📄 বিপদে দুর্যোগে বা শোকাবহ ঘটনায় উচ্চস্বরে কান্নাকাটি
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি (শোক দুঃখ প্রকাশার্থে) মুখ ও কপাল চাপড়ায়, পোশাক ছিঁড়ে ফেলে, এবং জাহেলী প্রথা অনুযায়ী দোয়া করে, সে আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" ইতিপূর্বে আমরা বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করেছি যে, রাসূল (সা) উচ্চৈস্বরে ক্রন্দন, চুল কামানো ও চুল টেনে ছেঁড়া এবং কাপড় ছেঁড়ার মাধ্যমে শোক প্রকাশকারিনীকে অভিসম্পাত করেছেন। এ সকল কাজ সর্বসম্মতভাবে হারাম। অনুরূপভাবে মুখ কপাল চাপড়ানো, মুখ খামচানো এবং মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করে দোয়া করাও হারাম। হযরত উম্মে আতিয়া (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) আমাদের কাছ থেকে অংগীকার নিয়েছেন যে আমরা কখনো উচ্চৈস্বরে কেঁদে শোক প্রকাশ করবোনা। (বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "দুটি কাজ কুফরীর পর্যায়ভুক্ত। কারো বংশ নিয়ে টিটকারি দেয়া এবং মৃত ব্যক্তির ওপর উচ্চৈস্বরে কান্নাকাটি করা।” (মুসলিম)
আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) উচ্চৈস্বরে ক্রন্দনকারিনী ও তার শ্রোতাদেরকে অভিসম্পাত দিয়েছেন। বুখারী, ইবনে মাজা ও নাসায়ীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা) তীব্র যন্ত্রণায় অচেতন হয়ে পড়লে তাঁর এক আত্মীয়া মহিলা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। হুঁশ ফিরে এলে তিনি বলেন: রাসূল (সা) যাকে অবাঞ্ছিত গণ্য করেছেন, আমিও তাকে অবাঞ্ছিত গণ্য করি। উচ্চৈস্বরে ক্রন্দন, চুল ছেঁড়া, কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদির মাধ্যমে শোক প্রকাশকে রাসূল (সা) অবাঞ্ছিত গণ্য করেছেন।
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: উচ্চৈস্বরে কাঁদার কারণে মৃত ব্যক্তি কবরে আযাব ভোগ করে। রাসূল (সা) বলেছেন: দুটি নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ ও পাপজনক শব্দ থেকে আমাকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে: একটি গানবাজনার শব্দ, অপরটি বিপদের সময় মুখ চাপড়ানো ও শয়তানের মত চিৎকার করার শব্দ। বর্ণিত আছে, যে হযরত ওমর (রা) এক পেশাদার ক্রন্দসীকে স্বহস্তে প্রহার করেন এবং বলেন: আমি এই ক্রন্দসীকে প্রহার করছি। কেননা তাকে প্রহার করা নিষিদ্ধ নয়, সে তোমাদের দুঃখের অংশীদার হয়ে কাঁদেনা, বরং তোমাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য কাঁদে। সে তোমাদের মৃতদেরকে কবরে কষ্ট দেয় এবং জীবিতদের শোক যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেয়। কেননা সে ধৈর্য ধারণ করতে নিষেধ করে, অথচ আল্লাহ তার আদেশ দিয়েছেন, সে ব্যাকুলভাবে কাঁদতে উদ্বুদ্ধ করে, অথচ আল্লাহ তা করতে নিষেধ করেছেন।
আলেমগণ বলেছেন পেশাদার ভাড়াটে ক্রন্দসীদের ক্রন্দন এবং উচ্চৈস্বরে দিশাহারা হয়ে ক্রন্দন করা ছাড়া নিছক শোক বিহবল হয়ে মৃদুস্বরে আন্তরিকভাবে ক্রন্দন হারাম নয়। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) রুগ্ন সা'দ বিন উবাদাকে দেখতে গিয়ে কেঁদে দেন। তাঁর কান্না দেখে সমবেত সাহাবীগণও কাঁদেন। অতঃপর রাসূল (সা) বললেন: শুনে রাখ, আল্লাহ চোখের পানি ফেলা ও হৃদয়ের আবেগ প্রকাশ করার জন্য আযাব দেননা তিনি শুধু এই জিনিসটির জন্য শাস্তি দেন অথবা অনুগ্রহ করেন-এ কথা বলে জিহবার দিকে ইশারা করলেন। অপর রেওয়ায়েতে আছে যে, রাসূল (সা) কেঁদে দিলে হযরত সা'দ জিজ্ঞাসা করলেন "হে আল্লাহর রাসূল! এ কী?" তিনি বললেন: "এটা বান্দাদের হৃদয়ে আল্লাহর সৃষ্টি করা করুণা ও সহানুভূতি। আল্লাহ করুণা ও সহানুভূতিসম্পন্ন বান্দাদের প্রতিই করুণা বর্ষণ করেন।" সহীহ আল বুখারীতে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) যখন তার মুমূর্ষ পুত্র ইবরাহীমের কাছে গেলেন, তখন রাসূল (সা) এর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। তা দেখে আবদুর রহমান বিন আওফ বললেনঃ হে রাসূল! আপনিও কাঁদছেন! রাসূল (সা) বললেন: এটা স্নেহ মমতার প্রকাশমাত্র। অতঃপর বললেন: "চোখ অশ্রু বর্ষণ করে ও হুদয় মর্মাহত হয়। কিন্তু আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট, তা ছাড়া আমরা আর কিছু মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারিনা। হে ইবরাহীম, তোমার বিচ্ছেদে আমরা ব্যথিত।"
