📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা

📄 রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা


আল্লাহ তা'য়ালা বলেনঃ "তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের সম্পর্কে সতর্ক হও।” অর্থাৎ রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তা ছিন্ন করোনা। (সূরা আননিসা) আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন: "তোমরা রাসূলের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি এবং রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তাগুলোকে ছিন্ন করতে চাও নাকি? এসব অপকর্ম যারা করে, তাদের ওপরই তো আল্লাহ তা'য়ালা অভিশাপ বর্ষণ করেছেন এবং তাদেরকে বধির ও অন্ধ করে দিয়েছেন।” (সূরা মুহাম্মাদ) আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন: "আর যারা আল্লাহর অংগীকার পূরণ করে এবং প্রতিশ্রুতি ভংগ করেনা এবং আল্লাহ যেসব সম্পর্ক রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলিকে রক্ষা করে, তাদের প্রভুকে ভয় করে এবং খারাপ প্রতিফলকে ভয় করে, (তারাই বুদ্ধিমান)। (সূরা আর-রা'দ)
আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন: "আল্লাহ এ দ্বারা (অর্থাৎ কুরআন দ্বারা) অনেককে বিভ্রান্ত করেন এবং অনেককে সুপথগামী করেন। তিনি বিপথগামী করেন কেবল সেই সব অন্ধ লোককে, যারা আল্লাহর সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভংগ করে, আল্লাহ যেসব সম্পর্ককে রক্ষা করার আদেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। বস্তুত তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।”
বস্তুত আল্লাহ যেসব সম্পর্ককে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলো হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "রক্ত সম্পর্ক ছিন্নকারী কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবেনা।" যে ব্যক্তি নিজের দুর্বল ও দরিদ্র নিকট-আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদেরকে ত্যাগ করে, তাদের ওপর অহংকার ও দম্ভ প্রকাশ করে, নিজে ধনী এবং তারা দরিদ্র এরূপ ক্ষেত্রে তাদের প্রতি দয়া দাক্ষিণ্য ও অনুগ্রহ দ্বারা তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করেনা, উপরোক্ত হুমকি ও হুশিয়ারী তার ওপর প্রযোজ্য এবং সে জান্নাতে প্রবেশের অধিকার পাবে না। কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে তাওবাহ ও উক্ত আত্মীয়দের প্রতি সদাচরণ করা দ্বারাই এ পরিণাম থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
তারাবানীতে বিশ্বস্ত সূত্রে বর্ণিত হাদীসে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: 'দরিদ্র ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন থাকতে যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বদান্যতা প্রদর্শন করেনা এবং নিজের দান সদকা তাদেরকে না দিয়ে অন্যদেরকে দেয়, আল্লাহ তা'য়ালা তার সদকা কবুল করেননা এবং কিয়ামাতের দিন তার দিকে তাকাবেন না।" আর যদি সে নিজে দরিদ্র হয়, তবে তাদের কাছে বেড়াতে এবং তাদের অবস্থা পরিদর্শন করতে যাওয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে সচেষ্ট হওয়া উচিত। কেননা রাসূল (সা) বলেছেন: "নিকট আত্মীয়দের সাথে সালাম দেয়ার মাধ্যমে হলেও আত্মীয়তা ঘনিষ্ঠ কর।"
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তা রক্ষা করে।" (সহীহ আল বুখারী, আবু দাউদ, তিরমিযী) অন্য হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: প্রতিশোধ গ্রহণকারী সম্পর্ক রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করেনা। সম্পর্ক রক্ষাকারী হলো সেই ব্যক্তি, যে আত্মীয়তা ছিন্নকারীর সাথে আত্মীয়তা রক্ষা বা বহাল করে।
এক হাদীসে কুদসীতে রাসূল (সা) বলেন: "আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন যে, আমি পরম দয়ালু। যে ব্যক্তি রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তা রক্ষা করে, আমি তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করি আর যে ব্যক্তি তা ছিন্ন করে তার সাথে আমিও সম্পর্ক ছিন্ন করি।" হযরত আলী (রা) তার ছেলেকে বলেছিলেন: "হে বৎস! কখনো রক্ত সম্পর্ক ছিন্নকারীর সহচর হয়োনা। কেননা আমি আল্লাহর কিতাবে তিন জায়গায় এরূপ ব্যক্তিকে অভিশপ্ত আখ্যায়িত হতে দেখেছি।” (আবু দাউদ, তিরমিযী)
হযরত আবু হুরাইরা (রা) একবার এক বৈঠকে রাসূল (সা) এর হাদীস বর্ণনা করার সময় বললেন: কোন রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়তা ছিন্নকারীর সাথে একত্রে বসতে আমি বিরক্ত বোধ করি, যতক্ষণ সে উঠে না যায়।" এ কথা শুনে বৈঠকের শেষ প্রান্ত থেকে এক যুবক উঠে গেল। সে তার ফুফুর কাছে গেল। এই ফুফুর সাথে সে বহু বছর যাবত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। পরে আবার সম্পর্ক বহাল করে। তার ফুফু জিজ্ঞাসা করলো : তুমি কেন এসেছ? সে বললো : আমি রাসূল (সা) এর সহচর আবু হুরাইরার কাছে বসেছিলাম। তিনি বললেন : রক্ত সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে বসতে আমি বিরক্ত বোধ করি, যতক্ষণ না সে উঠে যায়।" তার ফুফু বললো : ওহে ভাতিজা, তুমি আবু হুরাইরার কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞাসা কর যে, এর কারণ কি? সে আবু হুরাইরার কাছে ফিরে গিয়ে তার ফুফুর বক্তব্য তাকে জানালো এবং জিজ্ঞাসা করলো আপনার কাছে কোন আত্মীয়তা ছিন্নকারী বসতে পারেনা কেন? হযরত আবু হুরাইরা বললেন : "আমি রাসূলকে (সা) বলতে শুনেছি যে, কোন দলের ভেতর রক্ত সম্পর্ক ছিন্নকারী কোন ব্যক্তি থাকলে তাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়না।" (তারগীর ও তারহীব)
