📄 শাসক কর্তৃক শাসিতের ওপর যুলুম
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: 'একমাত্র সেই সব লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।” (সূরা আশ শুরা)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: “তুমি কখনো ভেবনা যে, আল্লাহ অত্যাচরীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে উদাসীন। তিনি তো তাদের বিচার শুধুমাত্র এমন একটি দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করছেন, যেদিন চক্ষুগুলো বিস্ফারিত হবে, লোকেরা মাথা নত করে ছুটতে থাকবে, নিজেদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরবেনা এবং তাদের হৃদয়গুলো থাকবে শূন্য।" (সূরা ইবরাহীম)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ "যারা অত্যাচার চালিয়েছে, তারা অচিরেই জানতে পারবে তারা কী পরিণতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।" (আশ্ শুরা)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ "তারা নিজেদের কৃত অপকর্ম থেকে পরস্পরকে নিষেধ করতো না। এটা ছিল তাদের জঘন্যতম আচরণ।" (আল মায়েদা)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোকা দেয় সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেন: কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকারে পরিণত হবে। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে'আত তিরমিযী) রাসূল (সা) আরো বলেন: "তোমাদের প্রত্যেক শাসক এবং প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করা হবে কিভাবে শাসন করেছ।" (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেন: যে শাসকই তার প্রজাকে ধোঁকা দেবে সে জাহান্নামবাসী হবে। (তাবরানী) রাসূল (সা) আরো বলেন: আল্লাহ যার শাসনাধীন কিছু প্রজাকে ন্যস্ত করেছেন, অতঃপর সে তার হিত কামনা দ্বারা তাদেরকে উপকৃত করেনা, তার ওপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দেবেন। (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেনঃ "যে ব্যক্তির শাসনে আল্লাহ কিছু প্রজাকে অর্পণ করেছেন অথচ সে তাদের সাথে প্রতারণা করতে থাকে এবং প্রতারণা করতে করতে মারা যায়, তার জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দেবেন।” (সহীহ আল বুখারী)
রাসূল (সা) আরো বলেন: “জনগণের ওপর শাসন পরিচালনা করে এমন প্রত্যেক শাসককেই কিয়ামতের দিন আটক করা হবে এবং একজন ফেরেশতা তার ঘাড় ধরে রাখবে। আল্লাহ যদি তাকে বলেন যে, ওকে ফেলে দাও, তবে সেই ফেরেশতা তাকে ফেলে দেবে এবং সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।" (আহমাদ, ইবন মাজাহ) রাসূল (সা) আরো বলেন: ন্যায় বিচারক বিচারপতিও কিয়ামতের দিন এমন একটি মুহূর্তের সম্মুখীন হবে, যখন সে আক্ষেপ করবে যে, দুইজনের মধ্যে কোন একটি খোরমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব মেটাতেও তার না যাওয়া ভাল ছিল। (আহমাদ) রাসূল (সা) আরো বলেন: দশজন মানুষের শাসককেও কিয়ামতের দিন পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে, অতঃপর হয় তার কৃত সুবিচার ও সুশাসন তাকে মুক্ত করবে, নচেত তার কৃত অবিচার ও দুঃশাসন তাকে ধ্বংস করে দেবে। (আহমাদ ও ইবনে হাব্বান)
রাসূল (সা) এভাবে দোয়া করতেন: হে আল্লাহ! যার ওপর এই উম্মাতের কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হয় অতঃপর সে তাদের প্রতি নম্র আচরণ করে, তার প্রতি আপনি সদয় হোন, আর যে তাদের ওপর কঠোরতা করে, তার প্রতি আপনিও কঠোরতা করুন। (সহী মুসলিম, সুনানু নাসায়ী) রাসূল (সা) আরো বলেন: মুসলমানদের কোন দায়িত্ব আল্লাহ যাকে অর্পণ করেন, অতঃপর সে তাদের অভাব ও দৈন্য না মিটিয়ে গা ঢাকা দেয়, আল্লাহ তায়ালাও তার অভাব ও দৈন্য না মিটিয়ে গা ঢাকা দেবেন। (সুনানু আবু দাউদ, আল জামে আত তিরমিযী)
