কাছ থেকে বদলা নেবে।” মহিলা তৎক্ষণাত তার বাঁদীর কাছে গেল এবং তাকে একটা লাঠি দিয়ে বললো: আমাকে মারো। বাঁদীটি রাযী হলোনা। তখন ঐ মহিলা তাকে স্বাধীন করে দিল। তারপর সে রাসূল (সা) এর কাছে এসে বাঁদীকে স্বাধীন করার খবর জানালেন। রাসূল (সা) বললেন: "আশা করা যায়, তোমার গুনাহ মাফ হবে।"
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে যে রাসূল (সা) বলেছেন: যে তার অধোস্তনের ওপর কোন মিথ্যা অপবাধ আরোপ করবে, সে কিয়ামতের দিন অপবাদের জন্য নির্ধারিত বেত্রদন্ড ভোগ করবে। রাসূল (সা) বলেছেন: "চাকর চাকরানী বা দাসদাসীকে প্রয়োজনীয় খাদ্যবস্ত্র দিতে হবে এবং তার ক্ষমতার অতিরিক্ত দায়িত্ব তার ওপর চাপানো যাবেনা। নিতান্তই যদি চাপাতে হয়, তবে তার সাথে নিজে কাজ করতে হবে। আল্লাহর সৃষ্টিকে কষ্ট দিওনা। তিনি তোমাদেরকে তাদের মালিক বানিয়েছেন, যদি চাইতেন তবে তাদেরকে তোমাদের মালিক বানাতে পারতেন।" (সহীহ মুসলিম, তাবরানী)
অধীনস্থ মানুষ বা পশুকে ক্ষুধায় কষ্ট দেয়া এবং সন্তান ও পিতামাতাকে বিচ্ছিন্ন করা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের কবীরা গুনাহ। রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মা ও সন্তানকে বিচ্ছিন্ন করবে, আল্লাহ তাকে তার প্রিয়জন থেকে কিয়ামতের দিন বিচ্ছিন্ন করবেন। (জামে' তিরমিযী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "মানুষের নিজের অধীনস্থ মানুষ বা পশুকে ক্ষুধায় কষ্ট দেয়ার মত বড় গুনাহ আর হতে পারেনা।" (সহীহ মুসলিম)
অনুরূপভাবে পালিত জীবজন্তুকে সজোরে প্রহার করা, সব সময় খাঁচায় আবদ্ধ রাখা, যথাসময়ে খাবার না দেয়া অথবা তার ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করা জায়েয নয়। রাসূল (সা) বলেছেন: "একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে অনাহারে মেরে ফেলার কারণে একমহিলা আযাব ভোগ করবে।" বলাবাহুল্য যে, এ কথা সকল প্রাণীর বেলায়ই প্রযোজ্য। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে যে, রাসূল (সা) কোন জীবজন্তুকে তার স্বাভাবিক কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহার করতে এবং তার ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজে খাটাতে নিষেধ করেছেন। কোন জন্তুকে যবাই করতে হলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে যবাই করতে বলেছেন এবং যে জন্তুকে হত্যা করতে হবে, তাকে বন্দী না রেখে প্রথম সুযোগেই হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সাপ, বিচ্ছু, ইঁদুর, পাগলা কুকুর প্রভৃতি কষ্টদায়ক জন্তুকে পুড়িয়ে হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (সা) কোন জীবন্তুকে নিছক চিত্তবিনোদন অথবা সখের বশে এবং কোন উপকারিতা ছাড়া হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।
দাসদাসীকে মুক্তি দেয়া খুবই সওয়াবের কাজ। রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি তার দাসদাসীকে মুক্তি দেবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি দেবেন।
📄 প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূল (সা) বললেনঃ "সে মুমীন নয়। সে মুমীন নয়।" সবাই জিজ্ঞাসা করলোঃ হে রাসূল! কে? রাসূল (সা) বললেন, "যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টকর কাজ থেকে নিরাপদ নয়।” প্রতিবেশী তিন রকমঃ প্রথম মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী। এ ধরনের প্রতিবেশী তিনটি অধিকার পায়। একটি আত্মীয় হিসাবে, একটি মুসলমান হিসাবে এবং একটি প্রতিবেশী হিসাবে। দ্বিতীয় মুসলিম অনাত্মীয় প্রতিবেশী। এই প্রতিবেশী দুইটি অধিকার পাবেঃ একটি প্রতিবেশী হিসাবে ও একটি মুসলমান হিসাবে। তৃতীয় অমুসলিম প্রতিবেশী। এ ধরনের প্রতিবেশী স্রেফ প্রতিবেশীত্বের অধিকার পাবে।
রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি তৃপ্তি সহকারে আহার করে এবং তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে, সে মুসলমান নয়। রাসূল (সা) আরো বলেছেন: জিবরীল আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে এত সতর্ক করে যে, কখনো কখনো ভাবি, প্রতিবেশীকে হয়তো আমার উত্তরাধিকারী বানানো হবে। (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে ইবনে মাজা)
রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ দরিদ্র প্রতিবেশী কিয়ামতের দিন ধনী প্রতিবেশীকে জাপটে ধরে বলবেঃ 'হে প্রভুঃ আমার এই ভাইকে তুমি সচ্ছল বানিয়েছিলে এবং সে আমার নিকটেই থাকতো, কিন্তু আমি ভুখা থাকতাম আর সে পেট পুরে খেত। ওকে জিজ্ঞাসা কর, কেন আমার ওপর দরজা বন্ধ করে রাখতো এবং আমাকে বঞ্চিত করতো।" রাসূল (সা) বলেনঃ তিনটি গুনাহ সবচেয়ে ভয়াবহঃ আল্লাহর সাথে শিরক করা, সন্তানকে অভাবের ভয়ে হত্যা করা এবং প্রতিবেশীর স্ত্রীর শ্লীলতাহানি করা। "(সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে নাসায়ী, জামে তিরমিজী)
হযরত ইবনে উমরের একজন ইহুদী প্রতিবেশী ছিল। যখনই তার বাড়িতে ছাগল যবাই হতো, বলতেন, আমাদের ইহুদী প্রতিবেশীকে কিছু গোস্ত দিয়ে এস।" (সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজী)
প্রতিবেশীর উচিত অপর প্রতিবেশীর কষ্টদায়ক আচরণ যতদূর সম্ভব সহ্য করা। এমনকি সে যদি অমুসলিম হয় তবুও। কেননা এটাও তার প্রতি উপকার ও অনুগ্রহের অনুর্ভুক্ত। একবার এক ব্যাক্তি রাসূল (সা) এর কাছে এসে বললোঃ হে রাসূল! আমাকে এমন একটি কাজ বলে দিন, যা করলে আমি জান্নাতে যেতে পারবো। রাসূল (সা) বললেনঃ পরোপকারী হও। সে বললোঃ "আমি কিভাবে বুঝবো পরোপকারী হয়েছি কিনা? রাসূল (সা) বললেনঃ তোমার প্রতিবেশীর কাছে জিজ্ঞাসা কর সে যদি বলে যে, তুমি পরোপকারী, তাহলে তুমি পরোপকারী। আর সে যদি বলে যে, তুমি পরের অনিষ্টকারী, তাহলে তুমি অনিষ্টকারী।" (বায়হাকী)
অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ প্রতিবেশীর অধিকার এই যে, সে যখন সাহায্য চাইবে তাকে সাহায্য করতে হবে, সে যখন ঋণ চাইবে তাকে ঋণ দিতে হবে। যখন সে কোন কিছুর মুখাপেক্ষী হয়, তাকে তা দিতে হবে, যখন সে রুগ্ন হয় তাকে দেখতে যেতে হবে, যখন সে কল্যাণ লাভ করে তখন তাকে অভিনন্দন জানাতে হবে, যখন সে বিপদে পড়ে তখন তাকে সমবেদনা জানাতে হবে, যখন সে মারা যায়, তার জানাযা পড়তে ও তাকে সমাহিত করতে কবরের কাছে যেতে হবে, তার অনুমতি ছাড়া উঁচু বাড়ি বানিয়ে বাতাস বন্ধ করা যাবেনা। ডেগচিতে যে খাদ্য সামগ্রী রাখা হয়, তার ঘ্রাণ যদি সে পায়, তবে তা থেকে তাকে কিছু দিতে হবে, ফল কিনলে তাকে হাদিয়া পাঠাতে হবে, নচেত তার খোসা বাইরে ফেলা যাবেনা, যাতে সে দেখতে না পায়।"
রাসূল (সা) বলেন, প্রতিবেশী একজন নারীর শ্লীলতা হানি করা অন্য দশজন নারীর শ্লীলতা হানি করার সমান। অনুরূপ একজন প্রতিবেশীর বাড়ীতে চুরি করা অন্য জায়গায় দশজনের বাড়ীতে চুরি করার সমান।
প্রতিবেশীর প্রতি সহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়া খুবই মহৎ কাজ- যদিও সে বিরোধী হয়। কথিত আছে যে, হযরত সাহল বিন আবদুল্লাহ তাসতারী (রহ) এর একজন অগ্নি উপাসক প্রতিবেশী ছিল। প্রতিবেশীর গৃহ থেকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ ময়লা আবর্জনা তার অলক্ষ্যে হযরত সাহলের ঘরে এসে পড়তো। কিন্তু তিনি সে জন্য প্রতিবেশীর কাছে কোন অভিযোগ করতেন না। দিনের বেলা আবর্জনা জমা করে ঢেকে রাখতেন এবং রাত্রে বাইরে ফেলে দিতেন। একদিন সাহলের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো। তিনি তার প্রতিবেশীকে ডেকে আবর্জনার স্তূপ দেখিয়ে বললেন, "আমার মৃত্যু ঘনিয়ে না আসলে আপনাকে এটা দেখাতাম না। আমার আশংকা যে, আমার মৃত্যুর পর আমার পরিবারের আর কেউ আমার মত সহনশীলতা দেখাতে পারবেনা। তাই আপনাকে দেখালাম। আপনি যা আরো মনে হয় করুন।" প্রতিবেশী অগ্নি উপাসকের বিস্ময়ের অবধি রইলনা। সে বললো, “আপনি এত দীর্ঘকাল ব্যাপী এই বিরক্তিকর ব্যাপারটা সহ্য করে আসছেন। অথচ টু শব্দটি করেননি। আর আমি কিনা এখনো নিজের কুফরীর ওপর বহাল আছি।” এই বলে সে সাহলের হাতে হাত দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলো। আর সাহলও তৎক্ষণাত ইন্তিকাল করলেন।
