📄 বিনা অপরাধে কোন মুসলমানকে অভিশাপ ও গালি দেয়া
রাসূল (সা) বলেছেন : "মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকী ও তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া কুফরী।” (আবু দাউদ ব্যতীত সকল সহীহ হাদীস গ্রন্থ) তিনি আরো বলেছেন যে, "কোন মুমিনকে অভিশাপ দেয়া তাকে হত্যা করার শামিল।" (ইবনে মাজা ব্যতীত সকল সহীহ হাদীস গ্রন্থ) সহীহ মুসলিমে বর্ণিত যে, রাসূল (সা) বলেছেন, "অভিশাপকারীরা কিয়ামতের দিন কারো সুপারিশকারীও হবেনা, সাক্ষীও হবেনা।" হাদীসে আরো আছে : "মুমিন কখনো অভিশাপকারী, কটুভাষী, অশ্লীলভাষী ও অশালীনভাষী হতে পারেনা।" সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে রাসূল (সা) বলেছেন: "কোন বান্দা যখন কাউকে অভিশাপ করে (বদ দোয়াও অভিশাপের কাছাকাছি- অনুবাদক) তখন তা আকাশে উঠে যায়। কিন্তু আকাশের দরজা বন্ধ করে দিয়ে তার প্রবেশ রোধ করা হয়। অতঃপর তা পৃথিবীতে নেমে আসে। কিন্তু তার জন্য পৃথিবীর পথ রুদ্ধ করা হয়। অতঃপর তা ডানে ও বামে ছুটাছুটি করতে থাকে। যখন বেরুবার কোন পথ পায়না, তখন যার ওপর অভিশাপ বর্ষণ করা হয়েছে, সে তার উপযুক্ত হলে তার ওপর কার্যকর হয়, নচেত স্বয়ং অভিশাপকারীর ওপরই কার্যকর হয়।" হযরত ইমরান বিন হাসীন বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূল (সা) কোন সফরে যান। সেই সফরে এক আনসারী মহিলা স্বীয় বাহন উটকে উচ্চস্বরে গালাগালি করে উঠলো ও অভিশাপ দিল। এটা শুনতে পেয়ে রাসূল (সা) বললেন: "এই উটের পিঠে যে সব মালপত্র আছে তা নামাও এবং উটটাকে ছেড়ে দাও। কেননা সে তো অভিশপ্ত। ইমরান বলেন: আমি যেন এখনো মহিলাটিকে দেখতে পাচ্ছি যে, অসহায়ভাবে লোকদের সাথে হেঁটে চলছে, কেউ তাকে সাহায্য করতে আসছেনা।" (সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: সবচেয়ে খারাপ সুদ হলো, একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অপমানজনক ভাষা প্রয়োগ করা।
অবশ্য কতিপয় সুনির্দিষ্ট পাপ কার্যে জড়িত ব্যক্তিকে অভিশাপ দেয়া যায়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "অত্যাচারীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ!... মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।” রাসূল (সা) বিভিন্ন ব্যক্তিকে, যথা সুদের সাথে জড়িত, তাহলীলের সাথে জড়িত এবং ঘুষ, মদ ও জুয়ার সাথে জড়িত ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করেছেন, যারা চুলের সাথে চুল গিরে দিয়ে বাঁধে, ভ্রুর চুল ফেলে দেয়, বিপদে ঘাবড়ে গিয়ে চিৎকার ও আহাজারী করে, চুল কামায় ও কাপড় ছিড়ে ফেলে দেয়, তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। তিনি চিত্রকর, ভাস্কর ও যারা অন্যের জমি দখল করার জন্য সীমানার চিহ্ন তুলে ফেলে বা পাল্টে ফেলে, তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। অনুরূপভাবে তিনি নিজের পিতামাতার ওপর অভিশাপ বর্ষণকারী, গালিগালাজ বর্ষণকারী, কোন অন্ধ ব্যক্তিকে পথভ্রষ্টকারী, জীবজন্তুর সাথে কুকর্মকারী, সমকামী, নিজ স্ত্রীর সাথে পশ্চাদ্বারে সংগমকারী, ভাগ্য গণনাকারী ও তার কাছে গমনকারী, মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চস্বরে ক্রন্দনকারীনী এবং পেশাদার ক্রন্দনকারীনী ও তার সহকর্মী, জনগণ অপছন্দ করা সত্ত্বেও জোরপূর্বক তাদের নেতা বা শাসকের পদ দখলকারী, স্বামী অসন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় যে স্ত্রী রাত কাটিয়ে দিয়েছে, আযান শুনতে পেয়েও যে ব্যক্তি বিনা ওযরে জামায়াতে উপস্থিত হয়না, আল্লাহ ছাড়া আর কারো নামে জীবজন্তু জবাইকারী, চোর, সাহাবীগণকে গালিগালাজকারী, পুরুষের বেশভূষা ও সাদৃশ্যধারনকারী স্ত্রী লোক এবং স্ত্রীলোকের বেশভূষা ও সাদৃশ্য ধারনকারী পুরুষ, মানুষের চলাচলের পথে মলমূত্র ত্যাগকারী, হাতে মেহেদী ও চোখে সুর্মা ব্যবহারে বিমুখ (অর্থাৎ সৌন্দর্য চর্চার মাধ্যমে স্বামীকে খুশী রাখতে অনাগ্রহী) রমনী, স্বামী স্ত্রী ও চাকর-মনিবের সম্পর্ক বিনষ্টকারী, ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সংগমকারী, কোন মানুষকে অস্ত্র দেখিয়ে ভীতি প্রদর্শনকারী, যাকাত দিতে অস্বীকারকারী, নিজের পিতা নয় এমন কাউকে পিতা এবং নিজের মনিব নয় এমন কাউকে মনিব পরিচয় দানকারী, কোন জীবজন্তুর গায়ে তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে দাগ অংকনকারী, শরীয়তের বিধান অনুসারে কোন অপরাধীর বিরুদ্ধে বিচারক কর্তৃক শাস্তি ঘোষণা করার সম্ভাবনা দেখে তা থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য সুপারিশকারী ও সুপারিশ গ্রহণকারী, স্বামীগৃহ থেকে স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে কোথাও গমনকারীনী মহিলা, স্বামীর বিছানা ছেড়ে রাত যাপনকারিনী মহিলা, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সৎকাজে আদেশ দান অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করণে বিমুখ, মদ পানকারী ও মদের উৎপাদন, ক্রয়বিক্রয়, পরিবহন ও এইসবের সাথে জড়িত ও সহযোগিতাকারীকে অভিশাপ দিয়েছেন। অপর হাদীসে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: ছয় ব্যক্তিকে আমি অভিশাপ দিয়েছি, আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন এবং প্রত্যেক নবী অভিশাপ দিয়েছেন, আর প্রত্যেক নবীর দোয়া কবুল হওয়া নিশ্চিত।
সেই ছয় ব্যক্তি হলো: আল্লাহর নির্ধারিত অদৃষ্টকে অস্বীকারকারী, আল্লাহর কিতাবে কোন কিছু সংযোজনকারী, আল্লাহ যাদেরকে সম্মানিত করেছেন তাদেরকে অপমানিত করা এবং আল্লাহ যাদেরকে অপমানিত করেছেন তাদেরকে সম্মানিত করার জন্য জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হালাল প্রতিপন্নকারী এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তাকে হারাম প্রতিপন্নকারী এবং আমার প্রদর্শিত পথ বর্জনকারী। এছাড়া রাসূল (সা) প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারকারীকে, হস্তমৈথুনকারীকে, কোন মহিলা ও তার কন্যাকে এক সাথে বিবাহকারীকে, ঘুষখোর, ঘুষদাতা ও ঘুষের দালালকে, বিদ্যা গোপনকারীকে, খাদ্য গোলাজাতকারীকে, কোন মুসলমানের অপমানকারীকে, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মজলুম মুসলমানকে যে সাহায্য করে না তাকে, নির্দয় শাসককে, বিয়ে না করার জন্য প্রতিজ্ঞাকারী পুরুষ ও স্ত্রীকে এবং কোন নির্জন প্রান্তরে বিনা প্রয়োজনে একাকী গমনকারীকেও অভিসম্পাত করেছেন।
নিরপরাধ মুসলমানকে অভিশাপ দেয়া সর্বসম্মতভাবে হারাম। আর অসচ্চরিত্র লোকদেরকে নামোল্লেখ ব্যতিরেকে অভিসম্পাত করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। যেমন কেউ যদি বলে, অত্যাচারীদের ওপর বা মিথ্যাবাদীদের ওপর বা কাফেরদের ওপর অভিসম্পাত, তবে তা সর্বসম্মতভাবে জায়েয। পক্ষান্তরে কোন পাপ কাজে জড়িত ব্যক্তিকে নামোল্লেখপূর্বক অভিসম্পাত করা সম্পর্কে মতভেদ আছে। অনেকের মতে এটা জায়েয। কিন্তু ইমাম গাযযালীর মতে, যে ব্যক্তি তওবা ছাড়া মারা গেছে বলে নিশ্চিত জানা যায়, যেমন আবু লাহাব, আবু জেহেল, ফিরাউন, হামান প্রমুখ কেবলমাত্র তাদের ওপরই অভিশাপ করা জায়েয। কারো অকল্যাণ কামনা করে বদ দোয়া করাও অভিশাপের কাছাকাছি। যে যে ক্ষেত্রে অভিশাপ অবৈধ, সেই সেই ক্ষেত্রে বদ দোয়াও অবৈধ। এমনকি যালেমের বিরুদ্ধে বদ দোয়া করা অনুচিত তবে প্রতিরোধের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলে মযলুম স্বয়ং যালেমের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে পারেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও অভিসম্পাত করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
📄 ওয়াদা খেলাপি করা
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "তোমরা ওয়াদা পালন কর। নিশ্চয়ই ওয়াদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” যুজ্জাজ বলেন: আল্লাহ যা কিছু করতে আদেশ করেছেন এবং যা কিছু করতে নিষেধ করেছেন, তার সবই ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত। কেননা এসব পালনে মুসলমানরা আল্লাহর সাথে ওয়াদাবদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা চুক্তি পালন কর।" হযরত ইবনে আব্বাস বলেন: চুক্তির অর্থ যা কিছু কুরআনে হালাল ও হারাম করা হয়েছে এবং যা কিছু নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত করা হয়েছে। মুকাতিল বলেন: চুক্তি অর্থ কুরআনের মাধ্যমে বান্দার ওপর আরোপিত হালাল ও হারাম এবং বৈধ ও অবৈধ সংক্রান্ত আল্লাহর বিধান এবং মুসলমান ও কাফেরদের মধ্যে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পাদিত যাবতীয় চুক্তি, অংগীকার ও প্রতিশ্রুতি।
