📄 মদ্যপান
আল্লাহ তায়ালা সূরা আল মায়েদায় বলেন: “হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া ও ভাগ্য গণনা শয়তানের নোংরা কাজ। এগুলিকে পরিহার করে চল। তাহলে তোমরা সাফল্য লাভ করবে। শয়তান শুধু তোমাদের মধ্যে ক্ষমতা ও বিদ্বেষ সংঘটিত করতে চায় মদ ও জুয়ার মধ্য দিয়ে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে চায়। তোমরা কি তাহলে বিরত থাকবে?"
সুতরাং এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতে মদ পান করতে নিষেধ করেছেন এবং তা থেকে সাবধান করেছেন। রাসূল (সা) বলেছেনঃ "তোমরা মদ পরিত্যাগ কর। কারণ ওটা সকল ঘৃণ্য কাজের জননী।" এ থেকে এটা স্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি মদ পরিত্যাগ করেনা, সে আল্লাহ ও তার রাসূলের নাফরমানী করে এবং এ জন্য সে আযাবের যোগ্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা আন্ নিসায় বলেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে এবং তার সীমা লংঘন করে, আল্লাহ তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।"
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ "মদপানের নিষেধাজ্ঞা নাযিল হওয়ার পর সাহাবীগণ একে অপরের কাছে গিয়ে বলতে থাকেন যে, মদকে হারাম করা হয়েছে এবং তাকে শিরকের সমপর্যায়ের গুনাহ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
তাবারানী ও হাকেম বর্ণিত এক হাদীস অনুসারে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর মদ পানকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ গণ্য করতেন। এটা যে যাবতীয় নোংরা ও গর্হিত কাজের প্ররোচনার উৎস বা জননী, সে ব্যাপারে কোন দ্বিমতের অবকাশ নেই। আবু দাউদ শরীফে হযরত ইবনে উমার, ইবনে মাজাহ ও তিরমিযি শরীফে হযরত আনাস এবং আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত একাধিক হাদীসে মদ পানকারীর ওপর অভিশাপ বর্ষণ করা হয়েছে।
সহীহ মুসলিম বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: প্রত্যেক মাদক ও নেশাকর দ্রব্যই মদ এবং প্রত্যেক মদই হারাম। যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে মদ খাওয়ায় অভ্যস্ত থেকেছে এবং তওবা ছাড়াই মরে গেছে, সে আখিরাতে জান্নাতের পানীয় থেকে বঞ্চিত থাকবে। হাদীসটি সহীহ বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী, আবু দাউদ ও বায়হাকীতেও বর্ণিত হয়েছে। সহীহ মুসলিম ও নাসায়ীতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: যে ব্যক্তি কোন মাদক দ্রব্য সেবন করে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামীদের ঘর্ম ও মলমূত্র পান করাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা বর্ণিত হাদীস রাসূল (সা) বলেনঃ "মদ্যপায়ী ব্যক্তি মূর্তি পূজাকারীর সমান।"
সহীহ নাসায়ীতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "দুই ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না : পিতামাতার অবাধ্য ও মদ্যপায়ী।" অপর হাদীসে বলা হয়েছে: "তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না : মদ্যপায়ী, পিতামাতার অবাধ্য ও দায়ূস।" দায়ূস হলো সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের সদস্যদেরকে অসৎ কর্মে লিপ্ত জেনেও বাধা দেয় না।
রাসূল (সা) বলেন : "তিন ব্যক্তির নামায কবুল হয়না এবং কোন সৎ কর্ম উর্দ্ধে আরোহন করে না। পলাতক গোলাম যতক্ষণ তার মনিবের নিকট ফিরে না আসে, যে স্ত্রীর ওপর তার স্বামী অসন্তুষ্ট-যতক্ষণ সে তার ওপর খুশী না হয়, আর মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যাওয়া ব্যক্তি- যতক্ষণ তার হুশ ফিরে না আসে।"
