📄 নিজ পরিবারের মধ্যে অশ্লীলতা ও পাপাচারের প্রশ্রয় দান
রাসূল (সা) বলেছেন: "তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না। যে ব্যক্তি পিতামাতার অবাধ্য, দায়ুস অর্থাৎ পরিবারের মধ্যে অশ্লীলতা ও পাপাচারের প্রশ্রয়দাতা এবং পুরুষসুলভ আচরণকারী নারী।" নাসায়ীর বর্ণনায় রাসূল (সা) বলেন: তিন জনের ওপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করেছেন: মদখোর, পিতামাতার অবাধ্য ও আপন পরিবারে অশ্লীলতা ও পাপাচারের প্রশ্রয়দাতা।
যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রী অশ্লীলতার মধ্যে লিপ্ত আছে বলে অনুমান করে, কিন্তু তার হাতে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই, এবং স্ত্রীকে ভালোবাসার কারণে তাকে কিছু বলতে পারেনা, অথবা স্ত্রীর কাছে এমনভাবে ঋণগ্রস্ত আছে যে তার পরিশোধ করতে সে অপরাগ, সে বিপুল পরিমাণ দেনমোহরের দায়গ্রস্ত, অথবা বহুসংখ্যক শিশুসন্তান রয়েছে যাদের খোরপোশের দাবী নিয়ে স্ত্রী আদালতের শরণাপন্ন হবে - এরূপ আশংকা রয়েছে বলে শৈথিল্য প্রদর্শন করে তাকে দাযুস বলা যাবে না। তবে যার ভেতরে অশ্লীলতার প্রতি ঘৃণা বর্তমান নেই এবং স্ত্রী ও সন্তানদেরকে ইসলামী বিধান বিশেষত পর্দা মেনে চলতে বাধ্য করেনা তার ইহকালে ও পরকালে কোন কল্যাণ নেই এবং সে দায়ুস বলেই গণ্য হবে।
[উল্লেখ্য যে, উপরে যে ব্যতিক্রমমূলক কয়েকটি অবস্থার উল্লেখ করা হলো, তার কথা বাদ দিলে সাধারণভাবে একজন মানুষের নিজ স্ত্রী ও সন্তানদের ওপর নিরংকুশ কর্তৃত্ব ও একচ্ছত্র আধিপত্য বিদ্যমান, যা অনেকটা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম ক্ষমতার মতই। পিতা ও স্বামী হিসাবে সন্তান ও স্ত্রীদের প্রায় শর্তহীন ও অবাধ আনুগত্য লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে শরীয়তের বিধি ও সামাজিক প্রথা উভয়ের আলোকেই। তাই নিরংকুশ কর্তৃত্বের এই পরিমন্ডলে সে যাতে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে পরিবারকে সৎপথের ওপর বহাল রাখে, সেজন্য পবিত্র কুরআনে এই আদেশ দেয়া হয়েছে যে, "তোমাদের নিজেদেরকে ও পরিবার পরিজনকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর।" আর যারা এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করে তাদেরকে দায়ুস বলা হয়। পরিবারে পর্দার ব্যাপারে ও শরিয়াতের অন্যান্য বিধানের ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করলে তার জন্য পরিবার-প্রধানকেই দায়ী হতে হবে এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে সে দায়ুস হবে। - অনুবাদক]
📄 তালাকপ্রাপ্তা নারীর তাহলীল
নাসায়ী ও তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীসে হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেনঃ যে ব্যক্তি কোন তালাক প্রাপ্তা নারীকে তার পূর্ববর্তী স্বামীর জন্য হালাল করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে ও বিয়ের শর্ত অনুসারে বিনা সহবাসে তালাক দেয়, তাকে এবং যার জন্য হালাল করে তাকে রাসূল (সা) অভিশাপ দিয়েছেন। ইমাম তিরমিযী বলেন: হযরত উমর (রা) আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) এবং তাবেয়ী ফকীহগণ এই হাদীস অনুসারে কাজ করতেন। ইমাম আহমাদও স্বীয় মুসনাদে এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন: রাসূল (সা) কে