📄 অদৃষ্টকে অস্বীকার করা
আল্লাহ তায়ালা সূরা আল কামারে বলেনঃ "আমি প্রতিটি জিনিস পরিচ্ছন্নভাবে সৃষ্টি করেছি।” ইমাম ইবনুল জাওসী বলেন যে, এ আয়াতের নাযিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে দু'টো মত রয়েছে। প্রথম মত এইযে, মক্কার মুনাফিকরা রাসূল (সা) এর কাছে এসে অদৃষ্ট নিয়ে তর্ক জুড়ে দিয়েছিল। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। আর আবু উমামা (রা) এর বর্ণনা অনুসারে এ আয়াত নাযিল হয় অদৃষ্টে অবিশ্বাসী গোষ্ঠী সম্পর্কে। দ্বিতীয় মত এই যে, নাজরানের খৃস্টান পাদ্রী রাসূল (সা) এর কাছে এসে বলেছিল যে, হে মুহাম্মাদ! তুমি কি মনে কর পাপ কাজ অদৃষ্ট মোতাবিক হয়ে থাকে? আসলে তা নয়। তখন রাসূল (সা) বললেনঃ "তোমরা খোদাদ্রোহী।" এই সময় আয়াত নাযিল হয়। সূরা আল হাদীদে আল্লাহ বলেনঃ "পৃথিবীতে এবং তোমাদের জীবনে যে বিপদ মুসিবত আসুক, তা তোমাদের সৃষ্টির আগে থেকেই একটি পুস্তকে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এটা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ কাজ। কাজেই তোমরা যা হারাও তার জন্য আফসোস করোনা এবং আল্লাহ 'যা কিছু তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য গর্বিত ও উল্লাসিত হয়োনা। আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিত মানুষকে ভালবাসেন না।"
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেনঃ আল্লাহ যখন কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তীদেরকে ও পরবর্তীদেরকে একত্রিত করবেন, তখন তাঁর আদেশক্রমে জনৈক ফেরেশতা পূর্ববর্তীরা ও পরবর্তীরা শুনতে পারে এত জোরে ঘোষণা করবেন যে, আল্লাহর অবাধ্যরা কোথায়? তখন কাদরিয়াগণ (অর্থাৎ অদৃষ্টের অবিশ্বাসীগণ) উঠে দঁড়াবে। তাদেরকে তৎক্ষণাত জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। কাদরিয়া গোষ্ঠীর মতবাদ এই যে, আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে গুনাহর কাজের ক্ষমতা দেবেন, আবার তাকে শাস্তিও দেবেন, এটা সম্ভব নয়। অথচ প্রকৃত ব্যাপার এইযে, আল্লাহ মানুষকে ভালমন্দ সব রকম কাজের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিয়ে তাকে পরীক্ষা করেন। ভালো কাজ করলে সে পরীক্ষায় কৃতকার্য হয় ও পুরস্কৃত হয়। আর মন্দ কাজ করলে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয় ও শাস্তি পায়। আল্লাহ তায়ালা এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতে বর্ণনা করেছেন। "আল্লাহ তোমাদেরকে ও তোমাদের কাজকে সৃষ্টি করেছেন।" অর্থাৎ মানুষের ভালোমন্দ সব কাজ আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। অন্য আয়াতে বলেছেনঃ “তিনি মানুষের বিবেককে পাপ ও পুণ্য জানিয়ে দিয়েছেন।” অর্থাৎ তাকে পাপ ও পুণ্য উভয়ের জন্য তাকে ক্ষমতা ও সুযোগ দিয়েছেন। রাসূল (সা) বলেছেনঃ আল্লাহ তায়ালা এক শ্রেণীর মানুষকে অনুগ্রহপূর্বক সৎ কাজের প্রেরণা দেন এবং তাদেরকে তার রহমতের অন্তর্ভুক্ত করেন, আর অপর এক শ্রেণীর মানুষকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন, ফলে তাদেরকে অপমানিত করেন। তাদের অপকর্মের জন্য তাদেরকে ধিকৃত করেন এবং যে কাজ দ্বারা তিনি তাদেরকে পরীক্ষা করেন, তা ছাড়া অন্য কোন কাজে তারা সমর্থ হয়না। অতপর তাদেরকে শাস্তি দেন। অথচ এ সব সত্ত্বেও আল্লাহ ন্যায় বিচারক।"