রাসূল (সা) আরো বলেন: পৃথিবীতে অচিরেই পাপিষ্ঠ ও অত্যাচারী শাসকদের প্রাদুর্ভাব ঘটবে। যে ব্যক্তি তাদের মিথ্যাচারকে মেনে নেবে এবং তাদের অত্যাচারকে সমর্থন যোগাবে, সেও আমার দলভুক্ত নয় এবং আমিও তার দলভুক্ত নই। সে কখনো হাউজ কাউসারে আসার সুযোগ পাবেনা। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী) রাসূল (সা) আরো বলেন: আমার উম্মাতের দুই শ্রেণীর মানুষ আমার শাফায়াত কখনো পাবেনা, অত্যাচারী ও ধোকাবাজ শাসক এবং ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়িকারী। এদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া হবে এবং এদের ব্যাপারে কেউ কোন দায়দায়িত্ব স্বীকার করবেনা। (তাবারানী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশী আযাব ভোগ করবে অত্যাচারী শাসক। (তাবারানী) অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ হে মানবমন্ডলী, তোমরা সৎ কাজের আদেশ দাও এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে। নচেৎ এমন এক সময় আসবে, যখন তোমরা দোয়া করলেও আল্লাহ তা কবুল করবেন না এবং তোমরা ক্ষমা চাইলেও আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। জেনে রেখ, ইহুদী আলেমরা এবং খৃস্টান সংসার ত্যাগীরা সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজে নিষেধ করা থেকে বিরত হওয়ার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর তাদের নবীদের মাধ্যমে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের ওপর সর্বব্যাপী বিপদ মুসিবত নাযিল করেন।
রাসূল (সা) আরো বলেন: যে ব্যক্তি মানুষের ওপর দয়ালু নয়, আল্লাহ তার ওপর দয়া করেন না। (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেন: আল্লাহ তায়ালা ন্যায় বিচারক শাসককে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। সেদিন তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। (সহীহ আল বুখারী ও সহী মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেন: সেই সব ন্যায় বিচারক কিয়ামতের দিন জ্যোতির্ময় মিম্বরের ওপর অধিষ্ঠিত থাকবে যারা নিজের অধস্তনদের ওপর পরিবার পরিজন ও আত্মীয় স্বজনের ওপর এবং জনগণের ওপর শাসন পরিচালনার সময় ন্যায়বিচার করবে। (সহীহ মুসলিম ও নাসায়ী)
হযরত মা'য়াজকে ইয়ামানে প্রেরণ করার সময় রাসূল (সা) তাকে বলেন: সাবধান, জনগণের মূল্যবান ধনসম্পদ রক্ষা করবে, আর মাযলুমের দোয়া সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। কেননা আল্লাহর ও মাযলুমের দোয়ার মাঝে কোন পর্দা থাকেনা। (সহীহ আল বুখারী) সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন যে, তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের মধ্যে একজন হলো মিথ্যাবাদী শাসক। তিনি আরো বলেন: তোমরা নেতৃত্বের প্রতি লোভাতুর থাকবে অথচ নেতৃত্ব তোমাদের জন্য কিয়ামতের দিন অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেন: আল্লাহর কসম, আমি এই দায়িত্ব এমন কারো ওপর অর্পণ করবো না, যে তা চাইবে বা তার আকাংখা করবে। (সহীহ আল বুখারী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: হে কা'ব ইবনে আজরা, আল্লাহ তোমাকে মূর্খ ও নির্বোধ লোকদের শাসন থেকে রক্ষা করুন। আমার পরে এমন শাসকরা ক্ষমতাসীন হবে, যারা আমার প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করবেনা। (আহমদ) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: যে ব্যক্তি মুসলমানদের বিচারক হতে চায় অতঃপর সেই পদে নিয়োগ লাভ করে, অতঃপর তার অবিচারের চেয়ে সুবিচারের মাত্রা বেশী হয়, তার জন্য জান্নাত নির্দিষ্ট রয়েছে। আর যার সুবিচারের চেয়ে অবিচারের মাত্রা বেশী হয় তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত রয়েছে। (সুনানু আবী দাউদ) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: একজন শাসককে কিয়ামতের দিন জাহান্নামের পুলের ওপর ছুঁড়ে মারা হবে। এর ফলে পুলটি এত জোরে ঝাঁকুনী খাবে যে, তার জোড়গুলো খুলে স্থানচ্যুত হয়ে যাবে। ঐ শাসক যদি আল্লাহর অনুগত হয়, তাহলে এর পরও সে ঐ পুল পার হয়ে যাবে। আর যদি সে আল্লাহর অবাধ্য হয়, তবে তাকে নিয়ে পুলটি ভেংগে পড়বে এবং সে ৫০ বছরের দূরত্বে অবস্থিত জাহান্নামের গহবরে নিক্ষিপ্ত হবে।