তাহলীল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দিলেন: না, স্বাধীন ইচ্ছা অনুসারে ব্যতীত কোন বিয়ে চলবে না। বিয়ের নামে কোন ছলচাতুরী চলবে না। (অর্থাৎ কেবল বিয়ের ভান বা অভিনয় করা হবে, আসলে বিয়ে করা হবে না। এটা জায়েজ নয়।) আল্লাহর কিতাবের সাথে উপহাস করার অবকাশ নেই। সহবাস ছাড়াই স্ত্রীকে ছেড়ে দেয়ার বাধ্যবাধকতা গ্রহণযোগ্য নয়। উকবা ইবনে আমের থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “ভাড়াটে পাঠা কে বলবো?” সবাই বললো : হা, বলুন! তখন রাসূল (সা) বললেন : "সহবাস না করে তালাক দিতে হবে-এই শর্ত মেনে নিয়ে যে বিয়ে করে, সেই হচ্ছে ভাড়াটে পাঠা। আল্লাহ তায়ালা এ ধরনের শর্তাধীন বিয়েকারী ও যার জন্য সে বিয়ে করে, তাকে অভিশাপ দিয়েছেন। (ইবনে মাজা) এক ব্যক্তি হযরত ইবনে উমর (রা) কে জিজ্ঞাসা করলো যে, একটি তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে আমি বিয়ে করেছি। আমি তাকে তালাক দিয়ে তার পূর্ববর্তী স্বামীর জন্য হালাল করে দিতে চাই। অথচ তার পূর্বতন স্বামী আমাকে আদেশও করেনি, আর আমি যে তার জন্য এ কাজ করছি তা সে জানেও না। এ সম্পর্কে আপনার মত কি? ইবনে উমর (রা) বললেন : সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক বিয়ে ছাড়া আর সমস্ত বিয়ে অচল। তোমার যদি ভালো লাগে তবে তাকে রেখে দেবে, নচেত ছেড়ে দেবে। এ ধরনের কাজকে আমরা রাসূল (সা) এর আমলে ব্যভিচার গণ্য করতাম। হযরত উমর (রা) এ ধরনের বিয়েকে ব্যভিচার গণ্য করতেন এবং যে এ ধরনের বিয়ে করে ও যার জন্য করে- উভয়কে তিনি 'রজম' (প্রস্তারাঘাতে মৃত্যুদন্ড প্রদান) করার সংকল্প প্রকাশ করতেন। হযরত ইবনে উমার (রা) তাহলীল করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে বিশ বছর কাটিয়ে দিলেও স্বামী-স্ত্রী উভয়কে ব্যভিচারী আখ্যায়িত করেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলো : আমার চাচাতো ভাই স্বীয় স্ত্রীকে এক সাথে তিন তালাক দিয়ে এখন অনুতপ্ত। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বললেন : "সে আল্লাহর নাফরমানী করেছে। ফলে আল্লাহ তাকে এই অনুতাপজনক অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন। সে শয়তানের ফরমাবরদারী করেছে। তাই শয়তান তাকে এই সংকটজনক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে এবং এখান থেকে বেরুবার পথ রাখেনি।" লোকটি বললো : যদি কেউ তার জন্য তার স্ত্রীকে হালাল করে দেয়ার উদ্যোগ নেয় তাহলে কেমন হয়? ইবনে আব্বাস (রা) বললেন : "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ধোকা দেবে, আল্লাহ তাকে ধোকা দেবেন। হযরত ইবরাহীম নাখয়ী (বিশিষ্ট তাবেয়ী ইমাম) বলেন : প্রথম স্বামী, স্ত্রী ও দ্বিতীয় স্বামী- এই তিনজনের কারো যদি তাহলীলের নিয়ত থাকে, তাহলে পরবর্তী স্বামীর সাথে অনুষ্ঠিত বিয়ে বাতিল বলে গণ্য হবে এবং এ ধরনের বিয়ে দ্বারা ঐ স্ত্রী সাবেক স্বামীর জন্য হালাল হবেনা। হাসান বশরী, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, মালেক বিন আনাস, লাইস বিন সাদ, সুফিয়ান সাওরী ও ইমাম আহমদ- এঁরা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, এক্ষেত্রে স্ত্রী সাবেক স্বামীর জন্য হালাল হবেনা। ইমাম শাফেয়ীর মতে তাহলীলের শর্তে আকদ সম্পন্ন হলে সেই বিয়েই অবৈধ। কেননা তা মুত'য়া বিয়ের ন্যায় অস্থায়ী, যা শরীয়তসিদ্ধ নয়। তবে আ'কদ সম্পন্ন হওয়ার সময়ে নয় বরং তার আগে বা পরে এই শর্তের উল্লেখ করা হলে শর্ত বাতিল হবে ও বিয়ে শুদ্ধ হবে।
