📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 মিথ্যা শপথ করা

📄 মিথ্যা শপথ করা


আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয় যারা আল্লাহর নামে ওয়াদা করে ও কসম খেয়ে তার বিনিময়ে ক্ষুদ্র স্বার্থ লাভ করে, আখেরাতে তাদের কিছুই প্রাপ্য থাকবেনা, আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে দৃষ্টি দেবেন না, এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। অধিকন্তু তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।" (আলে ইমরান)
ইমাম ওয়াহদী বলেন: একবার একটি জমির মালিকানা নিয়ে দুই ব্যক্তি পরস্পর বিরোধী দাবী জানাতে থাকে এবং তাদের বিবাদের মীমাংসার জন্য তারা উভয়ে রাসূলের (সা) নিকট গমন করে। বিবাদী যখন নিজের দাবীর স্বপক্ষে কসম খেতে উদ্যত হলো, অমনি এই আয়াত নাযিল হলো। ফলে সে কসম খাওয়া থেকে বিরত হয় এবং জমির ওপর বাদীর মালিকানা মেনে নেয়।
এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: যে ব্যক্তি নিজে হকদার না হয়েও অপরের সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য কসম খায়, সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময় তাকে রাগান্বিত দেখবে। আশয়াস বলেন: উপরোক্ত আয়াতটি আমার সম্পর্কেই নাযিল হয়েছিল। জনৈক ইহুদীর সাথে একটি জমি নিয়ে আমার বিরোধ ছিল। আমি তাঁকে রাসূলের (সা) কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন: তোমার কি সাক্ষী বা প্রমাণ আছে? আমি বললাম: না। তখন রাসূল (সা) উক্ত ইহুদীকে বললেন: তুমি শপথ করে বল যে ঐ জমি তোমার। আমি বললামঃ হে রাসূল! ইহুদীকে শপথ করার সুযোগ দিলে তো সে শপথ করে আমার জমি নিয়ে নেবে। এই সময় এই আয়াত নাযিল হয়। আয়াতটিতে যে "ক্ষুদ্র স্বার্থের” কথা বলা হয়েছে, তা দ্বারা পার্থিব স্বার্থকেই বুঝানো হয়েছে, যার জন্য লোকেরা সচরাচর মিথ্যা কসম খেয়ে থাকে।
প্রসংগতঃ উল্লেখ্যযোগ্য যে, ইসলামী আইন অনুসারে আদালতে বাদী উপযুক্ত সাক্ষী প্রমাণ উপস্থিত করতে অক্ষম হলে বিবাদী শপথ করার সুযোগ লাভ করে থাকে এবং এই শপথের ভিত্তিতেই আদালত বিবাদের নিষ্পত্তি করে থাকে। তাই এরূপ ক্ষেত্রে শপথ অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত: রাসূল (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি নিজের প্রাপ্য নয় জেনেও কোন সম্পত্তির দাবীতে শপথ করে, সে আল্লাহকে রাগান্বিত অবস্থায় দেখতে পাবে।' অতঃপর রাসূল (সা) এই আয়াতটি পাঠ করলেন যে, "যারা আল্লাহর নামে ওয়াদা করে ও কসম খেয়ে তার বিনিময়ে ক্ষুদ্র স্বার্থ লাভ করে...।"
হযরত আবু উমামা (রা) বলেন: আমরা রাসূলের (সা) কাছে বসা ছিলাম। রাসূল (সা) বললেন: যে ব্যক্তি নিজের শপথ দ্বারা কোন মুসলমানদের সম্পদ কুক্ষিগত করে, সে নিজের জন্য জাহান্নাম অবধারিত ও জান্নাত হারাম করে ফেলে। এক ব্যক্তি বললোঃ হে রাসূল! যদি তা খুব নগণ্য জিনিস হয় তবুও? তিনি বললেনঃ "যদি একটা গাছের ডালও হয় তবুও।" (সহীহ মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)
সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে মাজাতে হযরত আবু যর থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "তিন ব্যক্তির সাথে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা কথা বলবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।" এ কথাটা তিনি তিনবার বললেন। হযরত আবু যর বললেনঃ "ওরা তো চরম ক্ষতিগ্রস্ত ও হতভাগ্য ব্যক্তি। হে রাসূল! তারা কারা?" রাসূল (সা) বললেন: যে ব্যক্তি পায়ের গোড়ালী সমান কাপড় পরে, যে দান বা উপকার করে তার খোঁটা দেয় এবং যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথ করে তার পণ্য বিক্রী করে। অর্থাৎ শপথ করে মিথ্যামিথ্যি পণ্যের উচ্চতর ক্রয়মূল্য বা বিদেশী পণ্য বলে উল্লেখ করে, যাতে উচ্চ মূল্যে তা বিক্রি করা যায়, অথচ মিথ্যা শপথ করে পণ্যের ত্রুটি গোপন করে। সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত অপর হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: কবীরা গুনাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতামাতাকে অসন্তুষ্ট করা, আত্মহত্যা করা ও মিথ্যা শপথ করা। ইচ্ছাকৃতভাবে যে মিথ্যা শপথ করা হয়, তাকে শরীয়তের পরিভাষায় 'ইয়ামীনে গামূস' তথা নিমজ্জিতকারী শপথ বলা হয়। কারণ এই শপথ মানুষকে পাপে নিমজ্জিত করে।
কারো কারো মতে তাকে আগুনে নিমজ্জিত করে বলে এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করাও কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। যেমন নবীর কসম, কাবার কসম, ফেরেশতার কসম, আকাশের কসম, পানির কসম, জীবনের কসম, আমানতের কসম, প্রাণের কসম, মাথার কসম, অমুকের মাজারের কসম, ইত্যাদি।
মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক, সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, জামে' তিরমিযী, সুনানে নাসায়ী ও সুনানে ইবনে মাজাতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের পিতৃপুরুষদের নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। শপথ যদি করতেই হয় তবে আল্লাহর নামেই শপথ করবে, নচেত চুপ থাকবে।"
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “তোমারা দেবদেবীর নামে বা বাপ-দাদার নামে শপথ করোনা।" "আমার কথা সত্য নাহলে আমি অমুকের সন্তান নই-" এরূপ বলা বাপ-দাদার নামে শপথের পর্যায়ভুক্ত। আবুদাউদ, ইবনে মাজাহ ও হাকেম বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “যে ব্যক্তি এভাবে শপথ করে যে, আমার কথা সত্য না হলে আমি মুসলমান নই, সে মিথ্যুক হলে যা বলেছে তাই হবে (ঈমান থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে) আর সে সত্যবাদী হলেও সম্পূর্ণ নিরাপদে ইসলামের পথে বহাল থাকতে পারবেনা।"
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “কেউ অভ্যাসবশতঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে ভুলক্রমে শপথ করলে তৎক্ষণাৎ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলবে।"

