📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের অধিকার লংঘন

📄 স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের অধিকার লংঘন


(ক) স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অসদাচরণ
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যে সব স্ত্রী অবাধ্যতা প্রকাশ করবে বলে তোমরা আশংকা কর, তাদেরকে উপদেশ দাও, বিছানায় তাদের থেকে পৃথক হও, এবং মারধর কর। এতে যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আর কোন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা চিন্তা করোনা।"

ইমাম ওয়াহেদী বলেন: এখানে অবাধ্যতার অর্থ হলো স্বামীর অবাধ্য হওয়া এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করা। আতা বলেন: স্ত্রী স্বামীর প্রতি এ যাবত যে ধরনের আনুগত্য দেখিয়ে আসছিল তা পাল্টে যাওয়া এবং স্বামীকে বিনা ওযরে যৌন মিলনে বাধা দান এর পর্যায়ভুক্ত। "উপদেশ দাও" অর্থ হলো, আল্লাহর কিতার ও তাঁর আদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়া। ইবনে আব্বাস বলেন: বিছানায় পৃথক হওয়ার অর্থ হলো, স্ত্রীর দিকে পিঠ দিয়ে শয়ন করা এবং কথা না বলা। শা'বী ও মুজাহিদের মতে, এর অর্থ বিছানা একেবারেই পৃথক করে ফেলা এবং স্ত্রীর সাথে এক বিছানায় শয়ন না করা। আর "মারধর কর" অর্থ মৃদু মারধর করা, যাতে খুব বেশী ব্যথা না পায়। ইবনে আব্বাসের মতে খালি হাতে কিল থাপ্পড় ইত্যাদি এর বেশী নয়।

রাসূল (সা) বলেছেনঃ "যখন কোন স্বামী স্বীয় স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে এবং সে সেই ডাকে সাড়া দেয়না, তখন ভোর হওয়া অবধি তার ওপর ফেরেশতারা অভিশাপ বর্ষণ করতে থাকে।" (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)

অপর হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: তিন ব্যক্তির নামায এবং কোন সৎকাজ কবুল হয়না; পালিয়ে যাওয়া গোলাম বা চাকর যতক্ষণ ফিরে না আসে, স্বামীর অবাধ্য স্ত্রী, যতক্ষণ স্বামী তার ওপর সন্তুষ্ট না হয়, এবং মদ খেয়ে মাতাল হওয়া ব্যক্তি যতক্ষণ তার হুঁশ ফিরে না আসে।"

রাসূল (সা) আরো বলেছেন: কিয়ামতের দিন নারীকে সর্ব প্রথম যে প্রশ্ন করা হবে তা হবে তার নামায ও স্বামী সম্পর্কে। রাসূল (সা) আরো বলেন: কোন মুমিন স্ত্রীর পক্ষে তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোযা রাখা এবং তার ঘরে অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া বৈধ নয়। (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: আমি যদি কাউকে কারো সামনে সিজদার আদেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে স্বামীর সামনে সিজদা করার আদেশ দিতাম। (তিরমিযী) একবার এক মহিলা রাসূলের (সা) নিকট স্বীয় স্বামীর কথা উল্লেখ করলে তিনি বললেন: "তুমি তার তুলনায় কতটুকু মর্যদার অধিকারী তা ভেবে দেখ। সে তোমার বেহেশত ও দোজখ।” (নাসায়ী) রাসূল (সা) আবো বলেনঃ "স্ত্রী সব সময়ই স্বামীর মুখাপেক্ষী। তথাপি যে স্ত্রী স্বামীর কৃতজ্ঞ নয়, আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না।” (নাসায়ী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "স্ত্রী যখন স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার গৃহ ত্যাগ করে, তখন সে ফিরে না আসা পর্যন্ত ফেরেশতারা তারপর অভিসম্পাত করতে থাকে।” (তাবরানী) রাসূল (সা) আরো বলেন: "স্বামীকে সন্তুষ্ট রেখে যে স্ত্রী মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (তিরমিযী)

তবে স্বামীকে কোন হারাম কাজে সহযোগিতা করা স্ত্রীর পক্ষে বৈধ নয়, এবং অবৈধ কাজে সহযোগিতা না করায় স্বামী অসন্তুষ্ট হলেও তার জন্য সে গুনাহগার হবে না। বৈধ সীমার মধ্যে স্বামীর পরিপূর্ণ আনুগত্য করা স্ত্রীর জন্য ওয়াজিব। স্বামীর অনুমতি ছাড়া নিজেকে এমন কোন কাজে নিয়োজিত করা বৈধ নয়, যার ফলে স্বামী তার সাহচর্য থেকে সাময়িকভাবে বঞ্চিত হয়। স্বামীর ধনসম্পদে বিনা অনুমতিতে হস্তক্ষেপ করা স্ত্রীর বৈধ নয়। নিজের অধিকারের ওপর স্বামীর অধিকারকে এবং নিজের আত্মীয়দের অধিকারের ওপর স্বামীর আত্মীয়দের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়া স্ত্রীর পক্ষে অপরিহার্য। সব সময় পূর্ণ পরিচ্ছন্নতা সহকারে স্বামীর ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। নিজের সৌন্দর্যের জন্য তার ওপর বড়াই করা এবং স্বামীর মধ্যে বিদঘুটে কিছু থাকলে তার জন্য তাকে দোষারোপ করা বাঞ্ছনীয় নয়।

স্ত্রীর উচিত স্বামীর সামনে সর্বদা লজ্জাশীলা থাকা, তার সামনে চোখ নামিয়ে রাখা, তার আদেশের অনুগত থাকা, তার কথা মনোযোগের সাথে শোনা, তার কথা বলার সময় চুপ থাকা, তার গৃহে আগমনের সময় দরজায় এগিয়ে গিয়ে অভ্যর্থনা জানানো, তার বাইরে যাওয়ার সময় দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়া ও কিছুক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা, সে যা যা অপছন্দ করে তা থেকে দূরে থাকা, তার ঘুমানোর সময় তার কাছে উপস্থিত থাকা, তার অনুপস্থিতিতে তার গৃহ, সম্পত্তি ও নিজের সতিত্বকে আমানত হিসাবে সংরক্ষণ করা, নিয়মিত দাঁত মাজা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ও তার কাছে নিজেকে সব সময় সুসজ্জিত ও সুবাসিত রাখা, তার অসাক্ষাতে তার কোন নিন্দা না করা। তার আত্মীয়স্বজনের যত্ন করা এবং তার ক্ষুদ্র উপকারকে বড় করে দেখা।

রাসূল (সা) বলেছেনঃ "স্ত্রী যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিক ঠিক মত পড়বে, রমযান মাসের রোযা ঠিকমত রাখবে এবং স্বামীর অনুগত থাকবে, তখন সে যে দরজা দিয়েই জান্নাতে প্রবেশ করতে চাইবে, করতে পারবে।” (আহমাদ, তাবরানী)

রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "স্বামীর অনুগত স্ত্রীর জন্য পাখি, মাছ, সূর্য, চন্দ্র ও ফেরেশতারা পর্যন্ত আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চায়। আর স্বামীর অবাধ্য স্ত্রীর জন্য আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে অভিসম্পাত আসে। যে স্ত্রী স্বামীর সামনে মুখ কালো করে থাকে, সে পুনরায় হাসিমুখ হয়ে স্বামীকে সন্তুষ্ট না করা পর্যন্ত আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকবেন। যে স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ীর বাইরে যাবে সে ফিরে না আসা পর্যন্ত ফেরেশতাদের অভিশাপ কুড়াতে থাকবে।"