রাসূল (সা) বলেছেনঃ জেনে রাখ, সমগ্র মানব জাতি যদি তোমার কোন উপকার করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তবুও তারা আল্লাহ যতটুকু তোমার জন্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন তার চেয়ে বেশী উপকার করতে পারবেনা। আর যদি তোমার ক্ষতি করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তবুও আল্লাহ যেটুকু নির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোন ক্ষতি করতে পারবেনা। "কলমগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং কাগজগুলো শুকিয়ে গেছে।” অর্থাৎ অদৃষ্টে যা কিছু লেখা হয়েছে তা চূড়ান্ত। নতুন করে আর কিছু লেখা হবেনা এবং নতুন কিছু সংঘটিতও হবেনা। [উল্লেখ্য যে, তাকদীর বা অদৃষ্টে বিশ্বাস করা রিসালাত, আখেরাত ও কিতাবে বিশ্বাস করার ন্যায় ঈমানের অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। তাই তাকদীরে অবিশ্বাস করা শুধু কবীরা গুনাহ নয়, কুফরীও বটে। এ বিষয়টি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ও মতভেদ রয়েছে তবে সকল মতভেদের উর্দ্ধে উঠে এই মর্মে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, বান্দাকে আল্লাহ তায়ালা ভালো ও মন্দ কাজের নিয়ত বা ইচ্ছা করাতে এবং সে জন্য চেষ্টা করার ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিয়েছেন। আর এই স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়ে সে যে ইচ্ছা ও চেষ্টা করবে, তার জন্যই তাকে পুরস্কৃত করা বা শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু কাজটি সমাধা করার ক্ষমতা তাকে দেয়া হয়নি এবং তার জন্য সে দায়ীও হবেনা। উদাহরণ স্বরূপ, এক ব্যক্তি কাউকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল এবং সে জন্য সে তাকে উপযুক্ত অস্ত্র দ্বারা আঘাত করলো। এতে আহত ব্যক্তি যদি নিহত না হয়, তবুও আক্রমণকারী আল্লাহর কাছে খুনের দায়ে দোষী হবে এবং শাস্তি পাবে। কেননা আয়ু না ফুরালে ও মৃত্যুর নির্দ্ধারিত সময় সমাগত না হলে কারো মৃত্যু ঘটানো যায়না। কিন্তু ইচ্ছা ও সক্রিয় চেষ্টার জন্য হত্যার গুনাহ সে এড়াতে পারবেনা। কারণ তার ক্ষমতায় যা ছিল তা সে পুরোপুরি করেছে। এ বক্তব্যের সপক্ষে একটি হাদীস উল্লেখ কর যাচ্ছে। রাসূল (সা) বলেছেনঃ যখন দুই ব্যক্তি পরস্পরকে হত্যা করার জন্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ে জাহান্নামী হবে। জিজ্ঞাসা করা হলো যে, যে হত্যা করেছে সে জাহান্নামী হবে এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু নিহত ব্যক্তি কেন দোজখে যাবে? রাসূল (সা) বললেনঃ সেও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে চেয়েছিল।"- অনুবা:ক]