আমর ইবনুল মুহাজির বলেন: হযরত উমর ইবন আবদুল আযীয আমাকে বলেছিলেন: “যখন দেখবে আমি সত্যের পথ থেকে দূরে সরে গেছি, তৎক্ষণাত আমার কলার টেনে ধরে বলবে যে, ওহে উমর, তুমি এ কী করছ?" অতএব, হে জুলুমবাজ, অত্যাচারী শাসক! মনে রেখ, তোমার কারাগার হচ্ছে জাহান্নাম এবং মহা প্রভু আল্লাহই তোমার চূড়ান্ত বিচারক। সেখানে তুমি কোন ওজর আপত্তি পেশ করতে পারবেনা। ভয়াবহ কবর হবে তোমার হাজতখানা। আর দীর্ঘস্থায়ী হিসাব নিকাশ ও জবাবদিহির জন্য তোমাকে দাঁড়াতে হবে। সুতরাং নিজেকে সেই শাস্তি থেকে বাঁচাও। আর ওহে মজলুম, মনে রেখ, জালিমকে বিন্দুমাত্রও ছাড় দেয়া হয়না। যদি দেখ, কোন জালিম এত প্রভাবশালী হয়ে গেছে যে, তাকে আর প্রতিহত করা যাচ্ছেনা, তবে তাকে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে ঘুমিয়ে থাক। দেখবে, হয়তো রাতের মধ্যেই কোন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে যাবে, আল্লাহর পাকড়াও থেকে সে কিছুতেই নিস্তার পাবেনা।
📄 অহংকার করা
নিজেকে আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা, অন্যদেরকে নিজের তুলনায় ক্ষুদ্র ও অধম জ্ঞান করতঃ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে ঔদ্ধ্যত প্রকাশ করে তার প্রতি অবাধ্য হওয়া ও আদেশ অমান্য করা এ সবই অহংকারের লক্ষণ ও তার আওতাভুক্ত। পবিত্র কুরআনে একাধিক জায়গায় অহংকারের নিন্দা ও অহংকারীর প্রতি ধিক্কার ঘোষিত হয়েছে। যেমন সূরা আল মু'মিনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"মূসা বললো: আমি আমার ও তোমাদের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন প্রত্যেক অহংকারী থেকে, যে হিসাবের দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখেনা।” সূরা আন্-নাহলে আল্লাহ তায়ালা বলেন: "নিশ্চয় আল্লাহ অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না।" সূরা আল-বাকারাতে আল্লাহ বলেন:
"আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম: আদমকে সিজদা কর। সকলেই সিজদা করলো। কেবল ইবলিস করলোনা। সে অস্বীকার ও অহংকার করলো। সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।" এ দ্বারা বুঝা গেল, আল্লাহর আদেশকে যে অহংকার বশতঃ অমান্য করে, আল্লাহর প্রতি তার ঈমান থাকলেও তাতে কোন লাভ হবে না। ইবলিসের ন্যায় সে কাফের বলে গণ্য হবে। সূরা লুকমানে বলা হয়েছে: "মানুষের প্রতি মুখ ভেংচি দিয়োনা, ভ্রুকুটি করোনা এবং যমীনের ওপর অহংকার ভরে চলাফেরা করোনা। আল্লাহ কোন অহংকারী গর্বিত লোককে পছন্দ করেন না।"
একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "অহংকার আমার পোশাক। এই পোশাক যে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেষ্টা করে, তাকে আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।" (সহীহ মুসলিম)
রাসূল (সা) বলেনঃ "অহংকারী স্বৈরাচারীদেরকে কিয়ামতের দিন ক্ষুদ্র কণার আকৃতিতে ওঠানো হবে। লোকেরা তাদেরকে পায়ের তলায় পিষ্ট করবে এবং চারদিক থেকে তাদের ওপর কেবল লাঞ্ছনা ও অপমানই আসতে থাকবে। তাদেরকে জাহান্নামের বোলাস নামক কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের মাথার ওপর আগুন জ্বলতে থাকবে এবং তাদেরকে জাহান্নামবাসীর মলমূত্র, ঘাম, কাশি ইত্যাদি খেতে দেয়া হবে।" (সুনানু নাসায়ী, জামেআত তিরমিযী)