কথিত আছে যে, একবার এক ধনাঢ্য ব্যক্তি হজ্জ করতে গিয়েছিল। মক্কায় পৌছে সে নিজের এক হাজার দীনার খুবই সৎ ও আমানতদার বলে পরিচিত এক ব্যক্তির কাছে গচ্ছিত রাখলো। পরে আরাফাত থেকে ফিরে এসে দেখলো লোকটি মারা গেছে। সে মৃত ব্যক্তির পরিবারের কাছে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো যে, তারা ঐ এক হাজার দীনার সম্পর্কে কিছুই জানেনা। অতঃপর সে মক্কার বিশিষ্ট আলেমগণের কাছে গিয়ে পরামর্শ চাইল। তাঁরা তাকে বললেন যে, তুমি রাত দুপুরের সময় যমযম কুপের নিকট গিয়ে তাঁর নাম ধরে ডাক দিও। সে যদি জান্নাতবাসী হয়ে থাকে, তাহলে সে তোমার প্রথম ডাকেই সাড়া দেবে এবং তোমার টাকার কথা জানাবে। লোকটি রাত দুপুরে যমযম কুয়ার কাছে গিয়ে অনেক ডাকাডাকি করলো। কিন্তু কোন সাড়া পেলনা। অবশেষে উক্ত আলেমগণের নিকট ফিরে গেল। তাঁরা বললেন : আমাদের আশংকা, তোমার বন্ধু হয়তো জাহান্নামবাসী হয়েছে। তুমি ইয়ামানে যাও। সেখানে বারহুত নামে একটি কুয়া আছে। জনশ্রুতি আছে যে, ঐ কুয়াটা জাহান্নামের সাথে সংযুক্ত এবং ওতে পাপী লোকদের আত্মা অবস্থান করে। তুমি গভীর রাতে ওখানে গিয়ে তার নাম ধরে ডাক দিও। সে জাহান্নামী হয়ে থাকলে তোমার ডাকে সাড়া দেবে।
অতঃপর লোকটি ইয়ামানের উল্লেখিত কুয়াটির কাছে গেল এবং মৃত ব্যক্তির নাম ধরে ডাকলো। মৃত ব্যক্তি তৎক্ষণাত সাড়া দিল। সে জিজ্ঞাসা করলো : আমার এক হাজার দীনার কোথায় রেখেছ? সে বললো : ওটা আমার বাড়ীর অমুক স্থানে মাটিতে পোতা আছে। আমার ছেলে বিশ্বস্ত নয় বলে তার কাছে রাখিনি। তুমি আমার রাড়ীতে গিয়ে মাটি খুড়ে তোমার দীনারগুলো নিয়ে নাও।” সে বললো : আমরা তো তোমাকে সৎলোক মনে করতাম। কিন্তু তোমার এখানে আসার কারণ কি? সে বললো: আমার এক দরিদ্র বোন ছিল। তার কোন খোঁজখবর নিতামনা। তাই আল্লাহ আমাকে এহ শাস্তি দিয়েছেন।
দ্রষ্টব্যঃ এই কাহিনীর বিশদ বিবরণ হুবহু গ্রহণযোগ্য কিনা সে ব্যাপারে দ্বিমতের অবকাশ রয়েছে এবং ইমাম ইবনে কাইয়েম স্বীয় গ্রন্থ "আর-রূহ"তে যমযম কূপে মুমিনদের আত্মা এবং বারহুত বা যাবিয়ার কূপে পাপীদের আত্মা থাকার বিষয়টি কুরআন ও হাদীসের পরিপন্থী বিধায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। (গ্রন্থকারের টীকা) কিন্তু "রক্ত সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবেনা" এহ মর্মে রাসূল (সা) এর যে বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে, তার দ্বারা এ কাহিনীর মূল শিক্ষাটি সমর্থিত। - অনুবাদক

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 ব্যভিচার করা

📄 ব্যভিচার করা


অবস্থা ও পাত্রভেদে ব্যভিচারের গুরুত্বের তারতম্য আছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়োনা। ওটা একটা অশ্লীল কাজ এবং খারাপ পন্থা।" (বনী ইসরাইল) "আর যারা আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহের ইবাদাত করেনা, আল্লাহর নিষিদ্ধকৃত প্রাণী সংগত কারণ ছাড়া হত্যা করেনা এবং ব্যভিচার করেনা (তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা।) আর যে ব্যক্তি এসব কাজ করবে, সে শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে সে অপমানিত অবস্থায় চিরস্থায়ী হবে। কেবল তওবাকারী ব্যতীত।" (সূরা আল ফুরকান) "ব্যভিচারী पुरुष ও ব্যভিচারিনী নারী - উভয়কে একশো ঘা করে বেত মার। আল্লাহর বিধান কার্যকর করতে গিয়ে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে। যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।" (সূরা আন নূর)
আলেমগণ বলেছেন: এ হচ্ছে অবিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিনীর ইহকালীন শাস্তি। তবে তারা যদি বিবাহিত হয়ে থাকে অথবা জীবনে একবার হলেও বিবাহিত হয়েছিল এমন হয়ে থাকে, তাহলে তাদেরকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করতে হবে। এটা হাদীস থেকে প্রমাণিত। এই মৃত্যুদন্ডেও যদি তাদের পাপের পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত না হয় এবং তারা উভয়ে বিনা তওবায় মারা যায় তাহলে তাদেরকে দোজখে আগুনে পোড়ানো লৌহদন্ড দিয়ে শাস্তি দেয়া হবে।
আল্লাহর কিতাব যবুর শরীফে লিখিত ছিল: "ব্যভিচারীদেরকে নগ্ন করে দোজখে ঝুলানো হবে এবং লোহার ছড়ি বা লাঠি দিয়ে তাদের জননেন্দ্রিয়ে পেটানো হবে।
পিটুনি খেয়ে তারা যখন চিৎকার করবে, তখন দোজখের ফেরেশতারা বলবে: দুনিয়াতে যখন তোমরা আনন্দ ফুর্তি করতে, হাসতে এবং আল্লাহর কথা ধ্যান করতে না এবং তাঁকে লজ্জা পেতেনা, তখন এই চিৎকার কোথায় ছিল?
