📄 যাকাত না দেয়া
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "যারা আল্লাহর দেয়া সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করে, তাদের এই কাজকে তাদের জন্য কল্যাণজনক মনে করনা। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যে সম্পদ নিয়ে তারা কার্পণ্য করতো তা কিয়ামাতের দিন তাদের গলায় ঝুলানো হবে।” (আল-ইমরান)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: "সেই মুশরিকদের জন্য ধ্বংস যারা যাকাত দেয়না।" এখানে আল্লাহ তাদেরকে মুশরিক নামে আখ্যায়িত করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ "যারা সোনা রূপাকে গোলাজাত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করেনা, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিয়ে দাও। যেদিন এই সোনারূপা দোজখের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে অতঃপর তা দিয়ে তাদের কপালে, পিঠে ও পার্শে সেক দেয়া হবে আর বলা হবে, এই হলো তোমরা যা নিজেদের জন্য গোলাজাত করে রাখতে সেই সম্পদ। অতএব তোমরা তোমাদের গোলাজাত করা সম্পদের মজা ভোগ কর।" (আত্ তাওবাহ)
সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি পর্যাপ্ত সোনা রূপার মালিক, অথচ তা থেকে শরিয়ত সম্মত প্রাপ্য দেয়না তাকে কিয়ামাতের দিন আগুনে উত্তপ্ত লোহার পাত দিয়ে কপালে, পিঠে ও দুই পার্শে ছাপ দেয়া হবে। যখনই ঐ স্থানগুলো ঠান্ডা হবে, অমনি পুনরায় ছাপ দেয়া হবে। এভাবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান দীর্ঘ এক এক দিন পর্যন্ত তার দহনক্রিয়া চলবে। বিচার অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এভাবে ছাপ দেয়া চলতে থাকবে। তারপর সে বেহেস্ত অথবা দোজখে যাবে। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করেন, "হে রাসূল! উট, গরু, ছাগল, প্রভৃতির যাকাত না দিলেও কি এরূপ আযাব হবে?" রাসূল (সা) জবাব দিলেন: “হাঁ।"
হযরত আবু হুরাইরাহ থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: সর্ব প্রথম যে তিন ব্যক্তি দোজখে প্রবেশ করবে, তারা হচ্ছে: গায়ের জোরে ক্ষমতা দখলকারী (অর্থাৎ স্বৈরাচারী) শাসক, যাকাত দেয়না এমন ধনী ব্যক্তি এবং অহংকারী দরিদ্র। (সহীহ ইবনে খুযাইমা ও সহীহ ইবনে হাব্বান)
হযরত ইবেন আব্বাস (রা) বলেন: যার হজ্জ করার মত সম্পদ আছে কিন্তু হজ্জ করলোনা কিংবা যাকাত দেয়ার মত সম্পদ আছে কিন্তু যাকাত দিলনা, সে মৃত্যুর সময় আরো একটু দীর্ঘ আয়ু পেলে আল্লাহর হক দিতে পারতো বলে আফসোস করবে। এ সময় জনৈক শ্রোতা বললোঃ হে ইবনে আব্বাস! আল্লাহকে ভয় করুন। মৃত্যুর সময় এরূপ আফসোস তো কেবল কাফিররা করবে। হযরত ইবনে আব্বাস বললেন: আমি যা বলেছি তার প্রমাণ হিসাবে আমি এক্ষুনি তোমাকে আল কুরআনের আয়াত পড়ে শোনাচ্ছি। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা আমার দেয়া সম্পদ থেকে সৎপথে ব্যয় কর মৃত্যু ঘনিয়ে আসার আগে, যখন তোমাদের মরনোম্মুখ ব্যক্তি বলবে, হে আমার প্রভু! আমার মৃত্যু যদি সামান্য একটু বিলম্বিত করতেন, তাহলে আমি 'সদকা দিতাম'। এবং 'সৎ কর্মশীল হতাম।' (আল-মুনাফিকুন) এখানে 'সদকা দিতাম' অর্থ হজ্জ করতাম। এরপর হযরত ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করা হয়: যাকাত কখন ফরয হয়? তিনি বললেন: যখন দুইশো দিরহাম পরিমাণ সম্পদ জমা হয়। (আনুমানিক দশ হাজার টাকার সমপরিমাণ) অতঃপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলোঃ হজ্জ কিসে ফরয হয়? তিনি জবাব দিলেন: পাথেয় ও পরিবহন খরচ সংগৃহীত হলে।