📄 প্রস্রাব থেকে যথাযথভাবে পবিত্রতা অর্জন না করা
প্রস্রাব থেকে সঠিকভাবে পবিত্রতা অর্জন না করা মূলতঃ খৃষ্টানদের রীতি। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তোমরা পোশাককে পবিত্র কর।" (সূরা আল-মুদ্দাসসির) হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সা) দুটো কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: "এই কবর দুটির অধিবাসীদ্বয় আযাব ভোগ করবে। কারণ এদের একজন চোগলখুরি করে বেড়াতো। অপরজন প্রস্রাব থেকে যথাযথভাবে পবিত্রতা অর্জন করতো না।" (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেছেন : “তোমরা প্রস্রাব থেকে পবিত্রতা অর্জন কর। কেননা অধিকাংশ কবরের আযাব এ কারণেই হয়ে থাকে।" (দারকুত্তী)
যে ব্যক্তি পেশাব থেকে ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করেনা, তার দেহ ও পোশাক উভয়ই অপবিত্র হয়ে যায় এবং তার নামায হয়না। তাবরানী ও ইবনে আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: জাহান্নামবাসী তো এমনিতেই অবর্ণনীয় দুঃখ ও যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকবে। উপরন্তু চার শ্রেণীর মানুষের কারণে তাদের দুঃখ যন্ত্রণা আরো বেড়ে যাবে। ফলে তারা উত্তপ্ত পানি ও আগুনের মধ্য দিয়ে ছুটাছুটি করতে থাকবে এবং নিজেদের জন্য মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতে থাকবে। অতঃপর জাহান্নামবাসী একে অপরকে বলবে: এ চারটি লোকের পরিচয় কি, যারা জাহান্নামে প্রবেশ করে আমাদের যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিয়েছে। তখন অপরজন বলবে: ওদের একজনকে একটি আগুনের খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে? অপরজন নিজের বেরিয়ে পড়া নাড়িভুড়ি টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে। অপরজনের মুখ থেকে অনবরত পুঁজ ও রক্তের বমি হচ্ছে। আর একজন নিজের শরীরের গোস্ত কামড়িয়ে খাচ্ছে। অতঃপর খাঁচায় আবদ্ধ লোকটিকে লক্ষ্য করে বলা হবে: এই অভিশপ্ত লোকটির কি হয়েছে, যে আমাদের যন্ত্রণার ওপর যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিয়েছে? সে বলবে: আমি অভিশপ্ত এজন্য যে, নানাভাবে মানুষের সম্পদ লুটেপুটে খেতাম, অতঃপর সেই সমস্ত দায়দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়েই মারা গিয়েছিলাম। অতঃপর যে ব্যক্তি নিজের নাড়িভুঁড়ি টেনে নিয়ে বেড়ায়, তাকে একই কথা জিজ্ঞাসা করা হবে। সে বলবে: আমি অভিশপ্ত এ জন্য যে, প্রস্রাব সম্পর্কে সাবধান থাকতাম না। এবং তা ধুয়ে পরিষ্কার করতাম না। অতঃপর যার মুখ দিয়ে অনবরত রক্ত ও পুঁজের বমি হতে থাকবে, তাকে একইভাবে জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলবে: আমি অভিশপ্ত এজন্য যে, আমি যে কোন খারাপ কথা শুনে মজা পেতাম এবং একজনের কথা অপরজনের কাছে পৌঁছে দিয়ে চোগলখুরি করে শত্রুতা বাধিয়ে দিতাম। অতঃপর যে নিজের দেহের গোশ্ত কামড়ে খাবে তাকে একই কথা জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলবে: আমি এজন্য অভিশপ্ত যে, আমি মানুষের গোশ্ত খেতাম, অর্থাৎ গীবত করতাম।' আল্লাহ আমাদের সকলকে এ সব জঘন্য পাপ থেকে রক্ষা করুন!
