📄 হারাম খাওয়া ও হারাম উপার্জন করা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন : “তোমরা একে অপরের সম্পদ অবৈধভাবে ভোগদখল করোনা।” হযরত ইবনে আব্বাস বলেন : এর অর্থ হচ্ছে, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন শপথ দ্বারা অন্যের সম্পত্তির ওপর নিজের দখল প্রতিষ্ঠা করা। অবৈধভাবে তথা হারাম পন্থায় উপার্জন দুই রকমের হতে পারে। প্রথমত: সম্পূর্ণরূপে শক্তি প্রয়োগে ও অত্যাচারের মাধ্যমে, যেমন আত্মসাৎ, অপহরণ, জবরদখল, গচ্ছিত সম্পদ বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে ভোগদখল চুরি ডাকাতি ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত: খেলাধুলা, চালাকী, প্রতারণা ইত্যাদি। লটারী ও জুয়ার মাধ্যমে অর্থ জেতাও এর আওতাভুক্ত। সহীহ বুখারীতে আছে, রাসূল (সা) বলেছেন : “কিছুলোক এমন আছে যারা আল্লাহর বান্দাদের সম্পদে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করে। কিয়ামতের দিন তাদের জন্য জাহান্নাম নির্দিষ্ট রয়েছে।” সহীহ মুসলিমে আছে, রাসূল (সা) বলেছেন: “এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলিধূসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে "হে প্রভু” "হে প্রভু” বলে মুনাজাত করে, অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। তার মুনাজাত কিভাবে কবুল হবে?” হযরত আনাস (রা) বলেন: আমি বললাম, হে রাসূল, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমার দোয়া কবুল হয়। রাসূল (সা) বললেন : হে আনাস, তোমার উপার্জনকে হালাল রাখ, তোমার দোয়া কবুল হবে। মনে রেখ, কেউ যদি হারাম খাদ্যের এক গ্রাসও মুখে নেয়, তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার দোয়া কবুল হবেনা।” বায়হাকী বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেন: আল্লাহ তায়ালা যেমন তোমাদের মধ্যে তোমাদের জীবিকা বন্টন করেছেন, তোমাদের মধ্যে তোমাদের স্বভাব চরিচত্ত বন্টন করেছেন। দুনিয়ার সম্পদ তিনি যাকে ভালোবাসেন তাকেও দেন, যাকে ভালোবাসেন না তাকেও দেন। কিন্তু দীন তথা আখিরাতের সম্পদ কেবল তাকেই দেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন। আল্লাহ যাকে দীন দান করেছেন, বুঝতে হবে যে, তিনি তাকে ভালোবেসেছেন। কোন বান্দা হারাম সম্পদ উপার্জন করে তা নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করলে তাতে সে বরকত ও কল্যাণ লাভ করবেনা। অন্যকে দান করলে সেই দানও কবুল হবেনা, আর যেটুকু সে দুনিয়ায় রেখে যাবে, তা তার জন্য জাহান্নামের সম্বল হবে। আল্লাহ মন্দকে মন্দ দিয়ে প্রতিহত করেন না, মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করেন।" (মুসনাদে আহমাদ) হযরত ইবনে ওমর (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: পৃথিবী মিষ্ট ও শ্যামল। এখানে যে ব্যক্তি হালাল সম্পদ উপার্জন করবে এবং ন্যায়সংগত পথে তা ব্য করবে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন তাকে জান্নাত দান করবেন। আর যে ব্যক্তি হারাম সম্পদ উপার্জন করবে এবং তা অন্যায় পথে ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে অপমানজনক স্থানে নির্বাসিত করবেন। আর হারাম সম্পদ হস্তগতকারী ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন আগুনে জ্বলবে।"