মানুষের বিবেক বুদ্ধিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় এমন যে কোন মাদক দ্রব্যই মদ, চাই তা তরল পানীয় হোক বা শক্ত খাদ্য হোক, এবং শুকনো হোক কিংবা ভিজা হোক। রাসূল (সা) বলেছেনঃ "মদ্যপায়ীর দেহে যতক্ষণ বিন্দুমাত্রও মদ অবশিষ্ট থাকবে ততক্ষণ আল্লাহ তার নামায কবুল করবেন না।" অপর হাদীসে আছে : "মদ্যপায়ীর কোন সৎ কর্মই আল্লাহ কবুল করেন না, আর মদ পানের কারণে মাতাল হয়ে যাওয়া ব্যক্তির ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। সে যদি তওবা করে আবার মদ পান করে, তবে আল্লাহ তাকে জাহান্নামের গলিত তামা ভক্ষণ করাবেনই।" রাসূল (সা) আরো বলেন : “যে ব্যক্তি মদ পান করলো, কিন্তু মাতাল হলো না, আল্লাহ তায়ালা ৪০ রাত পর্যন্ত তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবেন। আর যে মদ পান করে মাতাল হয়, আল্লাহ তার কোন সাদাকাহ ও সৎকাজ ৪০ রাত পর্যন্ত গ্রহণ করেন না। এই সময়ের মধ্যে সে মারা গেলে সে পৌত্তলিকের মত মরবে। আর আল্লাহ তাকে জাহান্নামীর মলমূত্র ও ঘাম পান করাবেন।"
রাসূল (সা) বলেছেন : "চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না, ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না, মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদ পান করে না। পরে তওবা তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।" (সহীহ আল বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন : "যে ব্যক্তি যিনা করে কিংবা মদ পান করে। আল্লাহ তার কাছ থেকে ঈমান ছিনিয়ে নেন, যেভাবে কোন ব্যক্তি তার জামা মাথার ওপর দিয়ে খুলে ফেলে।” (হাকেম)
রাসূল (সা) আরো বলেন : “যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় মদ পান করে, সে ভোর পর্যন্ত মুশরিক থাকবে। আর যে ব্যক্তি সকালে মদ পান করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুশরিক থাকবে।” রাসূল (সা) আরো বলেনঃ "জান্নাতের ঘ্রাণ পাঁচশো বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। অথচ পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, দান করে যে খোঁটা দেয়, মদ্যপায়ী ও মূর্তি পূজারী এই ঘ্রাণ পাবেনা।” (তাবারানী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "মদ্যপায়ীকে জাহান্নামে ব্যভিচারী নারীদের যৌনাংগ থেকে নির্গত পানি পান করানো হবে।"
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা আমাকে রহমত ও হেদায়াত হিসাবে পাঠিয়েছেন। বাদ্যযন্ত্র ও জাহেলিয়াতের কর্মকান্ড উচ্ছেদ করার জন্য পাঠিয়েছেন। আমার প্রভু শপথ করেছেন যে, আমার কোন বান্দা এক কাতরা মদ পান করলেও তাকে আমি জাহান্নামের উত্তপ্ত পানি পান করাবো। আর যে বান্দা আমার ভয়ে মদ ত্যাগ করবে, আমি তাকে সর্বোত্তম সাথীদের সাথে জান্নাতের সম্ভ্রান্ততম স্থানে পানীয় পান করাবো।" (আহমাদ)
রাসূল (সা) বলেছেনঃ "মদের ওপর, মদ পানকারীর ওপর, যারা মদ পান করায় তাদের ওপর, মদের ক্রেতা, বিক্রেতা, উৎপাদনকারী, বহন-পরিবহনকারী, সংগ্রহকারী, সরবরাহকারী ও মদের বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভোগকারী সকলের ওপর অভিশাপ বর্ষণ করা হয়েছে।" (আবু দাউদ, আহমাদ)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ'স বলেন: "মদখোররা রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়োনা।" ইমাম বুখারী বলেন ইবনে উমার বলেন: "মদখোরদেরকে সালাম করোনা।" রাসূল (সা) বলেছেনঃ "মদখোরদের সাথে ওঠাবসা করোনা। রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়োনা। তাদের জানাযায় হাজির হয়োনা। মদখোর যখন কিয়ামতের ময়দানে হাজির হবে, তখন তার জিহবা তার বুকের ওপর ঝুলতে থাকবে, তা থেকে লালা ঝরতে থাকবে, তাকে যেই দেখবে ঘৃণা করতে ও ধিক্কার দিতে থাকবে এবং সকলেই তাকে মদখোর হিসাবে চিনবে।"