সহীহ আল-বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ীতে হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: "কোন ব্যভিচারী ব্যভিচারের সময়ে মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করেনা। কোন চোর চুরির সময়ে মুমিন অবস্থায় চুরি করেনা, কোন মদখোর মদ খাওয়ার সময় মুমিন অবস্থায় মদ পান করেনা, কোন লুণ্ঠনকারী লুণ্ঠন করার সময় মুমিন অবস্থায় লুণ্ঠন করেনা।" আবু দাউদ, তিরমিযী ও বায়হাকীর বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: কোন বান্দা যখন ব্যভিচার করে, তখন তার ভেতর থেকে ঈমান বেরিয়ে যায়, অতঃপর তা তার মাথার ওপর মেঘের মত ভাসতে থাকে। অতঃপর সে যখন তওবা করে তখন ঈমান পুনরায় তার কাছে ফিরে আসে।"
হযরত আবু হুরাইরা বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি ব্যভিচার করে বা মদ খায়, আল্লাহ তার কাছ থেকে ঈমান ঠিক সেইভাবে কেড়ে নেন, যেভাবে কোন মানুষ তার মাথার ওপর দিয়ে জামা খুলে ফেলে। মুসলিম ও নাসায়ীর অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন: কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্রও করবেন না এবং তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নির্ধারিত থাকবে। তারা হলো: ব্যভিচারী বৃদ্ধ, মিথ্যাবাদী শাসক এবং অহংকারী দরিদ্র।"
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেন: আমি বলেছিলাম: হে রাসূল! আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ কী? তিনি বললেন: আল্লাহর সমকক্ষ কাউকে মনে করা, অথচ তিনি প্রত্যেক প্রাণীর স্রষ্টা। আমি বললাম: এটা নিশ্চয়ই ভীষণ গুনাহ। এরপর কী? তিনি বললেন: তোমার সন্তান তোমার সাথে আহার করবে- এই আশংকায় তাকে হত্যা করা। আমি বললাম: এরপর কোন্টি? তিনি বললেন: তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে তোমার ব্যভিচার করা। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
এখানে লক্ষণীয় যে, প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করাকে কিভাবে আল্লাহর সাথে শরীক করা ও নিষিদ্ধ প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার সাথে একত্রে স্থান দেয়া হয়েছে।
রাসূলের (সা) স্বপ্নের বিবরণ সম্বলিত যে হাদীসটি হযরত সামুরা বিন জুনদুব (রা) থেকে সহীহ আল-বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে তাতে রাসূল (সা) বলেন। “জিবরীল ও মীকাইল (আ) আমার কাছে এল এবং আমি তাদের সাথে রওনা হলাম। যেতে যেতে আমরা বড় একটা চুল্লীর কাছে এসে পৌঁছলাম। সেই চুল্লীর উপরিভাগ সংকীর্ণ ও নিম্নভাগ প্রশস্ত। ভেতরে বিরাট চিৎকার ও হৈ চৈ শোনা যাচ্ছিল। আমরা চুল্লীটার ভেতরে উলংগ নারী ও পুরুষদেরকে দেখতে পেলাম। তাদের নিচ থেকে কিছুক্ষণ পর পর আগুনের এক একটা হলকা আসছিল আর তার সাথে সাথে আগুনের তীব্র দহনে তারা জোরে জোরে চিৎকার করছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম: ওহে জিবরীল, এরা কারা? তিনি বললেন: এরা ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ।” (সুহীহ আল বুখারী)
“দোজখের সাতটি দরজা থাকবে”- পবিত্র কুরআনের সূরা হিজরের এই আয়াতের তাফসীর প্রসংগে আতা (রহ) বলেন: “উক্ত সাতটি দরজার মধ্যে সবচেয়ে বেশী উত্তাপময়, সবচেয়ে বেশী দুঃখ বিষাদে পরিপূর্ণ ও সবচেয়ে দুর্গন্ধময় দরজা হবে যারা জেনেশুনে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাদের দরজা।”
মাকহুল দামাস্কী বলেন: দোজখবাসীদের নাকে একটা উৎকট দুর্গন্ধ ভেসে আসবে। তারা বলবে, এমন সাংঘাতিক দুর্গন্ধ আমরা ইতিপূর্বে আর কখনো পাইনি। তখন তাদেরকে বলা হবে যে, ব্যভিচারীদের জননেন্দ্রিয় থেকে এ দুর্গন্ধ আসছে। তাফসীরের বিশিষ্ট ইমাম ইবনে যায়েদ বলেন: ব্যভিচারীদের জননেন্দ্রিয়ের দুর্গন্ধ দোজখবাসীর জন্য বাড়তি কষ্ট বয়ে আনবে। আল্লাহ হযরত মূসাকে (আ) সর্বপ্রথম যে দশটি আয়াত দিয়েছিলেন তার একটি ছিল এরূপ: “তুমি চুরি করোনা এবং ব্যভিচার করোনা। যদি কর তবে তোমার কাছ থেকে আমার চেহারা ঢেকে ফেলবো। আল্লাহর নবী মূসাকে (আ) যদি এরূপ কথা বলা হয়, তাহলে অন্যদের কী বলা হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
রাসূল (সা) বলেছেন: ইবলীস তার বাহিনীকে পৃথিবীময় ছড়িয়ে দেয়ার সময় বলে যে, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে সবচেয়ে বেশী গোমরাহ করতে পারবে, তার মাথায় আমি মুকুট পরাবো এবং তাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেব। দিন শেষে এক একজন করে এসে ইবলীসের কাছে নিজের কৃতিত্বের বর্ণনা দিতে থাকে। কেউ বলে: আমি অমুককে কুপ্ররোচনা দিয়ে দিয়ে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে উদ্বুদ্ধ করেছি এবং সে তালাক দিয়েছে। ইবলীস বলেঃ “তুমি তেমন কিছু করনি। সে আর এক মহিলাকে বিয়ে করবে।” অতঃপর অপরজন এসে বলেঃ আমি অমুককে ক্রমাগত কুপ্ররোচনা দিয়ে দিয়ে তার সাথে তার ভাই-এর শত্রুতা বাধিয়ে দিয়েছি। ইবলীস বলেঃ “তুমি তেমন কিছু করনি। ওদের ভেতরে অচিরেই আপোষ হয়ে যাবে।” অতঃপর আর একজন এসে বলে: আমি অমুককে এক নাগাড়ে প্ররোচনা দিতে দিতে ব্যভিচার করিয়ে ছেড়েছি। এ কথা শুনে ইবলীস তাকে অভিনন্দন জানায় এবং বলে: তুমি একটা কাজের মত কাজ করেছ বটে। অতঃপর তাকে কাছে ডেকে নিয়ে তার মাথায় মুকুট পরিয়ে দেয়। আল্লাহ আমাদেরকে শয়তান ও তার চেলা চামুন্ডার কবল থেকে রক্ষা করুন!
