📄 যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন
"শত্রুবাহিনী যখন মুসলিম বাহিনীর দ্বিগুণের চেয়ে বেশী না হয়, তখন তাদের মুকাবিলা থেকে পলায়ন করা কবীরা গুনাহ। তবে রণকৌশল হিসাবে কিংবা মুজাহিদের কোন দল বা তাদের সমগ্র বাহিনীর সাথে মিলিত হবার উদ্দেশ্যে পলায়ন করলে সেটা কবীরা গুনাহ নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন: "যে ব্যক্তি যুদ্ধের দিন শত্রুদের মুকাবিলা থেকে পালাবে, সে আল্লাহর গযবে পতিত হবে এবং তার প্রত্যাবর্তন স্থল হবে জাহান্নাম। আর তা বড়ই জঘন্য জায়গা। তবে যদি কেউ রণকৌশল হিসাবে অথবা কোন সেনাদলের সাথে মিলিত হবার উদ্দেশ্যে পলায়ন করে তবে সেটা ভিন্ন কথা।" (আল আনফال) সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুমলিমে বর্ণিত একটি হাদীসে যে সাতটি সর্বনাশা কবীরা গুনাহর উল্লেখ করা হয়েছে, রণাংগন থেকে পলায়ন তার অন্যতম।
হযরত ইবনে আব্বাস বলেন: যখন এই আয়াত নাফিল হলো যে, "তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন ধৈর্যশীল ব্যক্তি তৈরী হয়, তবে তারা দুইশো জনের ওপর বিজয়ী হবে" তখন আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিলেন যে, মুসলিম বাহিনীতে যদি বিশজন থাকে এবং শত্রুবাহিনীতে দুইশো জন থাকে, তাহলে মুসলিম বাহিনীর কেউ পালাতে পারবেনা। এরপর এ আয়াত নাযিল হলো যে, "এখন আল্লাহ তায়ালা তোমাদের দায়িত্বের বোঝা হালকা করে দিয়েছেন এবং তিনি জানেন যে, তোমাদের মধ্যে কিছু দুর্বল লোক রয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যদি একশো জন ধৈর্যশীল ব্যক্তি থাকে, তবে তারা দুইশো জনের ওপর বিজয়ী হবে আল্লাহর অনুমতিক্রমে। আল্লাহ তো ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন।" এই শেষোক্ত আয়াত নাযিল করে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিলেন যে, মুসলিম বাহিনীতে যখন একশো এবং শত্রু বাহিনীতে দুইশো যোদ্ধা থাকবে, তখন মুসলমানদের পলায়ন নিষিদ্ধ। (সহীহ আল বুখারী)
[এর অর্থ দাঁড়ালো এই যে, শত্রুদের শক্তি যেখানে মুসলমানদের দ্বিগুণেরও বেশী, সেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া জরুরী নয় এবং কোন না কোন পন্থায় যুদ্ধ বিরতি বা সন্ধি করা জায়েজ। - অনুবাদক।
📄 শাসক কর্তৃক শাসিতের ওপর যুলুম
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: 'একমাত্র সেই সব লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।” (সূরা আশ শুরা)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: “তুমি কখনো ভেবনা যে, আল্লাহ অত্যাচরীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে উদাসীন। তিনি তো তাদের বিচার শুধুমাত্র এমন একটি দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করছেন, যেদিন চক্ষুগুলো বিস্ফারিত হবে, লোকেরা মাথা নত করে ছুটতে থাকবে, নিজেদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরবেনা এবং তাদের হৃদয়গুলো থাকবে শূন্য।" (সূরা ইবরাহীম)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ "যারা অত্যাচার চালিয়েছে, তারা অচিরেই জানতে পারবে তারা কী পরিণতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।" (আশ্ শুরা)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ "তারা নিজেদের কৃত অপকর্ম থেকে পরস্পরকে নিষেধ করতো না। এটা ছিল তাদের জঘন্যতম আচরণ।" (আল মায়েদা)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোকা দেয় সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেন: কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকারে পরিণত হবে। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে'আত তিরমিযী) রাসূল (সা) আরো বলেন: "তোমাদের প্রত্যেক শাসক এবং প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করা হবে কিভাবে শাসন করেছ।" (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেন: যে শাসকই তার প্রজাকে ধোঁকা দেবে সে জাহান্নামবাসী হবে। (তাবরানী) রাসূল (সা) আরো বলেন: আল্লাহ যার শাসনাধীন কিছু প্রজাকে ন্যস্ত করেছেন, অতঃপর সে তার হিত কামনা দ্বারা তাদেরকে উপকৃত করেনা, তার ওপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দেবেন। (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেনঃ "যে ব্যক্তির শাসনে আল্লাহ কিছু প্রজাকে অর্পণ করেছেন অথচ সে তাদের সাথে প্রতারণা করতে থাকে এবং প্রতারণা করতে করতে মারা যায়, তার জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দেবেন।” (সহীহ আল বুখারী)
রাসূল (সা) আরো বলেন: “জনগণের ওপর শাসন পরিচালনা করে এমন প্রত্যেক শাসককেই কিয়ামতের দিন আটক করা হবে এবং একজন ফেরেশতা তার ঘাড় ধরে রাখবে। আল্লাহ যদি তাকে বলেন যে, ওকে ফেলে দাও, তবে সেই ফেরেশতা তাকে ফেলে দেবে এবং সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।" (আহমাদ, ইবন মাজাহ) রাসূল (সা) আরো বলেন: ন্যায় বিচারক বিচারপতিও কিয়ামতের দিন এমন একটি মুহূর্তের সম্মুখীন হবে, যখন সে আক্ষেপ করবে যে, দুইজনের মধ্যে কোন একটি খোরমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব মেটাতেও তার না যাওয়া ভাল ছিল। (আহমাদ) রাসূল (সা) আরো বলেন: দশজন মানুষের শাসককেও কিয়ামতের দিন পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে, অতঃপর হয় তার কৃত সুবিচার ও সুশাসন তাকে মুক্ত করবে, নচেত তার কৃত অবিচার ও দুঃশাসন তাকে ধ্বংস করে দেবে। (আহমাদ ও ইবনে হাব্বান)
রাসূল (সা) এভাবে দোয়া করতেন: হে আল্লাহ! যার ওপর এই উম্মাতের কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হয় অতঃপর সে তাদের প্রতি নম্র আচরণ করে, তার প্রতি আপনি সদয় হোন, আর যে তাদের ওপর কঠোরতা করে, তার প্রতি আপনিও কঠোরতা করুন। (সহী মুসলিম, সুনানু নাসায়ী) রাসূল (সা) আরো বলেন: মুসলমানদের কোন দায়িত্ব আল্লাহ যাকে অর্পণ করেন, অতঃপর সে তাদের অভাব ও দৈন্য না মিটিয়ে গা ঢাকা দেয়, আল্লাহ তায়ালাও তার অভাব ও দৈন্য না মিটিয়ে গা ঢাকা দেবেন। (সুনানু আবু দাউদ, আল জামে আত তিরমিযী)
রাসূল (সা) আরো বলেন: পৃথিবীতে অচিরেই পাপিষ্ঠ ও অত্যাচারী শাসকদের প্রাদুর্ভাব ঘটবে। যে ব্যক্তি তাদের মিথ্যাচারকে মেনে নেবে এবং তাদের অত্যাচারকে সমর্থন যোগাবে, সেও আমার দলভুক্ত নয় এবং আমিও তার দলভুক্ত নই। সে কখনো হাউজ কাউসারে আসার সুযোগ পাবেনা। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী) রাসূল (সা) আরো বলেন: আমার উম্মাতের দুই শ্রেণীর মানুষ আমার শাফায়াত কখনো পাবেনা, অত্যাচারী ও ধোকাবাজ শাসক এবং ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়িকারী। এদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া হবে এবং এদের ব্যাপারে কেউ কোন দায়দায়িত্ব স্বীকার করবেনা। (তাবারানী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশী আযাব ভোগ করবে অত্যাচারী শাসক। (তাবারানী) অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ হে মানবমন্ডলী, তোমরা সৎ কাজের আদেশ দাও এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে। নচেৎ এমন এক সময় আসবে, যখন তোমরা দোয়া করলেও আল্লাহ তা কবুল করবেন না এবং তোমরা ক্ষমা চাইলেও আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। জেনে রেখ, ইহুদী আলেমরা এবং খৃস্টান সংসার ত্যাগীরা সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজে নিষেধ করা থেকে বিরত হওয়ার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর তাদের নবীদের মাধ্যমে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের ওপর সর্বব্যাপী বিপদ মুসিবত নাযিল করেন।
রাসূল (সা) আরো বলেন: যে ব্যক্তি মানুষের ওপর দয়ালু নয়, আল্লাহ তার ওপর দয়া করেন না। (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেন: আল্লাহ তায়ালা ন্যায় বিচারক শাসককে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। সেদিন তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। (সহীহ আল বুখারী ও সহী মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেন: সেই সব ন্যায় বিচারক কিয়ামতের দিন জ্যোতির্ময় মিম্বরের ওপর অধিষ্ঠিত থাকবে যারা নিজের অধস্তনদের ওপর পরিবার পরিজন ও আত্মীয় স্বজনের ওপর এবং জনগণের ওপর শাসন পরিচালনার সময় ন্যায়বিচার করবে। (সহীহ মুসলিম ও নাসায়ী)
হযরত মা'য়াজকে ইয়ামানে প্রেরণ করার সময় রাসূল (সা) তাকে বলেন: সাবধান, জনগণের মূল্যবান ধনসম্পদ রক্ষা করবে, আর মাযলুমের দোয়া সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। কেননা আল্লাহর ও মাযলুমের দোয়ার মাঝে কোন পর্দা থাকেনা। (সহীহ আল বুখারী) সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন যে, তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের মধ্যে একজন হলো মিথ্যাবাদী শাসক। তিনি আরো বলেন: তোমরা নেতৃত্বের প্রতি লোভাতুর থাকবে অথচ নেতৃত্ব তোমাদের জন্য কিয়ামতের দিন অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা) আরো বলেন: আল্লাহর কসম, আমি এই দায়িত্ব এমন কারো ওপর অর্পণ করবো না, যে তা চাইবে বা তার আকাংখা করবে। (সহীহ আল বুখারী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: হে কা'ব ইবনে আজরা, আল্লাহ তোমাকে মূর্খ ও নির্বোধ লোকদের শাসন থেকে রক্ষা করুন। আমার পরে এমন শাসকরা ক্ষমতাসীন হবে, যারা আমার প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করবেনা। (আহমদ) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: যে ব্যক্তি মুসলমানদের বিচারক হতে চায় অতঃপর সেই পদে নিয়োগ লাভ করে, অতঃপর তার অবিচারের চেয়ে সুবিচারের মাত্রা বেশী হয়, তার জন্য জান্নাত নির্দিষ্ট রয়েছে। আর যার সুবিচারের চেয়ে অবিচারের মাত্রা বেশী হয় তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত রয়েছে। (সুনানু আবী দাউদ) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: একজন শাসককে কিয়ামতের দিন জাহান্নামের পুলের ওপর ছুঁড়ে মারা হবে। এর ফলে পুলটি এত জোরে ঝাঁকুনী খাবে যে, তার জোড়গুলো খুলে স্থানচ্যুত হয়ে যাবে। ঐ শাসক যদি আল্লাহর অনুগত হয়, তাহলে এর পরও সে ঐ পুল পার হয়ে যাবে। আর যদি সে আল্লাহর অবাধ্য হয়, তবে তাকে নিয়ে পুলটি ভেংগে পড়বে এবং সে ৫০ বছরের দূরত্বে অবস্থিত জাহান্নামের গহবরে নিক্ষিপ্ত হবে।