মুসলিম মনীষীগণের কেউ কেউ বলেছেন: "মদ্যপায়ী রোগাক্রান্ত হলে তাকে দেখতে যাওয়া এবং তাকে সালাম করা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই যে, মদ্যপায়ী ফাসিক ও অভিশপ্ত। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার ওপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। তবে সে তওবা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন।"
হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন যে, "আমার এক মেয়ে রোগাক্রান্ত হলে আমি তার চিকিৎসার জন্য খানিকটা মদ তৈরী করলাম। এই সময় রাসূল (সা) আমার ঘরে প্রবেশ করে বললেনঃ হে উম্মু সালামা! এ কি হচ্ছে? আমি বললাম! হে আল্লাহর রাসূল! ওটা দিয়ে আমি আমার মেয়ের চিকিৎসা করছি। রাসূল (সা) বললেন: আল্লাহ তায়ালা যে জিনিসকে আমার উম্মাতের ওপর হারাম করেছেন, তাতে তার রোগ নিরাময়ের কোন গুণ রাখেননি।"
আবু মূসা (রা) বলেন: রাসূল (সা) এর নিকট একটি কলসীতে রক্ষিত কিছু রস আনা হলো। সেই রসে কিছুটা পচন ধরে গিয়েছিল। রাসূল (সা) বললেনঃ "এই কলসিটাকে দেয়ালের সাথে ছুড়ে মারো। কারণ ওতে যে পানীয় রয়েছে, ওটা আল্লাহতে অবিশ্বাসী ও আখেরাতে অবিশ্বাসীদের পানীয়।"
রাসূল (সা) আরো বলেনঃ "যার বুকে আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত রক্ষিত আছে, সে মদ পান করলে কিয়ামতের দিন ঐ আয়াতের প্রতিটি অক্ষর তার কাছে বাদী হয়ে আসবে এবং আল্লাহর দরবারে তাকে আসামী হিসাবে দাঁড় করাবে। আর কিয়ামতের দিন আল কুরআন যার বাদী হবে, তার জন্য দুঃসংবাদ।"
রাসূল (সা) আর একটি হাদীসে বলেন: "কোন দল দুনিয়াতে কোন নেশাকর দ্রব্য সেবনে ঐক্যবদ্ধ হলে জাহান্নামে আল্লাহ তাদেরকে একত্রিত করবেন। অতঃপর তারা সবাই পরস্পরকে উক্ত মাদক দ্রব্য সেবনে প্ররোচিত করার জন্য দোষারোপ করবে। প্রত্যেকে অপরকে বলবে: তুমিই আমাকে এই নিষিদ্ধ জিনিস সেবনে উদ্বুদ্ধ করেছিলে।"
রাসূল (সা) আরো বলেনঃ "যে ব্যক্তি মদ পান করবে, জাহান্নামে আল্লাহ তাকে এমন মারাত্মক বিষ পান করাবেন যে, সেই বিষের পেয়ালা মুখের কাছে নেয়া মাত্রই এবং বিষ পান করার আগেই ঐ পেয়ালার ভেতরে তার মুখের গোস্ত খসে পড়বে। আর বিষ পান করার পর তার দেহের সমস্ত গোশত ও চামড়া খসে পড়ে যাবে। তার দুর্গন্ধে সমগ্র জাহান্নামবাসী যন্ত্রণা ভোগ করবে। মনে রেখ, মদ পানকারী, মদ উৎপাদনকারী, পরিবহন ও সরবরাহকারী, ক্রয়-বিক্রয়কারী এবং এর বিক্রয়মূল্য ভোগকারী সকলেই এর পাপের অংশীদার। তাদের নামায, রোযা, হজ্জ - কিছুই আল্লাহ কবুল করবেন না যতক্ষণ তারা তওবা না করে। তওবা না করে মারা গেলে আল্লাহ তাকে প্রতি ঢোক মদ পানের বিনিময়ে জাহান্নামের অধিবাসীদের রক্ত পূঁজ পান করাবেন। মনে রেখ, যে কোন নেশাকর ও মাদক দ্রব্য মদ হিসাবে গণ্য এবং মদ মাত্রেই হারাম।"
একটি হাদীসে আছে যে, মদখোরদেরকে দোজখের প্রহরীরা পুলসিরাতের ওপর থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে এবং দোজখে তাদেরকে যে নোংরা পানীয় পান করানো হবে, তা আকাশের ওপর পতিত হলে তার উত্তাপে গোটা আকাশ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেত।