ব্যবহারের জন্য বানানো বৈধ গহনা পত্রে যাকাত দিতে হয়না। তবে সঞ্চয়ের জন্য বা ভাড়া দেয়ার জন্য বানানো গহনার যাকাত দিতে হবে। বাণিজ্যিক পণ্যদ্রব্যের জন্য যাকাত দিতে হবে।
রাসূল (সা) বলেছেন: যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন কিন্তু সে তার যাকাত দিলনা, কিয়ামতের দিন তার সম্পদ একটি বিষধর সাপে পরিণত হয়ে গলা পেঁচিয়ে থাকবে এবং তার দুই চোয়ালে কামড়িয়ে ধরে বলবে "আমি তোর সম্পদ, আমি তোর পুঁজি।" অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াত তিলাওয়াত করলেন: "আল্লাহর দেয়া সম্পদ নিয়ে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন ঐ কৃপণতাকে নিজেদের জন্য কল্যাণকর মনে না করে। ওটা বরঞ্চ তাদের জন্য অকল্যাণকর। যে সম্পদকে কেন্দ্র করে তারা কৃপণতা করতো, তা কিয়ামতের দিন তাদের গলায় পেঁচিয়ে থাকবে।" (সহীহ আল-বুখারী)
তাবারানীতে বর্ণিত হাদীসে আছে: "কিয়ামতের দিন সোনা রূপাকে আগুনে পুড়িয়ে তাদের কপালে, পিঠে ও পার্শে সেঁক দেয়া হবে" -আল কুরআনের এই উক্তির ব্যাখ্যা প্রসংগে হযরত ইবনে মাসউদ বলেন যে, তার দিনার ও দিরহামগুলো পুড়িয়ে একটার ওপর অপরটি সেঁক দেয়া হবেনা, বরং মানুষটির দেহের চামড়া এত সম্প্রসারিত করা হবে, যাতে প্রত্যেকটি দিনার ও দিরহামকে (অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট যুগের প্রচলিত মুদ্রা) পুড়িয়ে আলাদা আলাদাভাবে সেঁক দেয়া সম্ভব হয়।
প্রশ্ন হতে পারে যে, সেঁক দেয়ার জন্য পিঠ, কপাল ও পার্শ্বদেশকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে কেন? এর জবাব এই যে কৃপণ বিত্তশালীরা দরিদ্র ব্যক্তিকে দেখলে বিরক্তির সাথে কপাল কুঁচকে ফেলে ও মুখ কালো করে। অতঃপর পার্শ-দেশ ঘুরিয়ে দেহ বাঁকা করে দাঁড়ায়। তারপর দরিদ্র লোকটি কোন কিছু চাইতে কাছে এলে তার দিকে পিঠ ফিরিয়ে দিয়ে স্থান ত্যাগ করে। তাই এই অংগগুলোতে সেঁক দিয়ে কাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে শাস্তি দেয়া হবে।
তাবারানীতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (রা) বলেন: পাঁচটি পাপের পাঁচটি শাস্তি। সাহাবীগণ বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন্ পাঁচটি অপরাধের কোন্ পাঁচটি শাস্তি? রাসূল (সা) বললেন: যখনই কোন জাতি অংগীকার ভংগ করবে, আল্লাহ তাদের শত্রুকে তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবেন। যখনই কোন জাতি আল্লাহর নাযিল করা বিধান ছাড়া অন্য কিছু অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করবে, আল্লাহ তাদের ভেতরে দারিদ্রকে সর্বব্যাপী করে দেবেন। যখনই কোন জাতির ভেতর অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও ব্যভিচারের প্রচলন ঘটবে, আল্লাহ তাদের মধ্যে মৃত্যু (অর্থাৎ অস্বাভাবিক ও অপরিণত বয়সে মৃত্যু) ব্যাপক করে দেবেন। (কোন কোন বর্ণনায় মৃত্যুর পরিবর্তে 'মস্তিষ্ক বিকৃতি'র উল্লেখ আছে) যখনই কোন জাতি মাপে ও ওজনে কমবেশী করবে আল্লাহ তাদেরকে দুর্ভিক্ষ ও অজন্মার কবলে ফেলবেন। যখনই কোন জাতি যাকাত দেয়া বন্ধ করবে আল্লাহ তাদেরকে অনাবৃষ্টির কবলিত করবেন।"