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 যুলুম করা

📄 যুলুম করা


যুলুম বা অত্যাচার নানাভাবে করা হয়ে থাকে। তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রচলিত রূপ হলো মানুষের সম্পদ হরণ, জোর পূর্বক অন্যের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া, মানুষকে প্রহার করা, গালিগালাজ করা, বিনা উস্কানীতে কারো ওপর আক্রমণ চালানো এবং আর্থিক, দৈহিক ও মর্যাদার ক্ষতিসাধন এবং দুর্বলদের ওপর নৃশংসতা চালানো ইত্যাদি।
পবিত্র কুরআনে সূরা ইবরাহীমে আল্লাহ বলেনঃ "যালেমদের কর্মকান্ড সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো উদাসীন মনে করোনা। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে শুধু একটি নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফারিত হবে, তারা মাথা নিচু করে উঠিপড়ি করে দৌড়াতে থাকবে, তাদের চোখ তাদের নিজেদের দিকে ফিরবেনা, এবং তাদের হৃদয়সমূহ দিশাহারা হয়ে যাবে। মানুষকে আযাব সমাগত হওয়ার দিন সম্পর্কে সাবধান করে দাও। সেদিন যুলুমবাজরা বলবে : হে আমাদের প্রভু! অল্প কিছুদিন আমাদেরকে সময় দিন, তাহলে আমরা আপনার দাওয়াত কবুল করবো এবং রাসূলদের অনুসরণ করবো। তোমরা কি ইতিপূর্বে কসম খেয়ে খেয়ে বলতে না যে তোমাদের পতন নেই! যারা নিজেদের ওপর যুলুম করেছে, তোমরা তো তাদের বাসস্থানেই বাস করেছ এবং সেই সব যালেমের সাথে আমি কেমন আচরণ করেছি, তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। উপরন্তু আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ দিয়েছি।"
সূর আশ শুরাতে আল্লাহ বলেন: "শুধু তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে থাকে।" সূরা আশ শুরারার শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন: “যুলুমবাজরা তাদের যুলুমের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে।"
রাসূল (সা) বলেন: আল্লাহ তায়ালা যালেমকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেননা। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন : তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি যুলুম রত জনপদ সমূহকে পাকড়াও করেন। তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য।" (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে' তিরমিযী)
রাসূল (সা:) আরো বলেন: "কেউ যদি তার কোন ভাই-এর সম্মান হানি কিংবা কোন জিনিসপত্রের ক্ষতি করে থাকে, তবে আজই তার কাছ থেকে তা বৈধ করে নেয়া উ'চিৎ (অর্থাৎ ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত) এবং সেই ভয়াবহ দিন আসার আগেই এটা করা উচিত, যেদিন টাকা কড়ি দিয়ে কোন প্রতিকার করা যাবেনা, বরং তার কাছে কোন নেক আমল থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ হিসাবে মযলুমকে উক্ত নেক আমল দিয়ে দেয়া হবে এবং তার কোন অসৎ কাজ না থাকলেও উক্ত মযলুমের অসৎ কাজ তার ওপর বর্তানো হবে।" (সহীহ আল বুখারী ও জামে' তিরমিযী)
একটি হাদীসে কুদসীতে রাসূল (স) বলেন: আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : "হে আমার বান্দারা! আমি নিজের ওপর যুলুম হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পরের ওপর যুলুম করোনা।” (সহীহ মুসলিম, জামে' তিরমিষী)
অপর এক হাদীসে আছে: "রাসূল (সা) সাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তোমরা কি জান, দরিদ্র কে? তাঁরা বললেন: আমাদের মধ্যে যার অর্থ নেই, সম্পদ নেই, সেই দরিদ্র। রাসূল (সা) বললেন: আমার উম্মাতের মধ্যে দরিদ্র ব্যক্তি সে-ই, যে কিয়ামতের দিন প্রচুর নামায, যাকাত, রোযা ও হজ্জ সংগে করে আনবে, কিন্তু সে এমন অবস্থায় আসবে যে, কাউকে গালি দিয়ে এসেছে, কারো সম্পদ হরণ করে এসেছে, কারো সম্মানের হানি করেছে, কাউকে প্রহার করেছে, এবং কারো রক্তপাত করেছে। অতঃপর এই ব্যক্তির সৎ কার্যগুলো তাদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হবে। এভাবে মযলুমদের ক্ষতি পূরণের আগেই তার সৎকাজগুলো শেষ হয়ে গেলে মযলুমদের গুনাহগুলো একে একে তার ঘাড়ে চাপানো হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।" (সহী আল বুখারী ও অন্যান্য সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহ) সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত অপর হাদীসে আছেঃ "যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণও অন্যের জমি জবর দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার ঘাড়ে সাতটি পৃথিবী চাপিয়ে দেয়া হবে।” একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন: আমি সেই ব্যক্তির ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হই, যে এমন ব্যক্তির ওপর অত্যাচার করে, যার আমি ছাড়া কোন সাহায্যকারী নেই।"
জনৈক আরব কবি বলেন: "ক্ষমতা থাকলেই যুলুম করোনা, যুলুমের পরিণাম অনুশোচনা ছাড়া আর কিছু নয়। যুলুম করার পর তুমি তো সুখে নিদ্রা যাও, কিন্তু মযলুমের চোখে ঘুম আসেনা। সে সারা রাত তোমার ওপর বদ দোয়া করে, এবং আল্লাহ তা শোনেন। কেননা তিনিও ঘুমান না।" জনৈক মনীষী বলেছেন: "দুর্বলদের ওপর যুলুম করোনা। তাহলে তারা একদিন চরম ক্ষতিকর শক্তিমান গোষ্ঠীতে পরিণত হবে।"
তাওরাতে বর্ণিত আছে যে, "পুলসিরাতের পাশ থেকে একজন ঘোষক কিয়ামতের দিন এই বলে ঘোষণা দিতে থাকবে: "ওরে বলদর্পী, নিষ্ঠুর যালেমগণ! আল্লাহ নিজের মর্যাদা ও প্রতাপের শপথ করে বলেছেন যে, আজকের দিন কোন অত্যাচারী ব্যক্তি এই পুল পার হয়ে জান্নাতে যেতে পারবে না।"