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত: রাসূল (সা) বলেন: ঈমান একটি উত্তম পোশাক, যা আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা করেন পরিধান করান। কিন্তু কোন বান্দা ব্যভিচার করলে তার কাছ থেকে তিনি ঈমানের পোশাক কেড়ে নেন। অতঃপর তওবা করলে তাকে ঐ পোশাক ফিরিয়ে দেন। (বায়হাকী, তিরমিযী, আবু দাউদ ও হাকেম)
অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার বর্জন কর। কেননা এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। তন্মধ্যে তিনটি ইহকালে ও তিনটি পরকালে প্রকাশ পায়। যে তিনটি শাস্তি ইহকালে হয় তা হলো, তার চেহারার উজ্জ্বল্য নষ্ট হয়ে যায়, তার আয়ুষ্কাল সংকীর্ণ হয়ে যায় এবং তার দারিদ্র চিরস্থায়ী হয়। আর যে তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পায় তা হলো, সে আল্লাহর অসন্তোষ, কঠিন হিসাব ও দোজখের আযাব ভোগ করবে। (বায়হাকী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: যে ব্যক্তি মদ খাওয়া অব্যাহত রাখতে রাখতে মারা যায় আল্লাহ তাকে গাওতা নামক ঝর্ণার পানি পান করাবেন। গাওতা হচ্ছে ব্যভিচারনী নারীদের যোনিদেশ থেকে নির্গত পুঁজ ও দূষিত তরল পদার্থের ঝর্ণা যা দোজখে প্রবাহিত থাকবে। (আহমদ)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার পর নিষিদ্ধ নারীর সাথে সহবাস করার মত বড় গুনাহ আর নাই। (আহমদ, তাবারানী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: দোজখে একটা হ্রদ রয়েছে। তাতে বহু সংখ্যক সাপ বাস করে। প্রতিটি সাপ উটের ঘাড়ের সমান মোটা। সেই সাপগুলো নামায তরককারীকে দংশন করবে। একবার দংশনেই তার দেহে সত্তর বছর পর্যন্ত বিষক্রিয়া থাকবে। অতঃপর তার গোশত ঝরে পড়বে। এ ছাড়া দোজখে আরো একটা হ্রদ আছে, যাকে 'দুঃখের হ্রদ' বলা হয়। তাতে বহু সাপ ও বিচ্ছু বাস করে। প্রতিটি বিচ্ছু এক একটা খচ্চরের সমান। তার সত্তরটা হুল রয়েছে। প্রত্যেক হুল বিষে পরিপূর্ণ। সেই বিচ্ছু ব্যভিচারীকে দংশন করবে এবং তার সমস্ত বিষ তার দেহে ঢেলে দেবে। ফলে সে এক হাজার বছর পর্যন্ত বিষের যন্ত্রণা ভোগ করবে। অতঃপর তার গোশত খসে পড়বে এবং তার জননেন্দ্রিয় থেকে পুঁজ নোংরা তরল পদার্থ নির্গত হবে।
অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি কোন বিবাহিতা নারীর সাথে ব্যভিচার করবে সে ও উক্ত নারী কবরে সমগ্র মুসলিম উম্মাতের অর্ধেক আযাব ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার স্বামীকে তার সৎ কর্মের বিচারের দায়িত্ব অর্পণ করবেন এবং জিজ্ঞাসা করবেন যে, তার স্ত্রী যে কুকর্ম করেছে, সেটা সে জানতো কিনা। যদি জেনে থাকে এবং ঐ কুকর্ম ঠেকাতে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেবেন। কেননা আল্লাহ তায়ালা জান্নাতের দরজার ওপর এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে রেখেছেন যে, দায়ূসের জন্য জান্নাত হারাম। দায়ূস হলো সেই ব্যক্তি, যার পরিবারে অশ্লীল কার্যকলাপ চলতে থাকে, অথচ সে তা জেনেও চুপ থাকে এবং বন্ধ করার কোন পদক্ষেপ নেয় না।
হাদীসে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন নিষিদ্ধ নারীকে খারাপ ইচ্ছা নিয়ে স্পর্শ করবে, কিয়ামাতের দিন সে এমনভাবে আসবে যে তার হাত তার ঘাড়ের সাথে যুক্ত থাকবে। সে যদি উক্ত নারীকে চুমু দিয়ে থাকে, তবে তার ঠোঁট দুটিকে আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হবে। আর যদি তার সাথে ব্যভিচার করে থাকে তবে তার দুই উরু সাক্ষ্য দেবে যে, আমি অবৈধ কাজের জন্য আরোহণ করেছিলাম। আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাবেন। এতে সে অপমান বোধ করবে এবং গোয়ার্তুমি করে বলবে: আমি করিনি। তখন তার জিহবা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। জিহবা বলবে! "আমি অবৈধ বিষয়ে কথা বলেছিলাম।" তার হাত সাক্ষ্য দেবে যে, "আমি অবৈধ জিনিস ধরেছিলাম।" অতঃপর চক্ষু বলবে: "আমি অবৈধ জিনিসের দিকে তাকাতাম।" তার পা দুখানা বলবেঃ "আমি অবৈধ জিনিসের দিকে গমন করতাম।" তার লজ্জাস্থান বলবে: "আমি ব্যভিচার করেছি।" প্রহরী ফেরেশতা বলবেঃ "আমি শুনেছি।” অপর ফেরেশতা বলবে: "আর আমি লিখেছি।" আর আল্লাহ তায়ালা বলবেন "আমি জেনেছি এবং লুকিয়ে রেখেছি।" অতঃপর আল্লাহ তায়ালা বলবেন: "হে ফেরেশতাগণ! ওকে পাকড়াও কর এবং আমার আযাব ভোগ করাও। কেননা যে ব্যক্তির লজ্জা কমে যায় তার ওপর আমার ক্রোধ বেড়ে যায়।"
উল্লেখিত হাদীসের সত্যতা নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়ঃ "যেদিন তাদের বিরুদ্ধে তাদের জিহবা, হাত ও পা সাক্ষ্য দেবে: যে তারা দুনিয়ার জীবনে কী করতো।" (সূরা আন্ নূর)
সবচেয়ে জঘন্য ধরনের ব্যভিচার হলো মুহাররম অর্থাৎ চিরনিষিদ্ধ নারীদের সাথে সংগম করা। এদের মধ্যে রয়েছে মা, খালা, বোন, মেয়ে ইত্যাদি। রাসূল (সা) বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোন মুহাররম নারীর সাথে ব্যভিচার করবে, তাকে তোমরা হত্যা কর।"