উপদেশ: সম্পদের গর্বে যারা গর্বিত, তাদের মনে রাখা উচিত যে, অচিরেই তাদের এ দুনিয়া ও তার সকল সহায় সম্পদ ছেড়ে চলে যেতে হবে। যখন সঞ্চিত সম্পদকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে কপালে, পিঠে ও পার্শে সেঁক দেয়া হবে, তখন তা তাদের কোন উপকারে আসবেনা। এ আয়াতটি কখনো ভুলে যাওয়া চাইনা। দরিদ্র ও ভিক্ষুকদের দেখে বিরক্তি প্রকাশ করা উচিত নয়। আল্লাহ ইচ্ছা করলে দরিদ্র লোককে ধনী বানিয়ে দিতে পারেন এবং ধনীকে এক মুহূর্তে দরিদ্রে পরিণত করতে পারেন। কাউকে দরিদ্র বানানো ও কাউকে বিত্তশালী বানানোর পেছনে আল্লাহর যে গভীর ও মহৎ উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে তা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
বিশিষ্ট তাবেয়ী মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ আল-ফিরিয়াবী বলেন: একবার আমি ও আমার সংগীরা হযরত আবু সিনান (র) এর সাথে সাক্ষাত করতে গেলাম। কিছুক্ষণ পর হযরত আবু সিনান (র) আমাদেরকে সাথে নিয়ে তাঁর এক প্রতিবেশীকে দেখতে গেলেন। ঐ প্রতিবেশীর এক ভাই সম্প্রতি মারা গেছে। তাই তাকে সান্ত্বনা দেয়াই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। তাঁর কাছে গিয়ে দেখলাম, তিনি খুবই অস্থিরভাবে কাঁন্নাকাটি করছেন। আমাদের কোন সান্ত্বনা বাক্যই তাঁকে শান্ত করতে পারছিলনা। অবশেষে আমরা বললাম: আপনি কি জানেন না যে, মৃত্যু একটা অবধারিত ব্যাপার? তিনি বললেন: তাতো জানি ভাই, কিন্তু আমি কাঁদছি শুধু এজন্য যে, আমার ভাই কবরে ভয়ংকর আযাব ভোগ করছে। আমরা বললামঃ আল্লাহ কি আপনাকে অদৃশ্যের খবর জানিয়েছেন? তিনি বললেনঃ দাফন সম্পন্ন করার পর যখন সবাই চলে গেল, তখন আমি কবরের কাছে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। সহসা কবর থেকে একটি আওয়ায শুনতে পেলাম: “আহ্, আমাকে একা থাকতে দাও। আমি আযাব ভোগ করতে থাকি। আমি নামাযও পড়তাম, রোযাও রাখতাম।” তার এই কথায় আমার কান্না আসতে লাগলো। আমি তার অবস্থা দেখার জন্য কবর খুঁড়লাম। দেখলাম, কবরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে এবং আমার ভাই এর গলায় আগুনের শেকল লটকানো রয়েছে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম আপনার ভাই দুনিয়ায় থাকাকালে কি করতো? তিনি বললেন: সে যাকাত দিতনা। আমরা তখন বললাম: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: “যারা আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদে কার্পণ্য করে, তাদের এ কাজকে তোমরা ভালো মনে করনা। এটা তাদের জন্য অশুভ। যে সম্পদ নিয়ে তারা কার্পণ্য করতো তা কিয়ামতের দিন তাদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে।” আপনার ভাইকে হয়তো এ আযাব আগাম দেয়া হচ্ছে। অতঃপর আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে জনৈক সাহাবীর নিকট গেলাম, যিনি তখনো জীবিত। আমরা তাঁকে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বললাম: "কত ইহুদী ও খৃস্টান মারা যায়। তাদের তো এমনটি হতে দেখিনা।" তিনি বললেন: তারা নিঃসন্দেহে দোজখে যাবে। তবে আল্লাহ মুমিনদের ভেতরেই দৃষ্টান্ত দেখান, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।
📄 বিনা ওযরে রমযানের রোযা ভঙ্গ করা
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন পূর্ববর্তীদের ওপরে ফরয করা হয়েছিল। আশা করা যায় যে, তোমরা মুত্তাকী হবে। কতিপয় দিন, এ সময় যদি কেউ রোগাক্রান্ত হয় কিংবা প্রবাসে থাকে, তা হলে অন্য দিনগুলোতে রোযা রাখবে।"