হযরত জাবের (রা) বর্ণনা করেন যে, "মক্কা বিজয়ের বছর যখন আবিসিনয়ায় হিজরতকারী মুহাজিরগণ রাসূলের (স) নিকট প্রত্যাবর্তন করলো, তখন রাসূল (সা) বললেনঃ তোমরা কি আমাকে আবিসিনিয়ায় থাকাকালীন কোন বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কথা জানাবে? তখন মুহাজিরদের মধ্য হতে কতিপয় যুবক বললো: জ্বী, হে রাসূল! একদিন আমরা সেখানে বসা ছিলাম দেখলাম, আমাদের পাশ দিয়ে এক বৃদ্ধা মাথায় এক কলসী পানি নিয়ে চলে যাচ্ছে। সহসা এক যুবক এসে তার ঘাড়ে হাত দিয়ে জোরে ঠেলা দিল। এতে বৃদ্ধা পড়ে গেল এবং তার পানির কলসীও পড়ে ভেংগে গেল। বৃদ্ধা উঠে দাঁড়িয়ে সেই যুবকটির দিকে তাকিয়ে বললো: ওহে বিশ্বাসঘাতক! আল্লাহ যেদিন আরশ স্থাপন করবেন, যেদিন আগের ও পরের সকল মানুষকে সমবেত করবেন, এবং যেদিন মানুষের হাত ও পা তদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে, সেই দিন তুই দেখে নিস, আল্লাহর সামনে তোর কি পরিণতি হয় এবং আমার কি অবস্থা হয়।” এ কথা শুনে রাসূল (সা) বললেন: বৃদ্ধা ঠিকই বলেছে। যে জাতি তার দুর্বলদের কল্যাণার্থে সবলদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেনা, সে জাতিকে আল্লাহ কিভাবে সম্মানিত করবেন?” (ইবন মাজাহ, ইবনে হাববান, বায়হাকী)
রাসূল (সা) বলেন, "পাঁচ ব্যক্তির ওপর আল্লাহর ক্রোধ অবশ্যম্ভাবী। তিনি ইচ্ছা করলে দুনিয়াতেই তাদের ওপর তা কার্যকর করবেন, নচেত আখেরাতে কার্যকর করবেন: (১) কোন জাতির শাসক, যে তার প্রজাদের কাছে থেকে রাষ্ট্রের প্রাপ্য আদায় করে নেয়, কিন্তু তাদের ওপর সুবিচার ও ইনসাফ করে না এবং তাদেরকে যুলুম থেকে রক্ষা করেনা। (২) এমন দলনেতা, গোত্রপতি ও জাতীয় নেতা, যাকে সবাই আনুগত্য করে ও যার নির্দেশ সবাই মেনে চলে, অথচ সে সবল ও দুর্বলের সাথে সমান আচরণ করে না এবং নিজের খেয়ালখুশীমত কথা বলে। (৩) যে ব্যক্তি নিজের পরিবার পরিজনকে ও সন্তান-সন্ততিকে আল্লাহর আনুগত্য করার নির্দেশ দেয়না এবং তাদেরকে ইসলামের বিধান শিক্ষা দেয়না। (৪) যে ব্যক্তি নিজের নিযুক্ত কর্মচারীর নিকট থেকে আপন প্রাপ্য কাজ পুরোপুরি আদায় করে নিয়েও তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক পুরোপুরিভাবে বুঝিয়ে দেয়না। (৫) যে ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীকে মোহরানা থেকে বঞ্চিত করে ও তার ওপর অত্যাচার চালায়।"
- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেন: “আল্লাহ যখন সর্বপ্রথম তাঁর সকল সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেন, তখন তারা আল্লাহ তায়ালাকে জিজ্ঞাসা করে বলে যে, হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি কার সাথে থাকেন? আল্লাহ জবাব দিলেন: মযলুমের সাথে, যতক্ষণ তার প্রাপ্য তাকে ফিরিয়ে দেয়া না হয়।"
হযরত ওহাব বিন মুনাবিবহ বলেন: "একজন পরাক্রমশালী রাজা একটি প্রাসাদ • নির্মাণ করেছিলেন। একদিন এক বৃদ্ধা ভিখারিনী এসে সেই প্রাসাদের পাশে ... একটা ঝুপড়ি বানিয়ে বাস করতে লাগলো। পরে একদিন রাজা প্রাসাদের ছাদে উঠে চারপাশ ঘুরে দেখার সময় ঐ ঝুপড়িটি দেখে জিজ্ঞাসা করলেন: ঝুপড়িটা কার? লোকেরা বললো: এক দরিদ্র বৃদ্ধার। সে ওখানে বাস করে। রাজা তৎক্ষণাত ঝুপড়িটি ভেংগে ফেলার নির্দেশ দিলেন। বৃদ্ধা তখন বাইরে ভিক্ষা করতে গিয়েছিল। একটু পরে এসে দেখলো, তার ঝুপড়িটা বিধ্বস্ত। সে আশপাশের লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করলো আমার ঝুপড়ি কে ভেংগেছে? লোকেরা তাকে জানালো যে, রাজা ভেংগেছে। বৃদ্ধা আকাশেরর দিকে মাথা তুলে বললোঃ হে আল্লাহ! আমি যখন আমার ঝুপড়িতে ছিলাম না, তখন তুমি কোথায় ছিলে? তুমি কি ওটা রক্ষা করতে পারনি? এরপর আল্লাহ জিবরীলকে ঐ প্রাসাদটি ধ্বংস করার নির্দেশ দিলেন এবং তা সংগে সংগে ধ্বংস করা হলো।"
কথিত আছে, ক্ষমতা থেকে পতনের পর রাজা খালেদ বিন বারমাক ও তার ছেলে কারাবন্দী হলে তার ছেলে বললো: আব্বা, এত সম্মান ও মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকার পর এখন আমরা কারাগারে? খালেদ বললেন: হ্যাঁ, বাবা! প্রজাদের ওপর যুলুম চালিয়ে আমরা যে রজনীতে তৃপ্তির সাথে নিদ্রা গিয়েছিলাম, আল্লাহ তখন জাগ্রত ছিলেন এবং মযলুমদের দোয়া কবুল করেছিলেন।" এযীদ বিন হাকীম বলতেন: "এক ব্যক্তির ওপর আমি যুলুম করেছিলাম। আমি জানতাম যে, আল্লাহ ছাড়া তার আর কোন সাহায্যকারী দুনিয়ায় নেই। কিন্তু সে যখন বললো, “আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আমার ও তোমার মধ্যে ফায়সালা আল্লাহই করবেন," তখন আমি তাকে এত ভয় পেলাম যে, জীবনে আর কখনো কাউকে এত ভয় পাইনি।"
একবার খলিফা হারুনুর রশীদ কবি আবুল আতাহিয়াকে কারাগারে আটক করেন। কবি সেখান থকে তাকে যে চিঠি লেখেন, তাতে এই লাইনটি ছিল: "আল্লাহর কসম, জেনে রেখ, অত্যাচার স্বয়ং অত্যাচারীর জন্যই ভয়ংকর অমংগল ডেকে আনে। অত্যাচারী সব সময়ই অসৎ। ওহে যালেম, কিয়ামতের দিন যখন আমরা একত্রিত হব, তখন কে প্রকৃত নিন্দিত তা তুমি জানতে পারবে।"
তাবরানী শরীফে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে যে, "অত্যাচারী যখন কেয়ামতের দিন পুলসিরাতের ওপর আসবে, অমনি যার যার ওপর সে অত্যাচার করেছে, অর্থাৎ যার যার হক নষ্ট ও ক্ষতি সাধন করেছে, তারা সবাই আসবে এবং ক্ষতিপূরণ হিসাবে তার কৃত সৎকর্মগুলো ছিনিয়ে নেবে। সব কয়টি সৎকর্ম কেড়ে নেয়ার পর মযলুমদের রাশি রাশি পাপ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে। ফলে অত্যাচারী জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে নিক্ষিপ্ত হবে।"
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "কিয়ামাতের দিন আল্লাহর বান্দারা খালি পায়ে নগ্ন দেহে ময়দানে সমবেত হবে। এ সময়ে গুরুগম্ভীর স্বরে একটি আওয়ায ধ্বনিত হবে, যা দূরের ও নিকটের সবাই শুনতে পাবে। বলা হবে: "আমি সকলের অভাব পূরণকারী রাজাধিরাজ, কোন জান্নাতবাসীর পক্ষে জান্নাতে যাওয়া এবং জাহান্নামবাসীর পক্ষে জাহান্নামে যাওয়া সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত তার কৃত যুলুমের আমি প্রতিশোধ না নেই, এমনকি তা যদি একটি চড় থাপ্পড় বা লাথির পর্যায়েও হয়ে থাকে। তোমার প্রভু কারো ওপর যুলুম করেন না।" আমরা বললামঃ হে রাসূল! সেটা কিভাবে সম্ভব হবেং আমরা তা সবাই খালি পায়ে ও নগ্ন দেহে থাকবো। রাসূল (স) বললেন: প্রত্যেকের কৃত সৎকর্ম ও অসৎকর্মের আদান-প্রদান দ্বারাই প্রতিশোধ নেয়া হবে। তোমাদের প্রতিপালক যালেম নন।" অপর এক হাদীসে রাসূল (স) বলেন: "একটি বেতের আঘাতের জন্যও কিয়ামাতের দিন প্রতিশোধ নেয়া হবে।"