রাসূল (সা) বলেছেন: চারটি দোষ যার ভেতরে থাকবে সে পুরোপুরি মুনাফিক। আর যার ভেতরে এর কোন একটি দোষ থাকবে, তার মধ্যে মুনাফেকীর একটা উপাদান থাকবে যতক্ষণ সে তা বর্জন না করে: যখন সে কথা বলে তখন মিথ্যা বলে, যখন তার কাছে কোন জিনিস আমানত তথা গচ্ছিত রাখা হয়, তখন সে তাতে খেয়ানত করে। যখন সে কোন অংগীকার করে বা প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন সে তা ভংগ করে এবং যখন কারো সাথে তার বিরোধ দেখা দেয়, তখন সে সীমা ছাড়িয়ে যায়। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) একটি হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন: তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কিয়ামতের দিন আমি বাদী হব : যে ব্যক্তি ওয়াদা করে তার খেলাপ করেছে, যে ব্যক্তি কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রী করে তার মূল্য ভোগ করে এবং যে ব্যক্তি কোন কর্মচারী নিয়োগ করে তার কাছ থেকে পুরো কাজ আদায় করে কিন্তু তার পারিশ্রমিক দেয় না। (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেন: যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা যায় যে, সে কোন বাইয়াতে (অংগীকারে) আবদ্ধ নয়, সে জাহেলী মৃত্যু বরণ করে। (সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেন: "যে ব্যক্তি কোন নেতার আনুগত্যের অংগীকার করে, তার উচিত সাধ্যমত তার আনুগত্য করা।" (সহীহ মুসলিম)
📄 ভবিষ্যদ্বক্তা ও জ্যোতিষীর কথা বিশ্বাস করা
আল্লাহ বলেন: “যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করোনা। নিশ্চয় চোখ, কান হৃদয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" ইমাম ওয়াহেদী এ আয়াতের তাফসীর প্রসংগে বলেন: অর্থাৎ তুমি যা জানোনা তা বলোনা। কাতাদা বলেন: অর্থাৎ তুমি যা দেখনি তা দেখেছ, যা শোননি তা শুনেছ এবং যা জানোনি তা জেনেছ বলে দাবী করোনা। এক কথায়, কোন ব্যাপারে যা জানোনা তা বলো না। হযরত ইবনে আব্বাস আয়াতের শেষাংশের ব্যাখ্যায় বলেন: অর্থাৎ চোখ কান ও হৃদয় কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সে কথা আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন। এ কথার মাধ্যমে যা দেখা হারাম তা দেখতে, যা শোনা হারাম তা শুনতে এবং যে ইচ্ছা পোষণ করা নিষেধ তা পোষণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। অন্যত্র আল্লাহ বলেন: "আল্লাহই একমাত্র অদৃশ্যজ্ঞ। তিনি তার অদৃশ্য জ্ঞান নিজের মনোনীত কোন রাসূলকে ব্যতীত আর কাউকে দেন না।"
ইমাম ইবনুল জাওযী বলেন: অর্থাৎ অদৃশ্য বা গায়েবের জ্ঞানের ওপর আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকার। এ অধিকারে তার কোন শরীক নেই। এই গায়েবের জ্ঞান তিনি কোন মনোনীত রাসূল ছাড়া কাউকে দেননা। শুধুমাত্র রাসূলকে যতটুকু গায়েবের জ্ঞান দিতে চান দেন। কেননা এই গায়েব বা অদৃশ্যের তথ্য জানানোই নবীর নবুয়তের প্রমাণ। এ থেকে বুঝা যায়, যে ব্যক্তি নক্ষত্রকে অদৃশ্য জ্ঞানের উৎস মনে করে সে কাফের। রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি কোন জ্যোতিষী বা ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে যায় এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মাদ (সা) এর ওপর নাযিলকৃত কিতাব ও ওহিকে অস্বীকার করে। (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ) এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন: আমার বান্দাদের ভেতর কেউ হয় মুমিন এবং কেউ হয় কাফের। যে বলে যে, আল্লাহর অনুগ্রহে বৃষ্টি হয়েছে, সে আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রে অবিশ্বাসী। আর যে বলে যে, বৃষ্টি হয়েছে অমুক ধরনের আবহাওয়ার কারণে বা বাতাসের কারণে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী এবং নক্ষত্রে বিশ্বাসী।
