📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 কবীরা গুনাহ কী

📄 কবীরা গুনাহ কী


আল্লাহর কিতাব, রাসূলের (সা) সুন্নাহ ও অতীতের পুণ্যবান মনীষীদের বর্ণনা থেকে যেসব জিনিস আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ বলে জানা যায়। সেগুলিই কবীরা (বড়) গুনাহ। কবীরা ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকলে সগীরা (ছোট) গুনাহ সমূহ ক্ষমা করা হবে বলে আল্লাহ কুরআনে নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা যদি বড় বড় নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাক তাহলে আমি তোমাদের (অন্যান্য) গুনাহ মাফ করে দেবো এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাবো।” (সূরা আন্ নিসা)
আল্লাহ তায়ালা এই অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দ্বারা কবীরা বা বড় বড় গুনাহ থেকে যারা সংযত থাকে তাদের জন্য স্পষ্টতই জান্নাতের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। সূরা আশ্ শূরাতে আল্লাহ বলেন:
"আর সেই সব ব্যক্তি, যারা বড় বড় গুনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে সংযত থাকে এবং রাগান্বিত হলে ক্ষমা করে।" এবং সূরা আন নাজমে আল্লাহ বলেন: "আর যারা বড় বড় গুনাহ ও অশ্লীল কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকে, তাদের জন্য আল্লাহর ক্ষমা খুবই প্রশস্ত। অবশ্য ছোটখাটো গুনাহর কথা আলাদা।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "প্রতিদিন পাঁচবার নামায, জুময়ার নামায পরবর্তী জুময়া না আসা পর্যন্ত এবং রমযানের রোযা পরবর্তী রমযান না আসা পর্যন্ত মধ্যবর্তী গুনাহ সমূহের ক্ষমার নিশ্চয়তা দেয়- যদি 'কবীরা গুনাহ' সমূহ থেকে বিরত থাকা হয়।”
এই কয়টি আয়াত ও হাদীসের আলোকে আমাদের জন্য কবীরা গুনাহসমূহ কি কি তা অনুসন্ধান করা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে আমরা আলেম সমাজের মধ্যে কিছু মতভেদ দেখতে পাই। কারো কারো মতে কবীরা গুনাহ সাতটি। তাঁরা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: "তোমরা সাতটি সর্বনাশা গুনাহ থেকে বিরত থাকো। আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, যাদু করা, শরীয়াতের বিধিসম্মতভাবে ছাড়া কোন অবৈধ হত্যাকান্ড ঘটানো, ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাত করা, সুদ খাওয়া, যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো, এবং সরলমতি সতীসাধ্বী মুমিন মহিলাদের ওপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন: এর সংখ্যা সত্তরের কাছাকাছি।
হাদীসে কবীরা গুনাহের কোন সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়না। তবে এতটুকু বুঝা যায় এবং অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, যে সমস্ত বড় বড় গুনাহের জন্য দুনিয়ায় শাস্তি প্রদানের আদেশ দেয়া হয়েছে, যেমন হত্যা, চুরি, ও ব্যভিচার, কিংবা আখিরাতে ভীষণ আযাবের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে অথবা রাসূলের (সা) ভাষায় সেই অপরাধ সংঘটককে অভিসম্পাত করা হয়েছে, অথবা সেই গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ঈমান নেই, বা সে মুসলিম উম্মাহর ভেতরে গণ্য নয়- এরূপ বলা হয়েছে সেগুলি কবীরা গুনাহ।
হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে বলেছিল: কবীরা গুনাহ তো সাতটি। হযরত ইবনে আব্বাস বললেন: বরঞ্চ সাতশোটির কাছাকাছি। তবে ক্ষমা চাইলে ও তওবা করলে কোন কবীরা গুনাহই কবীরা থাকেনা। অর্থাৎ মাফ হয়ে যায়। আর ক্রমাগত করতে থাকলে সগীরা গুনাহও সগীরা থাকেনা, বরং কবীরা হয়ে যায়। অপর এক রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, হযরত ইবনে আব্বাস বলেছেন: কবীরা গুনাহ প্রায় ৭০টি। অধিকাংশ আলেম গণনা করে ৭০টিই পেয়েছেন বা তার সামান্য কিছু বেশী পেয়েছেন।
এ কথাও সত্য যে, কবীরা গুনাহর ভেতরেও তারতম্য আছে। একটি অপরটির চেয়ে গুরুতর বা হালকা আছে। যেমন শিরককেও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়েছে। অথচ এই গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি চির জাহান্নামী এবং তার গুনাহ অমার্জনীয়। আল্লাহ তায়ালা সূরা আন নিসায় বলেছেন: "আল্লাহ শিরকের গুনাহ মাফ করেন না। এর নিচে যে কোন গুনাহ যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিতে পারেন।" অবশ্য শিরক পরিত্যাগ করলে ভিন্ন কথা। [নিম্নে ৭০টি কবীরা গুনাহ সম্পর্কে আলোচনা পেশ করা হলো।]

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 শিরক করা

📄 শিরক করা


আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ। এই শিরক দুই প্রকারের: (১) আকীদাগত শিরক: অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা এবং তার ইবাদাত করা। গাছ, পাথর, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, ফিরিশতা, নবী, ওলী ইত্যাদি যাই হোক না কেন, তাকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা ও তার ইবাদাত করা শিরক। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে কাউকে শরীক করার গুনাহ মাফ করেন না। এর চেয়ে ছোট যে কোন গুনাহ যাকে ইচ্ছা মাফ করেন।" (সূরা আন নিসা)
"নিশ্চয় শিরক একটা বিরাট জুলুম।" (সূরা লুকমান)
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।" (সূরা আল মায়েদা) এ বিষয়ে আরো বহু আয়াত রয়েছে।
বস্তুতঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে বা কোন বস্তুকে শরীক করবে এবং সেই অবস্থায় মারা যাবে, সে নির্ঘাত জাহান্নামে যাবে। যেমন কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলে এবং ঈমানদার অবস্থায় মারা গেলে জান্নাতবাসী হবে, চাই সে জাহান্নামে যতই আযাব ভোগ করুক না কেন। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) একদিন তিনবার বললেন: আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করবোনা? সবাই বললোঃ "জ্বি হাঁ, হে রসূল"! তখন তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরীক করা, মাতাপিতাকে কষ্ট দেয়া। অতঃপর তিনি হেলান দেয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন: "মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া থেকে সাবধান!" এই শেষোক্ত কথাটা তিনি এতবার পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন যে, হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন: আমরা মনে মনে বলছিলাম, রাসূল (সা) যদি চুপ করতেন তবে ভালো হতো।
বুখারী ও আহমাদের বর্ণনায় রয়েছে: "রাসূল (সা) বললেন: তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক ও সর্বনাশা গুনাহ থেকে বিরত থাক। অতঃপর শিরকের উল্লেখ করলেন। অতঃপর বললেন: যে ব্যক্তি নিজের ধর্ম পরিবর্তন করে (অর্থাৎ ইসলামকে ত্যাগ করে) তাকে হত্যা কর।"
দ্বিতীয় প্রকারের শিরক হচ্ছে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সৎ কাজ করা। আল্লাহ বলেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাত কামনা করে তার সৎ কাজ করা উচিত এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদাতে আর কাউকে শরীক করা উচিত নয়।” অর্থাৎ নিজের সৎ কাজ কাউকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করা উচিত নয়। রাসূল (সা) বলেছেন: তোমরা ছোট শিরক থেকে দূরে থাক। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন; ছোট শিরক কী? তিনি বললেন: রিয়া অর্থাৎ লোক দেখিয়ে সৎ কাজ করা। যেদিন আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে কর্মফল দেবেন সেদিন তাদেরকে বলবেন, যাদেরকে দেখিয়ে দেখিয়ে দুনিয়ায় তোমরা নেক আমল করতে, তাদের কাছে চলে যাও। দেখ, তারা তোমাদেরকে কোন প্রতিদান দেয় কিনা।” (আহমাদ, বায়হাকী, তাবরানী) অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: যে ব্যক্তি কোন কাজ করে এবং তাতে আমি ব্যতীত অন্য কাউকে শরীক করে, তার কাজ যাকে শরীক করেছে তার। সে কাজের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।" (মুসলিম, ইবনে মাজাহ) রাসূল (সা) আরো বলেছেন : যে ব্যক্তি মানুষকে শুনায়, আল্লাহও তার বেলায় মানুষকে শুনান, আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখায়, আল্লাহও তার সাথে লোক দেখানো আচরণ করেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
রাসূল (সা) বলেন, "অনেক রোযাদার এমন আছে, যার রোযা থেকে ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া আর কিছু অর্জিত হয়না। আর অনেক রাত জেগে নামায পড়া লোক আছে, যাদের রাত জাগাই সার হয়।" অর্থাৎ নামায ও রোযা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে না করা হলে তার কোন সওয়াব হবেনা। (ইবনে মাজাহ, আহমাদ, তাবরানী)
আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন : “তাদের কৃতকর্মের কাছে আমি উপস্থিত হব এবং তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণা বানিয়ে দেব।” অর্থাৎ আল্লাহর সন্তোষ ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে মানুষ যে কাজ করবে, আল্লাহ তার সওয়াব নষ্ট করে দেবেন।
আদী বিন হাতেম বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন : "কিছু সংখ্যক লোককে কেয়ামতের দিন জান্নাতে পাঠানোর আদেশ দেয়া হবে। তারা যখন জান্নাতের খুব কাছাকাছি চলে যাবে, তার ঘ্রাণও পাবে, এবং তার ভেতরের প্রাসাদগুলো ও অন্যান্য অনুপম নিয়ামতগুলো দেখবে, তখন ফেরেশতাদেরকে বলা হবে যে, "ওদেরকে ওখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কেননা জান্নাতের ঐ সব নিয়ামতে ওদের কোন অধিকার নেই।" অতপর তারা চরম হতাশা ও অনুশোচনা নিয়ে ফিরে যাবে। তারপর তারা বলবে : “হে আল্লাহ! তোমার প্রিয়জনদের জন্য যে নিয়ামত নির্দিষ্ট করে রেখেছ, তা দেখানোর আগে যদি আমাদেরকে জাহান্নামে পাঠাতে, তাহলে তা আমাদের জন্য অনেকটা সহজ হতো।"
আল্লাহ বলবেন : "আমি তোমাদের সাথে এই আচরণই করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম। তোমরা যখন একাকী থাকতে, আমার প্রতি চরম অবাধ্যতার আচরণ করতে। আর যখন মানুষের সাথে মেলামেশা করতে, তখন তাদের সাথে খোদাভীরু লোকদের মত আচরণ করতে। নিজেদের কার্যকলাপ দ্বারা মানুষের কাছে যে মানসিকতা তোমরা প্রকাশ করতে, আমার প্রতি তোমরা আন্তরিকতার সাথে সেই মানসিকতা পোষণ করতেনা। তোমরা মানুষকে ভয় করতে, আমাকে ভয় করতোনা। তোমরা মানুষকে গুরুত্ব দিতে, আমাকে গুরুত্ব দিতোনা। মানুষের জন্য তোমরা ত্যাগ স্বীকার করতে, আমার জন্য ত্যাগ স্বীকার করতোনা। তাই আজ আমি তোমাদেরকে আমার অগাধ প্রতিদান থেকে বঞ্চিতও করবো, আর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিও দেবো।"
অপর এক হাদীসে আছে যে, এক ব্যক্তি রাসূল (সা) কে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, মুক্তি কিভাবে পাওয়া যাবে! তিনি বললেন: আল্লাহকে যদি ধোকা না দাও তাহলে মুক্তি পাবে। লোকটি বললো: আল্লাহকে ধোকা দেয়ার অর্থ কী? তিনি বললেন: যে কাজ তোমাকে আল্লাহ ও তার রাসূল করতে বলেছেন, সে কাজ যদি তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে খুশী করার জন্য কর, তাহলে সেটাই হবে আল্লাহকে ধোকা দেয়ার শামিল। রাসূল (সা) আরো বললেন: তুমি রিয়াকারী (লোক দেখানো কাজ) থেকে বিরত থাক। কেননা রিয়া হচ্ছে ছোট শিরক। যে ব্যক্তি রিয়াকারীতে লিপ্ত থাকবে, কিয়ামতের দিন সমবেত জনতার সামনে তাকে চারটে বিশেষণে ভূষিত করে ডাকা হবে, যথা: হে রিয়াকার, হে বিশ্বাসঘাতক, হে অবাধ্য, হে ক্ষতিগ্রস্ত! তোমার আমল বাতিল হয়ে গেছে, তোমার প্রতিদান নষ্ট হয়ে গেছে, আমার কাছে তোমার কোন পারিশ্রমিক পাওনা নেই। হে ধোকাবাজ, তুমি যার জন্য কাজ করেছ তার কাছ থেকে পারিশ্রমিক নাও গে।”
কথিত আছে যে, জনৈক মুসলিম মনীষীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা (ইখলাস) কাকে বলে? তিনি জবাব দিলেন: মানুষ নিজের পাপ কাজকে যেমন লুকায়, তেমনি তার ভালো কাজকেও লুকাবে। এটাই নিষ্ঠা বা ইখলাস। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো: ইখলাস বা আন্তরিকতার উদ্দেশ্য কী? তিনি বললেন: লোকে তোমার প্রশংসা করুক- এটা কামনা না করা। হযরত ফযীল বিন ইয়ায বলেন: লোকের ভয়ে খারাপ কাজ ত্যাগ করা রিয়াকারী, আর মানুষকে খুশী করার জন্য ভালো কাজ করা শিরক। আর ইখলাস হচ্ছে এই উভয় রোগ থেকে মুক্ত থাকার নাম।

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 হত্যা করা

📄 হত্যা করা


আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তার পরিণাম জাহান্নাম। সেখানে সে চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তার ওপর ক্রুদ্ধ হন, অভিসম্পাত করেন এবং তার জন্য ভয়ংকর আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।" (সূরা আন নিসা) "আর যারা বৈধ কারণ ছাড়া আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ প্রাণকে হত্যা করেনা এবং ব্যভিচার করেনা, (তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা) আর যারা ওসব অপকর্ম করে তারা হয় মহাপাপী। তার জন্য আযাব দ্বিগুণ করা হবে এবং সে অপমানিত হয়ে সেখানে চিরদিন অবস্থান করবে।' অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করে ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তার কথা ভিন্ন।" সূরা আল মায়েদায় একটি হত্যাকাণ্ডকে গোটা মানব জাতির হত্যার শামিল বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: "এ কারণেই আমি বনী ইসরাইলকে লিখে দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি কোন হত্যার বিনিময়ে ছাড়া কাউকে হত্যা করলো সে যেন সমগ্র মানব জাতিকে হত্যা করলো।
আর যে একটা প্রাণকে বাঁচালো সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচালো।" হাদীসে হত্যা ও হত্যার ইচ্ছাকেও সমান অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। রাসূল (সা) বলেন: যখন দু'জন মুসলমান তরবারী নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করে, তখন হন্তা ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামী হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, হত্যাকারীর কথা তো বুঝলাম। কিন্তু নিহত ব্যক্তির ব্যাপার কি? রাসূল (স) বললেন: সে তার প্রতিপক্ষকে খুন করতে চেয়েছিল।” (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ)
ইমামগণ ও মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেছেন যে, কোন অবৈধ স্বার্থ, শত্রুতা বা বিদ্বেষবশতঃ পরস্পরে সংঘর্ষ হলেই এ হাদীস প্রযোজ্য। নচেত আত্মরক্ষা ও বৈধ ধনসম্পদের হেফাজতের উদ্দেশ্যে অস্ত্র ধারণ করলে এ হাদীস প্রযোজ্য হবেনা। কেননা আত্মরক্ষাকারীর উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে খুন করা হয়না বরং আক্রমণ প্রতিহত করাই তার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। আক্রমণকারীকে হত্যা না করে যদি আত্মরক্ষা করা সম্ভব হয় তবে সেটা করাই শ্রেয়।
রাসূল (সা) আরো বলেছেন: আমার পরে তোমরা পরস্পরকে হত্যাকারী কাফেরদের মত হয়ে যেওনা। তিনি আরো বলেছেন: অবৈধ হত্যাকান্ড না ঘটানো পর্যন্ত বান্দার আর সকল গুনাহ মাফ হওয়ার অবকাশ থাকে। তিনি আরো বলেছেন: কিয়ামতের দিন সবার আগে হত্যার বিচার হবে। তিনি আরো বলেছেন: আমার নিকট কোন মুমিনের হত্যাকান্ড সমগ্র পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চেয়েও মারাত্মক ঘটনা। এক হাদীসে আল্লাহর সাথে শরীক করা, নরহত্যা ও মিথ্যা শপথ করাকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ বলা হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন: পৃথিবীতে যত অন্যায় হত্যাকান্ড হবে, আদম (আ) এর প্রথম পুত্র তার অংশ পাবে। কারণ সে-ই সর্বপ্রথম এই অপরাধের প্রচলন করেছে। রাসূল (সা) আরো বলেছেন: কোন অমুসলিমকে হত্যাকারী জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ বেহেস্তের ঘ্রাণ ৪০ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।

📘 কবিরা গুনাহ ইমাম যাহাবী > 📄 জাদু করা

📄 জাদু করা


জাদুর কবীরা গুনাহ হওয়ার কারণ এই যে, এ কাজ করতে হলে কাফের না হয়ে করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন: "শয়তানরা কুফরীতে লিপ্ত হয়ে মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত।” বস্তুত: অভিশপ্ত শয়তানের মানুষকে জাদু শিক্ষা দেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সথে শিরক করা। হারূত ও মারূত নামক দু'জন ফিরিশতার কাহিনী বর্ণনা প্রসংগে আল্লাহ বলেন: "তারা উভয়ে কাউকে জাদু শিক্ষা দেয়ার আগে এ কথা বলে দিত যে, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ। কাজেই তোমরা কুফরীতে লিপ্ত হয়োনা। তারপর তাদের কাছ থেকে লোকেরা এমন জাদু শিখতো, যা দ্বারা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়। অথচ তারা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তা দ্বারা কারো ক্ষতি করতে পারতো না। তারা যে জাদু শিখতো তা তাদের শুধু ক্ষতি করতো, উপকার করতোনা। আর তারা এ কথাও জানতো যে, যে ব্যক্তি জাদু আয়ত্ব করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ প্রাপ্য নেই।” (সূরা বাকারা)
এ জন্য বহু গুমরাহ মানুষকে জাদুর আশ্রয় নিতে দেখা যায়। কেননা তারা একে শুধু একটা হারাম কাজ মনে করে। অথচ আসলে তা যে কুফরীও তা তারা জানেনা। স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটানো, বেগানা পুরুষ ও স্ত্রীর মধ্যে প্রেম প্রণয় সৃষ্টির কাজে এমন সব মন্ত্র পড়ে জাদু করা হয়, যার বেশীর ভাগ শিরক ও কুফরীতে পরিপূর্ণ।
জাদুকরের শরীয়ত বিহিত শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড। কেননা তা আল্লাহর সাথে কুফরী অথবা কুফরীর পর্যায়ভুক্ত। রসূল (সা) যে হাদীসে "সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ" পরিহার করতে বলেছেন, তাতে জাদুও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করা উচিত এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় ক্ষতিকর এমন কাজের ধারে কাছে যাওয়া চাইনা। হাদীসে আছে : “জাদুকরের শাস্তি তরবারীর আঘাতে তাকে খতম করে দেয়া।” (আল জামে আত্ তিরমিযী) বুখারী শরীফের হাদীসে বর্ণিত আছে যে, "ইবনে আবদা বলেছেন: হযরত উমরের (রা) ইন্তিকালের এক বছর আগে আমাদের কাছে এই মর্মে চিঠি আসে যে, জাদুকর স্ত্রী বা পুরুষ যে-ই হোক, তাকে হত্যা কর।" এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা বলেন: "আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। যে জাদু করে, যার জন্য জাদু করা হয়, যে ভবিষ্যদ্বাণী করে, যার জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, যে শুভ বা অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস করে বা কাউকে বিশ্বাস করতে উপদেশ দেয়, তারা কেউ আমার পছন্দনীয় নয়।" হযরত আলী (রা) বর্ণনা করেন যে, রসূল (সা) বলেছেনঃ "তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবেনা : (১) মদ্যপায়ী, (২) রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়তা ছিন্নকারী ও (৩) জাদুতে আস্থা স্থাপনকারী।" (মুসনাদে আহমাদ) হযরত ইবনে মাসউদ বর্ণিত হাদীসে আছে : তাবীজ ও ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাস করা শিরক। অবশ্য আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুগ্রহ ছাড়া এসবের কোন উপকারিতা নেই এরূপ বিশ্বাস করলে তাবীজ তুমার ও ঝাড়ফুঁকে দোষ নেই, যদি তা অনৈসলামিক ভাষায় লিখিত না হয়। ইমাম খত্তাবী বলেছেন : কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম লেখা তাবীজ বৈধ। কেননা রসূল (সা) স্বয়ং হাসান ও হুসাইনকে (রা) তাবীজ লিখে দিয়েছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00