হযরত বারা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সা) হযরত বারার মামাকে এই নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন যে, অমুক ব্যক্তিকে হত্যা করে তার সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে এস। কেননা সে নিজের সৎ মাকে বিয়ে করেছিল।" (হাকেম)
মহান আল্লাহ আমাদেরকে এই ঘৃণ্য মহাপাপ থেকে রক্ষা করুন। আর যারা এই পাপে লিপ্ত, তাদেরকে তওবা করার তওফীক দিন ও তাদেরকে ক্ষমা করুন।
ব্যভিচার প্রতিরোধে শরীয়তের ব্যবস্থা মানব সমাজকে মিশ্র প্রজাতি থেকে মুক্ত রেখে সুস্থ ও নির্ভেজাল বংশীয় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য আল্লাহ ব্যভিচারকে হারাম করেছেন। আর এই ব্যভিচার প্রতিরোধে ইসলামী শরীয়ত পর্দা নামক এক বিস্তারিত বিধান দিয়েছে। এই বিধান অনুসারে নারীদেরকে সৌন্দর্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে অনাবৃতভাবে ঘরের বাইরে বিচরণ, পুরুষদের সাথে বেপর্দাভাবে একত্রে শিক্ষা গ্রহণ ও কাজ করা, স্বামী স্ত্রী ব্যতীত অন্য যে কোন দুজন বয়স্ক নারী ও পুরুষের একত্রে নির্জনে অবস্থান করা, নারীদের গলার আওয়াজ বিনা-প্রয়োজনে ভিন্ন পুরুষকে শুনতে দেয়া, অশ্লীল গান, বাজনা ও অশ্লীল সাহিত্য, নাটক ও সিনেমা ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষতঃ পুরুষ ও নারী উভয়কে পরস্পরের প্রতি দৃষ্টি সংবরণ করতে আদেশ দেয়া হয়েছে। সূরা আন নূরে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, "মুমিন পুরুষদেরকে বলে দাও, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে।... মুমিন নারীদেরকে বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে।"
এক হাদীসে আছে: "কোন বেগানা স্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি দিলে কেয়ামতের দিন তার চোখে গলিত শীসা ঢালা হবে।" অপর হাদীসে আছে: "দৃষ্টি দেয়া চোখের যিনা, অশ্লীল কথাবার্তা বলা জিহবার যিনা, অবৈধভাবে কাউকে স্পর্শ করা হাতের যিনা, ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে হেঁটে যাওয়া পায়ের যিনা, খারাপ কথা শোনা কানের যিনা এবং যিনার কল্পনা ও আকাংখা করা মনের যিনা। অতঃপর লজ্জাস্থান একে পূর্ণতা দেয়া অথবা অসম্পূর্ণ রেখে দেয়।" (সহীহ আল বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী)
হাদীসে আরো আছে: দৃষ্টি হচ্ছে ইবলীসের একটি বিষাক্ত তীর। যে ব্যক্তি একে সংযত রাখবে, আল্লাহ তার মনকে ইবাদাতের প্রকৃত স্বাদ দান করবেন, যা সে কিয়ামত পর্যন্ত ভোগ করতে থাকবে।
মোদ্দাকথা, যে সব জিনিস ব্যভিচারে উদ্বুদ্ধ করে, সেগুলিও ব্যভিচারের ন্যায় কবীরা গুনাহ। - অনুবাদক

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 সমকাম ও যৌনাধিকার

📄 সমকাম ও যৌনাধিকার


আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের একাধিক জায়গায় হযরত লুত (আ) এর জাতির ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যেমন সূরা হুদে বলেন: "অতঃপর যখন আমার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলো তখন আমি তাদের দেশটির উপরিভাগ নিচে এবং নিম্নভাগ ওপরে ওঠালাম এবং তার ওপর পাকা পাথর (যা আগুনে পুড়ে ইটের মত হয়ে গেলো) অবিরাম ধারায় নিক্ষেপ করলাম। পাথরগুলি ছিল সুচিহ্নিত। (অর্থাৎ তাতে এমন আলামত ছিল যে, দেখলেই চেনা যেত যে, তা পৃথিবীর পাথর নয়।) ওগুলো তোমার প্রভুর কাছেই ছিল। (অর্থাৎ তাঁর সেই কোষাগারে ছিল, যার কোন কিছুই আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ব্যবহৃত হয়না।) বস্তুতঃ এই শাস্তি অত্যাচারীদের কাছ থেকে দূরে নয়। (অর্থাৎ এই উম্মাতের লোকেরাও যদি অনুরূপ ঘৃণ্য কাজ করে তাহলে তাদের যে শোচনীয় পরিণতি হয়েছিল তা এদেরও হবে।) ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: তোমাদের ওপর যে জিনিসটির সবচেয়ে বেশী আশংকা করি, তা হচ্ছে দূত এর জাতির জঘন্য কাজ। অতঃপর তিনি এই কাজে লিপ্তদেরকে তিনবার নিম্নরূপ অভিশাপ দেন: "দূতের জাতির কাজ যে করে তার ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত!" আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে মাযাহ বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ "যাদেরকে তোমরা দূতের জাতির কাজে লিপ্ত পাও, তাদের দু'জনকেই হত্যা কর।" হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন: এলাকার সবচেয়ে উঁচু বাড়ীর ছাদের ওপর থেকে তাদেরকে ফেলে দিতে হবে এবং ফেলে দেয়ার সংগে সংগে তাদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে হবে, যেমন হযরত লূতের জাতির ওপর নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
মুসলমানদের মধ্যে এই ব্যাপারে ইজমা অর্থাৎ সর্বম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, সমকাম একটা হারাম কাজ ও কবীরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন: "পৃথিবীতে তোমরা কেবল পুরুষদের কাছেই আস এবং তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালক যে জোড়া সৃষ্টি করেছেন তা ত্যাগ কর? আসলে তোমরা সীমা অতিক্রমকারী (অর্থাৎ হালালের সীমা অতিক্রম করে হারামের সীমায় প্রবেশকারী) সূরা আশ শুয়ারা)