রাসূল (সা) আরো বলেন: "যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করবে তার পরোয়া করেনা, আল্লাহ তায়ালা তাকে কোন্ দরজা দিয়ে জাহান্নামে ঢুকাবেন তার পরোয়া করবেন না।" হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন: "কোন মুসলমানের হারাম জিনিস খাওয়ার চেয়ে মাটি খাওয়াও ভালো।” (মুসনাদে আহমাদ) হযরত ইউসুফ বিন আসবাত (রহঃ) বলেন: কোন যুবক যখন ইবাদাতে মনোনিবেশ করে, তখন শয়তান নিজের সহকর্মীদেরকে বলেঃ খোঁজ নাও লোকটি কী খায়! সে যদি হারাম খায়, তাহলে সে যত ইচ্ছা ইবাদাত করে ক্লান্ত হোক, বাধা দিওনা। কেননা সে নিজেই নিজের ইবাদাত ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। হারাম খাওয়া অব্যাহত রেখে ইবাদাত তার কোন কাজে লাগবেনা।” এ উক্তিটি ইতিপূর্বে উদ্ধৃত সহীহ মুসলিমের হাদীস দ্বারা সমর্থিত।
একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, একজন ফিরিশতা বাইতুল মাকদিসে প্রতি রাতে ও দিনে ঘোষণা দিতে থাকে যে, "যে ব্যক্তি হারাম খায় আল্লাহ তার ফরয ও নফল কিছুই গ্রহণ করেন না।" আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন: “সন্দেহজনক একটি দিরহাম গ্রহণ করার চাইতে আমার কাছে লক্ষ টাকা দান করা অধিকতর পছন্দনীয়।" রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি হারাম অর্থ ব্যয় করে হজ্জে গিয়ে বলে "লাব্বায়েক” (প্রভু আমি হাজির), তাকে একজন ফিরিশতা বলে: তোমার লাব্বায়েক গ্রহণযোগ্য নয়। তোমার হজ্জ তোমার মুখের ওপরই ছুড়ে দেয়া হলো।” (তাবারানী)
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি দশ দিরহাম দিয়ে কোন কাপড় কিনলো এবং তার মধ্যে এক দিরহাম অসৎ উপায়ে অর্জিত, সে যতদিন ঐ কাপড় পরিহিত থাকবে ততদিন তার নামায কবুল "হবেনা।" ইমাম ওহব ইবনুল ওয়ারদ বলেন! তুমি যদি জিহাদের ময়দানে যোদ্ধা অথবা প্রহরী হিসাবে নিয়োজিত থাক, তাতেও কোন ফায়দা হবেনা, যতক্ষণ তুমি যা খাচ্ছ তা হালাল না হারাম, তা লক্ষ্য না রাখ।" হযরত ইবনে আব্বাস বলেনঃ "আল্লাহর কাছে তওবা করে সৎ উপার্জনে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহ কোন হারামখোরের নামায কবুল করেন না।" হযরত সুফিয়ান সাওরী বলেন: “যে ব্যক্তি হারাম অর্থ দ্বারা কোন সৎ কাজ করে, সে পেশাব দ্বারা কাপড় ধৌতকারীর মত। কাপড় পবিত্র পানি ছাড়া পাক হয় না। আর গুনাহর কাফফারাও হালাল উপার্জন ছাড়া সম্ভব নয়।" হযরত ওমর (রা) বলেন: "আমরা হারামের মধ্যে পতিত হওয়ার ভয়ে হালাল সম্পদের দশ ভাগের নয় ভাগ বর্জন করতাম।" রাসূল (সা) বলেন: "যে শরীর হারাম খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে, তা জান্নাতে যাবেনা।" (তিরমিযী) সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকরের একজন গোলাম ছিল। সে হযরত আবু বকরকে মুক্তিপণ হিসাবে কিছু অর্থ দেয়ার শর্তে মুক্তি চাইলে তিনি তাতে সম্মত হন। অতঃপর সে প্রতিদিন তার মুক্তিপনের কিছু অংশ নিয়ে আসতো। হযরত আবু বকর তাকে জিজ্ঞেস করতেন, কিভাবে এটা উপার্জন করে এনেছ? সে যদি