অভিজ্ঞ মনীষীগণ বলেছেন: বিশেষ ধরনের আবহাওয়ার কারণে বৃষ্টি হয়েছে একথা বলার সময় কোন মুসলমান যদি মনে করে যে, বিশেষ ধরনের আবহাওয়াই বৃষ্টির স্রষ্টা, তাহলে সে নিঃসন্দেহে কাফের ও মুরতাদ হয়ে যায়। আর যদি কেউ মনে করে যে, বিশেষ ধরনের আবহাওয়া বৃষ্টির আলামত বা লক্ষণ মাত্র, তাহলে কাফের হবেনা। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে এরূপ না বলাই ভালো।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: যে ব্যক্তি কোন গণকের কথায় বিশ্বাস করে, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হয়না। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের এক হাদীসে আছে যে, একদল লোক রাসূল (সা) কে গণক ও জ্যোতিষীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন। "ও সব কিছুই নয়।" "ওসব কিছুই নয়।” তখন কয়েকজন বললেন: হে রাসূল! অমুক জ্যোতিষী না অমুক কথা বলেছে? রাসূল (সা) বললেন: "কিছু সত্য কথা জিনেরা সংগ্রহ করে, অতঃপর তা তার মনিব মানুষটির কানে কানে বলে দেয়। অতঃপর সে তার সাথে শত শত মিথ্যা সংযজিত করে প্রচার করে।" বুখারী শরীফের এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: ফেরেশতারা মেঘের ভেতরে নেমে আসে অতঃপর যে সব বিষয়ের যে ফায়সালা হয়ে গেছে তা নিয়ে আলোচনা করে। শয়তান এই সব কথা আড়ি পেতে শুনে জ্যোতিষীদের কাছে পৌছায়। অতঃপর জ্যোতিষীরা তার সাথে শত শত মিথ্যা যোগ করে।"
রাসূল (সা) আরো বলেন: “পাখির উড্ডয়নের গতি ও অন্যান্য আলামত দ্বারা শুভাশুভ নির্ণয় করা সুস্পষ্ট শিরক।"
📄 স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের অধিকার লংঘন
(ক) স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অসদাচরণ
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যে সব স্ত্রী অবাধ্যতা প্রকাশ করবে বলে তোমরা আশংকা কর, তাদেরকে উপদেশ দাও, বিছানায় তাদের থেকে পৃথক হও, এবং মারধর কর। এতে যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আর কোন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা চিন্তা করোনা।"
ইমাম ওয়াহেদী বলেন: এখানে অবাধ্যতার অর্থ হলো স্বামীর অবাধ্য হওয়া এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করা। আতা বলেন: স্ত্রী স্বামীর প্রতি এ যাবত যে ধরনের আনুগত্য দেখিয়ে আসছিল তা পাল্টে যাওয়া এবং স্বামীকে বিনা ওযরে যৌন মিলনে বাধা দান এর পর্যায়ভুক্ত। "উপদেশ দাও" অর্থ হলো, আল্লাহর কিতার ও তাঁর আদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়া। ইবনে আব্বাস বলেন: বিছানায় পৃথক হওয়ার অর্থ হলো, স্ত্রীর দিকে পিঠ দিয়ে শয়ন করা এবং কথা না বলা। শা'বী ও মুজাহিদের মতে, এর অর্থ বিছানা একেবারেই পৃথক করে ফেলা এবং স্ত্রীর সাথে এক বিছানায় শয়ন না করা। আর "মারধর কর" অর্থ মৃদু মারধর করা, যাতে খুব বেশী ব্যথা না পায়। ইবনে আব্বাসের মতে খালি হাতে কিল থাপ্পড় ইত্যাদি এর বেশী নয়।
রাসূল (সা) বলেছেনঃ "যখন কোন স্বামী স্বীয় স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে এবং সে সেই ডাকে সাড়া দেয়না, তখন ভোর হওয়া অবধি তার ওপর ফেরেশতারা অভিশাপ বর্ষণ করতে থাকে।" (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
অপর হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: তিন ব্যক্তির নামায এবং কোন সৎকাজ কবুল হয়না; পালিয়ে যাওয়া গোলাম বা চাকর যতক্ষণ ফিরে না আসে, স্বামীর অবাধ্য স্ত্রী, যতক্ষণ স্বামী তার ওপর সন্তুষ্ট না হয়, এবং মদ খেয়ে মাতাল হওয়া ব্যক্তি যতক্ষণ তার হুঁশ ফিরে না আসে।"
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: কিয়ামতের দিন নারীকে সর্ব প্রথম যে প্রশ্ন করা হবে তা হবে তার নামায ও স্বামী সম্পর্কে। রাসূল (সা) আরো বলেন: কোন মুমিন স্ত্রীর পক্ষে তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোযা রাখা এবং তার ঘরে অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া বৈধ নয়। (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: আমি যদি কাউকে কারো সামনে সিজদার আদেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে স্বামীর সামনে সিজদা করার আদেশ দিতাম। (তিরমিযী) একবার এক মহিলা রাসূলের (সা) নিকট স্বীয় স্বামীর কথা উল্লেখ করলে তিনি বললেন: "তুমি তার তুলনায় কতটুকু মর্যদার অধিকারী তা ভেবে দেখ। সে তোমার বেহেশত ও দোজখ।” (নাসায়ী) রাসূল (সা) আবো বলেনঃ "স্ত্রী সব সময়ই স্বামীর মুখাপেক্ষী। তথাপি যে স্ত্রী স্বামীর কৃতজ্ঞ নয়, আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না।” (নাসায়ী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "স্ত্রী যখন স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার গৃহ ত্যাগ করে, তখন সে ফিরে না আসা পর্যন্ত ফেরেশতারা তারপর অভিসম্পাত করতে থাকে।” (তাবরানী) রাসূল (সা) আরো বলেন: "স্বামীকে সন্তুষ্ট রেখে যে স্ত্রী মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (তিরমিযী)