আল্লাহ তায়ালা অপর এক আয়াতে স্বীয় নবী হযরত লূত (আ) সম্পর্কে বলেন: “আর আমি তাকে সেই জনপদ থেকে রক্ষা করেছি, যে জনপদ অশ্লীল কার্যকলাপে লিপ্ত ছিল। ঐ জনপদবাসীরা দুরাচারী পাপিষ্ঠ ছিল।” (সূরা আল আম্বিয়া)
তাদের ঐ জনপদের নাম ছিল সদোম। জনপদের অধিবাসীরা যে সব অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকতো, কুরআনে তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তারা পুরুষদের মল দ্বারে সংগম করতো এবং প্রকাশ্য সমাবেশ স্থলে নানা রকম পাপাচারে লিপ্ত হতো।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি নিম্নোক্ত কাজগুলিকে লূত জাতির কাজ বলে আখ্যায়িত করেছেন : মহিলাদের পুরুষদের মত ছোট করে এবং পুরুষদের মহিলাদের মত বড় করে চুল রাখা, জামার বোতাম খুলে রাখা, বন্দুক চালানো, পাথর নিক্ষেপ করা, উড়ন্ত কবুতর নিয়ে খেলা করা, আংগুল মুখে দিয়ে শিষ দেয়া, পায়ের গিরে ফোটানো, টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলানো, পোশাকের নিম্নাংশ ইচ্ছাকৃতভাবে খোলা রাখা, মদ খাওয়া, পুরুষের সাথে পুরুষের এবং নারীর সাথে নারীর সংগম। (উল্লেখ্য যে, হযরত ইবনে আব্বাস এ কাজগুলিকে লূত জাতির কাজ বলে এটাই বুঝিয়েছেন যে, তারাই এগুলির প্রথম উদগাতা। এগুলির মধ্যে বন্দুক চালানো ছাড়া আর সব কয়টি সর্বসম্মতভাবে অবৈধ কিংবা অশালীন কাজ। বন্দুক চালানোর কাজটিও নিয়মিত সরকারী আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিশেষ আত্মরক্ষার প্রয়োজন ব্যতীত অনুমোদনযোগ্য নয়। অনুবাদক)
তাবারানীতে উদ্ধৃত এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন : নারীদের পারস্পরিক সংগম ব্যভিচারের শামিল। তাবারানী ও বাইহাকীতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ চার ব্যক্তি সকাল সন্ধ্যা আল্লাহর গযব ও আক্রোশের আওতায় থাকে : মহিলাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বেশভূষা গ্রহণকারী পুরুষ, পুরুষদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বেশভূষা গ্রহণকারী মহিলা, জীবজন্তুর সাথে সংগমকারী এবং সমকামী। অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, "যখন কোন পুরুষ অপর পুরুষে উপগত হয়, তখন আল্লাহর গযবের ভয়ে আল্লাহর আরশ কাঁপতে থাকে এবং আকাশ পৃথিবীর ওপর ভেংগে পড়ার উপক্রম হয়। ফেরেশতারা আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত হওয়া পর্যন্ত আকাশকে তার প্রান্তসীমায় ধরে রাখে এবং সূরা ইখলাস পড়তে থাকে।"
রাসূল (সা) বলেন : সাত ব্যক্তির ওপর আল্লাহ অভিশাপ বর্ষণ করেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশের আদেশ দেবেন: সমকামীদের, জীবজন্তুর সাথে সংগমকারী, কোন মহিলা ও তার কন্যাকে এক সাথে বিবাহকারী, এবং হস্তমৈথুনকারী। তবে তওবা করলে তারা সবাই ক্ষমা পেতে পারে।"
আরো বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন এক শ্রেণীর লোক এমনভাবে উত্থিত হবে যে, তাদের হাত ব্যভিচারের ফলে অন্তসত্তা থাকবে। দুনিয়ার জীবনে তারা হস্তমৈথুন করতো।” অপর এক হাদীসে আছে যে, দাবা ও পাশা জাতীয় খেলা, কবুতরের লড়াই, কুকুরের লড়াই, মেষ লড়াই, মোরগ লড়াই, পোশাক না নিয়ে গোসল খানায় প্রবেশ, এবং মাপে কম দেয়া-এ সব লূত এর জাতির কাজ। এ সব কাজ যারা করবে, তাদের কঠোর শাস্তি অবধরিত।"
হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত যে, কোন সমকামী বিনা তওবায় মারা গেলে কবরে শুকরের আকৃতি প্রাপ্ত হবে।
তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে আব্বাসে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন পুরুষ বা নারীর মল দ্বারে সংগম করবে, আল্লাহ তায়ালা তার দিকে তাকাবেন না।
কামভাবাপন্ন দৃষ্টিতে কোন স্ত্রীলোকের প্রতি বা কোন সুদর্শন যুবকের প্রতি তাকানোও একইভাবে ব্যভিচারের শামিল। কেননা ইতিপূর্বে এই মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, কু-দৃষ্টি চোখের যিনা। জনৈক আরব কবি বলেছেন: "সকল ঘটনার সূচনা হয় দৃষ্টি থেকেই, যেমন ক্ষুদ্র স্কুলিংগ থেকে বড় বড় অগ্নিকান্ড সংঘটিত হয়ে থাকে।"
বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকরের নির্দেশে হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ জনৈক পেশাদার সমকামীকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আরো বর্ণিত আছে যে, একবার আব্দুল কায়েস গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল রাসূল (সা) এর নিকট এলো। তাদের ভেতরে এক দাড়ি গোঁপহীন কিশোরও ছিল। রাসূল (সা) কিশোরকে নিজের পেছনের দিকে বসালেন এবং বললেন: দৃষ্টির কারণেই হযরত দাউদ (আ) দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন।
একবার হযরত সুফিয়ান সাওরীর নিকট এক কিশোর এলো। তিনি চিৎকার করে বললেন: একে আমার সামনে থেকে সরাও। কারণ আমি স্ত্রীলোকদের সাথে একজন করে শয়তান দেখি, আর কিশোরদের সাথে দেখি দশজনেরও বেশী সংখ্যক শয়তান।