সন্তোষজনক জবাব দিত তবে তিনি তা গ্রহণ ও ভোগ করতেন, নচেত করতেন না। একদিন সে রাতের বেলায় তাঁর জন্য কিছু খাবার জিনিস নিয়ে এল। সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। তাই তাকে ঐ খাদ্যের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ভুলে গেলেন এবং এক লোকমা খেয়ে নিলেন। তাঁর পর তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ খাবার তুমি কিভাবে সংগ্রহ করেছ? সে বললোঃ আমি জাহেলিয়ত আমলে লোকের ভাগ্যগণনা করতাম। আমি ভালো গণনা করতে পারতাম না। কেবল ধোকা দিতাম। এ খাদ্য সেই ভাগ্যগণনার উপার্জিত অর্থ দ্বারা সংগৃহীত। হযরত আবু বকর (রা) বললেন: কী সর্বনাশ! তুমি তো আমাকে ধ্বংস করে ফেলার উপক্রম করেছ। তারপর গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বমিতে খাওয়া জিনিস বেরুলোনা। উপস্থিত লোকেরা তাকে বললো যে, পানি না খেলে খাওয়া জিনিস বেরুবেনা। তখন তিনি পানি চাইলেন। পানি খেয়ে খেয়ে সমস্ত ভুক্ত দ্রব্য পেট থেকে বের করে দিলেন। লোকেরা বললোঃ আল্লাহ আপনার ওপর দয়া করুন। ঐ এক লোকমা খাওয়ার কারণেই কি এত সব? হযরত আবু বকর (রা) বললেন: ঐ খাদ্য বের করার জন্য যদি আমাকে মৃত্যু বরণও করতে হতো, তবুও আমি বের করে ছাড়তাম। কেননা আমি শুনেছি, রাসূল (সা) বলেছেন: "যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে ওঠে তার জন্য দোজখের আগুনই উত্তম।" তাই আমি আশংকা করছিলাম যে, এই এক লোকমা খাদ্য দ্বারা আমার শরীরের কিছু অংশ গঠিত হতে পারে। বিজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন: জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা, খেয়ানত, চুরি, ধোকাবাজী ও জালিয়াতি, সুদ ও সুদের দালালী, মিথ্যা সাক্ষ্য দান, ধার করে নিয়ে পরে আত্মসাৎ, ঘুষ খাওয়া, মাপে ও ওজনে কমবেশী করা, পণ্যের দোষ গোপন করে বিক্রি করা, জুয়া, যাদু, জ্যোতিষ গণনা, ছবি আঁকা ও তোলা, ব্যভিচার, মৃত ব্যক্তির জন্য পেশাদারী কান্না, বিক্রেতার অনুমতি ছাড়া ক্রেতার কাছ থেকে দালালীর পারিশ্রমিক নেয়া, ক্রেতাকে অর্থের বিনিময়ে পণ্যের সন্ধান দান, স্বাধীন মানুষ বিক্রী, মদ ও শুকর বিক্রী বাবদ অর্জিত সম্পদ ও অপহরণকৃত এতিমের সম্পদ- এই সবই হারাম সম্পদ।
রাসূল (সা) বলেছেন: "কিয়ামতের দিন কিছু লোক তাহামার পাহাড় সমান সৎ কর্ম নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সংগে সংগেই তাকে ধুলিকণার মত বানিয়ে উড়িয়ে দেবেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলোঃ হে রাসূল, এটা কিভাবে সম্ভব হবে? রাসূল (সা) বললেন: এই লোকগুলো নামায পড়তো, রোযা রাখতো, যাকাত দিত ও হজ্জ করতো। কিন্তু যখনই কোন হারামের সংস্পর্শে আসতো, অমনি তাতে লিপ্ত হয়ে পড়তো। তাই আল্লাহ তাদের সকল নেক আমল বাতিল করে দিয়েছেন।” (তাবারানী)
বর্ণিত আছে যে, জনৈক পুণ্যবান ব্যক্তিকে কেউ স্বপ্নে দেখে তার অবস্থা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ আমি কোন আযাব ভোগ করছিনা। তবে দুনিয়ার জীবনে একটি সূঁচ ধার নিয়ে তা ফেরত দেইনি বলে আমার জান্নাতে যাওয়া স্থগিত রয়েছে।
উপদেশ: আখিরাতের কঠিন ও অবধারিত শাস্তির কথা মনে রেখে সব সময় হারাম থেকে পরহেজ করে চলা উচিত।
📄 মিথ্যা বলা
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন: "মিথ্যাবাদীদের ওপর অভিসম্পাত।" (আল বাকারা) তিনি আরো বলেন: 'আল্লাহ তায়ালা মিথ্যুক অপচয়ীকে সুপথ দেখান না।” (মুমিন) সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: সত্যবাদিতা মানুষকে সততার পথে টেনে নিয়ে যায়, আর সততা টেনে নিয়ে যায় জান্নাতের দিকে। কোন ব্যক্তি ক্রমাগত সত্য বলতে থাকলে এবং সত্যের পথ অন্বেষণ করতে থাকলে এক সময় তাকে সিদ্দীক তথা "পরম সত্যনিষ্ঠ” বলে আল্লাহর কাছে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর মিথ্যা মানুষকে পাপাচারের দিকে এবং পাপাচার জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়। আর কোন ব্যক্তি ক্রমাগত মিথ্যা বলা ও মিথ্যার পথ অন্বেষণ করতে থাকলে এক সময় আল্লাহর দরবারে তাকে 'মিথ্যুক' লেখা হয়। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: তিনটি জিনিস মুনাফিকের আলামত - "চাই সে যতই নামায রোযা করুক এবং নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করুক: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা কবলে তা খেলাফ করে এবং আমানত রাখলে তার খেয়ানত করে।"
সহীহ আল বুখারীতে অপর এক হাদীসে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: চারটি দোষ যার ভেতরে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক। আর যার ভেতরে এর একটি থাকবে, সে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার ভেতরে মুনাফেকীর একটি আলামত থেকে যাবে: আমানতের খেয়ানত করা, ওয়াদা খেলাপ করা, মিথ্যা বলা ও ঝগড়ার সময় গালিগালাজ করা।
সহীহ আল বুখারীতে যে দীর্ঘ হাদীসে রাসূল (সা) এর স্বপ্নের বৃতান্ত দেয়া হয়েছে, তাতে এক জায়গায় রাসূল (সা) বলেন: এক শায়িত ব্যক্তির কাছে আমরা উপস্থিত হলাম। দেখলাম, এক ব্যক্তি তার পাশে দাঁড়িয়ে লোহার একটি অস্ত্র দিয়ে একবার তার ডানপাশের চোয়াল ও চোখ একেবারে পেছন পর্যন্ত ফেড়ে দিচ্ছে। তারপর যখনই বাম দিকে অনুরূপ ফেড়ে দিচ্ছে, তখন ডান দিকটা আগের মত স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। আবার ডান দিকে পুনরায় চোয়াল ফেড়ে দিলে বাম দিক ভালো হয়ে যাচ্ছে।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম: এই ব্যক্তি কে? আমার সংগী ফিরিশতাদ্বয় বললেনঃ সে বাড়ী থেকে বেরিয়ে একটা মিথ্যে গুজব রটিয়ে ছেড়ে দিতো এবং তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো।
আর একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: মুমিনের স্বভাবে সব রকমের দোষ থাকা সম্ভব, কিন্তু মিথ্যা ও খেয়ানত থাকা সম্ভব নয়।
রাসূল (সা) বলেন: "তোমরা কারো সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করোনা। কেননা খারাপ ধারণা জঘন্যতম মিথ্যাচার।" (সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম)
মুসলিম শরীফের হাদীসে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে দৃষ্টি দেবেন না এবং তাদেরকে গুনাহ থেকে পবিত্র করবেন নাঃ ব্যভিচারী বৃদ্ধ, মিথ্যুক শাসক এবং অহংকারী দরিদ্র।
মুসনাদে আহমদের হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "মানুষকে হাসানোর জন্য যে মিথ্যা বলে তার সর্বানশ হোক, তার সর্বনাশ হোক, তার সর্বনাশ হোক।" মিথ্যার মধ্যে অধিকতর মারাত্মক হচ্ছে মিথ্যা শপথ। সূরা আল মুনাফিকুনে আল্লাহ তায়ালা এটিকে মুনাফিকদের স্বভাব বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন: মুনাফিকরা জেনে শুনেও মিথ্যা শপথ করে। (২৬ নং কবীরা গুনাহ দ্রষ্টব্য) আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও বায়হাকীতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: তিনজনের সাথে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন কথাও বলবেন না। তাদেরকে পবিত্র করবেন না, অধিকন্তু তাদের জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারিত থাকবে: যে ব্যক্তির উদ্বৃত্ত পানি আছে, কিন্তু পথিককে তা ব্যবহার করতে দেয় না, যে ব্যক্তি খরিদ্দারকে মিথ্যা শপথ করে বলে যে, আমি এত দামে কিনেছি, আর খরিদ্দার তা বিশ্বাস করে তা অধিক মূল্যে কিনে নেয়, অথচ আসলে সে সেই দামে তা কেনেনি, এবং যে ব্যক্তি কোন নেতার প্রতি নিছক দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য আনুগত্য করার ওয়াদা করে, অতঃপর নেতা তাকে স্বার্থ দিলে সে তার আনুগত্য করে, নচেত করেনা।
রাসূল (সা) আরো বলেন: "যে ব্যক্তি তোমাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করে, তার সাথে মিথ্যা কথা বলা নিকৃষ্টতম বিশ্বাসঘাতকতা।"
রাসূল (সা) আরো বলেন: "আল্লাহর সাথে সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হলো কোন ব্যক্তি যা দেখেনি, তাই দেখেছে বলে দাবী করা।" অর্থাৎ সে বলে আমি এরূপ স্বপ্নে দেখেছি, অথচ তা সে দেখেনি। হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেন: কোন বান্দা ক্রমাগত মিথ্যা বলতে থাকলে তার হৃদয়ে প্রথমে একটা কালো দাগ পড়ে, অতঃপর সেই দাগ বড় হতে হতে পুরো হৃদয়টা কালো হয়ে যায়। তখন আল্লাহর কাছে তাকে মিথ্যাবাদী লেখা হয়।
সুতরাং সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কল্যাণ নিহিত আছে এমন অবস্থা ছাড়া কোন মুসলমানের কোন অবস্থাতেই মিথ্যা বলা উচিত নয়। তার উচিত হয় সত্য বলা, নচেত চুপ থাকা।
রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে সে যেন ভালো কথা বলে, নচেত চুপ থাকে।" এ হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, কোন কথার কল্যাণকরিতা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত না হলে সে কথা বলা উচিত নয়।
হযরত আবু মূসা (রা) বলেন: আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, হে রাসূল! مسلمانوں মধ্যে কে উত্তম? রাসূল (সা) বললেন: যার জিহবা ও হাত দ্বারা অন্য মুসলমান কষ্ট পায় না। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসায়ী)
অপর হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ "যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ জেনে শুনে হারাম বাক্য উচ্চারণ করে, সে জাহান্নামে এত নিচে নিক্ষিপ্ত হবে, যা পৃথিবীর পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত অপেক্ষাও দূরে অবস্থিত।" উল্লেখ্য যে, কারো প্রাণ রক্ষা, দুইপক্ষের কলহ প্রশমিত করা এবং দাম্পত্য সম্পর্কে ভাংগন রোধ করার প্রয়োজনে মিথ্যা বলার শুধু অনুমতি আছে তা নয়, বরং ক্ষেত্র বিশেষে তা অবশ্য কর্তব্য। তবে এরূপ ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট মিথ্যা বলার চাইতে দ্ব্যর্থবোধক কথা বলা ভাল। যেমন সূর পর্বতগুহায় যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি হযরত আবু বকরকে রাসূল (সা) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো, ইনি কে? আবু বকর বললেন: উনি আমার পথ প্রদর্শক।
জনৈক মনীষী বলেছেন: মানুষের ভেতরে প্রায় আট হাজার চারিত্রিক দোষ রয়েছে। কিন্তু একটি গুণ তার সব দোষ ঢেকে দিতে সক্ষম। সে গুণটি হলো বাকসংযম। আর একটি গুণ তার সব দোষ দূর করতে পারে। তাহচ্ছে সত্যবাদিতা।
📄 বিচার কার্যে অসততা ও দুর্নীতি
আল্লাহ তায়ালা সূরা আল মায়েদায় বলেন: "আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুসারে যারা বিচার ও শাসন করে না তারা জালেম"... "আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুসারে যারা বিচার ও শাসন করেনা তারা কাফের"... "যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুসারে বিচার ও শাসন করে না তারা ফাসেক।" রাসূল (সা) বলেছেন: যে বিচারক বা শাসক আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুসারে ফায়সালা করে না, আল্লাহ তার নামায কবুল করেন না। (হাকেম) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: বিচারক তিন প্রকারের: তন্মধ্যে দুপ্রকারের বিচারক জাহান্নামে যাবে এবং এক প্রকারের বিচারক জান্নাতে যাবে। যে বিচারক সত্য ও ন্যায় কি, তা জানে এবং তদনুযায়ী বিচার করে সে জান্নাতে যাবে। আর যে বিচারক সত্য ও ন্যায় কি তা জানে না, আর যে বিচারক সত্য ও ন্যায় কি তা জেনেও ন্যায়বিচার করেনা, এরা উভয়ে দোজখবাসী। জিজ্ঞাসা করা হলো যে, যে জানেনা তার কি দোষ? রাসূল (সা) বললেন: "সে না জেনে বিচারক হয়েছে এটাই তার দোষ।" (হাকেম, আবু দাউদ, তিরমিযী) হযরত আবু হুরাইয়া (রা) বলেন: যাকে বিচারক নিয়োগ করা হলো, তাকে যেন ছুরি ছাড়াই যবাই করা হলো।” হযরত ফযীল বিন ইয়ায বলেন: "একজন বিচারপতির উচিত একদিন বিচারকার্য পরিচালনা করা, আর একদিন নিজের জন্য কান্নাকাটি করা।" ইমাম মুহাম্মাদ বিন ওয়াসে (রহ) বলেন: কিয়ামতের দিন সবার আগে বিচারকদেরকেই হিসাবের জন্য ডাকা হবে।" রাসূল (সা) বলেছেন: একজন ন্যায় বিচারককে যখন কিয়ামতের দিন হিসাবের সম্মুখীন করা হবে তখন হিসাবের কঠোরতা দেখে সে আক্ষেপ করবে যে, একটা খোরমা সংক্রান্ত বিবাদেও যদি আমি দু'জনের বিচার না করতাম।" হযরত আলী (রা) বলেন: রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি যে, প্রত্যেক শাসক ও বিচারককে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে পুলসিরাতে দাঁড় করিয়ে সমগ্র মানব জাতির সামনে তার গোপন আমলনামা পাঠ করা হবে। অতঃপর সে যদি ন্যায় বিচারক সাব্যস্ত হয়, তবে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেবেন, নচেত পুলসিরাত সহ সে জাহান্নামে পতিত হবে।
📄 ঘুষ খাওয়া
