📄 সতী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "যারা সতী ও সরলমনা মুমিন নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং সেই দিন তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে, যেদিন তাদের জিহবা, হাত ও পা তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে।” (সূরা আন নূর) "যারা সতী নারীদের ওপর অপবাদ দেয়, অতঃপর চারজন সাক্ষী হাজির করেনা, তাদেরকে ৮০টি দোররা মারো এবং আর কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করোনা। তারাই হচ্ছে ফাসিক।" (সূরা আন নূর)
এ সব আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোন সতী নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচার ও অশ্লীল কর্মে লিপ্ত হওয়ার অপবাদ আরোপকারী দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তার জন্য কঠিন আযাব নির্দ্ধারিত রয়েছে। পৃথিবীতে তার শাস্তি এই যে, তাকে ৮০টি দোররা (বিশেষভাবে সজ্জিত প্রহার দন্ড) মারা হবে এবং সে সত্যবাদী হলেও তার সাক্ষ্য কখনো গ্রহণ করা হবেনা। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রাসূল (সা) সাতটি বৃহত্তম কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন এবং এই সাতটির অন্যতম হচ্ছে সতী ও সরলমনা মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ রটনা করা। অপবাদ রটনার বিভিন্ন পন্থা রয়েছে, যেমন: কোন নির্দোষ মুসলিম নারীকে এরূপ সম্বোধন করা “ওহে ব্যভিচারীনী, ওহে বেশ্যা, ওহে অসতী, অথবা তার স্বামীকে সম্বোধন করা, "ওহে ব্যভিচারিনীর বা বেশ্যার স্বামী, অথবা তার সন্তানকে বলা "ওহে হারামজাদা বা হারামজাদী, ওহে বেশ্যার সন্তান বা ব্যভিচারিনীর সন্তান" ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, বিনা প্রমাণে ব্যভিচারের অভিযোগ উত্থাপন স্ত্রী বা পুরুষ যার বিরুদ্ধেই করা হোক এবং যে ভাষাতেই করা হোক, আর সেই অভিযুক্ত পুরুষ বা স্ত্রী স্বাধীন বা দাসদাসী যাই হোক না কেন অভিযোগ আরোপকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আবেদন সাপেক্ষে ৮০টি দোররা মারা হবে।
(ব্যভিচার ব্যতীত অন্যান্য পাপাচার সংক্রান্ত অপবাদ আরোপের বিষয়টি পরবর্তীতে আলাদাভাবে বর্ণনা করা হবে। কেননা সেগুলি কবীরা গুনাহ হলেও সেগুলোর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোন পার্থিব শাস্তি নির্দ্ধারিত নেই। অনুবাদক)
পরিতাপের বিষয় যে, সাধারণতঃ অজ্ঞ মুসলমানেরা এ ধরনের অশ্লীল কথাবার্তা রটনা করে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত হয় ও আযাব ভোগ করে। এ জন্য রাসূল (সা) মানুষের জিহবাকে সংযত রাখতে বলেছেন। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "লোকেরা বিনা সাক্ষ্য প্রমাণে কোন কোন কথা বলে জাহান্নামের এত গভীরে নিক্ষিপ্ত হয়, যার দূরত্ব সূর্যাস্তের স্থান ও সূর্যোদয়ের স্থানের মধ্যের দূরত্বের চেয়েও বেশী।" এ কথা শুনে হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল বললেন: “হে রাসূলুল্লাহ! আমাদের কথাবার্তার জন্যও কি আমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে?” রাসূল (সা) বললেনঃ "ওহে মুয়ায! মানুষের মুখ দ্বারা সংঘটিত পাপ ছাড়া আর কোন পাপ কি এমন আছে, যা তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপের কারণ হবে?” রাসূল (সা) আরো বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে হয় নিরব থাকুক, না হয় ভালো কথা বলুক।" এছাড়া পবিত্র আল কুরআনের এ আয়াতটিতেও জিহবার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে: "সে যে কথাই উচ্চারণ করুক না কেন, তা লিখে রাখার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।" (সূরা ক্বাফ) হযরত