📄 মানুষের গোপনীয় দোষ জানার চেষ্টা করা
আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ তোমরা গোপনীয় জিনিসের তল্লাশী করোনা। তাফসীরকারগণ বলেনঃ এর অর্থ মানুষের গুপ্ত দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করোনা। অর্থাৎ গোয়েন্দাগিরী করতে নিষেধ করা হয়েছে। একবার হযরত ইবনে মাসউদকে বলা হলো যে, ওয়ালীদ ইবনে উকবার দাড়ি থেকে ফোঁটা ফোঁটা মদ গড়িয়ে পড়ে। তিনি বললেনঃ গোয়েন্দাগিরী করতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। তবে কোন কিছু প্রকাশিত হয়ে গেলে সেটি আমরা বিবেচনা করবো।
রাসূল (সা) বলেনঃ "যে ব্যক্তি কারো কথাবার্তা তার সম্মতি না থাকা সত্ত্বেও আড়ি পেতে শোনে কিয়ামতের দিন তার কানে গলিত শীসা ঢালা হবে।” একটি হাদীসে বিনা অনুমতিতে কারো চিঠি পড়তেও কঠোরভাবে নিষেধ করা করা হয়েছে।
📄 নামীমা বা চোগলখুরি
(ইসলামের চিরস্থায়ী বিধান হলো, কারো প্রশংসা করতে হলে তার অসাক্ষাতে আর সমালোচনা করতে হলে সাক্ষাতে করতে হয়। এই বিধান লংঘন করে যখনই কারো অসাক্ষাতে নিন্দা, সমালোচনা বা কুৎসা রটানো হয়, তখন তা শরীয়ত বিরোধী কাজে পরিণত হয়। এ ধরনের কাজ তিন রকমের হতে পারে। এবং তিনটিই কবীরা গুনাহ। প্রথমত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ বা দোষ আরোপ করা হয়, তা যদি মিথ্যা, বা প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণহীন হয়, তবে তা নিছক অপবাদ। আরবীতে একে বুহতান বা কাযাফ বলা হয়। ইসলামী শরীয়তে এটি শুধু কবীরা গুনাহ নয়, বরং আইনত দন্ডনীয় ফৌজদারী অপরাধ। শরীয়তে এর শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে ৮০ ঘা বেত্রদন্ড এবং চির জীবনের জন্য সাক্ষ্য দানের অযোগ্য ঘোষিত হওয়া। ইতিপূর্বে ২২ নং কবীরা গুনাহতে এটি সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ আরোপিত দোষ বা অভিযোগ যদি সত্য হয়, কিন্তু তা ইসলামের বিধি অনুসারে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রত্যক্ষভাবে ও নিভৃতে বুঝিয়ে বলে আত্মশুদ্ধির সুযোগ দেয়ার পরিবর্তে কোন ব্যক্তি বিশেষের কাছে ফাঁস করে দিয়ে উভয়ের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করা বা তাদের সুসম্পর্ক নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তাকে নামীমা বা চোগলখুরি বলে। তৃতীয়তঃ যদি ব্যক্তি বিশেষের পরিবর্তে সর্বসাধারণের কাছে প্রকাশ করে দিয়ে তাকে জনসমক্ষে হেয় করার চেষ্টা করা হয়, তবে তাকে গীবত বলা হয়। অসাক্ষাতে পরনিন্দার এই তিনটি রূপই কবীরা গুনাহ ও ঘৃণ্য অপরাধ। তিনটিতেই লংঘিত হয় হক্কুল ইবাদ তথা মানবাধিকার। কেননা এদ্বারা অবৈধভাবে তার মান ইজ্জত ও সম্ভ্রম বিনষ্ট করা হয়। অথচ তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পর্যন্ত দেয়া হয় না। তাই এ অপরাধ সংশ্লিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষমা না করলে আল্লাহও ক্ষমা করেন না। - অনুবাদক)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: "সেই ব্যক্তির অনুসরণ করোনা, যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, যে অসাক্ষাতে নিন্দা করে, যে একজনের কথা আরেকজনের কাছে লাগায়।" (সূরা আল কালাম)