📄 মুসলমানকে তিরষ্কার করা ও গালি দেয়া
আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ "হে মুমীনগণ! তোমরা একদল অপর দলকে উপহাস করোনা। কেননা যাদেরকে উপহাস করা হয় তারা উপহাসকারীদের চেয়ে ভালোও হতে পারে। তোমরা এক দল মহিলা আর এক দল মহিলাকে উপহাস করোনা। কেননা যাদেরকে উপহাস করা হয় তারা উপহাসকারীদের চেয়ে ভালোও হতে পারে। আর তোমরা পরষ্পরের দুর্নাম বা কুৎসা রটিও না এবং পরস্পরকে খারাপ নামে ডেকো না। ঈমানের পর খারাপ নামে ডাকা খুবই জঘন্য কাজ, যারা ঐ কাজ থেকে বিরত হয়না তারা যালিম।" (সূরা আল হুজরাত)
আল্লাহ আরো বলেছেনঃ “একে অপরের দোষ খুঁজে বেড়িও না এবং অসাক্ষাতে নিন্দা করোনী। "সহীহ আল বুখারী' ও সহীহ মুসলিমে স্বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে ধিকৃত হবে সেই ব্যক্তি, যার অশালীন ও অশ্রাব্য কথাবার্তা শোনার ভয়ে জনগণ তার সংগ ত্যাগ করে।
রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে সংকীর্ণতা দূর করে দিয়েছেন। তবে যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাই'এর মানসম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলে তার কথা ভিন্ন। সে সংকীর্ণতার শিকার হবে।
সহীহ মুসলিম ও সুনানে তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসুল (সা) বলেছেন তার মুসলমানের পক্ষে অপর মুসলমানের জান, মাল ও সম্ভ্রমের ক্ষতি করা হারাম।
সহীহ মুসলিমে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে কারো ওপর যুলুম করেনা, কাউকে অপমান করেনা এবং তুচ্ছ করেনা। কোন মুসলমানের পক্ষে এর চেয়ে খারাপ কাজ আর কিছু হতে পারেনা যে, সে তার মুসলমান ভাইকে তুচ্ছ বা হেয় জ্ঞান করে। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত অপর হাদীসে আছে: মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকী এবং তার সাথে যুদ্ধ বাধানো কুফরী।
হাকেম ইবনে হাব্বান, আহমাদ ও বায়যার বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলকে (সা) বলা হলো যে, "অমুক মহিলা রাত জেগে নামায পড়ে এবং দিনের পর দিন রোযা রাখে, কিন্তু তার পার্শ্ববর্তী লোকজনকে কটু কথা দ্বারা কষ্ট দেয়। রাসূল (সা) বললেনঃ তার কোন ভালাই হবে না। সে জাহান্নামে যাবে।" হাদীসে আরো আছে যে, "তোমরা তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের শুধু গুণাবলী বর্ণনা কর এবং দোষ বর্ণনা থেকে বিরত থাক। কেননা সে তো তার কর্মফলের জায়গায় পৌঁছে গেছে।” (হাকেম) রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কাউকে "কাফের” অথবা 'আল্লাহর দুশমন" বলে আখ্যায়িত করে অথচ আসলে সে তা নয়, তার আরোপিত উক্ত আখ্যা তার কাছেই ফিরে আসবে।" অর্থাৎ সে নিজেই কাফের ও আল্লাহর দুশমন হয়ে যাবে। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ "মিরাজের রাত্রে আমি একদল লোক দেখেছি, যাদের হাতে তামার নখ ছিল এবং তা দ্বারা তারা নিজেদের মুখমন্ডল খামচাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলামঃ হে জিবরীল, এরা কারা? তিনি বললেনঃ "যারা মানুষের নিন্দা ও কুৎসা রটিয়ে বেড়াতো এবং তাদের মানসম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলতো।"