সহী আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এ হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, “ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিস: আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁর রাসূল এই মর্মে সাক্ষ্য দেয়া, নামায কায়েম করা, যাকাত দেয়া, হজ্জ করা ও রমযানের রোযা রাখা।"
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: যে ব্যক্তি বিনা ওজরে রমযানের একটি রোযাও পরিত্যাগ করবে, সে যদি এরপর সারা জীবন রোযা রাখে তথাপি তার ক্ষতিপূরণ হবেনা।” (তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)
বস্তুত কাফফারা দ্বারা রোযা ভাংগার গুনাহ মাফ হলেও রমযানের রোযার সওয়াব ও মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হবেনা।
📄 সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করা
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "যে ব্যক্তি হজ্জ করার সামর্থ রাখে, তার ওপর হজ্জ করা ফরয।" রাসূল (সা) বলেন: "আল্লাহর ঘর পর্যন্ত পৌছে হজ্জ করার জন্য প্রয়োজনীয় বাহন ও পাথেয় যার রয়েছে, সে যদি হজ্জ না করে, তবে সে ইহুদী হয়ে মরুক কিংবা খৃস্টান হয়ে, তাতে আল্লাহর কিছু আসে যায়না।"
হযরত উমর (রা) বলেন: যারা ক্ষমতা থাকা সত্বেও হজ্জ করেনা, আমার ইচ্ছা হয় তাদের ওপর জিযিয়া বসিয়ে দেই। কারণ তারা মুসলমান নয়।" হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন: সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যাকাত দেয়না ও হজ্জ করেনা, এমন ব্যক্তি মৃত্যুর সময় নিজের আয়ু বৃদ্ধির জন্য আক্ষেপ করবে। তাকে প্রশ্ন করা হলো যে, এরূপ আক্ষেপ তো কাফিরদের করার কথা।” তিনি বললেনঃ আমি যে কথা বলেছি তা কুরআনে রয়েছে। এই বলে তিনি নিম্নের আয়াত কয়টি পড়লেন: "হে মুমিনগণ: তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন করে না দেয়। আর যারা উদাসীন হবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তোমরা সেই সময়টি ঘনিয়ে আসার আগে আমার দেয়া সম্পদ থেকে দান কর, যখন তোমাদের কারো মৃত্যু এসে যাবে তখন সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, তুমি কেন আমাকে আর অল্প কিছু সময় বাড়িয়ে দিলেনা, তাহলে আমি সদকা করতাম (অর্থাৎ যাকাত দিতাম) এবং সৎকর্মশীলদের (অর্থাৎ হজ্জ আদায়কারীদের) অন্তর্ভুক্ত হতাম।" তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, যাকাত কিসে ফরয হয়? তিনি বললেন: দুইশত দিরহাম অথবা অনুরূপ মূল্যের স্বর্ণ থাকলে। অতঃপর জিজ্ঞাসা করা হলো: হজ্জ কিসে ফরয হয়? তিনি বললেন, আসা যাওয়ার পথ খরচ ও যানবাহন সংগৃহীত হলেই হজ্জ ফরয হয়। হযরত সাঈদ বিন জুবাইর (রা) বলেন: "আমার এক ধনী প্রতিবেশী হজ্জ না করে মারা গেলে আমি তার জানাযার নামায পড়িনি।"
📄 আত্মহত্যা করা
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করোনা। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়ালু। আর যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি ও জুলমের মাধ্যমে এ কাজ করবে, তাকে আমি আগুনে পোড়াবো। এ কাজ আল্লাহর পক্ষে সহজ।” (সূরা আন নিসা)