সহীহ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন যে, চোগলখোর জান্নাতে যাবে না। অপর হাদীসে আছে যে, একবার রাসূল (সা) দুটি কবরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: "এই দুটি কবরের অধিবাসীদ্বয় আযাবে ভুগছে। তবে কোন বড় ধরনের গুনাহের জন্য তারা আযাবে ভুগছেনা। একজন পেশাব করে ভালোভাবে পবিত্র হতোনা। আর অপর জন চোগলখুরী করে বেড়াতো। অতঃপর তিনি খেজুরের দুটি কাটা ডাল নিয়ে উভয়ের কবরে একটি করে গেড়ে দিলেন এবং বললেন: ডাল দুটো না শুকানো পর্যন্ত হয়তো ওদের আযাব কম থাকবে।"
এই হাদীসে "কোন বড় ধরনের গুনাহের জন্য তারা আযাবে ভুগছেনা" এ উক্তির অর্থ এই যে, তাদের ধারণায় তাদের কৃত গুনাহ তেমন বড় ধরনের ছিলনা। এ জন্য কোন কোন রেওয়াতে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "তবে অবশ্যই তা বড় গুনাহ ছিল।” সহীহ বুখারী, মুসলিম ও মুয়াতায়ে ইমাম মালিকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: তোমরা সবচেয়ে অধম লোক দেখতে পাবে সেই ব্যক্তিকে, যে বিভিন্ন জনের কাছে গিয়ে নিজেকে বিভিন্ন আকারে প্রকাশ করে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ায় দোমুখো আচরণ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাকে দুটো আগুনের জিহবা দেবেন। দোমুখো আচরণ দ্বারা বুঝায় দু'জনের সাথে দু'রকমের কথা বলা। ইমাম গাযযালী (রহ) বলেছেন: "দোমুখো লোক বলতে সাধারণতঃ চোখলখোরকে বুঝানো হয়ে থাকে, যে একজনকে গিয়ে বলে: অমুক তোমার সম্পর্কে এরূপ কথা বলেছে। সংশ্লিষ্ট দু'পক্ষের যে কোন পক্ষ অথবা তৃতীয় কোন পক্ষ যে গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করা অপছন্দ করে, সেটার প্রকাশ করাই চোগলখুরি, চাই তা কথা, লেখা, ইশারা ইংগিত বা অন্য যে কোন মাধ্যমেই করা হোক না কেন, এবং প্রকাশিত বিষয়টি কারো কথা বা কাজ বা কোন দোষত্রুটি- যাই হোক না কেন। মোটকথা, • চোগলখুরি হলো, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কেউ অথবা তৃতীয় কেউ অপছন্দ করে এমন কোন গোপন তথ্য ফাঁস করা। মানুষের যে অবস্থাই নজরে পড়ুক না কেন, তা অন্য কারো কাছে প্রকাশ করায় যদি সমাজের উপকার না হয় বা তা দ্বারা সমাজকে কোন গুনাহ থেকে রক্ষা করা না যায়, তাহলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত।” ইমাম গাযযালী আরো বলেছেন: যার কাছে কেউ কারো সম্পর্কে চোগলখুরি করে, এবং বলে যে, অমুক তোমার সম্পর্কে এই এই কথা বলেছে। তার উচিত ছয়টি কাজ করা: প্রথমতঃ তাকে অবিশ্বাস করবে। কেননা সে একজন চোগলাখার ও ফাসেক। সে বিশ্বাসযোগ্য নয়। দ্বিতীয়তঃ তাকে ঐ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলবে, কাজটির তীব্র সমালোচনা করবে এবং সদুপদেশ দেবে। তৃতীয়তঃ তাকে মন থেকে ঘৃণা করবে। কেননা সে আল্লাহর কাছে ঘৃণিত। আর আল্লাহর