রাসূল (সা) আরো বলেন: যার অন্তরে কণা পরিমাণও অহংকার আছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেনা। (সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেন: “জান্নাত ও জাহান্নাম বিতর্কে লিপ্ত হবে। জান্নাত বলবে: আমার এ কী দশা যে, মানব সমাজের দুর্বল ও পতিত শ্রেণীর লোক ছাড়া আর কেউ আমার ভেতরে প্রবেশ করে না? আর জাহান্নাম বলবে: আর আমাকে যত সব স্বেচ্ছাচারী ও অহংকারীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ সময় আল্লাহ তাদের বিতর্কের মীমাংসা করে বলবেন: হে জান্নাত! তুমি আমার রহমতের প্রতীক। আমি যাকে ইচ্ছা করি, তাকে তোমার মাধ্যমে রহমত দিয়ে থাকি। আর ওহে জাহান্নাম! তুমি আমার আযাবের প্রতীক। তোমার দ্বারা আমি যাকে ইচ্ছা আযাব দিয়ে থাকি। তবে তোমাদের উভয়কেই কানায় কানায় পূর্ণ করা হবে।” (সহীহ মুসলিম)
ইতিহাস সাক্ষী যে, সর্বপ্রথম আল্লাহর নাফরমানী করা হয়েছিল যে গুনাহের আশ্রয় নিয়ে সেই গুনাহটি ছিল অহংকার। ইবলিসই এই অপরাধ সংঘটিত করেছিল।
হযরত সালমা ইবন আল-আকওয়া' বলেন: এক ব্যক্তি রাসূল (সা) এর সামনে বাম হাত দিয়ে আহার করলো। তিনি বললেন: ডান হাত দিয়ে খাও। সে বললোঃ আমি ডান হাত দিয়ে খেতে পারি না। রাসূল (সা) বললেন: তুমি যেন আর পারও না।" তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: তার ডান হাত দিয়ে খেতে না পারার কারণ অহংকার ছাড়া আর কিছু নয়।" অতঃপর সে আর কখনো মুখের কাছে হাত তুলতে সক্ষম হয়নি। (সহীহ মুসলিম)
রাসূল (সা) বলেন: কে জাহান্নামবাসী তাকি আমি তোমাদেরকে বলবো না? সবাই এক বাক্যে বললো: হাঁ, বলুন। তখন রাসূল (সা) বললেন: অত্যন্ত পাষাণ হৃদয়, কৃপণ ও অর্থগৃধু এবং অহংকারী ব্যক্তি। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরে বলেন: যে ব্যক্তি অহংকারের সাথে চলাফেরা করে এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে, সে যখন আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাত করবে, তখন তাঁকে তার ওপর ক্রুদ্ধ দেখবে।” (তাবারানী)
রাসূল (সা) আরো বলেন: প্রথম যে তিন ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে তারা হলো বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলকারী ও জালিম শাসক, যাকাত আদায়ে অবহেলাকারী বিত্তশালী এবং অহংকারী দরিদ্র। সহীহ আল বুখারীতে আছে, রাসূল (সা) বলেছেন: কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির দিকে আল্লাহ দৃষ্টি দেবেন না, তাদেরকে গুনাহ থেকে পবিত্র করবেন না, এবং তাদের জন্য কঠিন শাস্তি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। এই তিন ব্যক্তি হচ্ছে: পায়ের গিরে বা পাতা পর্যন্ত গড়িয়ে পড়া পোশাক পরিধানকারী। কাউকে দান করে বা উপকার করে খোঁটা দানকারী এবং মিথ্যে কসম খেয়ে পণ্য বিক্রয়কারী। পায়ের পাতা পর্যন্ত পোশাক গড়ানো অহংকারের আলামত বলে গন্য হয়ে থাকে। তাই রাসূল (সা) বলেছেন: পায়ের গিরের নিচে যে পোশাক পরা হবে তা জাহান্নামে যাবে।
মনে রাখতে হবে যে, জ্ঞান ও বিদ্যার শ্রেষ্ঠত্ব এবং পদমর্যাদার উচ্চতা নিয়ে বড়াই করা খুবই নিকৃষ্ট ধরনের অহংকার। যে ব্যক্তি আখেরাতের উদ্দেশ্যে জ্ঞান বিশেষতঃ ইসলামী জ্ঞান অর্জন করে, সে অহংকারী হতে পারেনা। সে সব সময় নিজের মনের ওপর পাহারা বসিয়ে রাখে এবং কড়া নজর রাখে। এ ব্যাপারে শৈথিল্য দেখা দিলেই মনে অহংকার আসবে এবং সঠিক পথ থেকে তাকে বিচ্যুত করে ফেলবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: যে অহংকার করে তাকে আমি আমার আয়াতসমূহ থেকে ফিরিয়ে রাখবো। অর্থাৎ অহংকার মানুষের হেদায়াতের পথ বন্ধ করে দেয়। আর যে ব্যক্তি অহংকার করা ও মুসলমানদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার উদ্দেশ্যে জ্ঞানার্জন করে এবং জ্ঞানার্জনের পর তাদেরকে বোকা ঠাওরায়, সে সবচেয়ে মারাত্মক ধরনের অহংকারে লিপ্ত হয়।
📄 মিথ্যা সাক্ষ্য দান
পবিত্র কুরআনের সূরা ফুরকানে মুমিনদের অপরিহার্য গুণাবলীর মধ্যে একটি বলা হয়েছে: "যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না।" সূরা হজ্জে ইরশাদ হয়েছে: "তোমরা মিথ্যা থেকে আত্মসংবরণ কর।" হাদীসে বলা হয়েছে: "মিথ্যা সাক্ষ্য দান শিরকের সমান।" (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, তাবারানী)