উকবা ইবনে আমের (রা) রাসূলকে (সা) জিজ্ঞাসা করলেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুক্তি কিভাবে পাওয়া যাবে? তিনি বলেন: তোমার জিহবাকে সংযত রাখো, তোমার বাড়ীর প্রশস্ততা যেন তোমার জন্য যথেষ্ট হয় (অর্থাৎ অন্যের ভূমির প্রতি লোভ করোনা, তোমার গুনাহর জন্য কাঁদো, এবং মনে রেখ যে, নিষ্ঠুরমনা লোকেরা আল্লাহ থেকে সবচেয়ে বেশী দূরবর্তী।” (আবু দাউদ ও তিরমিযী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হচ্ছে অশ্লীল কথাবার্তা উচ্চারণকারী।” (তিরমিযী) এ হাদীস থেকে সহজেই বুঝা যায় যে, অশ্লীল কাজে লিপ্ত লোকেরা তাহলে কত বেশী ঘৃণিত। তিনি আরো বলেছেনঃ "যে ব্যক্তি আমার জন্য তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অংগ (জিহবা দাঁত ও খাদ্যনালী) এবং দুই উরুর মধ্যবর্তী অংগকে (যৌনাংগ) সংরক্ষণ করার দায়িত্ব নেবে, আমি তার জন্য জান্নাতেও দায়িত্ব নেব।"
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে, চরিত্রবান ও চরিত্রব্রতী লোকদের সম্মান রক্ষা এবং সমাজে অশ্লীলতার বিস্তার রোধের উদ্দেশ্যেই ৪ জন চাক্ষুস সাক্ষী ব্যতীত ব্যভিচারের অভিযোগ প্রকাশ্যে উচ্চারণে এইরূপ কঠোর আইনগত কড়াকড়ি আরোপিত হয়েছে। এ দ্বারা প্রকৃত ব্যভিচারীদেরকে রক্ষা করা শরীয়তের উদ্দেশ্য নয়। (নাউজু বিল্লাহ) প্রকৃত অপরাধীদেরকে শাস্তি দানের জন্য যথাযথ নিয়মে আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে হবে।
📄 চুরি করা
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "চোর-স্ত্রী বা পুরুষ যাই হোক না কেন, তাদের হাত কেটে দাও, তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তিস্বরূপ। আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।" (সূরা আল মায়েদা)
এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে ইবনে শিহাব বলেন: মানুষের সম্পদ অপহরণের অপরাধের জন্য আল্লাহ হাত কাটার শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। তিনি চোরের প্রতিশোধ গ্রহণে পরাক্রমশালী এবং হাত কাটাকে বাধ্যতামূলক করার কাজে প্রাজ্ঞ।
রাসূল (সা) বলেছেন: "কোন চোর ঈমানদার অবস্থায় চুরি করেনা। তবে তওবা করলে ঈমান বহাল হয়।" (আবু দাউদ, তিরমিযী)
হযরত ইবনে উমার (রা) বর্ণনা করেন যে, তিন দিরহাম মূল্যের দ্রব্য চুরির ঘটনায় রাসূল (সা) হাত কেটেছেন। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম) হযরত আয়িশাহ (রা) বলেন: রাসূল (সা) সিকি দিনার বা তার বেশী চুরিতে হাত কেটে দিতেন। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম) একাধিক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, সিকি দিনার বা তিন দিরহামের কম চুরিতে হাত কাটা যাবেনা।
তৎকালে ১২ দিরহামে এক দিনার হতো। তবে চুরির পরিমাণ যাই হোক এবং হাত কাটার শাস্তির উপযুক্ত হোক বা না হোক, সর্বাবস্থায় তা কবীরা গুনাহ ও জঘন্য অপরাধ।
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে হযরত আয়িশাহ (রা) বলেন যে, বনু মাখযুম গোত্রের এক মহিলা বিভিন্ন জিনিস ধার নিয়ে পরে অস্বীকার করতো। রাসূল (সা) তার হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। তার পরিবারের লোকেরা রাসূলের (সা) পালকপুত্র যায়েদের ছেলে উসামার কাছে এসে ঐ মহিলার অব্যাহতির জন্য সুপারিশ করতে অনুরোধ করলো। উসামা সুপারিশ করলে রাসূল (সা) বললেন: হে উসামা! আমি আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে তোমাকে সুপারিশ করতে দেখতে চাইনা।" অতঃপর সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বললেন: "তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো শুধু একজন্যই ধ্বংস হয়েছে যে, তাদের মধ্যে কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর কোন দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার হাত কেটে দিত। আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদের (সা) কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করতো, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।" অতঃপর বনু মাখযুমের ঐ মহিলার হাত কেটে দেয়া হলো।
তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ বর্ণিত হাদীসে হযরত আবদুর রহমান ইবনে জারীর বলেন: আমরা ফুযালা বিন উবাইদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম চোরের হাত কাটার পর কর্তিত হাত চোরের কাঁধে ঝুলিয়ে দেয়া কি রাসূলের (সা) সুন্নাত? তিনি বললেন: হাঁ, রাসূল (সা) কর্তিত হাত চোরের কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন।
আলেমগণ বলেন: চুরি করা জিনিস মালিকের নিকট ফেরত দেয়া ব্যতীত চোরের তওবায় কোন লাভ হবেনা। তবে সে গরীব হলে মালিকের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারে।
📄 ডাকাতি করা
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং পৃথিবীতে অরাজকতা ছড়ায়, তাদের একমাত্র শাস্তি এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা তাদের বিপরীত দিকের হাত ও পা কেটে দিতে হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে। এটা তাদের পার্থিব অপমান। আরো তাদের জন্য আখেরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি।" (সূরা আল মায়েদা)
ইমাম ওয়াহেদী উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার" অর্থ আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করা ও তাদের আদেশ-নিষেধ অমান্য করা। আদেশ অমান্যকারী প্রকৃত পক্ষে যুদ্ধে ও বিদ্রোহে লিপ্ত হয়ে থাকে। "পৃথিবীতে অরাজকতা ছড়ায়” অর্থাৎ হত্যা ও সম্পদ অপহরণের মাধ্যমে অরাজকতা ছড়ায়। মুমিনদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণকারী আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও যুদ্ধ ঘোষণাকারী রূপে বিবেচিত। ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আওযায়ী এই মত পোষণ করতেন। "অথবা” শব্দটি বারবার ব্যবহার করা দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, এই ব্যবস্থাগুলোর মধ্য হতে যে কোন একটি প্রয়োগে ইসলামী সরকারের স্বাধীনতা রয়েছে। অর্থাৎ ইচ্ছা করলে তাকে হত্যা করা যাবে, ইচ্ছা করলে শূলে চড়ানো যাবে, এবং ইচ্ছা করলে তাকে বহিষ্কার করা যাবে। এই মতটি হযরত ইবনে আব্বাস, হাসান, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব ও মুজাহিদের।
ইমাম আতিয়ার মতে এ দ্বারা স্বাধীনতা নয় বরং অপরাধের মাত্রার তারতম্য অনুসারে শাস্তি বিধান করা বুঝায়। যে ডাকাত হত্যা ও সম্পদ হরণ এই দুই অপরাধই করবে তাকে হত্যাও করা হবে অতঃপর শূলে চড়ানো হবে। যে ডাকাত সম্পদ কেড়ে নেবে কিন্তু কাউকে হত্যা করবেনা, তাকে শুধু হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটা হবে। যে ডাকাত শুধু রক্তপাত করবে এবং সম্পদ হরণ করবেনা তাকে হত্যা করা হবে। আর যে ব্যক্তি হত্যাও করবেনা, সম্পদও হরণ করবেনা, কিন্তু অস্ত্র নিয়ে বা অন্য কোন উপায়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করবে, তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এটি শাফেয়ী মাযহাবের মত। ইমাম শাফেয়ী আরো বলেন যে, প্রত্যেককে তার অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তি দেয়া হবে। হত্যা ও শূল দুটোই যার প্রাপ্য, তাকে প্রথমে হত্যা করা হবে অথবা ৩ বার শূলে চড়িয়ে নামিয়ে রাখা হবে যাতে তার শাস্তিকে খুবই ঘৃণ্য করে প্রকাশ করা যায়। আর যার কেবল হত্যার শাস্তি প্রাপ্য