তবে স্বামীকে কোন হারাম কাজে সহযোগিতা করা স্ত্রীর পক্ষে বৈধ নয়, এবং অবৈধ কাজে সহযোগিতা না করায় স্বামী অসন্তুষ্ট হলেও তার জন্য সে গুনাহগার হবে না। বৈধ সীমার মধ্যে স্বামীর পরিপূর্ণ আনুগত্য করা স্ত্রীর জন্য ওয়াজিব। স্বামীর অনুমতি ছাড়া নিজেকে এমন কোন কাজে নিয়োজিত করা বৈধ নয়, যার ফলে স্বামী তার সাহচর্য থেকে সাময়িকভাবে বঞ্চিত হয়। স্বামীর ধনসম্পদে বিনা অনুমতিতে হস্তক্ষেপ করা স্ত্রীর বৈধ নয়। নিজের অধিকারের ওপর স্বামীর অধিকারকে এবং নিজের আত্মীয়দের অধিকারের ওপর স্বামীর আত্মীয়দের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়া স্ত্রীর পক্ষে অপরিহার্য। সব সময় পূর্ণ পরিচ্ছন্নতা সহকারে স্বামীর ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। নিজের সৌন্দর্যের জন্য তার ওপর বড়াই করা এবং স্বামীর মধ্যে বিদঘুটে কিছু থাকলে তার জন্য তাকে দোষারোপ করা বাঞ্ছনীয় নয়।
স্ত্রীর উচিত স্বামীর সামনে সর্বদা লজ্জাশীলা থাকা, তার সামনে চোখ নামিয়ে রাখা, তার আদেশের অনুগত থাকা, তার কথা মনোযোগের সাথে শোনা, তার কথা বলার সময় চুপ থাকা, তার গৃহে আগমনের সময় দরজায় এগিয়ে গিয়ে অভ্যর্থনা জানানো, তার বাইরে যাওয়ার সময় দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়া ও কিছুক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা, সে যা যা অপছন্দ করে তা থেকে দূরে থাকা, তার ঘুমানোর সময় তার কাছে উপস্থিত থাকা, তার অনুপস্থিতিতে তার গৃহ, সম্পত্তি ও নিজের সতিত্বকে আমানত হিসাবে সংরক্ষণ করা, নিয়মিত দাঁত মাজা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ও তার কাছে নিজেকে সব সময় সুসজ্জিত ও সুবাসিত রাখা, তার অসাক্ষাতে তার কোন নিন্দা না করা। তার আত্মীয়স্বজনের যত্ন করা এবং তার ক্ষুদ্র উপকারকে বড় করে দেখা।
রাসূল (সা) বলেছেনঃ "স্ত্রী যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিক ঠিক মত পড়বে, রমযান মাসের রোযা ঠিকমত রাখবে এবং স্বামীর অনুগত থাকবে, তখন সে যে দরজা দিয়েই জান্নাতে প্রবেশ করতে চাইবে, করতে পারবে।” (আহমাদ, তাবরানী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "স্বামীর অনুগত স্ত্রীর জন্য পাখি, মাছ, সূর্য, চন্দ্র ও ফেরেশতারা পর্যন্ত আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চায়। আর স্বামীর অবাধ্য স্ত্রীর জন্য আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে অভিসম্পাত আসে। যে স্ত্রী স্বামীর সামনে মুখ কালো করে থাকে, সে পুনরায় হাসিমুখ হয়ে স্বামীকে সন্তুষ্ট না করা পর্যন্ত আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকবেন। যে স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ীর বাইরে যাবে সে ফিরে না আসা পর্যন্ত ফেরেশতাদের অভিশাপ কুড়াতে থাকবে।"
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: চার রকমের নারী জান্নাতে এবং চার রকমের নারী জাহান্নামে যাবে: আল্লাহর ও স্বামীর অনুগত সতী নারী, অধিক সন্তান উৎপাদনে সক্ষম, ধৈর্যশীলা ও অল্পে তুষ্টা নারী, লজ্জাশীলা নারী, যে স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সতিত্ব ও স্বামীর সম্পদ সংরক্ষণ করে এবং তার উপস্থিতিতে তার সাথে বাকসংযম করে এবং শিশু সন্তানসহ বিধবা হওয়ার পর যে নারী সন্তাদেরকে আঁকড়ে ধরে থাকে এবং তাদের ক্ষতির আশংকায় বিয়ে না করে তাদের লালন পালনে নিয়োজিত থাকে। আর যে চার রকমের নারী জাহান্নামী হবে তারা হচ্ছেঃ (১) যে নারী স্বামীর প্রতি কটু বাক্য বর্ষণ ও ভর্ৎসনা করে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সতিত্ব রক্ষা করেনা, আর সে উপস্থিত থাকলে তাকে কটুবাক্য দ্বারা কষ্ট দেয় (২) যে নারী স্বামীর ওপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপায় এবং যা তার ক্ষমতার বাইরে, তা তাকে করতে বাধ্য করে। (৩) যে নারী পর পুরুষ থেকে নিজেকে ঢেকে রাখেনা (পর্দার বিধান মেনে চলে না) এবং সাজসজ্জা করে ও রূপের প্রদর্শনী করে বাইরে বের হয় (৪) যে নারীর পানাহার ও ঘুম ছাড়া আর কোন কিছুতেই আগ্রহ নেই এবং নামায আল্লাহ রাসূল ও স্বামীর আনুগত্য করতে চায়না। এসব দোষ যে নারীর রয়েছে, সে যখন স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে বাইরে বের হয়, তখন সে অভিশাপ কুড়ায় ও জাহান্নামের যোগ্য হয়। কেবলমাত্র তওবা দ্বারা সে এই পরিণাম থেকে রক্ষা পেতে পারে।