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেন: "কোন মদ্যপায়ী মারা গেলে তাকে একটি কাষ্ঠ খন্ডের ওপর শূলবিদ্ধ করে কবরস্থ কর। পরে কবর খুলে দেখ। যদি দেখতে পাও যে তার মাথা পশ্চিম দিক থেকে ফিরে যায়নি, তাহলে তাকে শূল থেকে খুলে স্বাভাবিকভাবে দাফন কর। নচেত তাকে শূলবিদ্ধ অবস্থায়ই রাখো।”
হযরত ফযীল ইবনে ইয়ায একবার তার মুমূর্ষ শিষ্যকে দেখতে গিয়ে তাকে কলেমা পড়তে বলেন। কিন্তু সে কলেমা পড়তে পারছিল না। তিনি বারবার তাকে কলেমা শেখালেন। কিন্তু সে বললো: আমি কলেমা পড়তে পারছিনা। আর কলেমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। ফযীল কাঁদতে কাঁদতে তার কাছ থেকে চলে গেলেন। অতঃপর কিছু দিন পর তাকে স্বপ্নে দেখলেন। দেখলেন তাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বললেন: তোমার কলেমার জ্ঞান কিসে ছিনিয়ে নিয়েছিল? সে বললো: একবার আমার অসুখ হয়েছিল। চিকিৎসক আমাকে চিকিৎসার জন্য মদ পান করতে বলেছিল। তাই আমি মদ পান করতাম। বস্তুতঃ চিকিৎসার্থে মদ পানকারীর যদি এই দশা হয়ে থাকে, তাহলে সখের বসে ও নেশার বশে মদ পানকারীর কী অবস্থা হবে, ভাবতেও গা শিউরে ওঠে।
মদ ছাড়াও কিছু তরল বা কঠিন আকৃতির মাদক দ্রব্য রয়েছে, যা খেলে বা পান করলে মাদকতা আসে, বিবেকবুদ্ধি ও মেজাজ সাময়িক বা স্থায়ীভাবে পাল্টে যায়, আংশিক অথবা পুরোপুরি মাতলামীর সৃষ্টি করে, মাত্রাতিরিক্ত যৌন উত্তেজনার সৃষ্টি করে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে, স্বভাবে হিংস্রতা এনে গালিগালাজ, মারামারি বা দাংগা ফাসাদের উস্কানি দেয়, আর নামায-রোযা ও অন্যান্য ইবাদাত থেকে সেবনকারীকে বিরত রাখে, এমন কি মাত্রারিক্ত সেবন করলে সেবনকারীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটায়। গাজা, ভাং, আফিম, তাড়ি, হিরোইন, হাশিশ ও অনুরূপ দেশী- বিদেশী বস্তু মাদক দ্রব্য এর আওতাভুক্ত। এর সব কটিই হারাম। "সকল মাদক দ্রব্যই হারাম চাই তা পরিমাণে বেশী হোক বা কম হোক"- এই একটি দ্ব্যর্থহীন বাক্য দ্বারা রাসূল (সা) এগুলিকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং মদখোরের শরীয়ত বিহিত শাস্তি ৮০টি বেত্রাঘাত প্রত্যেক মাদকখোরেরই প্রাপ্য।
একটি ঘটনা: উমাইয়া শাসক আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের কাছে এক যুবক ক্রন্দনরত অবস্থায় এসে বললোঃ হে আমীরুল মুমিনীন, আমি কবর খুঁড়ে মৃতদের কাফন চুরি করতাম। একটি কবর খুঁড়ে দেখি, তার ভেতরে শায়িত মানুষটি শুকরের আকৃতি ধারণ করে রয়েছে। আমি ভয়ে কবরটি ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হয়েছি, এমন সময় গায়েবী আওয়াজ হলোঃ "তুমি তো চলে যাচ্ছ।
এই লোকটাকে কেন শুকরে পরিণত করা হয়েছে জান?" আমি বললাম: না। আমাকে বলা হলোঃ "সে মদ খেত এবং তওবা না করেই মারা গেছে। তাকে এই অবস্থায় কিয়ামত পর্যন্ত আযাব ভোগ করানো হবে।" আল্লাহ আমাদেরকে এই ভয়ংকর পাপ কাজ থেকে রক্ষা করুন।
📄 জুয়া খেলা
মহান আল্লাহ বলেনঃ "হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, দেবতার নামে বেদীতে বলি দেয়া ও লটারী দ্বারা ভাগ্য গণনা শয়তানের নোংরা কাজ। এসব থেকে দূরে থাক। তাহলে তোমরা সফলকাম হবে। মদ ও জুয়ার মধ্য দিয়ে শয়তান তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে ও নামায থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে রাখতে চায়। তোমরা কি বিরত থাকবে?" (সূরা আল মায়েদা)