তাকে হত্যা করে লাশ আপনজনদের হাতে অর্পণ করতে হবে। আর যার শুধু কর্তন দন্ড প্রাপ্য, তার প্রথমে ডান হাত কাটা হবে। সে পুনরায় চুরি ডাকাতি করলে তার বাম পা কাটা হবে। পুনরায় এই অপরাধ করলে তার বাম হাত কাটা হবে। কেননা আবু দাউদ নাসায়ী বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেনঃ "প্রথমবার চুরি করলে তার হাত কেটে দাও, দ্বিতীয়বার চুরি করলে তার পা কেটে দাও, পুনরায় চুরি করলে হাত কেটে দাও, পুনরায় চুরি করলে পা কেটে দাও।" হযরত আবু বকর ও হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে এই হাদীস অনুসারেই কাজ করা হতো এবং কোন সাহাবীই এর বিরোধিতা করেননি।
আয়াতে যে বলা হয়েছে "অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে" এর ব্যাখ্যা প্রসংগে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন: যাকে ধরা সম্ভব হবেনা, তার সম্পর্কে সরকার ঘোষণা দিয়ে দেবেন যে, যে ব্যক্তি তাকে ধরতে পারবে, সে যেন তাকে হত্যা করে। আর যে ধরা পড়বে, তাকে গ্রেফতার করে জেলে ঢুকাতে হবে। কেননা এতে তার দেশে ঘুরে ঘুরে অপরাধ করার পথ বন্ধ হবে এবং এটাই তার বহিষ্কার।
বস্তুতঃ শুধুমাত্র হত্যার ভয় দেখানো এবং সন্ত্রাস ছড়ানোই কবীরা গুনাহ। এর ওপর কেউ যদি জিনিসপত্র ছিনতাইও করে এবং খুন জখমও করে, তবে সে তো এক সাথে অনেকগুলো কবীরা গুনাহ সংঘটিত করে। এ ছাড়া এ ধরনের অপরাধীরা সাধারণতঃ মদখুরী, ব্যভিচার, সমকাম, নামায তরক ইত্যাদি কবীরা গুনাহে তো লিপ্ত থাকেই।
📄 মিথ্যা শপথ করা
আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয় যারা আল্লাহর নামে ওয়াদা করে ও কসম খেয়ে তার বিনিময়ে ক্ষুদ্র স্বার্থ লাভ করে, আখেরাতে তাদের কিছুই প্রাপ্য থাকবেনা, আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে দৃষ্টি দেবেন না, এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। অধিকন্তু তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।" (আলে ইমরান)
ইমাম ওয়াহদী বলেন: একবার একটি জমির মালিকানা নিয়ে দুই ব্যক্তি পরস্পর বিরোধী দাবী জানাতে থাকে এবং তাদের বিবাদের মীমাংসার জন্য তারা উভয়ে রাসূলের (সা) নিকট গমন করে। বিবাদী যখন নিজের দাবীর স্বপক্ষে কসম খেতে উদ্যত হলো, অমনি এই আয়াত নাযিল হলো। ফলে সে কসম খাওয়া থেকে বিরত হয় এবং জমির ওপর বাদীর মালিকানা মেনে নেয়।
এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: যে ব্যক্তি নিজে হকদার না হয়েও অপরের সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য কসম খায়, সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময় তাকে রাগান্বিত দেখবে। আশয়াস বলেন: উপরোক্ত আয়াতটি আমার সম্পর্কেই নাযিল হয়েছিল। জনৈক ইহুদীর সাথে একটি জমি নিয়ে আমার বিরোধ ছিল। আমি তাঁকে রাসূলের (সা) কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন: তোমার কি সাক্ষী বা প্রমাণ আছে? আমি বললাম: না। তখন রাসূল (সা) উক্ত ইহুদীকে বললেন: তুমি শপথ করে বল যে ঐ জমি তোমার। আমি বললামঃ হে রাসূল! ইহুদীকে শপথ করার সুযোগ দিলে তো সে শপথ করে আমার জমি নিয়ে নেবে। এই সময় এই আয়াত নাযিল হয়। আয়াতটিতে যে "ক্ষুদ্র স্বার্থের” কথা বলা হয়েছে, তা দ্বারা পার্থিব স্বার্থকেই বুঝানো হয়েছে, যার জন্য লোকেরা সচরাচর মিথ্যা কসম খেয়ে থাকে।
প্রসংগতঃ উল্লেখ্যযোগ্য যে, ইসলামী আইন অনুসারে আদালতে বাদী উপযুক্ত সাক্ষী প্রমাণ উপস্থিত করতে অক্ষম হলে বিবাদী শপথ করার সুযোগ লাভ করে থাকে এবং এই শপথের ভিত্তিতেই আদালত বিবাদের নিষ্পত্তি করে থাকে। তাই এরূপ ক্ষেত্রে শপথ অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত: রাসূল (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি নিজের প্রাপ্য নয় জেনেও কোন সম্পত্তির দাবীতে শপথ করে, সে আল্লাহকে রাগান্বিত অবস্থায় দেখতে পাবে।' অতঃপর রাসূল (সা) এই আয়াতটি পাঠ করলেন যে, "যারা আল্লাহর নামে ওয়াদা করে ও কসম খেয়ে তার বিনিময়ে ক্ষুদ্র স্বার্থ লাভ করে...।"