📄 রিয়া অর্থাৎ অন্যকে দেখানোর উদ্দেশ্যে সৎ কাজ করা
আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য ও আলামত হিসাবে বর্ণনা করে বলেন: "তারা মানুষকে দেখায় এবং আল্লাহকে কদাচিৎ স্মরণ করে।" (সূরা আন নিসা) "সেই সব নামাযীর জন্য ধ্বংস, যারা তাদের নামায সম্পর্কে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য নামায পড়ে এবং মানুষকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে সাহায্য করে না।" (সূরা আল মাউন) “হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের সদকাগুলোর খোঁটা দিয়ে নষ্ট করে দিওনা, যেমন লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দানকারী ব্যক্তি নষ্ট করে।" (সূরা আল বাকারাহ) "যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাত লাভের আশা করে, তার সৎ কাজ করা উচিত এবং নিজের রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক করা উচিত নয়।" (সূরা আল কাহফ) অর্থাৎ অন্যকে দেখিয়ে খুশী করার উদ্দেশ্যে ইবাদাত করা উচিত নয়।
হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে তিন ব্যক্তির বিচার অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ব্যক্তি আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছিল। তাকে হাজির করে তাকে দেয়া আল্লাহর নিয়ামতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। সে সকল নিয়ামতের স্বীকৃতি দেবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, তুমি এই সমস্ত নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কী কাজ করেছ? সে বলবে: আমি তোমার জন্য লড়াই করে শহীদ হয়েছি। আল্লাহ বলবেন: "তুমি মিথ্যা বলেছ। আসলে তোমাকে যাতে লোকে বীর বলে সেইজন্য লড়াই করেছিলে। লোকে তোমাকে তো বীর বলেছে।" অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার আদেশ দেয়া হবে। দ্বিতীয় ব্যক্তি আল্লাহর কাছ থেকে প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেছিল। তাকে হাজির করে আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে। সে আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্বীকার করবে। অতঃপর জিজ্ঞাসা করা হবে: তুমি এই বিপুল সম্পদ ছাড়া কী সৎ কাজ করেছ? সে বলবে: হে আল্লাহ! আমি তোমার পথে যেখানেই অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন দেখেছি, সেখানে অর্থ ব্যয়ে ইতস্তত করিনি। আল্লাহ বলবেন: তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি আমার পথে নয়, বরং লোকে যাতে তোমাকে দানশীল বলে প্রশংসা করে, সেই জন্য দান করেছ। লোকেরা তোমাকে তো দানশীল বলেছেই।" অতঃপর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তৃতীয় ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে ইসলামের জ্ঞান অর্জন করেছিল, অন্যকেও জ্ঞান বিতরণ করতো এবং কুরআন অধ্যয়ন করতো। তাকে হাজির করে তাকে প্রদত্ত আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে এবং সে তা স্বীকার করবে। জিজ্ঞাসা করা হবে যে, তুমি এই ইসলামী জ্ঞান দ্বারা কী কাজ করেছ? সে বলবে: আমি ইসলামী জ্ঞান অর্জন করেছি, জ্ঞান বিতরণও করেছি এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য আল কুরআন অধ্যয়ন করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং লোকেরা যাতে তোমাকে ক্বারী বলে প্রশংসা করে, সেই জন্য অধ্যয়ন করেছ। অতঃপর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়া হবে।" (সহীহ মুসলিম)