আল্লাহ তায়ালা বলেন : 'তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের অর্থ আত্মসাৎ করোনা, শাসকদের কাছে অর্থ নিয়ে যেওনা, যাতে তোমরা মানুষের অর্থের একাংশ অন্যায় পন্থায় ভোগ করতে পার। অথচ তোমরা জান।” অর্থাৎ তোমরা শাসকদেরকে উৎকোচ দিয়ে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার ব্যবস্থা করোনা, অথচ তোমরা তো জান যে, এ রকম করা বৈধ নয়। রাসূল (সা) বলেছেন : আল্লাহ ঘুষদাতা ও ঘুষখোর উভয়কে অভিসম্পাত দিয়েছেন। ইমামগণ একমত হয়ে বলেছেন যে, ঘুষদাতার ওপর অভিসম্পাত তখনই পতিত হবে, যখন সে তা দ্বারা অন্যের ক্ষতি সাধনে ব্রতী হবে অথবা নিজের প্রাপ্য নয় এমন কোন সুবিধা আদায় করতে চাইবে। কিন্তু সে যদি নিজের কোন ন্যায্য প্রাপ্য জিনিস বা অধিকার আদায়ের জন্য অনন্যোপায় হয়ে ঘুষ দেয় এবং কারো জুলুম থেকে বাঁচার জন্য ঘুষ দেয়, তবে তার ওপর অভিসম্পাত পতিত হবেনা। এ সংক্রান্ত যে হাদীস আবু দাউদ ও তিরমিযী উদ্ধৃত করেছেন, তাতে ঘুষদাতা ও ঘুষখোরের মাঝে তৃতীয় যে ব্যক্তি উভয়কে সাহায্য করে, তাকেও অভিশপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ব্যক্তি যদি ঘুষদাতা কর্তৃক নিযুক্ত হয়, তবে ন্যায্য অধিকার আদায় ও জুলুম থেকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে তার অবস্থা ঘুষদাতার মত হবে এবং সে অভিসম্পাতের যোগ্য হবেনা। নচেত অভিসম্পাতের যোগ্য হবে। তবে শাসকের জন্য ঘুষ আদান প্রদান সর্বাবস্থায় হারাম- চাই তা কারো অধিকার বিনষ্ট করার মাধ্যমেই করুক, অথবা কোন জুলুম প্রতিহত করার জন্যই করুক।
রাসূল (সা) আরো বলেছেন : যে ব্যক্তি কারো জন্য সুপারিশ করলো, অতঃপর যার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, সে তাকে কোন হাদিয়া বা উপহার দিল, সে যদি এই হাদিয়া গ্রহণ করে, তবে তা হবে একটি বড় ধরনের সুদ খাওয়ার পর্যায়ভুক্ত। হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেন: "তোমার ভাই এর প্রয়োজন পূরণ করে দিয়ে তার কাছ থেকে যদি উপহার গ্রহণ কর তবে তা হবে হারাম।" (উল্লেখ থাকে যে, যে ব্যক্তি কোন কাজের জন্য বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত থাকে, সে যদি তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত কোন কাজ করে দিয়ে যার জন্য কাজ করেছে তার কাছ থেকে কোন বিনিময় গ্রহণ করে, তবে সেটা সর্বসম্মতভাবে ঘুষ- চাই তা উপহার, উপঢৌকন, হাদিয়া বা বখশিস যে নামেই প্রদত্ত হোক না কেন। আর যদি দায়িত্বের অতিরিক্ত হয় এবং চাকুরীর সময়ের বাইরে করা হয় তবে সে জন্য পারিশ্রমিক বা পারিতোষিক নিলে তা ঘুষ হবেনা। -অনুবাদক)
বর্ণিত আছে যে, একবার একজন খৃষ্টান বৈরুতে ইমাম আওযায়ীর সাথে সাক্ষাত করে অভিযোগ করলো যে, বা'লাবাকের শাসক তার ওপর অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত খাজনা আরোপ করেছে। সে এই জুলুমের প্রতিকারে সুপারিশমূলক চিঠি লেখার জন্য ইমাম সাহেবকে অনুরোধ করলো এবং তাকে হাদিয়া হিসাবে এক বোতল মধু দিল। ইমাম আওযায়ী তাকে বললেন: আমি চিঠি লিখে দেব এবং মধুর বোতলটি তোমাকে ফেরত দিব। লোকটি মধুর বোতল ও চিঠি নিয়ে চলে গেল এবং ইমাম সাহেবের অনুরোধক্রমে বা'লাবাকের শাসক তার খাজনা থেকে ৩০ দিরহাম কমিয়ে দিল।