আমর ইবনুল মুহাজির বলেন: হযরত উমর ইবন আবদুল আযীয আমাকে বলেছিলেন: “যখন দেখবে আমি সত্যের পথ থেকে দূরে সরে গেছি, তৎক্ষণাত আমার কলার টেনে ধরে বলবে যে, ওহে উমর, তুমি এ কী করছ?" অতএব, হে জুলুমবাজ, অত্যাচারী শাসক! মনে রেখ, তোমার কারাগার হচ্ছে জাহান্নাম এবং মহা প্রভু আল্লাহই তোমার চূড়ান্ত বিচারক। সেখানে তুমি কোন ওজর আপত্তি পেশ করতে পারবেনা। ভয়াবহ কবর হবে তোমার হাজতখানা। আর দীর্ঘস্থায়ী হিসাব নিকাশ ও জবাবদিহির জন্য তোমাকে দাঁড়াতে হবে। সুতরাং নিজেকে সেই শাস্তি থেকে বাঁচাও। আর ওহে মজলুম, মনে রেখ, জালিমকে বিন্দুমাত্রও ছাড় দেয়া হয়না। যদি দেখ, কোন জালিম এত প্রভাবশালী হয়ে গেছে যে, তাকে আর প্রতিহত করা যাচ্ছেনা, তবে তাকে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে ঘুমিয়ে থাক। দেখবে, হয়তো রাতের মধ্যেই কোন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে যাবে, আল্লাহর পাকড়াও থেকে সে কিছুতেই নিস্তার পাবেনা।
📄 অহংকার করা
নিজেকে আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা, অন্যদেরকে নিজের তুলনায় ক্ষুদ্র ও অধম জ্ঞান করতঃ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে ঔদ্ধ্যত প্রকাশ করে তার প্রতি অবাধ্য হওয়া ও আদেশ অমান্য করা এ সবই অহংকারের লক্ষণ ও তার আওতাভুক্ত। পবিত্র কুরআনে একাধিক জায়গায় অহংকারের নিন্দা ও অহংকারীর প্রতি ধিক্কার ঘোষিত হয়েছে। যেমন সূরা আল মু'মিনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"মূসা বললো: আমি আমার ও তোমাদের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন প্রত্যেক অহংকারী থেকে, যে হিসাবের দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখেনা।” সূরা আন্-নাহলে আল্লাহ তায়ালা বলেন: "নিশ্চয় আল্লাহ অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না।" সূরা আল-বাকারাতে আল্লাহ বলেন:
"আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম: আদমকে সিজদা কর। সকলেই সিজদা করলো। কেবল ইবলিস করলোনা। সে অস্বীকার ও অহংকার করলো। সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।" এ দ্বারা বুঝা গেল, আল্লাহর আদেশকে যে অহংকার বশতঃ অমান্য করে, আল্লাহর প্রতি তার ঈমান থাকলেও তাতে কোন লাভ হবে না। ইবলিসের ন্যায় সে কাফের বলে গণ্য হবে। সূরা লুকমানে বলা হয়েছে: "মানুষের প্রতি মুখ ভেংচি দিয়োনা, ভ্রুকুটি করোনা এবং যমীনের ওপর অহংকার ভরে চলাফেরা করোনা। আল্লাহ কোন অহংকারী গর্বিত লোককে পছন্দ করেন না।"
একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "অহংকার আমার পোশাক। এই পোশাক যে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেষ্টা করে, তাকে আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।" (সহীহ মুসলিম)