কথিত আছে যে, "পারস্যের এক সম্রাট নিজের ছেলের জন্য একজন শিক্ষক রেখেছিলেন। ছেলেটি যখন যথেষ্ট বড় হয়ে উঠেছে, তখন একদিন ঐ শিক্ষক তাকে ডাকলেন এবং বিনা কারণে ও বিনা অপরাধে তাকে কঠোর শারীরিক শাস্তি দিলেন। ছেলেটি তার শিক্ষকের ওপর রাগান্বিত এবং মনে মনে ক্ষিপ্ত হয়ে রইল। অল্প দিন পরই রাজা মারা গেল এবং ঐ ছেলেটি সিংহাসনে আরোহণ করলো। তখন সে উক্ত শিক্ষককে দরবারে তলব করে জানতে চাইল যে, আপনি অমুক দিন আমাকে বিনা কারণে শাস্তি দিয়েছিলেন কেন? শিক্ষক বললেনঃ ওহে সম্রাট, শুনুন, আমি যখন দেখলাম, আপনি বড় হয়েছেন এবং অচিরেই সিংহাসনে আরোহণ করতে যাচ্ছেন, তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, বিনা কারণে প্রহার ও যুলুম করলে কেমন কষ্ট লাগে, তার স্বাদ আপনাকে গ্রহণ করাবো, যাতে আপনি কারো ওপর যুলুম না করেন। একথা শুনে সম্রাট ধন্যবাদ দিয়ে বললেন: আল্লাহ আপনাকে এর উত্তম প্রতিদান দিন। অতঃপর স্বীয় প্রাক্তন শিক্ষককে প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে বিদায় করলেন।"
এতীমের ওপর যুলুম এবং প্রজার ওপর শাসকের যুলুম ইতিপূর্বে পৃথকভাবে আলোচিত হয়েছে। এখানে সকল স্তরে দুর্বলের ওপর সবলের যুলুমের বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে। অর্থাৎ যে কোন বান্দার হক বা অধিকার নষ্ট করাই যুলুম। এ প্রসংগে উল্লেখ্য যে, ধনী বা সক্ষম লোক কর্তৃক দরিদ্র পাওনাদারের প্রাপ্য মজুরী বা অন্য কোন জিনিস দিতে অহেতুক বিলম্ব করা ও তালবাহানা করাও যুলুমের শামিল। এজন্য হাদীসে মজুরের মজুরী তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই দিতে বলা হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন: "ধনীর তালহাবানাও যুলুমের অন্তর্ভুক্ত।”
মুসনাদে আহমাদ ও তিরমিযীতে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "মযলুমের দোয়া মেঘের ওপরে উঠে যায় এবং আল্লাহ তখন বলেন: আমার মর্যাদা ও প্রতাপের শপথ, আমি তোমাকে সাহায্য করবোই, চাই তা কিছু পরেই হোক।" স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর প্রাপ্য মোহরানা ও খোরপোশ না দেয়াও বুলুমের অন্তর্ভুক্ত। রাসূল (সা) বলেন: "দুর্বলের সাথে সবলের বক্র আচরণ - যা দ্বারা সে তার সহায়-সম্পদ ও মর্যাদার ক্ষতি সাধন করে ও কষ্ট দেয়া - যুলুমের অন্তর্গত।"
হযরত ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে যে, "কিয়ামাতের দিন পালাক্রমে প্রত্যেক নারীপুরুষকে হাত ধরে কিয়ামতের ময়দানে সমবেত সমগ্র মানব-মন্ডলীর সামনে উপস্থিত করা হবে এবং বলা হবে, এই যে অমুকের ছেলে বা মেয়ে অমুক। এর কাছে যদি কারো কিছু পাওনা থাকে তবে সে যেন এসে তার কাছ থেকে আদায় করে নেয়। এ সময় অধিকার বঞ্চিত স্ত্রীরা খুশী হবে এবং তাদের অধিকার হরণকারী পিতা, ভাই বা স্বামীর কাছ থেকে অধিকার আদায় করে নেবে। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন: "সেদিন কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য হবেনা এবং কেউ কাউকে জিজ্ঞাসা করবেনা।" সেদিন আল্লাহ নিজের পাওনা সম্পর্কে যাকে ইচ্ছা মাফ করবেন, কিন্তু মানুষের হক তিনি মাফ করবেন না। অতঃপর যে নারী বা পুরুষকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো, তাকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখা হবে এবং দাবীদারদেরকে বলা হবেঃ "তোমাদের হক নিতে এগিয়ে এসো।" আল্লাহ তায়ালা ফিরিশতাদেরকে বলবেন, "প্রত্যেক পাওনাদারকে তার নেক আমল থেকে পাওনা অনুপাতে দিয়ে দাও। এভাবে সকল পাওনাদারকে দেয়ার পর যদি সামান্য কিছু নেক আমল অবশিষ্ট থাকে এবং সে যদি সামগ্রিক কৃতকর্মের বিচারে আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তি হয়, তবে তার অবশিষ্ট আমলকে এমনভাবে বাড়িয়ে দেয়া হবে যাতে সে জান্নাতে যেতে পারে। অতঃপর তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। কিন্তু সে যদি সামগ্রিকভাবে অসৎ ব্যক্তি হয়, এবং তার আর কোন নেক আমল অবশিষ্ট না থাকে, তবে ফিরিশতারা বলবে: হে আল্লাহ, ওর সব নেক আমল ফুরিয়ে গেছে, অথচ এখনো ঢের হকদার রয়েছে। তখন আল্লাহ বলবেন, হকদারদের গুনাহ ওর ওপর চাপিয়ে দাও এবং দোজখে প্রবেশ করাও।"
কোন অমুসলিমের ওপর যুলুম করলেও দুনিয়া ও আখেরাতে তার একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। কোন মুসলিমকে তার প্রাপ্য না দেয়া, কম দেয়া, ঠকানো, ধোকা দেয়া, তার ওপর তার ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ চাপানো, স্বেচ্ছায় ও সানন্দে না দেয়া পর্যন্ত তার কোন জিনিস গ্রহণ করা যেমন যুলুম, কোন অমুসলিমের ক্ষেত্রেও এই সব কাজ সমান যুলুম। রাসূল (সা) বলেছেন, "কোন অমুসলিমের অধিকার যে হরণ করবে তথা তার জানমালের কোন ক্ষতি সাধন করবে, কিয়ামাতের দিন আমি স্বয়ং আল্লাহর আদালতে তার বিরুদ্ধে বিচার চাইবো।"
তাবরানী বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: "কিয়ামাতের দিন সর্বপ্রথম যে বিবাদ বিচারের জন্য উঠবে তা হবে এক স্বামী ও তার স্ত্রী সংক্রান্ত। স্ত্রী কথা বলবেনা তবে তার হাত ও পা সাক্ষ্য দেবে তার স্বামীর প্রতি সে যে আচরণ করতো সে সম্পর্কে এবং স্বামীর হাত ও পা সাক্ষ্য দেবে স্ত্রীর প্রতি সে ভালো বা মন্দ যে আচরণ করতো সে সম্পর্কে। এরপর মামলা উঠবে মনিব ও চাকর চাকরানীদের সম্পর্কে। সেখানে কোন অর্থকড়ি দিয়ে বিবাদ মেটানো হবেনা। কেবল মযলুমকে যালেমের নেক আমল দিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর সকল প্রতাপশালী যালেম শাসককে লোহার শিকলে বেঁধে হাজির করা হবে এবং তাদেরকে জাহান্নামে পাঠানো হবে।"
কথিত আছে যে, বিশিষ্ট তাবেয়ী তাউস ইয়ামানী উমাইয়া শাসক হিশাম বিন আবদুল মালিককে একবার উপদেশ দিলেন যে, "আপনি আযানের দিন সম্পর্কে সতর্ক হোন।" হিশাম বললেন, "কোন্ আযানের দিন?" তাউস বললেন: আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "সেদিন একজন এই বলে আযান দেবে (অর্থাৎ ঘোষণা করবে) যালেমদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত!" এ কথা শুনেই হিশাম মুর্ছা গেলেন। তাউস বললেন, কিয়ামতের দিন যা ঘটবে তার বিবরণ শুনে যদি এই অবস্থা হয় তবে তা যখন বাস্তবে ঘটবে তখন তা স্বচোক্ষে দেখলে কী অবস্থা হবে?