রাসূল (সা) আরো বলেন! "যে ব্যক্তি মানুষকে শুনানোর জন্য সৎ কাজ করে, আল্লাহ তাকে শুনাবেন। আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য করে, আল্লাহ তাকে দেখাবেন।” (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম) ইমাম খাত্তাবী বলেন, এ হাদীসের মর্ম এই যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তোষের জন্য নয় বরং মানুষকে শুনানো ও দেখানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তাকে এভাবে শাস্তি দেবেন যে, তার কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য ফাঁস করে দিয়ে কিয়ামতের দিন জনসমক্ষে অপমানিত করবেন। রাসূল (সা) আরো বলেন: সামান্যতম রিয়াও শিরকের শামিল। (তাবরানী, হাকেম) রাসূল (সা) আরো বলেন: তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর যে জিনিসটি ছড়িয়ে পড়ার আশংকা করি, সেটি হচ্ছে ছোট শিরক। জিজ্ঞাসা করা হলো যে, হে রাসূলাল্লাহ! ছোট শিরক কী? তিনি বললেন: লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সৎ কাজ করা। আল্লাহ যেদিন তার বান্দাদেরকে কর্মফল দেবেন সেদিন বলবেন: যাদেরকে দেখানোর জন্য তোমরা সৎ কাজ করতে, তাদের কাছে চলে যাও, এবং দেখ তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কিনা।” (আহমদ, বায়হাকী) পবিত্র আল কুরআনে আল্লাহ বলেনঃ "তাদের সামনে আল্লাহর পক্ষ হতে এমন জিনিস প্রতিভাত হবে, যা তারা কল্পনাও করেনি।" এর ব্যাখ্যা প্রসংগে কেউ বলেন যে, তারা এমন সব কাজ করতো, যাকে তারা দুনিয়ার সৎ কাজ মনে করতো, কিন্তু কিয়ামতের দিন তা খারাপ কাজ বলে প্রতিভাত হবে। এই আয়াত পড়ে কোন কোন বুযুর্গ বলতেন: রিয়াকারদের সর্বনাশ হোক।" ইবনে আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, কিয়ামতের দিন রিয়াকারকে চারটি নাম ধরে ডেকে বলা হবে: ওহে রিয়াকার, ওহে ভণ্ড, ওহে পাপিষ্ঠ, ওহে ক্ষতিগ্রস্ত। যাও, যাকে খুশী করার জন্য কাজ করেছিলে, তার কাছ থেকে তোমার পুরস্কার নাওগে। আমার কাছে তোমার জন্য কিছুই নেই।"
বর্ণিত আছে যে, হযরত উমর (রা) এক ব্যক্তিকে ঘাড় নিচু করে চলতে দেখলেন। তিনি বললেন: তুমি ঘাড় উঁচু করে চল। ঘাড় নিচু করাতে বিনয় নেই- বিনয় থাকে অন্তরে।" হযরত আবু উমামা বাহেলী (রা) এক ব্যক্তিকে দেখলেন, মসজিদে সিজদায় থাকাকালে উচ্চস্বরে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে দোয়া করছে। আবু উমামা তাকে বললেন: এরূপ কান্নাকাটি তোমার বাড়ীতে বসে করলেই ভালো করতে। ইমাম মুহাম্মদ বিন আল-মুবারক বলেন: "তোমার কাকুতি মিনতি রাত্রিকালে প্রকাশ্যে কর। কেননা রাত্রিকালে ওঠা আল্লাহর জন্য আর দিনের বেলায় ওটা মানুষের জন্য হয়ে থাকে।" হযরত আলী (রা) বলেন: রিয়াকারের আলামত এই যে, একাকী থাকলে উদাসীন ও অলস হয়ে যায়, আর লোকজনের মধ্যে থাকলে সক্রিয় হয় এবং প্রশংসা করলে বেশী করে সৎ কাজ করে, আর ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে বা নিন্দা সমালোচনা করলে সৎ কাজ কমিয়ে দেয়। হযরত ফযীল বিন ইয়ায বলেন: মানুষকে খুশী করার জন্য সৎ কাজ করা শিরক, আর মানুষের রোষের ভয়ে সৎ কাজ ছেড়ে দেয়া রিয়াকারী। ইখলাস হলো উভয় অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করার নাম। আল্লাহ আমাদেরকে রিয়া থেকে মুক্তি দিন ও ইখলাস দান করুন। আমীন!
(উল্লেখ্য যে, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্য না থাকলে অথবা মানুষকে সৎ কাজে উৎসাহিত করা উদ্দেশ্য থাকলে প্রকাশ্যে সৎ কাজ করা দোষের নয়। যেমন আল্লাহ বলেন: যারা দিনে ও রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে অর্থ দান করে, তাদের প্রতিপালকের কাছে তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে।" -অনুবাদক)