একবার হযরত ঈসা (আ) কোথাও যাওয়ার সময় পথিমধ্যে এক ব্যক্তিকে আগুনে দগ্ধীভূত হতে দেখলেন। তা দেখে তিনি পানি এনে আগুন নেভাতেই আগুন একটি কিশোরে পরিণত হলো। আর লোকটি পরিণত হলো আগুনে।
হযরত ঈসা (আ) দোয়া করলেন : হে আল্লাহ! এদের উভয়কে আসল অবস্থায় ফিরিয়ে নাও আমি তাদেরকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করবো। আল্লাহ তাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করলে দেখা গেল, একজন এক বয়স্ক পুরুষ এবং অপরজন একটি কিশোর। হযরত ঈসা (আ) জিজ্ঞাসা করলেন : তোমাদের কী হয়েছিল? লোকটি বললো : হে রুহুল্লাহ! আমি এই কিশোরের প্রেমে পড়ে তার সাথে কুকর্মে লিপ্ত হয়েছিলাম। পরে আমাদের উভয়ের মৃত্যুর পর আল্লাহ আমাদেরকে এভাবে শাস্তি দিচ্ছেন যে, আমি কিছুক্ষণ আগুন হয়ে ছেলেটাকে পোড়াই। আবার কিছুক্ষণ পর ছেলেটা আগুন হয়ে আমাকে পোড়ায়। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে।" উল্লেখ্য যে, নিজের স্ত্রীর সাথে মল দ্বারে সংগম করা অথবা ঋতুবতী অবস্থায় সংগম করাও হারাম ব্যভিচারের শামিল। কেননা, রাসূল (সা) বলেছেন : "যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর সাথে ঋতুবতী অবস্থায় সংগম করে অথবা পশ্চাদ দ্বারে সংগম করে সে অভিশপ্ত।"
আল্লাহ তায়ালা সকল মুসলমানকে এই মহাপাপ থেকে রক্ষা করুন।

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 সুদের আদান প্রদান

📄 সুদের আদান প্রদান


মহান আল্লাহ বলেন : "হে মুমিনগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়না। আল্লাহকে ভয় কর। আশা করা যায় যে, তোমরা সাফল্য লাভ করবে।” (সূরা আলে ইমরান) আল্লাহ তায়া'লা আরো বলেন : "যারা সুদ খায় তারা কেবল সেই ব্যক্তির মত দাঁড়ায় যাকে শয়তান নিজের স্পর্শ দ্বারা উন্মাদ বানিয়ে দিয়েছে।" (অর্থাৎ তারা কিয়ামতের দিন কবর থেকে উঠবার সময় শয়তানের স্পর্শে উন্মাদ হয়ে যাওয়া মানুষের মত উঠবে।)" এর কারণ এইযে, তারা বলতো : ব্যবসা তো সুদেরই মত। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন, আর সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা)
অর্থাৎ আল্লাহ যে জিনিস হারাম করেছেন তাকে তারা হালাল মনে করে নিয়েছে। অতঃপর কিয়ামতের দিন আল্লাহ যখন মানব জাতিকে পুনরুত্থিত করবেন, তখন সবাই কবর থেকে উঠে দ্রুত বেগে দৌড়াতে থাকবে। কিন্তু সুদখোররা তা পারবেনা। তারা মাতাল ব্যক্তির ন্যায় একবার উঠবে একবার পড়বে। যখনই উঠবে, অমনি পড়ে যাবে। কেননা তারা দুনিয়ায় নিষিদ্ধ সুদ খেয়েছিল। আর সেই হারাম খাদ্যকে আল্লাহ পেটের ভেতর বিপুল পরিমাণে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এভাবে কিয়ামতের দিন তাদেরকে এত ভারী করে দেবেন যে, তারা যখনই উঠতে যাবে পড়ে যাবে। অন্য সবার সাথে তাল মিলিয়ে তারাও দৌড়াতে চাইবে কিন্তু পারবেনা।
ইমাম কাতাদা (রহ) বলেন: সুদখোর কিয়ামতের দিন উন্মাদ অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে। এই উন্মাদ অবস্থা সুদখুরীর আলামত হিসাবে কিয়ামতের মাঠে সকলের কাছে পরিচিত থাকবে।
ইমাম বায়হাকী, ইবনে জারীর ও ইবনে আবী হাতেম হযরত আবু সাঈদ আল খুদরী থেকে বর্ণনা করেন যে রাসূল (সা) বলেছেন: "মিরাজের রাত্রে আমাকে যখন নিয়ে যাওয়া হয়, তখন এমন একদল লোকের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম, যাদের পেট এক একটি ঘরের মত প্রকান্ড। অত বড় পেট নিয়ে তারা ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারেনা। ফলে তারা চলতে গিয়ে নিজেদের পথ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। যে পথ দিয়ে ফেরাউন ও তার দলবলকে সকাল বিকাল দোজখের কাছে নেয়া হয়, ঐ লোকগুলি এক একবার সেই পথের ওপর চলে আসে এবং নির্বোধ ও শ্রবণশক্তিহীন বিপথগামী উটের মত চলতে থাকে। এই বড় ভুড়ি ওয়ালা লোকগুলো যখন টের পায় যে, ফিরআউন ও তার দলবলকে আনা হচ্ছে, তখন তারা উঠি পড়ি করে পালাতে চায়। কিন্তু পেট নিয়ে নড়তে না পারায় তারা রাস্তা ছেড়ে সরে যেতে পারেনা। ফলে ফিরআউন ও তার দলবল এসে তাদের ওপর চড়াও হয় এবং একবার পেছনের দিকে ও আরেকবার সামনের দিকে ঠেলে নিয়ে যায় ও নিয়ে আসে। কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত তারা এভাবে শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। রাসূল (সা) বলেন: আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ওহে জিবরীল, এরা কারা? তিনি বললেন: ওরা সুদখোর, যারা শয়তানের স্পর্শে উন্মাদ হয়ে যাওয়া লোকের মত চলে।"
ইমাম আহমাদ বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: মিরাজের রাত্রে আমি আমার মাথার ওপরে সপ্তম আকাশে প্রচন্ড তর্জন গর্জনের শব্দ শুনতে পেলাম। চোখ মেলে তাকালে দেখলাম, সেখানে কিছু লোক রয়েছে, যাদের ভুড়ি তাদের সামনে বেরিয়ে আছে। ভুড়িগুলো বড় বড় এক একটা ঘরের মত। সেই সব ঘরে হাজার হাজার সাপ ও বিচ্ছু। এ সব পেটের বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? জিবরীল বললেন: ওরা সুদখোর।