এখানে উল্লেখ্য যে, বিপদ আপদে ও প্রিয়জনের বিচ্ছেদে মাত্রাতিরিক্ত কান্নাকাটিকে নিরুৎসাহিত করার কারণ এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা) ধৈর্য ও আত্মসংযমের নির্দেশ দিয়েছেন এবং হতাশা ও অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামায দ্বারা শক্তি অর্জন কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।...... আর আমি অবশ্য অবশ্য তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা, সম্পদহানি, প্রাণহানি ও শস্যহানি দ্বারা পরীক্ষা করবো। যারা ধৈর্য ধারণ করে, যারা বিপদে পতিত হয়ে বলে যে, আমরা আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবো। তাদেরই সুসংবাদ দিয়ে দাও।" (সূরা আল বাকারা) হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেনঃ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন-এর তাৎপর্য এই যে, তিনি তাদেরকে সাহায্য করেন এবং লাঞ্ছিত করেন না। আর "যারা বিপদে পতিত হলে বলে যে, আমরা আল্লাহরই জন্য" এ কথার মর্ম এই যে, "আমরা আল্লাহর বান্দা, তাই তিনি আমাদের সাথে যা ইচ্ছা, তাই আচরণ করতে পারেন।"
রাসূল (সা) বলেছেনঃ "মুমিন বান্দার ওপর যে বিপদই আসুক না কেন, এমন কি তার পায়ে যদি একটা কাঁটাও ফোটে, তবে তা দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহ মুছে দেন।" (সহীহ মুসলিম) তিরমিযীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "কোন বান্দার সন্তান মারা গেলে আল্লাহ ফিরিশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন যে, যখন তোমরা আমার বান্দার সন্তানের প্রাণ সংহার করছিলে, তখন সে কী বলেছে? ফিরিশতারা বলেন: "সে তোমার প্রশংসা করেছে এবং তোমার কাছে তার ফিরে যাওয়ার কথা স্মরণ করেছে।" তখন আল্লাহ বলেনঃ আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটা বাড়ী তৈরী কর এবং তার নাম রাখ "বাইতুল হাম্দ" (প্রশংসার বাড়ী)। এক হাদীসে কুদসীতে আছে যে, আল্লাহ বলেন: “যখন আমার বান্দার কোন প্রিয়জনের মৃত্যু হয় এবং সে তাতে ধৈর্ম ও সংযম অবলম্বন করে, তখন জান্নাত ছাড়া তাকে দেয়ার মত আর কোন প্রতিদান আমার কাছে থাকেনা।" (সহীহ আল বুখারী)
রাসূল (সা) বলেছেন: "আল্লাহর ফায়সালা অম্লান বদনে মেনে নেয়া আদম সন্তানের জন্য সৌভাগ্যজনক আর তাতে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্টি হওয়া দুর্ভাগ্যজনক।" হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে যে, মৃত্যুর ফিরিশতা মুমিনের প্রাণ সংহার করে বিদায় হওয়ার সময় যখন তার পরিবার পরিজন বুক চাপড়ে, চুল এলিয়ে এবং নিজেদের মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করে শোক প্রকাশ করতে আরম্ভ করে, তখন তা দেখে তিনি ক্ষণিকের জন্য বাড়ীর ফটকে দাঁড়ান এবং বলেন: এত হাহুতাশ ও কান্নাকাটি কেন? আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের কারো আয়ু কমাইনি, কারো জীবিকা ছিনিয়ে নেইনি এবং কারো ওপর যুলুম করিনি। তোমাদের অভিযোগ ও অসন্তোষ যদি আমার বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, তাহলে খোদার কসম, আমি আল্লাহর আদেশের অনুগত। আর যদি তোমাদের ক্ষোভ মৃত ব্যক্তির ওপর হয়ে থাকে, তাহলে তোমরা কাফের হয়ে গেছ। আমাকে তো আরো বহুবার আসতে হবে এবং এক সময় তোমাদের কেউ আর অবশিষ্ট থাকবেনা। রাসূল (সা) বলেন: আল্লাহর কসম, লোকেরা যদি তার এ ভাষণ শুনতো এবং তাকে দেখতো, তাহলে তাদের মৃতের কথা ভুলে যেত এবং নিজেদের জন্যই কেঁদে দিশেহারা হতো।
কারো বিপদের খবর শুনলে শোক বা সহানুভূতি প্রকাশ করা ছওয়াবের কাজ।
তিরমিযী শরীফে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন : “যে ব্যক্তি কোন বিপন্নের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে, তাহলে স্বয়ং ঐ বিপন্ন ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করলে যে ছওয়াব পায়, সেও তদ্রূপ ছওয়াব পাবে।” রাসূল (সা) আরো বলেছেন : সন্তানহারা মাতাকে সমবেদনা জ্ঞাপন ও সান্ত্বনা দান করলে আল্লাহ জান্নাতের মূল্যবান পোশাক পরাবেন।” (তিরমিযী)