যে কোন ধরনের জুয়াই এই আয়াতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, চাই তা দাবা, তাস, পাশা, গুটি অথবা অন্য কোন জিনিসের দ্বারা খেলা হোক। এটা আসলে অবৈধ পন্থায় মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ ও লুণ্ঠন করার আওতাভুক্ত। যাকে আল্লাহ তায়ালা সূরা আল বাকারার এই আয়াতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন: "তোমরা পরস্পরের সম্পদ অবৈধ পন্থায় খেয়োনা।" রাসূল (সা) এক হাদীসে বলেছেন : "কিছু লোক অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদে হস্তক্ষেপ করে। তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব।” (সহীহ আল বুখারী) সহীহ বুখারীর অপর এক হাদীসে আছে, রাসূল (সা) বলেছেন: "কেউ যদি এরূপ প্রস্তাব বা দাওয়াত দেয় যে, এস তোমার সাথে জুয়া খেলবো, তবে তার (গুনাহ মাফের জন্য) সদকা করা উচিত।" বস্তুতঃ জুয়া সম্বন্ধে শুধু কথা বললেই যদি সদকা বা কাফফরা দিতে হয়, তবে কাজ করলে কী পরিণতি হতে পারে ভেবে দেখুন তো!
তাস ও দাবা ইত্যাদি খেলা যদি আর্থিক হারজিত থেকে মুক্ত হয় এবং নিছক চিত্তবিনোদনমূলক হয়, তবে তা নিয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে হারাম, কারো মতে হালাল। কিন্তু আর্থিক হারজিত যুক্ত থাকলে তা যে হারাম, সে ব্যাপারে সকল মাযহাবের আলেম ও ইমামগণ একমত। মারদ বা পাশা জাতীয় জুয়া খেলা হারাম হওয়া সম্পর্কে ইমামগণ একমত হয়েছেন। কেননা রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি পাশা খেললো, সে যেন নিজের হাতকে শুকরের গোশত ও রক্তের মধ্যে ডুবিয়ে রঞ্জিত করলো।” (মুসলিম) সহীহ আল-বুখারী বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: “যে ব্যক্তি পাশা খেলে, সে আল্লাহ ও রাসূলের নাফরমানী করে।” হযরত ইবনে উমার (রা) বলেন: “পাশা খেলা এক ধরনের জুয়া এবং তা শুকরের চর্বি দিয়ে পালিশ করার মত হারাম কাজ।"
দাবা খেলা ত অধিকাংশ আলেমের মতে হারাম, চাই তাকে কোন কিছু বন্ধক রাখা তথা আর্থিক হারজিতের বাধ্যবাধকতা থাক বা না থাক। তবে বন্ধক রাখা এবং হেরে যাওয়া খেলোয়াড়ের বন্ধক বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা, অন্য কথায় আর্থিক হারজিত যুক্ত থাকলে তা সর্বসম্মতভাবে জুয়া ও হারাম। বন্ধক রাখা ও আর্থিক হারজিত যুক্ত না থাকলেও অধিকাংশ আলেমের মতে দাবা খেলা হারাম। কেবলমাত্র ইমাম শাফেয়ী একে হালাল মনে করেন শুধু এই শর্তে যে, তা ঘরোয়াভাবে খেলা হবে এবং নামায কাযা অথবা অন্য কোন ফরয ওয়াজিব বিনষ্ট হওয়ার কারণ হবেনা। ইমাম নবাবী ইমাম শাফেয়ীর এই মতানুসারে ফতোয়া দিতেন। সেই সাথে তিনি পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের বিনিময়ে দাবা খেলাকে জুয়ার অন্তর্ভুক্ত বলে রায় দেন।
যে সমস্ত আলেম দাবা খেলাকে হারাম বলেন, তাদের প্রমাণ হলো সূরা আল মায়েদার তৃতীয় আয়াতের এই উক্তি: "ওয়া আন তাসতাকসিমু বিল আযলাম।" ইমাম সূফিয়ান ও ওয়াকী ইবনুল জাররাহ ব্যাখ্যা দেন যে, 'আযলাম' অর্থ দাবা খেলা। হযরত আলী (রা) বলেন: শাতরাস্তু বা দাবা হলো অনারবদের জুয়া। হযরত আলী (রা) একদিন দাবা খেলায়রত একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখে বললেন: "তোমরা যা নিয়ে এরূপ ধ্যানে মগ্ন আছ এটি কী? এগুলো স্পর্শ করার চেয়ে জ্বলন্ত আগুন স্পর্শ করাও ভাল। আল্লাহর কসম, তোমাদেরকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি।" হযরত আলী (রা) আরো বলেন: "দাবাড়ুর ন্যায় মিথ্যাবাদী আর কেউ নেই। সে বলে আমি হত্যা করছি। অথচ সে হত্যা করেনি। সে বলে, ওটা মরেছে। অথচ কোন কিছুই মরেনি।” হযরত আবু মূসা আশয়ারী রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন: গুনাহগার ব্যক্তি ছাড়া কেউ দাবা খেলেনা। ইমাম ইসহাক বিন রাহওয়াহকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, দাবা খেলাতে আপনার মতে আপত্তি আছে? তিনি বললেন: দাবا পুরোপুরি আপত্তিকর। তাঁকে বলা হলো: দূর্গের সৈন্যরা যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে দাবা খেলে। তিনি জবাব দিলেন: এটি গুনাহর কাজ। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কারযী দাবা খেরা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন: দাবা খেলার ন্যূনতম ক্ষতি এই যে, দাবাড়ু কিয়ামতের দিন বাতিল পন্থীদের সাথে সমবেত হবে।