রাসূল (সা) বলেনঃ "অহংকারী স্বৈরাচারীদেরকে কিয়ামতের দিন ক্ষুদ্র কণার আকৃতিতে ওঠানো হবে। লোকেরা তাদেরকে পায়ের তলায় পিষ্ট করবে এবং চারদিক থেকে তাদের ওপর কেবল লাঞ্ছনা ও অপমানই আসতে থাকবে। তাদেরকে জাহান্নামের বোলাস নামক কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের মাথার ওপর আগুন জ্বলতে থাকবে এবং তাদেরকে জাহান্নামবাসীর মলমূত্র, ঘাম, কাশি ইত্যাদি খেতে দেয়া হবে।" (সুনানু নাসায়ী, জামেআত তিরমিযী)
রাসূল (সা) আরো বলেন: যার অন্তরে কণা পরিমাণও অহংকার আছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেনা। (সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরো বলেন: “জান্নাত ও জাহান্নাম বিতর্কে লিপ্ত হবে। জান্নাত বলবে: আমার এ কী দশা যে, মানব সমাজের দুর্বল ও পতিত শ্রেণীর লোক ছাড়া আর কেউ আমার ভেতরে প্রবেশ করে না? আর জাহান্নাম বলবে: আর আমাকে যত সব স্বেচ্ছাচারী ও অহংকারীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ সময় আল্লাহ তাদের বিতর্কের মীমাংসা করে বলবেন: হে জান্নাত! তুমি আমার রহমতের প্রতীক। আমি যাকে ইচ্ছা করি, তাকে তোমার মাধ্যমে রহমত দিয়ে থাকি। আর ওহে জাহান্নাম! তুমি আমার আযাবের প্রতীক। তোমার দ্বারা আমি যাকে ইচ্ছা আযাব দিয়ে থাকি। তবে তোমাদের উভয়কেই কানায় কানায় পূর্ণ করা হবে।” (সহীহ মুসলিম)
ইতিহাস সাক্ষী যে, সর্বপ্রথম আল্লাহর নাফরমানী করা হয়েছিল যে গুনাহের আশ্রয় নিয়ে সেই গুনাহটি ছিল অহংকার। ইবলিসই এই অপরাধ সংঘটিত করেছিল।
হযরত সালমা ইবন আল-আকওয়া' বলেন: এক ব্যক্তি রাসূল (সা) এর সামনে বাম হাত দিয়ে আহার করলো। তিনি বললেন: ডান হাত দিয়ে খাও। সে বললোঃ আমি ডান হাত দিয়ে খেতে পারি না। রাসূল (সা) বললেন: তুমি যেন আর পারও না।" তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: তার ডান হাত দিয়ে খেতে না পারার কারণ অহংকার ছাড়া আর কিছু নয়।" অতঃপর সে আর কখনো মুখের কাছে হাত তুলতে সক্ষম হয়নি। (সহীহ মুসলিম)
রাসূল (সা) বলেন: কে জাহান্নামবাসী তাকি আমি তোমাদেরকে বলবো না? সবাই এক বাক্যে বললো: হাঁ, বলুন। তখন রাসূল (সা) বললেন: অত্যন্ত পাষাণ হৃদয়, কৃপণ ও অর্থগৃধু এবং অহংকারী ব্যক্তি। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) রাসূল (সা) আরে বলেন: যে ব্যক্তি অহংকারের সাথে চলাফেরা করে এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে, সে যখন আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাত করবে, তখন তাঁকে তার ওপর ক্রুদ্ধ দেখবে।” (তাবারানী)
রাসূল (সা) আরো বলেন: প্রথম যে তিন ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে তারা হলো বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলকারী ও জালিম শাসক, যাকাত আদায়ে অবহেলাকারী বিত্তশালী এবং অহংকারী দরিদ্র। সহীহ আল বুখারীতে আছে, রাসূল (সা) বলেছেন: কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির দিকে আল্লাহ দৃষ্টি দেবেন না, তাদেরকে গুনাহ থেকে পবিত্র করবেন না, এবং তাদের জন্য কঠিন শাস্তি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। এই তিন ব্যক্তি হচ্ছে: পায়ের গিরে বা পাতা পর্যন্ত গড়িয়ে পড়া পোশাক পরিধানকারী। কাউকে দান করে বা উপকার করে খোঁটা দানকারী এবং মিথ্যে কসম খেয়ে পণ্য বিক্রয়কারী। পায়ের পাতা পর্যন্ত পোশাক গড়ানো অহংকারের আলামত বলে গন্য হয়ে থাকে। তাই রাসূল (সা) বলেছেন: পায়ের গিরের নিচে যে পোশাক পরা হবে তা জাহান্নামে যাবে।