উল্লেখ্য যে, শোক ও সমবেদনা প্রকাশ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সান্তনা দান, ধৈর্য ধারণের উপদেশ দান, তার দুঃখ, শোক ও বিপদের অনুভূতিকে হালকা করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তাই এটি মুস্তাহাব। এটি সৎ কাজের আদেশ দান অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা এবং সততা ও খোদাভীতির কাজে সহযোগিতার আওতাভুক্ত। সমবেদনা ও সান্ত্বনার সর্বোত্তম ভাষা রাসূল (সা) এর নিম্নোক্ত হাদীস থেকে জানা যায়। সহীহ আল বুখারী ও সহী মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর এক কন্যা রাসূল (সা) এর কাছে এই মর্মে খবর পাঠালো যে, তার এক পুত্র মৃত্যুর মুখোমুখি। রাসূল (সা) দূতকে বললেনঃ “যাও, ওকে (কন্যাকে) বল যে, আল্লাহ যা নেন, তা তাঁরই জিনিস, আর যা দেন, তাও তাঁরই জিনিস। সব কিছুই বান্দার কাছে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য রয়েছে। তাকে বল সে যেন ধৈর্য ধারণ ও সংযম অবলম্বন করে।”
এক সাহাবীকে দরবারে অনুপস্থিত দেখে রাসূল (সা) তাঁর কথা জিজ্ঞাসা করলেন। এক ব্যক্তি বললো : হে রাসূল! তার ছেলে মারা গেছে। রাসূল (সা) তার সাথে সাক্ষাত করে তার প্রতি সমবেদনা জানালেন। অতঃপর বললেন : “শোনো, তোমার ছেলে সারা জীবন তোমরা কাছে থাকুক-এটা তোমার বেশী পসন্দনীয়, না সে তোমার আগে গিয়ে জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকুক এবং তুমি মারা গেলে সে তোমার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দিক-এটা পসন্দনীয়? সাহাবী বললেন সে আমার আগে জান্নাতে গিয়ে আমার জন্য দরজা খুলে দিক-এটাই পসন্দীয়। রাসূল (সা) বললেন : তাহলে তোমার জন্য সেটিই নির্ধারিত রইল। সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন : এটা কি শুধু আমার জন্য? রাসূল (সা) বললেন : না, সকল মুসলমানের জন্য।” (আহমাদ, নাসায়ী)
হযরত আবু মূসা (রা) বর্ণনা করেন যে, একদিন রাসূল (সা) জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে দেখলেন এক মহিলা একটি কবরের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদছে। রাসূল (সা) তাকে বললেন : হে আল্লাহর বাঁদী, আল্লাহকে ভয় কর ও ধৈর্য ধারণ কর। মহিলা বললো: ওহে আল্লাহর বান্দা, আমি এক সন্তানহারা জননী। সুতরাং আমি যা করছি তা আমার জন্য অশোভন কিছু নয়।" রাসূল (সা) আবার বললেন: তুমি ধৈর্য ধারণ কর। মহিলা বললোঃ "যথেষ্ট হয়েছে। তোমার কথা শুনেছি। এবার তুমি যাও।" রাসূল (সা) তার কাছ থেকে চলে গেলেন। জনৈক সাহাবী মহিলাকে দেখে বললেন: এই ব্যক্তি তোমাকে কি বললো: মহিলা সব কথা জানালো। সাহাবী বললেন: তুমি জান ঐ ব্যক্তি কে? সে বললো: না। সাহাবী বললো: সর্বনাশ! উনিতো রাসূলুল্লাহ (সা)। মহিলা একথা শোনা মাত্র ছুটে গিয়ে রাসূল (সা) এর সাথে দেখা করলো এবং বললোঃ হে রাসূল! আমি ধৈর্য ধারণ করবো। রাসূল (সা) বললেনঃ "প্রথম আঘাতের সময়ই ধৈর্য ধারণ করা উচিত।” অর্থাৎ আকস্মিক বিপদ দেখা দেয়ার সময় ধৈর্য অবলম্বন করা উত্তম। নচেত পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবেই মন শান্ত হয়ে আসে।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আবু তালহা নামক সাহাবীর একটি ছেলে মারা যায়। সে সময় তিনি বিদেশে ছিলেন এবং ছেলের মৃত্যুর কথা মোটেই জানতেন না। অতঃপর তিনি যখন বাড়ী এলেন, তার স্ত্রী পরিবারের সবাইকে আগে ভাগে বলে দিলেন যে, "ছেলের মৃত্যুর কথা তোমরা কেউ এর কাছে ফাঁস করোনা। যখন যা বলতে হয় আমিই বলবো।" অতঃপর তিনি আবু তালহার খাবার দাবারের ব্যবস্থা করলেন। রাত্রে শোবার পর তাকে বললেন: ওহে আবু তালহা, কেউ যদি কাউকে কোন জিনিস ধার হিসাবে দেয়, অতঃপর তা ফেরত চায়, তাহেল তা ফেরত দিতে অস্বীকার করা কি তার উচিৎ? তালহা বললেন: না। তখন তার স্ত্রী সকল ঘটনা জানালেন এবং বললেনঃ "তাহলে তোমার ছেলের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ কর।" এ কথা শুনে আবু তালহা রাগান্বিত হলেন। তিনি বললেন: তুমি এত দেরীতে এটা আমাকে জানালে? অতঃপর তিনি রাসূল (সা) এর নিকট গিয়ে সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেন। শুনে রাসূল (সা) বললেন: "গত রাতে তোমাদের আচরণকে আল্লাহ অভিনন্দিত করেছেন।" হাদীসে আরো আছে যে, "ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কোন জিনিস কাউকে দেয়া হয়নি।"
বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত উসমান (রা) কে ঘাতকরা আঘাত করে, তখন তার দাড়ির ওপর দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকা অবস্থায় তিনি বলেনঃ “লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনা যালেমীন। হে আল্লাহ! আমি তাদের বিরুদ্ধে তোমার কাছে সাহায্য চাই এবং সকল বিষয়ে সাহায্য চাই, আর আমাকে তুমি যে পরীক্ষায় নিক্ষেপ করেছ, তাতে আমি ধৈর্য চাই।" জামে'তিরমিযীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেনঃ "যার দুটো অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান মারা যায়, সে জান্নাতে যাবে।" সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “অপ্রাপ্ত বয়স্ক মৃত সন্তানেরা জান্নাতের সর্বত্র অবাধে ঘুরে বেড়াবে। কেয়ামতের মাঠে তারা তাদের পিতামাতাকে পেয়ে তাদেরকে জাপটে ধরবে এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ না করিয়ে ছাড়বেনা।"
হযরত মালেক ইবনে দীনার (রহ) বলেন: যৌবনে আমি মদে আসক্ত ছিলাম। এই সময় আমার দুবছর বয়স্কা একটি মেয়ে মারা যায়। মেয়েটিকে আমি খুবই ভালোবাসতাম। তাই তার মৃত্যুতে আমি এত ব্যথিত হই যে, মদ পান অনেকটা কমিয়ে দেই। একদিন ঘুমিয়ে আমি স্বপ্নে দেখি, কিয়ামত শুরু হয়ে গেছে এবং আমি আমার কবর থেকে উঠেছি। সহসা দেখলাম বিরাটকায় একটি অজগর সাপ আমাকে তাড়া করছে। আমি তার ভয়ে ছুটে পালাতে লাগলাম। কিন্তু সাপটা তেড়ে আসতেই লাগলো। পথিমধ্যে সাদা কাপড় পরিহিত এক বৃদ্ধকে দেখে বললাম, "দয়া করে আমাকে আশ্রয় দিন। একটা সাপ আমাকে তেড়ে আসছে।" তিনি বললেন: "আমি দুর্বল। আর এই সাপ আমার চেয়ে সবল। তুমি ছুটে পালাতে থাক। আল্লাহ হয়তো তোমাকে রক্ষা করবেন।" আমি ছুটতে ছুটতে একটি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে উঠলাম। সেখানে দেখলাম কতকগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে খেলা করছে। তাদের প্রত্যেকের মুখ চাঁদের মত উজ্জ্বল। দেখলাম, তাদের মধ্যে আমার মেয়েটিও রয়েছে। সে আমাকে দেখে নিচে নেমে এল এবং একটি প্রদীপ সাপের দিকে ছুঁড়ে মারলো। এতে সাপটি পালিয়ে গেল। এরপর আমার মেয়ে আমার কোলে এসে কুরআনের এই আয়াত তেলাওয়াত করলোঃ "সেই সময় কি এখনো আসেনি যখন মুমিনদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে নিবিষ্ট হবে এবং তিনি যে সত্য বিধান নাযিল করেছেন তার প্রতি আকৃষ্ট হবে?" আমি বললাম: ওহে কচি মেয়ে! তুমি আবার কুরআনও জান নাকি? সে বললোঃ আব্বু! আমরা তোমাদের চেয়েও বেশী জানি। আমি বললাম: তোমার সাথীরা কারা এবং এখানে তোমরা কী কর? সে বললো: আমরা এখানে সবাই মুসলমান বাবামার মৃত শিশু। কিয়ামত পর্যন্ত এখানে বাবামায়ের আগমনের অপেক্ষায় থাকবো। আমি বললাম: ওহে আমার কচি মেয়ে! এই সাপটা আমার পিছু নিয়েছিল কেন জান? সে বললো: আব্বু, ওতো তোমার অসৎ কাজ। তুমি ওকে নিজেই শক্তিশালী বানিয়েছ। আমি বললামঃ ঐ বৃদ্ধ লোকটি কে? সে বললোঃ সে তো তোমার সৎ কাজ-যা তোমার অবহেলার কারণে দুর্বল হয়ে গেছে। তুমি তওবা কর। তাহলে নাজাত পাবে। এরপর আমার ঘুম ভেংগে যায় এবং আমি তৎক্ষণাৎ তওবা করি।
রাসূল (সা) বলেছেন: কোন বান্দার ওপর যখনই কোন বিপদ মুসিবত আসে, তখন তা হয় তাকে এমন কোন গুনাহ থেকে পবিত্র করার জন্য আসে, যাকে আল্লাহ ঐ বিপদ ছাড়া আর কোন ভাবে ক্ষমা করবেন না বলে স্থির করেছেন, নচেৎ তাকে এমন কোন উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করার জন্য আসে, যার জন্য আল্লাহ আর কোন বিকল্প রাখেননি।
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি বিপদ মুসিবতে পড়ে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলবে এবং দোয়া করবে যে, হে আল্লাহ! আমাকে এই মুসিবতে আশ্রয় দাও এবং আমাকে এর চেয়ে ভালো বিকল্প দান কর, আল্লাহ তাকে উপযুক্ত পুরস্কার ও উত্তম বিকল্প দেবেন। হযরত উম্মে সালমা (রা) বলেন: "এরপর আমার স্বামী আবু সালমা মারা গেলে আমি অনুরূপ দোয়া করেছিলাম। ফলে আল্লাহ আমাকে রাসূলুল্লাহর (সা) ন্যায় স্বামী দান করলেন।" (সহীহ মুসলিম)
বিচারপতি শুরাইহ (রাহ) বলতেন: আমি কোন বিপদে পড়লে চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি। প্রথমবার এই জন্য যে, বিপদটা আরো মারাত্মক হতে পারতো কিন্তু হয়নি। দ্বিতীয়বার যখন আল্লাহ আমাকে সহ্য করার তওফীক দেন। তৃতীয়বার যখন আমাকে "ইন্নালিল্লাহ..." পড়ার সুযোগ দেন। এবং চতুর্থবার যখন দেখি যে বিপদটা আমার ইসলাম থেকে পদস্খলনের আকারে হয়নি।
পক্ষান্তরে কেউ যদি বিপদাপদে অস্থির হয়, নিজের মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করে, চুল ও কাপড় ছেঁড়ে, মুখে ও বুকে থাপ্পড় ও খামচি মারে এবং প্রবল জোরে চিৎকার করে কাঁদে বা ভাড়াটে দিয়ে কাঁদায়, তবে তার ওপর আল্লাহ অবশ্যই অসন্তুষ্ট হবেন। অভিসম্পাত করবেন এবং কোন কোন রেওয়ায়েত অনুসারে তার নেক আমল নষ্ট করে দেবেন। কেননা এসব তৎপরতা তাকদীর তথা আল্লাহর ফায়সালাকে অবিশ্বাস করার শামিল। বিশেষ করে নিজের মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করা এক ধরনের আত্মহত্যার চেষ্টা বটে।
📄 বিদ্রোহ, গুন্ডামী ও দাম্ভিকতা
আল্লাহতায়ালা বলেছেন: "শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যারা মানুষের ওপর যুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে বেড়ায়। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরই জন্য নির্ধারিত রয়েছে।” (সূরা আশূরা)
রাসূল (সা) বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা আমার কাছে এই মর্মে ওহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, যাতে একজন অপরজনের ওপর আগ্রাসন না চালায় ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন না করে।" (সহীহ মুসলিম, সুনানু আবীদাউদ ও সুনানু ইবনে মাজা)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের মত এমন অপরাধ আর নাই যা আখিরাতের আযাব ছাড়াও দুনিয়াতেও আযাব অনিবার্য করে তোলে।" (জামে'তিরমিযী ও সুনানু ইবনু মাজাহ)
এই অপরাধের সবচেয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছিল কারন। সে ছিল হযরত মূসা (আ) এর আপন চাচাতো ভাই এবং ফিরাওনের অন্যতম উপদেষ্টা। তার বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তাকে তার সমস্ত সহায় সম্পদসহ জ্যান্ত মাটিতে পুতে ফেলেন। এই ঘটনার বিবরণ সূরা আল কাসাসে নিম্নরূপ দেয়া হয়েছে:
"নিশ্চয় কারূন মূসার গোত্রের লোক ছিল। সে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলো। আমি তাকে এমন ধনভান্ডার দিয়েছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, তার গোত্র তাকে বলেছিল যে, দম্ভ করোনা, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পসন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা কিছু দিয়েছেন, তাদ্বারা আখিরাতের বাসস্থান খুঁজে নাও। তবে দুনিয়া থেকে তোমার প্রাপ্য অংশ ভুলনা। অন্যের প্রতি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না। সে বললো: এ সম্পদ তো আমি নিজের জ্ঞানের সাহায্যে অর্জন করেছি। সে কি জানতোনা যে, আল্লাহ তার পূর্বে তার চেয়েও অধিক শক্তিশালী ও ধনশালী বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছেন? আর অপরাধীদেরকে তো তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবেনা। (কেননা তাদের আমলনামায় সবই লেখা থাকবে।) কারূন জাঁকজমক সহকারে আপন সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থিত হয়েছিল। তখন যারা পার্থিব জীবনের জন্য লালায়িত ছিল। তারা বলতে লাগলো: আহা কারূনকে যেরূপ সম্পদ দেয়া হয়েছে, তদ্রূপ আমাদেরকেও যদি দেয়া হতো! সে সত্যই খুব ভাগ্যবান। পক্ষান্তরে যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল, তারা বললো ধিক, তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই উত্তম। ধৈর্যশীল ব্যতীত আর কেউ তা পাবেনা। অতঃপর আমি কারূনকে ও তার প্রাসাদকে মাটির নিচে পুতে ফেললাম। আল্লাহর শান্তি থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে-এমন কোন দল তার পক্ষে ছিলনা এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলনা। আগের দিন যারা কারূনের মত হবার অভিলাষ পোষণ করেছিল, তারা (কারূনের পরিণতি দেখে) বলতে লাগলো, আসলে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা জীবিকা বাড়িয়ে দেন, যাকে ইচ্ছা কমিয়ে দেন। আল্লাহ আমাদের ওপর সদয় না হলে আমাদেরকেও তিনি মাটির নিচে পুতে দিতেন। আসলে কাফেররা সফলকাম হয়না।"
ইমাম ইবনুল জাওসী বলেন: কারন কিভাবে ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহ প্রকাশ করেছিল, সে সম্পর্কে একাধিক উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাসের মতে, সে জালিয়াতির মাধ্যমে জনৈকা দুশ্চরিত্রা মহিলাকে হযরত মূসার (আ) এর বিরুদ্ধে এই মর্মে দুর্নাম রটাতে প্ররোচিত করে যে, তিনি তার সাথে ব্যভিচার করেছেন। হযরত মূসা (আ) ঐ মহিলাকে শপথপূর্বক সত্য কথা বলতে বাধ্য করলে সে ফাঁস করে দেয় যে, কারূনের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই তাকে এই অপবাদ রটাতে প্ররোচিত করেছে। যুহহাকের ও কাতাদার মতে, কারুন আল্লাহর নবীকে অস্বীকার করে কুফরীতে লিপ্ত হয়। মাওয়ার্দীর মতে, সে ফেরাউনের দরবারে চাকুরী করতো এবং সেই খুঁটির জোরে আপন গোত্র বনী ইসরাইলের ওপর নির্যাতন চালাতো।
হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আ) এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনায় তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বদদোয়া করলে আল্লাহ বলেনঃ হে মূসা! আমি মাটিকে নির্দেশ দিয়েছি তোমার আদেশ মানতে। তুমি তাকে যা ইচ্ছা আদেশ দাও। মূসা (আ) আদেশ দিলেন: হে মাটি, কারূনকে গ্রাস কর। তৎক্ষণাৎ কারুনের খাট মাটিতে অদৃশ্য হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে কারূন মূসা (আ) এর দয়া ভিক্ষা করলো। কিন্তু মূসা (আ) পুনরায় মাটিকে আদেশ দিলেন: ওকে গ্রাস কর। এবার তার পা মাটির নিচে তলিয়ে গেল। এভাবে তিনি বারবার আদেশ দিতে দিতে কারূন সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল।
(পবিত্র আল কুরআনে বর্ণিত উপরোক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে কারূনের বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের যে দিকগুলো প্রকাশ পেয়েছে, তো হলো: (১) ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুর সাথে যোগসাজশ করে মুসলমানদের ও স্বজাতির স্বার্থের ক্ষতি সাধন (২) নিজের অর্জিত সম্পদকে আল্লাহর অনুগ্রহের দান মনে করার পরিবর্তে নিজের জ্ঞানের ফল ভেবে বাহাদুরী প্রদর্শন (৩) নিজ সম্পদে সমাজের দরিদ্র জনগণের যে অধিকার রয়েছে, তা উপলব্ধি না করা ও দিতে অস্বীকার করা, উপরন্তু জনগণকে নিজের বিত্তবৈভবের জৌলুস দেখিয়ে বেড়ানো, যাতে বঞ্চিতদের মানসিক যন্ত্রণা আরো বেড়ে যায় এবং তাদের বঞ্চনার অনুভূতি আরো তীব্রতর হয়। (ঘ) কার্পণ্য লাগামহীন পুঁজিবাদ, দাম্ভিক সুলভ ও একচেটিয়া ভোগবাদী মানসিকতা। - অনুবাদক)
📄 দুর্বল শ্রেণী, দাসদাসী বা চাকর-চাকরাণী ও জীবজন্তুর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : “তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তার সাথে কাউকে শরীক করোনা, এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর, আরো সদ্ব্যবহার কর আত্মীয়স্বজনদের সাথে, এতীমদের সাথে, দরিদ্রদের সাথে, আত্মীয় প্রতিবেশীরর সাথে, অনাত্মীয় প্রতিবেশীর সাথে, সফরসংগীর সাথে, পথিকের সাথে এবং দাসদাসীর সাথে। আল্লাহ দাম্ভিক ও গর্বিত লোককে পছন্দ করেন না।” (সূরা আন-নিসা)
রাসূল (সা) তাঁর ইন্তিকালের পূর্ব মুহূর্তেও তাকিদ দিয়েছেন যে, “নামায ও অধীনস্থদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।” (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন : “অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহার সৌভাগ্যের উৎস আর তাদের সাথে দুর্ব্যবহার দুর্ভাগ্যের উৎস।” (মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবুদাউদ)
হযরত আবু মাসউদ (রা) বলেন : আমি একজন ভৃত্যকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিলাম। এই সময় আমার পশ্চাতে একটা শব্দ শুনলাম : “জেনে রেখ, হে আবু মাসউদ, আল্লাহ তায়ালাই তোমাকে এই ভৃত্যের ওপর কর্তৃত্ব দিয়েছেন।” আমি বললাম : হে রাসূলুল্লাহ! আমি আর কখনো দাসদাসী ও চাকর চাকরানীকে প্রহার করবোনা। আমি ওকে স্বাধীন করে দিলাম। রাসূল (সা) বললেন : “এই কাজটি না করলে আগুন তোমাকে কিয়ামতের দিন ভস্মীভূত করে দিত।” (সহীহ মুসলিম)
রাসূল (সা) বলেছেন : যারা দুনিয়াতে মানুষকে নির্যাতন করে, আল্লাহ তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবেন। জামে' তিরমিযী ও সুনানে আবু দাউদে আছে যে, “রাসূলকে (সা) জিজ্ঞাসা করা হলো, অধীনস্থদেরকে কতবার ক্ষমা করবো। রাসূল (সা) বললেন : প্রতিদিন ৭০ বার।”