হযরত ইবনে উমার (রা) দাবাকে পাশার চেয়েও খারাপ এবং ইমাম মালিক (রহ) দাবাকে পাশার সমপর্যায়ের এবং উভয়ে এ দুটিকে হারাম বলেছেন। ইমাম মালিক আরো বলেন: আমি শুনেছি যে, হযরত ইবনে আব্বাস জনৈক ইয়াতীমের সম্পতির তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি ঐ সম্পত্তিতে দাবা খেলার সরঞ্জাম পেয়ে তা পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। দাবা খেলা বৈধ হলে ইয়াতীমের সম্পত্তির এই ক্ষতি সাধন তার দ্বারা সম্ভবপর হতো না। হারাম বলেই তিনি এ কাজ করতে পেরেছিলেন যেমন কোন ইয়াতীমের সম্পত্তিতে মদ থাকলে তা ঢেলে ফেলা ওয়াজিব। ইবরাহীম নাখয়ী (রহ) এর মতে দাবা একটি অভিশপ্ত খেলা।
এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন তাঁর সৃষ্টির প্রতি ৩৬০ (তিনশো ষাট) বার রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। যে দাবা খেলে, সে এর একটি দৃষ্টিও পায়না।” হযরত আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “দাবা পাশা ও অন্যান্য অলসতা সৃষ্টিকারী খেলায় নিমগ্ন লোকদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় সালাম দিওনা। কেননা তারা যখন খেলায় মত্ত হয়, তখন শয়তান তার দলবল নিয়ে তাদের মাঝে সমবেত হয়। যখনই কেউ খেলা ছেড়ে চলে যায়, শয়তান তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। কেননা শয়তান ও তার দলবল তাকে ঘৃণা করে, দাবাড়ুরা খেলা শেষে যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে চলে যায় তখন তারা মরা জন্তুর লাশ খেয়ে পেট ভরা কুকুরদের মত চলে যায়।" অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: "দাবাড়ুরা কিয়ামতের দিন কঠিন আযাব ভোগ করবে।"
📄 সতী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "যারা সতী ও সরলমনা মুমিন নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং সেই দিন তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে, যেদিন তাদের জিহবা, হাত ও পা তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে।” (সূরা আন নূর) "যারা সতী নারীদের ওপর অপবাদ দেয়, অতঃপর চারজন সাক্ষী হাজির করেনা, তাদেরকে ৮০টি দোররা মারো এবং আর কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করোনা। তারাই হচ্ছে ফাসিক।" (সূরা আন নূর)
এ সব আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোন সতী নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচার ও অশ্লীল কর্মে লিপ্ত হওয়ার অপবাদ আরোপকারী দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তার জন্য কঠিন আযাব নির্দ্ধারিত রয়েছে। পৃথিবীতে তার শাস্তি এই যে, তাকে ৮০টি দোররা (বিশেষভাবে সজ্জিত প্রহার দন্ড) মারা হবে এবং সে সত্যবাদী হলেও তার সাক্ষ্য কখনো গ্রহণ করা হবেনা। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রাসূল (সা) সাতটি বৃহত্তম কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন এবং এই সাতটির অন্যতম হচ্ছে সতী ও সরলমনা মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ রটনা করা। অপবাদ রটনার বিভিন্ন পন্থা রয়েছে, যেমন: কোন নির্দোষ মুসলিম নারীকে এরূপ সম্বোধন করা “ওহে ব্যভিচারীনী, ওহে বেশ্যা, ওহে অসতী, অথবা তার স্বামীকে সম্বোধন করা, "ওহে ব্যভিচারিনীর বা বেশ্যার স্বামী, অথবা তার সন্তানকে বলা "ওহে হারামজাদা বা হারামজাদী, ওহে বেশ্যার সন্তান বা ব্যভিচারিনীর সন্তান" ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, বিনা প্রমাণে ব্যভিচারের অভিযোগ উত্থাপন স্ত্রী বা পুরুষ যার বিরুদ্ধেই করা হোক এবং যে ভাষাতেই করা হোক, আর সেই অভিযুক্ত পুরুষ বা স্ত্রী স্বাধীন বা দাসদাসী যাই হোক না কেন অভিযোগ আরোপকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আবেদন সাপেক্ষে ৮০টি দোররা মারা হবে।
(ব্যভিচার ব্যতীত অন্যান্য পাপাচার সংক্রান্ত অপবাদ আরোপের বিষয়টি পরবর্তীতে আলাদাভাবে বর্ণনা করা হবে। কেননা সেগুলি কবীরা গুনাহ হলেও সেগুলোর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোন পার্থিব শাস্তি নির্দ্ধারিত নেই। অনুবাদক)
পরিতাপের বিষয় যে, সাধারণতঃ অজ্ঞ মুসলমানেরা এ ধরনের অশ্লীল কথাবার্তা রটনা করে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত হয় ও আযাব ভোগ করে। এ জন্য রাসূল (সা) মানুষের জিহবাকে সংযত রাখতে বলেছেন। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "লোকেরা বিনা সাক্ষ্য প্রমাণে কোন কোন কথা বলে জাহান্নামের এত গভীরে নিক্ষিপ্ত হয়, যার দূরত্ব সূর্যাস্তের স্থান ও সূর্যোদয়ের স্থানের মধ্যের দূরত্বের চেয়েও বেশী।" এ কথা শুনে হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল বললেন: “হে রাসূলুল্লাহ! আমাদের কথাবার্তার জন্যও কি আমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে?” রাসূল (সা) বললেনঃ "ওহে মুয়ায! মানুষের মুখ দ্বারা সংঘটিত পাপ ছাড়া আর কোন পাপ কি এমন আছে, যা তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপের কারণ হবে?” রাসূল (সা) আরো বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে হয় নিরব থাকুক, না হয় ভালো কথা বলুক।" এছাড়া পবিত্র আল কুরআনের এ আয়াতটিতেও জিহবার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে: "সে যে কথাই উচ্চারণ করুক না কেন, তা লিখে রাখার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।" (সূরা ক্বাফ) হযরত উকবা ইবনে আমের (রা) রাসূলকে (সা) জিজ্ঞাসা করলেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুক্তি কিভাবে পাওয়া যাবে? তিনি বলেন: তোমার জিহবাকে সংযত রাখো, তোমার বাড়ীর প্রশস্ততা যেন তোমার জন্য যথেষ্ট হয় (অর্থাৎ অন্যের ভূমির প্রতি লোভ করোনা, তোমার গুনাহর জন্য কাঁদো, এবং মনে রেখ যে, নিষ্ঠুরমনা লোকেরা আল্লাহ থেকে সবচেয়ে বেশী দূরবর্তী।” (আবু দাউদ ও তিরমিযী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হচ্ছে অশ্লীল কথাবার্তা উচ্চারণকারী।” (তিরমিযী) এ হাদীস থেকে সহজেই বুঝা যায় যে, অশ্লীল কাজে লিপ্ত লোকেরা তাহলে কত বেশী ঘৃণিত। তিনি আরো বলেছেনঃ "যে ব্যক্তি আমার জন্য তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অংগ (জিহবা দাঁত ও খাদ্যনালী) এবং দুই উরুর মধ্যবর্তী অংগকে (যৌনাংগ) সংরক্ষণ করার দায়িত্ব নেবে, আমি তার জন্য জান্নাতেও দায়িত্ব নেব।"
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে, চরিত্রবান ও চরিত্রব্রতী লোকদের সম্মান রক্ষা এবং সমাজে অশ্লীলতার বিস্তার রোধের উদ্দেশ্যেই ৪ জন চাক্ষুস সাক্ষী ব্যতীত ব্যভিচারের অভিযোগ প্রকাশ্যে উচ্চারণে এইরূপ কঠোর আইনগত কড়াকড়ি আরোপিত হয়েছে। এ দ্বারা প্রকৃত ব্যভিচারীদেরকে রক্ষা করা শরীয়তের উদ্দেশ্য নয়। (নাউজু বিল্লাহ) প্রকৃত অপরাধীদেরকে শাস্তি দানের জন্য যথাযথ নিয়মে আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে হবে।