রাসূল (সা) বলেছেন: (মেরাজের রাতে) আমি জাহান্নাম পরিদর্শন করেছি। দেখেছি যে, সেখানকার অধিকাংশ অধিবাসী মহিলা। কারণ তারা আল্লাহ, রাসূল ও স্বামীর আনুগত্য কম করে এবং "তাবাররুজ” করে। তাবাররুজ হলো, বাইরে চলাফেরার সময় সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরা, অধিক পরিমাণে সাজসজ্জা করা এবং অধিক সৌন্দর্য প্রদর্শনী করে জনসাধারণকে প্রলুব্ধ করা, অন্য কথায় বেপর্দায় চলাফেরার নামই তাবাররুজ। রাসূল (সা) বলেছেন: নারী পর্দায় থাকার জন্যই সৃষ্ট। সে যখন ঘর থেকে বের হয়, তখন শয়তান তাকে অভিনন্দন জানায়।
হাদীসে আছে: নারীরা যতক্ষণ আপন গৃহে অবস্থান করে ততক্ষণই আল্লাহর চোখে সবচেয়ে মর্যাদাশীলা থাকে। হাদীসে আরো আছে যে, নারী আপন গৃহে অবস্থান, আল্লাহর ইবাদাত ও স্বামীর আনুগত্যের মাধ্যমে যতটা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে, ততটা আর কোনভাবে করতে পারে না। একবার হযরত আলী (রা) স্বীয় স্ত্রী হযরত ফাতিমা (রা) কে জিজ্ঞাসা করলেন: নারীর মংগল কিসে? হযরত ফাতিমা বললেন: 'বেগানা পুরুষের প্রতি দৃষ্টিপাত না করা এবং বেগানা পুরুষকে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করার সুযোগ না দেয়ার মধ্যেই নারীর মংগল নিহিত।'
হযরত আলী (রা) বলতেন: 'তোমাদের কি লজ্জা নেই, তোমাদের কি আত্মসম্মানবোধ নেই যে, তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে বাইরে যেতে দাও, আর তারা পরপুরুষদের দিকে তাকায় এবং পরপুরুষেরাও তাদের দিকে তাকায়? আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাতে বর্ণিত আছে যে, একদিন হযরত আয়িশা (রা) ও হযরত হাফসা (রা) রাসূল (সা) এর নিকট উপস্থিত ছিলো। এই সময় অন্ধ সাহাবী ইবনে উম্মে মাকতুম এলেন। রাসূল (সা) তাঁর স্ত্রীদ্বয়কে বললেন: তোমরা তার কাছে থেকে পর্দায় চলে যাও। তাঁরা উভয়ে বললেন: উনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখতেও পাননা, চেনেনও না। রাসূল (সা) বললেন: তোমরা দু'জনও অন্ধ নাকি? তোমরা কি তাকে দেখতে পাওনা?
এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, পুরুষ ও নারী উভয়েই পরস্পরের প্রতি তাকানো থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা সূরা নূরে বলেছেন: “মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা যেন নিজ নিজ দৃষ্টি সংযত রাখে ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। . . . আর মুমিন নারীদেরকে বল, তারা যেন নিজ নিজ দৃষ্টি সংযত রাখে ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।"
হযরত আলী (রা) বলেন: একবার আমি ও ফাতিমা রাসূল (সা) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, তিনি অত্যন্ত অধীরভাবে কাঁদছেন। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আপনার জন্য আমার পিতামাতার প্রাণ উৎসর্গ হোক! আপনি কি জন্য কাঁদছেন? রাসূল (সা) বললেন: "হে আলী! মিরাজের রাত্রে আমি আমার উম্মাতের নারীদেরকে নানা রকমের আযাব ভোগ করতে দেখেছি। সেই কঠিন আযাবের কথা মনে করে কাঁদছি। আমি দেখেছি, এক মহিলাকে তার চুল দিয়ে জাহান্নামের আগুনের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে তার মাথার ঘিলু টগবগ করে ফুটছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম, তার জিহবা টেনে লম্বা করে তা দিয়ে তাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং তার গলায় গরম পানি ঢালা হচ্ছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম, তার দুই পা দুই স্তনের সাথে এবং দুই হাত কপালের চুলের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম তার স্তনে রশি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম, তার মাথা শুকরের মাথার মত। তার দেহ গাধার দেহের মত এবং তাকে হাজার হাজার রকমের শাস্তি দেয়া হচ্ছে। আর এক মহিলাকে দেখলাম, সে কুকুরের আকৃতি পেয়েছে। আগুন তার মুখ দিয়ে ঢুকছে এবং মলদ্বার দিয়ে বেরুচ্ছে। আর ফেরেশতারা তার মাথায় লোহার হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে।