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) তাঁর এক ভৃত্যকে ডাকলেন। সে অনেক দেরীতে এল। তখন রাসূল (সা) নিজের হাতের মেসওয়াক দেখিয়ে বললেন, “কিয়ামতের দিন বদলা পাওয়ার ভয় না থাকলে তোমাকে এই মেসওয়াক দিয়ে পিটাতাম।”
এক হাদীসে আছে যে, এক মহিলা রাসূল (সা) কে এসে বললোঃ হে রাসূল! আমি নিজের বাঁদীকে "ব্যভিচারিনী" বলে গাল দিয়েছি। রাসূল (সা) বললেন : তুমি কি ব্যভিচারের কোন লক্ষণ তার মধ্যে দেখেছ? মহিলা বললো : না। রাসূল (সা) বললেন: “সাবধান, এই মেয়েটি কিয়ামতের দিন তোমার কাছ থেকে বদলা নেবে।” মহিলা তৎক্ষণাত তার বাঁদীর কাছে গেল এবং তাকে একটা লাঠি দিয়ে বললো: আমাকে মারো। বাঁদীটি রাযী হলোনা। তখন ঐ মহিলা তাকে স্বাধীন করে দিল। তারপর সে রাসূল (সা) এর কাছে এসে বাঁদীকে স্বাধীন করার খবর জানালেন। রাসূল (সা) বললেন: "আশা করা যায়, তোমার গুনাহ মাফ হবে।"
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে যে রাসূল (সা) বলেছেন: যে তার অধোস্তনের ওপর কোন মিথ্যা অপবাধ আরোপ করবে, সে কিয়ামতের দিন অপবাদের জন্য নির্ধারিত বেত্রদন্ড ভোগ করবে। রাসূল (সা) বলেছেন: "চাকর চাকরানী বা দাসদাসীকে প্রয়োজনীয় খাদ্যবস্ত্র দিতে হবে এবং তার ক্ষমতার অতিরিক্ত দায়িত্ব তার ওপর চাপানো যাবেনা। নিতান্তই যদি চাপাতে হয়, তবে তার সাথে নিজে কাজ করতে হবে। আল্লাহর সৃষ্টিকে কষ্ট দিওনা। তিনি তোমাদেরকে তাদের মালিক বানিয়েছেন, যদি চাইতেন তবে তাদেরকে তোমাদের মালিক বানাতে পারতেন।" (সহীহ মুসলিম, তাবরানী)
অধীনস্থ মানুষ বা পশুকে ক্ষুধায় কষ্ট দেয়া এবং সন্তান ও পিতামাতাকে বিচ্ছিন্ন করা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের কবীরা গুনাহ। রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মা ও সন্তানকে বিচ্ছিন্ন করবে, আল্লাহ তাকে তার প্রিয়জন থেকে কিয়ামতের দিন বিচ্ছিন্ন করবেন। (জামে' তিরমিযী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "মানুষের নিজের অধীনস্থ মানুষ বা পশুকে ক্ষুধায় কষ্ট দেয়ার মত বড় গুনাহ আর হতে পারেনা।" (সহীহ মুসলিম)
অনুরূপভাবে পালিত জীবজন্তুকে সজোরে প্রহার করা, সব সময় খাঁচায় আবদ্ধ রাখা, যথাসময়ে খাবার না দেয়া অথবা তার ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করা জায়েয নয়। রাসূল (সা) বলেছেন: "একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে অনাহারে মেরে ফেলার কারণে একমহিলা আযাব ভোগ করবে।" বলাবাহুল্য যে, এ কথা সকল প্রাণীর বেলায়ই প্রযোজ্য। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে যে, রাসূল (সা) কোন জীবজন্তুকে তার স্বাভাবিক কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহার করতে এবং তার ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজে খাটাতে নিষেধ করেছেন। কোন জন্তুকে যবাই করতে হলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে যবাই করতে বলেছেন এবং যে জন্তুকে হত্যা করতে হবে, তাকে বন্দী না রেখে প্রথম সুযোগেই হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সাপ, বিচ্ছু, ইঁদুর, পাগলা কুকুর প্রভৃতি কষ্টদায়ক জন্তুকে পুড়িয়ে হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (সা) কোন জীবন্তুকে নিছক চিত্তবিনোদন অথবা সখের বশে এবং কোন উপকারিতা ছাড়া হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।
দাসদাসীকে মুক্তি দেয়া খুবই সওয়াবের কাজ। রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি তার দাসদাসীকে মুক্তি দেবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি দেবেন।
📄 প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূল (সা) বললেনঃ "সে মুমীন নয়। সে মুমীন নয়।" সবাই জিজ্ঞাসা করলোঃ হে রাসূল! কে? রাসূল (সা) বললেন, "যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টকর কাজ থেকে নিরাপদ নয়।” প্রতিবেশী তিন রকমঃ প্রথম মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী। এ ধরনের প্রতিবেশী তিনটি অধিকার পায়। একটি আত্মীয় হিসাবে, একটি মুসলমান হিসাবে এবং একটি প্রতিবেশী হিসাবে। দ্বিতীয় মুসলিম অনাত্মীয় প্রতিবেশী। এই প্রতিবেশী দুইটি অধিকার পাবেঃ একটি প্রতিবেশী হিসাবে ও একটি মুসলমান হিসাবে। তৃতীয় অমুসলিম প্রতিবেশী। এ ধরনের প্রতিবেশী স্রেফ প্রতিবেশীত্বের অধিকার পাবে।
রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি তৃপ্তি সহকারে আহার করে এবং তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে, সে মুসলমান নয়। রাসূল (সা) আরো বলেছেন: জিবরীল আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে এত সতর্ক করে যে, কখনো কখনো ভাবি, প্রতিবেশীকে হয়তো আমার উত্তরাধিকারী বানানো হবে। (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে ইবনে মাজা)
রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ দরিদ্র প্রতিবেশী কিয়ামতের দিন ধনী প্রতিবেশীকে জাপটে ধরে বলবেঃ 'হে প্রভুঃ আমার এই ভাইকে তুমি সচ্ছল বানিয়েছিলে এবং সে আমার নিকটেই থাকতো, কিন্তু আমি ভুখা থাকতাম আর সে পেট পুরে খেত। ওকে জিজ্ঞাসা কর, কেন আমার ওপর দরজা বন্ধ করে রাখতো এবং আমাকে বঞ্চিত করতো।" রাসূল (সা) বলেনঃ তিনটি গুনাহ সবচেয়ে ভয়াবহঃ আল্লাহর সাথে শিরক করা, সন্তানকে অভাবের ভয়ে হত্যা করা এবং প্রতিবেশীর স্ত্রীর শ্লীলতাহানি করা। "(সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে নাসায়ী, জামে তিরমিজী)
হযরত ইবনে উমরের একজন ইহুদী প্রতিবেশী ছিল। যখনই তার বাড়িতে ছাগল যবাই হতো, বলতেন, আমাদের ইহুদী প্রতিবেশীকে কিছু গোস্ত দিয়ে এস।" (সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজী)
প্রতিবেশীর উচিত অপর প্রতিবেশীর কষ্টদায়ক আচরণ যতদূর সম্ভব সহ্য করা। এমনকি সে যদি অমুসলিম হয় তবুও। কেননা এটাও তার প্রতি উপকার ও অনুগ্রহের অনুর্ভুক্ত। একবার এক ব্যাক্তি রাসূল (সা) এর কাছে এসে বললোঃ হে রাসূল! আমাকে এমন একটি কাজ বলে দিন, যা করলে আমি জান্নাতে যেতে পারবো। রাসূল (সা) বললেনঃ পরোপকারী হও। সে বললোঃ "আমি কিভাবে বুঝবো পরোপকারী হয়েছি কিনা? রাসূল (সা) বললেনঃ তোমার প্রতিবেশীর কাছে জিজ্ঞাসা কর সে যদি বলে যে, তুমি পরোপকারী, তাহলে তুমি পরোপকারী। আর সে যদি বলে যে, তুমি পরের অনিষ্টকারী, তাহলে তুমি অনিষ্টকারী।" (বায়হাকী)
অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ প্রতিবেশীর অধিকার এই যে, সে যখন সাহায্য চাইবে তাকে সাহায্য করতে হবে, সে যখন ঋণ চাইবে তাকে ঋণ দিতে হবে। যখন সে কোন কিছুর মুখাপেক্ষী হয়, তাকে তা দিতে হবে, যখন সে রুগ্ন হয় তাকে দেখতে যেতে হবে, যখন সে কল্যাণ লাভ করে তখন তাকে অভিনন্দন জানাতে হবে, যখন সে বিপদে পড়ে তখন তাকে সমবেদনা জানাতে হবে, যখন সে মারা যায়, তার জানাযা পড়তে ও তাকে সমাহিত করতে কবরের কাছে যেতে হবে, তার অনুমতি ছাড়া উঁচু বাড়ি বানিয়ে বাতাস বন্ধ করা যাবেনা। ডেগচিতে যে খাদ্য সামগ্রী রাখা হয়, তার ঘ্রাণ যদি সে পায়, তবে তা থেকে তাকে কিছু দিতে হবে, ফল কিনলে তাকে হাদিয়া পাঠাতে হবে, নচেত তার খোসা বাইরে ফেলা যাবেনা, যাতে সে দেখতে না পায়।"
রাসূল (সা) বলেন, প্রতিবেশী একজন নারীর শ্লীলতা হানি করা অন্য দশজন নারীর শ্লীলতা হানি করার সমান। অনুরূপ একজন প্রতিবেশীর বাড়ীতে চুরি করা অন্য জায়গায় দশজনের বাড়ীতে চুরি করার সমান।
প্রতিবেশীর প্রতি সহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়া খুবই মহৎ কাজ- যদিও সে বিরোধী হয়। কথিত আছে যে, হযরত সাহল বিন আবদুল্লাহ তাসতারী (রহ) এর একজন অগ্নি উপাসক প্রতিবেশী ছিল। প্রতিবেশীর গৃহ থেকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ ময়লা আবর্জনা তার অলক্ষ্যে হযরত সাহলের ঘরে এসে পড়তো। কিন্তু তিনি সে জন্য প্রতিবেশীর কাছে কোন অভিযোগ করতেন না। দিনের বেলা আবর্জনা জমা করে ঢেকে রাখতেন এবং রাত্রে বাইরে ফেলে দিতেন। একদিন সাহলের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো। তিনি তার প্রতিবেশীকে ডেকে আবর্জনার স্তূপ দেখিয়ে বললেন, "আমার মৃত্যু ঘনিয়ে না আসলে আপনাকে এটা দেখাতাম না। আমার আশংকা যে, আমার মৃত্যুর পর আমার পরিবারের আর কেউ আমার মত সহনশীলতা দেখাতে পারবেনা। তাই আপনাকে দেখালাম। আপনি যা আরো মনে হয় করুন।" প্রতিবেশী অগ্নি উপাসকের বিস্ময়ের অবধি রইলনা। সে বললো, “আপনি এত দীর্ঘকাল ব্যাপী এই বিরক্তিকর ব্যাপারটা সহ্য করে আসছেন। অথচ টু শব্দটি করেননি। আর আমি কিনা এখনো নিজের কুফরীর ওপর বহাল আছি।” এই বলে সে সাহলের হাতে হাত দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলো। আর সাহলও তৎক্ষণাত ইন্তিকাল করলেন।