ইবনে মাজাহ বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: কিয়ামতের দিন মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার জন্য জাহান্নামের ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত সে পা নাড়াতেও পারবেনা।
মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা আসলে ৪টা বড় বড় গুনাহে লিপ্ত হয়। প্রথমতঃ সে মিথ্যা ও মনগড়া কথা বলে। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আল্লাহ তায়ালা অপব্যয়ী মিথ্যাবাদীকে হেদায়াত করেন না।" (সূরা আল মুমিন) দ্বিতীয়তঃ সে যার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় তার ওপর যুলুম করে। কেননা এদ্বারা সে তার জান মাল অথবা সম্মানের ক্ষতি সাধন করে। তৃতীয়তঃ সে যার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় তার ওপরও যুলুম করে। কেননা সে তার জন্য হারাম সম্পদ ভোগের ব্যবস্থা করে দেয়, ফলে তার জন্য জাহান্নাম অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। রাসূল (সা) বলেছেন: "মিথ্যা সাক্ষ্যের প্রভাবে আমি যদি কাউকে অন্য কোন মুমিন ভাই-এর সম্পদ দেয়ার নির্দেশ দেই, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা ঐ সম্পদ তার জন্য জাহান্নামের আগুনের একটা টুকরো।" (সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম) চতুর্থতঃ সে মিথ্যা সাক্ষ্যের মাধ্যমে একটি নিষিদ্ধ সম্পদ, প্রাণ বা সম্ভ্রমের ওপর অন্যের হস্তক্ষেপ বৈধ বানিয়ে দেয়।
সহীহ আল বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীসে আছে: রাসূল (সা) বলেন: "আমি কি তোমাদেরকে জঘন্যতম কবীরা গুনাহ কী কী বলবোনা? শোনো, তা হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক করা, মাতাপিতাকে কষ্ট দেয়া, আর সাবধান, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, সাবধান মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া।" বর্ণনাকারী বলেন, শেষের কথাটি তিনি এতবার পুনরাবৃত্তি করেন যে, আমরা মনে মনে বলছিলাম যে, আহা, উনি যদি এখন চুপ করতেন, তবে ভালো হতো।
📄 মদ্যপান
আল্লাহ তায়ালা সূরা আল মায়েদায় বলেন: “হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া ও ভাগ্য গণনা শয়তানের নোংরা কাজ। এগুলিকে পরিহার করে চল। তাহলে তোমরা সাফল্য লাভ করবে। শয়তান শুধু তোমাদের মধ্যে ক্ষমতা ও বিদ্বেষ সংঘটিত করতে চায় মদ ও জুয়ার মধ্য দিয়ে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে চায়। তোমরা কি তাহলে বিরত থাকবে?"
সুতরাং এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতে মদ পান করতে নিষেধ করেছেন এবং তা থেকে সাবধান করেছেন। রাসূল (সা) বলেছেনঃ "তোমরা মদ পরিত্যাগ কর। কারণ ওটা সকল ঘৃণ্য কাজের জননী।" এ থেকে এটা স্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি মদ পরিত্যাগ করেনা, সে আল্লাহ ও তার রাসূলের নাফরমানী করে এবং এ জন্য সে আযাবের যোগ্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা আন্ নিসায় বলেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে এবং তার সীমা লংঘন করে, আল্লাহ তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।"
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ "মদপানের নিষেধাজ্ঞা নাযিল হওয়ার পর সাহাবীগণ একে অপরের কাছে গিয়ে বলতে থাকেন যে, মদকে হারাম করা হয়েছে এবং তাকে শিরকের সমপর্যায়ের গুনাহ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
তাবারানী ও হাকেম বর্ণিত এক হাদীস অনুসারে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর মদ পানকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ গণ্য করতেন। এটা যে যাবতীয় নোংরা ও গর্হিত কাজের প্ররোচনার উৎস বা জননী, সে ব্যাপারে কোন দ্বিমতের অবকাশ নেই। আবু দাউদ শরীফে হযরত ইবনে উমার, ইবনে মাজাহ ও তিরমিযি শরীফে হযরত আনাস এবং আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত একাধিক হাদীসে মদ পানকারীর ওপর অভিশাপ বর্ষণ করা হয়েছে।