যুলুমের পাশাপাশি যুলুমের সহযোগিতা ও যালেমদের সাথে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করাকেও ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সূরা হুদে আল্লাহ বলেন: "তোমরা যালেমদের সহযোগী হয়োনা, তাহলে তোমাদেরকে আগুন স্পর্শ করবে।" হযরত ইবনে আববাস এর তাফসীর প্রসংগে বলেন: অর্থাৎ তাদের সাথে পূর্ণ আন্তরিক ভালোবাসা পোষণ করোনা, নম্র ও বিনয়পূর্ণ ভাষায় তাদের সাথে কথা বলোনা এবং বন্ধুত্ব রেখন।। সুদ্দী বলেন: এর অর্থ যালেমদের সাথে আপোষকামী হয়োনা। ইকরাম বলেন: অর্থাৎ তাদের অনুগত হয়োনা। আবুল আলিয়া বলেন: অর্থাৎ যালেমদের কার্যকলাপকে খুশীমনে মেনে নিওনা। সূরা সাফাতে আল্লাহ বলেনঃ "যারা যুলুম করে তাদেরকে এবং তাদের সাংগপাংগদেরকে সমবেত করো।” অর্থাৎ তাদের সহযোগী ও অনুসারীদেরও একই পরিণামে ভুগতে হবে।
এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “যে ব্যক্তি কোন যালেমকে যালেম জেনেও তার পক্ষ নেবে সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।” অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “এমন অনেক শাসকের আবির্ভাব ঘটবে, যাদের বহু অনুসারী থাকবে এবং সেই অনুসারীরাও মানুষের ওপর যুলুম ও মিথ্যাচার চালাবে। সে ব্যক্তি তাদের সাথে ওঠাবসা করবে, তাদের মিথ্যাচারকে সমর্থন দেবে এবং তাদের যুলুমের সহযোগিতা করবে আমি তার কেউ নই এবং সে আমার কেউ নয়। আর যে ব্যক্তি তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে এবং তাদের যুলুমের সহযোগিতা করবেনা, সে আমার আপনজন এবং আমিও তার আপনজন।"
রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোন যালেমকে সাহায্য করবে তার ওপর কোন না কোন যালেমকে চাপিয়ে দেয়া হবে।" হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়ার (র) বলেনঃ "যালেম শাসক ও তার সাংগপাংগদের দিকে যখন তাকাবে, তখন অন্তরের ক্ষোভ ও অসন্তোষ সহকারে তাকাবে। নচেত তোমাদের কৃত নেক আমল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে।" মাকহুল দামেস্কী বলেন: কিয়ামাতের দিন যখন যালেম ও যালেমের সাংগপাংগদের ডাকা হবে, তখন যালেমের কলমে যে কালি ভরে দিত, কিংবা কলম গুছিয়ে দিত বা এরূপ ছোটখাট কাজ বা এর চেয়ে বড় কাজ করে যে সাহায্য করতো সেও বাদ যাবেনা। সকল সহযোগীকে আগুনের একটি বাক্স ভরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।"
রাসূল (সা) এক হাদীসে বলেছেন: “যারা যালেম শাসকদের পক্ষে অস্ত্র নিয়ে ঘুরতো এবং তাদের মনতুষ্টির জন্য মানুষকে অকারণে প্রহার করতো, তারাই হবে সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারী।” হযরত ইবনে উমার (রা) বলেন: "যালেমদের সাংগপাংগরা হবে জাহান্নামের কুকুর।"
রাসূল (সা) অপর এক হাদীসে বলেছেন: "যে স্থানে কোন মানুষকে অন্যায়ভাবে নির্যাতন বা হত্যা করা হয়, তোমরা কেউ সেই স্থানে থেকনা। কেননা যারা ঐ জায়গায় অবস্থান করে এবং যুলুম প্রতিহত করেনা, তাদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হয়ে থাকে।” (তাবরানী) অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "এক ব্যক্তি কবরে যাওয়ার পর ফিরিশতারা তাকে বলবে: আমরা তোমাকে একশো ঘা বেত মারবো। লোকটি অনেক অনুনয় বিনয় করে অব্যাহত চাইবে। ফলে তাকে মাত্র একটি ঘা বেত মারা হবে। এরপর কবর আগুনে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। তখন লোকটি জিজ্ঞাসা করবে, তোমরা কী কারণে আমাকে মেরেছ? তারা বলবে: কেননা তুমি পবিত্রতা অর্জন ছাড়াই এক ওয়াক্ত নামায পড়েছিলে এবং তোমার পথের পাশে এক ব্যক্তির ওপর যুলুম হচ্ছিল, কিন্তু তুমি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে সাহায্য করোনি।" চিন্তার ব্যাপার এই যে, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি মযলুমকে সাহায্য করেনা তার যদি এই পরিণতি হয়, তাহলে যে ব্যক্তি স্বয়ং যুলুম করে তার কি দশা হবে?