মনে রাখতে হবে যে, জ্ঞান ও বিদ্যার শ্রেষ্ঠত্ব এবং পদমর্যাদার উচ্চতা নিয়ে বড়াই করা খুবই নিকৃষ্ট ধরনের অহংকার। যে ব্যক্তি আখেরাতের উদ্দেশ্যে জ্ঞান বিশেষতঃ ইসলামী জ্ঞান অর্জন করে, সে অহংকারী হতে পারেনা। সে সব সময় নিজের মনের ওপর পাহারা বসিয়ে রাখে এবং কড়া নজর রাখে। এ ব্যাপারে শৈথিল্য দেখা দিলেই মনে অহংকার আসবে এবং সঠিক পথ থেকে তাকে বিচ্যুত করে ফেলবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: যে অহংকার করে তাকে আমি আমার আয়াতসমূহ থেকে ফিরিয়ে রাখবো। অর্থাৎ অহংকার মানুষের হেদায়াতের পথ বন্ধ করে দেয়। আর যে ব্যক্তি অহংকার করা ও মুসলমানদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার উদ্দেশ্যে জ্ঞানার্জন করে এবং জ্ঞানার্জনের পর তাদেরকে বোকা ঠাওরায়, সে সবচেয়ে মারাত্মক ধরনের অহংকারে লিপ্ত হয়।
📄 মিথ্যা সাক্ষ্য দান
পবিত্র কুরআনের সূরা ফুরকানে মুমিনদের অপরিহার্য গুণাবলীর মধ্যে একটি বলা হয়েছে: "যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না।" সূরা হজ্জে ইরশাদ হয়েছে: "তোমরা মিথ্যা থেকে আত্মসংবরণ কর।" হাদীসে বলা হয়েছে: "মিথ্যা সাক্ষ্য দান শিরকের সমান।" (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, তাবারানী)
ইবনে মাজাহ বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: কিয়ামতের দিন মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার জন্য জাহান্নামের ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত সে পা নাড়াতেও পারবেনা।
মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা আসলে ৪টা বড় বড় গুনাহে লিপ্ত হয়। প্রথমতঃ সে মিথ্যা ও মনগড়া কথা বলে। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আল্লাহ তায়ালা অপব্যয়ী মিথ্যাবাদীকে হেদায়াত করেন না।" (সূরা আল মুমিন) দ্বিতীয়তঃ সে যার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় তার ওপর যুলুম করে। কেননা এদ্বারা সে তার জান মাল অথবা সম্মানের ক্ষতি সাধন করে। তৃতীয়তঃ সে যার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় তার ওপরও যুলুম করে। কেননা সে তার জন্য হারাম সম্পদ ভোগের ব্যবস্থা করে দেয়, ফলে তার জন্য জাহান্নাম অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। রাসূল (সা) বলেছেন: "মিথ্যা সাক্ষ্যের প্রভাবে আমি যদি কাউকে অন্য কোন মুমিন ভাই-এর সম্পদ দেয়ার নির্দেশ দেই, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা ঐ সম্পদ তার জন্য জাহান্নামের আগুনের একটা টুকরো।" (সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম) চতুর্থতঃ সে মিথ্যা সাক্ষ্যের মাধ্যমে একটি নিষিদ্ধ সম্পদ, প্রাণ বা সম্ভ্রমের ওপর অন্যের হস্তক্ষেপ বৈধ বানিয়ে দেয়।
সহীহ আল বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীসে আছে: রাসূল (সা) বলেন: "আমি কি তোমাদেরকে জঘন্যতম কবীরা গুনাহ কী কী বলবোনা? শোনো, তা হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক করা, মাতাপিতাকে কষ্ট দেয়া, আর সাবধান, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, সাবধান মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া।" বর্ণনাকারী বলেন, শেষের কথাটি তিনি এতবার পুনরাবৃত্তি করেন যে, আমরা মনে মনে বলছিলাম যে, আহা, উনি যদি এখন চুপ করতেন, তবে ভালো হতো।