সহীহ মুসলিম বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: প্রত্যেক মাদক ও নেশাকর দ্রব্যই মদ এবং প্রত্যেক মদই হারাম। যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে মদ খাওয়ায় অভ্যস্ত থেকেছে এবং তওবা ছাড়াই মরে গেছে, সে আখিরাতে জান্নাতের পানীয় থেকে বঞ্চিত থাকবে। হাদীসটি সহীহ বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী, আবু দাউদ ও বায়হাকীতেও বর্ণিত হয়েছে। সহীহ মুসলিম ও নাসায়ীতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: যে ব্যক্তি কোন মাদক দ্রব্য সেবন করে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামীদের ঘর্ম ও মলমূত্র পান করাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা বর্ণিত হাদীস রাসূল (সা) বলেনঃ "মদ্যপায়ী ব্যক্তি মূর্তি পূজাকারীর সমান।"
সহীহ নাসায়ীতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: "দুই ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না : পিতামাতার অবাধ্য ও মদ্যপায়ী।" অপর হাদীসে বলা হয়েছে: "তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না : মদ্যপায়ী, পিতামাতার অবাধ্য ও দায়ূস।" দায়ূস হলো সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের সদস্যদেরকে অসৎ কর্মে লিপ্ত জেনেও বাধা দেয় না।
রাসূল (সা) বলেন : "তিন ব্যক্তির নামায কবুল হয়না এবং কোন সৎ কর্ম উর্দ্ধে আরোহন করে না। পলাতক গোলাম যতক্ষণ তার মনিবের নিকট ফিরে না আসে, যে স্ত্রীর ওপর তার স্বামী অসন্তুষ্ট-যতক্ষণ সে তার ওপর খুশী না হয়, আর মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যাওয়া ব্যক্তি- যতক্ষণ তার হুশ ফিরে না আসে।"
মানুষের বিবেক বুদ্ধিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় এমন যে কোন মাদক দ্রব্যই মদ, চাই তা তরল পানীয় হোক বা শক্ত খাদ্য হোক, এবং শুকনো হোক কিংবা ভিজা হোক। রাসূল (সা) বলেছেনঃ "মদ্যপায়ীর দেহে যতক্ষণ বিন্দুমাত্রও মদ অবশিষ্ট থাকবে ততক্ষণ আল্লাহ তার নামায কবুল করবেন না।" অপর হাদীসে আছে : "মদ্যপায়ীর কোন সৎ কর্মই আল্লাহ কবুল করেন না, আর মদ পানের কারণে মাতাল হয়ে যাওয়া ব্যক্তির ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। সে যদি তওবা করে আবার মদ পান করে, তবে আল্লাহ তাকে জাহান্নামের গলিত তামা ভক্ষণ করাবেনই।" রাসূল (সা) আরো বলেন : “যে ব্যক্তি মদ পান করলো, কিন্তু মাতাল হলো না, আল্লাহ তায়ালা ৪০ রাত পর্যন্ত তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবেন। আর যে মদ পান করে মাতাল হয়, আল্লাহ তার কোন সাদাকাহ ও সৎকাজ ৪০ রাত পর্যন্ত গ্রহণ করেন না। এই সময়ের মধ্যে সে মারা গেলে সে পৌত্তলিকের মত মরবে। আর আল্লাহ তাকে জাহান্নামীর মলমূত্র ও ঘাম পান করাবেন।"
রাসূল (সা) বলেছেন : "চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না, ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না, মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদ পান করে না। পরে তওবা তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।" (সহীহ আল বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন : "যে ব্যক্তি যিনা করে কিংবা মদ পান করে। আল্লাহ তার কাছ থেকে ঈমান ছিনিয়ে নেন, যেভাবে কোন ব্যক্তি তার জামা মাথার ওপর দিয়ে খুলে ফেলে।” (হাকেম)
রাসূল (সা) আরো বলেন : “যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় মদ পান করে, সে ভোর পর্যন্ত মুশরিক থাকবে। আর যে ব্যক্তি সকালে মদ পান করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুশরিক থাকবে।” রাসূল (সা) আরো বলেনঃ "জান্নাতের ঘ্রাণ পাঁচশো বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। অথচ পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, দান করে যে খোঁটা দেয়, মদ্যপায়ী ও মূর্তি পূজারী এই ঘ্রাণ পাবেনা।” (তাবারানী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "মদ্যপায়ীকে জাহান্নামে ব্যভিচারী নারীদের যৌনাংগ থেকে নির্গত পানি পান করানো হবে।"