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের এক হাদীসে রাসূল বলেন: তোমার ভাই যালেম হলেও তাকে সাহায্য করো, মযলুম হলেও তাকে সাহায্য করো। সাহাবীগণ বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে যদি মযলুম হয় তবে তাকে সাহায্য করতে হবে, এ কথা তো বুঝলাম, কিন্তু যালেম হলে কিভাবে সাহায্য করবো? রাসূল (সা) বললেন: তাকে যুলুম থেকে ফিরাও। এটাই তাকে সাহায্য করা।"
কথিত আছে, জনৈক দরবেশ একদিন যুলুবাজ সরকারী আমলাদের একজন সহযোগীকে তার মৃত্যুর কিছুকাল পর অত্যন্ত দুর্দাশাগ্রস্ত অবস্থায় স্বপ্নে দেখলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: মৃত্যুর পর তুমি কেমন আছ? সে বললো" দুর্বিসহ অবস্থায় আছি। আল্লাহর আযাব ভোগ করছি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার মনিবরা অর্থাৎ যুল্যবাজ সরকারী কর্মচারীরা কোথায় আছে? সে বললোঃ তারা আছে আমার চেয়েও ভয়ংকর অবস্থায়। তারপর সে বললোঃ আপনি কি এ আয়াত পড়েননি: "যালেমরা অচিরেই জানতে পারবে তাদের কী পরিণতি হয়।"
জনৈক ঐতিহাসিক এ প্রসংগে আরো একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, একবার আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম তার এক হাত ঘাড় থেকে কর্তিত। সে উচ্চস্বরে বলছে: যারা আমাকে দেখবে তারা যেন কারো ওপর অত্যাচার না করে। আমি তার কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার কি হয়েছে ভাই? সে বললো: একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে। আমি একজন অত্যাচারী ব্যক্তির বরকন্দাজ ছিলাম। একদিন দেখলাম, এক জেলে বড় একটা মাছ নিয়ে যাচ্ছে। মাছটি দেখে আমার ভীষণ লোভ হলো এবং জেলেকে প্রহার করে তার মাছটি কেড়ে নিলাম। মাছটি নিয়ে সানন্দে বড়ী যাচ্ছি। সহসা মাছটি আমার বুড়ো আংগুলে ভীষণ জোরে কামড় দিল। অতঃপর বাড়ী গিয়ে মাছটি আছড়ে ফেলে দিলাম। ব্যথায় সেদিন রাত্রে আমার ঘুম হলোনা। পরদিন সকালে দেখি আংগুলটা ভীষণভাবে ফুলে উঠেছে। আমি দ্রুত চিকিৎসকের কাছে গেলাম। তিনি আমাকে জানালেন, বুড়ো আংগুলটা কেটে ফেলতে হবে। নচেৎ পরে পুরো হাত আক্রান্ত হবে। অগত্যা বুড়ো আংগুল কাটা হলো। কিন্তু এতেও ব্যথার উপশম হলো না। পুনরায় চিকিৎসকের কাছে গেলাম। এবার তিনি আমার হাতের পাতাটি পুরো কেটে দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। কিন্তু তাতেও উপশম হলোনা।
ক্রমে আমার পুরো হাতটাই কাটতে হলো। অতঃপর এক ব্যক্তি আমার সব ঘটনা শুনে আমাকে মাছের মালিকের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বললেন, নচেৎ আমার পুরো দেহই রোগক্রান্ত হতে পারে বলে সতর্ক করে দিলেন। আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করে জেলেটির সন্ধান পেয়েছি এবং তার কাছে পূর্বের সমস্ত ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পা ধরে মাফ চেয়েছি। এখন আমার বাদবাকী শরীর সুস্থ আছে। কেননা ঐ জেলে আমাকে মাফ করে দিয়েছে এবং আমাকে যে বদদোয়া করেছিল তা ফিরিয়ে নিয়েছে।
বস্তুতঃ মানুষের ওপর অত্যাচার এমন এক ভয়ংকর গুনাহ, যার শাস্তি কোন না কোন উপায়ে দুনিয়ার জীবনেই পাওয়া শুরু হয়ে যায়। যদিও অনেকেই তা উপলব্ধি করেনা। আর এ থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় হলো পরোপকার ও জনসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করা। লোভ, হিংসা ও ক্রোধ থেকে আত্ম সংবরণ করা এবং হালালভাবে প্রাপ্ত নিজের যা কিছু আছে, তাতে সন্তুষ্ট থাকা। রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি অদৃষ্টের ওপর সন্তুষ্ট থাকে এবং অন্যের কাছে যা আছে তার থেকে নিরাশ হয় সে-ই প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পায়।

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা

📄 জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা


এটিও এক ধরনের জুলুম। পবিত্র কুরআনের নিম্নের আয়াতটিতে যে জুলুমের কথা বলা হয়েছে, এটিও তার অন্তর্ভুক্তঃ "যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং পৃথিবীতে অবৈধভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়, কেবল তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।" (আশশূরা)
যারা জোর পূর্বক চাঁদা আদায় করে তারা নিজেরাও জুলুমবাজ এবং তারা জুলুমবাজদের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারীও। চাঁদাবাজরা যে চাঁদা আদায় করে, তা যেমন তাদের প্রাপ্য নয়, তেমনি যে পথে তা ব্যয় করে তাও বৈধ পথ নয়। এ জন্য রাসূল (সা) বলেছেন: "অবৈধ চাঁদা আদায়কারী জান্নাতে যাবেনা।” (আবু দাউদ) এর কারণ এই যে, জোরপূর্বক চাঁদা আদায়কারী আল্লাহর বান্দাদের ওপর জুলুম ও শোষণ চালায়। তাদের কষ্টোপার্জিত অর্থ কেড়ে নেয়। এ ধরনের লোকেরা কেয়ামতের দিন মজলুমদের প্রাপ্য দিতে পারবেনা। যদি তাদের কবুল কৃত কোন সৎকর্ম থাকে, তবে তাই দিতে হবে। নচেত মজলুমদের পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে জাহান্নামে যেতে হবে। এ সংক্রান্ত হাদীস ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন, আমার উম্মাতের মধ্যে প্রকৃত দরিদ্র হলো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামাতের দিন প্রচুর নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত নিয়ে আসবে। কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়ে আসবে, প্রহার করে আসবে অথবা কারো সম্পদ আত্মসাত করে আসবে। অতঃপর এই সকল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদেরকে একে একে তার পুণ্যকর্ম দিয়ে দেয়া হবে। যখন পুণ্যকর্ম ফুরিয়ে যাবে, তখন মজলুমদের পাপ কাজ তার ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