রাসূল (সা) আরো বলেছেন: চার রকমের নারী জান্নাতে এবং চার রকমের নারী জাহান্নামে যাবে: আল্লাহর ও স্বামীর অনুগত সতী নারী, অধিক সন্তান উৎপাদনে সক্ষম, ধৈর্যশীলা ও অল্পে তুষ্টা নারী, লজ্জাশীলা নারী, যে স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সতিত্ব ও স্বামীর সম্পদ সংরক্ষণ করে এবং তার উপস্থিতিতে তার সাথে বাকসংযম করে এবং শিশু সন্তানসহ বিধবা হওয়ার পর যে নারী সন্তাদেরকে আঁকড়ে ধরে থাকে এবং তাদের ক্ষতির আশংকায় বিয়ে না করে তাদের লালন পালনে নিয়োজিত থাকে। আর যে চার রকমের নারী জাহান্নামী হবে তারা হচ্ছেঃ (১) যে নারী স্বামীর প্রতি কটু বাক্য বর্ষণ ও ভর্ৎসনা করে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সতিত্ব রক্ষা করেনা, আর সে উপস্থিত থাকলে তাকে কটুবাক্য দ্বারা কষ্ট দেয় (২) যে নারী স্বামীর ওপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপায় এবং যা তার ক্ষমতার বাইরে, তা তাকে করতে বাধ্য করে। (৩) যে নারী পর পুরুষ থেকে নিজেকে ঢেকে রাখেনা (পর্দার বিধান মেনে চলে না) এবং সাজসজ্জা করে ও রূপের প্রদর্শনী করে বাইরে বের হয় (৪) যে নারীর পানাহার ও ঘুম ছাড়া আর কোন কিছুতেই আগ্রহ নেই এবং নামায আল্লাহ রাসূল ও স্বামীর আনুগত্য করতে চায়না। এসব দোষ যে নারীর রয়েছে, সে যখন স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে বাইরে বের হয়, তখন সে অভিশাপ কুড়ায় ও জাহান্নামের যোগ্য হয়। কেবলমাত্র তওবা দ্বারা সে এই পরিণাম থেকে রক্ষা পেতে পারে।

রাসূল (সা) বলেছেন: (মেরাজের রাতে) আমি জাহান্নাম পরিদর্শন করেছি। দেখেছি যে, সেখানকার অধিকাংশ অধিবাসী মহিলা। কারণ তারা আল্লাহ, রাসূল ও স্বামীর আনুগত্য কম করে এবং "তাবাররুজ” করে। তাবাররুজ হলো, বাইরে চলাফেরার সময় সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরা, অধিক পরিমাণে সাজসজ্জা করা এবং অধিক সৌন্দর্য প্রদর্শনী করে জনসাধারণকে প্রলুব্ধ করা, অন্য কথায় বেপর্দায় চলাফেরার নামই তাবাররুজ। রাসূল (সা) বলেছেন: নারী পর্দায় থাকার জন্যই সৃষ্ট। সে যখন ঘর থেকে বের হয়, তখন শয়তান তাকে অভিনন্দন জানায়।

হাদীসে আছে: নারীরা যতক্ষণ আপন গৃহে অবস্থান করে ততক্ষণই আল্লাহর চোখে সবচেয়ে মর্যাদাশীলা থাকে। হাদীসে আরো আছে যে, নারী আপন গৃহে অবস্থান, আল্লাহর ইবাদাত ও স্বামীর আনুগত্যের মাধ্যমে যতটা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে, ততটা আর কোনভাবে করতে পারে না। একবার হযরত আলী (রা) স্বীয় স্ত্রী হযরত ফাতিমা (রা) কে জিজ্ঞাসা করলেন: নারীর মংগল কিসে? হযরত ফাতিমা বললেন: 'বেগানা পুরুষের প্রতি দৃষ্টিপাত না করা এবং বেগানা পুরুষকে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করার সুযোগ না দেয়ার মধ্যেই নারীর মংগল নিহিত।'

হযরত আলী (রা) বলতেন: 'তোমাদের কি লজ্জা নেই, তোমাদের কি আত্মসম্মানবোধ নেই যে, তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে বাইরে যেতে দাও, আর তারা পরপুরুষদের দিকে তাকায় এবং পরপুরুষেরাও তাদের দিকে তাকায়? আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাতে বর্ণিত আছে যে, একদিন হযরত আয়িশা (রা) ও হযরত হাফসা (রা) রাসূল (সা) এর নিকট উপস্থিত ছিলো। এই সময় অন্ধ সাহাবী ইবনে উম্মে মাকতুম এলেন। রাসূল (সা) তাঁর স্ত্রীদ্বয়কে বললেন: তোমরা তার কাছে থেকে পর্দায় চলে যাও। তাঁরা উভয়ে বললেন: উনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখতেও পাননা, চেনেনও না। রাসূল (সা) বললেন: তোমরা দু'জনও অন্ধ নাকি? তোমরা কি তাকে দেখতে পাওনা?

এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, পুরুষ ও নারী উভয়েই পরস্পরের প্রতি তাকানো থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা সূরা নূরে বলেছেন: “মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা যেন নিজ নিজ দৃষ্টি সংযত রাখে ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। . . . আর মুমিন নারীদেরকে বল, তারা যেন নিজ নিজ দৃষ্টি সংযত রাখে ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।"

হযরত আলী (রা) বলেন: একবার আমি ও ফাতিমা রাসূল (সা) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, তিনি অত্যন্ত অধীরভাবে কাঁদছেন। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আপনার জন্য আমার পিতামাতার প্রাণ উৎসর্গ হোক! আপনি কি জন্য কাঁদছেন? রাসূল (সা) বললেন: "হে আলী! মিরাজের রাত্রে আমি আমার উম্মাতের নারীদেরকে নানা রকমের আযাব ভোগ করতে দেখেছি। সেই কঠিন আযাবের কথা মনে করে কাঁদছি। আমি দেখেছি, এক মহিলাকে তার চুল দিয়ে জাহান্নামের আগুনের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে তার মাথার ঘিলু টগবগ করে ফুটছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম, তার জিহবা টেনে লম্বা করে তা দিয়ে তাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং তার গলায় গরম পানি ঢালা হচ্ছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম, তার দুই পা দুই স্তনের সাথে এবং দুই হাত কপালের চুলের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম তার স্তনে রশি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম, তার মাথা শুকরের মাথার মত। তার দেহ গাধার দেহের মত এবং তাকে হাজার হাজার রকমের শাস্তি দেয়া হচ্ছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম, সে কুকুরের আকৃতি পেয়েছে। আগুন তার মুখ দিয়ে ঢুকছে এবং মলদ্বার দিয়ে বেরুচ্ছে। আর ফেরেশতারা তার মাথায় লোহার হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে।