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা আমাকে রহমত ও হেদায়াত হিসাবে পাঠিয়েছেন। বাদ্যযন্ত্র ও জাহেলিয়াতের কর্মকান্ড উচ্ছেদ করার জন্য পাঠিয়েছেন। আমার প্রভু শপথ করেছেন যে, আমার কোন বান্দা এক কাতরা মদ পান করলেও তাকে আমি জাহান্নামের উত্তপ্ত পানি পান করাবো। আর যে বান্দা আমার ভয়ে মদ ত্যাগ করবে, আমি তাকে সর্বোত্তম সাথীদের সাথে জান্নাতের সম্ভ্রান্ততম স্থানে পানীয় পান করাবো।" (আহমাদ)
রাসূল (সা) বলেছেনঃ "মদের ওপর, মদ পানকারীর ওপর, যারা মদ পান করায় তাদের ওপর, মদের ক্রেতা, বিক্রেতা, উৎপাদনকারী, বহন-পরিবহনকারী, সংগ্রহকারী, সরবরাহকারী ও মদের বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভোগকারী সকলের ওপর অভিশাপ বর্ষণ করা হয়েছে।" (আবু দাউদ, আহমাদ)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ'স বলেন: "মদখোররা রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়োনা।" ইমাম বুখারী বলেন ইবনে উমার বলেন: "মদখোরদেরকে সালাম করোনা।" রাসূল (সা) বলেছেনঃ "মদখোরদের সাথে ওঠাবসা করোনা। রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়োনা। তাদের জানাযায় হাজির হয়োনা। মদখোর যখন কিয়ামতের ময়দানে হাজির হবে, তখন তার জিহবা তার বুকের ওপর ঝুলতে থাকবে, তা থেকে লালা ঝরতে থাকবে, তাকে যেই দেখবে ঘৃণা করতে ও ধিক্কার দিতে থাকবে এবং সকলেই তাকে মদখোর হিসাবে চিনবে।"
মুসলিম মনীষীগণের কেউ কেউ বলেছেন: "মদ্যপায়ী রোগাক্রান্ত হলে তাকে দেখতে যাওয়া এবং তাকে সালাম করা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই যে, মদ্যপায়ী ফাসিক ও অভিশপ্ত। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার ওপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। তবে সে তওবা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন।"
হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন যে, "আমার এক মেয়ে রোগাক্রান্ত হলে আমি তার চিকিৎসার জন্য খানিকটা মদ তৈরী করলাম। এই সময় রাসূল (সা) আমার ঘরে প্রবেশ করে বললেনঃ হে উম্মু সালামা! এ কি হচ্ছে? আমি বললাম! হে আল্লাহর রাসূল! ওটা দিয়ে আমি আমার মেয়ের চিকিৎসা করছি। রাসূল (সা) বললেন: আল্লাহ তায়ালা যে জিনিসকে আমার উম্মাতের ওপর হারাম করেছেন, তাতে তার রোগ নিরাময়ের কোন গুণ রাখেননি।"
আবু মূসা (রা) বলেন: রাসূল (সা) এর নিকট একটি কলসীতে রক্ষিত কিছু রস আনা হলো। সেই রসে কিছুটা পচন ধরে গিয়েছিল। রাসূল (সা) বললেনঃ "এই কলসিটাকে দেয়ালের সাথে ছুড়ে মারো। কারণ ওতে যে পানীয় রয়েছে, ওটা আল্লাহতে অবিশ্বাসী ও আখেরাতে অবিশ্বাসীদের পানীয়।"
রাসূল (সা) আরো বলেনঃ "যার বুকে আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত রক্ষিত আছে, সে মদ পান করলে কিয়ামতের দিন ঐ আয়াতের প্রতিটি অক্ষর তার কাছে বাদী হয়ে আসবে এবং আল্লাহর দরবারে তাকে আসামী হিসাবে দাঁড় করাবে। আর কিয়ামতের দিন আল কুরআন যার বাদী হবে, তার জন্য দুঃসংবাদ।"
রাসূল (সা) আর একটি হাদীসে বলেন: "কোন দল দুনিয়াতে কোন নেশাকর দ্রব্য সেবনে ঐক্যবদ্ধ হলে জাহান্নামে আল্লাহ তাদেরকে একত্রিত করবেন। অতঃপর তারা সবাই পরস্পরকে উক্ত মাদক দ্রব্য সেবনে প্ররোচিত করার জন্য দোষারোপ করবে। প্রত্যেকে অপরকে বলবে: তুমিই আমাকে এই নিষিদ্ধ জিনিস সেবনে উদ্বুদ্ধ করেছিলে।"