যে হাদীসে এক ব্যভিচারিনী রমণীকে পাথর মেরে হত্যা করার বিবরণ এসেছে, তাতে রাসূল (সা) বলেন: এই মহিলা এমন তওবা করেছে যে, জোরপূর্বক চাঁদা আদায়কারীও যদি তেমন তওবা করতো, তবে তার গুনাহও মাফ হয়ে যেত। এ থেকে বুঝা যায় এটি কত বড় মারাত্মক গুনাহর কাজ। বস্তুতঃ জোরপূর্বক অর্থ আদায় করার কাজটি ডাকাতি রাহাজানি সদৃশ। জোরপূর্বক চাঁদা যে আদায় করে, যে তার সহযোগিতা করে, যে লেখে, যে সাক্ষী থাকে, তারা সবাই এই পাপের সমান অংশীদার। তারা সবাই হারামখোর। রাসূল (সা) বলেছেন: "যে গোশতের টুকরাটি হারাম সম্পদ থেকে উৎপন্ন হয়, তা জাহান্নামের উপযুক্ত।" ইমাম ওয়াহেদী (রহ) "হে নবী তুমি বল, পবিত্র ও অপবিত্র জিনিস সমান হয়না” এই আয়াতের তাফসীর প্রসংগে অপবিত্র জিনিসের মধ্যে জোরপূর্বক আদায়কৃত জিনিসকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। রাসূল (সা) বলেছেন: কারো সম্পদ সে স্বেচ্ছায় না দিলে হালাল হয়না।
একবার হযরত জাবের (রা) রাসূল (সা) কে এসে বললেনঃ হে রাসূল, আমার মদের ব্যবসায় ছিল। সেই ব্যবসায় থেকে আমার বেশ কিছু সঞ্চিত নগদ অর্থ রয়েছে। আমি যদি তা দিয়ে আল্লাহর কোন ইবাদাত বা পুণ্যের কাজ করি, তবে তাতে কি আমার উপকার হবে? রাসূল (সা) বললেনঃ তুমি যদি সেই অর্থ হজ্ব, জিহাদ, অথবা সদকায় ব্যবহার কর, তবে তা আল্লাহর কাছে একটা মাছির ডানার সমানও মর্যাদা পাবেনা। আল্লাহ পবিত্র সম্পদ ব্যতীত কোন কিছু গ্রহণ করেন না। তখন আল্লাহ এই বক্তব্যের সমর্থনে নাযিল করলেনঃ “হে নবী! তুমি বল, পবিত্র ও অপবিত্র জিনিস সমান নয়, যদিও অপবিত্র জিনিসের আধিক্য তোমাকে মুগ্ধ করে।" ইমাম আতা ও হাসান বসরী বলেন, পবিত্র ও অপবিত্র দ্বারা যথাক্রমে হালাল ও হারামকে বুঝানো হয়েছে।
উপদেশ: বল প্রয়োগে মানুষের সম্পদ লুণ্ঠন করে যারা গণরোষ থেকে বাঁচার জন্য সুরক্ষিত দুর্গসম উচ্চ প্রাসাদ তৈরী করে বসবাস করেছে, যারা মনোরম ফুলের বাগান নির্মাণ করে পরম আয়েশী জীবন যাপন করেছে, পৃথিবীতে উচ্চ সম্মান ও ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছে— ভেবে দেখুন, তারা আজ কোথায়? পৃথিবীতে চিরস্থায়ী হবার সকল চেষ্টা এবং সকল স্বপ্ন তাদের ধূলিসাত হয়ে গেছে। তারা আজ তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল ভোগ করতে শুরু করেছে। সেই পরিণামের কথা চিন্তা করে জুলুম নির্যাতন ও পরস্ব অপহরণের পথ চিরতরে বর্জন করে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, সেই প্রকৃত বুদ্ধিমান। যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে চায়, তার জীবনের যে কয়টি দিন অবশিষ্ট আসে, তাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করা উচিত।

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 হারাম খাওয়া ও হারাম উপার্জন করা

📄 হারাম খাওয়া ও হারাম উপার্জন করা


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন : “তোমরা একে অপরের সম্পদ অবৈধভাবে ভোগদখল করোনা।” হযরত ইবনে আব্বাস বলেন : এর অর্থ হচ্ছে, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন শপথ দ্বারা অন্যের সম্পত্তির ওপর নিজের দখল প্রতিষ্ঠা করা। অবৈধভাবে তথা হারাম পন্থায় উপার্জন দুই রকমের হতে পারে। প্রথমত: সম্পূর্ণরূপে শক্তি প্রয়োগে ও অত্যাচারের মাধ্যমে, যেমন আত্মসাৎ, অপহরণ, জবরদখল, গচ্ছিত সম্পদ বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে ভোগদখল চুরি ডাকাতি ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত: খেলাধুলা, চালাকী, প্রতারণা ইত্যাদি। লটারী ও জুয়ার মাধ্যমে অর্থ জেতাও এর আওতাভুক্ত। সহীহ বুখারীতে আছে, রাসূল (সা) বলেছেন : “কিছুলোক এমন আছে যারা আল্লাহর বান্দাদের সম্পদে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করে। কিয়ামতের দিন তাদের জন্য জাহান্নাম নির্দিষ্ট রয়েছে।” সহীহ মুসলিমে আছে, রাসূল (সা) বলেছেন: “এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলিধূসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে "হে প্রভু” "হে প্রভু” বলে মুনাজাত করে, অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। তার মুনাজাত কিভাবে কবুল হবে?” হযরত আনাস (রা) বলেন: আমি বললাম, হে রাসূল, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমার দোয়া কবুল হয়। রাসূল (সা) বললেন : হে আনাস, তোমার উপার্জনকে হালাল রাখ, তোমার দোয়া কবুল হবে। মনে রেখ, কেউ যদি হারাম খাদ্যের এক গ্রাসও মুখে নেয়, তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার দোয়া কবুল হবেনা।” বায়হাকী বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেন: আল্লাহ তায়ালা যেমন তোমাদের মধ্যে তোমাদের জীবিকা বন্টন করেছেন, তোমাদের মধ্যে তোমাদের স্বভাব চরিচত্ত বন্টন করেছেন। দুনিয়ার সম্পদ তিনি যাকে ভালোবাসেন তাকেও দেন, যাকে ভালোবাসেন না তাকেও দেন। কিন্তু দীন তথা আখিরাতের সম্পদ কেবল তাকেই দেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন। আল্লাহ যাকে দীন দান করেছেন, বুঝতে হবে যে, তিনি তাকে ভালোবেসেছেন। কোন বান্দা হারাম সম্পদ উপার্জন করে তা নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করলে তাতে সে বরকত ও কল্যাণ লাভ করবেনা। অন্যকে দান করলে সেই দানও কবুল হবেনা, আর যেটুকু সে দুনিয়ায় রেখে যাবে, তা তার জন্য জাহান্নামের সম্বল হবে। আল্লাহ মন্দকে মন্দ দিয়ে প্রতিহত করেন না, মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করেন।" (মুসনাদে আহমাদ) হযরত ইবনে ওমর (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: পৃথিবী মিষ্ট ও শ্যামল। এখানে যে ব্যক্তি হালাল সম্পদ উপার্জন করবে এবং ন্যায়সংগত পথে তা ব্য করবে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন তাকে জান্নাত দান করবেন। আর যে ব্যক্তি হারাম সম্পদ উপার্জন করবে এবং তা অন্যায় পথে ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে অপমানজনক স্থানে নির্বাসিত করবেন। আর হারাম সম্পদ হস্তগতকারী ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন আগুনে জ্বলবে।"