ইমাম ওয়াহেদী ও ইবনে আব্বাস প্রমুখ এ আয়াতের তাফসীর প্রসংগে বলেছেন যে, এর অর্থ তোমরা একে অপরকে হত্যা করোনা। কেননা তোমরা একই ধর্মের অনুসারী। তাই তোমরা যেন একই ব্যক্তি। কিন্তু অন্যরা বলেছেন যে, এ আয়াতে আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই শেষোক্ত মতটিই সঠিক। কেননা অন্য মানুষকে হত্যার ব্যাপারে আল কুরআন ও হাদীসে আরো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং তা স্বতন্ত্রভাবে আলোচিত হয়েছে। তা ছাড়া আবু দাউদ শরীফে উদ্ধৃত হযরত আমর ইবনুল আসের বর্ণিত হাদীসও এই মতের বিশুদ্ধতার অন্যতম প্রমাণ। হযরত আমর ইবনুল আ'স বলেন: রাসূল (সা) এর নেতৃত্বে পরিচালিত যাতুস সালাসিল যুদ্ধ চলাকালে এক হিমেল রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়। সেই রাতে গোসল করলে ঠান্ডায় আমার মারা যাওয়ার আশংকা ছিল। তাই আমি তায়াম্মুম করলাম এবং আমার সংগীদের নিয়ে ফজরের নামায পড়লাম। পরে রাসূলকে (সা) ঘটনাটা জানালাম। তিনি বললেনঃ "ওহে আমর। তুমি তোমার সাথীদের নিয়ে নাপাক শরীরে নামায পড়লে? আমি কী কারণে গোসল করিনি তা তাঁকে অবহিত করলাম। সেই সাথে বললাম: আমি কুরআনে আল্লাহর এই বানী পড়েছি যে, "তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করোনা, আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়ালু।” এ কথা শুনে রাসূল (সা) হেসে দিলেন এবং আর কিছুই বললেন না। এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, হযরত আমর এই আয়াত দ্বারা আত্মহত্যা বুঝেছেন, অন্যকে হত্যা করা নয়। অথচ রাসূল (সা) তাঁর এই ব্যাখ্যায় আপত্তি করেননি।
অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি আহত হয়ে কষ্ট পাচ্ছিল। তাই সে একখানা ছুরি দ্বারা নিজের দেহে আঘাত করলো। ফলে রক্তপাত হয়ে সে মারা গেল। তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন। "আমার বান্দা আমাকে ডিংগিয়ে নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিলাম।" (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: যে ব্যক্তি কোন লোহার অস্ত্র দিয়ে নিজেকে হত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে বসে অনন্তকাল ধরে সেই অস্ত্র দিয়েই নিজেকে কোপাতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি বিষ পানে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের মধ্যে বসেও সে অনন্তকাল ধরে বিষ পান করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি পাহাড়ের ওপর থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করবে, দোযখে বসেও সে অনবরত উচ্চ স্থান থেকে লাফিয়ে পড়তে থাকবে। এভাবে অনন্তকাল ধরে সে নিজেকে কষ্ট দিতে থাকবে। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
অপর হাদীসে রাসূল (সা) বলেন : "কোন মুমিনকে অভিশাপ দেয়া তাকে হত্যা করার শামিল। কোন মুমিনকে মিথ্যামিথ্যি কাফির বলা তাকে হত্যা করার শামিল। আর যে ব্যক্তি কোন জিনিস দ্বারা নিজেকে হত্যা করবে, কিয়ামতের দিনও তাকে সেই জিনিস দ্বারাই শাস্তি দেয়া হবে।" (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, নাসায়ী, তিরমিযী)
অপর একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি নিজের ক্ষত স্থানের যন্ত্রণা সইতে না পেরে নিজ তরবারী দ্বারা আত্মহত্যা করে। রাসূল (সা) তার কথা শুনে বলেন, সে জাহান্নামী।
বস্তুত আল্লাহর দেয়া প্রাণ ও আয়ুষ্কাল একটি মস্ত বড় নিয়ামত এবং আখিরাতের জন্য নেক কাজ করার সীমিত অবকাশ। একে যারা স্বহস্তে খতম করে, তাদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ আমাদেরকে এই ভয়ংকর কবীরা গুনাহ থেকে রক্ষা করুন।