ঘৃণিত ব্যক্তিকে ঘৃণা করা ওয়াজিব। চতুর্থতঃ যে ব্যক্তির সম্পর্কে চোগলখোর খারাপ সংবাদ দিয়েছে, তার সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে খারাপ ধারণা পোষণ করবেনা। কেননা আল্লাহ বলেছেন: 'তোমরা বেশী ধারণা পোষণ থেকে বিরত থাকবে। কেননা কিছু কিছু ধারণায় গুনাহ হয়। পঞ্চমতঃ তার বর্ণিত সংবাদকে এতটা গুরুত্বও দেবেনা যে, তার সত্যাসত্য তদন্ত করতে আরম্ভ করে দেবে। কেননা আল্লাহ বলেন: "তোমরা গোয়েন্দাগিরি করোনা।" ষষ্ঠতঃ চোগলখোরকে দেয়া উপদেশ নিজেই যেন লংঘন না করে। চোগলখোর যা বলেছে, তা নিয়ে সে নিজে যেন অন্যের সাথে আলোচনা না করে। বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি হযরত উমর ইবনু আবদুল আযীযকে কারো সম্পর্কে একটি খারাপ খবর দিল। তিনি বলেন: তুমি যদি চাও তাহলে তোমার খবরটা নিয়ে অগ্রসর হই। তুমি যদি সত্য বলে থাক, তাহলে তোমার ওপর এই আয়াত প্রযোজ্য হবে, "তোমাদের কাছে কোন ফাসেক যদি কোন খবর নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা নিয়ে তদন্ত চালাও।" আর যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তাহলে তোমার ওপর এই আয়াত প্রযোজ্য হবে, "যে পশ্চাতে নিন্দা করে, যে একের কথা অপরের কাছে লাগায়।" আর যদি তুমি চাও, তোমাকে মাফ করে দিই। সে বললো: আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহ ক্ষমা করুন। আমি আর এ কাজ করবোনা।"
হযরত হাসান বাসরী বলেন: যে ব্যক্তি তোমার কাছে অন্যের কথা লাগায়, জেনে রেখ, সেও তোমার কথা অন্যের কাছে লাগায়।
এক ব্যক্তি জনৈক বিশিষ্ট আলেমের নিকট এসে অপর একজনের নামে বিভিন্ন দুর্নাম আরোপ করতে লাগলো। তখন ঐ আলেম বললেনঃ "তুমি আমার কাছে তিনটি অপরাধ করেছ। প্রথমতঃ আমার এক দীনী ভাই-এর প্রতি আমার মনে ক্ষোভ ও বিদ্বেষের সৃষ্টি করেছ। দ্বিতীয়তঃ তার কারণে আমার মনকে দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত করেছ। তৃতীয়তঃ তুমি আমার কাছে বিশ্বস্ততা হারিয়েছ। কোন কোন মনীষী বলতেন: "যে ব্যক্তি কারো গালি তোমার নিকট পৌছায়, সে যেন নিজেই তোমাকে গালি দেয়।” এক বক্তি হযরত আলী (রা) এর নিকট এসে বললো: অমুক আপনার নামে দুর্নাম রটিয়েছে ও গালি দিয়েছে। তিনি বললেন: আমাকে তার কাছে নিয়ে চল। সে তাকে ঐ ব্যক্তির কাছে নিয়ে গেল। লোকটি ভেবেছিল, হযরত আলী তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেবেন। কিন্তু তিনি তাকে গিয়ে বললেনঃ "ওহে ভাই! তুমি যা বলেছ, তা যদি সত্য হয়, তবে আল্লাহর কাছে আমি ক্ষমা চাই। আর যদি মিথ্যা হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে তোমার জন্য ক্ষমা চাই।” কোন কোন তাফসীরকার সূরা লাহাবের যে জায়গায় আবু লাহাবের স্ত্রীকে "হাম্মালাতাল হাতাব" বলা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন: এর শাব্দিক অর্থ কাষ্ঠ বহন কারীনী। সে একজন চোগলখোর ছিল। চোগলখুরি স্বভাবটাকে কাষ্ঠ বলা হয়েছে, কেননা কাষ্ঠ যেমন আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে, তেমনি চোগলখুরি দু'জনের মধ্যে শত্রুতার আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে।