হযরত ফাতিমা উঠে দাঁড়ালেন এবং এইসব মহিলার এইসব আযাবের কারণ কি জানতে চাইলেন। রাসূল (সা) বললেন: "হে ফাতিমা! যে মহিলাকে চুল দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সে পর পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজের মাথাকে ঢেকে রাখতোনা। যে মহিলাকে তার জিহ্বা দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সে প্রতিবেশীকে কটুবাক্য দ্বারা কষ্ট দিত। স্তনে রশি দিয়ে বেঁধে যাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সে স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সতিত্ব সংরক্ষণ করতোনা, অর্থাৎ ব্যভিচারীনী ছিল। আর যার দুই পা দুই স্তনের সাথে এবং দুই হাত কপালের চুলের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সে সহবাস ও ঋতুজনিত অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জন করতোনা এবং নামায নিয়ে তামাশা করতো। যার মাথা শুকরের মত ও দেহ গাধার মত হয়ে গেছে, সে ছিল চোগলখোর ও মিথ্যাবাদী। আর যে কুকুরের আকারে রূপান্তরিত হয়েছে, সে ছিল হিংসুটে এবং দান করে খোঁটা দিত। রাসূল (সা) বলেছেন: কোন নারী নিজের স্বামীকে কষ্ট দিলে জান্নাতের হুর উক্ত নারীকে অভিসম্পাত দেয়।
উল্লেখ আছে যে, পিতামাতা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনকে দেখার জন্য এবং অন্যান্য জরুরী প্রয়োজনে স্বামীর অনুমতি নিয়ে এবং পর্দা সহকারে বাইরে যাওয়াতে কোন দোষ নেই।
(খ) স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর অধিকার লংঘন:
স্ত্রী যেমন স্বামীর আনুগত্য করতে ও তাকে সন্তুষ্ট রাখতে আদিষ্ট, তেমনি স্বামীও আদিষ্ট স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ ও বিনম্র ব্যবহার করতে, তার পক্ষ থেকে কোন দুর্ব্যবহার ইত্যাদি প্রকাশ পেলে তাতে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করতে এবং স্ত্রীকে খোরপোশ ও সম্মানজনক জীবন যাপনের সুযোগ দিতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: স্ত্রীদের সাথে উত্তম ব্যবহার কর। রাসূল (সা) বলেছেন: তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রেখো। মনে রেখো, তোমাদের স্ত্রীদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপরও স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। তোমাদের ওপর স্ত্রীদের অধিকার এই যে, তোমরা তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে, তাদের খোরপোশ দেবে। আর তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তাদের সতিত্ব ও শ্লীলতা রক্ষা করবে এবং তোমাদের কাছে যারা অবাঞ্ছিত তাদেরকে গৃহে প্রবেশ করতে দেবেনা। (ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)
ইবনে হাব্বান বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার পরিবার পরিজনের সাথে অধিকতর সদ্ব্যবহারকারী।" কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে, "সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে আপন পরিবারের সাথে সর্বাধিক বিনম্র আচরণকারী। রাসূল (সা) স্ত্রীলোকের প্রতি অত্যধিক বিনম্র আচরণ করতেন। রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি নিজ স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে ধৈর্য ধারণ করবে, সে হযরত আইয়ূব (আ) এর মত পুরস্কৃত হবে। আর যে স্ত্রী স্বামীর দুর্ব্যবহারে ধৈর্য ধারণ করবে, সে ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিমের ন্যায় পুরস্কৃত হবে।