হযরত আবু উমামা (রা) বলেন: আমরা রাসূলের (সা) কাছে বসা ছিলাম। রাসূল (সা) বললেন: যে ব্যক্তি নিজের শপথ দ্বারা কোন মুসলমানদের সম্পদ কুক্ষিগত করে, সে নিজের জন্য জাহান্নাম অবধারিত ও জান্নাত হারাম করে ফেলে। এক ব্যক্তি বললোঃ হে রাসূল! যদি তা খুব নগণ্য জিনিস হয় তবুও? তিনি বললেনঃ "যদি একটা গাছের ডালও হয় তবুও।" (সহীহ মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)
সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে মাজাতে হযরত আবু যর থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "তিন ব্যক্তির সাথে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা কথা বলবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।" এ কথাটা তিনি তিনবার বললেন। হযরত আবু যর বললেনঃ "ওরা তো চরম ক্ষতিগ্রস্ত ও হতভাগ্য ব্যক্তি। হে রাসূল! তারা কারা?" রাসূল (সা) বললেন: যে ব্যক্তি পায়ের গোড়ালী সমান কাপড় পরে, যে দান বা উপকার করে তার খোঁটা দেয় এবং যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথ করে তার পণ্য বিক্রী করে। অর্থাৎ শপথ করে মিথ্যামিথ্যি পণ্যের উচ্চতর ক্রয়মূল্য বা বিদেশী পণ্য বলে উল্লেখ করে, যাতে উচ্চ মূল্যে তা বিক্রি করা যায়, অথচ মিথ্যা শপথ করে পণ্যের ত্রুটি গোপন করে। সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত অপর হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: কবীরা গুনাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতামাতাকে অসন্তুষ্ট করা, আত্মহত্যা করা ও মিথ্যা শপথ করা। ইচ্ছাকৃতভাবে যে মিথ্যা শপথ করা হয়, তাকে শরীয়তের পরিভাষায় 'ইয়ামীনে গামূস' তথা নিমজ্জিতকারী শপথ বলা হয়। কারণ এই শপথ মানুষকে পাপে নিমজ্জিত করে।
কারো কারো মতে তাকে আগুনে নিমজ্জিত করে বলে এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করাও কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। যেমন নবীর কসম, কাবার কসম, ফেরেশতার কসম, আকাশের কসম, পানির কসম, জীবনের কসম, আমানতের কসম, প্রাণের কসম, মাথার কসম, অমুকের মাজারের কসম, ইত্যাদি।
মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক, সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, জামে' তিরমিযী, সুনানে নাসায়ী ও সুনানে ইবনে মাজাতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের পিতৃপুরুষদের নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। শপথ যদি করতেই হয় তবে আল্লাহর নামেই শপথ করবে, নচেত চুপ থাকবে।"
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “তোমারা দেবদেবীর নামে বা বাপ-দাদার নামে শপথ করোনা।" "আমার কথা সত্য নাহলে আমি অমুকের সন্তান নই-" এরূপ বলা বাপ-দাদার নামে শপথের পর্যায়ভুক্ত। আবুদাউদ, ইবনে মাজাহ ও হাকেম বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “যে ব্যক্তি এভাবে শপথ করে যে, আমার কথা সত্য না হলে আমি মুসলমান নই, সে মিথ্যুক হলে যা বলেছে তাই হবে (ঈমান থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে) আর সে সত্যবাদী হলেও সম্পূর্ণ নিরাপদে ইসলামের পথে বহাল থাকতে পারবেনা।"
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “কেউ অভ্যাসবশতঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে ভুলক্রমে শপথ করলে তৎক্ষণাৎ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলবে।"