একটি ঘটনা : কথিত আছে যে, একবার এক ব্যক্তি দেখতে পেল, বাজারে একজন নিজের দাস বিক্রি করছে। বিক্রেতা এভাবে হাকডাক করছে : “এ গোলামের একটু চোগলখুরির অভ্যাস ছাড়া আর কোন দোষ নেই।" লোকটি এ দোষটাকে গুরুত্ব না দিয়ে গোলামকে কিনে নিল। গোলামটি তার বাড়ীতে থাকতে লাগলো। কিছুদিন পর সে তার মনিবের স্ত্রীকে বললো : আমার মনিব আর একটি বিয়ে করতে চাইছেন এবং তিনি আপনার প্রতি আর তেমন অনুরক্ত নেই। আপনি কি এই বিয়ে ঠেকাতে চান এবং আপনার স্বামী আগের মত আপনাকে ভালোবাসুক- এটা চান, তাহলে উনি যখন ঘুমাবেন, তখন একটা ছুরি দিয়ে তার কণ্ঠনালীর ওপরের একটা পশম কেটে নিয়ে নিজের কাছেই রাখুন। অপর দিকে মনিবকে সে বললো, আপনার স্ত্রী তলে তলে অন্য একজনকে ভালোবাসে এবং সে তার সাথে চক্রান্ত করে আজ আপনাকে ঘুমন্ত অবস্থায় যবাই করবে। আপনি যদি বাঁচতে চান তাহলে আপনি না ঘুমিয়ে কেবল ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকবেন। দেখবেন, আপনার স্ত্রী কিভাবে আপনার গলায় ছুরি চালাতে চেষ্টা করে। মনিব ঠিক তাই করলো। রাত্রে যেই তার স্ত্রী ছুরি নিয়ে তার গলার পশম কাটতে গেছে, অমনি মনিব উঠে তার হাত ধরে বসলো এবং ছুরি কেড়ে নিয়ে স্ত্রীকে সংগে সংগে খুন করলো। অতঃপর স্ত্রীর আত্মীয়রা এসে মনিবকে খুন করলো। অতঃপর উভয় পক্ষে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল এবং তাতে উভয় পক্ষ সর্বস্বান্ত হয়ে গেল।
📄 বিনা অপরাধে কোন মুসলমানকে অভিশাপ ও গালি দেয়া
রাসূল (সা) বলেছেন : "মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকী ও তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া কুফরী।” (আবু দাউদ ব্যতীত সকল সহীহ হাদীস গ্রন্থ) তিনি আরো বলেছেন যে, "কোন মুমিনকে অভিশাপ দেয়া তাকে হত্যা করার শামিল।" (ইবনে মাজা ব্যতীত সকল সহীহ হাদীস গ্রন্থ) সহীহ মুসলিমে বর্ণিত যে, রাসূল (সা) বলেছেন, "অভিশাপকারীরা কিয়ামতের দিন কারো সুপারিশকারীও হবেনা, সাক্ষীও হবেনা।" হাদীসে আরো আছে : "মুমিন কখনো অভিশাপকারী, কটুভাষী, অশ্লীলভাষী ও অশালীনভাষী হতে পারেনা।" সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে রাসূল (সা) বলেছেন: "কোন বান্দা যখন কাউকে অভিশাপ করে (বদ দোয়াও অভিশাপের কাছাকাছি- অনুবাদক) তখন তা আকাশে উঠে যায়। কিন্তু আকাশের দরজা বন্ধ করে দিয়ে তার প্রবেশ রোধ করা হয়। অতঃপর তা পৃথিবীতে নেমে আসে। কিন্তু তার জন্য পৃথিবীর পথ রুদ্ধ করা হয়। অতঃপর তা ডানে ও বামে ছুটাছুটি করতে থাকে। যখন বেরুবার কোন পথ পায়না, তখন যার ওপর অভিশাপ বর্ষণ করা হয়েছে, সে তার উপযুক্ত হলে তার ওপর কার্যকর হয়, নচেত স্বয়ং অভিশাপকারীর ওপরই কার্যকর হয়।" হযরত ইমরান বিন হাসীন বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূল (সা) কোন সফরে যান। সেই সফরে এক আনসারী মহিলা স্বীয় বাহন উটকে উচ্চস্বরে গালাগালি করে উঠলো ও অভিশাপ দিল। এটা শুনতে পেয়ে