বস্তুতঃ সলমানদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য ও গোলযোগ সৃষ্টি এবং জীবজন্তুর মধ্যে লড়াই বাধানো ভয়ংকর কবীরা গুনাহ। রাসূল (সা) বলেনঃ "শয়তান এখন আর এ আশা করেনা যে, আরব উপদ্বীপের মুসলমানরা তাকে পূজা করবে। তবে তাদের মধ্যে বিভেদ অনৈক্য ও কোন্দল সৃষ্টির আশা সে এখনও পোষণ করে।" এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, দুই ব্যক্তি বা দুই দলের মধ্যে যে গন্ডগোল ও কলহ সৃষ্টি করে এবং তাদের মধ্যে কষ্টদায়ক ও উস্কানীমূলক কথার আদান প্রদান করে, সে শয়তানের দলভূক্ত চোগলখোর ও নিকৃষ্টতম মানুষ। অনুরূপভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, চাকর ও মনিবের মধ্যে এবং শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সম্পর্ক বিনষ্টকারীও শয়তানের দলভুক্ত চোগলখোর। চাই তা যতই ভালো কাজের মোড়কে করা হোকনা কেন। রাসূল (সা) বলেছেনঃ "সেই ব্যক্তি অভিশপ্ত, যে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ও চাকর মনিবের মধ্যে বিভেদ ও কোন্দল বাধায়।” (সুনানে আবু দাউদ) অনুরূপভাবে আমোদ প্রমোদের উপকরণ হিসাবে মোরগ লড়াই, কুকুর লড়াই, ষাঁড় লড়াই ইত্যাদি অনুষ্ঠিত করতে রাসূল (সা) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। (একই কারণে মুষ্ঠিযুদ্ধ এবং দৈহিক ক্ষতি ও আর্থিক অপচয়ের ঝুঁকিপূর্ণ যাবতীয় খেলা ও প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। -অনুবাদক)
পক্ষান্তরে দুই পক্ষের বিবাদ মীমাংসা করে দিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা অত্যন্ত মহৎ কাজ। এরূপ মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গোপন শলাপরামর্শ করতেও ক্ষতি নেই। নচেৎ গোপন শলাপরামর্শ সন্দেহ সংশয় ও বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে। সূরা আন নিসার এক আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ "তাদের বহু গোপন সলাপরামর্শে কোন কল্যাণ নেই, তবে যে ব্যক্তি সদকা, সৎকাজ কিংবা জনগণের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উদ্দেশ্যে এটা করে তার কথা স্বতন্ত্র। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এরূপ কাজ করে তাকে আমি বিরাট প্রতিদান দেব।” রাসূল (সা) মানুষের বিবাদ মীমাংসা, কোন্দল নিরসন, ঐক্য সংহতকরণ ও সম্পর্ক ঘনিষ্ঠকরণে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি হযরত আবু আইয়ূব আনসারীকে বলেছিলেনঃ তোমাকে লাল উটের পাল অপেক্ষা ভালো এমন সদকার সন্ধান দেব কি? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, হে রাসূল। রাসূল (সা) বললেনঃ মানুষের মধ্যে যখন পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় তখন তা শুধরে দেবে, এবং তারা যখন পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়, তখন তাদেরকে পরস্পরের ঘনিষ্ঠতর করে দেবে।"
পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এত বড় মহৎ কাজ যে, এ জন্য রাসূল (সা) প্রয়োজনে মিথ্যা কথা বলারও অনুমতি দিয়েছেন। সহীহ আল বুখারীতে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ "সেই ব্যক্তি মিথ্যুক নয় যে মানুষের সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করে, ফলে সে যা বলে তার ফলাফল ভালো হয়ে থাকে।" সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে আছে যে, হযরত উম্মে কুলসুম বলেছেনঃ যুদ্ধ, পারস্পরিক সম্পর্ক শুধরানো এবং স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে ও স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে কিছু বলা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই শুধু রাসূল (সা) মিথ্যার অনুমতি দিয়েছেন।
সহীহ আল বুখারীতে আছে যে, রাসূল (সা) বনু আমরের মধ্যে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়েছে শুনে সাহাবীদের একটি দল নিয়ে সেখানে চলে যান এবং উত্তেজনা প্রশমিত করেন। রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দু'জনের গোলমাল মিটিয়ে দেয়, আল্লাহ তায়ালা তার সকল কাজ বিশুদ্ধ করে দেবেন, তার প্রতিটি কথার বিনিময়ে একটি গোলাম মুক্ত করার সওয়াব দেবেন এবং তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।