হযরত ইবনে আব্বাস থেকে আবু ইয়া'লা ও হাকেম কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: কোন জাতি যখন ব্যভিচার ও সুদে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ধ্বংস করার অনুমতি দেন। আবু দাউদ কর্তৃক বর্ণিত যে, কোন জাতি যখন কৃপণতা করতে থাকে। সুদের ভিত্তিতে কায়কারবার চালাতে থাকে। ষাড়ের দৌড়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত করে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ পরিত্যাগ করে, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর এমন দুর্যোগ নামান যে, তারা দীনের পথে ফিরে না আসা পর্যন্ত তা থেকে আর নিষ্কৃতি পায়না।
ইবনে মাজাহ, বাযায, বায়হাকী ও হাকেম বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ "কোন সমাজে সুদের প্রচলন হলে সেখানে পাগলের সংখ্যা বেড়ে যাবে, ব্যভিচারের প্রচলন হলে মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে এবং মাপে কম দেয়ার প্রথা চালু হলে আল্লাহ তায়ালা সেখানে বৃষ্টি বন্ধ করে দেবেন। এটা অবর্ধারিত।"
সহীহ আল-বুখারীতে এক দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, সুদখোর মৃত্যু পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত রক্তে পরিপূর্ণ লাল নদীতে সাঁতার কেটে আযাব ভোগ করতে থাকবে এবং তাকে পাথর গেলানো হতে থাকবে। ঐ নদী হচ্ছে তার দুনিয়ায় উপার্জিত হারাম সম্পদ যার মধ্যে তাকে হাবুডুবু খেতে বাধ্য করা হবে। আর যে আগুনের পাথর তাকে গেলানো হবে তাহলো তার হারাম খাদ্য খাওয়ার শাস্তি। কিয়ামত পর্যন্ত তাকে এই শাস্তি দেয়া হবে এবং সেই সাথে তার ওপর অভিশাপ বর্ষিত হতে থাকবে। অপর এক বিশুদ্ধ হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: চার ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করতে না দেয়া এবং জান্নাতের নিয়ামত ভোগ করতে না দেয়াকে আল্লাহ তায়ালা নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন। তারা হলোঃ মদখোর, সুদখোর, ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎকারী এবং পিতামাতার প্রতি কর্তব্য পালনে অবহেলাকারী- যতক্ষণ না তারা তাওবাহ করে।"
হাদীসে আরো বর্ণিত আছে যে, একদল ইহুদী যেমন শনিবারে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকা সত্তেও চক্রান্ত করে সমুদ্রের কিনারে বড় বড় গর্ত খুড়ে রাখতো, শনিবারে সেই গর্তে মাছ পড়ে থাকতো এবং রবিবারে তারা তা ধরে আনতো এবং এই চক্রান্তের শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ যেমন তাদেরকে বাঁদর ও শুকর বানিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি সোজা পথে সুদ খেতে না পেরে যারা নানা রকমের ছলছুতো ও ধোকার মাধ্যমে সুদ খায়, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে কিয়ামতের দিন বাঁদর ও শুকর বানিয়ে ওঠাবেন। কেননা তাদের কোন ফন্দিফিকির ও ধোকাবাজী আল্লাহ তায়ালার কাছে গোপন থাকবেনা। বিশিষ্ট তারেয়ী আইয়ূব সাখতিয়ানী বলেছেন: একটি শিশুকে যেমন ধোকা দেয়া হয়, সুদখোররা তেমনি আল্লাহ তায়ালাকে ধোকা দিতে চায়। তা না করে তারা যদি সোজা পথে সুদ খেত, তাহলে হয়তো তাদের আযাব কিছু হালকা হতো।
তাবরানী, ইবনে মাজাহ ও বায়হাকীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: সুদের ৭০টি গুনাহ। তন্মধ্যে সর্বনিম্ন গুনাহটি হলো আপন মাকে বিয়ে করার গুনাহর সমান। আর সবচেয়ে জঘন্য সুদ হলো, সুদের পাওনা আদায় করতে গিয়ে কোন মুসলমানের সম্ভ্রম নষ্ট করা বা তার সম্পত্তি জবর দখল করা।
বায়হাকী বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: কোন সুদখোর যদি এক দিরহাম পরিমাণও সুদ আদায় করে তবে তার গুনাহ ৩৬ বার ব্যভিচার করার সমান।
ইবনে মাজাহ ও বায়হাকী বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: সুদের ৭০টি গুনাহ। তন্মধ্যে সর্বনিম্ন গুনাহ হচ্ছে আপন মায়ের সাথে ব্যভিচার করার সমান। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (সা) ৭টি গুনাহকে "সর্বনাশা গুনাহ" নামে আখ্যায়িত করেছেন ও তা থেকে আত্মরক্ষা করতে বলেছেন। এই সাতটির মধ্যে সুদ খাওয়া অন্যতম।
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: আল্লাহ তায়ালা সুদখোর, সুদ দাতা, সুদের সাক্ষী, সুদের লেখক-সকলের ওপরই অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। (সহীহ মুসলিম ও সুনানুত্ তিরমিযী)
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেন: কোন ব্যক্তির কাছে যদি তোমার কোন ঋণ প্রাপ্য থেকে থাকে এবং সে যদি কোন উপহার পাঠায় তবে তা গ্রহণ করোনা। কেননা সেটা সুদ। হযরত হাসান বসরী বলেন: তোমার কাছে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে যদি তুমি কিছু খাও তবে তা সুদ।
রাসূল (সা) বলেছেন: যে ঋণ থেকে কোন লাভ পাওয়া যায় তা সুদ। সুনানু আবু দাউদে বর্ণিত যে রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি কারো জন্য সুপারিশ করলো, অতঃপর ঐ ব্যক্তি তাকে কোন উপহার পাঠালো এবং সুপারিশকারী তা গ্রহণ করলো, সে একটি গুরুতর ধরনের সুদের কারবার করলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00