হযরত ফাতিমা উঠে দাঁড়ালেন এবং এইসব মহিলার এইসব আযাবের কারণ কি জানতে চাইলেন। রাসূল (সা) বললেন: "হে ফাতিমা! যে মহিলাকে চুল দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সে পর পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজের মাথাকে ঢেকে রাখতোনা। যে মহিলাকে তার জিহ্বা দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সে প্রতিবেশীকে কটুবাক্য দ্বারা কষ্ট দিত। স্তনে রশি দিয়ে বেঁধে যাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সে স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সতিত্ব সংরক্ষণ করতোনা, অর্থাৎ ব্যভিচারীনী ছিল। আর যার দুই পা দুই স্তনের সাথে এবং দুই হাত কপালের চুলের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সে সহবাস ও ঋতুজনিত অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জন করতোনা এবং নামায নিয়ে তামাশা করতো। যার মাথা শুকরের মত ও দেহ গাধার মত হয়ে গেছে, সে ছিল চোগলখোর ও মিথ্যাবাদী। আর যে কুকুরের আকারে রূপান্তরিত হয়েছে, সে ছিল হিংসুটে এবং দান করে খোঁটা দিত। রাসূল (সা) বলেছেন: কোন নারী নিজের স্বামীকে কষ্ট দিলে জান্নাতের হুর উক্ত নারীকে অভিসম্পাত দেয়।

উল্লেখ আছে যে, পিতামাতা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনকে দেখার জন্য এবং অন্যান্য জরুরী প্রয়োজনে স্বামীর অনুমতি নিয়ে এবং পর্দা সহকারে বাইরে যাওয়াতে কোন দোষ নেই।

(খ) স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর অধিকার লংঘন:
স্ত্রী যেমন স্বামীর আনুগত্য করতে ও তাকে সন্তুষ্ট রাখতে আদিষ্ট, তেমনি স্বামীও আদিষ্ট স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ ও বিনম্র ব্যবহার করতে, তার পক্ষ থেকে কোন দুর্ব্যবহার ইত্যাদি প্রকাশ পেলে তাতে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করতে এবং স্ত্রীকে খোরপোশ ও সম্মানজনক জীবন যাপনের সুযোগ দিতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: স্ত্রীদের সাথে উত্তম ব্যবহার কর। রাসূল (সা) বলেছেন: তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রেখো। মনে রেখো, তোমাদের স্ত্রীদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপরও স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। তোমাদের ওপর স্ত্রীদের অধিকার এই যে, তোমরা তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে, তাদের খোরপোশ দেবে। আর তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তাদের সতিত্ব ও শ্লীলতা রক্ষা করবে এবং তোমাদের কাছে যারা অবাঞ্ছিত তাদেরকে গৃহে প্রবেশ করতে দেবেনা। (ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)

ইবনে হাব্বান বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার পরিবার পরিজনের সাথে অধিকতর সদ্ব্যবহারকারী।" কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে, "সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে আপন পরিবারের সাথে সর্বাধিক বিনম্র আচরণকারী। রাসূল (সা) স্ত্রীলোকের প্রতি অত্যধিক বিনম্র আচরণ করতেন। রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি নিজ স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে ধৈর্য ধারণ করবে, সে হযরত আইয়ূব (আ) এর মত পুরস্কৃত হবে। আর যে স্ত্রী স্বামীর দুর্ব্যবহারে ধৈর্য ধারণ করবে, সে ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিমের ন্যায় পুরস্কৃত হবে।

এক হাদীসে আছে যে, এক ব্যক্তি হযরত উমরের নিকট নিজের স্ত্রীর দুর্ব্যবহারের অভিযোগ পেশ করার জন্য উপস্থিত হলো। সে হযরত উমরের বাড়ীর ফটকে দাঁড়িয়ে তাঁর বাইরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। এই সময় শুনতে পেল, হযরত উমরের স্ত্রী তাঁকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করছেন। কিন্তু হযরত উমর তার কোন জবাব না দিয়ে নীরবে সহ্য করছেন। এটা শোনার পর লোকটি ফিরে যেতে উদ্যত হলো। সে ভাবলো, এমন দুর্দন্ড ও প্রতাপান্বিত খলিফার যখন এই অবস্থা, তখন আমি আর কোথাকার কে? ঠিক এই সময় হযরত উমর বাইরে বেরিয়ে দেখলেন, লোকটি চলে যাচ্ছে। তিনি ডেকে বললেন : তুমি কেন এসেছিলে আর কেনই বা দেখা না করে চলে যাচ্ছ? সে বললো : আমীরুল মুমিনীন! আমার সাথে আমার স্ত্রী যে দুর্ব্যবহার করে ও কটুবাক্য প্রয়োগ করে, তার বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করার জন্য আমি আপনার কাছে এসেছিলাম। কিন্তু শুনতে পেলাম স্বয়ং আপনার স্ত্রীও তদ্রূপ। তাই ফিরে যাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম যে, আমীরুল মুমিনীনের অবস্থা যখন এরূপ, তখন আমি আর কোথাকার কে? হযরত উমর বললেন : শোন, ভাই! আমার ওপর তার কিছু অধিকার আছে বলেই আমি তাকে সহ্য করলাম। দেখ, সে আমার খাবার রান্না করে, রুটি বানায়, কাপড় ধোয়, এবং আমার সন্তানদের দুধ খাওয়ায়। অথচ এসব কাজ তার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে এসব কাজ করে দিয়ে সে আমার মনকে হারাম উপার্জন থেকে ফিরিয়ে রাখে। এ জন্যই আমি তাকে সহ্য করি। লোকটি বললোঃ আমীরুল মুমিনীন! আমার স্ত্রীও তদ্রুপ। হযরত উমর বললেন : “তাহলে তাকে সহ্য করতে থাক, ভাই। দুনিয়ার জীবনটা তো নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী।”

কথিত আছে যে, একবার জনৈক নেককার ব্যক্তির এক নেককার দ্বীনী ভাই তার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি প্রতি বছর একবার বেড়াতে আসতেন। এসে দরজায় কড়া নাড়তেই তার স্ত্রী দরজা খুলে দিয়ে আগন্তুককে জিজ্ঞাসা করলেন : “কে আপনি?” আগন্তুক বললেন : “আমি আপনার স্বামীর দ্বীনী ভাই! তাকে দেখতে এসেছি।” স্ত্রী অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় বললো : “সে জংগলে কাঠ কাটতে গেছে। আল্লাহ যেন ওকে নিরাপদে ফিরিয়ে না আনে। আল্লাহ যেন ওর অমুক করে, তমুক করে! ইত্যাদি ইত্যাদি...।” এভাবে অনুপস্থিত স্বামীর বিরুদ্ধে সে প্রচন্ডভাবে নিন্দাবাদ করতে লাগলো। ইতিমধ্যে সহসা তার স্বামী এসে উপস্থিত হলেন। একটা সিংহের পিঠে করে বিরাট এক কাঠের বোঝা নিয়ে এবং নিজে তার ওপর আরোহণ করে পাহাড়েরর দিক থেকে ফিরে এলেন। তিনি তাঁর দ্বীনী ভাইকে সালাম করলেন এবং মোবারকবাদ জানালেন। অতঃপর তিনি গৃহের ভেতরে ঢুকে সিংহের পিঠ থেকে কাঠ নামালেন এবং সিংহকে বললেন : যাও, আল্লাহ তোমার কল্যাণ করুন। অতঃপর তিনি তার দ্বীনী ভাইকেও ভেতরে এনে বসালেন। তার স্ত্রী তখনো তাকে বকা ঝকা করছিল। অথচ তার স্বামী ছিলেন নিরুত্তর। অতঃপর খাওয়া দাওয়া শেষে অতিথি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। তিনি তার বন্ধুর মুখরা স্ত্রীর ব্যবহার ও তার বন্ধুর ধৈর্য দেখে অবাক হয়ে গেলেন।