রাসূল (সা) বললেন: "এই উটের পিঠে যে সব মালপত্র আছে তা নামাও এবং উটটাকে ছেড়ে দাও। কেননা সে তো অভিশপ্ত। ইমরান বলেন: আমি যেন এখনো মহিলাটিকে দেখতে পাচ্ছি যে, অসহায়ভাবে লোকদের সাথে হেঁটে চলছে, কেউ তাকে সাহায্য করতে আসছেনা।" (সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: সবচেয়ে খারাপ সুদ হলো, একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অপমানজনক ভাষা প্রয়োগ করা।
অবশ্য কতিপয় সুনির্দিষ্ট পাপ কার্যে জড়িত ব্যক্তিকে অভিশাপ দেয়া যায়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "অত্যাচারীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ!... মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।” রাসূল (সা) বিভিন্ন ব্যক্তিকে, যথা সুদের সাথে জড়িত, তাহলীলের সাথে জড়িত এবং ঘুষ, মদ ও জুয়ার সাথে জড়িত ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করেছেন, যারা চুলের সাথে চুল গিরে দিয়ে বাঁধে, ভ্রুর চুল ফেলে দেয়, বিপদে ঘাবড়ে গিয়ে চিৎকার ও আহাজারী করে, চুল কামায় ও কাপড় ছিড়ে ফেলে দেয়, তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। তিনি চিত্রকর, ভাস্কর ও যারা অন্যের জমি দখল করার জন্য সীমানার চিহ্ন তুলে ফেলে বা পাল্টে ফেলে, তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। অনুরূপভাবে তিনি নিজের পিতামাতার ওপর অভিশাপ বর্ষণকারী, গালিগালাজ বর্ষণকারী, কোন অন্ধ ব্যক্তিকে পথভ্রষ্টকারী, জীবজন্তুর সাথে কুকর্মকারী, সমকামী, নিজ স্ত্রীর সাথে পশ্চাদ্বারে সংগমকারী, ভাগ্য গণনাকারী ও তার কাছে গমনকারী, মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চস্বরে ক্রন্দনকারীনী এবং পেশাদার ক্রন্দনকারীনী ও তার সহকর্মী, জনগণ অপছন্দ করা সত্ত্বেও জোরপূর্বক তাদের নেতা বা শাসকের পদ দখলকারী, স্বামী অসন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় যে স্ত্রী রাত কাটিয়ে দিয়েছে, আযান শুনতে পেয়েও যে ব্যক্তি বিনা ওযরে জামায়াতে উপস্থিত হয়না, আল্লাহ ছাড়া আর কারো নামে জীবজন্তু জবাইকারী, চোর, সাহাবীগণকে গালিগালাজকারী, পুরুষের বেশভূষা ও সাদৃশ্যধারনকারী স্ত্রী লোক এবং স্ত্রীলোকের বেশভূষা ও সাদৃশ্য ধারনকারী পুরুষ, মানুষের চলাচলের পথে মলমূত্র ত্যাগকারী, হাতে মেহেদী ও চোখে সুর্মা ব্যবহারে বিমুখ (অর্থাৎ সৌন্দর্য চর্চার মাধ্যমে স্বামীকে খুশী রাখতে অনাগ্রহী) রমনী, স্বামী স্ত্রী ও চাকর-মনিবের সম্পর্ক বিনষ্টকারী, ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সংগমকারী, কোন মানুষকে অস্ত্র দেখিয়ে ভীতি প্রদর্শনকারী, যাকাত দিতে অস্বীকারকারী, নিজের পিতা নয় এমন কাউকে পিতা এবং নিজের মনিব নয় এমন কাউকে মনিব পরিচয় দানকারী, কোন জীবজন্তুর গায়ে তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে দাগ অংকনকারী, শরীয়তের বিধান অনুসারে কোন অপরাধীর বিরুদ্ধে বিচারক কর্তৃক শাস্তি ঘোষণা করার সম্ভাবনা দেখে তা থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য