📄 শিরক করা
আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ। এই শিরক দুই প্রকারের: (১) আকীদাগত শিরক: অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা এবং তার ইবাদাত করা। গাছ, পাথর, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, ফিরিশতা, নবী, ওলী ইত্যাদি যাই হোক না কেন, তাকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা ও তার ইবাদাত করা শিরক। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে কাউকে শরীক করার গুনাহ মাফ করেন না। এর চেয়ে ছোট যে কোন গুনাহ যাকে ইচ্ছা মাফ করেন।" (সূরা আন নিসা)
"নিশ্চয় শিরক একটা বিরাট জুলুম।" (সূরা লুকমান)
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।" (সূরা আল মায়েদা) এ বিষয়ে আরো বহু আয়াত রয়েছে।
বস্তুতঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে বা কোন বস্তুকে শরীক করবে এবং সেই অবস্থায় মারা যাবে, সে নির্ঘাত জাহান্নামে যাবে। যেমন কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলে এবং ঈমানদার অবস্থায় মারা গেলে জান্নাতবাসী হবে, চাই সে জাহান্নামে যতই আযাব ভোগ করুক না কেন। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) একদিন তিনবার বললেন: আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করবোনা? সবাই বললোঃ "জ্বি হাঁ, হে রসূল"! তখন তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরীক করা, মাতাপিতাকে কষ্ট দেয়া। অতঃপর তিনি হেলান দেয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন: "মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া থেকে সাবধান!" এই শেষোক্ত কথাটা তিনি এতবার পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন যে, হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন: আমরা মনে মনে বলছিলাম, রাসূল (সা) যদি চুপ করতেন তবে ভালো হতো।
বুখারী ও আহমাদের বর্ণনায় রয়েছে: "রাসূল (সা) বললেন: তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক ও সর্বনাশা গুনাহ থেকে বিরত থাক। অতঃপর শিরকের উল্লেখ করলেন। অতঃপর বললেন: যে ব্যক্তি নিজের ধর্ম পরিবর্তন করে (অর্থাৎ ইসলামকে ত্যাগ করে) তাকে হত্যা কর।"
দ্বিতীয় প্রকারের শিরক হচ্ছে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সৎ কাজ করা। আল্লাহ বলেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাত কামনা করে তার সৎ কাজ করা উচিত এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদাতে আর কাউকে শরীক করা উচিত নয়।” অর্থাৎ নিজের সৎ কাজ কাউকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করা উচিত নয়। রাসূল (সা) বলেছেন: তোমরা ছোট শিরক থেকে দূরে থাক। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন; ছোট শিরক কী? তিনি বললেন: রিয়া অর্থাৎ লোক দেখিয়ে সৎ কাজ করা। যেদিন আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে কর্মফল দেবেন সেদিন তাদেরকে বলবেন, যাদেরকে দেখিয়ে দেখিয়ে দুনিয়ায় তোমরা নেক আমল করতে, তাদের কাছে চলে যাও। দেখ, তারা তোমাদেরকে কোন প্রতিদান দেয় কিনা।” (আহমাদ, বায়হাকী, তাবরানী) অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: যে ব্যক্তি কোন কাজ করে এবং তাতে আমি ব্যতীত অন্য কাউকে শরীক করে, তার কাজ যাকে শরীক করেছে তার। সে কাজের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।" (মুসলিম, ইবনে মাজাহ) রাসূল (সা) আরো বলেছেন : যে ব্যক্তি মানুষকে শুনায়, আল্লাহও তার বেলায় মানুষকে শুনান, আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখায়, আল্লাহও তার সাথে লোক দেখানো আচরণ করেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
রাসূল (সা) বলেন, "অনেক রোযাদার এমন আছে, যার রোযা থেকে ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া আর কিছু অর্জিত হয়না। আর অনেক রাত জেগে নামায পড়া লোক আছে, যাদের রাত জাগাই সার হয়।" অর্থাৎ নামায ও রোযা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে না করা হলে তার কোন সওয়াব হবেনা। (ইবনে মাজাহ, আহমাদ, তাবরানী)
আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন : “তাদের কৃতকর্মের কাছে আমি উপস্থিত হব এবং তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণা বানিয়ে দেব।” অর্থাৎ আল্লাহর সন্তোষ ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে মানুষ যে কাজ করবে, আল্লাহ তার সওয়াব নষ্ট করে দেবেন।
আদী বিন হাতেম বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন : "কিছু সংখ্যক লোককে কেয়ামতের দিন জান্নাতে পাঠানোর আদেশ দেয়া হবে। তারা যখন জান্নাতের খুব কাছাকাছি চলে যাবে, তার ঘ্রাণও পাবে, এবং তার ভেতরের প্রাসাদগুলো ও অন্যান্য অনুপম নিয়ামতগুলো দেখবে, তখন ফেরেশতাদেরকে বলা হবে যে, "ওদেরকে ওখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কেননা জান্নাতের ঐ সব নিয়ামতে ওদের কোন অধিকার নেই।" অতপর তারা চরম হতাশা ও অনুশোচনা নিয়ে ফিরে যাবে। তারপর তারা বলবে : “হে আল্লাহ! তোমার প্রিয়জনদের জন্য যে নিয়ামত নির্দিষ্ট করে রেখেছ, তা দেখানোর আগে যদি আমাদেরকে জাহান্নামে পাঠাতে, তাহলে তা আমাদের জন্য অনেকটা সহজ হতো।"
আল্লাহ বলবেন : "আমি তোমাদের সাথে এই আচরণই করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম। তোমরা যখন একাকী থাকতে, আমার প্রতি চরম অবাধ্যতার আচরণ করতে। আর যখন মানুষের সাথে মেলামেশা করতে, তখন তাদের সাথে খোদাভীরু লোকদের মত আচরণ করতে। নিজেদের কার্যকলাপ দ্বারা মানুষের কাছে যে মানসিকতা তোমরা প্রকাশ করতে, আমার প্রতি তোমরা আন্তরিকতার সাথে সেই মানসিকতা পোষণ করতেনা। তোমরা মানুষকে ভয় করতে, আমাকে ভয় করতোনা। তোমরা মানুষকে গুরুত্ব দিতে, আমাকে গুরুত্ব দিতোনা। মানুষের জন্য তোমরা ত্যাগ স্বীকার করতে, আমার জন্য ত্যাগ স্বীকার করতোনা। তাই আজ আমি তোমাদেরকে আমার অগাধ প্রতিদান থেকে বঞ্চিতও করবো, আর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিও দেবো।"
অপর এক হাদীসে আছে যে, এক ব্যক্তি রাসূল (সা) কে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, মুক্তি কিভাবে পাওয়া যাবে! তিনি বললেন: আল্লাহকে যদি ধোকা না দাও তাহলে মুক্তি পাবে। লোকটি বললো: আল্লাহকে ধোকা দেয়ার অর্থ কী? তিনি বললেন: যে কাজ তোমাকে আল্লাহ ও তার রাসূল করতে বলেছেন, সে কাজ যদি তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে খুশী করার জন্য কর, তাহলে সেটাই হবে আল্লাহকে ধোকা দেয়ার শামিল। রাসূল (সা) আরো বললেন: তুমি রিয়াকারী (লোক দেখানো কাজ) থেকে বিরত থাক। কেননা রিয়া হচ্ছে ছোট শিরক। যে ব্যক্তি রিয়াকারীতে লিপ্ত থাকবে, কিয়ামতের দিন সমবেত জনতার সামনে তাকে চারটে বিশেষণে ভূষিত করে ডাকা হবে, যথা: হে রিয়াকার, হে বিশ্বাসঘাতক, হে অবাধ্য, হে ক্ষতিগ্রস্ত! তোমার আমল বাতিল হয়ে গেছে, তোমার প্রতিদান নষ্ট হয়ে গেছে, আমার কাছে তোমার কোন পারিশ্রমিক পাওনা নেই। হে ধোকাবাজ, তুমি যার জন্য কাজ করেছ তার কাছ থেকে পারিশ্রমিক নাও গে।”
কথিত আছে যে, জনৈক মুসলিম মনীষীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা (ইখলাস) কাকে বলে? তিনি জবাব দিলেন: মানুষ নিজের পাপ কাজকে যেমন লুকায়, তেমনি তার ভালো কাজকেও লুকাবে। এটাই নিষ্ঠা বা ইখলাস। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো: ইখলাস বা আন্তরিকতার উদ্দেশ্য কী? তিনি বললেন: লোকে তোমার প্রশংসা করুক- এটা কামনা না করা। হযরত ফযীল বিন ইয়ায বলেন: লোকের ভয়ে খারাপ কাজ ত্যাগ করা রিয়াকারী, আর মানুষকে খুশী করার জন্য ভালো কাজ করা শিরক। আর ইখলাস হচ্ছে এই উভয় রোগ থেকে মুক্ত থাকার নাম।
📄 হত্যা করা
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তার পরিণাম জাহান্নাম। সেখানে সে চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তার ওপর ক্রুদ্ধ হন, অভিসম্পাত করেন এবং তার জন্য ভয়ংকর আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।" (সূরা আন নিসা) "আর যারা বৈধ কারণ ছাড়া আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ প্রাণকে হত্যা করেনা এবং ব্যভিচার করেনা, (তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা) আর যারা ওসব অপকর্ম করে তারা হয় মহাপাপী। তার জন্য আযাব দ্বিগুণ করা হবে এবং সে অপমানিত হয়ে সেখানে চিরদিন অবস্থান করবে।' অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করে ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তার কথা ভিন্ন।" সূরা আল মায়েদায় একটি হত্যাকাণ্ডকে গোটা মানব জাতির হত্যার শামিল বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: "এ কারণেই আমি বনী ইসরাইলকে লিখে দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি কোন হত্যার বিনিময়ে ছাড়া কাউকে হত্যা করলো সে যেন সমগ্র মানব জাতিকে হত্যা করলো।
আর যে একটা প্রাণকে বাঁচালো সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচালো।" হাদীসে হত্যা ও হত্যার ইচ্ছাকেও সমান অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। রাসূল (সা) বলেন: যখন দু'জন মুসলমান তরবারী নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করে, তখন হন্তা ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামী হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, হত্যাকারীর কথা তো বুঝলাম। কিন্তু নিহত ব্যক্তির ব্যাপার কি? রাসূল (স) বললেন: সে তার প্রতিপক্ষকে খুন করতে চেয়েছিল।” (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ)
ইমামগণ ও মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেছেন যে, কোন অবৈধ স্বার্থ, শত্রুতা বা বিদ্বেষবশতঃ পরস্পরে সংঘর্ষ হলেই এ হাদীস প্রযোজ্য। নচেত আত্মরক্ষা ও বৈধ ধনসম্পদের হেফাজতের উদ্দেশ্যে অস্ত্র ধারণ করলে এ হাদীস প্রযোজ্য হবেনা। কেননা আত্মরক্ষাকারীর উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে খুন করা হয়না বরং আক্রমণ প্রতিহত করাই তার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। আক্রমণকারীকে হত্যা না করে যদি আত্মরক্ষা করা সম্ভব হয় তবে সেটা করাই শ্রেয়।
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: আমার পরে তোমরা পরস্পরকে হত্যাকারী কাফেরদের মত হয়ে যেওনা। তিনি আরো বলেছেন: অবৈধ হত্যাকান্ড না ঘটানো পর্যন্ত বান্দার আর সকল গুনাহ মাফ হওয়ার অবকাশ থাকে। তিনি আরো বলেছেন: কিয়ামতের দিন সবার আগে হত্যার বিচার হবে। তিনি আরো বলেছেন: আমার নিকট কোন মুমিনের হত্যাকান্ড সমগ্র পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চেয়েও মারাত্মক ঘটনা। এক হাদীসে আল্লাহর সাথে শরীক করা, নরহত্যা ও মিথ্যা শপথ করাকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ বলা হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন: পৃথিবীতে যত অন্যায় হত্যাকান্ড হবে, আদম (আ) এর প্রথম পুত্র তার অংশ পাবে। কারণ সে-ই সর্বপ্রথম এই অপরাধের প্রচলন করেছে। রাসূল (সা) আরো বলেছেন: কোন অমুসলিমকে হত্যাকারী জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ বেহেস্তের ঘ্রাণ ৪০ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।
📄 জাদু করা
জাদুর কবীরা গুনাহ হওয়ার কারণ এই যে, এ কাজ করতে হলে কাফের না হয়ে করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন: "শয়তানরা কুফরীতে লিপ্ত হয়ে মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত।” বস্তুত: অভিশপ্ত শয়তানের মানুষকে জাদু শিক্ষা দেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সথে শিরক করা। হারূত ও মারূত নামক দু'জন ফিরিশতার কাহিনী বর্ণনা প্রসংগে আল্লাহ বলেন: "তারা উভয়ে কাউকে জাদু শিক্ষা দেয়ার আগে এ কথা বলে দিত যে, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ। কাজেই তোমরা কুফরীতে লিপ্ত হয়োনা। তারপর তাদের কাছ থেকে লোকেরা এমন জাদু শিখতো, যা দ্বারা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়। অথচ তারা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তা দ্বারা কারো ক্ষতি করতে পারতো না। তারা যে জাদু শিখতো তা তাদের শুধু ক্ষতি করতো, উপকার করতোনা। আর তারা এ কথাও জানতো যে, যে ব্যক্তি জাদু আয়ত্ব করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ প্রাপ্য নেই।” (সূরা বাকারা)
এ জন্য বহু গুমরাহ মানুষকে জাদুর আশ্রয় নিতে দেখা যায়। কেননা তারা একে শুধু একটা হারাম কাজ মনে করে। অথচ আসলে তা যে কুফরীও তা তারা জানেনা। স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটানো, বেগানা পুরুষ ও স্ত্রীর মধ্যে প্রেম প্রণয় সৃষ্টির কাজে এমন সব মন্ত্র পড়ে জাদু করা হয়, যার বেশীর ভাগ শিরক ও কুফরীতে পরিপূর্ণ।
জাদুকরের শরীয়ত বিহিত শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড। কেননা তা আল্লাহর সাথে কুফরী অথবা কুফরীর পর্যায়ভুক্ত। রসূল (সা) যে হাদীসে "সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ" পরিহার করতে বলেছেন, তাতে জাদুও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করা উচিত এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় ক্ষতিকর এমন কাজের ধারে কাছে যাওয়া চাইনা। হাদীসে আছে : “জাদুকরের শাস্তি তরবারীর আঘাতে তাকে খতম করে দেয়া।” (আল জামে আত্ তিরমিযী) বুখারী শরীফের হাদীসে বর্ণিত আছে যে, "ইবনে আবদা বলেছেন: হযরত উমরের (রা) ইন্তিকালের এক বছর আগে আমাদের কাছে এই মর্মে চিঠি আসে যে, জাদুকর স্ত্রী বা পুরুষ যে-ই হোক, তাকে হত্যা কর।" এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা বলেন: "আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। যে জাদু করে, যার জন্য জাদু করা হয়, যে ভবিষ্যদ্বাণী করে, যার জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, যে শুভ বা অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস করে বা কাউকে বিশ্বাস করতে উপদেশ দেয়, তারা কেউ আমার পছন্দনীয় নয়।" হযরত আলী (রা) বর্ণনা করেন যে, রসূল (সা) বলেছেনঃ "তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবেনা : (১) মদ্যপায়ী, (২) রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়তা ছিন্নকারী ও (৩) জাদুতে আস্থা স্থাপনকারী।" (মুসনাদে আহমাদ) হযরত ইবনে মাসউদ বর্ণিত হাদীসে আছে : তাবীজ ও ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাস করা শিরক। অবশ্য আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুগ্রহ ছাড়া এসবের কোন উপকারিতা নেই এরূপ বিশ্বাস করলে তাবীজ তুমার ও ঝাড়ফুঁকে দোষ নেই, যদি তা অনৈসলামিক ভাষায় লিখিত না হয়। ইমাম খত্তাবী বলেছেন : কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম লেখা তাবীজ বৈধ। কেননা রসূল (সা) স্বয়ং হাসান ও হুসাইনকে (রা) তাবীজ লিখে দিয়েছিলেন।
📄 নামাযে শৈথিল্য প্রদর্শন
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "অতঃপর (সেই সব নবীর পর) এমন উত্তরাধিকারীরা এল, যারা নামাযকে নষ্ট করলো ও প্রবৃত্তির কামনা বাসনা অনুসারে কাজ করলো। তারা অবশ্যই "গায়” তে পতিত হবে। তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও নেক আমল করে তাদের কথা স্বতন্ত্র।” (মারিয়াম)
হযরত ঈবনে আব্বাস (রা) বলেন: "নামাযকে নষ্ট করার অর্থ পুরোপুরি তরক করা বা বর্জন করা নয়, এর অর্থ হলো নির্দিষ্ট সময়ের পরে পড়া বা কাযা করা।
হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব বলেন: এর অর্থ পরবর্তী নামাযের সময় না এসে পড়া পর্যন্ত নামায বিলম্বিত করা। এটা করতে যে অভ্যস্থ হয়ে যায় এবং এই অভ্যাসের ওপর তওবা না করেই মারা যায় আল্লাহ তাকে 'গায়" নামক স্থানে নিক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। এটি দোজখের অত্যন্ত নিচ ও নোংরা একটি গহবরের নাম।
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেন: সেই সকল নামাযীর জন্য 'ওয়েল', যারা নিজেদের নামাযের ব্যাপারে শিথিল। অর্থাৎ আলসেমী ও গড়িমসি করে। হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস বলেন: আমি রসূলকে (সা) জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, এই শিথিলতা কি? তিনি বললেন: নির্দিষ্ট সময় থেকে বিলম্বিত করা। তাদেরকে নামাযী বলা হয়েছে। কিন্তু উদাসীনতা ও বিলম্বের কারণে তাদেরকে "ওয়েল" এর হুমকি দেয়া হয়েছে। ওয়েল অর্থ আযাবের কঠোরতা। কারো কারো মতে ওয়েল হচ্ছে জাহান্নামের এমন উত্তপ্ত একটি জায়গা, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত পাহাড় পর্বত ফেলে দিলেও তা তীব্র দহনে গলে যাবে। তওবা ও অনুতাপসহকারে ক্ষমা না চাইলে নামায কাযাকারী ও নামাযে আলস্যকারীর জন্য এই জায়গা বাসস্থান হিসাবে নির্ধারিত রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে বলেছেন: "হে মুমিনগণ! তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্তুতি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন করে না দেয়। যে ব্যক্তি তা করবে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।" তাফসীরকারগণ বলেছেন: উক্ত আয়াতে "আল্লাহর স্মরণ” দ্বারা পাঁচ ওয়াক্তের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। কাজেই কেউ 'যদি নিজের অর্থ উপার্জন সংক্রান্ত কর্মকান্ডে যথা ব্যবসায় বাণিজ্যে ও সন্তানাদি সংক্রান্ত ব্যস্ততায় সময় মত নামায না পড়ে তবে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রসূল (সা) বলেছেন: "কিয়ামতের দিন বান্দার যে কাজ সম্পর্কে সর্বপ্রথম হিসাব নিকাশ নেয়া হবে তা হচ্ছে নামায। হিসাব দিতে সক্ষম হলে মুক্তি নচেত ব্যর্থতা অবধারিত।"
জাহান্নামবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন : “জান্নাতবাসী তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে, কোন্ কারণে তোমরা দোজখে গেলে? তারা জবাব দেবে : আমরা নামায আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না,......"
রসূল (সা) বলেছেন : "অমুসলিমদের ও আমাদের মাঝে যে অংগীকার, তা হচ্ছে নামায সংক্রান্ত। নামাযকে যে ত্যাগ করলো, সে কাফের।" তিনি আরো বলেছেন : "বান্দার ও তার কাফের হওয়ার মাঝে কেবল নামায তরকের ব্যবধান।"
সহীহ বুখারীতে আছে, রসূল (সা) বলেছেন : "যার আসরের নামায ছুটে যায়, তার সমস্ত সৎ কাজ বৃথা হয়ে যায়।" অপর হাদীসে রসূল (সা) বলেন : “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ত্যাগ করে, আল্লাহ তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত।" সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রসূল (সা) বলেন : “মানুষ যতক্ষণ এক আল্লাহকে মা'বুদ হিসাবে মেনে না নেবে, নামায কায়েম ও যাকাত আদায় না করবে, ততক্ষণ তাদের সাথে যুদ্ধ করতে আমি আদিষ্ট। এ কাজগুলো যারা করবে, তাদের রক্ত ও সম্পদ আমার হাত থেকে নিরাপদ। তবে ন্যায়সংগত কারণ থাকলে ভিন্ন কথা। তাদের হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালার।" এ হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসংগে উমর (রা) বলেন : "নামায ত্যাগকারী ইসলামের প্রদত্ত কোন সুযোগ সুবিধা ও নিরাপত্তা ভোগ করতে পারবেনা।"
রসূল (সা) আরো বলেছেন : "যে ব্যক্তি যথারীতি নামায আদায় করবে, তা কিয়ামতের দিন তার জন্য মুক্তির ওসীলা, আলোকবর্তিকা ও যুক্তিপ্রমাণ হবে। আর যে যথারীতি নামায আদায় করবে না, তার জন্য তা আলোকবর্তিকাও হবে না, যুক্তিপ্রমাণও হবেনা, মুক্তির ওসীলাও হবেনা। অধিকন্তু সে কিয়ামতের দিন ফিরাউন, কারুন, হামান ও উবাই বিন খালাফের সংগী হবে।"
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় কোন কোন মুসলিম মনীষী বলেছেন যে, উল্লেখিত চারজন কুখ্যাত কাফেরের সাথে বেনামাযীর হাশর হওয়ার কারণ এই যে, নামায তরকের কারণ চার রকমের হয়ে থাকে। অর্থসম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততা, প্রশাসনিক ব্যস্ততা ও বাণিজ্যিক ব্যস্ততা। নামায পরিত্যাগের কারণ প্রথমটি হলে কারুনের সাথে, দ্বিতীয়টি হলে ফেরাউনের সাথে, তৃতীয়টি হলে হামানের সাথে এবং চতুর্থটি হলে মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী উবাই বিন খালাফের সাথে তার হাশর হবে।
বায়হাকী কর্তৃক উমর (রা) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি রসূল (সা) এর নিকট এসে বললো : "হে রসূল! ইসলামের কোন্ কাজ আল্লাহর নিকট বেশী প্রিয়?
রসূল (সা) বললেন: যথা সময়ে নামায পড়া। যে ব্যক্তি নামায ছেড়ে দিল তার ধর্ম নেই। নামায ইসলামের খুঁটি।"
উমর (রা) যখন আততায়ীর আঘাতে আহত হলেন, তখন তাঁকে জানানো হলো যে, "হে আমীরুল মুমিনীন! নামাযের সময় উপস্থিত।" তিনি বললেন: “হাঁ, আমি নামায পড়বো। নামায যে ছেড়ে দেয় ইসলামের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই।” অতঃপর তিনি নামায পড়লেন, তখনো তাঁর ক্ষতস্থান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল।"
বিশিষ্ট তাবেয়ী [যিনি রসূলকে (সা) দেখেননি, কিন্তু সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন তাকে তাবেয়ী বলা হয়]। আব্দুল্লাহ বিন শাকীফ (রহ) বলেন: রসূল (সা) এর সাহাবীগণ নামায ছাড়া আর কোন কাজকে ছেড়ে দিলে মানুষ কাফের হয়ে যায় বলে মনে করতেন না। আলী (রা) ও ইবনে মাসউদ (রা) বেনামাযীকে সুস্পষ্টভাবে যথাক্রমে কাফের ও বেদ্বীন বলেছেন। ইবনে আব্বাস বলেছেন: ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত নামায তরক করলেও আল্লাহর সাথে যখন সাক্ষাত হবে তিনি ক্রুদ্ধ থাকবেন।
রসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি বেনামাযী হয়ে আল্লাহর কাছে যাবে, তার অন্যান্য সৎ কাজকে আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। (তাবরানী) ইমাম ইবনে হাযম বলেছেন: আল্লাহর সাথে শরীক করা ও অন্যায়ভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করার পরেই সবচেয়ে বড় গুনাহর কাজ হলো নামায তরক করা। রসূল (সা) আরো বলেছেন: কোন বান্দা যখন প্রথম ওয়াক্তে নামায পড়ে তখন সেই নামায একটি আলোকরশ্মি ছুড়তে ছুড়তে আরশ পর্যন্ত পৌছে যায়। অতঃপর কিয়ামত পর্যন্ত দোয়া করতে থাকে যে, তুমি যেমন আমাকে রক্ষা করেছ, আল্লাহ তেমন তোমাকে রক্ষা করুন! (তাবরানী)
রসূল (সা) বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল করেন না: (১) যাকে জনগণ অপছন্দ করা সত্ত্বেও তাদের নেতা হয়ে জেঁকে বসে, (২) যে কোন স্বাধীন ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণ করে (৩) যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময় অতীত হওয়ার পর নামায পড়ে।" (আবু দাউদ) রসূল (সা) আরো বলেন: "যে ব্যক্তি বিনা ওযরে দুই নামায একত্রে পড়ে সে এক মস্ত বড় কবীরা গুনাহ করে।" (হাকেম)
আবু দাউদে বর্ণিত যে, রসূল (সা) বলেছেন: "কোন বালকের সাত বছর বয়স হলেই তাকে নামায পড়তে আদেশ দাও। আর দশ বছর হলে তাকে সে জন্য প্রহার কর ও বিছানা আলাদা করে দাও।"
ইমাম খাত্তাবী বলেন: এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, প্রাপ্ত বয়স্কের নামায তরকের জন্য আরো কঠোর শাস্তি প্রযোজ্য। শাফেয়ী মাযহাবের কারো কারো মতে ইচ্ছাকৃতভাবে নামায তরককারী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ড দেয়া যাবে। ইমাম মালেক, শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদের মতে সে হত্যাযোগ্য।
ইবরাহীম নাখয়ী, আইয়ুব সাখতিয়ানী, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইসহাক বিন রাহওয়ের মতে বিনা ওযরে স্বেচ্ছায় নামায তরককারীকে নামাযের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর কাফের গণ্য করতে হবে।
একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায যথারীতি আদায় করবে, আল্লাহ তাকে পাঁচটি মর্যাদা দান করবেন। প্রথমঃ তার দারিদ্র দূর করবেন, দ্বিতীয়তঃ তাকে কবরের আযাব থেকে মুক্তি দেবেন, তৃতীয়তঃ তার আমলনামা ডান হাতে দেবেন, চতুর্থতঃ বিদ্যুতবেগে তাকে পুলসিরাত পার করাবেন, পঞ্চমতঃ তাকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে ব্যক্তি নামাযের ব্যাপারে শৈথিল্য দেখাবে, আল্লাহ তাকে ১৪টি শাস্তি দেবেন। এর মধ্যে পাঁচটি দুনিয়ার জীবনে, ৩টি মৃত্যুর সময়ে, তিনটি কবরে, এবং তিনটি কবর থেকে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সময়ে। দুনিয়ার পাঁচটি হলো, তার জীবন থেকে বরকত উঠে যাবে, তার মুখমন্ডল থেকে সৎ লোকসুলভ ঔজ্জল্য দূর হয়ে যাবে। তার কোন নেক আমলের প্রতিদান দেয়া হবেনা।
তার কোন দোয়া কবুল হবেনা এবং নেককার লোকদের দোয়া থেকে সে বঞ্চিত হবে। আর মৃত্যুর সময়ের তিনটি শাস্তি হলো, সে অপমানিত হয়ে মারা যাবে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় মারা যাবে, এত পিপাসিত অবস্থায় মারা যাবে যে, সারা দুনিয়ার সমুদ্রের পানি পান করলেও তার পিপাসা মিটবেনা। কবরে থাকাকালে যে তিনটি শাস্তি সে ভোগ করবে, তাহলো তার কবর সংকুচিত হয়ে তাকে এত জোরে পিষ্ট করবে যে, এক পাশের পাঁজরের হাড় ভেংগে অপর পার্শ্বে চলে যাবে, তার কবর এমনভাবে আগুন দিয়ে ভরে দেয়া হবে যে, রাত দিন তা জ্বলতে থাকবে, এবং তাকে কিয়ামত পর্যন্ত একটি বিষধর সাপ দংশন করতে থাকবে। আর কবর থেকে বেরুবার সময় যে তিনটি শাস্তি সে ভোগ করবে তা হলো, তার হিসাব কঠিন হবে, আল্লাহকে সে ক্রুদ্ধ দেখতে পাবে এবং সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অন্য রেওয়ায়েতে আছে যে, কিয়ামতের দিন তার কপালে তিনটে কথা অংকিত থাকবে। একটি কথা হবে: "হে আল্লাহর হক বিনষ্টকারী", দ্বিতীয় কথাটি হবে: “হে আল্লাহর গযবের উপযুক্ত ব্যক্তি"। তৃতীয় কথাটি হবে: "তুমি পৃথিবীতে যেমন আল্লাহর অধিকার দাওনি, আজ তেমনি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে।"
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আল্লাহর সামনে দাঁড় করিয়ে জাহান্নামে যাওয়ার আদেশ দেয়া হবে। সে জিজ্ঞাসা করবে : হে আমার প্রতিপালক! কি কারণে? আল্লাহ বলবেন : নামায নির্ধারিত সময়ের পরে পড়া ও আমার নামে মিথ্যা কসম খাওয়ার কারণে।
একবার রসূল (সা) বললেন : হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে কাউকে বঞ্চিত হতভাগা বানিওনা, তারপর উপস্থিত সাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন : তোমরা কি জান বঞ্চিত হতভাগা কে? সাহাবীগণ বললেন : হে আল্লাহর রসূল? কে? তিনি বললেন : নামায তরককারী।
অপর এক হাদীসে আছে যে, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের মুখ কালো হবে, তারা হলো নামায তরককারী। জাহান্নামে 'মালহাম' নামক একটা অঞ্চল আছে। সেখানে বহু সাপ থাকে। তার প্রতিটি সাপ উটের ঘাড়ের মত মোটা এবং প্রায় এক মাসের পথের সমান লম্বা। এই সাপ নামায তরককারীকে দংশন করবে। তর বিষ তার শরীরে ৭০ বছর ধরে যন্ত্রণা দিতে থাকবে অবশেষে তার গোশত খসে খসে পড়বে।
বর্ণিত আছে যে, বনী ইসরাইলের এক মহিলা একবার মূসার (আ) কাছে এল। সে বললো : হে আল্লাহর রসূল! আমি একটি ভীষণ পাপের কাজ করেছি। পরে তওবাও করেছি। আপনি দোয়া করুন যেন আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেন। মূসা (আ) বললেন : তুমি কী গুনাহ করেছ? সে বললো : আমি ব্যভিচার করেছিলাম। অতঃপর একটি অবৈধ সন্তান প্রসব করি এবং তাকে হত্যা করে ফেলি। মূসা (আ) বললেন : "হে মহাপাতকিনী! এক্ষুণি বেরিয়ে যাও। আমার আশংকা, আকাশ থেকে এক্ষুণি আগুন নামবে এবং তাতে আমরা সবাই ভস্মীভূত হবো।" মহিলাটি ভগ্ন হৃদয়ে বেরিয়ে গেল। অল্পক্ষণ পরেই জিবরীল (আ) এলেন। তিনি বললেন : “হে মুসা! আল্লাহ আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছেন কী কারণে এই তওবাকারিনীকে তাড়িয়ে দিলেন? তার চেয়েও কি কোন অধম মানুষকে আপনি দেখেননি?” মূসা বললেন : “হে জিবরীল! এর চেয়ে পাপিষ্ঠ কে আছে!" জিবরীল (আ) বললেন : "ইচ্ছাকৃতভাবে নামায তরককারী।"
অপর একটি ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি তার বোনের দাফন কাফন সম্পন্ন করে বাড়ী ফিরে গিয়ে দেখলো, তার মানিব্যাগটি নেই। পরে তার মনে হলো, ওটা কবরের ভেতরে পড়ে গেছে। তাই সে ফিরে গিয়ে কবর খুড়লো। দেখলো, সমস্ত কবর জুড়ে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। সে পুনরায় মাটি চাপা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ী গেল। তার মায়ের কাছে সমস্ত ঘটনা জানালে তিনি বললেন, মেয়েটি নামাযের ব্যাপারে আলসেমী করতো এবং সময় গড়িয়ে গেলে নামায পড়তো। বিনা ওজরে নামায কাযা করলে যদি এরূপ পরিণতি হতে পারে, তাহলে বেনামাযীর পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে।
শুধু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নামায পড়াই যথেষ্ট নয়, নামাযকে সুষ্ঠুভাবে ও বিশুদ্ধভাবে পড়াও জরুরী। নচেত অশুদ্ধ নামায পড়া নামায না পড়ারই সমতুল্য।। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, “একদিন এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলো। রসূল (সা) তখন মসজিদেই বসে ছিলেন। লোকটি নামায পড়লো। অতঃপর রসূল (সা) এর কাছে এসে সালাম করলো। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন: তুমি ফিরে যাও এবং নামায পড়। কারণ তুমি নামায পড়নি। সে চলে গেল এবং আগের মত আবার নামায পড়ে রসূল (সা) এর কাছে এসে সালাম করলো। তিনি সালামের জবাব দিয়ে আবার বললেন: তুমি ফিরে যাও এবং নামায পড়। কেননা তুমি নামায পড়নি। এরূপ তিনবার নামায পড়ার পর লোকটি বললোঃ হে আল্লাহর রসূল! আমি এর চেয়ে ভালোভাবে নামায পড়তে পারিনা। আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন: প্রথমে নামাযে দাঁড়িয়ে তাকবীর বল। অতঃপর যতটুকু পার কুরআন পাঠ কর। অতঃপর রুকু কর এবং রুকুতে গিয়ে স্থির হও। অতঃপর উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াও। তারপর সিজদা দাও এবং সিজদায় গিয়ে স্থির হও। তারপর স্থির হয়ে বস। অতঃপর আবার সিজদা দাও এবং সিজদায় স্থির হও। এভাবে নামায শেষ কর।"
পবিত্র কুরআনে আছেঃ "সেই সব নামাযীর জন্য 'ওয়েল' নির্ধারিত, যারা নামাযে শৈথিল্য প্রদর্শন করে।" এর তাফসীরে হাদীসে আছে যে, যারা রুকু ও সিজদা ঠিকমত করেনা এবং কেবল ঠোকাঠুকি করে, তাদেরকে বুঝানো হয়েছে।
একটি হাদীসে আছে যে, সবচেয়ে বড় চোর হলো সেই ব্যক্তি যে নামাযে চুরি করে। জিজ্ঞাসা করা হলো: কীভাবে নামাযে চুরি করা হয়? রসূল (সা) বললেনঃ যথাযথভাবে রুকু সিজদা না করা ও বিশুদ্ধভাবে কুরআন না পড়া। (আহমাদ) রসূল (সা) আরো বলেন: যে ব্যক্তি রুকু ও সিজদার মধ্যবর্তী স্থানে পিঠটান করে দাঁড়ায়না, আল্লাহ তাঁর দিকে দৃষ্টি দেবেন না। (আহমাদ) রসূল (সা) আরো বলেন: সেই ব্যক্তির নামায মুনাফিকের নামায, যে বসে বসে সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে থাকে, আর যেই সূর্য শয়তানের দুই শিং-এর মাঝে পৌঁছে যায় (অর্থাৎ অস্ত যাওয়ার অব্যবহিত পূর্বে) অমনি উঠে দাঁড়ায় এবং চার বার মাথা ঠোকে। ঐ সময়ে আল্লাহকে সে খুব কমই স্মরণ করতে পারে। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
আবু মূসা (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদিন রসূল (সা) তাঁর সংগীদের নিয়ে নামায পড়ে বসলেন। এই সময়ে এক ব্যক্তি এসে তাড়াতাড়ি রুকু সিজদা করে নামায পড়লো। রসূল (সা) বললেন: তোমরা ওই ব্যক্তিকে দেখতে পাচ্ছো? সে যদি এই অবস্থায় মারা যায় তবে মুহাম্মদ (সা) এর উম্মাতের বহির্ভূত অবস্থায় মারা যাবে। কাক যেমন তার চঞ্চু দিয়ে রক্তে ঠোকর মারে, সে সেই রকম ঠোকর মেরে নামায সারলো। (সহীহে আবু বকর বিন খুযাইমা)
“রসূল (সা) আরো বলেছেন: যখনই কেউ নামায পড়ে তখন একজন ফিরিশতা তার ডানে এবং একজন ফিরিশতা তার বামে থাকে। সে যদি সুষ্ঠুভাবে নামায শেষ করে তবে তারা উভয়ে সেই নামাযকে নিয়ে আল্লাহর কাছে পৌছায়। নচেত তারা তা তার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারে।” (দারকুনী)
রসূল (সা) আরো বলেছেন: যে ব্যক্তি সুষ্ঠুভাবে ওযু করে, অতঃপর নামাযে দাঁড়ায়, সুষ্ঠুভাবে রুকু সিজদা ও কুরমান পাঠ দ্বারা নামায সম্পন্ন করে, তার নামায তাকে বলে: তুমি যেমন আমাকে সংরক্ষণ করেছ, তেমনি আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করুন। অতঃপর তা আলোকরশ্মি ছড়াতে ছড়াতে আকাশের দিকে উঠে যায়। অতঃপর তার জন্য আকাশের দুয়ার খুলে যায় এবং আল্লাহর নিকট পৌছে গিয়ে উক্ত নামাযীর পক্ষে সুপরিশ করে। আর যখন রুকু সিজদা ও কুরআন পাঠ সুষ্ঠুভাবে করেনা তখন নামায তাকে বলে: তুমি যেমন আমাকে নষ্ট করতে, আল্লাহও তেমনি তোমাকে নষ্ট করুক। অতঃপর তা অন্ধকারে আচ্ছন্ন অবস্থায়।কাশে উঠে যায়। তার জন্য আকাশের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তাকে পুরানো কাপড়ের মত গুটিয়ে নামাযীর মুখের ওপর ছুঁড়ে মারা হয়।
রসূল (সা) আরো বলেছেন: নামায একটি দাঁড়িপাল্লা স্বরূপ। যে ব্যক্তি এই দাঁড়িপাল্লা পুরোপুরিভাবে মেপে দেয়, তাকে তার পুরস্কারও পুরোপুরিভাবে দেয়া হবে। আর যে কম মেপে দেবে, তার সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে যে, যারা মাপে কম দেয় তাদের জন্য 'ওয়েল' নির্দিষ্ট রয়েছে। মাপে কম দেয়া যেমন অন্যান্য জিনিসে হতে পারে, তেমনি নামাযেও হতে পারে। আর 'ওয়েল' হচ্ছে জাহান্নামের এমন উত্তপ্ত জায়গা, যার উত্তাপ থেকে জাহান্নাম নিজেও আল্লাহর কাছে পানাহ চায়। (মুসনাদে আহমাদ)
রসূল (সা) বলেছেন: সিজদার সময় তোমরা মুখমন্ডল, নাক ও দুই হাত মাটিতে রাখবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা আমাকে সাতটি অংগ দিয়ে সিজদা করতে আদেশ দিয়েছেন: কপাল, নাক, দুই হাতের তালু, দুই হাটু ও দুই পায়ের পিঠ। সিজদার সময়ে কাপড় ও চুল সামলাতে নিষেধ করেছেন। যে ব্যক্তি প্রতিটি অংগপ্রত্যংগকে তার অধিকার না দিয়ে নামায পড়ে, তাকে সংশ্লিষ্ট অংগ পুরো নামাযের সময়টা ধরে অভিশাপ দিতে থাকে। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
হযরত হুযায়ফা এক ব্যক্তিকে দেখলেন ভালোভাবে রুকু সিজদা না করে নামায পড়ছে। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এভাবে কতদিন যাবত নামায পড়ছ? সে বললোঃ চল্লিশ বছর। তিনি বললেন: তুমি চল্লিশ বছর যাবত কোন নামাযই পড়নি। এ অবস্থায় মারা গেলে তুমি অমুসলিম অবস্থায় মারা যাবে।
ইমাম হাসান বরসী বলতেন: "হে আদম সন্তান! নামায যদি তোমার কাছে গুরুত্বহীন কাজ হয়, তাহলে ইসলামের আর কোন্ কাজটি তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে? অথচ রসূল (সা) বলেছেন: কিয়ামতের দিন বান্দা সর্বপ্রথম নামায সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হবে। যদি সঠিকভাবে নামায পড়ে থাকে তাহলে সে মুক্তি পাবে। আর যদি নামায সুষ্ঠুভাবে না পড়ে থাকে তাহলে সে ব্যর্থকাম ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি ফরয নামাযে অসম্পূর্ণতা ধরা পড়ে, তবে আল্লাহ বলবেন, "দেখতো, আমার বান্দার কোন নফল কাজ আছে কিনা। যদি থাকে, তবে তা দিয়ে ফরযের ত্রুটি পূর্ণ করা হবে। অনুরূপভাবে সকল কাজের বিচার অনুষ্ঠিত হবে।” (তিরমিযী)
অতএব প্রত্যেক মুমিনের উচিত যতটা বেশী সম্ভব নফল আদায় করা, যাতে ফরযের ক্ষতি পূরণ করা যায়।
জামায়াতে নামায না পড়ার শাস্তি প্রসংগে
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যেদিন কঠিন সময় উপস্থিত হবে, এবং লোকদেরকে সিজদা করার জন্য ডাকা হবে, তখন তারা সিজদা করতে পারবেনা। তাদের দৃষ্টি নিচু হবে, লাঞ্ছনা-অপমান তাদের ওপর চেপে বসবে। তারা যখন সুস্থ ও নিরাপদ ছিল, তখন তাদেরকে সিজদা করার জন্য ডাকা হচ্ছিল।" (কিন্তু তারা তা অস্বীকার করতো।) (সূরা) আল-কলম) এ আয়াতের প্রথমাংশে কিয়ামতের দিনের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। তাদের ওপর অবমাননার ছাপ থাকবে। অথচ দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে সিজদা করতে ডাকা হতো। ইবরাহীম তাইমী এর ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন: অর্থাৎ আযান ও ইকামাত দ্বারা তাদেরকে ফরয নামাযের: দিকে ডাকা হতো। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব বলেন: তারা আযান শুনতো, অথচ সুস্থ সবল থাকা সত্ত্বেও জামায়াতে হাজির হতোনা।
কা'ব আল আহবার (রা) বলেন: এ আয়াত কেবলমাত্র নামাযের জামায়াতে অনুপস্থিত থাকা লোকদের প্রসংগে নাযিল হয়েছিল। এ থেকে বিনা ওযরে জামায়াতে উপস্থিত না হওয়ার কী ভয়ংকর পরিণাম, তা জানা যায়। বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে রসূল (সা) বলেন: "আমার ইচ্ছা হয়, নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠিত হোক, তাতে আমি একজন ইমাম নিয়োগ করি, অতঃপর শুখনো কাঠ বহনকারী একদল লোক সাথে নিয়ে যারা জামায়াতে আসেনি তাদের বাড়ীতে গিয়ে তাদের বাড়ী জ্বালিয়ে দিই।"
মুসলিম শরীফের হাদীসে আছে যে, এক অন্ধ ব্যক্তি রসূল (সা) এর কাছে এসে বললোঃ হে রসূল, আমাকে মসজিদে নিয়ে যেতে পারে এমন কেউ নেই। আমাকে বাড়ীতে নামায পড়ার অনুমতি দিন। রসূল (সা) তাকে অনুমতি দিলেন। সে চলে যেতে উদ্যত হলে তাকে ডেকে বললেন: তুমি কি আযান শুনতে পাও? সে বললো: হাঁ। তিনি বললেন: তাহলে মসজিদে যাবে। এই হাদীসটি আবু দাউদ শরীফে এভাবে এসেছে যে, "আমর ইবনে উম্মে মাকতুম রসূল (সা) এর কাছে এলেন। তিনি বললেন: হে রসূল! মদীনা অনেক হিংস্র জীবজন্তুতে পূর্ণ শহর। আমি চোখে দেখিনা। বাড়ীও অনেক দূরে। আমাকে মসজিদে নিয়ে যেতে পারে এমন একজন আছে বটে। তবে সে আমার উপযুক্ত নয়। আমি কি বাড়ীতে নামায পড়তে পারি? রসূল (সা) বললেন: তুমি কি আযান শুনতে পাও? তিনি বললেন: হাঁ, পাই। রসূল (সা) বললেন: তাহলে তুমি মসজিদে যাবে। আমি তোমাকে বাড়ীতে নামায পড়ার অনুমতি দিতে পারিনা।"
এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে জামায়াতে হাজির না হওয়া কোন ক্রমেই বৈধ হতে পারে না। কেননা রসূল (সা) একজন অন্ধ ব্যক্তিকেও বাড়ীতে নামায পড়ার অনুমতি দেননি। এজন্য ইবনে আব্বাসকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো যে, এক ব্যক্তি সব সময় দিনে রোযা রাখে ও রাতে নামায পড়ে, কিন্তু জামায়াতে নামায পড়ে না। তার কি হবে? তিনি বললেন: এরূপ করতে থাকা অবস্থায় মারা গেলে সে জাহান্নামে যাবে। (তিরমিযী)
রসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি নামাযের ডাক শুনলো কিন্তু কোন ওজর না থাকা সত্ত্বেও জামায়াতে হাজির হলোনা, তার একাকী পড়া নামায কবুল হবেনা। জিজ্ঞাসা করা হলো যে, কি ধরনের ওযর? রসূল (সা) বললেন: রোগ অথবা বিপদের আশংকা। (আবু দাউদ)
রসূল (সা) বলেছেন: তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন: (১) যে ব্যক্তি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের নেতা হয়। (২) যে নারীর ওপর স্বামী অসন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় রাত অতিবাহিত হয়ে যায়। (৩) যে আযান শুনেও জামায়াতে যায়না।
আলী (রা) বলেনঃ "মসজিদের প্রতিবেশীর নামায মসজিদে ছাড়া জায়েজ নয়। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, মসজিদের প্রতিবেশী কে? তিনি বললেন: যে বাড়ীতে বসে আযান শুনতে পায়।"
বুখারী শরীফের এক হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন: "আমরা নামাযের জামায়াতে অনুপস্থিত ব্যক্তিকে মুনাফিক অথবা রোগী ছাড়া আর কিছু ভাবতামনা।"
ইবনে উমর (রা) জানান যে, একবার উমর (রা) তাঁর খেজুরের বাগান দেখতে গিয়েছিলেন। এসে দেখেন আসরের জামায়াত শেষ হয়ে গেছে। তিনি তৎক্ষনাত ঐ খেজুরের বাগান দরিদ্র লোকদের নামে সদকা করে দিলেন, যাতে তা জামায়াত ছুটে যাওয়ার ক্ষতি পূরণ করে দেয়।
জামায়াত নামায পড়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত ইশা ও ফজরের নামাযকে। কেননা রসূল (সা) বলেছেন: এই দুটি নামায অর্থাৎ ফজর ও ঈশা মুনাফিকের জন্য সবচেয়ে কঠিন। এ দুটি নামায জামায়াতে পড়ার সওয়াব কত তা জানলে লোকেরা কিছুতেই তা ত্যাগ করতোনা। (সহীহ আল বুখারী)
ইবনে উমর (রা) বলেন: যখন কেউ ফজর ও ইশার জামায়াতে অনুপস্থিত থাকতো, তখন আমরা মনে করতাম সে মুনাফিক হয়ে গেছে।
ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের উস্তাদ উবাইদুল্লাহ বিন উমার কাওয়ারীরী বলেন যে, আমি কখনো ইশার নামায জামায়াতে পড়তে ভুলতাম না। কিন্তু একদিন আমার বাড়ীতে এক মেহমান আসায় তাকে নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কারণে ইশার জামায়াত ধরতে পারলামনা। পরে ইশার নামায ২৭ বার পড়লাম। কারণ হাদীসে আছে, জামায়াতে নামাযের সওয়াব ২৭ গুণ বেশী। কিন্তু রাত্রে স্বপ্নে দেখলাম, আমি এক দল ঘোড় সওয়ারের সাথে দৌড়ে পাল্লা দিচ্ছি। কিন্তু আমি পেছনে পড়ে যাচ্ছি। যারা আগে ছিল তারা বললো, তুমি কখনো আমাদেরকে ধরতে পারবেনা। কারণ আমরা ইশার নামায জামায়াতে পড়েছি আর তুমি পড়েছ একাকী।