রাসূল (সা) আরো বলেন: "যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করবে তার পরোয়া করেনা, আল্লাহ তায়ালা তাকে কোন্ দরজা দিয়ে জাহান্নামে ঢুকাবেন তার পরোয়া করবেন না।" হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন: "কোন মুসলমানের হারাম জিনিস খাওয়ার চেয়ে মাটি খাওয়াও ভালো।” (মুসনাদে আহমাদ) হযরত ইউসুফ বিন আসবাত (রহঃ) বলেন: কোন যুবক যখন ইবাদাতে মনোনিবেশ করে, তখন শয়তান নিজের সহকর্মীদেরকে বলেঃ খোঁজ নাও লোকটি কী খায়! সে যদি হারাম খায়, তাহলে সে যত ইচ্ছা ইবাদাত করে ক্লান্ত হোক, বাধা দিওনা। কেননা সে নিজেই নিজের ইবাদাত ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। হারাম খাওয়া অব্যাহত রেখে ইবাদাত তার কোন কাজে লাগবেনা।” এ উক্তিটি ইতিপূর্বে উদ্ধৃত সহীহ মুসলিমের হাদীস দ্বারা সমর্থিত।
একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, একজন ফিরিশতা বাইতুল মাকদিসে প্রতি রাতে ও দিনে ঘোষণা দিতে থাকে যে, "যে ব্যক্তি হারাম খায় আল্লাহ তার ফরয ও নফল কিছুই গ্রহণ করেন না।" আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন: “সন্দেহজনক একটি দিরহাম গ্রহণ করার চাইতে আমার কাছে লক্ষ টাকা দান করা অধিকতর পছন্দনীয়।" রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি হারাম অর্থ ব্যয় করে হজ্জে গিয়ে বলে "লাব্বায়েক” (প্রভু আমি হাজির), তাকে একজন ফিরিশতা বলে: তোমার লাব্বায়েক গ্রহণযোগ্য নয়। তোমার হজ্জ তোমার মুখের ওপরই ছুড়ে দেয়া হলো।” (তাবারানী)
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি দশ দিরহাম দিয়ে কোন কাপড় কিনলো এবং তার মধ্যে এক দিরহাম অসৎ উপায়ে অর্জিত, সে যতদিন ঐ কাপড় পরিহিত থাকবে ততদিন তার নামায কবুল "হবেনা।" ইমাম ওহব ইবনুল ওয়ারদ বলেন! তুমি যদি জিহাদের ময়দানে যোদ্ধা অথবা প্রহরী হিসাবে নিয়োজিত থাক, তাতেও কোন ফায়দা হবেনা, যতক্ষণ তুমি যা খাচ্ছ তা হালাল না হারাম, তা লক্ষ্য না রাখ।" হযরত ইবনে আব্বাস বলেনঃ "আল্লাহর কাছে তওবা করে সৎ উপার্জনে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহ কোন হারামখোরের নামায কবুল করেন না।" হযরত সুফিয়ান সাওরী বলেন: “যে ব্যক্তি হারাম অর্থ দ্বারা কোন সৎ কাজ করে, সে পেশাব দ্বারা কাপড় ধৌতকারীর মত। কাপড় পবিত্র পানি ছাড়া পাক হয় না। আর গুনাহর কাফফারাও হালাল উপার্জন ছাড়া সম্ভব নয়।" হযরত ওমর (রা) বলেন: "আমরা হারামের মধ্যে পতিত হওয়ার ভয়ে হালাল সম্পদের দশ ভাগের নয় ভাগ বর্জন করতাম।" রাসূল (সা) বলেন: "যে শরীর হারাম খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে, তা জান্নাতে যাবেনা।" (তিরমিযী) সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকরের একজন গোলাম ছিল। সে হযরত আবু বকরকে মুক্তিপণ হিসাবে কিছু অর্থ দেয়ার শর্তে মুক্তি চাইলে তিনি তাতে সম্মত হন। অতঃপর সে প্রতিদিন তার মুক্তিপনের কিছু অংশ নিয়ে আসতো। হযরত আবু বকর তাকে জিজ্ঞেস করতেন, কিভাবে এটা উপার্জন করে এনেছ? সে যদি সন্তোষজনক জবাব দিত তবে তিনি তা গ্রহণ ও ভোগ করতেন, নচেত করতেন না। একদিন সে রাতের বেলায় তাঁর জন্য কিছু খাবার জিনিস নিয়ে এল। সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। তাই তাকে ঐ খাদ্যের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ভুলে গেলেন এবং এক লোকমা খেয়ে নিলেন। তাঁর পর তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ খাবার তুমি কিভাবে সংগ্রহ করেছ? সে বললোঃ আমি জাহেলিয়ত আমলে লোকের ভাগ্যগণনা করতাম। আমি ভালো গণনা করতে পারতাম না। কেবল ধোকা দিতাম। এ খাদ্য সেই ভাগ্যগণনার উপার্জিত অর্থ দ্বারা সংগৃহীত। হযরত আবু বকর (রা) বললেন: কী সর্বনাশ! তুমি তো আমাকে ধ্বংস করে ফেলার উপক্রম করেছ। তারপর গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বমিতে খাওয়া জিনিস বেরুলোনা। উপস্থিত লোকেরা তাকে বললো যে, পানি না খেলে খাওয়া জিনিস বেরুবেনা। তখন তিনি পানি চাইলেন। পানি খেয়ে খেয়ে সমস্ত ভুক্ত দ্রব্য পেট থেকে বের করে দিলেন। লোকেরা বললোঃ আল্লাহ আপনার ওপর দয়া করুন। ঐ এক লোকমা খাওয়ার কারণেই কি এত সব? হযরত আবু বকর (রা) বললেন: ঐ খাদ্য বের করার জন্য যদি আমাকে মৃত্যু বরণও করতে হতো, তবুও আমি বের করে ছাড়তাম। কেননা আমি শুনেছি, রাসূল (সা) বলেছেন: "যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে ওঠে তার জন্য দোজখের আগুনই উত্তম।" তাই আমি আশংকা করছিলাম যে, এই এক লোকমা খাদ্য দ্বারা আমার শরীরের কিছু অংশ গঠিত হতে পারে। বিজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন: জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা, খেয়ানত, চুরি, ধোকাবাজী ও জালিয়াতি, সুদ ও সুদের দালালী, মিথ্যা সাক্ষ্য দান, ধার করে নিয়ে পরে আত্মসাৎ, ঘুষ খাওয়া, মাপে ও ওজনে কমবেশী করা, পণ্যের দোষ গোপন করে বিক্রি করা, জুয়া, যাদু, জ্যোতিষ গণনা, ছবি আঁকা ও তোলা, ব্যভিচার, মৃত ব্যক্তির জন্য পেশাদারী কান্না, বিক্রেতার অনুমতি ছাড়া ক্রেতার কাছ থেকে দালালীর পারিশ্রমিক নেয়া, ক্রেতাকে অর্থের বিনিময়ে পণ্যের সন্ধান দান, স্বাধীন মানুষ বিক্রী, মদ ও শুকর বিক্রী বাবদ অর্জিত সম্পদ ও অপহরণকৃত এতিমের সম্পদ- এই সবই হারাম সম্পদ।
রাসূল (সা) বলেছেন: "কিয়ামতের দিন কিছু লোক তাহামার পাহাড় সমান সৎ কর্ম নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সংগে সংগেই তাকে ধুলিকণার মত বানিয়ে উড়িয়ে দেবেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলোঃ হে রাসূল, এটা কিভাবে সম্ভব হবে? রাসূল (সা) বললেন: এই লোকগুলো নামায পড়তো, রোযা রাখতো, যাকাত দিত ও হজ্জ করতো। কিন্তু যখনই কোন হারামের সংস্পর্শে আসতো, অমনি তাতে লিপ্ত হয়ে পড়তো। তাই আল্লাহ তাদের সকল নেক আমল বাতিল করে দিয়েছেন।” (তাবারানী)
বর্ণিত আছে যে, জনৈক পুণ্যবান ব্যক্তিকে কেউ স্বপ্নে দেখে তার অবস্থা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ আমি কোন আযাব ভোগ করছিনা। তবে দুনিয়ার জীবনে একটি সূঁচ ধার নিয়ে তা ফেরত দেইনি বলে আমার জান্নাতে যাওয়া স্থগিত রয়েছে।
উপদেশ: আখিরাতের কঠিন ও অবধারিত শাস্তির কথা মনে রেখে সব সময় হারাম থেকে পরহেজ করে চলা উচিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00