পরের বছর একই সময় তিনি আবার এলেন। তিনি কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে আওয়াজ এল: দরজায় কে? আগন্তুক বললেন: আমি আপনার স্বামীর দ্বীনী ভাই অমুক। তখন মোবারকবাদ বলে মহিলা দরজা খুলে দিল। সে আরো বললো: "আপনি বসুন, আমার স্বামী ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই ফিরে আসবেন। আল্লাহ তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনুন। ইত্যাদি ইত্যাদি।" আগন্তুক তার সুমিষ্ট ব্যবহার ও কথাবার্তায় অবাক হয়ে গেলেন।

একটু পরেই গৃহকর্তা কাঠের বোঝা নিয়ে বাড়ী ফিরে এলেন। কিন্তু এবার কাঠের বোঝা সিংহের পিঠে করে নয় - নিজের পিঠে করে আনলেন। অতঃপর তারা অতিথিকে যত্ন করে খাইয়ে দাইয়ে বিদায় করলেন। বিদায় কালে তিনি তার বন্ধুকে বললেন: "গত বছর যখন এসেছিলাম তখন আপনার স্ত্রীর কর্কশ ব্যবহার ও দুর্বিনীত ভাষণ শুনেছিলাম। তিনি সর্বদাই আপনার নিন্দা করছিলেন। আর আপনি সিংহের পিঠে করে কাঠের বোঝা বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এ বছর দেখলাম আপনার স্ত্রীর সুমধুর ব্যবহার। অথচ আপনি বোঝা বয়ে এনেছেন নিজের পিঠে করে। ব্যাপারটা কি বলুন তো?” তিনি বললেন: “হে ভাই! সেই কর্কশভাষিণী নারীর মৃত্যু হয়েছে। আমি তার ওপর ধৈর্য ধারণ করতাম। ফলে আল্লাহ সেই সিংহটিকে আমার বশীভূত করে দিয়েছিলেন। পরে আমি এই সদাচারীনী মহিলাকে বিয়ে করেছি। আমি তার সাথে সুখে আছি। কিন্তু সেই সিংহ আমার হাতছাড়া হয়ে গেল। তাই আমি নিজের ঘাড়ে করে কাঠ বহন করতে বাধ্য হয়েছি এই অনুগত সৎস্বভাবা স্ত্রীর সাথে আমার সুখময় জীবন যাপনের খাতিরে।

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 প্রাণীর প্রতিকৃতি বা ছবি আঁকা

📄 প্রাণীর প্রতিকৃতি বা ছবি আঁকা


আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "যারা আল্লাহকে ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিসম্পাত করবেন এবং তাদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।" এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে ইকরামা বলেন: যারা ছবি তৈরী করে তারাই আল্লাহ ও রাসূলকে কষ্ট দেয়। রাসূল (সা) বলেছেন: যারা ছবি তৈরী করে, তাদেরকে কিয়ামতের দিন শাস্তি দেয়া হবে এবং বলা হবে: "তোমরা যা বানিয়েছিলে, তাতে প্রাণ দাও।" (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) হযরত আয়িশা (রা) বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূল (সা) এক সফর থেকে গৃহে ফিরলেন। তখন আমি আমার ঘরের দেয়ালের কুঠুরিকে এমন একটা পর্দা দিয়ে ঢেকে রেখেছিলাম, যাতে কতকগুলো ছবি ছিল। পর্দাটি দেখা মাত্র রাসূল (সা) এর মুখমন্ডল বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেনঃ "হে আয়িশা! যারা নিজের সৃষ্টিকে আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ করবে, কিয়ামতের দিন তারাই কঠোরতম শাস্তি ভোগ করবে।" হযরত আয়িশা বলেন: এরপর আমি সেই পর্দাটা কেটে দু'ভাগ করে ফেলি এবং তা দিয়ে দুটো বালিশ বানাই। (বুখারী-মুসলিম)

রাসূল (সা) বলেছেন: "প্রত্যেক চিত্রকর দোজখবাসী হবে। তার প্রতিটি ছবির জন্য তাকে এক একটা প্রাণ দেয়া হবে এবং প্রত্যেকটা প্রাণ জাহান্নামের আগুনে আযাব ভোগ করবে।” (বুখারী-মুসলিম)

রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি পৃথিবীতে কোন প্রাণীর প্রতিচ্ছবি বা ছবি তৈরী করেছে, কিয়ামতের দিন তাকে ঐ প্রতিচ্ছবি বা ছবিতে প্রাণ সঞ্চার করার নির্দেশ দেয়া হবে। কিন্তু তা সে কখনো পারবেনা।” (বুখারী)

রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা বলেন যে, যে ব্যক্তি আমার সৃষ্টির মত সৃষ্টি করার ঔদ্ধত্য দেখায়, তার চেয়ে বড় অপরাধী আর কে আছে? সে একটা দানাই সৃষ্টি করুক না! একটা গমের দানা অথবা একটি কলাই সৃষ্টি করুক তো দেখি!” (বুখারী, মুসলিম)

তিরমিযীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন, "কিয়ামতের দিন দোজখ থেকে একটি মাথা উঠে বলবে যে, তিন ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়ার জন্য আমার কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। এই তিনজন হলো, আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার প্রতিপন্নকারী, স্বৈরাচারী শাসক, এবং চিত্রকর।” বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত অপর হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ "যে গৃহে কুকুর কিংবা প্রাণীর ছবি আছে, সেই গৃহে ফিরিশতারা প্রবেশ করেনা।" Imam খাত্তাবী বলেন যে, এ দ্বারা রহমত ও বরকতের ফিরিশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতারা সকল গৃহেই যেয়ে থাকে। আর কুকুর দ্বারা বুঝানো হয়েছে নিছক সখের বশে পালিত কুকুরকে। শিকার ধরা, পাহারা দেয়া ইত্যাদি কাজের জন্য কুকুরের প্রয়োজন হলে তাতে কোন বাধা নেই। আর ছবি বলতে বুঝানো হয়েছে যে কোন প্রাণীর ছবি বা প্রতিকৃতিকে, চাই তা যে জিনিসের ওপর যেভাবেই রক্ষিত থাকনা কেন। এ ধরনের সকল ছবি ও প্রতিকৃতিকে সাধ্যমত অপসারণ বা ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, হযরত আলী (রা) সকল ছবি বা প্রতিকৃতিকে ধ্বংস করার এবং সকল উঁচু কবরকে সমান করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 বিপদে দুর্যোগে বা শোকাবহ ঘটনায় উচ্চস্বরে কান্নাকাটি