রাসূল (সা) আরো বলেনঃ "যে ব্যক্তি মদ পান করবে, জাহান্নামে আল্লাহ তাকে এমন মারাত্মক বিষ পান করাবেন যে, সেই বিষের পেয়ালা মুখের কাছে নেয়া মাত্রই এবং বিষ পান করার আগেই ঐ পেয়ালার ভেতরে তার মুখের গোস্ত খসে পড়বে। আর বিষ পান করার পর তার দেহের সমস্ত গোশত ও চামড়া খসে পড়ে যাবে। তার দুর্গন্ধে সমগ্র জাহান্নামবাসী যন্ত্রণা ভোগ করবে। মনে রেখ, মদ পানকারী, মদ উৎপাদনকারী, পরিবহন ও সরবরাহকারী, ক্রয়-বিক্রয়কারী এবং এর বিক্রয়মূল্য ভোগকারী সকলেই এর পাপের অংশীদার। তাদের নামায, রোযা, হজ্জ - কিছুই আল্লাহ কবুল করবেন না যতক্ষণ তারা তওবা না করে। তওবা না করে মারা গেলে আল্লাহ তাকে প্রতি ঢোক মদ পানের বিনিময়ে জাহান্নামের অধিবাসীদের রক্ত পূঁজ পান করাবেন। মনে রেখ, যে কোন নেশাকর ও মাদক দ্রব্য মদ হিসাবে গণ্য এবং মদ মাত্রেই হারাম।"
একটি হাদীসে আছে যে, মদখোরদেরকে দোজখের প্রহরীরা পুলসিরাতের ওপর থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে এবং দোজখে তাদেরকে যে নোংরা পানীয় পান করানো হবে, তা আকাশের ওপর পতিত হলে তার উত্তাপে গোটা আকাশ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেত।
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেন: "কোন মদ্যপায়ী মারা গেলে তাকে একটি কাষ্ঠ খন্ডের ওপর শূলবিদ্ধ করে কবরস্থ কর। পরে কবর খুলে দেখ। যদি দেখতে পাও যে তার মাথা পশ্চিম দিক থেকে ফিরে যায়নি, তাহলে তাকে শূল থেকে খুলে স্বাভাবিকভাবে দাফন কর। নচেত তাকে শূলবিদ্ধ অবস্থায়ই রাখো।”
হযরত ফযীল ইবনে ইয়ায একবার তার মুমূর্ষ শিষ্যকে দেখতে গিয়ে তাকে কলেমা পড়তে বলেন। কিন্তু সে কলেমা পড়তে পারছিল না। তিনি বারবার তাকে কলেমা শেখালেন। কিন্তু সে বললো: আমি কলেমা পড়তে পারছিনা। আর কলেমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। ফযীল কাঁদতে কাঁদতে তার কাছ থেকে চলে গেলেন। অতঃপর কিছু দিন পর তাকে স্বপ্নে দেখলেন। দেখলেন তাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বললেন: তোমার কলেমার জ্ঞান কিসে ছিনিয়ে নিয়েছিল? সে বললো: একবার আমার অসুখ হয়েছিল। চিকিৎসক আমাকে চিকিৎসার জন্য মদ পান করতে বলেছিল। তাই আমি মদ পান করতাম। বস্তুতঃ চিকিৎসার্থে মদ পানকারীর যদি এই দশা হয়ে থাকে, তাহলে সখের বসে ও নেশার বশে মদ পানকারীর কী অবস্থা হবে, ভাবতেও গা শিউরে ওঠে।
মদ ছাড়াও কিছু তরল বা কঠিন আকৃতির মাদক দ্রব্য রয়েছে, যা খেলে বা পান করলে মাদকতা আসে, বিবেকবুদ্ধি ও মেজাজ সাময়িক বা স্থায়ীভাবে পাল্টে যায়, আংশিক অথবা পুরোপুরি মাতলামীর সৃষ্টি করে, মাত্রাতিরিক্ত যৌন উত্তেজনার সৃষ্টি করে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে, স্বভাবে হিংস্রতা এনে গালিগালাজ, মারামারি বা দাংগা ফাসাদের উস্কানি দেয়, আর নামায-রোযা ও অন্যান্য ইবাদাত থেকে সেবনকারীকে বিরত রাখে, এমন কি মাত্রারিক্ত সেবন করলে সেবনকারীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটায়। গাজা, ভাং, আফিম, তাড়ি, হিরোইন, হাশিশ ও অনুরূপ দেশী- বিদেশী বস্তু মাদক দ্রব্য এর আওতাভুক্ত। এর সব কটিই হারাম। "সকল মাদক দ্রব্যই হারাম চাই তা পরিমাণে বেশী হোক বা কম হোক"- এই একটি দ্ব্যর্থহীন বাক্য দ্বারা রাসূল (সা) এগুলিকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং মদখোরের শরীয়ত বিহিত শাস্তি ৮০টি বেত্রাঘাত প্রত্যেক মাদকখোরেরই প্রাপ্য।
একটি ঘটনা: উমাইয়া শাসক আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের কাছে এক যুবক ক্রন্দনরত অবস্থায় এসে বললোঃ হে আমীরুল মুমিনীন, আমি কবর খুঁড়ে মৃতদের কাফন চুরি করতাম। একটি কবর খুঁড়ে দেখি, তার ভেতরে শায়িত মানুষটি শুকরের আকৃতি ধারণ করে রয়েছে। আমি ভয়ে কবরটি ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হয়েছি, এমন সময় গায়েবী আওয়াজ হলোঃ "তুমি তো চলে যাচ্ছ।
এই লোকটাকে কেন শুকরে পরিণত করা হয়েছে জান?" আমি বললাম: না। আমাকে বলা হলোঃ "সে মদ খেত এবং তওবা না করেই মারা গেছে। তাকে এই অবস্থায় কিয়ামত পর্যন্ত আযাব ভোগ করানো হবে।" আল্লাহ আমাদেরকে এই ভয়ংকর পাপ কাজ থেকে রক্ষা করুন।