সুপারিশকারী ও সুপারিশ গ্রহণকারী, স্বামীগৃহ থেকে স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে কোথাও গমনকারীনী মহিলা, স্বামীর বিছানা ছেড়ে রাত যাপনকারিনী মহিলা, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সৎকাজে আদেশ দান অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করণে বিমুখ, মদ পানকারী ও মদের উৎপাদন, ক্রয়বিক্রয়, পরিবহন ও এইসবের সাথে জড়িত ও সহযোগিতাকারীকে অভিশাপ দিয়েছেন। অপর হাদীসে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: ছয় ব্যক্তিকে আমি অভিশাপ দিয়েছি, আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন এবং প্রত্যেক নবী অভিশাপ দিয়েছেন, আর প্রত্যেক নবীর দোয়া কবুল হওয়া নিশ্চিত।
সেই ছয় ব্যক্তি হলো: আল্লাহর নির্ধারিত অদৃষ্টকে অস্বীকারকারী, আল্লাহর কিতাবে কোন কিছু সংযোজনকারী, আল্লাহ যাদেরকে সম্মানিত করেছেন তাদেরকে অপমানিত করা এবং আল্লাহ যাদেরকে অপমানিত করেছেন তাদেরকে সম্মানিত করার জন্য জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হালাল প্রতিপন্নকারী এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তাকে হারাম প্রতিপন্নকারী এবং আমার প্রদর্শিত পথ বর্জনকারী। এছাড়া রাসূল (সা) প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারকারীকে, হস্তমৈথুনকারীকে, কোন মহিলা ও তার কন্যাকে এক সাথে বিবাহকারীকে, ঘুষখোর, ঘুষদাতা ও ঘুষের দালালকে, বিদ্যা গোপনকারীকে, খাদ্য গোলাজাতকারীকে, কোন মুসলমানের অপমানকারীকে, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মজলুম মুসলমানকে যে সাহায্য করে না তাকে, নির্দয় শাসককে, বিয়ে না করার জন্য প্রতিজ্ঞাকারী পুরুষ ও স্ত্রীকে এবং কোন নির্জন প্রান্তরে বিনা প্রয়োজনে একাকী গমনকারীকেও অভিসম্পাত করেছেন।
নিরপরাধ মুসলমানকে অভিশাপ দেয়া সর্বসম্মতভাবে হারাম। আর অসচ্চরিত্র লোকদেরকে নামোল্লেখ ব্যতিরেকে অভিসম্পাত করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। যেমন কেউ যদি বলে, অত্যাচারীদের ওপর বা মিথ্যাবাদীদের ওপর বা কাফেরদের ওপর অভিসম্পাত, তবে তা সর্বসম্মতভাবে জায়েয। পক্ষান্তরে কোন পাপ কাজে জড়িত ব্যক্তিকে নামোল্লেখপূর্বক অভিসম্পাত করা সম্পর্কে মতভেদ আছে। অনেকের মতে এটা জায়েয। কিন্তু ইমাম গাযযালীর মতে, যে ব্যক্তি তওবা ছাড়া মারা গেছে বলে নিশ্চিত জানা যায়, যেমন আবু লাহাব, আবু জেহেল, ফিরাউন, হামান প্রমুখ কেবলমাত্র তাদের ওপরই অভিশাপ করা জায়েয। কারো অকল্যাণ কামনা করে বদ দোয়া করাও অভিশাপের কাছাকাছি। যে যে ক্ষেত্রে অভিশাপ অবৈধ, সেই সেই ক্ষেত্রে বদ দোয়াও অবৈধ। এমনকি যালেমের বিরুদ্ধে বদ দোয়া করা অনুচিত তবে প্রতিরোধের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলে মযলুম স্বয়ং যালেমের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে পারেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও অভিসম্পাত করা থেকে বিরত থাকা উচিত।