📄 বিপদে দুর্যোগে বা শোকাবহ ঘটনায় উচ্চস্বরে কান্নাকাটি


সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি (শোক দুঃখ প্রকাশার্থে) মুখ ও কপাল চাপড়ায়, পোশাক ছিঁড়ে ফেলে, এবং জাহেলী প্রথা অনুযায়ী দোয়া করে, সে আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" ইতিপূর্বে আমরা বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করেছি যে, রাসূল (সা) উচ্চৈস্বরে ক্রন্দন, চুল কামানো ও চুল টেনে ছেঁড়া এবং কাপড় ছেঁড়ার মাধ্যমে শোক প্রকাশকারিনীকে অভিসম্পাত করেছেন। এ সকল কাজ সর্বসম্মতভাবে হারাম। অনুরূপভাবে মুখ কপাল চাপড়ানো, মুখ খামচানো এবং মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করে দোয়া করাও হারাম। হযরত উম্মে আতিয়া (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) আমাদের কাছ থেকে অংগীকার নিয়েছেন যে আমরা কখনো উচ্চৈস্বরে কেঁদে শোক প্রকাশ করবোনা। (বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "দুটি কাজ কুফরীর পর্যায়ভুক্ত। কারো বংশ নিয়ে টিটকারি দেয়া এবং মৃত ব্যক্তির ওপর উচ্চৈস্বরে কান্নাকাটি করা।” (মুসলিম)

আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) উচ্চৈস্বরে ক্রন্দনকারিনী ও তার শ্রোতাদেরকে অভিসম্পাত দিয়েছেন। বুখারী, ইবনে মাজা ও নাসায়ীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা) তীব্র যন্ত্রণায় অচেতন হয়ে পড়লে তাঁর এক আত্মীয়া মহিলা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। হুঁশ ফিরে এলে তিনি বলেন: রাসূল (সা) যাকে অবাঞ্ছিত গণ্য করেছেন, আমিও তাকে অবাঞ্ছিত গণ্য করি। উচ্চৈস্বরে ক্রন্দন, চুল ছেঁড়া, কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদির মাধ্যমে শোক প্রকাশকে রাসূল (সা) অবাঞ্ছিত গণ্য করেছেন।

সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: উচ্চৈস্বরে কাঁদার কারণে মৃত ব্যক্তি কবরে আযাব ভোগ করে। রাসূল (সা) বলেছেন: দুটি নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ ও পাপজনক শব্দ থেকে আমাকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে: একটি গানবাজনার শব্দ, অপরটি বিপদের সময় মুখ চাপড়ানো ও শয়তানের মত চিৎকার করার শব্দ। বর্ণিত আছে, যে হযরত ওমর (রা) এক পেশাদার ক্রন্দসীকে স্বহস্তে প্রহার করেন এবং বলেন: আমি এই ক্রন্দসীকে প্রহার করছি। কেননা তাকে প্রহার করা নিষিদ্ধ নয়, সে তোমাদের দুঃখের অংশীদার হয়ে কাঁদেনা, বরং তোমাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য কাঁদে। সে তোমাদের মৃতদেরকে কবরে কষ্ট দেয় এবং জীবিতদের শোক যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেয়। কেননা সে ধৈর্য ধারণ করতে নিষেধ করে, অথচ আল্লাহ তার আদেশ দিয়েছেন, সে ব্যাকুলভাবে কাঁদতে উদ্বুদ্ধ করে, অথচ আল্লাহ তা করতে নিষেধ করেছেন।

আলেমগণ বলেছেন পেশাদার ভাড়াটে ক্রন্দসীদের ক্রন্দন এবং উচ্চৈস্বরে দিশাহারা হয়ে ক্রন্দন করা ছাড়া নিছক শোক বিহবল হয়ে মৃদুস্বরে আন্তরিকভাবে ক্রন্দন হারাম নয়। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) রুগ্ন সা'দ বিন উবাদাকে দেখতে গিয়ে কেঁদে দেন। তাঁর কান্না দেখে সমবেত সাহাবীগণও কাঁদেন। অতঃপর রাসূল (সা) বললেন: শুনে রাখ, আল্লাহ চোখের পানি ফেলা ও হৃদয়ের আবেগ প্রকাশ করার জন্য আযাব দেননা তিনি শুধু এই জিনিসটির জন্য শাস্তি দেন অথবা অনুগ্রহ করেন-এ কথা বলে জিহবার দিকে ইশারা করলেন। অপর রেওয়ায়েতে আছে যে, রাসূল (সা) কেঁদে দিলে হযরত সা'দ জিজ্ঞাসা করলেন "হে আল্লাহর রাসূল! এ কী?" তিনি বললেন: "এটা বান্দাদের হৃদয়ে আল্লাহর সৃষ্টি করা করুণা ও সহানুভূতি। আল্লাহ করুণা ও সহানুভূতিসম্পন্ন বান্দাদের প্রতিই করুণা বর্ষণ করেন।" সহীহ আল বুখারীতে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) যখন তার মুমূর্ষ পুত্র ইবরাহীমের কাছে গেলেন, তখন রাসূল (সা) এর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। তা দেখে আবদুর রহমান বিন আওফ বললেনঃ হে রাসূল! আপনিও কাঁদছেন! রাসূল (সা) বললেন: এটা স্নেহ মমতার প্রকাশমাত্র। অতঃপর বললেন: "চোখ অশ্রু বর্ষণ করে ও হুদয় মর্মাহত হয়। কিন্তু আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট, তা ছাড়া আমরা আর কিছু মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারিনা। হে ইবরাহীম, তোমার বিচ্ছেদে আমরা ব্যথিত।"

এখানে উল্লেখ্য যে, বিপদ আপদে ও প্রিয়জনের বিচ্ছেদে মাত্রাতিরিক্ত কান্নাকাটিকে নিরুৎসাহিত করার কারণ এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা) ধৈর্য ও আত্মসংযমের নির্দেশ দিয়েছেন এবং হতাশা ও অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামায দ্বারা শক্তি অর্জন কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।...... আর আমি অবশ্য অবশ্য তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা, সম্পদহানি, প্রাণহানি ও শস্যহানি দ্বারা পরীক্ষা করবো। যারা ধৈর্য ধারণ করে, যারা বিপদে পতিত হয়ে বলে যে, আমরা আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবো। তাদেরই সুসংবাদ দিয়ে দাও।" (সূরা আল বাকারা) হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেনঃ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন-এর তাৎপর্য এই যে, তিনি তাদেরকে সাহায্য করেন এবং লাঞ্ছিত করেন না। আর "যারা বিপদে পতিত হলে বলে যে, আমরা আল্লাহরই জন্য" এ কথার মর্ম এই যে, "আমরা আল্লাহর বান্দা, তাই তিনি আমাদের সাথে যা ইচ্ছা, তাই আচরণ করতে পারেন।"

রাসূল (সা) বলেছেনঃ "মুমিন বান্দার ওপর যে বিপদই আসুক না কেন, এমন কি তার পায়ে যদি একটা কাঁটাও ফোটে, তবে তা দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহ মুছে দেন।" (সহীহ মুসলিম) তিরমিযীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "কোন বান্দার সন্তান মারা গেলে আল্লাহ ফিরিশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন যে, যখন তোমরা আমার বান্দার সন্তানের প্রাণ সংহার করছিলে, তখন সে কী বলেছে? ফিরিশতারা বলেন: "সে তোমার প্রশংসা করেছে এবং তোমার কাছে তার ফিরে যাওয়ার কথা স্মরণ করেছে।" তখন আল্লাহ বলেনঃ আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটা বাড়ী তৈরী কর এবং তার নাম রাখ "বাইতুল হাম্দ" (প্রশংসার বাড়ী)। এক হাদীসে কুদসীতে আছে যে, আল্লাহ বলেন: “যখন আমার বান্দার কোন প্রিয়জনের মৃত্যু হয় এবং সে তাতে ধৈর্ম ও সংযম অবলম্বন করে, তখন জান্নাত ছাড়া তাকে দেয়ার মত আর কোন প্রতিদান আমার কাছে থাকেনা।" (সহীহ আল বুখারী)

রাসূল (সা) বলেছেন: "আল্লাহর ফায়সালা অম্লান বদনে মেনে নেয়া আদম সন্তানের জন্য সৌভাগ্যজনক আর তাতে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্টি হওয়া দুর্ভাগ্যজনক।" হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে যে, মৃত্যুর ফিরিশতা মুমিনের প্রাণ সংহার করে বিদায় হওয়ার সময় যখন তার পরিবার পরিজন বুক চাপড়ে, চুল এলিয়ে এবং নিজেদের মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করে শোক প্রকাশ করতে আরম্ভ করে, তখন তা দেখে তিনি ক্ষণিকের জন্য বাড়ীর ফটকে দাঁড়ান এবং বলেন: এত হাহুতাশ ও কান্নাকাটি কেন? আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের কারো আয়ু কমাইনি, কারো জীবিকা ছিনিয়ে নেইনি এবং কারো ওপর যুলুম করিনি। তোমাদের অভিযোগ ও অসন্তোষ যদি আমার বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, তাহলে খোদার কসম, আমি আল্লাহর আদেশের অনুগত। আর যদি তোমাদের ক্ষোভ মৃত ব্যক্তির ওপর হয়ে থাকে, তাহলে তোমরা কাফের হয়ে গেছ। আমাকে তো আরো বহুবার আসতে হবে এবং এক সময় তোমাদের কেউ আর অবশিষ্ট থাকবেনা। রাসূল (সা) বলেন: আল্লাহর কসম, লোকেরা যদি তার এ ভাষণ শুনতো এবং তাকে দেখতো, তাহলে তাদের মৃতের কথা ভুলে যেত এবং নিজেদের জন্যই কেঁদে দিশেহারা হতো।

কারো বিপদের খবর শুনলে শোক বা সহানুভূতি প্রকাশ করা ছওয়াবের কাজ।

তিরমিযী শরীফে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন : “যে ব্যক্তি কোন বিপন্নের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে, তাহলে স্বয়ং ঐ বিপন্ন ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করলে যে ছওয়াব পায়, সেও তদ্রূপ ছওয়াব পাবে।” রাসূল (সা) আরো বলেছেন : সন্তানহারা মাতাকে সমবেদনা জ্ঞাপন ও সান্ত্বনা দান করলে আল্লাহ জান্নাতের মূল্যবান পোশাক পরাবেন।” (তিরমিযী)

উল্লেখ্য যে, শোক ও সমবেদনা প্রকাশ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সান্তনা দান, ধৈর্য ধারণের উপদেশ দান, তার দুঃখ, শোক ও বিপদের অনুভূতিকে হালকা করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তাই এটি মুস্তাহাব। এটি সৎ কাজের আদেশ দান অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা এবং সততা ও খোদাভীতির কাজে সহযোগিতার আওতাভুক্ত। সমবেদনা ও সান্ত্বনার সর্বোত্তম ভাষা রাসূল (সা) এর নিম্নোক্ত হাদীস থেকে জানা যায়। সহীহ আল বুখারী ও সহী মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর এক কন্যা রাসূল (সা) এর কাছে এই মর্মে খবর পাঠালো যে, তার এক পুত্র মৃত্যুর মুখোমুখি। রাসূল (সা) দূতকে বললেনঃ “যাও, ওকে (কন্যাকে) বল যে, আল্লাহ যা নেন, তা তাঁরই জিনিস, আর যা দেন, তাও তাঁরই জিনিস। সব কিছুই বান্দার কাছে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য রয়েছে। তাকে বল সে যেন ধৈর্য ধারণ ও সংযম অবলম্বন করে।”

এক সাহাবীকে দরবারে অনুপস্থিত দেখে রাসূল (সা) তাঁর কথা জিজ্ঞাসা করলেন। এক ব্যক্তি বললো : হে রাসূল! তার ছেলে মারা গেছে। রাসূল (সা) তার সাথে সাক্ষাত করে তার প্রতি সমবেদনা জানালেন। অতঃপর বললেন : “শোনো, তোমার ছেলে সারা জীবন তোমরা কাছে থাকুক-এটা তোমার বেশী পসন্দনীয়, না সে তোমার আগে গিয়ে জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকুক এবং তুমি মারা গেলে সে তোমার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দিক-এটা পসন্দনীয়? সাহাবী বললেন সে আমার আগে জান্নাতে গিয়ে আমার জন্য দরজা খুলে দিক-এটাই পসন্দীয়। রাসূল (সা) বললেন : তাহলে তোমার জন্য সেটিই নির্ধারিত রইল। সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন : এটা কি শুধু আমার জন্য? রাসূল (সা) বললেন : না, সকল মুসলমানের জন্য।” (আহমাদ, নাসায়ী)

হযরত আবু মূসা (রা) বর্ণনা করেন যে, একদিন রাসূল (সা) জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে দেখলেন এক মহিলা একটি কবরের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদছে। রাসূল (সা) তাকে বললেন : হে আল্লাহর বাঁদী, আল্লাহকে ভয় কর ও ধৈর্য ধারণ কর। মহিলা বললো: ওহে আল্লাহর বান্দা, আমি এক সন্তানহারা জননী। সুতরাং আমি যা করছি তা আমার জন্য অশোভন কিছু নয়।" রাসূল (সা) আবার বললেন: তুমি ধৈর্য ধারণ কর। মহিলা বললোঃ "যথেষ্ট হয়েছে। তোমার কথা শুনেছি। এবার তুমি যাও।" রাসূল (সা) তার কাছ থেকে চলে গেলেন। জনৈক সাহাবী মহিলাকে দেখে বললেন: এই ব্যক্তি তোমাকে কি বললো: মহিলা সব কথা জানালো। সাহাবী বললেন: তুমি জান ঐ ব্যক্তি কে? সে বললো: না। সাহাবী বললো: সর্বনাশ! উনিতো রাসূলুল্লাহ (সা)। মহিলা একথা শোনা মাত্র ছুটে গিয়ে রাসূল (সা) এর সাথে দেখা করলো এবং বললোঃ হে রাসূল! আমি ধৈর্য ধারণ করবো। রাসূল (সা) বললেনঃ "প্রথম আঘাতের সময়ই ধৈর্য ধারণ করা উচিত।” অর্থাৎ আকস্মিক বিপদ দেখা দেয়ার সময় ধৈর্য অবলম্বন করা উত্তম। নচেত পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবেই মন শান্ত হয়ে আসে।

সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আবু তালহা নামক সাহাবীর একটি ছেলে মারা যায়। সে সময় তিনি বিদেশে ছিলেন এবং ছেলের মৃত্যুর কথা মোটেই জানতেন না। অতঃপর তিনি যখন বাড়ী এলেন, তার স্ত্রী পরিবারের সবাইকে আগে ভাগে বলে দিলেন যে, "ছেলের মৃত্যুর কথা তোমরা কেউ এর কাছে ফাঁস করোনা। যখন যা বলতে হয় আমিই বলবো।" অতঃপর তিনি আবু তালহার খাবার দাবারের ব্যবস্থা করলেন। রাত্রে শোবার পর তাকে বললেন: ওহে আবু তালহা, কেউ যদি কাউকে কোন জিনিস ধার হিসাবে দেয়, অতঃপর তা ফেরত চায়, তাহেল তা ফেরত দিতে অস্বীকার করা কি তার উচিৎ? তালহা বললেন: না। তখন তার স্ত্রী সকল ঘটনা জানালেন এবং বললেনঃ "তাহলে তোমার ছেলের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ কর।" এ কথা শুনে আবু তালহা রাগান্বিত হলেন। তিনি বললেন: তুমি এত দেরীতে এটা আমাকে জানালে? অতঃপর তিনি রাসূল (সা) এর নিকট গিয়ে সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেন। শুনে রাসূল (সা) বললেন: "গত রাতে তোমাদের আচরণকে আল্লাহ অভিনন্দিত করেছেন।" হাদীসে আরো আছে যে, "ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কোন জিনিস কাউকে দেয়া হয়নি।"

বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত উসমান (রা) কে ঘাতকরা আঘাত করে, তখন তার দাড়ির ওপর দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকা অবস্থায় তিনি বলেনঃ “লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনা যালেমীন। হে আল্লাহ! আমি তাদের বিরুদ্ধে তোমার কাছে সাহায্য চাই এবং সকল বিষয়ে সাহায্য চাই, আর আমাকে তুমি যে পরীক্ষায় নিক্ষেপ করেছ, তাতে আমি ধৈর্য চাই।" জামে'তিরমিযীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেনঃ "যার দুটো অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান মারা যায়, সে জান্নাতে যাবে।" সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “অপ্রাপ্ত বয়স্ক মৃত সন্তানেরা জান্নাতের সর্বত্র অবাধে ঘুরে বেড়াবে। কেয়ামতের মাঠে তারা তাদের পিতামাতাকে পেয়ে তাদেরকে জাপটে ধরবে এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ না করিয়ে ছাড়বেনা।"

হযরত মালেক ইবনে দীনার (রহ) বলেন: যৌবনে আমি মদে আসক্ত ছিলাম। এই সময় আমার দুবছর বয়স্কা একটি মেয়ে মারা যায়। মেয়েটিকে আমি খুবই ভালোবাসতাম। তাই তার মৃত্যুতে আমি এত ব্যথিত হই যে, মদ পান অনেকটা কমিয়ে দেই। একদিন ঘুমিয়ে আমি স্বপ্নে দেখি, কিয়ামত শুরু হয়ে গেছে এবং আমি আমার কবর থেকে উঠেছি। সহসা দেখলাম বিরাটকায় একটি অজগর সাপ আমাকে তাড়া করছে। আমি তার ভয়ে ছুটে পালাতে লাগলাম। কিন্তু সাপটা তেড়ে আসতেই লাগলো। পথিমধ্যে সাদা কাপড় পরিহিত এক বৃদ্ধকে দেখে বললাম, "দয়া করে আমাকে আশ্রয় দিন। একটা সাপ আমাকে তেড়ে আসছে।" তিনি বললেন: "আমি দুর্বল। আর এই সাপ আমার চেয়ে সবল। তুমি ছুটে পালাতে থাক। আল্লাহ হয়তো তোমাকে রক্ষা করবেন।" আমি ছুটতে ছুটতে একটি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে উঠলাম। সেখানে দেখলাম কতকগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে খেলা করছে। তাদের প্রত্যেকের মুখ চাঁদের মত উজ্জ্বল। দেখলাম, তাদের মধ্যে আমার মেয়েটিও রয়েছে। সে আমাকে দেখে নিচে নেমে এল এবং একটি প্রদীপ সাপের দিকে ছুঁড়ে মারলো। এতে সাপটি পালিয়ে গেল। এরপর আমার মেয়ে আমার কোলে এসে কুরআনের এই আয়াত তেলাওয়াত করলোঃ "সেই সময় কি এখনো আসেনি যখন মুমিনদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে নিবিষ্ট হবে এবং তিনি যে সত্য বিধান নাযিল করেছেন তার প্রতি আকৃষ্ট হবে?" আমি বললাম: ওহে কচি মেয়ে! তুমি আবার কুরআনও জান নাকি? সে বললোঃ আব্বু! আমরা তোমাদের চেয়েও বেশী জানি। আমি বললাম: তোমার সাথীরা কারা এবং এখানে তোমরা কী কর? সে বললো: আমরা এখানে সবাই মুসলমান বাবামার মৃত শিশু। কিয়ামত পর্যন্ত এখানে বাবামায়ের আগমনের অপেক্ষায় থাকবো। আমি বললাম: ওহে আমার কচি মেয়ে! এই সাপটা আমার পিছু নিয়েছিল কেন জান? সে বললো: আব্বু, ওতো তোমার অসৎ কাজ। তুমি ওকে নিজেই শক্তিশালী বানিয়েছ। আমি বললামঃ ঐ বৃদ্ধ লোকটি কে? সে বললোঃ সে তো তোমার সৎ কাজ-যা তোমার অবহেলার কারণে দুর্বল হয়ে গেছে। তুমি তওবা কর। তাহলে নাজাত পাবে। এরপর আমার ঘুম ভেংগে যায় এবং আমি তৎক্ষণাৎ তওবা করি।

রাসূল (সা) বলেছেন: কোন বান্দার ওপর যখনই কোন বিপদ মুসিবত আসে, তখন তা হয় তাকে এমন কোন গুনাহ থেকে পবিত্র করার জন্য আসে, যাকে আল্লাহ ঐ বিপদ ছাড়া আর কোন ভাবে ক্ষমা করবেন না বলে স্থির করেছেন, নচেৎ তাকে এমন কোন উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করার জন্য আসে, যার জন্য আল্লাহ আর কোন বিকল্প রাখেননি।

উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি বিপদ মুসিবতে পড়ে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলবে এবং দোয়া করবে যে, হে আল্লাহ! আমাকে এই মুসিবতে আশ্রয় দাও এবং আমাকে এর চেয়ে ভালো বিকল্প দান কর, আল্লাহ তাকে উপযুক্ত পুরস্কার ও উত্তম বিকল্প দেবেন। হযরত উম্মে সালমা (রা) বলেন: "এরপর আমার স্বামী আবু সালমা মারা গেলে আমি অনুরূপ দোয়া করেছিলাম। ফলে আল্লাহ আমাকে রাসূলুল্লাহর (সা) ন্যায় স্বামী দান করলেন।" (সহীহ মুসলিম)

বিচারপতি শুরাইহ (রাহ) বলতেন: আমি কোন বিপদে পড়লে চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি। প্রথমবার এই জন্য যে, বিপদটা আরো মারাত্মক হতে পারতো কিন্তু হয়নি। দ্বিতীয়বার যখন আল্লাহ আমাকে সহ্য করার তওফীক দেন। তৃতীয়বার যখন আমাকে "ইন্নালিল্লাহ..." পড়ার সুযোগ দেন। এবং চতুর্থবার যখন দেখি যে বিপদটা আমার ইসলাম থেকে পদস্খলনের আকারে হয়নি।

পক্ষান্তরে কেউ যদি বিপদাপদে অস্থির হয়, নিজের মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করে, চুল ও কাপড় ছেঁড়ে, মুখে ও বুকে থাপ্পড় ও খামচি মারে এবং প্রবল জোরে চিৎকার করে কাঁদে বা ভাড়াটে দিয়ে কাঁদায়, তবে তার ওপর আল্লাহ অবশ্যই অসন্তুষ্ট হবেন। অভিসম্পাত করবেন এবং কোন কোন রেওয়ায়েত অনুসারে তার নেক আমল নষ্ট করে দেবেন। কেননা এসব তৎপরতা তাকদীর তথা আল্লাহর ফায়সালাকে অবিশ্বাস করার শামিল। বিশেষ করে নিজের মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করা এক ধরনের আত্মহত্যার চেষ্টা বটে।

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 বিদ্রোহ, গুন্ডামী ও দাম্ভিকতা

📄 বিদ্রোহ, গুন্ডামী ও দাম্ভিকতা


আল্লাহতায়ালা বলেছেন: "শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যারা মানুষের ওপর যুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে বেড়ায়। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরই জন্য নির্ধারিত রয়েছে।” (সূরা আশূরা)

রাসূল (সা) বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা আমার কাছে এই মর্মে ওহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, যাতে একজন অপরজনের ওপর আগ্রাসন না চালায় ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন না করে।" (সহীহ মুসলিম, সুনানু আবীদাউদ ও সুনানু ইবনে মাজা)

রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের মত এমন অপরাধ আর নাই যা আখিরাতের আযাব ছাড়াও দুনিয়াতেও আযাব অনিবার্য করে তোলে।" (জামে'তিরমিযী ও সুনানু ইবনু মাজাহ)

এই অপরাধের সবচেয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছিল কারন। সে ছিল হযরত মূসা (আ) এর আপন চাচাতো ভাই এবং ফিরাওনের অন্যতম উপদেষ্টা। তার বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তাকে তার সমস্ত সহায় সম্পদসহ জ্যান্ত মাটিতে পুতে ফেলেন। এই ঘটনার বিবরণ সূরা আল কাসাসে নিম্নরূপ দেয়া হয়েছে:
"নিশ্চয় কারূন মূসার গোত্রের লোক ছিল। সে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলো। আমি তাকে এমন ধনভান্ডার দিয়েছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, তার গোত্র তাকে বলেছিল যে, দম্ভ করোনা, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পসন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা কিছু দিয়েছেন, তাদ্বারা আখিরাতের বাসস্থান খুঁজে নাও। তবে দুনিয়া থেকে তোমার প্রাপ্য অংশ ভুলনা। অন্যের প্রতি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না। সে বললো: এ সম্পদ তো আমি নিজের জ্ঞানের সাহায্যে অর্জন করেছি। সে কি জানতোনা যে, আল্লাহ তার পূর্বে তার চেয়েও অধিক শক্তিশালী ও ধনশালী বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছেন? আর অপরাধীদেরকে তো তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবেনা। (কেননা তাদের আমলনামায় সবই লেখা থাকবে।) কারূন জাঁকজমক সহকারে আপন সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থিত হয়েছিল। তখন যারা পার্থিব জীবনের জন্য লালায়িত ছিল। তারা বলতে লাগলো: আহা কারূনকে যেরূপ সম্পদ দেয়া হয়েছে, তদ্রূপ আমাদেরকেও যদি দেয়া হতো! সে সত্যই খুব ভাগ্যবান। পক্ষান্তরে যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল, তারা বললো ধিক, তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই উত্তম। ধৈর্যশীল ব্যতীত আর কেউ তা পাবেনা। অতঃপর আমি কারূনকে ও তার প্রাসাদকে মাটির নিচে পুতে ফেললাম। আল্লাহর শান্তি থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে-এমন কোন দল তার পক্ষে ছিলনা এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলনা। আগের দিন যারা কারূনের মত হবার অভিলাষ পোষণ করেছিল, তারা (কারূনের পরিণতি দেখে) বলতে লাগলো, আসলে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা জীবিকা বাড়িয়ে দেন, যাকে ইচ্ছা কমিয়ে দেন। আল্লাহ আমাদের ওপর সদয় না হলে আমাদেরকেও তিনি মাটির নিচে পুতে দিতেন। আসলে কাফেররা সফলকাম হয়না।"

ইমাম ইবনুল জাওসী বলেন: কারন কিভাবে ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহ প্রকাশ করেছিল, সে সম্পর্কে একাধিক উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাসের মতে, সে জালিয়াতির মাধ্যমে জনৈকা দুশ্চরিত্রা মহিলাকে হযরত মূসার (আ) এর বিরুদ্ধে এই মর্মে দুর্নাম রটাতে প্ররোচিত করে যে, তিনি তার সাথে ব্যভিচার করেছেন। হযরত মূসা (আ) ঐ মহিলাকে শপথপূর্বক সত্য কথা বলতে বাধ্য করলে সে ফাঁস করে দেয় যে, কারূনের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই তাকে এই অপবাদ রটাতে প্ররোচিত করেছে। যুহহাকের ও কাতাদার মতে, কারুন আল্লাহর নবীকে অস্বীকার করে কুফরীতে লিপ্ত হয়। মাওয়ার্দীর মতে, সে ফেরাউনের দরবারে চাকুরী করতো এবং সেই খুঁটির জোরে আপন গোত্র বনী ইসরাইলের ওপর নির্যাতন চালাতো।

হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আ) এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনায় তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বদদোয়া করলে আল্লাহ বলেনঃ হে মূসা! আমি মাটিকে নির্দেশ দিয়েছি তোমার আদেশ মানতে। তুমি তাকে যা ইচ্ছা আদেশ দাও। মূসা (আ) আদেশ দিলেন: হে মাটি, কারূনকে গ্রাস কর। তৎক্ষণাৎ কারুনের খাট মাটিতে অদৃশ্য হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে কারূন মূসা (আ) এর দয়া ভিক্ষা করলো। কিন্তু মূসা (আ) পুনরায় মাটিকে আদেশ দিলেন: ওকে গ্রাস কর। এবার তার পা মাটির নিচে তলিয়ে গেল। এভাবে তিনি বারবার আদেশ দিতে দিতে কারূন সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল।

(পবিত্র আল কুরআনে বর্ণিত উপরোক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে কারূনের বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের যে দিকগুলো প্রকাশ পেয়েছে, তো হলো: (১) ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুর সাথে যোগসাজশ করে মুসলমানদের ও স্বজাতির স্বার্থের ক্ষতি সাধন (২) নিজের অর্জিত সম্পদকে আল্লাহর অনুগ্রহের দান মনে করার পরিবর্তে নিজের জ্ঞানের ফল ভেবে বাহাদুরী প্রদর্শন (৩) নিজ সম্পদে সমাজের দরিদ্র জনগণের যে অধিকার রয়েছে, তা উপলব্ধি না করা ও দিতে অস্বীকার করা, উপরন্তু জনগণকে নিজের বিত্তবৈভবের জৌলুস দেখিয়ে বেড়ানো, যাতে বঞ্চিতদের মানসিক যন্ত্রণা আরো বেড়ে যায় এবং তাদের বঞ্চনার অনুভূতি আরো তীব্রতর হয়। (ঘ) কার্পণ্য লাগামহীন পুঁজিবাদ, দাম্ভিক সুলভ ও একচেটিয়া ভোগবাদী মানসিকতা। - অনুবাদক)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00