এক হাদীসে আছে যে, এক ব্যক্তি হযরত উমরের নিকট নিজের স্ত্রীর দুর্ব্যবহারের অভিযোগ পেশ করার জন্য উপস্থিত হলো। সে হযরত উমরের বাড়ীর ফটকে দাঁড়িয়ে তাঁর বাইরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। এই সময় শুনতে পেল, হযরত উমরের স্ত্রী তাঁকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করছেন। কিন্তু হযরত উমর তার কোন জবাব না দিয়ে নীরবে সহ্য করছেন। এটা শোনার পর লোকটি ফিরে যেতে উদ্যত হলো। সে ভাবলো, এমন দুর্দন্ড ও প্রতাপান্বিত খলিফার যখন এই অবস্থা, তখন আমি আর কোথাকার কে? ঠিক এই সময় হযরত উমর বাইরে বেরিয়ে দেখলেন, লোকটি চলে যাচ্ছে। তিনি ডেকে বললেন : তুমি কেন এসেছিলে আর কেনই বা দেখা না করে চলে যাচ্ছ? সে বললো : আমীরুল মুমিনীন! আমার সাথে আমার স্ত্রী যে দুর্ব্যবহার করে ও কটুবাক্য প্রয়োগ করে, তার বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করার জন্য আমি আপনার কাছে এসেছিলাম। কিন্তু শুনতে পেলাম স্বয়ং আপনার স্ত্রীও তদ্রূপ। তাই ফিরে যাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম যে, আমীরুল মুমিনীনের অবস্থা যখন এরূপ, তখন আমি আর কোথাকার কে? হযরত উমর বললেন : শোন, ভাই! আমার ওপর তার কিছু অধিকার আছে বলেই আমি তাকে সহ্য করলাম। দেখ, সে আমার খাবার রান্না করে, রুটি বানায়, কাপড় ধোয়, এবং আমার সন্তানদের দুধ খাওয়ায়। অথচ এসব কাজ তার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে এসব কাজ করে দিয়ে সে আমার মনকে হারাম উপার্জন থেকে ফিরিয়ে রাখে। এ জন্যই আমি তাকে সহ্য করি। লোকটি বললোঃ আমীরুল মুমিনীন! আমার স্ত্রীও তদ্রুপ। হযরত উমর বললেন : “তাহলে তাকে সহ্য করতে থাক, ভাই। দুনিয়ার জীবনটা তো নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী।”
কথিত আছে যে, একবার জনৈক নেককার ব্যক্তির এক নেককার দ্বীনী ভাই তার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি প্রতি বছর একবার বেড়াতে আসতেন। এসে দরজায় কড়া নাড়তেই তার স্ত্রী দরজা খুলে দিয়ে আগন্তুককে জিজ্ঞাসা করলেন : “কে আপনি?” আগন্তুক বললেন : “আমি আপনার স্বামীর দ্বীনী ভাই! তাকে দেখতে এসেছি।” স্ত্রী অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় বললো : “সে জংগলে কাঠ কাটতে গেছে। আল্লাহ যেন ওকে নিরাপদে ফিরিয়ে না আনে। আল্লাহ যেন ওর অমুক করে, তমুক করে! ইত্যাদি ইত্যাদি...।” এভাবে অনুপস্থিত স্বামীর বিরুদ্ধে সে প্রচন্ডভাবে নিন্দাবাদ করতে লাগলো। ইতিমধ্যে সহসা তার স্বামী এসে উপস্থিত হলেন। একটা সিংহের পিঠে করে বিরাট এক কাঠের বোঝা নিয়ে এবং নিজে তার ওপর আরোহণ করে পাহাড়েরর দিক থেকে ফিরে এলেন। তিনি তাঁর দ্বীনী ভাইকে সালাম করলেন এবং মোবারকবাদ জানালেন। অতঃপর তিনি গৃহের ভেতরে ঢুকে সিংহের পিঠ থেকে কাঠ নামালেন এবং সিংহকে বললেন : যাও, আল্লাহ তোমার কল্যাণ করুন। অতঃপর তিনি তার দ্বীনী ভাইকেও ভেতরে এনে বসালেন। তার স্ত্রী তখনো তাকে বকা ঝকা করছিল। অথচ তার স্বামী ছিলেন নিরুত্তর। অতঃপর খাওয়া দাওয়া শেষে অতিথি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। তিনি তার বন্ধুর মুখরা স্ত্রীর ব্যবহার ও তার বন্ধুর ধৈর্য দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
পরের বছর একই সময় তিনি আবার এলেন। তিনি কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে আওয়াজ এল: দরজায় কে? আগন্তুক বললেন: আমি আপনার স্বামীর দ্বীনী ভাই অমুক। তখন মোবারকবাদ বলে মহিলা দরজা খুলে দিল। সে আরো বললো: "আপনি বসুন, আমার স্বামী ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই ফিরে আসবেন। আল্লাহ তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনুন। ইত্যাদি ইত্যাদি।" আগন্তুক তার সুমিষ্ট ব্যবহার ও কথাবার্তায় অবাক হয়ে গেলেন।
একটু পরেই গৃহকর্তা কাঠের বোঝা নিয়ে বাড়ী ফিরে এলেন। কিন্তু এবার কাঠের বোঝা সিংহের পিঠে করে নয় - নিজের পিঠে করে আনলেন। অতঃপর তারা অতিথিকে যত্ন করে খাইয়ে দাইয়ে বিদায় করলেন। বিদায় কালে তিনি তার বন্ধুকে বললেন: "গত বছর যখন এসেছিলাম তখন আপনার স্ত্রীর কর্কশ ব্যবহার ও দুর্বিনীত ভাষণ শুনেছিলাম। তিনি সর্বদাই আপনার নিন্দা করছিলেন। আর আপনি সিংহের পিঠে করে কাঠের বোঝা বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এ বছর দেখলাম আপনার স্ত্রীর সুমধুর ব্যবহার। অথচ আপনি বোঝা বয়ে এনেছেন নিজের পিঠে করে। ব্যাপারটা কি বলুন তো?” তিনি বললেন: “হে ভাই! সেই কর্কশভাষিণী নারীর মৃত্যু হয়েছে। আমি তার ওপর ধৈর্য ধারণ করতাম। ফলে আল্লাহ সেই সিংহটিকে আমার বশীভূত করে দিয়েছিলেন। পরে আমি এই সদাচারীনী মহিলাকে বিয়ে করেছি। আমি তার সাথে সুখে আছি। কিন্তু সেই সিংহ আমার হাতছাড়া হয়ে গেল। তাই আমি নিজের ঘাড়ে করে কাঠ বহন করতে বাধ্য হয়েছি এই অনুগত সৎস্বভাবা স্ত্রীর সাথে আমার সুখময় জীবন যাপনের খাতিরে।