📄 চুরি করা
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "চোর-স্ত্রী বা পুরুষ যাই হোক না কেন, তাদের হাত কেটে দাও, তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তিস্বরূপ। আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।" (সূরা আল মায়েদা)
এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে ইবনে শিহাব বলেন: মানুষের সম্পদ অপহরণের অপরাধের জন্য আল্লাহ হাত কাটার শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। তিনি চোরের প্রতিশোধ গ্রহণে পরাক্রমশালী এবং হাত কাটাকে বাধ্যতামূলক করার কাজে প্রাজ্ঞ।
রাসূল (সা) বলেছেন: "কোন চোর ঈমানদার অবস্থায় চুরি করেনা। তবে তওবা করলে ঈমান বহাল হয়।" (আবু দাউদ, তিরমিযী)
হযরত ইবনে উমার (রা) বর্ণনা করেন যে, তিন দিরহাম মূল্যের দ্রব্য চুরির ঘটনায় রাসূল (সা) হাত কেটেছেন। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম) হযরত আয়িশাহ (রা) বলেন: রাসূল (সা) সিকি দিনার বা তার বেশী চুরিতে হাত কেটে দিতেন। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম) একাধিক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, সিকি দিনার বা তিন দিরহামের কম চুরিতে হাত কাটা যাবেনা।
তৎকালে ১২ দিরহামে এক দিনার হতো। তবে চুরির পরিমাণ যাই হোক এবং হাত কাটার শাস্তির উপযুক্ত হোক বা না হোক, সর্বাবস্থায় তা কবীরা গুনাহ ও জঘন্য অপরাধ।
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে হযরত আয়িশাহ (রা) বলেন যে, বনু মাখযুম গোত্রের এক মহিলা বিভিন্ন জিনিস ধার নিয়ে পরে অস্বীকার করতো। রাসূল (সা) তার হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। তার পরিবারের লোকেরা রাসূলের (সা) পালকপুত্র যায়েদের ছেলে উসামার কাছে এসে ঐ মহিলার অব্যাহতির জন্য সুপারিশ করতে অনুরোধ করলো। উসামা সুপারিশ করলে রাসূল (সা) বললেন: হে উসামা! আমি আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে তোমাকে সুপারিশ করতে দেখতে চাইনা।" অতঃপর সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বললেন: "তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো শুধু একজন্যই ধ্বংস হয়েছে যে, তাদের মধ্যে কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর কোন দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার হাত কেটে দিত। আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদের (সা) কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করতো, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।" অতঃপর বনু মাখযুমের ঐ মহিলার হাত কেটে দেয়া হলো।
তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ বর্ণিত হাদীসে হযরত আবদুর রহমান ইবনে জারীর বলেন: আমরা ফুযালা বিন উবাইদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম চোরের হাত কাটার পর কর্তিত হাত চোরের কাঁধে ঝুলিয়ে দেয়া কি রাসূলের (সা) সুন্নাত? তিনি বললেন: হাঁ, রাসূল (সা) কর্তিত হাত চোরের কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন।
আলেমগণ বলেন: চুরি করা জিনিস মালিকের নিকট ফেরত দেয়া ব্যতীত চোরের তওবায় কোন লাভ হবেনা। তবে সে গরীব হলে মালিকের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারে।