📄 সে আগুন বের হওয়ার স্থান
এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কোন বর্ণনায় রয়েছে, সে আগুন বের হবে ইয়েমেন থেকে। আবার কোন বর্ণনায় রয়েছে, আদান এলাকার গভীর অঞ্চল থেকে। আবার কোন বর্ণনায় রয়েছে, হাফ্রামাউত সাগর থেকে।
নিম্নে উক্ত বর্ণনাগুলো উপস্থাপিত হলোঃ
১. 'হুযাইফাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
... وَآخِرُ ذَلِكَ نَارٌ تَخْرُجُ مِنَ الْيَمَنِ، تَطْرُدُ النَّاسَ إِلَى مَحْشَرِهِمْ.
অর্থাৎ সর্বশেষে ইয়েমেন থেকে এক ধরনের আগুন বের হবে যা মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে হাঁকিয়ে নিবে। (মুসলিম ২৯০১)
২. 'হুযাইফার অন্য বর্ণনায় রয়েছে,
... وَنَارُ تَخْرُجُ مِنْ قَعْرَةِ عَدْنٍ تَرْحَلُ النَّاسَ.
অর্থাৎ সর্বশেষে আদানের গভীর অঞ্চল থেকে এক ধরনের আগুন বের হবে যা মানুষকে (হাশরের ময়দানের দিকে) তাড়িয়ে নিবে। (মুসলিম ২৯০১)
৩. আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
سَتَخْرُجُ نَارٌ مِنْ حَضْرَ مَوْتَ أَوْ مِنْ بَحْرٍ حَضْرَ مَوْتَ قَبْلَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ تَحْشُرُ النَّاسَ.
অর্থাৎ অচিরেই হাইরামউত অথবা হাইরামউত সাগর থেকে কিয়ামতের পূর্বে এক ধরনের আগুন বের হবে যা মানুষকে (হাশরের মাঠে) একত্রিত করবে। (আহমাদ ৭/১৩৩ তিরমিযী/তুহফাহ্ ৬/৪৬৩-৪৬৪)
৪. আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ যখন আব্দুল্লাহ্ বিন্ সালাম ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি রাসূল () কে অনেকগুলো মাসআলা জিজ্ঞাসা করেন যেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ কিয়ামতের সর্ব প্রথম আলামত কোনটি? রাসূল () ইরশাদ করেনঃ
أَمَّا أَوَّلُ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ فَنَارُ تَحْشُرُ النَّاسَ مِنَ الْمَشْرِقِ إِلَى الْمَغْرِبِ.
অর্থাৎ সর্ব প্রথম কিয়ামতের আলামত হচ্ছে এক ধরনের আগুন যা মানুষকে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে হাঁকিয়ে নিবে। (বুখারী ৪৪৮০)
উক্ত হাদীসে আগুনকে কিয়ামতের সর্ব প্রথম আলামত এ অর্থে বলা হয়েছে যে, কারণ তার পর আর দুনিয়ার কিছুই থাকবে না। বরং এর পরপরই শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। আর 'হুযাইফার হাদীসে সর্বশেষ আলামত এ জন্যই বলা হয়েছে যে, কারণ এর পূর্বে আরো নয়টি বড়ো আলামত রয়েছে। তবে এরপর আর কোন বড়ো আলামত নেই।
কোন বর্ণনায় রয়েছে, উক্ত আগুন ইয়েমেন থেকে বের হবে। আবার কোন বর্ণনায় রয়েছে, উক্ত আগুন মানুষকে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে হাঁকিয়ে নিবে। এতে প্রকাশ্য বৈপরীত্য মনে হলেও মূলতঃ কোন বৈপরীত্য নেই। কারণ, তা সর্ব প্রথম ইয়েমেন থেকে বের হলেও পরিশেষে তা পুরো দুনিয়া ছড়িয়ে যাবে। আর উক্ত আগুন মানুষকে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে হাঁকিয়ে নেয়া মানে শুধু পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে নয়। বরং সর্ব দিক থেকে হাঁকিয়ে সকল মানুষকে এক জায়গায় একত্রিত করা হবে।
অথবা উক্ত আগুন সর্ব প্রথম পূর্বের মানুষগুলোকেই হাঁকিয়ে নিবে। কারণ, পূর্ব দিকটা সকল ফিতনারই কেন্দ্রস্থল। সে হিসেবে শাম তথা ফিলিস্তীন, সিরিয়া ও তার আশপাশের এলাকা পশ্চিম দিকে।
অথবা আনাসের হাদীসে বর্ণিত আগুন বলতে ফিতনার আগুনকেই বুঝানো হয়েছে। যা পূর্বের অধিকাংশ এলাকাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অতঃপর মানুষগুলো শাম ও মিশরের দিকেই ধাবিত হয়েছে। যা পরিলক্ষিত হয়েছে চেঙ্গিজ খান ও তার পরবর্তী যুগে। এ দিকে 'হুযাইফাহ্ ও আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'উমরের হাদীসদ্বয়ে আগুন বলতে বাস্তব আগুনকেই বুঝানো হয়েছে।
📄 উক্ত আগুন কর্তৃক মানুষকে হাঁকিয়ে নেয়ার ধরন-প্রকৃতি
উক্ত আগুন সর্ব প্রথম ইয়েমেন থেকে বের হয়ে খুব দ্রুত পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে এবং মানুষগুলোকে হাশরের মাঠের দিকে হাঁকিয়ে নিবে। যাদেরকে হাঁকিয়ে নেয়া হবে তারা আবার তিন দলে বিভক্ত। যা নিম্নরূপঃ
ক. যারা পূর্ব থেকেই যাওয়ার জন্য খাওয়া-দাওয়া সেরে পোশাক পরে আরোহণ নিয়ে প্রস্তুত।
খ. যারা কখনো হাঁটবে আবার কখনো আরোহণ করবে। তারা একই উটের পিঠে পালাক্রমে দু' তিন চার এমনকি দশ জন পর্যন্ত আরোহণ করবে।
গ. যাদেরকে আগুন হাঁকিয়ে নিবে। আগুন তাদেরকে পেছন দিক থেকে ঘিরে ফেলবে এবং তাদেরকে সর্ব দিক থেকে হাঁকিয়ে হাশরের মাঠে একত্রিত করবে। যে ব্যক্তি হাঁকানোর সময় পেছনে পড়বে তথা আসতে চাবে না আগুন তাকে গিলে ফেলবে।
এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস নিম্নে উদ্ধৃত হলোঃ
১. আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ তিনভাবে মানুষকে হাশরের মাঠে একত্রিত করা হবেঃ তার মধ্যে এক জাতীয় মানুষ হবে যারা হাশরের মাঠে একত্রিত হতে খুব আগ্রহী। আরেক জাতীয় মানুষ হবে যারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে হাশরের মাঠে একত্রিত হওয়ার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তারা পালাক্রমে দু' তিন চার এমনকি দশজন করে এক উঠের পিঠে চড়ে হাশরের মাঠে একত্রিত হবে। আর বাকিদেরকে আগুন হাঁকিয়ে নিবে। উক্ত আগুন তাদের সাথেই দুপুর বেলায় বিশ্রাম নিবে এবং তাদের সাথেই রাত্রি যাপন করবে। এমনকি তাদের সাথেই সকাল ও সন্ধ্যা বেলায় উপনীত হবে। (বুখারী ৬৫২২; মুসলিম ২৮৬১)
২. আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ একদা পূর্ব দিকের লোকদের উপর এক ধরনের আগুন পাঠানো হবে যা তাদেরকে পশ্চিম দিকে হাঁকিয়ে নিবে এবং যা তাদের সাথেই রাত্রি যাপন করবে ও দুপুর বেলায় বিশ্রাম নিবে। তাদের কেউ পেছনে পড়ে গেলে আগুন তাকে জ্বালিয়ে ফেলবে। আগুন তাদেরকে এমনভাবে হাঁকিয়ে নিবে যেমনিভাবে হাঁকিয়ে নেয়া হয় পা ভাঙ্গা উটকে। ('হাকিম ৪/৫৪৮ মাজা'উয-যাওয়ায়িদ্ ৮/১২)
৩. 'হুযাইফাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা আবূ যর বনী গিফারকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ হে বনী গিফার! তোমরা সঠিক বলো, পরস্পর দ্বন্দ্ব করো না। কারণ, সত্যায়িত সত্যবাদী ব্যক্তি তথা রাসূল () বলেছেনঃ মানুষকে তিনভাবে হাশরের মাঠে একত্রিত করা হবে। এক দলকে একত্রিত করা হবে খাওয়া-দাওয়া সেরে প্রস্তুত পোশাক পরিহিত আরোহী অবস্থায়। আরেক দলকে একত্রিত করা হবে হাঁটা ও দৌড় অবস্থায়। আরেক দলকে ফিরিস্তাগণ মুখের উপর টেনে-হেঁচড়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে। তখন শ্রোতাদের কেউ বললেনঃ দু' দলের ব্যাপারটি তো আমরা সহজেই বুঝেছি। তবে ওদের ব্যাপারটিই বা কেমন যাদেরকে হাঁটা ও দৌড় অবস্থায় একত্রিত করা হবে। তখন তিনি বলেনঃ মহান আল্লাহ্ তা'আলা আরোহণসমূহের উপর এক ধরনের রোগ ছড়িয়ে দিবেন। যার দরুন অধিকাংশ আরোহণই মরে যাবে। তখন পরিস্থিতি এমন হবে যে, যার কাছে একটি আকর্ষণীয় বাগান-বাড়ি রয়েছে সে তার বিনিময়ে একটি কর্মশ্রান্ত দুর্বল বয়স্ক উট খুঁজে বেড়াবে কিন্তু সে তা খুঁজে পাবে না। (আহমাদ ৫/১৬৪-১৬৫ নাসায়ী ৪/১১৬-১১৭ 'হাকিম ৪/৫৬৪)